Jump to ratings and reviews
Rate this book

জলের দেশে স্থলপদ্ম

Rate this book

128 pages, Hardcover

First published January 1, 2021

1 person is currently reading
22 people want to read

About the author

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
15 (40%)
4 stars
16 (43%)
3 stars
6 (16%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 12 of 12 reviews
Profile Image for Zubayer Kamal.
84 reviews20 followers
March 1, 2022
‘জলের দেশে স্থলপদ্ম’ বইটির নয়টা গল্প পড়লাম। বই হিসেবে প্রকাশ হবার আগেই এর মধ্যকার দুটো গল্প প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিলো। সেগুলো আমিও আগেই পড়ে ফেলেছিলাম। তবে বাকীগুলো আমার জন্য নতুন।

ওয়ালিদ প্রত্যয় আগে একটি বই লিখেছেন। যেখানের গল্পগুলো আমার বেশ দারুন লেগেছিলো। এই বইয়ের গল্পগুলো আগের চেয়ে আলদা। সেটা কীরকম?

প্রথম গল্পে সুরিলিজমের একটি ছোঁয়া দেখতে পাই। ভোগবাদী বিশ্বের উত্থান ব্যক্তিগত জীবনের কোন পর্যায় গিয়ে পৌছেছে তার একটা দৃশ্য আঁকা হয়েছে ‘পিঁপড়া’ নামের গল্পটিতে। তবে তার লেখা আগের বইটির প্রথম গল্পে দেখতে পাই গল্পের শুরুতেই স্পয়লার। একটা নাটকে ফাঁসির দৃশ্য দেখানো হবে। আর এবারের বইয়ের প্রথম গল্পের প্রথম বাক্যেই দেখতে পাই গল্পের সিনোপসিস। এই ‘গল্প বলে দিয়ে গল্প শুরু’ করার প্রক্রিয়াটা বেশ মজার। একই সাথে উত্তেজনাপূর্ণ এবং স্নায়ুচাপের।

প্রথম গল্পে উত্তম পুরুষে নিজের লাশ একটি নর্দমায় ভেসে থাকার যে কাহিনী ফাঁদা হয়েছে সেখানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ চোখ এড়িয়ে যায় না। যেমন নর্দমায় ভেসে থাকা লাশ দেখে পেশাব করতে আসা একজন রিক্সাচালকের মধ্যে তেমন ভাবান্তর দেখা যায় না। তবে গল্পের মুল আবেদন অন্যখানে। এখানে ব্যবহার করা হয়েছে দুর্দান্ত কিছু মেটাফোর। রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার আরেকটি রূপ দেখতে পাই বইটির অন্য গল্পে। গল্পটির নাম ‘বিচার’। সেখানে পাপ পুন্যের বিচার করতে আসা রাজা একটা সময় দ্বিধান্বিত হয়ে পরেন এই কারণে যে, আসলে একজন অপরাধ কেন করে?

পুরো বই জুড়ে এমন দ্বন্দের দেখা পাওয়া যায়, তবে খুব বেশি না। কারণ এই বইতে বেশ কয়েকবার আধো-ভৌতিক এবং পরাবাস্তবতার বিভিন্ন দিকমাত্র ব্যবহার করা হয়েছে। রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ নামক গল্পে জীবনানন্দ এবং ভ্যানগগের দেখা হবার একটা পরাবাস্তবিক সংলাপ নির্মান করা হয়েছে। বাস্তবে ভ্যানগগ বাংলার কবি জীবনানন্দকে চিনতেন না। কারণ তিনি তখনও জন্ম নেননি। এছাড়াও অলমোস্ট অটোবায়োগ্রাফিক নামের গল্পতে দুজন ব্যক্তির হাটতে হাটতে সময় পরিভ্রমন করতে দেখা যায়। এই সময় ভ্রমনের প্রক্রিয়ার মধ্যে রিক্সাকে বেছে নেয়া হয়েছে একবার। চরিত্র বর্তমানের একজন রিক্সাওয়ালার কাছে জানতে চান তিনি তাকে নিয়ে ১৯৭১ সালে যাবেন কিনা। রিক্সাওয়ালা আশি টাকার বিনিময়ে যেতে রাজী হন। এই যে বর্তমান সময় থেকে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে চলে যাওয়া, পুরো ব্যাপারটিতেই একধরণের নান্দনিকতার ইশারা পাওয়া যায়। গল্পটা রূপকথা হবে হবে করেও হচ্ছে না।

তবে সবকিছুকে বাদ দিয়ে গল্পে ফুটে উঠেছে চরম মানবিক বোধ। হৃৎপিন্ডের ঘ্রাণ নামক গল্পে একজন ছাপোষা মানুষ শামসুল আলমকে হুটকরে অন্ধ হতে দেখা যায়। সাময়িক অন্ধত্বের মধ্যে দেখি আমরা সমাজের ক্ষমতার ব্যবহার এবং নিজের ভিক্টিম হবার একটা গল্প। একই সমাজের ক্ষমতাবান এবং নিরীহ মানুষের মনোস্তাত্বিক বিরোধের বাইরে হুট করে গল্প মোড় নেয়। দেখা যায় এর বাইরেও পৃথিবীতে সমস্যা হয়। তখন হয়তোবা কোন সঙ্গত কারণে গল্পের মুল চরিত্র শামসুল আলম চিরস্থায়ী অন্ধ হয়ে যেতে চান। কিন্তু সেটি ঘটে না।

ওয়ালিদ প্রত্যয়ের লেখার একটা মজা হলো, গল্প বলার ন্যারাটিভ স্টাইল নিয়ে খেলা করা। ল্যাম্পপোষ্ট নামের একটি গল্প নাম পুরুষে বলা হলেও হুট করে গল্পের মাঝে সেটিকে উত্তম পুরুষে চলে যেতে দেখা যায়। এই যে গল্প শুরুর প্রায় আড়াই হাজার শব্দের পরে হুট করে ন্যারাশন পরিবর্তন হওয়া এটা নিঃসন্দেহে গল্পের বৈচিত্র্যতাকে প্রকাশ করে।

গল্পের শেষে একটি ধাক্কা দেয়ার মত স্টাইলে কিছু গল্প লেখা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে গল্পগুলো বুননে তেমন একটা খামতি দেখা যায় না। খুব খেয়াল করলে বোঝা যায় অধিকাংশ গল্পের খাজে লুকিয়ে আছে একধরণের শুন্যতা। কিছু ক্ষেত্রে ওয়ালিদ প্রত্যয় সরাসরি শুন্যতা প্রকাশের ভাষা ফুটিয়েছেন। বেশিরভাগ জায়গাতেই লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক হাহাকার। ঝড়ে ভেঙে যাওয়া ল্যাম্পপোষ্টের নিচে দিন তিনেক অভুক্ত থাকা দুই সন্তানের জননী যখন সদ্য জন্ম নেয়া বাচ্চাকে দুগ্ধ পান করাচ্ছেন তখন চার বছর বয়সী অন্য ছেলে ক্ষুধার কথা জানান দেন। মমতাময়ী মা তার অন্য স্তন যখন চার বয়সী অনুপযোগী সন্তানের জন্য ঠেলে দেন, ঠিক তখন আমার বুকে এক ফাঁকা সুর বেজে ওঠে। সেই সুরে আছে এক দলা হাহাকার।

কিছু গল্পে টেকনিকালি বাহুল্য বাক্য ছিলো। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। কিন্তু গল্পের রেশ লেগে থাকা কোন বইকে এই তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে না ঘাটানোই ভালো। শুধু এটুকু বলতে পারি, ওয়ালিদ প্রত্যয় তার নতুন বই দিয়ে আমাকে পুনরায় তাড়িত করেছেন।

বাংলাদেশী প্রকাশনা সংস্থা নালন্দা ওয়ালিদ প্রত্যয়ের গল্পযাত্রায় নিজেদেরকে শামিল করেছে। আমার বিশ্বাস, যে কোন মনোস্তাত্বিকভাবে সচেতন থাকা পাঠক এই বইটি মনোযোগ সহকারে পড়তে বাধ্য হবেন।


I read nine stories from the book ‘Jaler Deshe Sthalopadma’ (Lotus in the Land of Water). Two of these stories were published. I had read them before. The rest of the stories are very fresh to me.

Walid Prottoy has written a book before (Ekhane Bhishon Rod). I really liked writing there. The stories in this book are different than before. How is that?

In the first story, we see a touch of surrealism. The story of ‘Pipra’ (Ants) depicts the stage at which the rise of the consumerist world has reached. However, in the first story of the previous book written by him, we see the spoiler at the beginning of the story. A drama will show the human hanging scene. And in the first sentence of the first story of this book we see the synopsis of the story. The process of ‘starting a story by telling a story’ is quite interesting. Simultaneously exciting and nervous.

In the first story, the story of a man floating his Dead-body in a sewer is a trap that does not go unnoticed. For example, a rickshaw puller who comes to urinate after seeing a dead body floating in the sewer does not show much jittery. But the main appeal of the story is elsewhere. Some great metaphors have been used here. In another story in the book, we see another form of protest against the state. The name of the story is ‘Bichar' (Justice). The king who came there to judge sin and virtue was hesitant for a while because why does one actually commit a crime?

There are conflicts throughout the book, but not too many. Because different aspects of semi-ghost and surrealism have been used several times in this book. In the story called ‘Raktim Gelashe Tarmuz Maad’ ( Watermelon Wine in the bloody Glass), a surreal dialogue is created between Jibanananda and VanGogh. In fact, Van Gogh did not know the Bengali poet Jibanananda. Because he was not born yet. Also in the story called ‘Almost Autobiographic’, two people are seen navigating while walking. This time the rickshaw was chosen once in the process of travelling. The character wants to know from a random rickshaw puller if he will go with him in the year of 1971. The rickshaw puller agreed to go for only 0.94 USD. Moving from the present time to a historical context, there is a hint of aesthetics in the whole matter. The story is not going to be a fairy tale.

However, excluding everything, the extreme human feeling has emerged in the story. In the story called ‘Hritpinder Ghraan’ (The Smell of the Heart’, a man Shamsul Alam is seen to be blinded. In temporary blindness, we see a story of the use of power in society and of being our own victim. The story takes a turn by rushing out of the psychological conflict of powerful and innocent people of the same society. It can be seen that there are problems in the world beyond this. Then maybe for some GOOD reason the main character of the story Shamsul Alam wants to go blind forever. But that doesn't happen.

One of the interesting things about writing Walid Prottoy is to play with the narrative style of storytelling. A story called ‘Lamp-post’ is told to a man’s story like indirect speech, but in the middle of the story, it is seen to go to the voice of the author (direct speech). The fact that the narration changes in a hurry after about two and a half thousand words at the beginning of the story undoubtedly reveals the diversity of the story.

Some stories are written in a push-up style at the end of the story. There are not many flaws in weaving the stories in the true sense. A closer look reveals that there is a kind of emptiness hidden in most of the stories. In some cases, Walid Prottoy expresses the language of direct emptiness. There is a strange wailing hidden in most places. Another four-year-old boy reported hunger while the mother of two starving children was feeding her newborn baby under a lamp-post broken by the storm. Just when the loving mother pushed her other breast for the unsuitable child of four years old, an empty melody rang in my heart. There is a lump of wailing in that tune.

Some stories had technically redundant sentences. At least that's what I thought. But it is better not to waste any book on this trivial matter. All I can say is that Walid Prottoy has struck me again with his New Book.

Bangladeshi publishing house Nalanda has included itself in the story journey of Walid Prottoy. I believe that any psychologically conscious reader will be compelled to read this book carefully.
Profile Image for Nishat Monsur.
191 reviews18 followers
January 21, 2023
প্রথম গল্প "পিঁপড়া" যখন ফেসবুকে প্রকাশিত হয়, তখন এই গল্পটি পড়েই আমি লেখকের সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠি এবং তার দুইটি বই সংগ্রহ করি পড়ার জন্যে। মানুষ যে পড়তে পড়তে পাঠক হিসেবে পরিণত হয়ে ওঠে, সেটা আমি বুঝতে পারছি ইদানীং- এই বইটি তার ব্যতিক্রম নয়। প্রথমবার পিঁপড়া গল্পটি পড়ে মুগ্ধ হওয়া আমার কাছেই দ্বিতীয় পড়ায় মনে হ��ো, গল্পটার আসলে শেষ লাইন লেখা হয়েছে সবার প্রথমে এবং তারপর পুরো গল্পটা লেখা হয়েছে শেষ লাইনটিকে কেন্দ্র করে। লেখকের স্থান আমার কাছে জাদুকরের সমান, তার জাদু ধরে ফেলতে পারলে আমার মুগ্ধতাটা কেটে যায়।

এই ব্যাপার ঘটেছে পুরো বই জুড়েই। সমস্যা হচ্ছে বইটা পড়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আমি যতটা ভেবেছিলাম, পড়ার পরে সেই অনুযায়ী আমার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বেশ কিছু নতুন বিষয় নিয়ে তিনি এক্সপেরিমেন্ট করেছেন বইটিতে, হয়ত বছর দু'য়েক আগে পড়লে বিস্মিত হতাম। লেখকের সাথে ফেসবুকে যুক্ত থাকার সুবাদে তার লেখা নিয়মিত পড়া হয়। সেই পড়ার সূত্রেই বলছি, ফেসবুকের জন্য তিনি যেভাবে লেখেন, তাতে বইয়ে আরো বেশি পাওয়ার আশা ছিল আমার।
Profile Image for Hasan.
Author 11 books88 followers
January 7, 2021
পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখার জন্য যত শব্দ, শক্তি আর অনুভূতি প্রয়োজন। সব স্তিমিত হয়ে গেছে শেষ গল্পটা পড়ে। একবুক হাহাকার জাঁকিয়ে বসেছে। 'জলের দেশে স্থল পদ্ম' বইয়ের নাম গল্প এবং সর্বশেষ গল্প। প্রথম থেকে শুরু করা যাক। প্রথম গল্প – পিঁপড়া। গল্পে পরাবাস্তবতার ব্যবহার আনলে অধিকাংশ সময় দেখা যায় কিছুটা ভজকট পাকিয়ে যায়। এবং সেই ভজকটকেই নান্দনিকতা হিসেবে ধরা হয়। আমি এটাকে খারাপ বলছি না। এসব বৈচিত্রের জন্যই গল্প ভিন্নতা লাভ করে, অনন্য হয়ে উঠে। তবে আশার কথা হলো, প্রত্যয়ের প্রথম গল্পে আমি কোনো ভজকট পাইনি। নিখাদ পরাবাস্তব গল্পে। কোথাও আমাকে থামতে হয়নি, ভ্রুকুটি করতে হয়নি। রাষ্ট্রে স্বপ্ন দেখা নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন, রাইফেল কাঁধে ছুটে আসা কুকুর আর যকৃত নিয়ে লড়াই করা পিঁপড়ের দল। একটা মৃত লাশের ভিতরে গড়ে ওঠা নতুন রাষ্ট্র আর দুই মেরুর দুটো দল। এবং সবশেষে গল্পের শেষ লাইন। শেষ দুটো বাক্য। দুর্দান্ত!

'মেয়েটি সাগ্রহে প্রশ্ন করলো' দ্বিতীয় গল্প। বর্তমান সময়ে ইতিহাস আশ্রিত বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের গল্প যতদূর যা পড়েছি, অধিকাংশই দেশভাগের সীমানা পেরোতে পারে না। সাতচল্লিশের ওপারে খুব কম যায়। ওয়ালিদ প্রত্যয় সাতচল্লিশ টপকে চুয়াল্লিশে গেছেন। সেই দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর। পঞ্চাশের মন্বন্তর। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গল্প লেখতে গিয়ে আমরা যে ইতিহাস কপচাই, মনে করি মোটা দাগে ইতিহাসকে তুলে ধরতে না পারলে ওই সময়ের আবেদনটা আসবে না। এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে কেবল গল্পই বলেছেন প্রত্যয়। গল্পের দুটো অংশ। সমাজের দুই ডাইমেনশন। একটি মিথ্যা, ঝরে পড়া একটি ফুল। খানিক জাদুবাস্তবতা অথবা নিদারুণ বাস্তবতার গল্প। এই গল্পের শেষে এসে আমি আঁতকে উঠেছি। দুর্ভিক্ষ কতটা পীড়াদায়ক, কতটা ভয়াবহ এর আগে আমি বুঝিনি। ঠিক এরকম আরেকটা গল্প 'কোকিলপেয়ারি জমিদার বাড়ি'। এই গল্পে সবথেকে চোখে লাগার মতো দারুণ বিষয় হলো খুব ছোট করে রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির খবর। মাত্র কয়েকটা লাইনে গল্পটা জীবন্ত হয়ে উঠে। কোকিলপেয়ারি জমিদার বাড়ির প্রতিটা সদস্যকে মনে হয় সত্য।
ওয়ালিদ প্রত্যয়ের গল্প নিয়ে কথা বলায় মুশকিল হলো, কোনটা রেখে কোনটা নিয়ে কথা বলবো খেই হারিয়ে ফেলি। গল্প নিয়ে, গল্পের গল্প নিয়ে প্রত্যয় অনেক ডিটেইল কাজ করেন৷ এবং সবথেকে বড়কথা প্রত্যয় থামতে জানেন। আমার ধারণা থামতে না জানলে এতদিনে প্রত্যয় শখানেক গল্প লিখে ফেলতেন। সংখ্যাটা একটু বেশি মনে হলেও, এই সক্ষমতা সে রাখেন। কিন্তু গল্প লেখার জন্য লেখা না৷ গল্প বলার জন্য লেখা। মস্তিষ্কে কতশত গল্প এমনিতেই পায়চারি করে প্রত্যয়ের সেটা বুঝতে পারি 'অলমোস্ট অটোবায়োগ্রাফি' পড়ে। লেখকের কথানুযায়ী শতভাগ panster হিসেবে লেখা এই গল্পে ফুটে উঠেছে নিজস্ব স্ফুরণ। ' আশি টাকার বিনিময়ে রিকশা যোগ একাত্তরে গমন', 'রাধিকাপুরের দূরত্ব অঞ্জন দত্তের পাঁচ গান' এই গল্পের এরকম ছোট ছোট উপমা আমার মনে থাকবে অনেকদিন।
'বিচার' গল্পে সমাজ, রাষ্ট্র অথবা ধর্মকে যেই প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে যুবক সেই প্রশ্ন আমারও। সেই প্রশ্ন প্রত্যেকের৷ কেবল সাহস কিম্বা সময়ের জন্য চুপ থাকি। সেই সময়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যুবকের জবানে প্রশ্নটা করে ফেলেছেন প্রত্যয়। গল্পটা সুন্দর এবং নান্দনিক। তবে প্রথমে যে পরাবাস্তব গল্পে ভজকট পাকিয়ে ফেলার কথা লিখেছিলাম, তার খানিকটা এই গল্পে দেখতে পাই। গল্পের বিচারালয় ইহলৌকিক না পারলৌকিক আমি সেটা বুঝতে পারিনি। ইহলৌকিক হল দেখছি, যুবক চুরি করতে গিয়ে মৃত্যুর পর বিচারে দাঁড়িয়েছে। আর পারলৌকিক হলে আবার দেখা যায়, মন্ত্রীর ছেলের পায়ে কামড়ানোর অপরাধে বিচারকের সামনে দাঁড়িয়েছে কুকুর। মন্ত্রী আবার রাজার পাশে বসে আছে। তাহলে! তবে এই ব্যাপারটা বাদ দিলে বা গোনায় না ধরলেও সমস্যা নাই। গল্পের আবেদন কোনো অংশেই কমে না। 'রক্তিম গ্লাসে তরমুজ মদ' গল্পটা ফেসবুকে আগে পড়েছিলাম। ভ্যানগগের সাথে জীবনানন্দের দেখা হওয়ার গল্প। আমার সবথেকে পছন্দ হয়েছে 'হৃৎপিণ্ডের ঘ্রাণ' গল্পটা। এইসময়ে এসে ধর্ষণের গল্প লেখা খুব সোজা। একটু ভায়োলেন্স, একটু পৈশাচিক বর্ণনা, ব্যাস হয়ে গেলো। জনৈক শামসুল আলমের গল্প। যে সাময়িক অন্ধত্বের স্বীকার হোন। হঠাৎ করেই অন্ধ হয়ে যান। এই অন্ধত্বটা মেটাফোর। আমিও এমন অন্ধ হয়ে যাই। দেখেও না দেখার ভান করি। নাম গল্প 'জলের দেশে স্থলপদ্ম' নিয়ে একটা কথা আছে। গল্পে কাজলের বাবা মতিন পোস্ট অফিসের কেরানী। গল্পের প্রথম পরিচ্ছদের প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়। 'পোস্ট অফিস' পাকিস্তান আমলের আগে থেকেই সরকারি। কিন্তু গল্পে লেখা হচ্ছে, কাজলের বাবা আগে গ্রামের পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন। তারপর শহরের পোস্ট অফিস থেকে 'প্রস্তাব' আসার পর সে শহরে চলে গেছে। কথা হচ্ছে, সরকারি কোনো চাকরিতে প্রস্তাব আসে না। আসে নির্দেশ। এটাকে শব্দের ভুল প্রয়োগ মনে করে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছিলাম কিন্তু একটু পরেই দেখি ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া কাজল তার বাবাকে শহরের অফিসের কাজ ছেড়ে দিয়ে গ্রামে আগের অফিসে এসে কাজ করতে বলছে। আমার জানামতে পোস্ট অফিসে এমন কাজ করা যায় না। এইটুকু চোখে লাগলো কারণ, আমার বাবা পোস্ট অফিসে চাকরি করেছেন। যাইহোক, শেষ গল্পটায় এই ব্যাপারটা বাদ দিলে আর কোনো সমস্যা নাই। পুরো বইতে জাদুবস্তবতা, পরাবাস্তবতার নান্দনিক কাজ শেষে, শেষ গল্পটায় একদম নিখাদ বাস্তববাদী এক গল্প উপহার দিয়েছেন লেখক। গল্পটা নিয়ে আর কিছু লিখে স্পয়লার দিতে চাই না। তবে চাই প্রত্যেক সচেতন পাঠক যেন অন্তত এই গল্পটা পড়ে।
বর্তমানে আমি লেখকদের লেখক পরিচিতি আর লেখার ভিতর বিস্তর ফারাক দেখি। কেউ আকাশ হতে গিয়ে লেখক হয়ে গেছেন। কেউ বৃক্ষ হতে চাইতেন। কারো বাড়ির পাশ দিয়ে নৌকা যেতো তাই সে মাঝি হতে চাইতো। কিন্তু হঠাৎ করেই কী এক মন্ত্রবলে তারা লেখক হয়ে উঠলেন। কিন্তু ওয়ালিদ প্রত্যয় বলেন, সে গল্প লেখে এটা জানার জন্য যে গল্পগুলো পৃথিবীতে আসার জন্য তাকে বেছে নিয়েছে কি-না। যদি কখনও জানতে পারেন তাকে বেছে নেয়নি, তাহলে পরদিন থেকে সে লেখা ছেড়ে দিবেন।
প্রত্যয়ের গল্প আমার কাছে ভালো লাগে কারণ, তাঁর গল্প নিয়ে ক্রিটিক করা যায়, কথা বলা যায়, আড্ডা দেওয়া যায়, আলাপ তোলা যায়। এমন কিছু লেখেন না যেটা পড়ে শুধু 'ভালো' বলে চুপ থাকতে হয়।
Profile Image for Mohammad Kamrul Hasan.
353 reviews16 followers
April 6, 2021
অসাধারণ প্রতিটা গল্প। সময় পেলে রিভিউ করবো ইনশা আল্লাহ।
Profile Image for তানভীর রুমি.
119 reviews62 followers
January 16, 2021
এই যে বইটা পড়ে শেষ করে আসলাম গতোকাল ট্রেনে, শুরু করেছিলাম আরও আগে। টুকরো টুকরো মিলিয়ে দৈনিক একটা গল্প আকারে শেষ করছিলাম, তারপর গতোকাল ট্রেনের ঝাকুনিতে বাকিথাকা রক্তিম গ্লাসের অর্ধেক তরমুজ মদ এক বসায় কয়েক চুমুকে খেয়ে ফেললাম।

পিঁপড়�� গল্পটা পড়েছিলাম আগে। সরল রাজনৈতিক বক্তব্য মূল উপজীব্য, গল্পটা শেষ হলে বোঝা যায় গল্পটা জানা, কিন্তু আমার চোখে পড়ে এর অন্য একটা দিক- ভোটটা চাওয়া হচ্ছে এক মৃত মানুষের কাছেই।

মেয়েটি সাগ্রহে প্রশ্ন করল গল্পের সাগ্রহ প্রশ্নটা যে কি শেষমেশ জানা যায় কিন্তু ধাক্কা লাগে না, যদিও ধাক্কা লাগার মতো ছিল প্রশ্নটা। অথচ দীর্ঘ গল্পে, গল্পের শুরুর পরিচ্ছেদ থেকে পড়ে আসতে আসতে, আস্তে আস্তে আমি মানিয়ে নিয়েছি যে মৃত্যু বা আমিষ হিসেবে মানুষ খাওয়া যায় কি না- আমাকে বা আমার সত্ত্বাকে আর নাড়া দেয় না। দুর্ভিক্ষের গল্প আমি জীবনে খুব একটা পড়িনি, এবার পড়েও কোনো নাড়া দিলো না, কারণ সত্যজিৎ কিংবা নরেশ এর মতো এসব আমাদের ছোয় না, বইয়ের পাতায় আহা উহু ছাড়া।

হৃৎপিণ্ডের ঘ্রাণও একটা রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার গল্প। শামসুল আলমের সাময়িক অন্ধত্ব স্থায়ী না হওয়ার যে আক্ষেপ- সেই আক্ষেপ আমাদের টেনে নিয়ে যায় অর্ধ বিবেকের দিকে, যে বিবেক মানসিক পীড়া দেয় ঠিকই কিন্তু আত্মরক্ষা ভুলে গিয়ে আমরা কখনও বিবেকের তাড়নায় সঠিক কাজটা করতে পারিনা। ফলাফল হিসেবে একসময় অনেক কিছুর নগ্নতা চোখে এসে পড়ে এবং অন্ধত্ব প্রাপ্তির আক্ষেপে নিমজ্জিত হয়ে উঠি।

ল্যাম্পপোস্ট অন্ধকারের গল্প। রাতের অন্ধকারে সরকারি আলোটুকু হারিয়ে গেলে যে অন্ধকারটুকু সৃষ্টি হয় জীবনে, সেই অন্ধকারের গল্প। এতো নিকষ অন্ধকার যে নবজাতক কিংবা সাড়ে চার বছর বয়সী ক্ষুধার্ত সন্তানের মুখে স্তন পুরে দিতে হয়, আলোতে যেটা সম্ভব ছিল না। আলোকিত মানুষদের কাছে এটা অশ্লীল।

বিচার গল্পের রাজার বিচারে খারাপ লোকেরা রাজাকেই অভিযুক্ত করলে রাজার মুখে দেখা যায় রহস্যময় হাসি৷ পুণ্যবাণরা আগেই চলে গিয়েছে একবছরের উপহার নিতে। কিন্তু পাপীরা কি শাস্তি পাবেনা? এই বিচার ন্যায় হবে না-কি অন্যায় এটা ভাবতে ভাবতেই আবারও ভুল করে ফেলি, বিচার করার ক্ষমতা যে কেবল রাজার সে কথা ভুলে যাই।

কোকিলপেয়ারি জমিদার বাড়ি এই সময়ের সবচেয়ে সহজ বাস্তবতার গল্প। এই গল্পকে বেশি না খুঁড়ে শুধু এটুকু বললেই বলা হয়ে যায়, বিনয় কিংবা ভালোমানুষি মানুষের পছন্দ নয়। তারা সেটা মেনে নিতে পারে না। তাই আসল জমিদার না হলে জমিদারি টেকে না।

রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ গল্পে আমরা দুজনকে পাই, যে দুজন এখন ফেসবুক পাড়ার এস্থেটিকস এ কাঠগোলাপের সাথে অবস্থান করছেন- ভ্যান গগ আর জীবনানন্দ। দুজনের মাঝে যে আলাপ হয় সে আলাপে ছবি আর কবিতার- এক কথায় শিল্পের অন্ধকার দিক দেখি, যে কথা আবার বুকোওস্কি বলেছেন, ‘কান নয় ভ্যান, বেশ্যারা চায় টাকা’। বুকোওস্কির সাবধান বানী ভ্যান গগ জানতেন না বোধহয়, জানলেও হয়তো ভাবান্তর হতো না। হেলাল হাফিজের বাম হাতের মতো বাম কান তিনি তাও কেটে দিতেন। যেভাবে কেটে গেল জীবনানন্দের শোভনার সাথে চুমু খাওয়ার ক্ষণ, পলকেই। ব্রোথেল থেকে ক্যাফে, জীবনানন্দ সবখানেই একা। এই একাকিত্বের সাথেই সঙ্গম কর‍তে করতেই কি তার কবিতা? আর চব্বিশোর্ধ এক মজনুনের রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ?

অলমোস্ট অটোবায়োগ্রাফি প্রথম পুরুষে লেখা গল্প যেখানে যৌনতা দিয়ে প্রকৃতির মেটাফোর আসে আর প্রকৃতি দিয়ে দেয়া হয় যৌনতার মেটাফোর। মানুষ আত্মহত্যা কেন করে এর ব্যাখ্যায় ওয়ালিদ প্রত্যয়ের প্রস্তাবনা আমার ভালো লেগেছে, অনেক আগে মরে যাওয়া লাশ যখন বহন করতে পারে না মানুষ, তখন শারীরিকভাবে মারা যায় মুক্তিলাভের আশায়। আর মানসিক লাশ থেকে শারীরিক লাশ হওয়ার মাঝের জার্নিটা একাকিত্ব।
এরপর ওয়ালিদ প্রত্যয় যখন তার সঙ্গী কবিকে নিয়ে কবির প্রেমিকার সাথে দেখা করতে গেল, যে প্রেমিকার কোলে সদ্য জন্মানো সন্তান। সেই সন্তান কার?
প্রেমিকার সাথে কবিকে রেখে প্রথম পুরুষ যখন বেলকোনিতে দাঁড়ায় তখন কবির শ্রেষ্ঠ কবিতা লেখার সম্ভাবনা শেষ করে দিয়ে তার প্রেমিকা শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে পোলাওয়ের দাওয়াত দেয়।
কবি কি শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখতে পারে? অমরত্ব কে তাচ্ছিল্য করা কবি নিজের অজান্তেই লিখে ফেলেন, প্রথম পুরুষ কবিকে যখন সেই দৃশ্য দেখিয়ে দেন তখন কবির চোখে আফসোস।
লেখক কিংবা কবি জীবনের এই তো নিজস্ব পরিণতি, তাই না?

জলের দেশে স্থলপদ্ম পঁচিশ পৃষ্ঠার একটা প্রথম পুরুষের গল্প, যে গল্পের প্রথম পরিচ্ছেদে গ্রামের নুরু পাগলার মুখ দিয়ে বের হওয়ার আগেই প্রশ্নটা নিজের মাথায় তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী একটা সময়ের গল্প উঠে আসে, প্রথমে পরিবারের তারপর রাজনীতির। আবার অবশ্যম্ভাবী একটা মোড় নিয়ে শেষে সেই গল্প পরিবারেই গিয়ে ঠেকে এবং আমরা দুই পিতাকে আবিষ্কার করি যার একজন জানে না তার পুত্র জেলে এবং যে পুত্রের জন্য তিনি নিজের ঔরসে কখনও বাবা হওয়ার ইচ্ছা রাখেননি, আরেকজন পিতা পুত্র হওয়ার আগে স্ত্রীর সাথে নাম নিয়ে তর্ক করেছেন অথচ পুত্র হওয়ার পর তার আর তর্ক করে লাগে না। নিজের ইচ্ছামতো সেই নামটা তিনি এখন ঠিক করতে পারবেন। এখানে আর প্রথম পুরুষের কিইবা করার থাকতে পারে! সে হয়তো শুধু চায় একটা আঙুলের হাড় পেয়ে যাক জলিলও, যে স্বৈরচারী জালিমের মুখে প্রস্রাব করতে চেয়েছিল।

নয়টা ছোটগল্পের ভিন্ন ভিন্ন কাহিনী আর কাহিনীর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন লেয়ার, যৌনতার মোড়কে একাকিত্ব আর অশ্লীল ভিডিও দৃশ্য দেখার সময় অন্ধত্বের যে আকুতি- ওয়ালিদ প্রত্যয় এর কলমে সেসব সুররিয়াল দৃশ্য তৈরি হয় যে পড়তে পড়তে আর ভাবতে ভাবতে ট্রেনের ঝাকুনি ভুলে থাকা যেতে পারে। ওয়ালিদ প্রত্যয় এর কাছে যে আরও অনেক কিছু আশা করেছি- এ কথা যেমন বহুলাংশে সত্যি তেমনই সত্যি কিছুটা মেদ থাকলেও লেখাগুলো দৃশ্যমান গল্প হয়ে ওঠে, যে গল্পে ঝমঝম করে ঘুরে আসি দুর্ভিক্ষ থেকে একাত্তর আর জীবনানন্দ এর ছোটঘরে।

ওয়ালিদ প্রত্যয়, চব্বিশোর্ধ এক যুবক, লিখে ফেলেন সেসবই যেসব লিখতে না পেরে আমি একা হয়ে যাই নিজের কাছে।
This entire review has been hidden because of spoilers.
1 review
Read
January 19, 2021
ওয়ালিদ প্রত্যয় ভাইয়ের নতুন গল্পের বইটি পড়লাম।কিছু কিছু বই আছে যেগুলো পড়লে গল্পের রেশ ও অনুরণন থেকে যায় অনেকদিন।সেই রকম একটি বই হলো জলের দেশে স্থলপদ্ম।লেখক এই বইয়ে মোট নয়টি গল্প লিখেছেন।প্রথম গল্পটি হলো পিপঁড়া।এই গল্পটি আগেই আমি ফেইসবুকে পড়েছিলাম।পুঁজিবাদী জামানায় ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য মানুষ কতটা ব্যক্তি কেন্দ্রিক হতে পারে এবং ভোগবাদী হতে পারে তারই একটি চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে সুন্দর কিছু মেটাফোর দিয়ে।ওয়ালিদ প্রত্যয় ভাইয়ের প্রায় প্রত্যেকটা গল্পের শেষে এমন একটা থ্রিল এনে দেয় যা পাঠককে চমকে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট এবং গল্পের মূল আকর্ষণ যেনো এখানেই।

এরপরের গল্পটি হলো" মেয়েটি সাগ্রহে প্রশ্ন করল"এই গল্পটি আমার কাছে ভালো লেগেছে কেননা বাংলার দুর্ভিক্ষ কিংবা মন্বন্তর নিয়ে আমি দুই একটি বই পড়েছিলাম ইতিহাস ভিত্তিক।তৎকালীন অবস্থা প্রেক্ষাপট নিয়ে টুকটাক জানা শোনা থাকলেও এই গল্পের মতো এতো স্বাদ নিয়ে পড়তে পারি নি।এই গল্পটি পড়ে আমার একধরনের কষ্ট ও মায়া তৈরি হয়েছে গল্পের চরিত্রগুলোর প্রতি।

"হৃদপিণ্ডের ঘ্রাণ" গল্পটি একটি সামাজিক ও পারিবারিক ঘটনার উপাখ্যান।গল্পের চরিত্র শামসুল আলম মাঝে মাঝেই অন্ধ হয়ে যান এবং সেটা বেশিক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হয় না।উনার এই অন্ধত্বের সময় পৃথিবীতে ঘটে যায় কত শত ঘটনা,ক্ষমতার অপব্যাবহার।কিন্তু হঠাৎ এমন একটি ঘটনা যা উনার নিজের জীবনের সাথেই ঘটে এবং তিনি পুরোদস্তুর নিজের অন্ধত্ব কামন��� করেন।

"ল্যাম্পপোস্ট" নামক গল্পটি মুসাফিরের মত বসবাসরত একটি ছোট তাবুর সংসারের অসহায়ত্বের চিত্র।যেখানে ল্যাম্প পোস্টের নিচে সোডিয়ামের আলোয় করুন জীবনের ইতিবৃত্ত দেখানো হয়েছে।

"বিচার" গল্পে অসাধারণ কিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে যা বরাবরের মতোই অন্যান্য গল্পের মত সুন্দর।লেখক এই গল্পে রাষ্ট্রের কাছে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন যা চমকপ্রদ এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে যারা পা�� করেছেন তাদের বিচার করতে গিয়ে রাজাই দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন।আসলে মূল অপরাধ কি?বা অপরাধীরা কেনো অপরাধ করে?

"কোকিলপেয়ারি জমিদার বাড়ি" গল্পটি প্রথাগত জমিদারির একটা ব্যবস্থাপত্র বলা যায়।সেই ব্যবস্থা পত্রের একমাত্র ওষুধ হলো সেগুন গাছের ডাল দিয়ে নকশা খচিত লাঠি।এই লাঠি ব্যবহার করেই প্রজাদের বিচার কার্য ও খাজনা আদায় করা হতো।কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই জমিদারি পবিত্র কুমার চৌহান লাঠির পরিবর্তে ভালোবাসা দিয়ে শাসন করতে চেয়েছিল।কিন্তু তিনি আসলেই কি তা পেরেছিলেন।সেটা জানতে হলে পড়তে হবে বইটি।

"রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ" গল্পটি জীবনানন্দ ও ভ্যান গগের সাথে সাক্ষাত হবার একটি গল্প তুলে ধরা হয়েছে।গল্পের সংলাপে যেনো মাতাল হতে হয় পাঠককে।

"অলমোস্ট অটো বায়োগ্রাফি" গল্পটা অনেকটটা রূপকথার গল্পের মত মনে হলেও যেনো বাস্তভিত্তিক একটা আবহ তৈরি করে। গল্পে বিভিন্ন সময়ে পরিভ্রমণ করার ব্যাপারটা আমাকে আনন্দিত করেছে,যেমন:রিক্সাওয়ালাকে বলা হলো ১৯৭১ সালে যাবেন কিনা যেখানে কবি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতাটা লিখতে চান।

"জলের দেশে স্থলপদ্ম" গল্পটি এই বইয়ের সবগুলো গল্পের চেয়ে বেশি সুন্দর।এই গল্পটি পড়ে আমি কিছুক্ষন চোখ বুঝে ছিলাম এবং আমি নিজেকে ওই জলের দেশের একজন মনে করছিলাম।এই গল্পের প্রথম অংশটুকু মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত।প্রথমে পরিবারের ও পরে রাজনীতি নিয়ে।মূলত দুইটা পরিবারের গল্প উঠে এসেছে।এক পরিবারের বাবা যিনি মৃত স্ত্রীর হাতের আঙ্গুল বুক পকেটে রেখে কাটিয়ে দিতে চায় আজীবন।আরেক বাবা স্ত্রীর সাথে সন্তানের নাম রাখা নিয়ে খুনসুটি করছেন।কিন্তু তিনি জেলখানায় বসে জানতে পারে না তার সদ্য জন্মানো সন্তানের আম্মা মারা গেছেন,যেই স্ত্রীর সাথে তর্ক করেছিলেন সন্তানের নাম রাখা নিয়ে।কিযেন এক অদ্ভুত শূন্যতা ও মায়া হয়ে যায় গল্পের চরিত্রগুলোর প্রতি।

পাঠ প্রতিক্রিয়া:এতক্ষণ আমি যা লিখেছি সেটা কখনোই এই বইয়ের পূর্ণাঙ্গ রিভিউ না।আসলে একেকটা গল্প একেক জনকে একেকরকম ভাবে দোলা দেয়, নাড়া দেয়।
সত্যি বলছি আমি এই বইয়ের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি নি ঠিক ভাবে।ওয়ালিদ ভাই জানেন কিনা,আপনার প্রত্যেকটা গল্প পাঠককে ধরে রাখতে পারে।একটা গল্প শুরু করলে শেষ না করে উঠা যায় না।
এইবার আসি,এই বইয়ে কিছু জায়গায় বানানে টাইপিং মিসটেক চোখে পড়েছে।দুইটা গল্প খুব সাধারন লেগেছে, ডিপ তেমন কিছু পাই নি।এছাড়া সব গুলো গল্পই চমৎকার। ভোগাবাদিতা,দুর্ভিক্ষ,ক্ষুধা,মানবিক,সামাজিক,রাজনৈতিক,মুক্তিযুদ্ধ,কবি জীবনানন্দ,ঐতিহাসিক জমিদারি প্রথা সব কিছুই এই বইয়ে পাওয়া যাবে।আশা করি পাঠক এই গল্পের বইটি গোগার্সে গিলতে পারবে। জাদু বাস্তবতা দিয়ে মোহের ঘোরে মাতাল করবে সকল শ্রেণীর পাঠককে।
Profile Image for Dipak Karmoker.
68 reviews2 followers
August 29, 2024
এবারের একুশে বইমেলায় নালন্দা হতে প্রকাশিত লেখক ও কবি ওয়ালিদ প্রত্যয়ের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ—‘জলের দেশে স্থলপদ্ম’, নয়টি ভিন্ন স্বাদের মদের মতো গল্প নিয়ে রচিত এই বইয়ে আমরা একজন পরিণত (আরও পরিণত হবে) ওয়ালিদ প্রত্যয়কে খুঁজে পাই, যাঁর লেখার সময় ব্যবহৃত সিগারেটের ধোঁয়া—বই পড়ার সময় পাঠকের ফুসফুসে এসে আঘাত করে। বঙ্গদেশের লেখকরা হৃদপিন্ডমুখী হলেও তিনি ফুসফুসমুখী, ক্ষেত্রবিশেষে তা লিভার অব্দি গড়ায়।

তাইতো আমরা শুরুতেই পাই ‘পিঁপড়া’র মতো রাজনৈতিক গল্পের। গল্পের শেষের একটিমাত্র সংলাপ দিয়ে লেখক যেন অজস্র সত্য কথা বলে ফেললেন, চিরায়ত রাজনীতি ব্যাখ্যার জন্য এর চেয়ে ভালো কথা আর হতে পারে না।

দ্বিতীয় গল্প ‘মেয়েটি সাগ্রহে প্রশ্ন করল’—নাম শুনে মনে হবে প্রেমের গল্প। আদতে দুর্ভিক্ষের গল্প। গল্পের শুরুতে চরিত্রগুলোর কথোপকথনের সময় গাঁদা ফুলের নীরবে ঝরে যাওয়া দিয়ে কি এক একটা দরিদ্র মানুষের মৃত্যু এবং তা যে সমাজের উঁচু স্তরের মানুষের কানে পৌঁছায় না—তাকেই বোঝানো হয়েছে? হবে হয়ত। লেখক দুর্ভিক্ষের যে করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তা এই সময়ে বসেও পেট ভরে খেতে পারার জন্য মনের অধ্যে অপরাধবোধ সৃষ্টি করে! তবে এই গল্প নিয়ে কয়েকটা জায়গায় খটকা আছে—
গল্পের ঘটনা প্রবাহ ১৯৪৪ সালের, চালের দাম বলা হচ্ছে পনেরো টাকা মণ। কিন্তু তেতাল্লিশের মে থেকে চালের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শুরু হয়, তা ৫০-৬০ টাকা থেকে ১০০ টাকায়ও (ঢাকায়) উন্নীত হয়। তাছাড়া মূল দুর্ভিক্ষ ছিল ’৪৩, সে বছরেই সবচেয়ে বেশী মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়, ’৪৪-এ প্রধানত কলেরা, বসন্ত ও ম্যালেরিয়াতে মানুষ মারা যায়। গল্পে একটা সংলাপ এরকম—‘পত্রিকায় পড়েছি ‘৪২ সালে আমাদের খাদ্যশস্য যথেষ্ট পরিমাণেই ছিল।’ এর মানে বিয়াল্লিশেও দুর্ভিক্ষ ছিল। কিন্তু ‘৪২-এ সবে দুর্ভিক্ষের বীজ বপন হচ্ছে, দুর্ভিক্ষ প্রধানত শুরু হয় ‘৪৩-এ। আর খাদ্যশস্য যথেষ্ট পরিমানে আছে এটা প্রমাণ করেন অমর্ত্য সেন, সেটা ৪২-৪৩ সালের দিকে না, আরও অনেক পরে, দুর্ভিক্ষের সময় উনার বয়স ছিল নয়-দশ বছর। অর্থাৎ ‘৪৪ সালে বসে এই তথ্যটা জানা সম্ভবপর নয় বলেই আমার ধারণা। ‘৪৪ সালে বসে গত বছরের অর্থাৎ ৪৩ সালের অক্টোবরের ঘূরণিঝরের কথা বলেছেন, কিন্তু ঘূর্ণিঝর হয় ‘৪২ এর অক্টোবরে। আরেকটা কথা, সত্যজিৎ এর বাড়িতে মুরগী খাওয়ার আয়োজনের কথা বলেছেন, যেটা রান্নার দায়িত্বে রয়েছেন তার স্ত্রী ও মা। কিন্তু যে সময়ের গল্প এটি সে সময়ে হিন্দুরা খাসি/পাঠার মাংস ছাড়া আর কোন মাংস খায় না, মুরগী তখন প্রায় অচ্ছুত ছিল। এমনকি সত্তর-আশির দশকেও হিন্দু বাড়িতে মুরগী সেভাবে প্রবেশ করা শুরু করেনি।

এর পরের গল্প ‘হৃদপিণ্ডের ঘ্রাণ’—গল্পটা এই সময়ের গল্প কিন্তু অপ্রতিবাদী শামুক শ্রেণির শামসুল আলম বা কমিশনারের হিংস্র ছেলে বা শামসুল আলমের বড় মেয়ের চিরায়ত লম্পট প্রেমিক—তারা এই সময়ের না, তারা সব সময়ের।

তেমনি ‘ল্যাম্পপোস্ট’ গল্পের মানুষগুলো তারাও চিরকালীন, যেখানে অভাব, অভাব এবং অভাব, তবুও নতুনের জন্ম হয়, কিছুই না থাকার ভেতরেও তাদের একটা ল্যাম্পপোস্টের আলোর বড় শখ হয়!

‘বিচার’ গল্পে আমরা দুনিয়াটাকে দেখবো অপরাধীর চোখ দিয়ে, কেন একজন অপরাধ করছে সেই বিবেচনা থেকে। এবং একসময় এও মন হতে পারে পাপ-পুণ্য বলে কি আদৌ কিছু আছে? যদি নাই থাকে তাহলে কে কার বিচার করবে? রাজা জনগণের, নাকি জনগণ রাজার?

‘কোকিলপেয়ারি জমিদার বাড়ি’র গল্পটি সাধারণ মোড়কে একটি শিক্ষণীয় গল্প। গল্পের কয়েকটি স্তর আছে, যেটা আপনাকে একেকবার একেক সিদ্ধান্তে উপনীত করবে। তবে সবশেষে সারমর্মটুকুও বোঝা চাই।

‘রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ’ আমাদের এটায় বোঝায় যে শিল্পের সাধনা করতে গেলে নিঃসঙ্গ হতে হয়। সঙ্গ পাবার আশা করলেও সে সঙ্গ বেশীক্ষণ সহ্য হয় না, ফলে নিঃসঙ্গতাকেই আকড়ে ধরে মড়ার মতো বাঁচতে হয়। লেখক যেন সেই নিঃসঙ্গতা কিছুটা কমিয়ে জীবনবাবু ও ভ্যন গঘ-কে একটু কথা বলার সুযোগ করে দিলেন!

‘অলমোস্ট অটবায়োগ্রাফি’ হলো একটি জাদুকরী গল্প। আমি লেখকের লেখার সাথে যতটা পরিচিত আছি, তাতে বোঝা যায় এটাই হলো লেখকের নিজস্ব ধরণ। এ ধরণের গল্প পড়ার পরেই মনে হয় আমরা তাঁর কাছ থেকে নতুন কিছু পেতে যাচ্ছি। রিকশায় চড়ে একাত্তর সালে যাওয়াটা এবং রিকশাওয়ালার সাথে দড় কষাকষি পুরো গল্পের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা বলে আমার মনে হয়েছে।

সর্বশেষ গল্পটি ‘জলের দেশে স্থলপদ্ম’—যেটা গল্প না হয়ে একটা উপন্যাস হতে পারত��! মায়ের মৃত্যু দিয়ে যে গল্প শুরু হয়ে সে গল্পে মায়ের চেয়ে একসময় বাবা প্রধান হয়ে ওঠেন। বাবার কাছে আবার তার স্ত্রীই প্রধান হয়ে আসেন। কীভাবে আসেন? সেই আসার গল্পটা যেন অনাকাঙ্ক্ষিত! আমার মুক্তিযুদ্ধের গল্প পাই, আবার স্বাধীন দেশে পরাধীনতার বিপক্ষে আন্দোলন দেখতে পাই। আমার মনে হয়েছে এই গল্পটা নিয়ে কথা বলার আগে এই গল্পটা নিয়ে আমার অনেক ভাবতে হবে, ভাবতে হবে গল্পের নাম নিয়ে, প্রচ্ছদের ছবিটা নিয়ে। এমন গল্পই তো লেখা চাই, যে গল্প পড়ে লেখককে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে, কী বোঝাতে চেয়েছেন—
এত এত কান্না আমাদের, এত এত রক্তক্ষরণ পেরিয়েছি যে একসময় আমরা আর কাঁদি না, জলের দেশে আমরা বেঁচে থাকি স্থলপদ্মের মতো! এমন কিছু?

আমি চাই না লেখক বিখ্যাত হোক, তাঁর আশেপাশে থাকুক চ্যালা, যা লিখবে তাকেই কালজয়ী আখ্যা দিবে, এরকম হোক তা চাই না। আমি চাই লেখক আরও নিঃসঙ্গ হোক, আরও ভাবুক এবং তাঁর হাত ধরে সোনা ফলুক।
Profile Image for Shojjoti Hossen.
30 reviews2 followers
February 4, 2021
" জলের দেশে স্থলপদ্ম " বইটি পড়ে শেষ করেছি বেশ কিছুদিন আগেই। বইটি নয়টি ছোট গল্পের সমন্বয়ে গঠিত। দুটি গল্প লেখক আগে সোশাল মিডিয়া সাইডে দিয়েছিলেন বাকি সাতটি গল্প একদম নতুন। "জলের দেশে স্থলপদ্ম" বইটি পাঠের মাধ্যমেই ওয়ালিদ প্রত্যয় এর লেখার সাথে আমার পরিচয়। ওনার লেখা আমি এই প্রথম পড়ি এবং ওনার লেখার ধরণ বেশ ভালোও লাগে । তো গল্প গুলো নিয়ে একটু বলি। তার আগে বলি, লেখক গল্পগুলো শুরু করেছেন একটা গল্পের মাধ্যমে, গল্প দিয়ে গল্প শুরু এটা বেশ মজার এবং থ্রিলিং ছিলো।

বইটির প্রথম গল্প ' পিঁপড়া ' । পিঁপড়া গল্পে দেখা যায় নিজের লাশ নর্দমায় ভেসে থাকা অবস্থা ব্যক্তি দেখতে পাচ্ছে। নর্দমায় ভেসে থাকা তার লাশের সাথে পিঁপড়ার কথোপকথন। লাশ তথা তাকে খাওয়া নিয়ে পিঁপড়ের রাজনীতি। এ গল্পটিতে লেখক নাম পুরুষের ব্যবহার করেন।

দ্বিতীয় গল্পটি হচ্ছে ' মেয়েটি সাগ্রহে প্রশ্ন করলো '। প্লট টিতে দুর্ভিক্ষের সময়কার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। দূর্ভিক্ষে একদিকে যেমন উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষেরা বাড়ি বসে মাংস রান্না করে আনন্দ করে খায়, পরিবারে নতুন সদস্য আশার আনন্দে মেতে ওঠে। অন্যদিকে তেমনি হাজার হাজার পরিবার এই দূর্ভিক্ষে না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে। কেউ আবার গল্পের নামের মতো প্রশ্ন করে বসে! বেঁচে থাকার আসল লড়াই অস্তিত্ববাদকে টিকিয়ে রাখার জন্যই ' মেয়েটাও সাগ্রহে প্রশ্ন করে '।

' হৃৎপিণ্ডের ঘ্রাণ ' নিতান্ত সাধারণ মানুষ শামসুল আলমকে নিয়ে লেখা। যে হঠাৎ করে কিছুক্ষণের জন্য অন্ধ হয়ে যায়৷ গল্পটিতে সমাজের ক্ষমতাশীল মানুষের ক্ষমতার ব্যবহার আর শামসুল আলমের অন্ধ ভিক্টিম হয়ে থাকার কথা বলা হয়। তারপর লেখকের গল্পের মোড় নেয় ক্ষমতাবানেরা তার ক্ষমতার ব্যবহার করে যায় তখন সে দৃশ্য না দেখার জন্য শামসুল আলম চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতে চায়। কিন্তু পারেনা। লেখক হয়ত শামসুল আলমের এই দৃশ্য দেখে চিরঅন্ধত্ব চাওয়ার সাথেই হৃৎপিণ্ডের ঘ্রাণটা শুনতে পায়!!

পরবর্তী গল্পটি হচ্ছে ' ল্যাম্পপোস্ট '। ল্যাম্পপোস্ট গল্পটিও লেখক নাম পুরুষের ব্যবহারের মাধ্যমে লেখা শুরু করেন। তবে হুট করে লেখক ন্যারেশন চেঞ্জ করে উত্তম পুরুষে চলে যান। এ গল্পটি পুরোটা সাজিয়েছেন লেখক অন্ধকারে৷ ল্যামপোস্টের আলোয় সংসার করা, রান্না করা, রাতের খাবার খাওয়া ৷ সবচেয়ে মূল থিম ছিল রাতের অন্ধকারে ল্যাপপোস্টের আলোর নিচে ক্ষুদার্ত চার বছরের বাচ্চার মুখে স্তন দেওয়া।

'বিচার' গল্পটি তে যুবকটি বিচারের আগে প্রশ্ন করে বসে সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে। এ সব প্রশ্ন হয়ত সকলেরই। কিন্তু সহসের জোরে যুবকটা যখন প্রশ্ন করে রাজাকে তখন রাজা শাস্তি দেওয়ার বদলে চিন্তায় পরে যায়, আসলে মানুষ অপরাধ করে কেন? লেখকের এখানে বেশ কিছু প্রশ্ন করার মাধ্যমে তার সাহসীতার প্রকাশ পায়।
গল্পটিমে পরকালের বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছে সৃষ্টিকর্তাকে প্রশ্ন করা নিয়ে৷ এ ব্যপারটা ব্যক্তিগত ভাবে আমার একটু দৃষ্টিকটু লাগলেও প্রতীকী অর্থে ধরে নেওয়ার পর আমার কাছে গল্পটা বেশ লেগেছে৷ আসলেই তো মানুষ অপরাধ করে কেন?

' রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ ' গল্পটি এই বইয়ে আমার সবচেয়ে পছন্দের একটি গল্প। বইটির ফ্লাপে এ নিয়ে পড়ার পর বইয়ের প্রতি আগ্রহটা আরো বেশি ছিলো। আর যখন গল্প পড়া শুরু করলাম বুঝতেই তো পারছেন উত্তেজনার কোন পর্যায়ে ছিলাম। গল্পটিতে জীবনানন্দের সাথে ভ্যান গগের দেখা হয়৷ তারা আড্ডা দেয় সাথে রক্তিম গেলাসে তরমুদ মদ। দুজন একাকীত্ব বরণ করে নেওয়া একা মানুষ গল্প করে তাদের প্রথম চুমু নিয়ে। জীবনানন্দ যার সাথে দেখা হলে বলতে চায় " ময়না, তোরে ছাইড়া থাহোন যায়না "। তারা গল্প করে ভিনগগের চিত্রকলা আর জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে। তারপর আবার আলাদা হয়ে যায় তারা৷ একাকীত্ব বরণ করে দুজন মানুষ আবার চলে তাদের সৃষ্টির পথ ধরে।
[ যদিও বাস্তব জীবনে ভ্যান গগের সাথে কখনোই জীবনানন্দের দেখা হয়না। ভ্যানের মৃত্যুর ন'বছর পরে জীবনানন্দের জন্ম ]

এ গল্পটি আমার অসম্ভব ভালো লাগেছে। যা নিয়ে হয়ত আমি আরো অনেকক্ষণ লিখেও শেষ করতে পারব না। বইয়ের এ পর্যায়ে এসে ওয়ালিদ প্রত্যয়ের প্রতি , তার লেখার মাত্রার প্রতি আমার আরো ভালো লাগা কাজ করে।

তারপরের গল্প ' অলমোস্ট অটোবায়োগ্রাফি ' গল্পটাতো অন্যমাত্রা যোগ করে বলা বাহুল্য। লেখক আগেই বলেছেন তিনি গল্পটি শতভাগ Panster হিসেবে লিখেছেন। এখানে তার লেখার মান বিচার করা যায়। গল্পটিতে তিনি একজন লেখক এবং একজন কবির চিত্র তুলে ধরেছেন। যে কবি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখার জন্য ঘুরে বেড়ায় - " কখনো আশি টাকার বিনিময়ে রিক্সার একাত্তরে গমন, কখনো আবার রাধিকাপুরের অঞ্জন দত্তের গান, পাগলিনী মায়ের একাত্তরের যুদ্ধে যাওয়া ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষা। " কবি তখনো তার শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখার খোঁজে ঘুরে বেড়ায়৷ অবশেষে সে তার হাজার লেখার ভীরে তার লেখার শ্রেষ্ঠত্ব খোঁজে পায় সে ছেলে হারানো সেই পাগলিনী মাকে তার ছেলের চিঠি বলে চালিয়ে দেওয়া তার লেখা সে চিঠির মাঝে। অশ্রুভেজা চোখে মা যখন বলেন আমার ছেলে চিঠি দিছে সে আসবে...

বইটির শেষ গল্প এবং নাম গল্প " জলের দেশে স্থলপদ্ম "। গল্পটি বেশ সুন্দর এবং একটার পর একটা ধাক্কা দিয়ে গেছেন লেখক গল্পে৷ কাজলের বাবা মতিনের গল্প, কাজলের মা হারানো, বন্যায় কবর থেকে ভেজে ওঠা লাশের সাথে কাজলের বাবার কথামালা, শার্টের বুক পকেটে মৃত্য স্ত্রীর আঙ্গুলের লাশ নিয়ে ঘুরা আরো অনেক কিছু। পুরো গল্পটি পড়লে বুঝা যাবে কত সুন্দর যে গল্পটি! বুঝা যাবে কিভাবে এটি নাম গল্প হওয়ার যোগ্যতা নিয়েছে !
Profile Image for Nahid Ahsan.
Author 5 books8 followers
May 4, 2021
বইয়ের ফ্ল্যাপে প্রথমেই চোখে পড়ে - 'আমি দেখতে চেয়েছিলাম -- জীবনানন্দ দাশের সাথে ভ্যান গগের দেখা হয়ে গেলে তাঁরা কীভাবে আড্ডা দেবেন!'

এক লাইন পড়েই আমি অবাক হই। একজন তরুণ লেখক, যার বয়স এখনও ত্রিশের কোটা স্পর্শ করেনি, সেই মানুষটা কেন এই অদ্ভুত জিনিস দেখতে চেয়েছে তা নিয়ে আমি অবাক হই। আমি পড়তে থাকি, দ্বিতীয় লাইন -- তৃতীয় লাইন -- চতুর্থ লাইন...

আমি হার মেনে নেই প্রথমেই। কল্পনাশক্তির তীক্ষ্ণতা দেখে থ হয়ে বসি, এক বসায় এই বই আমার শেষ করতেই হবে। একের পর এক অদ্ভুত কিসিমের ঘটনা সামনে আসে, আমি বুঁদ হয়ে পড়তে থাকি এবং ভাবতে থাকি এই লেখাগুলো নিজে নিজে আবিষ্কৃত হয়েছে কি না!

একজন মানুষের - চায়ের কাপ হাতে নিয়ে অপেক্ষা না করেই প্রথম চুমুক দিতে যতটা সময় লাগে তার চাইতেও কম সময়ে যখন আমি ভূমিকায় এসে উপস্থিত হই -- তখন দেখতে পাই এই গল্প নিজে নিজে আবিষ্কৃত হওয়ার ব্যাপারে লেখক তার অনুভূতি ব্যক্ত করে ফেলেছেন। আমার সাথে লেখকের এই ধারণা মিলে যাওয়ায় আরও অবাক হই। পৈশাচিক আনন্দ হতে থাকে। কেন? -- রিভিউয়ের শেষে উল্লেখ করব।

" গল্প লিখতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, কেউ আসলে নিজে ঠিক করতে পারে না যে -- আজ থেকে আমি লিখব, আমি লেখক হবো। বরং অপার্থিবভাবে লেখা নিজেই একজন উপযুক্ত মানুষ খুঁজে বের করে, যার মাধ্যমে ওরা পৃথিবীতে অবতীর্ণ হতে চায়। লেখা নিজেই খুঁজে বের করে এমন একজন মাতাল মানুষকে, লেখা নিজেই নিজের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করার জন্য ওই মাতালের উপর ভর করে। আমি লিখছি, লিখে চলছি, শুধু এটা জানার জন্য -- লেখাগুলো পৃথিবীতে আসার জন্য আমাকে বেছে নিয়েছে কি না! যদি কখনো জানতে পারি, ওরা আমাকে বেছে নেয়নি, আমি জোর করে ওদের জন্ম দিয়েছি, বৃদ্ধ দারোয়ানের ঘুম ঘুম চোখের কসম -- আমি সেদিন থেকে লেখালেখি ছেড়ে দেব। "

এই লেখাটুকু গল্প শুরুর আগে গল্প নিয়ে লিখেছেন ওয়ালিদ প্রত্যয়, যিনি কখনো সমুদ্রের পাশে পাহাড় কিংবা তিন প্রহরের বিল দেখেননি যেখানে সাপ আর ভ্রমর খেলা করে। তিনি সাপ আর ভ্রমরের খেলা দেখেছেন মাস শেষে মধ্যবিত্ত বাবার বুক পকেটে। এমন একজন লেখক যার চিন্তাভাবনায় আমি নিজেকে এখনও থিতু করতে পারছিনা তার লেখা পড়তে শুরু করলাম এক বিশাল আশা নিয়ে।

সবকিছু এক পাশে রেখে ওয়ালিদ প্রত্যয়ের লেখা নয়টা গল্প যখন আপনি একটার পর একটা পড়তে থাকবেন তখন যেন আপনার মধ্যে নতুন নতুন জীবন দেখতে পাবেন এবং একে একে উন্মোচিত হতে থাকবে ওয়ালিদ প্রত্যয়ের শক্তিশালী লেখক সত্ত্বা।

আমি আজ 'জলের দেশে স্থলপদ্ম' বইয়ের কোনো রিভিউ লিখবনা। গল্প নিয়ে কোনো কথাও বলব না। আমি বই পড়ারও অনেক অনেকদিন আগে এই বই নিয়ে একজন রিভিউতে লিখেছিলো এমন করে যে, প্রত্যয় যে গল্প লিখে সেই গল্প পড়ে শুধুমাত্র বাহ/সুন্দর বলে রেখে দেয়া যায়না। প্রত্যয়ের লেখা গল্প নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে কথা বলা যায়।
আজকেও আমি আমার লেখা শেষ করব এটা লিখে যে, 'প্রত্যয় ভাইয়ার গল্প নিয়ে সারাদিন কথা বলা যাবে বা লেখা যাবে।'

এবং রিভিউয়ের শুরুতে আমার সামান্য আনন্দের কথা বলেছিলাম। এটা এ কারণেই যে - এত ভালো একজন লেখক যে কিনা ভাবনার বাহিরে গিয়ে লিখে -- তার লেখার দুয়েকটা জিনিস আগেই আঁচ করতে পারায় নিজেকে বড় মনে হলে দোষ কোথায়?

নয়টা গল্প আছে বইটাতে। পড়বেন। পড়ে থ হয়ে বসে থাকবেন। রিভিউ লিখতে বসবেন, কিন্তু পারবেন না। ধন্যবাদ।
Profile Image for Amatunnoor  Sonncharee.
12 reviews
July 13, 2022
কারণ দরকার; আমরা যে কথায় কথায় নিউটনের তৃতীয় সূত্রকে টেনে আনি। প্রতিটি ক্রিয়ার একটি সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বইটির নয়টি গল্পে মানবজীবনের হরেক রকম ক্রিয়ার নগ্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। হয়তো বইটির প্রতিটি পাঠকের বইটি সম্পর্কিত মন্তব্য এক হবে না। তবে সকলেই মুগ্ধ হবে লেখকের মানুষের উদলা আবেগ অনুভূতিকে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা দেখে। এমনকি পাঠক প্রতিটি গল্পের শেষে নিজেকে প্রশ্ন করবে, কেন? কারণ কী?
Profile Image for Maliha Noboni.
9 reviews8 followers
April 24, 2021
এই গল্পগ্রন্থটি পড়ে দারুণ চমকে গেছি।লেখকের লেখা গাঁথুনি এতো সুন্দর!
Profile Image for Shaown Setu.
17 reviews1 follower
May 6, 2021
জলের দেশে স্থলপদ্ম - নামগল্পটি অসাধারণ। এই গল্পে বোঝা যায় লেখকের উপন্যাস লেখার ক্ষমতা আছে।
Displaying 1 - 12 of 12 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.