স্পেন হচ্ছে আমাদের হারিয়ে যাওয়া জান্নাত আর আমেরিকা হচ্ছে আমাদের জন্য দন্তখোলা জাহান্নাম। কীভাবে আমরা সে জান্নাত হারিয়ে আজ জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে ‘স্পেন টু আমেরিকা’ সে হৃদয়বিদারক ইতিহাসের করুণ আখ্যান। বইটি পাঠকালে আপনি প্রকাশ-অযোগ্য হতাশায় কুকড়ে যাবার পাশাপাশি শুনতে পাবেন উম্মাহর সোনালি স্বপ্নের পাজর ভাঙার যন্ত্রণাদায়ক আর্তনাদ। সে সাথে যখন দেখবেন বীর তারিকের উত্তরসূরি মুসা বিন আবি গাসসানের অসহায় একাকিত্ব, লেন্দুপ দর্জি আর মীরজাফরদের ন্যায় গাদ্দারি, পরিণাম-অন্ধ ভোগবাদী শাসকের রাজ্য অপেক্ষা রানির মেকআপের চিন্তা; তখন স্তম্ভিত ও বিমূঢ় হয়ে পড়তে পারেন আপনি।
‘স্পেন টু আমেরিকা’য় আপনি পরিচয় পাবেন পরের ধনে পোদ্দারি করা, দুপুরে-ডাকাত, মুসলিম উম্মাহর কৃতিত্ব-চোর নির্লজ্জ ইউরোপীয়দের প্রকৃত চেহারার।
দেখতে পাবেন এর পাতায় পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে রক্ত আর আগুনের জীবন্ত ইতিহাস। শুনতে পাবেন অশ্রুর মহাসড়ক ধরে মেষ-ছাগলের মতো তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া সরলপ্রাণ অসহায় রেড-ইন্ডিয়ানদের বুকফাটা হাহাকার। লোভের আগুনে ছাই হয়ে যেতে দেখবেন ‘অ্যারাওক’ ও ‘চ্যারোকি’ নামক দুই রেড ইন্ডিয়ান জাতির ইতিহাস। জানতে পারবেন রাজ্যলিপ্সু ফার্দিনান্দ ও চরম মুসলিম-বিদ্বেষী রানি ইসাবেলার মানস-সন্তান আমেরিকানরা কেন মুসলমানদের মোকাবিলায় এতটা হিংস্র? কী তাদের ভবিষ্যৎ টার্গেট।
বইটির নাম স্পেন টু আমেরিকা হলেও এখানে ইসলামি বিশ্বের ইতিহাসের ২টি গুরুত্বপূর্ন দিক নিয়ে বিস্তরভাবে আলোচনা করা হয়েছে। আর সেই দুটি ঘটনা একই সূত্রে গাথা আর সেটি হলো মুসলিমদের দ্বারা পুরো ইউরোপকে দখন করে নেওয়ার সম্ভাবনার কথা।
মুসলিমদের হাতে এমন দুটি সুযোগ এসেছিল যখন মুসলিমরা চাইলেই পুরো ইউরোপ দখল করে নিতে পারতো। কিন্তু মুসলিমরা নিজেদের কারনেই সেই সুযোহ গুলো হাতছাড়া করে ফেলেছে। আজ যদি মুসলিমরা ইউরোপ দখল করে নিতো তাহলে আমাদের সেই সপ্নের সেই আন্দালুস হারাতে হতো না। আমেরিকা আবিষ্কারের কৃতিত্বো আমাদেরই থাকতো এবং হতো আমেরিকাও একটা মুসলিম প্রাধান দেশ হতো।
হাঁয় আফসোস যে সেই সুযোগ গুলো আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল এবং আমরা আমাদের সকল শৌর্য, বীর্যের, মুসলিমদের গর্বের সেই আন্দালুস হারিয়ে ফেললাম। এই বইটি পড়ে শুধু আফসোসই হলো যে কীভাবে আমরা এত সুন্দর সুযোগ গুলো হারিয়ে ফেললাম নিজেদের অহমিকার ফলে এবং ৮০০ বছরের শাসনকৃত মুসলিম ভূখন্ড আন্দালুস খ্রিস্টান্দের হাতে সপে দিয়ে দিলাম নিজেদেরই অযোগ্যতার কারনে।
••• কলম্বাস (Colombus) ওয়েস্ট ইন্ডিযের দ্বীপপুঞ্জে (West Indies) যে বর্বরতা বৈধ রেখেছিল, কোর্তেজ (Hernán Cortés) নামক স্পেনীয় যুলুমবাজ মেক্সিকোতে অ্যাযটাক সভ্যতার (Aztec Civilization) লোকদের সাথে আর ব্রিটিশ উপনিবেশবাদিরা ভার্জিনিয়া ও ম্যাসাচুসেটের পোটাহান্ট রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে বৈধ রেখেছিলো। মোটকথা, আমেরিকার সর্বকালের ইতিহাস সন্ত্রাসবাদ-সহিংসতার সাথে জড়িত। যে রাষ্ট্রের প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে আছে রেড ইন্ডিয়ান-নির্যাতিত আফ্রিকানদের রক্ত-মাংস-হাড্ডি।
আজ দেশে দেশে গণতন্ত্র-মানবাধিকারে ব্যাপ্টিযমের দাবিদার আমেরিকায় বিশ্বে নাম্বার ওয়ান মানবাধিকার হরণকারী হিসেবে প্রমাণিত। মানবতার ইতিহাসে মানবতার ওপর সবচে বেশি যুলুম তাদের হাতেই লেগে আছে। আজকের আমেরিকার মাটি উর্বর করতে মিলিয়ন মিলিয়ন রেড ইন্ডিয়ানের রক্তে সেঁচ দিতে হয়েছে; শক্তিশালী করতে রক্ত-ঘাম ঝরাতে হয়েছে ১৫ মিলিয়ন আফ্রিকান নিগ্রোদের।
ইসাবেলা (Isabella of Castile) ও কলম্বাসের অন্তরে লুকিয়ে থাকা লোভের ভূত আজ ইরাকের মরুময় মাঠে আর আফগানিস্তানের পাথুরে পাহাড়ি ভূমিতে এসে উপস্থিত। আজ যদি এখানকার বাসিন্দারা সেই কাঠ-বাঁশের ধনুক দ্বারা প্রতিরোধ না গড়ে পশুপালের মতো পালতে থাকে, এদের পরিণতিও রেড ইন্ডিয়ানদের পরিণতির চেয়ে আলাদা হবে না। •••
— আবু লুবাবা শাহ মানসুর, স্পেন টু আমেরিকা, পৃষ্ঠা ১৯০
ইতিহাসের বই না, কিন্তু এখানে ইতিহাস নিয়েই প্রবন্ধ উঠে এসেছে। সাধারণ পাঠকের পড়তে সুবিধা হবে।
বইঃ স্পেনের পতন ও আমেরিকা আবিষ্কার লেখকঃ আবু লুবাবা শাহ মানসুর
১. বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস। আন্দালুসিয়া সমসাময়িক ইউরোপের মধ্যে এত বেশি উন্নত ছিলো, এত বেশি অগ্রগামী ছিলো, ভাবলে অহংকার হয়। আবার ৮০০ বছরের শাসন শেষে যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিলো, তখনকার নির্লজ্জ শাসকদের কথা ভাবলে লজ্জা লাগে।
২. বইয়ের বেশ বড় একটা অংশ জুড়ে আমেরিকা আবিষ্কার, সেখানে ইউরোপীয়দের আধিপত্যের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা আছে। ফার্ডিনান্ড আর ইসাবেলার বারবার চুক্তিভঙ্গ করা, স্পেনের মুসলিমদের রক্তে হাত রঞ্জিত করা, কলম্বাসের দ্বারা রেড ইন্ডিয়ানদের উপর আধিপত্য সৃষ্টির যেই ইতিহাস তাতে এটা স্পষ্ট ঐতিহাসিক ভাবে আমেরিকা মানবাধিকার ধ্বংসকারী অমানুষের আখড়া। যারা এখন পুরো বিশ্বে তথাকথিত গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের বয়ান গেলানোর চেষ্টা করে।
৩. আন্দালুসের শেষ সুলতান আবু আবদুল্লাহ কাপুরুষের মতো পালানোর সময় যেমন ইউরোপীয়দের সহযোগীতা আশা করেছিলো, তাদের বিশ্বাস করেছিলো, বর্তমান উম্মাহর নেতারাও অনেকটা তেমনই। অথচ হেনরি কিসিঞ্জারে ভাষায় " আমেরিকার শত্রুতার ওষুধ আছে, কিন্তু তার বিষাক্ত বন্ধুত্বের কোনো উপশম নেই।"