ইউভাল নোয়া হারারির জনপ্রিয় বই Sapiens: A Brief History of Humankind এর জনপ্রিয়তা দেখে মনে হয় কিছু মানুষের জন্য এটি যেন আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় একটি বই যতই জনপ্রিয় সমৃদ্ধ হোক না কেন এর কিয়দাংশও যদি মানুষের বিশ্বাসের স্পর্শকাতর স্থানে ভিত্তিহীন আঘাত হানে, বিজ্ঞানের নামে কায়দা বুঝে দর্শন আর প্রমানের নামে গোঁজামিলের সুক্ষ কারচুপি করে তখন সেই বইয়ের মান ধপাস করে তলানীতে পৌছার দাবী রাখে। অবাক করার ব্যাপার হল একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বঙ্গীয় অসংখ্য বিজ্ঞান প্রেমী পাঠকগন বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানবাদের পার্থক্য করতে এক দিকে যেমন ব্যার্থ অন্যদিকে তেমনি বিজ্ঞানবাদীদের লেখার স্রেতে হয়েছে ডুবন্ত। ডুবন্ত মানুষকে কি আর আপনি সাঁতারের মহিমা বুঝাতে পারবেন? তারা পুস্তক যাচাইয়ে ভেতরের উপাদানের চেয়ে মিডিয়া হাইপে অতি প্রভাবিত। পশ্চিম থেকে এসেছে বলে কথা, এহেন নামী লেখক আর এত, এত পাঠক সুতরাং ইহা কি ফেলা যায়। এমন মানসিকতার পাঠকের চোখ খুলে দিতে চমৎকার কাজ নিয়ে হাজির হয়েছেন লেখক রাফান আহমেদ। বইটি তিনি লিখলেও হারারির Sapiens বইকে ব্যাবচ্ছেদ করেছেন সেই পশ্চিমা একাডেমীয়ার জনপ্রিয় বিশেষজ্ঞ ও লেখকদের দিয়েই। তারা হারারির বইয়ের কাণ্ডজ্ঞানহীন ভুল গুলো দেখে যতটা আশ্চর্য, বিরক্ত, বিস্মিত আমরা মনে হয় ঠিক ততটাই উদ্বেলিত। পরিস্কার বিজ্ঞান জ্ঞানের অসারতার উপস্থিতিতে এর চেয়ে আর বেশী ভাল কি আশা করা যায়। তারপরও যারা সঠিক বিজ্ঞানের আয়নায় Sapiens বইটিকে দেখতে চায় তাদের জন্য রাফান আহমেদের বইটি সত্যের আলোকবর্তিকা। কি ভাবে? চলুন একটু দেখি পশ্চিমা একাডেমীয়ার প্রথম সারীর বিশেষজ্ঞরা কি বলেঃ
মানুষ কোথা থেকে এল প্রশ্নে হারারি বিবর্তনের নিঃসঙ্কোচ আশ্রয়তো নিয়েছেনই বরং একে প্রতিষ্ঠার জোর চেষ্টা করেছেন, যেন মানুষ এসেছে কোন নিচু প্রানী থেকে। অথচ বিখ্যাত ফসিলবিদ বার্নাড উড বলেনঃ
" গত পঞ্চাশ বছর ধরে সংগৃহীত ফসিল -প্রমান ও বিশ্লেষণ প্রযুক্তি কাজে লাগানোর পরও [ অষ্টরা অস্ট্রালোপিথ থেকে ] কি ভাবে হোমো আসলো - এই প্রশ্নের জবাব এখনও মেলেনি। "
অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত বই Not a Chimp গ্রন্থে জেরেমি টেইলর দেখিয়েছেন শিম্পাঞ্জী আর মানুষ কত আলাদা। তিনি বলেনঃ
শিম্পাঞ্জীর সাথে আমাদের সাদৃশ্যের প্রচলিত ধারনার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। শিম্পাঞ্জী ও অন্যান্যে বানরের ব্যাপারে প্রচলিত বিজ্ঞান বিষয়ক মুখরোচক রচনা ও টেলিভিশন প্রোগ্রামের কল্যানে এই ধারনার বহুল প্রসার। এরা বিজ্ঞানের একটা (বিকৃত) সোজাসাপটা রূপ বেঁছে নিয়ে এর দ্বারা সিম্পাঞ্জির সাথে আমাদের অদ্ভুত মিলের বিষয়ে পীড়াপীড়ি করতে থাকে। ... এসব ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার সময় হয়ে গেছে...
বিখ্যাত নিউরোসায়েন্টিস্ট এন্তনিও দ্যামাসিও তো বলেই ফেলেছেনঃ " হারারির অনুমান গুলো বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভাল না, এবং তার সিদ্ধান্ত একেবারেই গলদ! "
ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে হারারির বইয়ের প্রতি বিরক্ত হয়ে অধ্যাপক শ্লোমো শান্দ বলেছেনঃ " বইটা প্রথমে হাতে পেয়ে আমি তো অবাক! তার কল্পনার ক্ষমতা আসলেই চমকপ্রদ। কিন্তু যখন মানবের ভাষা কি ভাবে জন্ম নিল এই আলোচনায় এলাম দেখি তিনি লিখেছেন - ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে গপ্পো করার মাধ্যমে ভাষা জন্ম নিয়েছে। আমি খুবই বিরক্ত হয়েছি এটা দেখে। বইটা পড়া বাদ দিয়ে দেই তখনই, বহুদিন আর বইটার ধারে কাছেও আসিনি। মানবের ভাষা গপ্পো করার চাহিদা থেকে তৈরি হয়নি। এ ধরনের কথা তার মুখেই মানায় যে অনেক বেশী সময় চায়ের দোকানে বসে বসে কাটায়।... "
রাষ্ট্রের সুত্রপাত সম্পর্কে হারারিকে তীব্র সমালোচনা করেছেন হলপাইক। তিনি বলেনঃ " দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আদি সমাজ নিয়ে হারারি তো খুব অল্প জানেন, কিন্তু রাষ্ট্রের সুত্রপাত নিয়ে তিনি দেখছি কিচ্ছু জানেন না। "
হারারি বিজ্ঞান দিয়ে ধর্মকে দুর্বল করতে চেয়েছেন। কিন্ত জনপ্রিয় ইতিহাসবিদ পিটার হ্যারিসন দেখিয়েছেন পুরোনো ধর্মগ্রন্থের জ্ঞান বাদ দিয়ে নতুন জ্ঞান খোঁজার জন্য বৈজ্ঞানিক বিপ্লব শুরু হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ম গ্রন্থে বর্ণিত স্রষ্টার ধারনাকে জগতের সাথে মেলাতে গিয়েই বিজ্ঞানের আবির্ভাব হয়েছে। বাদ দিয়ে না।
হারারির বই সমালোচনা করে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিত জন সেক্সটন বলেনঃ " এ বইতে প্রকৃত ইতিহাস তেমন একটা নাই। বরং আছে মানববিবর্তিত আনুমানিক অতীতচিত্র..."
গ্যালেন স্ট্রসনের মতেঃ " বইয়ের আকর্ষণীয় দিক ছাপিয়ে দেখতে পাওয়া যায় গাফেলতি, অতিরঞ্জন আর উত্তেজক প্রলাপ...ঢালাও মন্তব্য, লাগাম ছাড়া কারন জুড়ে দেওয়া, উপাত্তকে জোর করে টেনে, হেঁচড়ে সিদ্ধান্তে আসার ক্ষতিকর চর্চায় লিপ্ত হয়েছেন হারারি। "
বিবর্তনকে আকাশচুম্বি করতে গিয়ে হারারি সৃষ্টিকর্তাকে সরিয়ে বিবর্তনের বুঝ দিতে চেয়েছেন। অথচ ড. এলিয়ট সোবার লিখেছেনঃ " কিছু মানুষ মনে করে নিউটনের তত্ত্ব ও ডারউইনের তত্ত্ব বলে - কোনো পরম স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই। অথচ তত্ত্ব গুলো মোটেই তা বলেনা। তত্ত্ব গুলোকে (বিজ্ঞান থেকে) দর্শনে টেনে নিয়ে এমন ব্যাক্ষা দাঁড় করানো হয়, যার জন্য আরো প্রেমিস (অনুমান) যোগ করতে হবে। ...বিজ্ঞান চর্চা করতে গিয়ে যে আমরা অনেক সময় আসলে দর্শন কপচাই এটা অবাক হওয়ার মত ব্যাপার না। মানুষ অধিকাংশ সময়ই এমন করে। "
এই ছিল "ইউভাল হারারি পাঠ ও মূল্যায়ন" বই থেকে নেওয়া মাত্র গোটা কয়েক মন্তব্য। আরও বিস্তারিত বইটিতে পাবেন।
সুতরাং স্পর্শকাতর স্থানে দূষণ ছড়ানো কোন বইয়ের লেখনীর স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের সচেতনতাই অধিক কাম্য, তাহলেই বিজ্ঞান তার চিরাচরিত রূপটি ফিরে পাবে, যে রুপে বিজ্ঞান দিয়ে বিজ্ঞানবাদের পরাজয় হবে, আর আমরাও বিজ্ঞানের নামে ছাইপাশ বিশ্বাসে ডুবন্ত হবনা। পরিশেষে Oracles of Science এর লেখক Giberson ও Artigas এর একটি কথা দিয়ে শেষ করতে চাই, যেখানে বলা হয়েছেঃ
" সেলেব্রেটি বিজ্ঞানীদের মুখ নিঃসৃত এসব দৈববাণী ও বিতর্কিত আলাপ গুলোর কারনেই পপুলার সায়েন্স বই গুলো মানুষজন এত গিলে। কিন্তু এসকল বক্তব্য বৈজ্ঞানিক নয় মোটেই। বরং এগুলো হলো দর্শন বা ধর্ম কেন্দ্রিক দাবি যা কিনা বিজ্ঞানের মোড়কে মুড়িয়ে বিকোনো হচ্ছে। "