চিক বা খড়খড়ির আড়ালে আজ নারী নেই। সমাজ অন্তঃপুরবাসিনীকে যে জানলার পিছনেই রাখুক সেখানে আছে জিন-পরীদের আসর, অবৈধ প্রেম, অন্তরমহলের কানাকানি, পাগল পড়শি, মাজারে নেশাড়ুদের গানবাজনা, যাত্রাদলে পালানো যুবক, নিজের শরীর চেনা, শিশুমৃত্যু-দাই, চোরের মানবিকতা, সর্পদংশনে মৃত্যুতে ওঝা—বাংলাদেশকে লাগে অচেনা, দূরবর্তী বিজ্ঞানমনস্কতার দ্বীপ থেকে, আকাশে তখন থমকে ছিল মেঘ, ধর্মান্ধতা। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের কিছু বদলে যাওয়ার পিছুটান ধরা পড়েছে লেখকের পিঞ্জিরায়। এই কথকতা সচিত্র। সামরানের সঙ্গে লিনোকাটে দৃশ্যপট সাজিয়েছেন পিয়ালী। রামচাঁদ রায়ের ছয়টি ছাপাইছবিতে সেজে ১৮১৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম সচিত্র বাংলা বই ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’— ‘পুবালি পিঞ্জিরা’ তার দ্বিশতবার্ষিক স্মারক। অন্তঃপুরে হর্ষ ও বিষাদ পাশাপাশি আঁকা হয়েছে দুই রঙা উলে কখনও সোয়েটারে, কখনও সূচিশিল্পে—রঙ-নকশায় ফুটে উঠেছে নারীমনের অমোঘ চাওয়া।
এই বই নিছকই হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের নারীমনের পাঁচালি, আছে ঘর-গেরস্থালি, রান্নাবান্না, গৃহে পশুপালনের কথা। ডিমে তা দিতে ধ্যানে বসা মুরগির সংকল্প, আছে গো-সংস্কৃতির দিকদর্শন; গোয়াল-গোবরে মাখামাখি রাখালি ছড়া, গোষ্ঠগানের বর্ণময় উদ্যাপন মাগনের সিন্নি। গৃহস্থের আদুরে বিড়ালের সঙ্গে সযত্নে আঁকা হয়েছে একঝাঁক জিওল কইমাছ। না মেরে ‘জিওল মাছ’ জিইয়ে রাখার সদ্য হারানো সংস্কৃতি— যন্ত্রসভ্যতার হিমশীতল দৈন্য এই বইতে অনুপস্থিত।
অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু কেন? এই প্রশ্ন আছে সারা বইজুড়ে।
সুরমা, কর্ণফুলি ও তিতাসের নৈসর্গ বর্ণনার পাশাপাশি নগরায়নের যতিহীণ উল্লাস, সাক্ষী—বাতিল নানা স্বপ্ন বা প্রকল্পের কঙ্কাল। আর কীভাবে ধর্মীয় অনুশাসন মুছে দিচ্ছে সাংস্কৃতিক পরিসর— যূথবদ্ধ বিয়ের গান, দরগায় মাছ প্রতিপালন, পারিবারিক ঘাঁটু নাচের দল উঠিয়ে হাজী হওয়ার সংকল্প। পরিবারগুলিতে ভাঙন ধরছে, সকলের বাড়ির গায়ে নিজস্ব মসজিদ, জেয়াফতের জন্য রান্নার বড়বড় পাত্রগুলি—মনিডেগ একে একে ডুবে যাচ্ছে পুকুরে, লুকিয়ে থাকা দৈত্য নাকি টেনে নেয় তাদের।