শূন্যসুত্ত, দুটি পরিণতমনস্ক থ্রিলার কাহিনি সংকলন। যার মধ্যে একটি কাহিনি নির্মম, ভয়ংকর পরাবাস্তব মনস্তাত্ত্বিক রোমাঞ্চকর এবং অন্যটির আধার ইতিহাস ও বর্তমানের দুটি সত্য ঘটনা। কিন্তু সবার উপরে শূন্যসুত্ত হলো আসলে একটি খোঁজ। শূন্যসুত্ত কী? তারই খোঁজ। বিভিন্ন অকাল্ট, মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক রেফারেন্স ইত্যাদি নিয়ে কাহিনি দু'টি জটিল ধরনের। যে পাঠকেরা হালকা ধরণের লেখা পড়বেন বলে থ্রিলার পছন্দ করেন, তাঁদের এই বই এড়িয়ে যেতে অনুরোধ করা হলো।
এবারত প্রকাশনীর নিবেদন, এই শক্তপোক্ত হার্ডকভারটি পড়তে শুরু করে আর থামা গেল না। পুরো বইটা শেষ করে তবে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। কী আছে এই বইয়ে? সংক্ষিপ্ত 'ভূমিকা'-র পর এতে আছে দুটি উপন্যাসিকা। তারা হল~ ১. সুজাতার কিচেন: এই লেখাটি আগে 'নভোরজ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ২. শূন্যসুত্ত: এযাবৎ অপ্রকাশিত। দুটি লেখাতেই নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ এসেছে। ডায়রির আকারে কাগজে বন্দি নানা ভাবনা, কথা, সরাসরি ইতিহাস, কল্পনা আর ভয় এতে মিশেছে। কখনও সে কাহিনির উপজীব্য হয়েছে নরমাংস-ভোজন। কখনও বা তা সন্ত্রাসবাদ নামক নরমেধযজ্ঞের কথা বলেছে। তবে দু'টি কাহিনিই আসলে বলতে চেয়েছে, প্রাচীন পাপের মধ্যেই প্রোথিত থাকে নবজন্মের বীজ৷ সেই পাপের আগুনে পোড়া মানুষের প্রায়শ্চিত্তের ছায়ায় বড়ো হয় নতুন মহীরুহের সম্ভাবনা। নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় এক অতি বিরল প্রজাতির লেখক। রোমাঞ্চ, ভয়, রহস্য, বীভৎসতা এবং ইতিহাসের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেও নিটোল গল্প বলতে পারেন তিনি। সেই ধারায় তাঁর এই নিবেদনটিও হতাশ করেনি। বরং নতুন করে আমাকে মুগ্ধ করেছে। অত্যন্ত সংবেদী ও সুরেলা গদ্যে তিনি নির্মাণ করেছেন হিংসা ও রিরংসা, অন্ধকার ও আগুনের এই ভয়াল ভুবন। এখানে প্রবেশ করার অধিকার আপনার আছে; কিন্তু মুক্তি পাবেন কি না— সেটা লেখকই ঠিক করে দেবেন। আনপুটডাউনেবল থ্রিলার, বিশেষত ইতিহাস ও বর্তমান যেখানে একাকার হয়, এমন কিছুর ভক্ত হলে এ-বই আপনার জন্যই লেখা হয়েছে। তাই সম্ভব হলে অবশ্যই পড়ুন।
সমসাময়িক যে কজন লেখকের লেখা পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকি, তাঁদের মধ্যে নীলাঞ্জন মুখার্জী অন্যতম। সৌভাগ্যের বিষয়, এখনও পর্যন্ত প্রিন্ট মিডিয়ায় তাঁর যা যা লেখা ছাপা হয়েছে, সবই পড়ে ফেলেছি। লেখকের গল্প বলার স্টাইল বা গল্পের প্লট এতটাই আলাদা যে পড়ে ফেলার থেকে 'পড়িয়ে নেন' শব্দযুগল ব্যবহার করাই শ্রেয়। সেই চোদ্দই ফেব্রুয়ারি থেকে যে মুগ্ধতার রেশের সূত্রপাত, তা সবসময়ই যে ঘনীভূত হয়েছে তা নয়। কয়েকটি গল্পে নিজের কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের কথা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছি, এবং অশেষ ধৈর্যবান শ্রোতার মত তিনি সেসবের উত্তর দিয়েছেন। লেখক হিসেবে এখানেই তাঁর মহত্ত্ব। তবে আজকের আলোচ্য বইটি নিয়ে পাঠক হিসেবে আমার কোথাও কোনো অভিযোগ নেই। বরং পাঠপ্রতিক্রিয়ার শুরুতে ঠিক যে কথাগুলো পড়ার সময় মনে হয়েছিল, বরং সেইগুলির পুনরাবৃত্তি করেই শুরু করি। কিছু লেখা থাকে যা মানুষকে লিখতে অনুপ্রাণিত করে। প্রতিযুগে বরেণ্য সাহিত্যিকরা নিজেদের একটি ছাপ তৈরি করে গেছেন, যেটাকে ফর্মালি সিগনেচার স্টাইল বলে। অনুনকরণীয় সেই লেখার ধাঁচ দেখলেই বোঝা যায়, লেখাটি কার লেখা। শূন্যসুত্তের দুটি উপন্যাসে, বিশেষতঃ দ্বিতীয়টিতে লেখক নিজের সেই সিগনেচার স্টাইলে চালিয়ে খেলেছেন, এবং যারা উপন্যাসটি পড়েছেন, তারা জানেন স্কোর সেঞ্চুরি অতিক্রম করেছে বললে একটুও বাহুল্য হবে না। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে হরর বা থ্রিলার লেখকদের এখনও সেই অর্থে 'সিরিয়াসলি' নেওয়া হয় না। তার পিছনে বিবিধ কারণ থাকতে পারে। তবে, আশার কথা, বাংলায় চোদ্দই ফেব্রুয়ারি বা শূন্যসুত্তের মত উপন্যাস ছাপা হলে পাঠক নড়েচড়ে বসতে বাধ্য। শূন্যসুত্তের প্রথম নভেলাটি সুজাতার কিচেন। দেবাশিস গোস্বামী সম্পাদিত, জনপ্রিয় নভোরজ পত্রিকায় প্রকাশিত, এবং বইতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বহু আগেই আমার পড়া। সুজাতার কিচেনের বিষয়বস্তু ঠিক কী, তা বলে বোঝানো সমস্যার। ডার্ক ফিকশনের জহুরী মাত্রই জানবেন, শুধুমাত্র অপরাধ, হিংসা, খুনজখম, ধর্ষণ, বা বাঁধভাঙা শরীরি খেলা দেখিয়ে একদা পাল্প ফিকশন বলে সাহিত্যের যে বিশেষ ধারাটি মাথা তুলেছিল, ডার্ক ফিকশনকে প্রকৃত অর্থে ডার্ক হতে গেলে সেই বাঁধাধরা গত ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। আলটিমেটলি আমরা সব গল্পেই মানুষের গল্প শুনতে চাই। ডার্ক ফিকশনে মনের অন্ধকার গলিখুঁজিতে সময়মতো এবং সুযোগমতো আলো ফেলে পাঠকের কাছে অভাবনীয়, রুদ্ধশ্বাস বা নাটকীয় মোড়কে পেশ করা হলেও, সারবত্তা হিসেবে কিছু না থাকলে তা দীর্ঘদিন মনে রাখা কঠিন। তারাশঙ্কর যেমন ডার্ক ফিকশনে নিষ্ঠুরতা মেশান, মানিক যেমন মেশান ঔদাসীন্য, মান্টো তেমনি মেশান শারীরিক অনাড়ষ্টতার আড়ালে, দুর্দমনীয় রিপুকাহিনী। শূন্যসুত্তে ডার্ক ফিকশনে মিথোলজি মিশেছে। চোদ্দই ফেব্রুয়ারি থেকেই লেখকের এই বিশেষ স্টাইলটি আমার অত্যন্ত আকর্ষণীয় লেগেছে। বিদেশী সাহিত্যে মিথোলজি বেসড ফিকশন একাধিক পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিথোলজিকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার জন্য গল্পের বুনটটি লেখক এমনভাবে বুনেছেন যে তা যারপরনাই আরোপিত লেগেছে। সম্প্রতি দ্য মেইডেনস পড়ে যেমন ভীষণ হতাশ হয়েছি। প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া অযথা লম্বা না করে তাই বলব, সুজাতার কিচেনে কোথাও আরোপিত ভাব পাইনি।
মিশরের দেবী হারিতি, এবং আধুনিক কলকাতা শহরে সুজাতা নাম্নী এক পদ্মগন্ধা, সুন্দরী, রন্ধনবিশারদার মধ্যে কী সম্পর্ক রয়েছে? কেনই বা, ঔপনিবেশিক কলকাতায় জর্জ ডিগবি নামে এক সাহেবের বাড়ির বাইরে পড়ে রয়েছে একগাদা হাড়, কুকুরের নয়, বেড়ালের নয় বরং মানুষের! কেনই বা অনুপ নামের এক বিখ্যাত লেখকের পাশের ফ্ল্যাটে মঙ্গলা নামের এক মরাঠি পূর্ণগর্ভা নারীর উপর হামলা চালাচ্ছে একের পর এক বিড়াল? কী চায় তারা? কেনই বা অনুপ কিছুতেই সুজাতার রান্নার ঘোর থেকে নিজেকে বার করে আনতে পারছে না? বহু আলোচিত রেক্কা উপন্যাস বা সিরিজের সঙ্গে আপাতভাবে মিল পেলেও এই উপন্যাসের উপজীব্য আলাদা, এবং ব্যক্তিগতভাবে, পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে রেক্কার থেকে সুজাতার কিচেন অনেকটাই এগিয়ে থাকবে। তার একটাই কারণ, এবং তা হল গল্পের সারবত্তা।
দ্বিতীয় নভেলাটি শূন্যসুত্ত। এর আগে এই ধরণের লেখা আমি কোনোদিন পড়িনি। টুকটাক থ্রিলার লিখি বলে একটু আধটু পড়া হয়, কিন্তু মগধের প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে আধুনিক কালের সন্ত্রাসবাদকে নিখুঁতভাবে জুড়ে লেখক যেটি লিখেছেন তার জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। মেধা, পরিশ্রম এবং বুদ্ধিমত্তার ছাপ ছত্রে ছত্রে। যুগে যুগে ঘৃণা, ষড়যন্ত্র আর বিষময় পরিবেশের পাঁকের মধ্যে কেমন করে অমিতাভর মত নির্মোহ পুরুষ জন্মান, কেমন করে ধর্মের বাহ্যিক আচরণকে আশ্রয় করে নিখুঁত রাজনীতির অঙ্ক খেলে মানুষকে যুগের পর যুগ স্বাধীন করেন, শূন্যসুত্ত তারই গল্প। এ স্বাধীনতার অর্থ স্ব-অধীনে থাকা। যক্ষ, যমকেলির মত বিষকন্যারা, আম্রপালির মত নগরবধূরা, রক্ষা মাতরের মত পুলিশ অফিসাররা, পলির মত লন্ডারা, নিজেদের সব যাপনের শেষে যার নিঃসীম, অনন্ত স্নেহময় আশ্বাসবাণীর প্রতি ভরসা রাখে, শূন্যসুত্ত সেই অমিতাভেরও গল্প। যারা থ্রিলার পড়তে ভালোবাসেন বা বাসেন না, তাঁরা সম্ভব হলে শূন্যসুত্ত পড়ে দেখবেন। এই বইয়ের একমাত্র খারাপ লাগা হল এর প্রচ্ছদ। শ্রদ্ধেয় শ্রী সুমিত রায়ের একাধিক অলংকরণ আমরা নভোরজে দেখেছি। কিন্তু পাঠক হিসেবে এই প্রচ্ছদটি আমার অনাকর্ষণীয় লেগেছে। পরের সংস্করণে যদি বদলানো যায়, এই আবদার জানিয়ে গেলাম। ধন্যবাদ।
বললে অনেক কথা বলা যায় কিন্তু বেশি বলে এই বইটির মুগ্ধতার রেশ আমি কাটাতে চাইছিনা। তাই সহজভাবে কয়েকটি জিনিস নিয়ে বলা যাক। বইটিতে দুটো উপন্যাস/উপন্যাসিকা রয়েছে। সুজাতার কিচেন এবং শূন্যসুত্ত। আর নীলাঞ্জন মুখার্জির লেখার সঙ্গে আগে পরিচিত থাকার সুবাদে বলতে পারি তার সিগনেচার স্টাইল এই দুটো উপন্যাসেই পাওয়া যাবে। তবে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষনীয় লাগল দুটো উপন্যাসেই প্যারালাল ন্যারেটিভ বজায় রেখে একাধিক উপাখ্যানের অবতারণা করা হয়েছে এবং শেষদিকে সেগুলো একটা অদৃশ্য সুতো দিয়ে জুড়েও গেছে। সুজাতার কিচেনের মধ্যে যেখানে ক্যানিবলিজম , সিরিয়াল কিলিং এবং মানসিক দ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছে, ওদিকে শূন্যসুত্ততে উঠে এসেছে দুটো প্যারালাল ন্যারেটিভ যেখানে একটা শহরকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয় তার ভেতরের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে। তবুও অভিযোগ কি নেই? আছে। মুদ্রণ প্রমাদ রয়েছে কিছু কিছু জায়গায় (সামান্যই যদিও) আর প্রচ্ছদ আমার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ হয়নি। এছাড়া আর কিছু বলার নেই। It is a good one, but not for all, ওই gore violence সবার সইবেনা। যদি অন্য ধরনের non linear লেখা পড়ে হজম করতে চান, go for it, you won't regret. Cheers.
লেখক নীলাঞ্জন মুখার্জ্জী এর লেখনীর আমার প্রথম পরিচয় হয় 'শতী সহস্রাননা' (প্রকাশনা - বেঙ্গল ট্রয়কা পাবলিকেশন) এর মাধ্যমে , তারপর ওনার লেখা '১৪ই ফেব্রুয়ারি' (একই প্রকাশনা) পড়েছি। বাংলা বইয়ের জগতে উনি যে এক অন্যরকম ধারা আনতে চেষ্টা করছেন, তার ধারণা প্রতিটি লেখায় স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। উনি যেমন দক্ষভাবে গল্পের প্লট তৈরী করেন, তেমনই দক্ষভাবে তাঁর কল্পনাশক্তি এবং তথ্যের মিশেল ঘটান। সব মিলিয়ে পাঠকদের এক অজানা মন্ত্রবলে আচ্ছন্ন করে রাখেন উপন্যাসের শেষ পাতা পর্যন্ত। আমিও তাই তাঁর লেখার ভক্ত হয়ে পড়েছি তখন থেকেই।
এরপর যখন এবারত প্রকাশনী থেকে তাঁর তৃতীয় বই 'শূন্যসুত্ত' প্রকাশিত হয়, সংগ্রহ করি আগের সেই জাদুঘরে যাওয়ার জন্য। বইটিতে দুটি উপন্যাস রয়েছে -
১) সুজাতার কিচেন (নভোরজ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত) ২) শূন্যসুত্ত
উপন্যাসগুলি কেমন লেগেছে তা বলার আগে, এগুলি সম্পর্কে ছোট্ট করে বলে নিই।
১) সুজাতার কিচেন - শহরে একের পর এক হয়ে চলা খুন, উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিছু মানুষের নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতার মাঝে প্রধান চরিত্র সুজাতা এবং তার প্রফেশনালি চালানো কিচেনকে ঘিরে সন্দেহের পারদ চড়া - সব মিলিয়ে লেখক এক অদ্ভুত কোলাহলপূর্ণ সমাজের ছবি তুলে ধরেছেন পাঠকদের কাছে, যে সমাজ শক্তিহীনদের টুঁটি চেপে ধরে কিন্তু বলশালীদের দিকে তাকিয়েও দেখে না। এই পরিস্থিতিতে স্থিতাবস্থা আনার জন্য প্রকৃতি নিজেই নিজের আদিম রূপ খুঁজে নেয়, দৈব শক্তি ঘিরে থাকে নিরপরাধীদের, তাদের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু কীভাবে? উত্তর খুঁজে পেতে শেষ পর্যন্ত পড়তে হবে উপন্যাসটি। টানটান উত্তেজনাপূর্ণ লেখাটিতে গল্পের ক্লাইম্যাক্সে যেভাবে পাঠকদের চমকে দিয়েছেন লেখক, শুরু থেকে ভেবে নেওয়া একটি ধারণাকে নস্যাৎ করে যেভাবে আমাদের ভাবনাকছ অন্য বৃত্তে চালনা করেছেন, তার জন্য লেখককে কুর্নিশ। এই ভাবনাকে শব্দে রূপান্তরিত করার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।
২) শূন্যসুত্ত - মুম্বাই শহরের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা ভয়, সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপের মাঝে এক মানুষের উদয় যে মনে করায় ইতিহাসের বাণী, হাজার হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর সঙ্গে আধুনিক সভ্যতার মিল। অতীতের মুম্বাই শহরের ইতিহাস, বুদ্ধদেবের জীবনীর পাশাপাশি এই সমাজের ঘটনা এবং চরিত্রের বিশ্লেষণ - পাঠকদের চোখে আপাতভাবে মনে হওয়া সম্পূর্ণ দুটি আলাদা বিষয়কে কীভাবে এক ছাঁচে ফেলে একে অপরের সমার্থক করে দেওয়া যায়, বুদ্ধদেবের শান্তির বার্তা আধুনিক সভ্যতাতেও কতটা প্রভাবশালী হতে পারে লেখক তা দেখিয়েছেন। ক্ষমতা দখলের লড়াই, ধ্বংস তথা মৃত্যুর রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষ কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, লেখক মনে করিয়েছেন আবারও। ভালো এবং মন্দের অবিরাম যুদ্ধ এবং রক্তপাতের শেষে শান্তিটুকুই যে দরকার হয় স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনতে, লেখক আমাদের সেই সত্যের দরজায় দাঁড় করিয়েছেন। তার জন্য ওনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। গল্পের ভাবনা, চরিত্রায়ন - এক কথায় মনমুগ্ধকর।
লেখককে অভিনন্দন বারংবার পাঠকদের মন জয় করার জন্য। আবার, এমন কিছু পড়ার আশায় রইলাম।
২১৬ পাতার হলেও একটু ছোটখাটো সাইজের বই। আর বেশি দেরি করলাম না পড়া শুরু করতে। এই বইটিতে দুটো গল্প রয়েছে। প্রথম গল্পটি দ্বিতীয় গল্পের তুলনায় ছোট।
১) সুজাতার কিচেন: বর্তমান সময়ের কলকাতার সল্ট লেক এর মত একটা পশ এলাকায় প্রায় রোজ মিলছে কারোর না কারোর লাশ। ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহের কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায় না, আবার গর্ভবতী মহিলার মৃত্যু হলে উধাও হচ্ছে গর্ভস্থ শিশু। এদিকে পুরো এলাকা জুড়ে বেড়ে চলেছে বিড়ালের সংখ্যা। অন্যদিকে প্রাচীন মিশরের ইতিহাস এবং ১৯১৯ সালের পরাধীন ভারতের ছবি বারবার ফুটে উঠেছে এই গল্পে। তিনটি ভিন্ন টাইমলাইনের গল্প সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে চলেছে রহস্যের সূত্রপাত এবং তার সমাধান খুঁজে পাওয়ার উদ্দেশ্যে। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময়, স্বাধীনতা বিপ্লবের সময় কিভাবে শহরগুলো নরখাদকের শহরে পরিণত হয় , এবং আজও শহরের কোণায় কোণায় তারা কিভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, নীলাঞ্জনবাবু তার লেখনীর মাধ্যমে খুব ভয়াবহ ভাবে তুলে ধরেছেন। মিথ্যে বলবো না একদমই, কিছু কিছু জায়গায় হত্যার পদ্ধতিগুলো পড়ার সময় খুব ডিস্টার্বিং লাগছিলো। এই গল্পে দেবী হারিতীর উল্লেখ রয়েছে। গল্পটি বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছিলো, তবে শেষের দিকে মনে হলো গল্পটি কোথাও যেন অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। যেন বেশ তাড়াহুড়ো করে লেখা শেষ করে দেওয়া হয়েছে। মিশরই বা কিভাবে নরখাদকদের হাত থেকে রক্ষা পেল, বর্তমান সময়ের সাথে অতীতের যোগসূত্রই বা কীকরে তৈরি হল, সবই যেন একরকম ধোঁয়াশায় থেকে গেল। তাই এই গল্পটি পড়তে ভালো লাগলেও শেষের দিকে এসে একটু নিরাশ হয়ে পড়লাম।
২) শূন্যসুত্ত: দ্বিতীয় গল্পটি আমার বেশ ভালো লেগেছে। মুম্বাই শহরের নামকরা হোটেল এবং রেলওয়ে স্টেশনে ব্লাস্ট করার ছক কষছে এক উগ্রপন্থীর দল। মারণাস্ত্র হতে হবে ভয়ানক, কিন্তু অতি সহজলভ্য জিনিস দিয়ে তৈরি। বৈশালীতে অজাতশত্রুর গুপ্তসংঘ ঠিক এমনই এক নতুন ধরনের বিষের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য মগধের কল্যাণে তথাগতকে হত্যা করা। বৈশালীর গণতন্ত্র যেমন একাধারে মগধের রাজতন্ত্রের শিকার, তেমনই তাদের গণতন্ত্রের নির্মম উদাহরণ হয়ে জেগে ওঠে আম্রপালি। সময়ের কালে কে কখন কার দাবার গুটিতে পরিণত হয়,গল্পের শেষে পাঠককে তা ভাবতে বাধ্য করাবে। মুম্বাই ব্লাস্ট ঘটনার সাথে প্রাচীন মহাজনপদের ইতিহাস, গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীরের উপস্থিতি সব মিলিয়ে গল্পের সাথে সময়ের দোলাচল বেশ উপভোগ করার মতো। একদম শেষের দিকে হিন্দি সিনে���ার মতো হয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা যদিও। তবে আমি একটা জিনিস ঠিক বুঝতে পারিনি। নীলাঞ্জন বাবু এক জায়গায় লিখেছেন, আম্রপালি কখনোই মা হতে পারবেন না, তা নিয়ম বিরুদ্ধ। কিন্তু পরেই উল্লেখ রয়েছে, বিম্বিসারকে আম্রপালি নিজের পুত্র সন্তান দান করেছেন। এখানে প্রশ্নচিহ্ন জেগে উঠছে মনে।
যদি দুটো গল্পের মধ্যে তুলনা করা হয়, তাহলে আমি দ্বিতীয় গল্পটিকে প্রথমটির থেকে এগিয়েই রাখবো। আপনারা কেউ "শুন্যসুত্ত" পড়ে থাকলে অবশ্যই জানাবেন, কোন গল্পটি আপনাদের ভালো লেগেছে।
যারা এখনো "সতী সহস্রাননা" বা "১৪ই ফেব্রুয়ারি" পড়েন নি, তাদের জন্যে বলি, নীলাঞ্জন মুখার্জ্জী paranormal আর psychological thriller এর মিশেলে যে গল্পগুলো লেখেন, আমি অন্তত সেগুলো শুরু করার পর শেষ না করে থামতে পারিনি! এই বইটাও সেরকমই দুটো গল্পের সংকলন।
বইয়ের প্রথম গল্প "সুজাতার কিচেন"। এই গল্পটা আমার নভোরজের পূজাসংখ্যা তে আগে পড়া, তবে আরো একবার পড়তে মন্দ লাগেনি। এই গল্পের মূলে রয়েছেন এক লেখক, যিনি একটি resturant এর গল্প লিখছেন। Resturant এর মালকিন সুজাতা নামের এক মহিলা। কানাঘুষোয় খবর মহিলা তার বানানো খাবারে মানুষের মাংস মিশিয়ে তাকে আরো সুস্বাদু বানিয়ে তোলে। আরে এ তো বাংলাদেশের সেই নামকরা thriller এর plot! ধূর বাবা.. পুরোটা তো শুনুন.. প্রাচীন মিশরে মানুষের খাদ্যাভাস বদলে তাদের cannibalistic বানিয়ে ফেলার এক প্রাচীন গল্প শোনান লেখক। সেখানে আসে মিশরীয় দেবী বাস্তেত আর আপেতের দ্বৈরথ। এই দ্বৈরথ সময়ের গন্ডি পেরিয়ে এসে পড়ে ব্রিটিশ রাজ-দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলায় আর শেষ হয় আধুনিক যুগে অনুপ আর সুজাতার গল্প দিয়ে।।
এই বইয়ের দ্বিতীয় গল্প হল শূন্যসুত্ত। গল্পের plot কিছুটা এরকম, একটি terrorist organization, Mumbai তে bomb blasting এর সাথে জড়িত। তাদেরই মধ্যে একজনের Diary এর লেখা পড়ে আমরা organization এর plan program সম্পর্কে জানতে পারি। উড়ো একটা phone call এ এই ঘটনার তদন্তে থাকা police officer এই Diary এর কথা জানতে পারে, আর তা উদ্ধার করতে গিয়ে কি হয়, তা নিয়েই গল্প। কি? আর ৫টা web series এর plot এর সাথে সাদৃশ্য পেলেন? একদমই নয়। এবার বাকিটা বলি। উপরের এই গল্পের সাথে Parallely চলে মগধের রাজা অজাতশত্রুর বৈশালী আক্রমণের গল্প, প্রচুর প্রচুর কূটনীতি, যক্ষ আর যমকেলির মতো assassins তৈরী হওয়ার নেপথ্য কাহিনী, আর তথাগত বুদ্ধের assassination! এই দুটো গল্পকে যে কি মারাত্মক ভাবে blend করেছেন লেখক, তা আমার মতো পাঠকের অন্তত লিখে বোঝানোর ক্ষমতা নেই! অবশ্যই পড়ুন, storngly recommended।
Hardbinding বইটা দেখতেও খুব সুন্দর, সুমিত রায়ের প্রচ্ছদ বেশ ভালো, তবে আমারও পুরোনো layout টাই বেশি মনে ধরেছে।
Another well researched work by the author. Some parts of the famine of Egypt in the first novella is a direct translation from historical works...the second novella is especially good and a very thrilling read. It almost urges the reader to do their own research and find out more about these ancient characters and their motivations. Above all the Buddha shines as the all compassionate one.