গুপ্তযুগের এক বিষকন্যার কাহিনী… কে এই কঙ্কাবতী? কীভাবে সে হয়ে উঠলো বিষকন্যা? কারা এই বিষকন্যা? কীভাবে কেটেছে কঙ্কাবতীর জীবন? সমুদ্রগুপ্ত, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, ইতিহাস, কল্পনা, লোককথা সব মিলেমিশে এক রোমহষর্ক কাহিনী অপেক্ষা করছে আপনার জন্য… গুপ্তযুগের এক বিষকন্যার আখ্যান নিয়ে সম্পূর্ণ উপন্যাস।
নিরাশাজনক লেখনী। বঙ্কিমচন্দ্র, শরদিন্দু প্রমুখ প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের লেখনী অনুকরণ করলেও লেখনীর সিংহভাগ বাঁধুনিহীন এবং দিশাহীন। এরকম লেখনী বই আকারে প্রকাশ করার দুঃসাহস দেখানোর জন্য প্রকাশককে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু আমার মতে, 270+ পাতার 333 ( ভারতীয়) মুদ্রার এই বইয়ে সময় এবং অর্থ ব্যায় করা নিতান্তই অপচয়।
❛মোরে প্রেম দিতে চাও? প্রেমে মোর ভুলাইবে মন? তুমি নারী, কঙ্কাবতী, প্রেম কোথা পাবে?❜ নারীর প্রেমে অন্ধ হয়ে যায় তাবত দুনিয়ার পুরুষ। সে নারী যদি হয় রূপে অপ্সরী, গুণে সম্পূর্ণা, তেজে দীপ্ত তবে তাকে হেলা করতে পারে কে? গানের কথাতেও আছে, নারীর কারণে সবি হয় নারীর কারণে পুরুষ বড় হয় জগতে নারীর কারণে, ধ্বংস হয়ে যায় আবার ঐ নারীর কারণে নারীর কারনে হায় রে নারীর কারণে। প্রাচীনভারতের শাসনে প্রচলিত ছিল বিভিন্ন পন্থা। রাজনৈতিক কুটিলতা, রাজ্য ধরে রাখা, রাজ্য জয়ের জন্য নানা পন্থার মধ্যে অনন্য একটি ছিল ❛বি ষকন্যা❜। ইতিহাসের এক অদ্ভুত অধ্যায় তারা। কারা এই বি ষকন্যা? কীভাবে তৈরি হয় তারা? আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এদের অবদান কী রকম? জনশ্রুতিতে জানা যায় অনেক কিছু। গুপ্ত সাম্রাজ্যের এক ধনী বণিকের কন্যা সৌরভী। ছোট্ট মেয়েটা যেন রূপে অপ্সরাদেরও হার মানায়। বাবা-মা-ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রাণপ্রিয় সে। জীবনের নয়টি বছর বেশ সুখে কাটিয়েছে। কিন্তু সুখ কপালে সইলো না। বড়ো ভাইয়ের বিয়ের রাতে অপহরণ হয় সে। অপহরণকারী আর কেউ নয়। গুপ্ত সাম্রাজ্যের মহামন্ত্রী। বছর কয়েক আগে প্রাসাদে শিশু এই কন্যাকে দেখে তার মনে খেলে যায় রাজনৈতিক এক চাল। অসীম রূপের এই কন্যাকে কাজে লাগাবেন বৃহত্তর স্বার্থে। এই কাজে তার সহযোগী রাজপুরোহিত রতিকান্ত। পরিবার পরিজন থেকে দূরে সরে একাকী হয়ে পরে সৌরভী। কিন্তু বুঝে গেছে ফিরবার আর পথ নেই। অতীত ভুলে সামনে যা আছে তাতেই নিজেকে সপে দিতে হবে। ক্রমেই সে শাস্ত্র, বেদ, অ স্ত্র চালনা, যু দ্ধবিদ্যা এমনকি গীত ও নৃত্যেও পারদর্শী হয়ে উঠলো। দেশের প্রয়োজনে প্রস্তুত করতে করতে নিজেকে এক কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী করে তুলেছে। সৌরভীকে চাপা দিয়ে জাগিয়ে তুলেছে নতুন সত্ত্বা বি ষকন্যা ❛কঙ্কাবতী❜ কে। যার প্রতি নিঃশ্বাসে, ছোঁয়ায় গরল এবং মৃ ত্যু। মহারাজ সমুদ্রগুপ্ত বছরের পর বছর যু দ্ধ করে চলেছেন আর জয় করছেন একের পর এক সাম্রাজ্য। অখন্ড ভারত তৈরীর অভিপ্রায় নিয়েই এই রাজ্য জয়। তার যোগ্য উত্তরসূরী প্রথম পুত্র যুবরাজ রামগুপ্ত। রাজ্যের প্রয়োজনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধও হয়েছেন তিনি। সময় হলেই রাজা হিসেবে অভিশেখ হবে তার। তবে সব কি এতোই সহজ? পরিস্থিতি বদলে দিতেই যেন কঙ্কাবতীর সাথে রামগুপ্তের দেখা। অপরূপা এই নারীতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। ভালোবাসার এই নারীকে কাছে পাওয়া যে একেবারেই অসম্ভব তা জেনেও নিজেকে বোধ দেয়ার অবস্থা নেই। একই দশা কঙ্কাবতীরও। বৈশ্বিক এই আবেগ তার জন্যে নয়। কিন্তু হৃদয় তো এসব শুনে না। গুপ্ত সাম্রাজ্য এবং ভারতবর্ষের নিরাপত্তায় নিজেকে সপে দেয়া কঙ্কাবতীর ভবিষ্যত কী হবে? হারিয়ে যাবে স্মৃতির পাতায়? অসম এই পরিণয়তের পরিণতি কী হবে? পাঠ প্রতিক্রিয়া: ঐতিহাসিক উপন্যাস শুনলেই আমার মন গলে যায়। ইতিহাসের সেই সময়ের কথার সাথে সাথে একটু কাল্পনিক ঘটনা পড়তে আমার খুব ভালো লাগে। সে উদ্দেশ্যেই ❛কঙ্কাবতী❜ বইটা সংগ্রহ করা। লেখিকার প্রথম উপন্যাস এটি। এক রূপবতী কন্যার নিজেকে ভাগ্যের কাছে অর্পণ করার বেদনাদায়ক কাহিনি রচিত করেছেন তিনি। ❛কঙ্কাবতী❜ ঐতিহাসিক কাহিনি, রাজনৈতিক গল্প। এতে কূটনীতি আছে। রাজা-মহারাজাদের নিয়ে লেখা উপন্যাসে অন্তঃকোন্দল, অন্দরের ষ ড়যন্ত্রও থাকে। তবে এই বইটিতে সেসব নেই। আছে সাম্রাজ্যকে রক্ষা ও জয়ের গল্প। এক বণিক পরিবারের সুখের সংসার মুহুর্তের মাঝে ছাড়খার হয়ে যাওয়ার গল্প আছে এখানে। ছোট্ট নিষ্পাপ সৌরভীর ❛কঙ্কাবতী❜ হয়ে ওঠার গল্প-ই মূলত এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। এসেছে প্রেমের ঘটনা। শত ত্যাগের পরেও নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা দুজন অসম মানুষের ভালোবাসার কথা এনেছেন লেখিকা। ঐতিহাসিক ঘটনার আদলে প্রেমের গল্প-ই মনে হয়েছে বেশি। লেখিকার লেখার গতি বেশ দ্রুত তাই একদিনেই বইটা শেষ করে ফেলেছি। যদিও ভাষার কাঠিন্য ছিল। প্রচলিত শব্দ এড়িয়ে তিনি অপেক্ষাকৃত কম প্রচলিত প্রতিশব্দ ব্যবহার করেছেন। প্রবীণ লেখকদের লেখার ধরন অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। তবে অনুসরণ মনে হচ্ছে সফল হয়নি। ফলে ভাষা গোলমেলে হয়ে গেছে। ❛কঙ্কাবতী❜ চরিত্রটাকে মনে ধরাতে খুব চেষ্টা করেছিলাম। তবে কেন যেন চরিত্রটা মনে বেশী দাগ ফেলতে পারেনি। উপন্যাসের ঘটনা একেক সময় একেকদিকে পরিবর্তিত হয়েছে। যার ফলে মূল প্লট থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে। শেষটাও খুব একটা প্রীতিকর লাগেনি। চাইলেই দারুণ কিছু লিখতে পারতেন। নিজস্ব ধারায় গল্পটাকে এগিয়ে নিয়ে গেলে পাঠ্যানুভূতি আরো ভালো হতে পারতো। পড়তে ইচ্ছা হলো বলে পড়ে শেষ করে ফেললাম জাতীয় উপন্যাস। না পড়লেও ক্ষতি নেই। বইয়ের প্রচ্ছদটা আমার ভালো লেগেছে। মনে পরে এইজন্যেই বইটা সংগ্রহ করেছিলাম।
বিষকন্যা—এক এমন রহস্যময় নারী, যার শরীরে ছোটবেলা থেকেই ক্ষুদ্রমাত্রার বিষ প্রয়োগ করে তাকে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তোলা হতো। শুধু বিষ সহ্য করার শিক্ষাই নয়—অস্ত্রবিদ্যা, শাস্ত্র, নৃত্য–সঙ্গীত, প্রলোভন আর গুপ্তচরবিদ্যার কঠোর অনুশীলনেই গড়ে উঠত এক দুর্লভ সেনানী। তাঁদের শরীরের তেজ, রক্ত, ঘাম, এমনকি মমতার স্পর্শও হয়ে উঠত মারাত্মক; যার সংস্পর্শে বা সহবাসে মৃত্যু ছিল অনিবার্য। চাণক্যের অর্থশাস্ত্র থেকে পুরাণ—সবখানেই পাওয়া যায় এই রহস্যময় নারীদের উল্লেখ।
লেখিকা অঙ্কিতা সরকারের "কঙ্কাবতী" সেই পুরাণকথাকে নতুন আলোয় উন্মোচিত করেছেন মানবিক, নির্মম এবং দার্শনিক গভীরতায়। গল্পের কেন্দ্রবিন্দু সৌরভী, মাত্র নয় বছর বয়সে যার শৈশব হঠাৎ ছিন্ন হয়। গুপ্ত সাম্রাজ্যের স্বার্থে তাকে আলাদা করা হয় পরিবার থেকে, হুমকি ও ভয় দেখিয়ে কেড়ে নেওয়া হয় স্বাভাবিক জীবনের সমস্ত রঙ। এরপর শুরু হয় তার কঠোর, নিষ্ঠুর, তবু অনিবার্য রূপান্তর—সৌরভী ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে কঙ্কাবতী, এক অতুলনীয় বিষকন্যা।
আচার্য রতিকান্তদেবের প্রশিক্ষণের প্রতিটি ধাপ লেখিকা এমনভাবে লিখেছেন, যেন পাঠকের চোখের সামনে সৌরভীর প্রতিটি হাসি শুকিয়ে যায়, প্রতিটি কষ্ট নিঃশব্দে জমতে থাকে, প্রতিটি ক্ষণ তাকে মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন এক যন্ত্রে রূপ দেয়। কিন্তু এই কঠোর রূপান্তরের ভিতরেও লেখিকা সৌরভীর হৃদয়ের আলোটুকু জিইয়ে রেখেছেন—তার চাপা ভালবাসা, দ্বন্দ্ব, দহন আর অবদমনকে দারুণ সূক্ষ্মতায় দেখিয়েছেন। সে কি শেষ পর্যন্ত হতে পেরেছিল আচার্যের আদর্শ ছাত্রী? নাকি তার মনের গভীর ইচ্ছে ও মানবিক অনুভূতি তাকে বারবার ভেঙে দিতে চাইছিল?
উপন্যাসটিতে শুধু কঙ্কাবতীর জীবনই নেই, আছে গুপ্ত সাম্রাজ্যের মহামন্ত্রীর নৈতিক দুর্বলতা, আচার্য রতিকান্তদেবের রাজ্যের প্রতি একনিষ্ঠ দায়বোধ, সমুদ্রগুপ্ত ও দত্তাদ��বীর প্রেম, রাণী দত্তাদেবীর স্নেহবৎসল মন, যুবরাজ রামগুপ্তর আত্মবিনাশী প্রেম, রাজবাড়ির অবৈধ সম্পর্ক —এসবই গল্পটিকে করে তুলেছে বহুমাত্রিক।
শেষে কঙ্কাবতী নিজের জীবন, স্বপ্ন, ভালোবাসা সব বিসর্জন দিয়ে রক্ষা করে সমুদ্রগুপ্তের অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন। সেই মুহূর্তে বিষকন্যা কেবল এক নারঘাতী অস্ত্র নয়—সে হয়ে ওঠে এক বেদনাময় প্রতীক, দেশের জন্য নিজের অস্তিত্বই উৎসর্গ করা এক অদ্ভুত নায়িকা।
“কঙ্কাবতী” শুধু বিষকন্যার গল্প নয়। এ উপন্যাস নারীর প্রতি চিরকালীন অবিচার, ক্ষমতার রাজনীতি, শৈশবের ক্ষত, ভালোবাসার নিষেধ আর দায়িত্বের নামে আত্মবলিদানের নির্মমতা—সবকিছুকে এমনভাবে রূপ দিয়েছেন যে পাঠক শেষ পৃষ্ঠা বন্ধ করার পরেও গল্পের আঘাত ও সৌরভীর মুখ থেকে যায় মনে। বিষকন্যার এরকম গভীর, হৃদয়বিদারক ও মানবিক ব্যাখ্যা বাংলা সাহিত্যে সত্যিই বিরল।।
বইঃ কঙ্কাবতী লেখকঃ অঙ্কিতা সরকার রেটিংঃ ৩.৫/৫ রিভিউঃ কাহিনীটা গুপ্ত সাম্রাজ্য যুগের, রাজা সমুদ্রগুপ্তের সময়ের। এক ধনী বনিকের একমাত্র মেয়েকে অপহরন করে তাকে বানানো হয় বিষকন্যা, রাজ্যের সুরক্ষার জন্য। কিন্তু এর জন্য বলি হয়ে যায় তার শৈশব, পরিবার আর ব্যক্তিগত চাওয়া। কাহিনীর শুরুটা সুন্দর ছিল, বিশেষ করে প্রথম দিকে কঙ্কাবতীর পরিবার, সেই সাথে তুলনামূলকভাবে রাজপরিবার আর তার মধ্যেকার রাজনীতি ভাল লেগেছে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সময় রামগুপ্ত আর তার ছোটভাই চন্দ্রগুপ্তর মধ্যেকার রাজনীতি, নিষিদ্ধ প্রেম অনেক সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। কিন্তু যেটা নিস্প্রভ লেগেছে সেটা হচ্ছে প্রধান চরিত্র কঙ্কাবতী। বইটা তাকে ঘিরে হলেও, সে নিজেই হয়ে গেছে পার্শ্বচরিত্র, আর তাই বইটা যতটা আশা নিয়ে বসেছিলাম, কেমন যেন মন ভরল না পুরোপুরি।
অঙ্কিতা সরকারের লেখনীর সঙ্গে আমার পরিচিতি মুখ পত্রিকার পাতায়। ভৌতিক, সামাজিক, থ্রিলার সবেতেই সমান পারদর্শী লেখিকা। ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে কঙ্কাবতী আমার পড়া প্রথম উপন্যাস। গুপ্ত যুগের পটভূমি চিত্রন থেকে আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি যথাযথ ফুটিয়ে তুলেছেন লেখিকা। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা এত সুচারু ভাবে ফুটিয়ে তুলতে লেখিকা যথেষ্ট পড়াশোনা করেছেন। এই উপন্যাসে সেই পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট। সমুদ্র গুপ্তের রাজ্য জয়, তার বীণা বাদন সমস্ত কিছু যেন এক মুহূর্তে ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে চোখের সামনে উপস্থিত হয়েছে। রাজ্যের একজন বণিকের সাজানো সংসার কিভাবে ছত্রখান হয়ে গেল, তাদের একমাত্র কন্যাকে কিভাবে ষড়যন্ত্র করে বিষকন্যায় পরিণত করা হল এই উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে সেই বর্ণনা রয়েছে। কঙ্কাবতী আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে, আশা করব লেখিকা ভবিষ্যতে আরও এমন সুন্দর সুন্দর ঐতিহাসিক কাহিনী আমাদের উপহার দেবেন।
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে বিষকন্যা শব্দটি বহুল প্রচলিত। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কারণে গুপ্তহত্যার প্রয়োজনে এক অদ্বিতীয় আয়ুধ ছিল বিষকন্যার ব্যবহার। কোনো মেয়েকে শৈশবে তার মা, বাবা, পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে তারপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রকার শিক্ষাদানের মাধ্যমে তাকে উপযুক্ত করে তোলা হতো। তাকে ভুলতে বাধ্য করা হতো তার পূর্ব জীবন। সমস্তটাই কোনো বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকে ব্যবহার করার জন্য। আর এই শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে চলত তাকে বিষের আধার বানানোর প্রক্রিয়া। প্রত্যহ তার খাবারে অল্প পরিমাণ গরল মিশিয়ে তাকে করে তোলা হতো আক্ষরিক অর্থেই 'বিষকন্যা', যার সাথে সংসর্গের পরিণতি সাক্ষাৎ মৃত্যু !
যুদ্ধ হয় বা হয়না... বদলে যায় রাজা... বদলে যায় শাসনের সমীকরণ...। রাজনৈতিক পালাবদলের ডামাডোলে বিষকন্যারা থেকে যায় চির-উপেক্ষিতা ও ঘৃণ্য হয়ে... ওদের যে নিঃশ্বাসেও বিষ !! ইতিহাস ওদের মনে রাখে না...
গুপ্তযুগের এমনই এক বিষকন্যা কঙ্কাবতীকে নিয়ে অঙ্কিতা সরকারের উপন্যাস 'কঙ্কাবতী'। কোনো এক বিস্মৃত অতীতে যার নাম ছিল সৌরভী।
এই বইটি লেখকের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এবং লেখকের গল্প বলার ভঙ্গী আমার বেশ ভালো লেগেছে। ঝরঝরে, স্বাদু গদ্যে তিনি একটা নিটোল গল্প বুনেছেন যেখানে আছে ইতিহাস, রোমাঞ্চ, প্রেম, ব্যর্থতা, রাজনীতি, গুপ্তচরবৃত্তি এবং গুপ্তহত্যাও....। গুপ্তসম্রাট সমুদ্রগুপ্তের সময়কালের পাটলিপুত্র নগর এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট। সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত, মহারানী দত্তদেবী, যুবরাজ রামগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছাড়াও আছে বণিক চন্দ্রশেখর, তাঁর স্ত্রী পদ্মিনী, তাঁদের দুই পুত্র সাগর ও সূর্যের কথা। আছে বান্ধুলি, বিদ্যুল্লতা, মহামন্ত্রী বসুবন্ধু, আচার্য রতিকান্ত মিশ্র। আছে বোধিসত্ত্ব যে ভালোবেসেছিলো কঙ্কাবতীকে আর নিজের জীবন দিয়ে সেই ভালোবাসার মূল্য চুকিয়ে গেছে। আছে গুপ্তচর বুদ্ধসত্ত্বও যে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, নিজের পরিচয় গোপন করে শত্রুরাজ্যের সেনাবাহিনীতে যোগদান করে শুধু খবর সংগ্রহের নিমিত্ত। আছেন ধ্রুবদেবী যিনি যুবরানী (পরবর্তীতে মহারানী) হয়েও ভালোবাসার অভাবে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। আর গোটা কাহিনী জুড়ে আছে বিষকন্যা কঙ্কাবতী যে কোনোদিন বিষকন্যা হতে চায়নি.... আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই বরং একটা ভালোবাসায় মোড়া সংসার চেয়েছিল... ভালোবেসেছিলো যুবরাজ রামগুপ্তকে...। কিন্তু বিষকন্যাদের যে ভালোবাসতে নেই! তাদের প্রেমাস্পদের জীবনও তাতে ধ্বংস হয়ে যায়। রামগুপ্তের ব্যর্থ জীবন তার সাক্ষ্য বহন করে।
বিষকন্যা ঐতিহাসিক উপন্যাস। বিষকন্যা রাজনৈতিক উপন্যাস। কিন্তু তার চেয়েও বেশি করে বিষকন্যা ভালোবাসার উপন্যাস। গোটা উপন্যাস জুড়ে এই ভালোবাসার সুরটুকু পাঠকের কান এড়ায় না। ওই যে কথায় বলে ভালোবাসা ব্যর্থ হলে কাহিনী হয়ে যায়.....
আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ, ঝকঝকে ছাপার বইটিতে সামান্য কিছু মুদ্রণ প্রমাদ আছে সেগুলো নিশ্চই পরবর্তী সংস্করণে শুধরে নেওয়া হবে।
ইতিহাস আর গল্প ভালোবাসলে, গুপ্তযুগের এক বিস্মৃত অধ্যায়কে জানতে গেলে এই উপন্যাস অবশ্যপাঠ্য।