‘পর্দা জুড়ে অন্ধকার। পৃথিবী একদিন তমিস্রার মতো হয়ে যায়! তারপর পাথরের গা বেয়ে জলকল্লোলের শব্দ।’ পূর্ববর্তী ‘ঘুমের দরজা ঠেলে’ গ্রন্থের সঙ্গে এর সুরের মিল, যদিও এটি একটি স্বতন্ত্র বই। এখানে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের স্নায়ুশিরার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ছবি। লেখক অক্ষররেখা দিয়ে এইসব বিচিত্র অনুরণনকে ছুঁতে চেয়েছেন। এক আলো-আঁধারির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে আমরা কখনও হঠাৎ দেখছি মঁতেন, এমিল জোলা, কাফকা বা টোমাস মানকে, কখনও চলচ্চিত্রকার বার্গম্যান, আন্তোনিওনি, আল্যাঁ রেনে বা এরিক রোমেরকে, কখনও চিত্রশিল্পী গোইয়া, দ্যগা, মাতিস বা পিকাসোকে, কিংবা অমিয় চক্রবর্তী, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত বা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে। আলফ্রেদ দ্ৰেফ্যুস নামে এক সৈনিক বা এক অজানা কথাশিল্পী দিবাকর ভট্টাচার্যকে। কীট্স দিয়ে এই অভিযাত্রার শুরু, র্যাঁবো দিয়ে শেষ। যেন একটি আয়নার মধ্যে আমরা তাঁদের সঙ্গে একা। এ কি শুধুই গদ্য, না ঘুমের অনন্ত অন্ধকারকে আলোড়িত করা এক মহাকবিতা! প্রবন্ধের সীমাকে অতিক্রম করে এই অভিনব অন্বেষণ উন্মুক্ত করে দেয় এক অনন্ত নক্ষত্রবীথি।
Chinmoy Guha (born in September 1958 in Kolkata, India) is a professor and former Head of the department of English at the University of Calcutta, a Bengali essayist and translator, and a scholar of French language and literature. He has served as the Vice-Chancellor of Rabindra Bharati University and Director of Publications, Embassy of France, New Delhi. Earlier he taught English at Vijaygarh Jyotish Ray College in Kolkata for more than two decades, and French at the Alliance Française and the Ramakrishna Mission Institute of Culture for eleven and five years respectively.
He has won the Lila Ray award of the Government of West Bengal in 2008 and the Derozio bicentenary award in 2010. He has been awarded knighthoods by the ministries of Education and Culture of the Government of France, in 2010 and 2013. Paschimbanga Bangla Akademi and the Government of West Bengal conferred on him Vidyasagar Puroshkar in 2017. The French President conferred on him in November 2019 the title of Chevalier de l'Ordre national du Mérite for his contribution to intercultural exchange. He won the prestigious Sahitya Akademi Award 2019 in Bengali literature for his collection of essays Ghumer Darja Thele.
১৯ জন বরেণ্য শিল্পী (যার মধ্যে আছেন কবি, চলচ্চিত্রকার, দার্শনিক, চিত্রকর, কবি ইত্যাদি)-কে নিয়ে লেখা বই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লেখাগুলো কৌতূহল জাগায় কিন্তু নিবৃত্ত করে না। অলংকারবহুল বাক্য বা বর্ণনার প্রতি বর্তমানে আমি কিঞ্চিৎ বীতস্পৃহ হওয়ায় পড়েও বিশেষ আনন্দ পাইনি। মজার ব্যাপার, জগৎজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের চাইতে ঘরের মানুষ রবীন্দ্রনাথ আর অমিয় চক্রবর্তীকে নিয়ে রচিত প্রবন্ধ দুটো পড়েই আনন্দ পেলাম বেশি। জরুরি ভিত্তিতে রানী চন্দের "গুরুদেব" পড়তে হবে।
১৯ জন লেখক-কবি-দার্শনিক-চিত্রকর; কীটস, মঁতেন, বার্গম্যান, কাফকা, আন্তোনিওনি, টোমাস মান, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত, আল্যাঁ রেনে, এরিক রোমেন, দ্রেফ্যুস ও জোলা, দ্যগা, রবীন্দ্রনাথ, গোইয়া, দিবাকর, মাতিস, পিকাসো, অমিয় চক্রবর্তী, র্যাঁবো— প্রসঙ্গে চিন্ময় গুহের লেখা প্রবন্ধ কিংবা উপলব্ধি বলা যায়। পাঠক এই বই পড়ে বিশ্বসাহিত্যের একটা ছবি আঁকতে পারবে।
আমরা যারা বইয়ের পাতায় মহাবিশ্ব খুঁজি, তাদের কাছে ‘হে অনন্ত নক্ষত্রবীথি’ একটা মানচিত্রের মতো— একেবারে চেনা নয়, সম্পূর্ণ অচেনাও নয়, কিছুটা ধাঁধার মতো মানচিত্র, যেখানে পথে পথে মিলেমিশে থাকে স্মৃতি, শুদ্ধ বিস্ময়, এবং পাণ্ডিত্যের ঘন কুয়াশা। চিন্ময় গুহর এই গ্রন্থটি যেন একটা লিটারারি প্ল্যানেটোরিয়াম, যেখানে তিনি পাঠককে নিয়ে ঘুরে বেড়ান তাঁর প্রিয় ঋষি-নক্ষত্রদের মধ্যে—র্যাঁবো থেকে দ্যগা, টোমাস মান থেকে মাতিস, বার্গম্যান থেকে আন্তোনিওনি, এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ।
যেমন বার্তেসের ‘Camera Lucida’ ফটোগ্রাফির প্রবন্ধ হয়েও হয়ে ওঠে মাতৃহরণের এক ব্যক্তিগত রুমিনেশন, তেমনই ‘হে অনন্ত নক্ষত্রবীথি’ তথ্যসমৃদ্ধ হলেও প্রাবন্ধিকের আত্মদর্শনের ঝলক স্পষ্ট। Barthes-এর মতই চিন্ময় গুহের প্রবন্ধও অনেক সময় কাঠামোর চেয়ে অনুভব দিয়ে এগোয়—তথ্যকে প্রসঙ্গ করে মুগ্ধতার আলোয় আলোড়িত করে তোলেন পাঠকে।
যারা ক্লেরেন্স ব্রাউনের কাফকা-বিশ্লেষণ পড়েছেন, তারা জানেন কীভাবে একটি লেখকের পেছনে ইতিহাস, ব্যাধি, সামাজিক কাঠামো ও ভাষার সংহত রাজনীতি কাজ করে। চিন্ময় গুহও সেই পথেই হেঁটেছেন। ‘দ্রেফ্যুস ও জোলা’ প্রবন্ধটি পড়ে আমার মনে পড়ল হান্না আরেন্ডটের ‘Eichmann in Jerusalem’-এর কথা—যেখানে একটানা বিচার বিশ্লেষণের মাঝে লেখক নিজের নৈতিক অবস্থান নিতে দ্বিধা করেন না। গুহও তাই করেন; শুধু তত্ত্ব নয়, স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানও জানান দেন। এইরকম স্পষ্টতা আজকের আপোষকামী সাহিত্যচর্চায় বড়ই দুর্লভ।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর দু’টি প্রবন্ধ—‘রবীন্দ্রনাথ ১’ ও ‘রবীন্দ্রনাথ ২’—রানী চন্দের স্মৃতিকথা ও অনুবাদের উপর ভিত্তি করে তৈরি। যদিও নতুন কিছু নয়, কিন্তু পড়তে ভালো লাগে, কারণ বিষয়টা এমন একজন মানুষকে ঘিরে, যিনি আমাদের ‘অন্তরতম আত্মীয়’ হয়ে আছেন বহুকাল ধরে। এখানে আমি যেন সিমোন ওয়েলের সেই বয়ান শুনতে পাই, যিনি তাঁর ‘Gravity and Grace’-এ বলেছিলেন, আত্মিক ভালবাসা আমাদের সব জট খুলে দিতে পারে—এমনকি ভাষারও।
তবে সত্যি বলতে কী, এই বই পড়তে গিয়ে আমাকে বেশ কষ্ট পেতে হয়েছে। এমনটা রুশ সাহিত্যপাঠে অনেকবার হয়েছে, বিশেষ করে যখন আমি দস্তয়েভস্কির ‘Demons’ বা আন্দ্রেই বিটভ-এর ‘Pushkin House’ পড়েছিলাম। একইভাবে চিন্ময় গুহের এই বইতেও আমার প্রায় অর্ধেক পরিচিতি নেই—ক্যামাস পড়েছি, কিন্তু আল্যাঁ রেনের একটা ছবিও দেখিনি, পিকাসোর আঁকা চিনি, কিন্তু দ্যগা-র স্কেচ ও আন্দোলনের প্রেক্ষিত জানি না। তাই যখন এই সব স্রষ্টাদের পারস্পরিক তুলনায় তিনি গদ্যকে সাজান, তখন সেটা আমার কাছে আবেগ নয়, বরং একটা চাপের মত হয়ে দাঁড়ায়।
এই অভিজ্ঞতা আবার মিল খায় জর্জ স্টেইনারের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘Language and Silence’-এর সঙ্গে। স্টেইনার যেমন নিজের পাঠককে সঙ্গে করে হেঁটে যান ইউরোপীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির ঘন সবুজ জঙ্গলে, ঠিক তেমনই চিন্ময় গুহও চান আপনি তারই সঙ্গে হাঁটুন—কিন্তু সেই হাঁটা সহজ নয়। বাংলার এই গদ্যরীতি—অলংকারবহুল, প্রাচীনতামোদী, কখনো একটু কাব্যিক ও আর্যসংস্কৃতিঘেঁষা—আমার কাছে অনেক সময়েই অতিরিক্ত বলে মনে হয়।
এর আগে এই ধরনের বিষয়ে আমি স্বচ্ছন্দ ছিলাম না। কিন্তু যখন পড়েছিলাম ইলিয়াস খানের অনুবাদে এমিল চোরান, বা আবুল মনসুর আহমদের ‘আয়না’, তখন বুঝেছিলাম যে কঠিন বিষয়ের কথাও সহজ করে বলা যায়। চিন্ময় গুহ পণ্ডিত মানুষ—তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই পাণ্ডিত্য কখনো কখনো সাধারণ পাঠকের নাগালের বাইরে চলে যায়। এই বইয়ের বেশ কিছু অধ্যায়ে সেই দুর্লভত্বই মূল সুর। যেমন ‘বার্গম্যান ও আন্তোনিওনি’ অধ্যায়ে গুহ যখন দুজন পরিচালকের চিত্রভাষা তুলনা করেন, তখন পাঠকের কাছ থেকে ন্যূনতম প্রস্তুতির প্রত্যাশা করেন।
তবুও, কিছু অধ্যায় হৃদয় ছুঁয়ে যায়। যেমন ‘আমার আল্যাঁ রেনে’ প্রবন্ধটি—একটা স্বীকারোক্তির মতো, যেখানে প্রাবন্ধিক নিজেকে প্রশ্ন করেন, “এই ছবিগুলোর দিকে আমি এতকাল চেয়ে থেকেছি কেন?” এই আত্মজিজ্ঞাসাই বইটিকে বাঁচিয়ে তোলে, শুধু দর্শনের জন্য নয়, সাহিত্যিক সত্যের জন্যও।
চিন্ময় গুহর প্রবন্ধ পড়ে আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল, ঠিক যেমনটা হয়েছিল যখন পড়েছিলাম ওক্টাভিও পাজ-এর ‘The Labyrinth of Solitude’। পাজ মেক্সিকান আত্মপরিচয় ও ভাষার দ্বন্দ্ব নিয়ে যেমন আলোচনা করেছিলেন, গুহ তেমনই করেন নিজের সাংস্কৃতিক শিকড় নিয়ে—তবে আরও সূক্ষ্ম ও অন্তর্গত ভাষায়।
আমার সবচেয়ে প্রিয় প্রবন্ধ ‘দ্রেফ্যুস ও জোলা’। জোলার সেই বিখ্যাত 'J'accuse…!' চিঠির প্রসঙ্গে গুহ যতটা রাজনৈতিক, ততটাই নৈতিক। তিনি ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করতে চান না, তিনি যেন ইতিহাসকে একবার ছুঁয়ে দিয়ে চলে যান নৈতিক গৌরবের কোনো অতল আঁধারে।
বইটির নাম ‘হে অনন্ত নক্ষত্রবীথি’ আমার কাছে একধরনের আকুতি হয়ে রয়ে গেল—যেমন কবি ত্রিলোকনাথ শাস্ত্রীর কবিতায় দেখি: “তুমি দূরের তারা, তবু বুকে রেখেছি।” চিন্ময় গুহের এই তারা-পুস্তক তেমনই—দূর, কিন্তু আকর্ষণীয়।
সবশেষে বলি, এই বইটা যেমন একজন পাঠকের কাছে হয়ে উঠতে পারে একটি অলৌকিক আবিষ্কারের অভিজ্ঞতা, তেমনই কারও কাছে হতে পারে দিশেহারা হবার বর্ণময় রেকর্ড। হয়তো সেটাই গুহ চেয়েছেন—সব পাঠক যেন নিজের নিজের তারা খোঁজে, নিজের নক্ষত্রবীথি আবিষ্কার করে। হয়তো প্রতিটি পাঠই এক-একটি আকাশে গমন, একেকটি ব্যক্তিগত কক্ষপথে বিচরণ।
"আমরা, যাদের বিন্দু বিন্দু ঘর, কিন্তু অনন্ত বারান্দা, তারা কবিতার জাদু-লন্ঠনগুলি বুকে আঁকড়ে বসে থাক��� এক অনন্ত অসীম মহাবিশ্বের সন্ধানে।"
২০১৬ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে 'রোববার' পত্রিকায় চিন্ময় গুহের একটা প্রবন্ধের সিরিজ প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রিয় কবি, চলচ্চিত্র-নির্মাতা, চিত্রশিল্পীদের নিয়ে প্রাবন্ধিকের নিজ্স্ব ভাবনার, মুগ্ধতার কোলাজ। সেই সংকলনই বইয়ের আকারে হয়ে উঠেছে 'হে অনন্ত নক্ষত্রবীথি'।
আমার সবথেকে ভালো লেগেছে 'দ্রেফ্যুস ও জোলা' প্রবন্ধটি। 'রবীন্দ্রনাথ ১' ও 'রবীন্দ্রনাথ ২' প্রবন্ধদুটি মূলত রানী চন্দের রবীন্দ্রবর্ণন-নির্ভর। তবুও, বিষয় হিসাবে রবীন্দ্রনাথ এত পরিচিত যে তাঁর উপরে লেখা যে কোনো কিছুই আয়েশ করে পড়ে ফেলা যায়।
এই তিনটি বাদ দিলে বাকি বইটা শেষ করতে আমাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। যে স্রষ্টাদের নিয়ে প্রবন্ধগুলো তাঁদের অধিকাংশ সৃষ্টির সঙ্গে আমার এখনও পরিচয় হয়ে ওঠেনি। তার উপর তুলনা টানতে বা রেফারেন্স হিসেবে এসে পড়েছে আরও আরও স্রষ্টা ও সৃষ্টি। আমাকে দিশেহারা করেছে এই ভার। উপরন্তু, আমি এই বাংলায় স্বচ্ছন্দ নই। যে বাংলা গদ্য মানুষে বলে না, সেই কেতাবি, অলংকারবহুল, সংস্কৃতঘেঁষা বাংলা আমার আরোপিত ও অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। চিন্ময় গুহ পণ্ডিত মানুষ। আমি দেখেছি, প্রাবন্ধিকের পাণ্ডিত্য সততই এই ধরনের গদ্যের জন্ম দেয়। হয়তো প্রবন্ধসাহিত্যকে সাধারণ পাঠকের নাগাল থেকে সন্তর্পণে দূরে রাখা একটা সচেতন প্রয়াস। কে জানে!