যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুঁছবে
বুঝবে সেদিন বুঝবে।
ছবি আমার বুকে বেধে
পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে
ফিরবে মরু কানন গিরি
সাগর আকাশ বাতাশ চিরি
সেদিন আমায় খুজবে
বুঝবে সেদিন বুঝবে।
সে আজ বন্দী! তার সত্য-মুক্ত প্রাণ যে ভৈরব-রুদ্ৰ-ছায়ানটের হিল্লোলে নৃত্য-পাগল ছন্দে এক অভিনব সৃষ্টি-রচনা করে গেল,
--সে আজ মুক্ত !
কোনো রাজ-শক্তির ভ্ৰূকুটি সে মানে না, কোনো লৌহ-নিগড় কোনোদিন তারে বাঁধতে পারে না—সে আপনার তালে নেচে চলে, আর পায়ের তলায় ওঁড়িয়ে যায় কত রক্ত-নয়ন, কত শাসন-বচন, কত
শাস্তি-রচন।
সে যে প্রলয়ানন্দে ভরা রুদ্রনটের নৃত্যছন্দ যে তার কাল- বৈশাখীর নর্তনের মতো এলোমেলো, সুর যে তার সৃষ্টির ব্যথা-গৌরব ভরা। সুর আজ স্বেচ্ছাচারী, সুর রাজবন্দী।
সে আজ বন্দী। তবু সে একদিন যুগযুগান্ত-সঞ্চিত রুদ্ধহিমানির বুকে অগ্রিকণা এনে দিয়েছিল, তার রুদ্র বীণে কোন সর্বভূক দেবতা তার চিরমন্দির গড়ে নিল, আর সেই অগ্নি-বীণে তার দিবস-নিশার দহন-আলোয় আপন অন্তরে তার চিরবাসরের চিতা রচনা
করে নিল,
--সবার আড়ালে, সবার গোপনে, সবার উপরে—মানবের হাসি-কান্না ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের বহু বহু দূরে ;
---সেখানে বসে সে তার অন্তর-অলকায় যে গাথা গেয়ে চলেছে তাতে বন্ধনের কৃষ্ণ রেখা নেই, দুর্বল কম্পিত হিয়ার ক্ষীণ রাগিণী নেই
—সেখানে সে আর তার অন্তর-দেবতা, নিখিল নরনারী বাইরে দাঁড়িয়ে রুদ্ধ দুয়ার দেখে ফিরে আসে শুধু।
সে আজ বন্দী। রাজার দেওয়া লৌহ-নিগড়ে তার অন্তরের বিদ্রোহী-বীর কোন দেবতার আশিস নির্মাল্য দেখতে পেল, তাই সাদরে বরণ করে নিল তাকে আপনার বলে।
তারপর একদিন যখন বাংলার যুবক আবার জলদমন্দ্রে বাধা-বন্ধহারা হয়ে স্বাধীনচিত্ত ভরে বাংলার চিরশ্যামল চিরঅমলিন মাতৃমূর্তি উন্মাদ আনন্দে বক্ষে টেনে নেবে,
সেই শুভ আরতিলগ্নে ইমনকল্যাণ সুরে যে নহবতের রাগিণী বেজে উঠবে, তাতে হে কবি, তোমার প্রেম-বৈভব-গাথা-তোমার অন্তর-বহ্নি-ব্যথা সন্ধ্যা-রাগ রক্তে আপনি বেজে উঠবে ;
জননীর শ্যামবক্ষে তোমার স্মৃতি ব্যথা-ভারাতুর হয়ে সকল পূজার মাঝে বারেবারে তোমাকেই স্মরণ করিয়ে দেবে,
–-হে কবি, সে আজ নয়।
শ্ৰীপবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়