Jump to ratings and reviews
Rate this book

লক্ষ্মণ চরিত মানস

Rate this book
যমকে পরাজিত করেছিলেন রাবণ। আর রাবণকে রাম। রাম তাই বীরশ্রেষ্ঠ। ইন্দ্রকে পরাজিত আর বন্দী করেছিলেন মেঘনাদ। সেই মেঘনাদকে বধ করেছিলেন লক্ষ্মণ। সম্মুখযুদ্ধে। ‘তস্করের মতো’ যজ্ঞগৃহে লুকিয়ে প্রবেশ করেননি আদৌ। সম্মুখযুদ্ধেই। তবু তিনি কাব্যে উপেক্ষিত। রণে বা বনে, চরিত্রে বা বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায় তিনি অনন্য। তবু আমরা ভুলে যাই-তিনিও রাঘব, তিনিও বিষ্ণুর অবতার। তিনি লক্ষ্মণ। এক অপরাজেয় যোদ্ধা। এক অনাদৃত, অথচ আশ্চর্য পুরুষ। সেই অনাদরের ধূলি সরিয়ে এই গ্রন্থে উঠে এলেন তিনি। রামের ভ্রাতা হিসাবে নয়। এক পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে।

256 pages, Hardcover

Published October 31, 2020

2 people are currently reading
34 people want to read

About the author

Raja Bhattacharjee

20 books8 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
11 (45%)
4 stars
7 (29%)
3 stars
4 (16%)
2 stars
2 (8%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 9 of 9 reviews
Profile Image for Riju Ganguly.
Author 38 books1,870 followers
January 1, 2021
"লক্ষ্মণ রামের জন্য সর্বপ্রকারে আত্মবিলোপ সাধন করিয়াছিলেন, সে গৌরব ভারতবর্ষের গৃহে গৃহে আজও ঘোষিত হইতেছে, কিন্তু সীতার জন্য ঊর্মিলার আত্মবিলোপ কেবল সংসারে নহে, কাব্যেও। লক্ষ্মণ তাঁহার দেবতাযুগলের জন্য কেবল নিজেকে উৎসর্গ করিয়াছিলেন, ঊর্মিলা নিজের চেয়ে অধিক নিজের স্বামীকে দান করিয়াছিলেন। সে কথা কাব্যে লেখা হইল না। সীতার অশ্রুজলে ঊর্মিলা একেবারে মুছিয়া গেল।
লক্ষ্মণ তো বারো বৎসর ধরিয়া তাঁহার উপাস্য প্রিয়জনের প্রিয়কার্যে নিযুক্ত ছিলেন— নারী-জীবনের সেই বারোটি শ্রেষ্ঠ বৎসর ঊর্মিলার কেমন করিয়া কাটিয়াছিল? সলজ্জ নবপ্রেমে আমোদিত বিকচোন্মুখ হৃদয়মুকুলটি লইয়া স্বামীর সহিত যখন প্রথমতম মধুরতম পরিচয়ের আরম্ভসময় সেই মুহূর্তে লক্ষ্মণ সীতাদেবীর রক্তচরণক্ষেপের প্রতি নতদৃষ্টি রাখিয়া বনে গমন করিলেন— যখন ফিরিলেন তখন নববধূর সুচিরপ্রণয়ালোকবঞ্চিত হৃদয়ে আর কি সেই নবীনতা ছিল? পাছে সীতার সহিত ঊর্মিলার পরম দুঃখ কেহ তুলনা করে, তাই কি কবি সীতার স্বর্ণমন্দির হইতে এই শোকাজ্জ্বলা মহাদুঃখিনীকে একেবারে বাহির করিয়া দিয়াছেন— জানকীর পাদপীঠপার্শ্বেও বসাইতে সাহস করেন নাই?"

'কাব্যের উপেক্ষিতা' প্রবন্ধের এই অংশটুকু আমরা প্রায় সবাই পড়েছি। ঊর্মিলা'র অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত ব্যথা আমরা কেউ অনুভব করতে পেরেছি, কেউ পারিনি।
কিন্তু লক্ষ্মণ?
রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সেই চরিত্রটিকে অমন ক'টা আপ্তবাক্যের মধ্যেই আটকে দিয়েছেন। সিরিয়ালে তাঁকে রামের 'সাইডকিক' হিসেবে পরিবেশন করা হয়েছে। কোথাও বা তাঁর ওপরেও দেবত্ব তথা অলৌকিকত্ব আরোপের চেষ্টায় তাঁকে শেষনাগের অবতার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ভরতপুরে তো লক্ষ্মণ আর ঊর্মিলা'র মন্দিরই আছে— যেখানে তাঁদের বিবাহ রীতিমতো উৎসবের মতো করেই পালিত হয়।
কিন্তু লক্ষ্মণের দৃষ্টিকোণ থেকে কি কখনও রামায়ণ লেখা হয়েছে?
কখনও কি আমরা সেই নশ্বর, নীরব, জ্যেষ্ঠের আজ্ঞাবহ মানুষটির দ্বিধাদীর্ণ অন্তরের পরিচয় পেয়েছি কোনো লেখায়?

রাজা ভট্টাচার্য এই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় সুলেখকদের একজন। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, তিনি তান্ত্রিক হরর বা রগরগে থ্রিলার লেখেন না। বরং শ্রীভট্টাচার্য এমন সব বিষয় নিয়ে লেখেন যাদের সম্বন্ধে ব্রিটিশরা বলে থাকেন, 'wouldn't touch it with a barge pole.' এমন বিষয় নিয়ে লেখেন বলেই তিনি নন্দিত 'মহর্ষি' (?) দেবেন্দ্রনাথকে নিয়ে না লিখে কলম পিষেছেন নিন্দিত দ্বারকানাথকে নিয়ে। এবারও তিনি বাজারের চাহিদা মেনে রামচন্দ্রকে নিয়ে একখানা ভক্তিরসে চোবানো আখ্যান লিখতেই পারতেন। তার বদলে তিনি লিখেছেন লক্ষ্মণকে নিয়ে!
কেমন লিখেছেন তিনি? তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন, ঠিক কী লিখেছেন তিনি?

আগে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিই। বাল্মীকি রামায়ণের তথ্য ও কাহিনিক্রম অক্ষুণ্ণ রেখে শ্রীভট্টাচার্য লক্ষ্মণের একটি জীবনী লিখেছেন। কিন্তু সেটি লেখা হয়েছে ঘোরতর আধুনিক এবং অসরলরৈখিক পদ্ধতিতে। তাতে লক্ষ্মণ এক রক্তমাংসের মানুষ। দ্বিধাদীর্ণ অথচ মহাবীর এই মানুষটি চিরকাল অদ্বিতীয় হয়েও দ্বিতীয় রয়ে গেছেন সব ক্ষেত্রে। পিতার স্নেহভাগ থেকে দিব্যাস্ত্রে অধিকার— কিছুই পাননি তিনি। অগ্রজ রাম তাঁকে শুধু স্নেহ করতেন না, সর্বাপেক্ষা বিশ্বাসও করতেন। তিনিও রামকে শুধু শ্রদ্ধা করতেন না, নিজের জীবনের এক অঙ্গ রূপেই দেখতেন। তাহলে, তাঁর আর রামের সঞ্চারপথ সমান্তরাল হলেও এক যাত্রায় এমন পৃথক ফলের কারণ কী?
এইবার প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিই। দ্বিধাগ্রস্ত লক্ষ্মণের যে চিত্রটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা প্রতিটি পুরুষের যাবতীয় ভয়, সংশয়, দর্প, ক্রোধ, আস্ফালন এবং অসহায়তাকে ধারণ করেছে নিপুণভাবে। আর এই দ্বিধা, এই হাহাকার, এই 'বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না' নিয়ে আমৃত্যু পথ চলাই লক্ষ্মণের ভবিতব্য নির্ধারিত করেছে। তাই রাম মহাকাব্যের নায়ক, সীতা কত-শত উপাখ্যানের নায়িকা। এমনকি স্বামীসুখ থেকে বঞ্চিত ও অবহেলিত ঊর্মিলাও পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের করুণা। কিন্তু লক্ষ্মণ কিচ্ছু পাননি— এতদিন অবধি।

শ্রীভট্টাচার্য এমন একটি রচনা আমাদের উপহার দিয়েছেন যা 'পাঞ্চজন্য' বা 'প্রথম প্রবাহ'-র মতো করেই বাংলা সাহিত্যের একটি অলংকার শুধু নয়, অহঙ্কার হয়ে উঠেছে। তা সম্ভব হয়েছে, কারণ ভাষায় ও ভাবে যথাসাধ্য আলঙ্কারিকতা বজায় রেখেও এই লেখায় এক চেনা পৌরাণিক চরিত্রকে রূপান্তরিত করা হয়েছে অচেনা কিন্তু বাস্তবানুগ মানুষে।
লক্ষ্মণ চরিত্রটি ছাড়া আর কী পেলাম এই বইয়ে? পেলাম এক রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার! আজ্ঞে হ্যাঁ, রামায়ণ আমরা মোটামুটি সবাই পড়েছি। সেই কাহিনিকেই যে এমন রোমহর্ষক, গতিময় এবং ঘাত-প্রতিঘাতের ভাষায় পরিবেশন করা সম্ভব— তা এই বইটি না পড়লে আমার বিশ্বাস হত না।
শুধু গতিময়তায় নয়, অতি অল্পেও কীভাবে মস্ত গল্প বলা যায় তার জন্য মডেল হতে পারে লক্ষ্মণ-তারা-সুগ্রীব কথোপকথনটি। সত্যি বলছি, ওই অংশটি পড়ে 'বোম্বাইয়ের বোম্বেটে'-খ্যাত ত্রিভুবন গুপ্তে'র কথা মনে পড়েছিল, যাঁর এক-একটা সংলাপ নাকি চাক্কু হয়ে দর্শকদের বুকে বিঁধে হলে পায়রা উড়িয়ে দেয়!
মিতকথন এবং সূচিমুখ বর্ণনার সাহায্যে শ্রীভট্টাচার্য প্রতিটি চরিত্রকে করেছেন ত্রিমাত্রিক। সম্পূর্ণ আখ্যানটিকে তিনি এক কঠোর কার্য-কারণ সম্পর্কে বেঁধেছেন। এখানে অলৌকিকের কোনো স্থান নেই। নেই সম্পূর্ণ সাদা বা কালো কোনো চরিত্র। বরং এখানে আছে যৌক্তিক, প্রবৃত্তিতাড়িত, কিছুটা ভাগ্যহত নানা শ্রেণির বহু নারী ও পুরুষ। আর তাদেরই ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছেন লক্ষ্মণ।
তবু কি কিছু ক্ষোভ রয়ে গেল? রইল কি কিছু খেদ?
রইল বইকি।
যুদ্ধের অংশটি বড়ো দ্রুত সমাপ্ত হল।
সীতা, তারা, শূর্পণখা— এই চরিত্রদের সঙ্গে সেভাবে পরিচয়ই ঘটল না। অথচ লেখক এঁদের যেভাবে এঁকেছিলেন তা দুলে-দুলে পড়া পাঁচালির থেকে একেবারে আলাদা লেভেলের। স্রেফ এই চরিত্রগুলোকে নিয়ে কেউ কি কোনোদিন লিখবেন?
আর... এত যত্ন, এত ভালোবাসা দিয়ে গড়া চরিত্রটিকে শেষে জড়বৎ জলে নিমজ্জিত করতে পারলেন লেখক! তিনি কি বোঝাতে চাইলেন যে কালের ওই ধারায় হারিয়ে যাওয়াই আমাদের ভবিতব্য?
সেজন্যই মনে হল, তাঁর কাহিনিটি আজ বলা হল দেখে কি খুশি হতেন লক্ষ্মণ?
নাকি জ্যেষ্ঠের আদেশে বারংবার নির্দোষ নারীদের সঙ্গে অবিচার করা, নানা প্রাণীকে অন্যায়ের শিকার হতে দেখেও প্রতিবাদ না করার পাপ নিজের স্কন্ধে নিয়ে তিনি আবার হেঁটে যেতেন আজকের পূতিগন্ধময় গঙ্গার দিকে?

এই বইটি না পড়লে খুব ভুল করবেন। এ শুধু পৌরাণিক বা মহাকাব্যিক এক কাহিনির নবনির্মাণ নয়। এ আসলে এক আয়না— যা আমাদের সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়, যাদের আমরা এড়িয়ে যেতে পছন্দ করি।
প্রতিবাদ করা উচিত, না কোলাবরেটর হওয়া?
অন্তে কী আছে— মৃত্যু, না ন্যুরেমবার্গ-স্টাইলে বলে যাওয়া "আমি তো আদেশ পালন করছিলাম"?
আজকের পাঠক এই বইয়ে নিজেকেই খুঁজে পাবেন বলে আমি মনে করি না। তাই ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য'র করা অনন্য প্রচ্ছদে সুপারস্যাচুরেটেড সানসেট এবং তার পটভূমিতে লক্ষ্মণকে দেখেও 'ড্রাইভ' সিনেমার কথাই মনে পড়েছিল— যেখানে এক মৌন নায়ক কখনও পাদপ্রদীপের আলোয় আসবেন না জেনেও এগিয়ে চলেন, এগিয়েই চলেন!
সর্বান্তঃকরণে পর���মর্শ দেব বইটি ঝট্‌ করে পড়ে ফেলার। অলমিতি।
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,280 reviews393 followers
January 2, 2021
কৈফিয়ত : বাংলায় রিভ্যু লিখতে পারিনা। বাংলায় রিভ্যু লেখার স্পেসিফিক ব্যাকরণ জানা নেই। রিভ্যুর নাম করে যা লিখি (বা কখনো সখনো বলিও) তা নিছক ভালোবাসার প্রকাশ।

যাই হোক , রাজা ভটচাজের বইটির দ্বিতীয় রিডিং না মারলে বিটুইন দ্য লাইন্স অনেক কিছু বুঝতুম না -- বিয়ন্ড দ্য লাইন্স তো নয়-ই।
ভারতীয় জনমানসে রামায়ণের জনপ্রিয়তা মহাভারতের ধারেকাছে যায় না। ব্যাস রচিত মহাভারত জ্ঞানী গুনিজনের দৃষ্টিতে নানারূপে প্রতিভাত। মহাকাব্য, পুরাণ, ধর্মশাস্ত্র, স্মৃতিশাস্ত্র, ইত্যাদি প্রভৃতি।

অনেক শতাব্দীর অনেক রচয়িতার রচনা এতে জুড়ে রয়েছে। আদিতে 'জয়' বা 'ভারতসংহিতায়' যা শোনা গেছে বৈশম্পায়নের মুখে, শ্লোক সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার। তাই পরের সৌতির শোনা গেল ৮৪ হাজার শ্লোকে আর তারও পরে কথা কাহিনি জুড়ে জুড়ে দাঁড়িয়ে গেল এক লক্ষ শ্লোকের এক অখণ্ড মহাভারত। বহুজনের বহুচিন্তার ফসল নিয়ে এ এক বিপুল ভান্ডার।

তার সাথে তুল্যমূল্য করে দেখতে গেলে রামায়ণে স্রেফ ২৪ হাজার শ্লোক। বাল্মীকি রচিত আদি রামায়নে বা আদিকাব্যে ৬০০০ টি শ্লোক ছিল।
কিন্তু তবুও আমার মনে হয়েছে, রামায়ণের আকর্ষণ বাঙালির কাছে মহাভারতের চাইতে কিছুটা বেশি।

রুকনুদ্দিন বরবক শাহের আদেশে বাংলা ভাষায় রামায়ণ প্রথম অনুবাদ করেন কৃত্তিবাস ওঝা। ‘বাল্মীকি রামায়ণ’ অনুসরণে তাঁর লেখা কাব্যটির নাম ‘শ্রীরাম পাঁচালী’ এবং বাঙালিদের কাছে সেটি ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ নামে পরিচিত। এই কাব্যের দৌলতে রাম, লক্ষ্মণ, সীতার মতো পৌরাণিক চরিত্রেরা বাংলার ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছেন। সাবলীলতার গুণে সমস্ত বঙ্গদেশ জুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’।

ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া বাদ দিয়ে আলোচনায় ফেরা যাক। আগেই বলেছিলুম।

রাজা ভটচাজ তাঁর বইয়ের গোড়ায় একটি কৈফিয়ত লিখেছেন।

সেখানে তিনি স্পষ্ট বলছেন : 'এই বই একটি উপন্যাস। উপন্যাস জিনিসটা ছোট গল্পের মতোই নিতান্ত আধুনিককালের ব্যাপার, যদিও বয়সে কিঞ্চিৎ বড়ো। পণ্ডিতেরা মোটা মোটা সংজ্ঞা লিখেছেন, সেসব মুখস্থ করে আমরা পরীক্ষায় নম্বর তোলার চেষ্টাও করেছি বিস্তর। কিন্তু তাতে আসল কথাটি ঢাকা পড়েনি।

এরপর উনি লিখছেন : 'আধুনিকতার মূল লক্ষণ হল প্রশ্ন। জিজ্ঞাসা নয়। নিজেকে প্রশ্ন করার আর নিজের ভিতরে অনুক্ষণ যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় - তার মুখোমুখি দাঁড়ানোর অভ্যাসকেই আমরা আধুনিকতা বলতে পারি। সেই অর্থে এটি একটি উপন্যাস। নিতান্ত আধুনিক ব্যাপার। আর সেই কারণেই পদে পদে এর সঙ্গে বাল্মিকী রামায়ণের মিল আর অমিল খুঁজতে গেলে হতাশ হতে হবে।'

বোঝা গেল প্রথমেই। এই লক্ষ্মণ রাজা ভটচাজের লক্ষ্মণ।

কিন্তু দ্বিতীয়বার পড়লুম কেন ? লিখতেই বা প্রবৃত্ত হলুম কেন ? ২৫৬ পৃষ্ঠা পড়তে অন্তত তিন ঘন্টা ইনভেস্ট করতে হবে। তবুও পড়লুম। নিজের প্রথম পাঠের রেকর্ডিংগুলোর সূত্রে ৩৩, ৪২, ১১২, ১৭২, এমন অনেকগুলি পৃষ্ঠার উল্লেখ পেলুম যেখানে নিজেই নিজেকে বলেছি : Re-read !

এই ২৫৬ পৃষ্ঠার ছত্রে ছত্রে কবি রাজা ভটচাজ মহাকাব্যের পাতায় চাপা পড়ে থাকা লক্ষ্মণের মানুষী সত্বার অন্বেষণের সূত্রে এক অন্য লক্ষ্মণের আবির্ভাব ঘটিয়েছেন। আবিষ্কার বা উদ্ভবও বলা যেতে পারে। মহাকাব্যের রচয়িতা যে লক্ষ্মণের প্রতি সুবিচার করেননি, তার সততা, কর্তব্যজ্ঞান এবং ভালোমানুষীর সুযোগ নিয়ে রামের প্রভূত দুষ্কর্মের বোঝা তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন, তা রাজা বাবুর বইয়ের প্রত্যেক অধ্যায়ে প্রতিভাত হয়। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে পাঠক সন্ধান পাবেন এক দুঃখবিদীর্ন, অসুখী, নিজের কাছে অপরাধী লক্ষ্মণের। সন্ধান পাবেন এমন এক চরিত্রের, যে বিবেকের দ্বারা ক্ষতবিক্ষত। সেই যন্ত্রনা অনুভব করার মমতা রাজা বাবুর কবিমনে পূর্ণ বিদ্যমান।
সুমিত্রানন্দনের প্রথম পর্বের জীবন অযোধ্যায়, দ্বিতীয় পর্বের জীবন পঞ্চবটী বন এবং তৃতীয় পর্বের সূচনা লঙ্কা থেকে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের পর। এই পর্বে লক্ষ্মণ অনেক পরিণত। তার নিজের একটা সুনির্দিষ্ট ভাবনার গতিপথ তৈরী হয়েছে। অনাবিল চোখে রামচন্দ্রের কাজকর্মের সে একজন সমালোচক। অনুগত ও বাধ্য ভ্রাতার মধ্যে প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী এক ভ্রাতার জন্ম হয়েছে। সে এখন বিচার বিশ্লেষণ করে বুঝেছে, রামচন্দ্র দু'হাতে তার থেকে নিয়েছে শুধু দেয়নি কিছুই।

তাই অগ্রজের প্রতি তার এক ধরনের অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধা ও ঘৃণাই বেশি করে প্রকাশ পেয়েছে। রামের প্রতি তার অনুরাগের রং ফিকে হয়ে যাওয়ার জন্য সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। প্রকাশ্যে এসে পড়েছে লক্ষণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রামের আসন্নপ্রসবা সীতাকে শ্বাপদসংকুল বনে নির্বাসনে বাধ্য করা। এমন একটা অমানবিক, বিবেক বিরুদ্ধ কাজ করার জন্য ক্ষমা করতে রামকে ক্ষমা করতে পারেনি লক্ষ্মণ। নিজের বিবেককে হত্যা করার যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেনি লক্ষ্মণ।

রাজা বাবু নিজেই বলছেন : লক্ষ্মণ রামায়ণের সবচাইতে বেশি করে 'মনুষ্যোচিত' চরিত্র।তাঁর জীবনে কোনো অসাধারনত্ব নেই, তাঁকে কেউ কোনো মন্ত্রশক্তি দান করেননি, কোন দৈবী অস্ত্র তাঁর হাতে তুলে দেননি কেউ। অথচ তাঁর কীর্তি একমাত্র রামের সঙ্গে তুলনীয়। রাম রাবণকে বধ করেছেন, লক্ষ্মণ ইন্দ্রজিৎকে ! তৎসত্ত্বেও আমরা ভুলে যাই -- রামের মতোই তিনিও বিষ্ণুর অবতার !

ভুলে যাই -- কারণ জন্ম ছাড়া আর কোথাও, কোত্থাও তাঁর জীবনে কোনো অলৌকিকতা নেই। তিনি মানুষ হিসেবে সংগ্রাম করেন, এবং মানুষের মতোই সাফল্য-ব্যর্থতার পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থায় হেঁটে যান সমস্ত জীবন। তিনি ভুল করেন, দুঃখ পান, অনুতাপ করেন, ভালোবাসেন.......

ঠিক আমার আপনার মতোই

লক্ষ্মণ-সম্পর্কিত যে রহস্যগুলির আলোচনা এই বইতে করেছেন লেখক , তাদের তিনি কয়েকটি লুক্কায়িত প্রশ্নের সাহায্যে সূচিত করেছেন। আলোচনার ভিতরেও প্রশ্নই বেশি উত্থাপন করেছেন। অনুসন্ধানের দিঙনির্দেশ করার জন্য অনুমানের সাহায্যও নিয়েছেন। কিন্তু পাকা লেখকের মতোই, অসামান্যভাবে সঠিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেননি।

এর চাইতে বেশি বলে কাজ নেই। সংগ্রহ করে পড়ে নিন বরঞ্চ।
Profile Image for Sumana.
24 reviews23 followers
December 17, 2020
#পাঠ প্রতিক্রিয়া
লক্ষ্মণ চরিত মানস
রাজা ভট্টাচার্য
দীপ প্রকাশন
পৃষ্ঠা= 256
মূল্য= 225 টাকা

রামায়ণের রামের চরিত্র আমার কোনো কালেই পছন্দের ছিল না।

1. অন্যায় ভাবে মহারাজ বালীর হত্যা,
2. নিজের স্ত্রী কে সমাজের কথায় বারবার নিজের সতীত্ব প্রমাণ করতে বলা।
3. এমনকী গর্ভধারণ কালে তাকে বনাঞ্চলে ছেড়ে আসা।

এর বাইরেও মনে হয়েছে লক্ষ্মণের কথা কি কখনো ভেবেছিলেন? হ্যা ভাই কে যে তিনি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসতেন এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, কিন্তু তারপরেও একটা পর থাকে...

লেখক বইএর শুরুতেই পাঠককে অনুরোধ করেছেন "কৈফিয়ত" পড়ার পরে বাকি বই টা পড়তে। এটা সত্যিই "কৈফিয়ত" অংশটি আগে না পড়লে, কিন্তু অনেক কিছুই - পড়েও কিছু পড়া হলো না ব্যাপার হয়ে যাবে।

যাক এবার সরাসরি লেখায় আসি।
যে রামের প্রতি এত বিরক্ত ছিলাম, সেটা অনেকাংশে দূর হয়েছে। মনে একটা মায়া মাখানো ভালোবাসা অনুভব করছি। বাড়ির আদুরে সন্তান যেমন হয়, অনেক কিছুই আবেগে করে, হয়তো ফলাফল চিন্তা না ক��েই। ভাই অন্ত প্রাণ, পাশে সবসময় ভাই কে চেয়েছে। কিন্তু ভাইয়ের ও যে একটা আলাদা অস্তিত্ব আছে, সেটা কোনোদিন ভেবেই উঠতে পারেনি।

হ্যা, লক্ষ্মণ কে নিয়েও আমরা কখনো না কখনো ভেবেছি, কিন্তু সেটা বোধহয় কখনই মনের খুব গভীরে যায়নি। হালকা হালকা ভাবনা শরতের মেঘের মত ভেসে গেছে।

এই গোটা বইটা লক্ষ্মণের, আমার আপনার বাড়ির ছেলের বা ভুল বললাম মেজো/সেজো ছেলের। ভালোবাসা তো থাকেই, কিন্তু বড় বা ছোট ছেলে টা যে ব্যাবহার পেয়ে অভ্যস্ত থাকে, সেটা বোধহয় বিধাতা তার কপালে লেখেননা।

পড়তে গিয়ে কোথাও মনে হয়েছে পিতা দশরথ, মাতা সুমিত্রার উপর অভিমান হয়েছে। কখনো বা ঋষি/ সন্যাসী দের উপরেও। আবার নিজেকে সাথে সাথে সামলেও নিয়েছে। কিন্তু এই অভিমান কখনই রামের প্রতি তার ভালবাসায় বাঁধা সৃষ্টি করেনি। বরঞ্চ দিন দিন তা আরও মজবুত হয়েছে।

আমরা গল্পের মজলিসে আলোচনা করি, ঊর্মিলার কী দোষ ছিল, যে তা��েও 14 বছর একা থাকতে হলো। লক্ষ্মণের কি একবারেই তার কথা মনে হয়নি?
এই বইতে তার উত্তর আছে। এই বিরহ শুধু ঊর্মিলার নয়, লক্ষ্মণের মনেও ছিলো। দাদার প্রতি দায়িত্ব পালন করতে করতেও ঊর্মিলার প্রতি করা তার অন্যায়ের কথাও মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, সীতার মতো ঊর্মিলার ও কি অধিকার ছিলো না তার সাথে থাকার। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে ঊর্মিলার কাছে ফেরার।

এটা লক্ষ্মণের "মানুষ" জীবনের বই, ভগবানের অবতারের নয়। এটা আমার আপনার বাড়ির অথবা পাশের বাড়ির ছেলের বই।

"কর্মের জন্যই আমরা কাউকে শ্রদ্ধা করি, কাউকে করিনা; কাউকে ভালোবাসি, কাউকে পেরে উঠি না।"
এটা কি আমার আপনার মনের কথা নয়। হ্যা, এটা আমাদেরই কথা যেটা লক্ষ্মণের মুখ দিয়ে বেরিয়েছে।

এটা দুই ভাইয়ের ভালোবাসার বই। ছোটো ভাইয়ের কর্তব্য পালন, বড় ভাইয়ের নির্ভরতা সব মিলে মিশে গেছে ভালবাসার সমুদ্রে।

সবটাই কি ভালো লেগেছে?
না, কোথাও কোথাও একটু তাড়াহুড়ো দেখতে পেলাম, কারণ জানিনা।

** মতামত সম্পূর্ন ব্যক্তিগত। তাড়াহুড়োর জন্য এক তারা কম দিলাম।
Profile Image for Anushtup.
47 reviews52 followers
November 27, 2020
শীতের মিঠে রোদ্দুর সর্বাঙ্গে ঝিম ধরাচ্ছে। চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মত ভেসে যাচ্ছে দৃশ্য, দৃশ্যান্তরে। এক অবগাহন স্নানের মত ডুবে যাচ্ছি অক্ষরের বুকে। এই ভালো লাগাটার নাম ছোটোবেলা।
বহুকাল পরে সেইরকম এক দুপুর ফিরে এলো রাজা ভট্টাচার্যের "লক্ষ্মণ-চরিত-মানস" এর পাতায় ভর করে।
এতই ঘোর লেগে গেছিল পড়তে পড়তে যে এমন পরিবেশে বসেও বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলতে পারছিলুম না। নিবিষ্টভাবে, নিখাদ বাল্মীকি রামায়ণের উপর ভিত্তি করে যে লক্ষ্মণকে তিনি এঁকেছেন, তা স্বতন্ত্র, স্বমাহাত্ম্যে উজ্জ্বল, যুক্তিবিচারে ঋজু, কর্তব্যে অটল, আবার পদে পদে অবহেলিত, অভিমানে, আবেগপ্রকাশের দুর্বলতায় আদ্যোপান্ত মানবিক নায়ক। তাকে শ্রদ্ধা করার সঙ্গে সঙ্গেই তার দুঃখে বুক নিঙড়ে কান্না আসে।
এর আগে এমন লেখা কখনো পড়েছি কি?
হ্যাঁ, পড়েছি। সমরেশ বসুর যে লেখাগুলি পড়ে আমার পাঠকসত্ত্বার এক নতুন উদ্ভাস হয়েছিল, যেগুলি পড়ে বেজায় আফসোস হয়েছিল কেন আরও এমন লেখা তিনি লেখেননি, এ বই পড়তে পড়তে সেই "শাম্ব", " পৃথা", "প্রাচেতস" মনে ভেসে এসেছিল।
এর বেশি আর বলার কি কিছু থাকে!
বইটি সুমুদ্রিত। ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের আঁকা প্রচ্ছদ অত্যন্ত সুন্দর।
বই - লক্ষ্মণ চরিত মানস
লেখক - রাজা ভট্টাচার্য
মুদ্রিত মূল্য - ২২৫/-
Profile Image for Joydeep Chatterjee.
54 reviews6 followers
April 11, 2021
🔹পাঠপ্রতিক্রিয়া: #লক্ষ্মণ_চরিত_মানস
▪️লেখক: #রাজা_ভট্টাচার্য
🔹প্রচ্ছদ: #ওঙ্কারনাথ_ভট্টাচার্য্য
▪️প্রকাশক: #দীপ_প্রকাশন
🔹মূল্য: #২২৫টাকা

||| 'লক্ষ্মণানুচরাে রামঃ শশাস পৃথিবীমিমাম্'

‘রাম, লক্ষ্মণের সঙ্গে মিলিত ভাবে পৃথিবীকে শাসন করতে লাগলেন।' |||

▪️আমার সাম্প্রতিক পাঠ, রাজা ভট্টাচার্যের 'লক্ষ্মণ চরিত মানস'। 'চলাচল' এবং 'প্রিন্স দ্বারকানাথ' — লেখকের দুটি প্রিয় কাজের পর সম্পূর্ণ অন্যধারার একটি সাহিত্যসৃষ্টি। পাঠক হিসাবে মহাকাব্যিক আখ্যান অথবা বিনির্মাণের প্রতি অনেকের মত আমিও বিশেষভাবেই আকৃষ্ট হই। বাংলা সাহিত্যে মহাভারত নিয়ে ফিকশনধর্মী উল্লেখযোগ্য সাহিত্যসৃষ্টি বেশ কিছু স্মরণে আসে, কিন্তু রামায়ণ নিয়ে সাম্প্রতিককালে সেইরকম স্মরণে আসে না। তাই প্রথমেই লেখককে সাধুবাদ জানাই 'লক্ষ্মণ চরিত মানস'-এর জন্য। রাজা ভট্টাচার্যের 'লক্ষ্মণ চরিত মানস'-এর সূচনা একটি কৈফিয়তের মাধ্যমে। কেন লক্ষ্মণকে তিনি বেছে নিয়েছেন কাহিনির নায়ক হিসাবে? কোথায় বাল্মীকি বিরচিত 'রামায়ণম' থেকে কাল এবং মেঘনাদবধ কাব্যের অভিঘাতে লক্ষ্মণ সম্পর্কে বাঙালির চেতনে বা অবচেতনে এক বিচিত্র ধারণা জন্ম নিয়েছে? লেখক সেই সম্পর্কে এক যুক্তিনিষ্ঠ আলোচনা করেছেন, যা এই উপন্যাসের প্রবেশক হিসাবে এক আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

▪️লেখক রাজা ভট্টাচার্যের আন্তরিক লেখনীর মায়াস্পর্শে সৌমিত্রি মহাকাব্যের পাতা থেকে উঠে এসে এক সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেছেন উপন্যাসে। একজন রক্তমাংসের মানুষের প্রতিটি অনুভূতি, সুখ-দুঃখ, হতাশা-সংশয়, প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্কের গভীরতা নিক্তিতে মেপে নেওয়া কার্যকারণসহ, লক্ষ্মণ চরিত্রটির প্রতিটি মুহূর্তের যাপন লেখক ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। দাশরথি লক্ষ্মণের সাথে তাঁর পিতার সম্পর্কের সমীকরণ, পত্নী ঊর্মিলার সাথে বিবাহপরবর্তী শীতল রসায়ন, শ্রীভট্টাচার্যের কলমে সুন্দরভাবে বর্ণিত। লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিতে লক্ষ্মণের এই জীবনাখ্যান পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় এমন অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি, যা হয়তো ভীষণভাবেই ন্যায্য এবং প্রাসঙ্গিক। মহাবীর লক্ষ্মণ, রামের আজীবন ছায়াসঙ্গী, রাম ছাড়া পৃথিবীর সকলের কাছেই তিনি এক ছায়ার ন্যায়। অস্তিত্ব আছে, অনুভূত হয় না তাঁর উপস্থিতি। অপরাজেয় যোদ্ধা তিনি, এক আশ্চর্য পুরুষ অথচ অদ্বিতীয় হয়েও রামায়ণের স্বার্থেই তাঁর ভীষণভাবে দ্বিতীয় হওয়ার জন্যে সৃষ্টি।

▪️উপন্যাসটিতে পাঠকের সবিশেষ প্রাপ্তি লেখকের ভাষার ব্যবহার। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি শব্দচয়নের মাধ্যমে লেখকের কলম বিস্তার করে রাখে এক মায়াজাল, চুঁইয়ে পড়ে রাজকীয় সুষমা। একই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিশব্দের ব্যবহার, উপযুক্ত প্রতিস্থাপন - যেমন, ধনুকের ধনু - শরাসন - কার্মুক — মহাকাব্যিক আখ্যানের আবহের সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করে। তৎসম - অর্ধ তৎসম - তদ্ভব শব্দের ব্যবহার হলেও তা জটিলতাবিহীন এবং একইসঙ্গে ধ্রুপদী। পাঠকমাত্রেই ঋদ্ধ হন এই ভাষায় অবগাহন করে। কেমন সেই ভাষার ব্যবহার?

||| লক্ষ্মণের যখন নিদ্রাভঙ্গ হল, তাঁর প্রথম অনুভূতিটিই হল— এত পক্ষী যে বৃক্ষচূড়ে লুক্কায়িত ছিল, তা গতকাল তাে বােঝা যায়নি! অজস্র অগণিত পক্ষীর কলকাকলিতে অরণ্য যেন গুরুর অবর্তমানে পাঠকক্ষের ন্যায় মুখরিত হয়ে উঠেছে।

রাম রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে লক্ষ্মণকে এসে বলেছিলেন, “এইবার শয়ন করাে, লক্ষ্মণ। সমস্ত দিবস অকাতরে পরিশ্রম করেছ। সমস্ত রাত্রি জাগরণ
করলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।”

সত্য বলতে, বিশেষ ক্লান্তি বােধ করছিলেন না লক্ষ্মণ। এই প্রথম প্রকৃত গভীর অরণ্যে নিশাযাপন করছেন তিনি। আরণ্যক প্রাণীদের নিঃশব্দপ্রায় চলাচল, তাদের নিঃশ্বাসপতনের ধ্বনি, হিংস্র পশুর সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়ংকর দূরাগত হুংকার— সবকিছুই তাঁর সদাজাগ্রত কর্ণে যেন এক অশ্রুতপূর্ব ভাষার ন্যায় তাৎপর্যপূর্ণ রূপ ধারণ করছিল। দিবসে এই অরণ্যই সম্পূর্ণ পৃথক ভাষায়
বিবিধ ইঙ্গিত পাঠায়, আকৈশাের মৃগয়ায় রত থাকায় সেই ভাষা রাম ও লক্ষ্মণ উভয়েই অতি উত্তম রূপে অধিগত আছেন। কিন্তু এ যেন অন্য এক
সংকেতময় ভাষা। লক্ষ্মণ শিক্ষার্থীতুল্য গভীর মনােযােগে তা শ্রবণ করছিলেন। কিন্তু অগ্রজের আদেশ পালন করা তাঁর নিকট সংস্কারের ন্যায়। বিনা-বাক্যবায়ে তিনি গিয়ে শয়ন করেছিলেন অগ্নিকুন্ডের অপর দিকে। |||

▪️'লক্ষ্মণ চরিত মানস' রামায়ণ নির্ভর বিনির্মাণমূলক একটি কাজ হলেও অসম্ভব গতিশীল লেগেছে আমার ব্যক্তিগতভাবে। পাঠের গতি ব্যাহত হয় না, বিশেষ করে প্রতিটি অধ্যায়ের সূচনা এবং সমাপ্তি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। নাটকীয়ভাবে কোনো দৃশ্যের বা ঘটনার পরিসমাপ্তি অথবা সৌমিত্রির ব্যক্তিগত মানসিক দ্বন্দ্বে��� সাথে পাঠকের অল্প পরিচয় ঘটিয়ে লেখক ছেদ টানেন অধ্যায়ের। লক্ষ্মণের চিন্তা, দ্বন্দ্ব যেন পাঠকমানসেও সঞ্চারিত হয়। পাঠক নিজেও উত্তর খুঁজে চলেন পুত্র লক্ষ্মণ, ভ্রাতা লক্ষ্মণ এবং ঊর্মিলার পতিরূপে লক্ষ্মণের অন্তরের গোপন প্রেমিকসত্তার হদিশ পেতে।
স্বেদ-রুধির-শ্রমের সমন্বয়ে লক্ষ্মণ চরিত্রের যে মানবায়ন শ্রীভট্টাচার্য ঘটিয়েছেন, অন্তিমে সেই প্রিয় নায়কের দ্বিধাদীর্ণ এবং স্ববিরোধী চিন্তাভাবনায় জর্জরিত হয়ে সরযূর জলে আত্মবিসর্জন — একটিই শব্দবন্ধ হয়তো সেই কলমের প্রাপ্য, 'সাধু সাধু!'

▪️নিন্দামন্দ করার জায়গা লেখক বিশেষ রাখেননি। তবুও ব্যক্তিগত মতামত, মূল শ্লোক এবং তার ভাবানুবাদের সংখ্যা শুরুর অধ্যায়গুলির তুলনায় কাহিনির সাথে সাথে ক্রমশ কমেছে। মুদ্রণ প্রমাদ বেশ কিছু চোখে পড়লেও আশা করি তা পরবর্তী মুদ্রণে সংশোধিত হয়েছে বা হবে। শিল্পী ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য্যের প্রচ্ছদ অপূর্ব সুন্দর। লক্ষ্মণের বলিষ্ঠ, ঋজু দেহভঙ্গিমা কাহিনির মূল সুরের সঙ্গে মানানসই এবং নায়কোচিত। বইটি সুমুদ্রিত এবং যত্নসহকারে পাঠকের কাছে পেশ করার জন্য দীপ প্রকাশন ধন্যবাদার্হ হলেন। (যদিও প্রকাশনার শেষ কিছু কাজের এবং প্রচ্ছদের 'নান্দনিক!!!' ধারাবাহিকতার মাঝে এই কাজ সত্যি ব্যতিক্রমী।)

▪️সবশেষে আরও একবার, 'লক্ষ্মণ চরিত মানস'-এর কৃতিত্ব এবং পরিপূর্ণতা হয়তো এখানেই যে লেখক কৈফিয়তে যেটি বলার চেষ্টা করেছেন, তাতে তিনি সম্পূর্ণরূপে সমর্থ হয়েছেন। রামানুজ লক্ষ্মণ যিনি আজও অবতাররূপে পূজিত, শ্রীভট্টাচার্য সেই চরিত্রটির মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানসিক উত্থান পতন, অন্তর্দ্বন্দ্ব কলমের খোঁচায় পাঠকমনে সঞ্চারিত করতে সম্পূর্ণরূপে সফল। সারাজীবন পিতার স্নেহ থেকে উপেক্ষিত, দৈব-আশীর্বাদ, দৈব-অস্ত্র কোনো কিছুই তিনি লাভ করেননি। অগ্রজের প্রতি ভালোবাসা এবং আনুগত্যের কাছে যে মানুষ নিজেকে নীরবে চিরবিসর্জন দিয়েছিলেন সেই উপেক্ষিত রাঘব আরো বেশী করে মনুষ্যরূপে উত্তীর্ণ হয়ে উঠেছেন। 'লক্ষ্মণ চরিত মানস' এক বাস্তব দর্পণ, পাঠান্তে যে কোন পাঠক একবার হলেও লক্ষ্মণের স্থানে নিজেকে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করেন এবং খুঁজে চলেন সেই আদি প্রশ্নের উত্তর — একদিকে ভক্তি এবং আদেশ প্রতিপালন এবং অন্যদিকে কর্তব্য এবং ন্যায়, পাল্লা ভারী কোনদিকে?

অপরিসীম পরিতৃপ্তি এবং মুগ্ধতা রইল পাঠান্তে। লেখককে অকুন্ঠ ধন্যবাদ।

অলমিতি।
Profile Image for Bubun Saha.
201 reviews6 followers
September 9, 2021
লক্ষণ চরিত মানস
রাজা ভট্টাচার্য
দীপ প্রকাশন
মুদ্রিত মূল্য: ২২৫ টাকা

বইয়ের শুরুতে যেখানে মুখবন্ধ বা ভূমিকা বা ধন্যবাদান্তে থাকে, সেখানে লেখক কৈফিয়ত দিয়েছেন। দয়া করে এটি এড়িয়ে যাবেন না। লেখক জানিয়েছেন তার লেখাটি বাল্মীকি-প্রসূত রামায়ণ কে আধার করে লেখা, কৃত্তিবাসী নয়, তবে পদে পদে বাল্মীকির লক্ষণের সাথে মিল বা অমিল খুঁজতে গেলে হতাশ হতে হবে।

দ্বিতীয় কৈফিয়তটি হলো, কেন লক্ষণ? এখানে লেখক স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন উপেক্ষিত অথচ শক্তিশালী মানুষদের প্রতি আমাদের টান স্বাভাবিক। রাম সর্বদা সর্বজন বিদিত ও পূজিত, সবার স্নেহভাজন এবং শ্রদ্ধেয়, সেখানে লক্ষণের পরিচয় রামের সহোদর হিসেবে। অথচ তিনিও ক্ষত্রিয়, রামের চেয়ে কিছুদিনের ছোট। অস্ত্রবিদ্যা, সাহসে রামের সমান। অথচ রামের সব অভিযান, রণভূমিতে লক্ষণ শুধু তার সহচর এবং পরিচারক হিসেবেই কাহিনীতে বর্ণিত।

এবার আসা যাক কাহিনীতে। কাহিনীর শুরু আর শেষে যে ঘটনা সেটার ব্যাপারে আমার আগে থেকে কোনো জ্ঞান নেই, তাই সেটা আপনারা পড়ে নেবেন।

রামায়ণের মূল কাহিনী দিয়ে শুরু করি। রাম লক্ষণ দুজনেই যখন অস্ত্রবিদ্যায় মনোযোগী, তখন দশরথ মাঝে মধ্যেই আকুল হয়ে পড়তেন রামকে দেখার জন্য। বাবার জন্যে ছুটে যেতেন রাম, সভার বাইরে একা লক্ষণ দাঁড়িয়ে রামের অপেক্ষা করতেন, দশরথ কখনো লক্ষণের জন্য সমান স্নেহ অনুভব করেননি। লক্ষণের নিজের মা সুমিত্রার কাছেও রাম স্নেহাধিক্যতা পেয়েছেন। মৃগয়ায় গেলেই সুমিত্রা লক্ষণকে স্মরণ করিয়ে দিতেন রামের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। তাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা লক্ষণের দায়িত্ব। এসবে লক্ষণ কখনোই রাগ করেনি বা ক্ষুন্ন মনোভাব পোষণ করেননি। রামের সহচর হিসেবেই সে নিজেকে দেখে এসেছে।

রাক্ষসের সাথে যুদ্ধে রাম লক্ষণ দুজনেই যখন যুদ্ধক্ষেত্রে, দুজনেই জানেন রাম বিষ্ণুর অবতার, যুদ্ধে পরাজয় অসম্ভব। কিন্তু লক্ষণ একজন সাধারণ মানুষ, তাকে সমস্ত ক্ষেত্রে সমস্ত যুদ্ধে নিজের বাহুবল আর দূরদর্শিতার ওপরেই নির্ভর থাকতে হয়েছে।

কৈকেয়ীর কথায় দশরথ যখন রামকে বনবাসের আজ্ঞা দিলেন, মনে রাখতে হবে সেই আজ্ঞা কিন্তু শুধুমাত্র রামের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল। সীতা পতিব্রতা হিসেবে রামের সঙ্গ নেবেন এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখানেও শুধু মাত্র রামের এক বাক্যে লক্ষণ রামের সঙ্গে বনবাসে রওনা হয়।

বনবাসে রাম যখন সীতাকে পেয়েও বনবাসের অনেকতা কষ্ট ভুলতে সক্ষম হয়েছে। তখন লক্ষণ এই দুজনের সেবায় অনেক বিনিদ্রিত রাত পার করেছে। উর্মিলা লক্ষণের সঙ্গে আসতে চাইলেও লক্ষণ নিষেধ করেছিলে, এই কারণে যে তাতে লক্ষণের দ্বারা রাম আর সীতার উপযুক্ত সেবা হবে না। ১৪ বছর বনবাসের প্রায় ১৩ বছর রাম-সীতা একসঙ্গে জীবন যাপন করেছেন, অথচ লক্ষণ তার বিবাহিত জীবনের, যৌবনের ১৪ বছর কাটিয়েছেন উর্মিলাকে ছাড়া। বনবাসে থেকেও রাম-সীতা একে ওপরের সান্নিধ্য পেয়েছে, আর লক্ষণ সর্বদা চিরসজাগ দায়িত্বপরায়ণ রক্ষকের ভূমিকা পালন করেছে। রামের চেয়ে এই বনবাস লক্ষণের পক্ষে ছিল অনেক বেশি একাকী আর কষ্টকর।

মারিচ বধের নেপথ্যে আছে এক অপমানজনক ঘটনা। সীতার অনুরোধে রাম সোনার হরিণ ধরার জন্য বেরিয়ে পড়ে, অথচ লক্ষণ তার ষষ্ঠেন্দ্রীয়ের দ্বারা রাম-সীতা দুজনকেই আগে জানিয়েছিল এ কোনো মায়াবী রাক্ষস, হরিণ নয়। লক্ষণের কথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে স্ত্রীর বায়নায় রাম বেরিয়ে পড়ে। লক্ষণ ভার নেই সীতার। এই অবস্থায় মারিচ রামের গলা নকল করে চিৎকার করলে সীতা লক্ষণকে রামের কাছে যাবার জন্য বলে। একসাথে বড়ো হয়ে ওঠা লক্ষণ জানে এই গলা রামের নয়, সে দৃঢ়ভাবে জানায় এ সেই মায়াবী রাক্ষসের গলা। ঠিক সেই মুহূর্তে সীতা বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে লক্ষণকে দুশ্চরিত্র আখ্যা দেয়, নিজের বড়ো ভাইকে বিপদে ফেলে তার স্ত্রীকে সম্ভোগের অভিযোগ তোলে। এই অপমান সহ্য করতে না পেরে লক্ষণ ছুটে যায় রামের কাছে, ফিরে এসে সীতাকে পায়না তারা। এখানেও রাম প্রত্যক্ষভাবে লক্ষণকেই দায়ী করে।

সীতাকে হারিয়ে রামের বিলাপ শুরু হয়, এবং তা চলতে থাকে দিনের পর দিন। লক্ষণ সান্তনা দেয় রামকে, তার খাওয়া, নিদ্রা, সেবা কোনোকিছুরই ত্রুটি রাখেনা লক্ষণ। অথচ রাম এক মুহূর্তের জন্য ভাবেনা, তার ভাই দীর্ঘ ১৩ বছর স্ত্রী বিনা দিন যাপন করছেন।

এভাবেই লক্ষণ রামের ছত্রছায়ায় থেকে উপেক্ষিত আর বঞ্চিত।

এই বইতে রামায়ণের আর্য-অনার্য প্রভেদটা বেশ ভালোভাবে দেখিয়েছেন লেখক। স্বাধীনচেতা ,সাহসী, যুদ্ধে পারদর্শী অনার্য সুর্পণখার শাস্তি দাম্ভিক রাম দিয়েছেন, কারণ আর্য সমাজে এরকম নারী ম্লেচ্ছ আর দুষ্ট বলেই পরিচিত, অথচ বালীকে অধর্ম উপায়ে বধ করে রাম নিজের স্বার্থ সিদ্ধ করতে চেয়েছেন। এই দুই ক্ষেত্রে লক্ষণ রামের পশে থেকেছে, কিন্তু পুরোপুরি সমর্থন করতে পারেনি।

লঙ্কা জয়ের পরেও যখন রাম সীতাকে অস্পৃশ্য বলে অপমান করলো, কারণ সীতা হয়তো এ��দিনে রাবন এবং অন্যদের শয্যাসঙ্গীনী হয়েছে, তখন পুরোনো কথা ভুলে লক্ষণ সীতার পক্ষে রামকে তিরস্কার করেছে। আবার অযোধ্যায় সস্ত্রীক রাম ফিরে গিয়েও প্রজাদের কথায় যখন রাম সীতাকে প্রত্যাহার করে, তখন সেই পাপকাজ রাম লক্ষণকে দিয়েই করিয়েছে।

এটা পাঠ-প্রতিক্রিয়া নয়। এক শক্তিশালী, দায়িত্বপরায়ণ সাধারণ মানব যিনি রামের সমকক্ষ হয়েও কখনো পূজিত হননি, সবসময় নিজেকে আড়ালে রেখেছেন, তার সম্পর্কে কিছু কথা জানানোর ইচ্ছে হলো, তাই কিছু কনটেন্ট ও ভাগ করে নিলাম। তবে বইটা অবশ্যই পড়বেন।
Profile Image for SwapNil Biswas.
9 reviews
February 16, 2025
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া

🧊 'বড়ো ভুল থেকে যায় জীবনে। ভুল জীবনের ভার বহন করা বড়ো ক্লান্তিকর। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন লক্ষ্মণ। শীতল স্রোতের স্পর্শ তাঁর সকল জ্বালা জুড়িয়ে দিক এবার। ইন্দ্রিয়ের দ্বারসকল রুদ্ধ করে দিলেন তিনি। আর শ্বাসপ্রশ্বাস চলবে না।...লক্ষ্মনের চেতনা বিলুপ্ত হয়ে গেল। তাঁর অচেতন দেহ ধীরে ধীরে ডুবে গেল জলে, এক খণ্ড প্রাণহীন প্রস্তরের ন্যায়।
অসীম, অনন্ত ভ্রান্তির গুরুভার বহন করতে না পেরে জলের গভীরে ডুবে গেল এক দ্বিধান্বিত মনুষ্যের জীবন।'

🧊 রাজা ভট্টাচার্যের 'লক্ষ্মণ চরিত মানস' শেষ করেছি বেশ কিছু মাস হল। ভট্টাচার্য মহাশয় রচিত এই উপন্যাস লক্ষ্মণের দৃষ্টিকোণ থেকে রামায়ণের ঘটনাগুলোর পুনর্উপস্থাপন করেছেন যা আমার অভিজ্ঞতায় নতুন ধরণের উপস্থাপনা। রামকে কেন্দ্র করে তৈরি রামায়ণকে লেখক প্রচলিত স্রোতের থেকে অন্যধারায় তুলে ধরেছেন পাঠকের কাছে।

🧊বাল্মীকি রামায়ণে লক্ষ্মণকে আমরা দেখতে পাই রামের ছায়ার মত, যাঁর উপস্থিতি আমাদের কাছে অনেকটা যুদ্ধের সৈনিকদের মতোই, রণকৌশলের বাইরে যাঁর অবদান আমাদের ভাবায় না। স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে যাঁর অস্তিত্ব নিয়ে আমরা ভাবিত নই। কিন্তু লক্ষ্মণের স্বতন্ত্রতাই এই উপন্যাসের উপজীব্য। লক্ষ্মণের চরিত্রের বিভিন্ন শেডকে এখানে লেখক তুলে ধরেছেন সুনিপুণভাবে।

লক্ষ্মণ চরিত মানস এর আরেক সার্থকতা হল উপন্যাসের নির্মাণ করতে গিয়ে রামায়ণের মূল কাহিনীর বিশেষ বিকৃতি ঘটাননি লেখক। যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধু পন্থা, রাজনীতিতে গুপ্তহত্যা, চিরাচরিত ব্যবস্থা ও জাতিভেদে ভিন্ন ব্যবহারে তাঁর চিন্তাধারা রামের বিরোধী, উর্মিলার কাছে তিনি অপরাধী, পিতার প্রতি অশ্রদ্ধ, তাঁরও বনবাসে ক্লান্তি জাগে প্রথম সমুদ্র দর্শনে ভীত হয়ে ওঠেন তিনিও। মাইকেলের ইন্দ্রজিতের মতোই এখানে লক্ষণকে আমরা দেখতে পাই এক প্রশ্নকারী যোদ্ধার চরিত্রে। তবে লক্ষ্মণের প্রশ্ন অন্য কাউকে নয়, বরং উপন্যাসে তাঁকে আমরা পাই আত্মবিশ্লেষণকারী রূপে। এ যেন এক সার্থক মানবায়ন।

🧊 স্বর্ণমৃগের রহস্য আগেই অনুধাবন করেছিলেন লক্ষ্মণ। রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎকে পরাস্ত করেন তিনি। পাঠশেষে পাঠকের মনে তাই ধন্দ জাগে, মহর্ষি বাল্মীকির চোখে কেন তিনি একজন পার্শ্বচরিত্র হিসেবেই রয়ে গেলেন। দীপ প্রকাশন কে ধন্যবাদ জানাই বইটিকে যথার্থভাবে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করার জন্য, বইয়ের পৃষ্ঠা, বাঁধাই এবং প্রচ্ছদ খুবই ভালো লেগেছে। আর লেখককে কুর্নিশ জানাই এই উপন্যাসের জন্য, কোনোরূপ ভারী ভাষার প্রয়োগ না করেও যে মহাকাব্যিক আখ্যানকে তার মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে সাবলীলভাবে তুলে ধরার জন্য। রামের অনুচর হিসেবে লক্ষ্মণ ছিলেন। কিন্তু এই হতভাগ্য 'দ্বিধান্বিত মনুষ্য' নিজের বিষাদগাথা কার কাছে ব্যক্ত করবেন?

📚 লক্ষ্মণ চরিত মানস
✍️ রাজা ভট্টাচার্য
📑 দীপ প্রকাশন
💰 225/-
Profile Image for Soumyabrata Sarkar.
238 reviews40 followers
May 11, 2021
সুললিত ভাষায় লেখক রামানুজের অনুপম জীবনী অঙ্কিত করেছেন।
লেখকের লক্ষ্মণায়ণ - অনেকাংশেই মহাকবি বাল্মীকির কাহিনীক্রম অনুসৃত হয়েও, অতিলৌকিক ও দৈবিক ঘটনার বাহুল্যবর্জিতায় এনেছে আলাদা সুষমা।
রামায়ণকে ভিন্ন দৃষ্টিতে অনুধাবন করতে নিঃসন্দেহে সাহায্য করবে এই বই।

এসত্যেও, অনেক জায়গায় মনে হয়েছে লেখক বাল্মীকির বেঁধে দেওয়া অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখা পার করতে চান নি, যেমন -
লক্ষ্মণ-সন্তানেরা ১-২ বারের বেশি উল্লেখিত হননি পুরো রচনায়।
আমার মনে হয়েছে, ঊর্মিলার উল্লেখ আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল, যদিও এক্ষেত্রে লেখককে ছাড় দেওয়াই যায়।
কিন্তু সবচেয়ে অবিশ্বাস্য লাগল, যখন লক্ষ্মণ তাঁর স্ত্রীপুত্রকে বিদায় বা কোন প্রকার সম্ভাষণ না করেই সরয়ুমগ্ন হলেন।
তাঁর চিন্তাতে তখনও রাম, রাম, রাম!
এছাড়া, কিছু বনবাসের কথা, আর কিছু "রামায়ণের গুরুত্বপুর্ণ অংশের", যা লক্ষ্মণোচিত।
বাকি সবই বুঝি তিনি বিস্মৃত হয়েছেন! এ কি কাহিনী শেষে শুধুই পাঠককে রিক্যাপ দেওয়ার জন্য?
রাবণ বধের পর থেকে তাঁর জীবনাবসান অব্দি কি আর কিছুই তাঁর জীবনে ঘটে নি? যা তাঁর স্মৃতিচারণ যোগ্য?
রামবর্জিত লক্ষ্মণের জীবন, যা অজানা, তা অজানাই থেকে গেছে এই উপন্যাসেও, যা আমার কাঙ্ক্ষিত ছিল।
মনে হয়েছে, লেখক যত্ন নিয়ে তা এড়িয়ে গেছেন।
লক্ষ্মণায়ণ না হয়ে তাই এটি "লক্ষ্মণের চোখে ধরা রামায়ণ" হিসেবে আমার কাছে বেশি ধরা দিয়েছে।

বইটি অবশ্যপাঠ্য, কারন উপরোক্ত প্রশ্নের জবাব না দিলেও, এই রচনা সেইসব প্রশ্নের উৎপত্তি ঘটাতে সক্ষম হবে আপনার মননে।

আরো কিছু লক্ষ্য করলাম -
১। শত্রুঘ্নর রক্তের গন্ধ সহ্য হয়না। (পৃঃ ৪৪)
২। লক্ষ্মণের মামার নাম দু'জাগায় দু রকম উল্লেখিত হয়েছে। আমার সংগ্রহে দ্বিতীয় মুদ্রণে আছে- যুধাজিত/যুধাজিৎ (পৃঃ ১৮/৫৪)
৩। বনবাসের শুরুতে লক্ষ্মণ ও রামের ব্যাপারে বলা হয়েছে, রাজকুমার হিসেবে তারা আজীবন নরমশয্যায় অভ্যস্ত। তাঁরা কি গুরুকুলে গিয়ে বিদ্যাভ্যাস করেন নি? নাকি, সেখানেও রাজকীয় শয্যায় রাত্রিযাপন করতেন? (পৃঃ ৫৭)
৪। অতিলৌকিক ঘটনা বাদ দিলেও, বা চোখ নাচলে সামনে বিপদ হবে- এই কুসংস্কার(অনুভব) লেখক লক্ষ্মণের চরিত্রে রেখে দিয়েছেন। ভালই। সংস্কার কুসংস্কার নিয়েই তো আমরা বেঁচে আছি। (পৃঃ ৫৯)
৫। বন্যপ্রাণীরা রাজকীয় ও সাধারণ মনুষ্যের মধ্যে তফাৎ করে না। রাজর্ষি জনকের কন্যা হয়ে, সীতা এই জ্ঞ্যানের অধিকারী নন, বরঞ্চ এর তাৎপর্যে তাঁর মনে ত্রাস সঞ্চার হয়েছে, এটি মানতে কষ্ট হয়েছে। (পৃঃ ১২৪)
Profile Image for Jheelam Nodie.
314 reviews13 followers
January 22, 2021
বইঃ লক্ষ্ণণ চরিত মানস
লেখকঃ রাজা ভট্টাচার্য
রেটিংঃ ২.৫/৫
রিভিউঃ এই সব বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে হতাশ করেছে এই বইটা। লক্ষ্ণণের দৃস্টিতে রামায়নের পুনঃকথন পড়তে পারব ভেবে বইটা কিনলাম, কিন্তু হতাশ হলাম। লেখক বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে গল্পটা বলতে চেয়েছেন, কিন্তু নতুন কিছুই নয়, একই চর্বিত চর্বন। নতুন আঙ্গিক আসতে পারত লক্ষ্ণণ আর উর্মিলার সম্পর্কে, কিন্তু লেখক সেটা প্রায় বাদ দিয়েছেন বলতেই হয়। তাছাডা তার লেখনভঙ্গি আমার সুখপাঠ্য লাগেনি। অনেক কস্ট হয়েছে শেষ করতে।
Displaying 1 - 9 of 9 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.