সত্যজিৎ রায়ের নানা লেখায়, সে রহস্য উপন্যাস হোক বা সায়েন্স ফিকশন, মর্মস্পর্শী বড়োগল্প হোক বা ধারালো ছোটোগল্প, ভোজবাজির উপস্থিতি দেখি আমরা। এখানে ভোজবাজি মানে শুধু ম্যাজিক নয়। বরং অন্য নানা ধরনের তাক-লাগানো খেলা, জাগলিং, এমনকি সার্কাসও বোঝানো হয়েছে। এই প্রসঙ্গগুলো সত্যজিৎ কি শুধুই কাহিনির স্বার্থে তুলতেন? নাকি এর সঙ্গে মিশে ছিল তাঁর নিজের স্মৃতি, বিভিন্ন পছন্দ-অপছন্দ আর ইচ্ছে? এই বিষয়টিই খতিয়ে দেখতে চেয়েছেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত আলোচ্য বইটিতে। 'লেখকের নিবেদন'-এ বইয়ের উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট করে দেওয়ার পর লেখক আলোচনাকে এইক'টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন~ ১) ম্যাজিক ও মানিক ২) বাজিকর যখন কল্পনায় ৩) সত্যি জাদুকর ৪) দেশি ও বিলেতি ৫) হিপনোটিজম ৬) জাদু ও সাধু ৭) মাদারি, বেদে আর গণৎকার ৮) মায়াস্বর ৯) সিনেমায় ম্যাজিক ১০) সার্কাস ১১) মিনেজারি ১২) বাঘের খেলা ও টাইগার ট্রেনার ১৩) ট্র্যাপিজ ১৪) ছুরি ছোড়ার খেলা ১৫) জাগলার ১৬) সাপুড়ে ১৭) মনুমেন্টের মাঠে ১৮) 'ধাপ্পা' ও জাদুকর এই লেখাগুলোতে সত্যজিতের প্রায় সম্পূর্ণ ফিকশন এবং নন-ফিকশন হিসেবে 'যখন ছোটো ছিলাম' মন্থন করে তুলে ধরা হয়েছে একটি চিত্র। সেই চিত্র বহুবর্ণশোভিত, রহস্যময় নানা নকশা ও অক্ষরে ঠাসা, অত্যন্ত আকর্ষক। কিন্তু ভোজবাজির আসল কথা যে 'জাদুকর কখনও বলে না' (সৌজন্যে ম্যানড্রেক)— সেটা লেখক ভোলেননি। ফলে আমরা লেখাগুলো এমনভাবেই পেয়েছি যা আমাদের আবার অনুপ্রাণিত করে 'গল্প ১০১', 'ফেলুদা সমগ্র' আর 'শঙ্কু সমগ্র' নিয়ে বসে পড়তে; অথচ তাতে স্পয়লার থাকে না। মূল লেখাগুলোর সঙ্গে থাকা বেশ কিছু আইকনিক অলংকরণ এই বইয়ে এসেছে বলে এই 'ফ্ল্যাশব্যাক' এফেক্টটা আরও জোরালো হয়। শুধুই সত্যজিতের লেখা বা স্মৃতি নয়, এই বইয়ের উপকরণ হিসেবে লেখক ব্যবহার করেছেন সমসাময়িক নানা ঘটনা এবং তথ্য। ফলে আমরা এক সৃজনশীল ও প্রতিভাবান মানুষের ক্যানভাস এবং রং— দুয়ের সঙ্গেই পরিচিত হতে পেরেছি। তবু এটা পড়ার পর কয়েকটা প্রশ্ন জেগে ওঠে। ১] ম্যাজিক নিয়ে 'দ্য প্রেস্টিজ'-এর মতো একটা সিনেমা বানানোর কথা কি কখনও ভেবেছিলেন সত্যজিৎ? বা 'দ্য ইলিউশনিস্ট'-এর মতো কিছু? নিদেনপক্ষে ম্যাজিক-এর পটভূমিতে কোনো হত্যারহস্য— যার সমাধান করবেন ফেলুদা? ২] 'ফেলুদা ফেরত'-এ বাঘের সিজিআই-এর যা অবস্থা দেখলাম আমরা, তাতে 'নাউ ইউ সি মি'-র মতো কিছুর আশা করা একান্তই অন্যায়। কিন্তু 'নয়ন রহস্য' নিয়ে যদি কেউ কখনও সিনেমা/ওয়েবসিরিজ বানান, তাহলে তাতে কি সত্যজিতের ভালো-লাগার এই বিষয়গুলোকে যথাসম্ভব দেখানো সম্ভব? অলীক প্রশ্ন আর অবান্তর ভাবনা। ও-সব বাদ দিয়ে মূল বইয়ের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বইটাতে কয়েকটা মারাত্মক মুদ্রণ প্রমাদ আছে, যেমন সুরপতি-কে সুরোপতি বলে ছাপানো হয়েছে প্রথম অধ্যায়েই। ছোড়া (নিক্ষেপ করা) ছোঁড়া (অল্পবয়সী ছেলে) হয়ে গেছে সূচিপত্রেই। এগুলো পরবর্তী মুদ্রণে শুধরে নিলে ভালো হয়। বইটার শেষে একটা টেবিল গোছের জিনিস দিয়ে আলোচিত লেখাগুলোর রচনাকাল এবং সেই সময় ভোজবাজি-র দুনিয়ায় কী ধরনের পরিবর্তন আসছিল— তা দেখালে ভালো হত। তবে এগুলো অতি সামান্য জিনিস। আসল ব্যাপার হল সরস ও বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনার সূত্র ধরে সত্যজিতের ম্যাজিকাল দুনিয়ায় নতুন করে ফিরে যাওয়ার পাসপোর্ট পাওয়া। এই বই সেটি পুরোমাত্রায় করতে পেরেছে। বইটা এত ছোটো হওয়ায় বড়ো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল— এটাই ট্র্যাজেডি। সত্যজিতের লেখায় আগ্রহী হলে, ম্যাজিক ও সার্কাস ভালোবাসলে, রেনেসাঁ ম্যান-টিকে তাঁর এই শতবর্ষে আরেকবার ছুঁতে চাইলে এই বইটি অবশ্যই পড়তে বলব।