Jump to ratings and reviews
Rate this book

অন্ত্যমিলের অঙ্গনে

Rate this book

Paperback

1 person is currently reading
34 people want to read

About the author

Pritam Basu

11 books75 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
5 (55%)
4 stars
2 (22%)
3 stars
2 (22%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 3 of 3 reviews
Profile Image for Arnab Pal.
51 reviews9 followers
May 23, 2021
এই বইয়ের রিভিউ হয়না, হওয়া সম্ভব না! এরকম প্রতিভাবান লেখকরা আছেন বলেই আমার ভাষাটা এখনো বেঁচে আছে। ইংরেজি মিডিয়াম এখনো মেরে ফেলতে পারেনি আমার বাংলাকে। আপনি ব্যাটিং করে যান, প্রীতম বাবু, আমরা আছি।
Profile Image for Somen Sarkar.
60 reviews3 followers
October 22, 2021
কি নেই এই বইএ, কবিতা আছে, গল্প আছে, উপন্যাস আছে, নাটক ও আছে। আর আছে অন্তমিল, শুধু আছে বললে ঠিক বলা হবেনা, এতে অন্তমিল ছাড়া কিছু নেই। লেখকের যে প্রতিভা আগেও দেখেছি ছিরিছাঁদে, পাঁচমুরোর পঞ্চাননমঙ্গলে তা আবার দেখলাম। আর কবিতা গুলিতে আধুনিক কবিদের বলে বলে গোল দিয়েছেন। অনুপ্রাসের এত ব্যাপক ব্যাবহার আগে দেখিনি। এক কথায় অনবদ্য। আর রামায়ণ, মহাভারতের যে আধুনিক আখ্যান তা মনমুগ্ধ করেছে। পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম।
Profile Image for Preetam Chatterjee.
6,857 reviews369 followers
July 10, 2025
অন্ত্যমিলের অঙ্গনে: হাসির অন্ত্যবিন্দুতে এক নতুন কাব্যচর্চা: প্রীতম বসুর লেখনী নিয়ে এক প্রেমিক পাঠকের পর্যালোচনা

“মন খারাপের দারুন দাওয়াই
এসো হাসির ওষুধ খাওয়াই।”

এই লাইনদুটি নিছক ছড়ার পংক্তি নয়—এ এক মানসিক মিনিস্ট্রেশন, ছন্দের ভাষায় লেখা স্নেহভরা প্রেসক্রিপশন। শব্দের গায়ে গায়ে যেভাবে স্বরবৃত্ত গেঁথে থাকে, অন্ত্যমিল যেভাবে বিন্দুতে এসে মিল খোঁজে—তাতে এই ছড়া হয়ে ওঠে এক লৌকিক লোরার ঝংকার, যার তালে পাঠকের মন বাঁধা না পড়ে পারে না।

ছন্দেরও যে একটা ব্যাকরণ আছে—তাকে উপেক্ষা করলে সে রস ফোটায় না, গান হয়ে ওঠে না। এই ব্যাকরণে থাকে মাত্রা (তালমাফিক উচ্চারণ), লয় (বাক্যের ভাসমান গতি), এবং অন্ত্য (যেখানে শেষ শব্দজুটি শোনায় আত্মীয়তা)। এই ব্যাকরণ মেনেই প্রীতম বসু গড়েছেন তাঁর অনন্য গ্রন্থ “অন্ত্যমিলের অঙ্গনে”, যেখানে শব্দ নয়, শব্দের আত্মীয়তাই হয়ে ওঠে আসল চরিত্র।

এই বইটি যেন সেই ছন্দস্নাত আহ্বানেরই সরস উত্তর।

এ বই একাধারে ব্যাকরণশাস্ত্রের দারিদ্র্য লাঘব করে, আবার মনখারাপের ব্যাকরণকেও সপ্রতিভ টান মেরে উল্টে দেয়। এখানকার কবিতা কেবল বিমূর্ত আত্মনিবেদনের খাতায় নাম লেখায় না—বরং হয়ে ওঠে এক টানটান, বাঁধাধরা, ঠাসবুনোনো অন্ত্যমিলের কাব্যনাট্য; যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি যেন শব্দের নিপুণ কসরৎ, আর প্রতিটি পর্ব—পাঠকের মনের “তাল-লয়-মিল” খুঁজে পাওয়ার এক অবিস্মরণীয় ভাষানুষ্ঠান।

এই বই যেন প্রমাণ করে দেয়, ব্যাকরণ মানে শুধুই বিধিনিষেধ নয়, ব্যাকরণ মানে বোঝাবার ও বোঝার স্পর্ধা। “অন্ত্যমিল” এখানে কোনো বাহুল্য অলংকার নয়, এটি communication made poetic. ঠিক যেমন ইংরেজি ব্যাকরণে সঠিক tense, subject-verb agreement বা punctuation লেখার অর্থ খুলে দেয়—তেমনই প্রীতম বসুর অন্ত্যমিল শব্দের দ্ব্যর্থতা সরিয়ে স্বচ্ছতা এনে দেয়। তার ছড়া যেন বলে ওঠে:

“Let the rules sing, not suffocate.”

ব্যাকরণ যখন স্পষ্ট, তখন লেখাও প্রাণবন্ত, বাক্যও নির্ভার। ঠিক যেমন নাটকের সংলাপে ছন্দ না থাকলে তাল ভেঙে পড়ে, তেমনই জীবনের কথাবার্তাতেও ব্যাকরণ না থাকলে ভুল বোঝাবুঝি অনিবার্য। প্রীতম এই বইয়ে সেই “ছন্দের ব্যাকরণ”কে সহজ করে দেন, অন্ত্যমিলের ক্লাসে তিনি বোঝান যে শব্দ কখন কোথায়, কীভাবে বসলে হৃদয়ের সঙ্গে ভাষার প্রেম হয়।

“Grammar”—হোক তা ভাষার বা ছন্দের—একটা রীতির ভেতর দিয়ে আত্মপ্রকাশকে আত্মবিশ্বাসে রূপান্তরিত করে। পাঠকের আত্মবিশ্বাস বাড়ে—লেখার ভাষায় যেমন, ছড়ার হাসিতে তেমনই। এখানেই এই বই এক আশ্চর্য দ্বৈত সেতুবন্ধন তৈরি করে—রস আর রীতি, আবেগ আর অভ্যন্তরীণ নিয়ম।

এই বই তাই একাধারে রসিক এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ—একাধারে ননসেন্স এবং নিষ্ঠা। এখানে ছড়া মানে শুধু রাইমিং গেম না, ছড়া মানে ভাষার confidence-building cardio।

এই বই পড়া মানে নিজেকে খুঁজে ফেলা এক অন্ত্যমিলের অভ্রভেদী অঙ্গনে—যেখানে ছন্দ কেবল নিয়ম নয়, এক আত্মা, এক ধ্রুপদী প্রাণস্পন্দন। এখানে ছন্দ চলে না ধুন্ধুমার তালহীন চালে—বরং তার প্রতিটি ঝংকারে লুকিয়ে থাকে অন্তরীক্ষ ছোঁয়ার সাধ, শ্রুতির গায়ে শিহরণ জাগানো স্পন্দ।

এখানে “হাসির ওষুধ” বলতে বোঝায় না শুধু মন খারাপের ইনহেলার—বরং এ এক আনন্দের অলংকারচিকিৎসা—শব্দের ছান্দস ও লাবণ্যের নিপুণ শল্যবিদ্যা, যা সাহিত্যের শ্রবণেন্দ্রিয় ও অনুভবকে একসঙ্গে চর্চা করায়। একবার পড়ে যাওয়া মানে, রস আর ব্যাকরণ দুটোতেই স্নাত হওয়া।

যেমন সংস্কৃত কাব্যতত্ত্বে “অলঙ্কার”—শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার—শুধু ভাষাকে সাজায় না, রসকে জাগিয়ে তোলে, তেমনি এই বইয়ের প্রতিটি অন্ত্যমিল আর অনুপ্রাস পাঠকের মনে মধু ও মেধার যুগলবন্দি তৈরি করে।

“The poet’s eye, in a fine frenzy rolling,
Doth glance from heaven to earth, from earth to heaven…”
— Shakespeare, A Midsummer Night’s Dream

ঠিক তেমনই এই বইয়ের ছন্দরথ ছুটে চলে বাস্তব থেকে অলৌকিকে, হাস্যরস থেকে অন্তর্দর্শনের দিকে। এখানে প্রতিটি অন্ত্যমিল যেন শব্দালঙ্কারের ধ্বনি-বিন্দু—যা শ্রুতির গায়ে জেগে থাকে গুনগুনে, আর প্রতিটি অনুপ্রাস যেন অর্থালঙ্কারের আলোড়ন—যা পাঠকের মনে ছবি আঁকে, হাসায়, কাঁদায়, আর জাগায়।

আর এখানেই নিহিত অলঙ্কারের ছোঁয়া:

১) চমক, নতুন রূপে চেনা জিনিসকে দেখা—"আশা" যখন পাখি হয়ে যায়, তখন কাব্য হয়ে ওঠে মুক্ত বাতাস।

২) ছন্দ আর অনুরণনে মস্তিষ্কের প্যাটার্ন-পিপাসা মেটে—alliteration, repetition, rhyme—সব একে একে মাথায় জেঁকে বসে।

৩) দুঃখ কেবল দুঃখ নয়—সে হয়ে যায় “ভিজে কোটের মতো ভার”, আর ভালোবাসা হয়ে ওঠে “আলতো ছায়া”—অনুভব যেখানে ধরা দেয় ছবির মতো করে।

৪) একেকটা উপমা মানে নতুন আয়না—“সময় এক চোর” বললে, সময় আর আগের মতো থাকে না।

এই বই তাই কেবল অন্ত্যমিলের কাব্যনাট্য নয়—এ এক অলঙ্কারতত্ত্বের খোলা ক্লাসরুম। এখানে পটলচাঁদের মতো ক্লাস টেনের লাস্টবয় অনুপ্রাস দিয়ে বিশ্বজয় করে, আর পাঠক হেসে হেসে একদিন আবিষ্কার করেন—তাঁর নিজের হারিয়ে যাওয়া ছন্দ তিনি আবার খুঁজে পেয়েছেন।

এ বই পড়ে মনে হয় ভাষা এতদিন কেবল বাহন ছিল, এখন তা হয়ে উঠেছে অভ্যন্তরীণ অলংকার—আর শব্দ কেবল কথা নয়, এক অনন্ত রসোৎসব।

নাটকে যখন হেসে ওঠে পুরাণ

রামায়ণ, মহাভারত কিংবা কালিদাসের ‘শকুন্তলা’—এইসব নাম শুনলেই আমাদের কল্পনায় ভেসে ওঠে ধূপধুনোতে মোড়া এক গম্ভীর শাস্ত্রীয় আবহ। যেন চরিত্ররা কথা বলেন ঢঙে, হাঁটেন ধ্রুপদী তালে। কিন্তু সাহিত্যের অলিন্দ থেকে যদি হঠাৎ কেউ বলে ওঠে—“দেবী নহে, বলো বেবি”—তাহলে কী হয়?

হয় ‘রসো বৈ সাহিত্যম্’।

প্রীতম বসুর “অন্ত্যমিলের অঙ্গনে” বইয়ে এমনই চারটি নাটক আছে—‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ’, ‘কলিকালের রামকাহিনী’, ‘সমুদ্রমন্থন’, আর ‘কালিদাসের শকুন্তলা’—যেখানে পুরাণের গাম্ভীর্য পেরিয়ে উঠে আসে শুদ্ধ হাস্যরস, অন্ত্যমিলের ছন্দে বাঁধা এক আধুনিক অলংকার।

তবে এ হাসি নিছক হাসির জন্য নয়। এই চারটি মহাকাব্য ও নাট্যকাব্যের মূল কাঠামোতেই সূক্ষ্মভাবে মিশে আছে কমিক এলিমেন্টস—

১) হনুমানের লঙ্কা সফর,
২) ঘটোৎকচের রঙ্গরস
৩) সহদেবের "আমার গুণই বিনয়",
৪) আর শকুন্তলার বিদূষক মাধব্যর সোজাসাপটা ব্যঙ্গ—

সবই ছিল, শুধু আমরা হয়তো সেগুলোকে প্রাচীনতার ভারে দেখতে পাইনি।

এই বই সেই ভার নামিয়ে দেয়। পাঠককে বলে, "এ বার হাঁসো—গম্ভীর মুখে পেরেক ঠোকা��� দিন শেষ।"

প্রীতমের লেখায় পুরাণ চলে আসে বটতলার নাটকের খাঁচায় — না কুরুচিকর, না অবমাননাকর, বরং আনন্দময়, আত্মীয়সুলভ। যেন হনুমান, সহদেব, শকুন্তলা এসে বসে পড়েছেন আপনার ড্রয়িংরুমে—আর বলছেন, “এক কাপ চা হবে? সঙ্গে খানিক অন্ত্যমিল?”

এই নাটকগুলো একদিকে যেমন প্রাচীন সাহিত্যের রসনাত্মক স্তর তুলে ধরে, অন্যদিকে আধুনিক পাঠকের মানসভূমিতে একরাশ বাতাস ঢুকিয়ে দেয়। হাস্যরস এখানে comic relief নয়, বরং rasa-sculptor।

আর যাঁরা প্রাচীনপন্থী হয়ে মনে মনে বলছেন, “ইহা কী সর্বনাশ!”, তাঁদের বলব—এই বই একপ্রকার রস-অ্যান্টিবায়োটিক। পুরাণে জমে থাকা ধুলো মুছে দেয়, খিলখিলিয়ে হাসায়, আর বলে—

“Even Homer nods… but even Vālmīki laughs.”

এখানে ছন্দে গাঁথা কৌতুক পুরাণের গভীরতাকে খাটো করে না, বরং জীবন্ত করে তোলে।

প্রীতম যেন নাটকের গেটআপে বসে নিজেই বলে ওঠেন: “হে গুরুগম্ভীর দেবতা, একটু হেসে ফেলুন তো—এই যে দ্রৌপদীও হাসছেন!”

ক্লাস টেনের পটলচাঁদ: এক অনুপ্রাসীয় বিপ্লবের নায়ক

১৩৫ পৃষ্ঠার উপন্যাস “অভিনব অনুপ্রাস”—এ একদম অন্য স্তরের কাজ। ক্লাস টেনের লাস্টবয় পটলচাঁদের হাতে কীভাবে জন্ম নিল এমন দুর্দান্ত সব অনুপ্রাসীয় কবিতা?

টুকেছে? না কি ঈশ্বরের কৃপা?

শম্ভুমাস্টার রীতিমত গোয়েন্দার ভূমিকায়। আর আমরা পাঠকেরা হয়ে উঠি সাক্ষী—বাংলা সাহিত্যের এক অলীক অলঙ্কারের জন্মের।

“হাঁস চল হাড় খাই হাঁড়িচাচা তাতালে
হায় হায় হাল দেখ হাঁস হাসপাতালে…”

প্রীতমের কবিতা পড়ে বোঝা যায়, তিনিও জানেন যে বাংলা ভাষার ব্যঞ্জনবর্ণে কাব্যরস লুকিয়ে আছে, যদি ঠিক ছোঁয়া মেলে।

অন্ত্যমিলের ক্লাস: এক আধুনিক ছন্দপাঠশালা

সোজামিল-গোঁজামিল: ছড়ার ক্লাসে ক্লাস ওয়ান থেকে রিসার্চ লেভেল

‘সোজামিল-গোঁজামিল’ শুধু একটি গল্প নয়—এ এক আদবকায়দার পাঠশালা, যেখানে বাংলা ভাষা ও কাব্যের অন্ত্যমিল নামক অলংকার শেখানো হয় এক অনবদ্য রসবোধে। এটা নিছকই মজার আখ্যান না, বরং এক ক্লাসরুম উইথ আ কার্নিভাল হার্ট—যেখানে পাঠক এক মুহূর্তে হেসে ওঠেন, পরের মুহূর্তে থমকে ভাবেন: ভাষা নিয়ে এত খেলা যায়!

এই গল্পেই লেখক স্পষ্ট করে দেন, অন্ত্যমিল কেবল ছন্দে শব্দ জোড়ার খেলা নয়—এ ভাষার এক লিগ্যাসি। যেখানে চলিত বনাম সাধু ভাষার লড়াই, ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ, এমনকি উচ্চারণগত নানা দোলাচল—সবই একটা বৃহৎ কাব্য-ভুবনের চেহারা তৈরি করে। অন্ত্যমিল এখানে শুধু ব্যাকরণ নয়, এক জীবনদর্শন।

এই পর্বেই আসে সেই অনন্য পঙ্‌ক্তিমালা—

“হিংসা, নিন্দা, দ্বেষ
হাসির ছড়ায় শেষ
ছড়া যে শেখায় ভালবাসতে”—

যা শুধু ছন্দ নয়, এক ধরনের আত্মশুদ্ধির অনুশীলন।

প্রীতমের ‘ছড়া থেরাপি’ নিছক ছড়া নয়, এটা আসলে an emotional first-aid kit—যা গদ্যের ধুলো ঝেড়ে হঠাৎ পাঠকের বুকে রেখে যায় শব্দের গুলতি। কে জানে, আজ এই ছড়াটাই কারও একাকিত্বের ওষুধ, কারও বিষণ্ণ মনখারাপের প্যানাডল!

এই অধ্যায়ে প্রীতম যেন বাংলা ভাষার সেই স্বর্ণালী অনুশাসন ফিরিয়ে আনেন, যা একদিন সুকুমার রায় আর সুনির্মল বসুর কল্পনায় নেচে উঠেছিল। ভাষা এখানে খেলে, গড়ায়, ঠেলাঠেলি করে, কিন্তু সব শেষে দাঁড়িয়ে থাকে তাল আর তালের ব্যাকরণে।

আর এই ব্যাকরণটাই যে এত প্রাণবন্ত হতে পারে, তা বুঝিয়ে দেন ‘সোজামিল-গোঁজামিল’-এর প্রতিটি চরণ। যেন লেখকের হাতে আমাদের মনে বেজে ওঠে একটাই অনুরণন — “ছন্দের ভিতেই শান্তি, অন্ত্যমিলে অমৃতসুধা।”

কবিতার কুঞ্জে প্রীতমের কবিতা: ছন্দের ল্যাবরেটরিতে সুকুমার-পরবর্তী এক অধ্যায়

“৪৬টি অন্ত্যমিলের কবিতা”—এই কথা শুনলে যেন সংখ্যায়ই চমক লেগে যায়। কিন্তু সংখ্যার বাইরেও আছে বিস্ময়ের ঘর। এসব কবিতা শুধু সংখ্যা বা ছন্দের গণিত নয়, এ একরকম “language chemistry”। কিছু লিমেরিক, কিছু nonsense rhyme, কিছু আবার সূক্ষ্ম বোধে বাঁধানো পংক্তিমালা—যা মন ছুঁয়ে যায়, আবার মস্তিষ্কেও রঙ ছড়িয়ে দেয়।

এই অধ্যায়ে এসে পাঠকরা প্রীতম বসুর লেখায় অবধারিতভাবে খুঁজে পান সুকুমার রায়ের ছায়া। কিন্তু এই ছায়া তাঁর উপর পড়ে থাকা নয়, বরং তাঁকে পাশে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া—একটি উত্তরাধিকারীর দৃপ্ত ঘোষণা। প্রীতম কোনোভাবেই সুকুমার-অনুকরণে যান না, পাস্টিশ-এর ফাঁদে পা দেন না। বরং যেন post-Sukumarian generation-এর একজন প্রতিনিধি হয়ে বলেন: ছড়া মানেই শিশুমনোরঞ্জন নয়, ছড়া মানে আধুনিক ভাষার অলংকারচিকিৎসা।

সুকুমার যেখানে “অসূয়াশূন্য, আঘাতশূন্য” হাস্যরসের সূত্রপাত করেছিলেন, প্রীতম সেখানে ছন্দের ব্যাকরণে শাণ দেন নিজস্ব ঢঙে। nonsense rhyme-এ তাঁর দক্ষতা এমন যে শব্দ যেন হয় “অঙ্গুরীয়ার মতো”—প্রতিটি ছন্দ বসে যায় কাঙ্ক্ষিত শব্দে, ঠিক আঙুলে আঙুলি বসার মতো মসৃণ, পরিপাটি, অনায়াস।

এটা ছন্দের grammar-এরই জাদু। **Sound structure, rhythmic stress, vowel-consonant play—**সব মিলিয়ে প্রীতমের কবিতা হয়ে ওঠে এক একটি ব্যাকরণচর্চার শব্দ-নৃত্য। শব্দের লুপে লুপে তিনি পাঠককে এমন এক জগতে নিয়ে যান, যেখানে “অ” থেকে “হ”—প্রতিটি বর্ণ নিজস্ব অনুপ্রাসে নেচে ওঠে।

এ যেন ছন্দের ক্লাসরুম, যেখানে শিক্ষকও ছড়ায় কথা বলেন।

আর পাঠকের কাজ? শুধু জোরে জোরে পড়ে ফেলা— আরো ভালো যদি কেউ সঙ্গে বলে:

“I can no other answer make but thanks,
And thanks, and ever thanks.” — Shakespeare, Twelfth Night

কিছু পাঠকীয় খচখচানি… একান্ত আত্মীয়স্বরে

হ্যাঁ, একেবারে শুরুতেই হয়তো পাঠকের কানে একটু খটকা লাগবে। শুদ্ধ বাংলার অনুরাগীরা ভাবতে পারেন—"এতো ইংরেজি শব্দ ঢুকল কোথা থেকে?" আবার অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করতে পারেন, “আরও আধুনিক হতে পারত না?”

এই দ্বৈধতা স্বাভাবিক। কারণ ভাষার স্বাদ যেমন ভৌগোলিক, তেমনই জেনারেশনাল। কিন্তু এইখানেই লেখক যেন অগ্রিম দিয়ে রেখেছেন উত্তর—

“সোজামিল হোক, গোঁজামিল হোক, অন্ত্যমিলটাই মুখ্য।”

এখানে ভাষা নয়, ছন্দই রাজা।

আর সেই রাজা কোনো স্থির, ধুতি-পরা রাজা নন—তিনি হিপহপ করতে জানেন, চান্দ্রযানে ওঠেন, আবার পুরাণে দাপিয়ে বেড়ান।

এই বইয়ের ভাষা তাই নিয়মের বাঁধনে বাঁধা পড়েনি। বরং ছন্দের নির্যাসে সে হয়ে উঠেছে এক সজীব, খেলোয়াড় মেজাজের কবিতানাট্য। পাঠককে একটাই কাজ—প্রথার মাটি থেকে পা তুলতে হবে। আর একবার তালমিল লাগলে… এই ভাষার নাচ শুরু হয়ে যাবে নিজে থেকেই।

শেষ কথা:

“অন্ত্যমিলের অঙ্গনে”—একাধারে ছন্দচর্চার আধুনিক পাঠশালা, আবার হালকা হাসির এক অক্সিজেন-চেম্বার, যেখানে ঢুকলেই নিঃশ্বাসে ছন্দ, ফুসফুসে ফান।

এ বই শুধু শেলফে রাখার নয়—এ বই শোবার মাথার পাশে রাখার মতো।

রাতের অন্ধকারে যদি ভেতরের আলো নিভে আসে, তাহলে আপনি হয়তো ফিসফিস করে বলবেন:

"When sorrows come, they come not single spies, but in battalions…" — Shakespeare, Hamlet

…তখনই এগিয়ে আসে এই বইয়ের “ছড়া থেরাপি”—হিংসা, ক্লান্তি, চাপ—সব ব্যাটালিয়নকে অন্ত্যমিলের তালেই নামিয়ে আনে চুপচাপ।

Verdict? আপনি যদি ছন্দপ্রেমী হন, ছড়ামুগ্ধ হন, অথবা একখান মনখারাপের ওষুধ খুঁজছেন—“অন্ত্যমিলের অঙ্গনে” আপনার নাম ধরে ডাকছে।

আরও ভালো হয় যদি জোরে জোরে আওড়ান। কারণ, ছন্দ যখন কানে বাজে, মন তখন চুপিচুপি হাঁসফাঁস হাসে।

পাঠ-শুভ হোক। অলমতি বিস্তরেণ।
Displaying 1 - 3 of 3 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.