ইতিহাস আমরা দুই ধরণের উৎস ( source) থেকে পড়তে পারি। Primary source বা মুখ্য উৎস এবং Secondary source বা গৌণ উৎস। প্রথম ধরণের উৎসের ক্ষেত্রে লেখকের সরাসরি সময়টার সাথে সম্পৃক্ততা থাকে। যেমন বলা যায় আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরি বইটার সাথে। অন্যদিকে দ্বিতীয় উৎসের ক্ষেত্রে লেখক সরাসরি আলোচ্য সময়টার সাথে সম্পৃক্ত থাকেন না বরং ঐ সময়ের বিভিন্ন লেখ��, বক্তৃতা, সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নিজে একটা বয়ান তৈরি করেন। অর্থাৎ গৌণ উৎস সবসময় মুখ্য উৎসের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়। যেমন বলা যায় প্রাচীন বাংলা নিয়ে লিখিত যেকোনো বইয়ের কথা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের “কারাগারের রোজনামচা” আমাদের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা দলিল যেখানে তিনি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দ্বারা একটা সময়কে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ বইটা আমাদের ইতিহাসের অন্যতম একটা মুখ্য উৎস।
বিষয়বস্তুর কথা বলতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে বইটার নামে। কারাগারের রোজনামচা নামটাই আমাদের বলে দিচ্ছে বইটা কি ধরণের বই আর কোথা থেকে বইটা লেখা হয়েছে। হ্যাঁ, এটি একটি রোজনামচা বা ডায়েরি যেটি বঙ্গবন্ধু তাঁর জেলে অবস্থানকালে লিখেছিলেন। ছয় দফা দাবি যখন সমগ্র পূর্ব বাংলায় আলোড়ন তুলে ফেলে তখন আন্দোলনকে বানচাল করতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে জেলে বন্দী করে। সেই সময়টাতে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার সরবরাহ করা রুল টানা খাতাতেই লিখিত হয়েছে এই রোজনামচা। ফলে বইটাতে স্বভাবতই আলোচিত হয়েছে ছয় দফা দাবির কথা, আওয়ামী লীগের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা, সরকারের দমন-পীড়নের কথা আর জেলে বঙ্গবন্ধুর কাটানো সময়টার কথা। দুই অংশে বিভক্ত বইটার প্রথম অংশে ঢাকা জেলে থাকাকালীন ১৯৬৬ সালের জুন থেকে ১৯৬৭ সালের জুন পর্যন্ত সময় এবং দ্বিতীয় অংশে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কুর্মিটোলা সেনানিবাসে বন্দী থাকাকালীন স্মৃতিকথা স্থান পেয়েছে।
বইটার প্রথম অংশে বঙ্গবন্ধু জেলজীবনকে তুলে ধরেছেন। জেল কি, কারা থাকে সেখানে, জেল কিভাবে চলে ইত্যাদি বিষয়গুলো এসেছে। এখানে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের একটা বড় অংশ জেলে কাটিয়েছেন ( ৪,৬৮২ দিন সর্বসাকুল্যে!) ফলে তিনি জেল-জীবনকে একদম খুঁটিয়ে বর্ণনা করতে পেরেছেন। জেলের নিজস্ব ভাষা যেমন কেসটাকোল, বন্দুক দফা, শয়তানের কল, সিকম্যান, আইন দফা ইত্যাদি বিষয়গুলো যেমন তিনি বর্ণনা করেছেন ঠিক তেমনি জেল সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাও তিনি বাতিল করেছেন। জেলের ভিতরে জেলের উপস্থিতি, টাকা থাকলে মেয়ে ব্যতীত সবকিছু পাওয়ার নিশ্চয়তা, জেলে তথ্যের ছড়িয়ে পড়া এসব দিকগুলো তুলে আনার পাশাপাশি তিনি সমালোচনা করেছেন পুরো জেল ব্যবস্থাকেই। তাঁর মতে, “ জেল দিয়ে লোকের চরিত্র ভালো হয়েছে বলে আমি জানি না।“ তিনি উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে সরকার ও প্রভাবশালীরা মানুষজনকে অন্যায়ভাবে জেলে পুরে রাখে বা জেলে এসে ছিঁচকে অপরাধীরা আরও বড় অপরাধী হয়ে ওঠে।
বঙ্গবন্ধুকে জেলে রাখা হয়েছিলো সলিটারি কনফাইনমেন্টে বা নিঃসঙ্গ অবস্থায়। ফলে বই আর কাগজপত্র পড়েই তাঁকে দিন কাটাতে হতো। আর যখন পড়তেন না তখন তিনি ভাবতেন আর লিখতেন। তাঁর এই চিন্তা থেকেই আমরা তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার প্রমাণ পাই। তিনি সরস বর্ণনা, রূপক ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানের সমাজচিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর সরস বর্ণনার প্রমাণ পাই পাগলের অন্য পাগলদের পাগল বলার ঘটনা, দাঁড়িওয়ালা ডাক্তারের ঘুষ খাওয়া, খিচুড়ি সংগ্রাম পরিষদ, ভন্ড মওলানা বা লেদু চোরের কাহিনীর মধ্য দিয়ে। এছাড়া আগাছা ও তাঁর ফুলের গাছের অবস্থা তুলে ধরে তিনি তুলে ধরেছেন তৎকালীন রাজনীতিবিদদের প্রকৃত অবস্থা। ব্যঙ্গতেও তিনি কম যান না ; তাঁর অসাধারণ হিউমারের প্রমাণ পাই বেশকিছু ঘটনা বর্ণনার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান যখন নিজ দেশের অভাব-অনটনের মধ্যে ইন্দোনেশিয়াকে সহায়তা করে তখন তিনি শাসকদের ব্যঙ্গ করেন এভাবে, “নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ানো তো ইসলামের হুকুম” বা পুলিশের উপস্থিতি ছেলে রাসেলের সাথে কথা বলার সময় বলেন, “….ভাববে একুশ মাসের ছেলের সাথে রাজনীতি নিয়ে কথা বলছি!” এছাড়া সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, শাসকদের মহাজ্ঞানী হয়ে পড়া, ভাসানীর রাজনৈতিক অসুখ ইত্যাদি বর্ণনাতেও তিনি ব্যঙ্গ করেছেন।
এবার আসা যাক বইটা থেকে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় সেদিকটাতে। বঙ্গবন্ধু যে আপোষহীন নেতা ছিলেন সেটা আমরা সবাই জানি কিন্তু কতটা? বইয়ের পরতে পরতে তার প্রমাণ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু জেলে গিয়েছিলেন ছয় দফা দাবির সপক্ষে বক্তব্য রাখায়। ঐ সম্পর্কিত বিভিন্ন বক্তব্যের জন্য তাঁর নামে বিভিন্ন জায়গায় মামলা করা হয় দশের অধিক। কিন্তু তিনি জানতেন শাসকরা এটাই করবে, তাইতো তাঁর মুখ দিয়ে বের হয়েছে, “ সাগরে শয়ান যার, শিশিরে ভয় কি তার!” কতটা আপোষহীন হলে মামলার পর মামলাকে এমন হাসিমুখে মেনে নেওয়া যায়! তিনি জানতেন তিনি কি করছেন, তিনি জানতেন ছয় দফা দাবি ছাড়া বাঙালির মুক্তি নেই এবং তার জন্য তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, “……আমি যে পথ বেছে নিয়েছি তা কষ্টের” বা “নিজেকে ভাসায়া দিয়াছি যা হবার হবে!” নিঃসঙ্গ কারা প্রকোষ্ঠে রেখে যখন তাঁকে পাগল করে ফেলার চেষ্টা করছিলো শাসকগোষ্ঠী তখনও তিনি স্থির ছিলেন, তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন তাঁকে পাগল করা যাবে না বরং শাসকরাই পাগল হয়ে যাবে! এমন সমূহ বিপদের দিনেও তিনি রবীন্দ্রনাথকে ভোলেননি, তাঁর অবস্থা বর্ণনা করেছেন কবিগুরুর পঙক্তিতে, “ বিপদে মোরে রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে যেন না করি ভয়!” এমনই ছিলো তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা।
রাজনীতিবিদ হওয়ার প্রথম শর্ত যে দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালোভাবে জানা সেটা বোধহয় সবাই স্বীকার করবেন। আর এই শর্ত বঙ্গবন্ধু পূরণ করেছিলেন সম্পূর্ণভাবে। তিনি বাঙালিকে হাড়ে হাড়ে চিনতেন, তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হাড়ে হাড়ে চিনতেন, তিনি দেশের প্রতিটা অংশের খোঁজ রাখতেন। বাঙালির অতি মাত্রায় দৈব সহযোগিতার আশা, পরশ্রীকাতরতা, একতার অভাব ও বিশ্বাসঘাতকতার দিকগুলো তিনি তুলে ধরেছেন বিভিন্ন প্রসঙ্গে। নেতাদের কাছে বন্যা নিয়ন্ত্রণের দাবি না করে আল্লাহর উপর দায় দেওয়া বা মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস তিনি এনেছেন প্রসঙ্গক্রমে। সহ রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের সম্পর্কেও তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিলো। তিনি ভাসানীর দোদুল্যমানতা, মানিক মিয়ার দৃঢ়তা ও ইত্তেফাকের মাধ্যমে বিরুদ্ধ রাজনীতি বাঁচানো বা মোনায়েম খানদের চাটুকারিতার কথা নিঃসঙ্কোচে বলে গিয়েছেন। আবার দেশ যে কিছু পশ্চিম পাকিস্তানি পুঁজিপতিদের হাতে বন্দী হয়ে গিয়েছিলো সেটাও তিনি দেখিয়েন বাজেট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ছয় দফার ব্যাখ্যার মাধ্যমে।
আত্মবিশ্বাস ছাড়া কখনও কোনো বিপ্লব সফল হয় না। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন নিজের এবং কর্মীদের উপর বিশ্বাস, দূরদৃষ্টি ও সঠিক পরিকল্পনা। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন বিপ্লবী। বাঙালিদের তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে তিনি নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ছিলো প্রচন্ড, তাইতো তিনি বলতে পেরেছেন, “ জেলের ভিতর আমি মরে যেতে পারি তবে এ বিশ্বাস নিয়ে মরব যে জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার একদিন আদায় করবে।“ তিনি ইতিহাসের মনোযোগী পাঠক ছিলেন, তিনি জানতেন ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। তাইতো তিনি আউয়ুব খানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, “কংগ্রেসের ভুলে দুই দেশ হলো, আইয়ুব খান সাহেব ভুল করলেও তাই হবে।“ কতটা দারুণভাবেই না মিলে গেল তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী! জেলে থাকাকালীন কখনোই তিনি আশা হারাননি, সর্বদা তিনি ত্যাগের জয়গান গেয়েছেন এবং জয়ের ব্যাপারে আত্মপ্রত্যয়ী থেকেছেন। তাঁর ভাষায়, “ আমার নিজের উপর বিশ্বাস আছে, সহ্য করার শক্তি খোদা আমাকে দিয়েছেন। ভাবি শুধু আমার সহকর্মীদের কথা।... ত্যাগ বৃথা যাবে না, যায় নাই কোনোদিন। নিজে ভোগ নাও করতে পারি, দেখে যেতে নাও পারি, তবে ভব��ষ্যৎ বংশধররা আজাদী ভোগ করতে পারবে।... জয়ী আমরা হবই। ত্যাগের মাধ্যমেই আদর্শের জয় হবে।“
বঙ্গবন্ধু ছিলেন পুরোপুরি রাজনীতির মানুষ। ফলে বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কেও তাঁর নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো। বইয়ের নানা স্থানে তাঁর এমন সচেতন মনের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার আগ্রাসন, কঙ্গোতে লুমুম্বার বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান, চীনের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কৌশল বা পা���িস্তান-প্রীতি, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সমস্যা প্রভৃতি সম্পর্কে নিজস্ব মতামত দিয়েছেন। আবার এর বিপরীত দিকটাও আমরা দেখতে পাই তাঁর চরিত্রে। একদিকে বহির্বিশ্বের রাজনীতি নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আবার অন্যদিকে তিনি মাথা ঘামান ছোট্ট ছোট্ট বিষয়ে। একটি হলদে পাখির জন্য অপেক্ষা, তাঁর পোষা মুরগির মৃত্যুতে মন খারাপ করা, কাকদের সাথে ‘জমিদখলের’ লড়াই ইত্যাদি ঘটনা উঠে এসেছে বইটাতে।
যদিও বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাজনীতির মানুষ তবুও তাঁর লেখনী যথেষ্ট ভালো। প্রমিত বাংলা লেখার কোনো চেষ্টা তাঁর মধ্যে ছিলো না, যেমনভাবে তিনি বক্তৃতা দিতেন ডায়েরিও লিখেছেন সেভাবেই। ফলে গুরুচন্ডালী দোষ, বাহুল্য দোষ ইত্যাদি নানা ধরণের অসঙ্গতিই আছে বইটাতে তবে বইটা সুখপাঠ্য। বইটা পড়ার সময় মনে হয় যেন কেউ একজন আমার কাছে তাঁর জীবনের গল্প বলছে! ফলে ভাষার সামান্য এদিক-সেদিক তেমন একটা প্রভাব ফেলে না বইটার রস আস্বাদনে।
জেলখানা রাসেলের ভাষায় বঙ্গবন্ধুর জন্য হয়ে গিয়েছিল “আব্বার বাড়ি”। রাজনৈতিক জীবনের একটা বড় অংশই তিনি কাটিয়েছেন জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। কিন্তু তিনি কখনও জেলে যেতে ভয় পাননি বা জেল তাঁর ভেতরের আগুনকে নেভাতে পারেনি। তিনি প্রতিবার জেল থেকে বের হয়ে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেছেন বাংলার জন্য, বাঙালির জন্য। আবার জেলেও তিনি ছিলেন সকলের নেতা, জেলের সব সমস্যা সমাধানের দ্বায়িত্ব যেন তাঁর উপর! এভাবে জেলই তাঁকে বাবা-মায়ের ‘ছোট্ট খোকা' থেকে বাঙালির ‘বঙ্গবন্ধু’ বানিয়েছে! সেই মহাকাব্যিক যাত্রার একটা ক্ষুদ্র অংশ এই রোজনামচা। বঙ্গবন্ধুকে জানতে, তাঁর চিন্তা বুঝতে, তাঁর স্বপ্ন অনুধাবন করতে তাই এই বইটা সবারই পাঠ করা উচিত।