জামশেদ মুস্তফির হাড়, ফতেহগড়ের তান্ত্রিক, বাদুড়, বালক-রহস্য, পতঙ্গ-রহস্য, নীল দরজার রহস্য, কে?, পাথর-রহস্য, ঘূর্ণি হাওয়ার রহস্য, দূরের নক্ষত্র, ওগলুলু, অন্য পৃষ্ঠা, পুরোনো বাড়ির রহস্য ও জাফলংয়ের ঘটনা... এখন পর্যন্ত লেখা এই ১৪টি আদিভৌতিক, অতিপ্রাকৃত গা ছমছমে গল্পগুলো নিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কুটি কবিরাজের সর্বপ্রথম সমগ্র বের হল! সেই ১৯৯০ সালে প্রকাশিত কুটি কবিরাজের প্রথম বইটা বাংলাদেশে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। আসুন, কয়েক ঘণ্টার জন্য হারিয়ে যাই ভূতুড়ে সব 'অতীব বিচিত্র' ঘটনার গহীনে ......
জন্ম সিলেটে। ১৯৬০-এর এক শীতের ভোরে। বাবা, মোঃ আবদুন নূর। মা, সাঈফা খাতুন। দুই কন্যার জনক, বিদৌরা ও বিয়াস। স্ত্রী, আবেদা হক। পেশা, চিকিৎসক। কিশোরগঞ্জ-এর সরকারি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান।
এক নিঃসঙ্গ চা-বাগানের সবুজ নিসর্গে তার বেড়ে ওঠা। সেখানে সারাদিন পাতাঝরার বনে বাতাসের জিফিল সুরের মুর্ছনা তুলতো। বাসার পেছনেই ছিলো সবুজ চায়ের বন। সাদা বালুঢাকা পথ সেই বনের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে কোথায় যে হারিয়ে গেছে। সে পথে সোনালী রোদের ভোরে, নরোম পালকের দুপুরে সাওতালি নারীপুরুষ কুর্মি মুন্ডা রৌতিয়া আহির বিরহোররা সার বেঁধে কাজে বেরোতো। বনের ভেতরে আরো দূরে চা-বাগানের নিঝুম স্টাফ-কোয়ার্টার। উদাস দুপুরে দূরের সাঁওতালপাড়া থেকে মাদলের সাথে ভেসে আসতো দেহাতি গানের সুর।
বাবার চাকরির সুবাদে যে চা-বাগানে বেড়ে ওঠা সেই মালনীছড়ায় এখন আর যাওয়া হয়ে ওঠে না তার। পেশাগত ব্যস্ততায়।
চায়ের বনের মানুষ তিনি, স্বপ্ন দেখেন আবার একদিন চা-বাগানে ফিরে গেছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন শিরীষ-চাপালিশের ছায়ায় ছায়ায় বন-জ্যোৎস্না গায়ে মেখে পাহাড়ের ঢালে বসে থাকা বুনো বেড়ালের খোঁজে বেড়াচ্ছেন রাতের জঙ্গলে।
“Imagination, of course, can open any door - turn the key and let terror walk right in.” ― Truman Capote, In Cold blood - জামশেদ মুস্তফির হাড় - জামশেদ মুস্তফির হাড় বইটি মূলত লেখক আবদুল হাই মিনারের কাল্পনিক চরিত্র কুটি কবিরাজ এবং তার বন্ধু কর্ণেল (অব:) গোলাম আহমদ মুনতাসির তুলুর নানা ধরণের অভিযান বিষয়ক ১৪টি অতিপ্রাকৃত গল্পের একটি সংকলন। ২০২১ সালে বইটির প্ৰথম প্রতিচ্ছবি সংস্করণ বের করা হয়। - জামশেদ মুস্তফির হাড়: জামশেদ মুস্তফির হাড় গল্পটি কুটি কবিরাজ এবং কর্ণেল (অব:) গোলাম আহমদ মুনতাসির তুলু এর প্রথম অভিযান। এই গল্পে দেখা যায় যে দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পরে একদিন চিঠির মাধ্যমে কুটি কবিরাজ তার বন্ধু তুলুকে অনন্তপুর নামক একটি জায়গায় আসতে বলেন। সেখানে এসে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন তিনি এবং কুটি কবিরাজ। এই ডুয়ো এর প্রথম অভিযান হিসেবে জামশেদ মুস্তফির হাড় গল্পটি বেশ ইন্টারেস্টিং, বিশেষ করে শেষটা একেবারে চমকে দেয়ার মতো।
ফতেহগড়ের তান্ত্রিক: কুটি কবিরাজ এবং তার বন্ধু তুলুর এবারের অভিযান ফতেহগড়ে। সেখানে ত্রিলোচন হোড় নামক এক তান্ত্রিকের সাথে দেখা হয় তাদের এবং এর পরবর্তী ঘটনা নিয়েই "ফতেহগড়ের তান্ত্রিক" গল্পের কাহিনি। গল্পের শুরুটা সাদামাটা লাগলেও ফিনিশিং এটারও বেশ শকিং।
বাদুর: কুটি কবিরাজের বন্ধু তুলুর কাছে এক বেনামি চিঠি আসে যে বারো ঘন্টা পরই কুটি কবিরাজকে খুন করা হবে, কারণ কুটি কবিরাজ তাদের সঙ্গীকে আটক করে রেখেছে । তাই তুলু ছুটে আসেন জাফলং এ কুটি কবিরাজের বাংলো "নির্জন" এ। জামশেদ মুস্তফির হাড় বইয়ের বাদুর গল্পটি বেশ ক্রিপি, এছাড়াও ভালো লেগেছে গল্পটির সার্বিক ঘটনাক্রমও। আমার মতে সংকলনের অন্যতম সেরা কাহিনি এটি।
বালক রহস্য: কুটি কবিরাজের বাসায় হঠাৎ এক দশ-বারো বছরের বালক আসে। জানা যায় তার পরিচয়ের সাথে রয়েছে কুটি কবিরাজের এক পূর্বপুরুষের সম্পর্ক। সে সম্পর্কের গূঢ় রহস্যই ভেদ করা নিয়েই এই গল্প। মোটামুটি চলে টাইপ গল্প, খারাপ লাগেনি মোটেই গল্পটা।
পতঙ্গ রহস্য: কর্ণেল (অব:) গোলাম আহমদ মুনতাসির তুলু এর ধনফকির লেনের বাসায় কাজ করা শিশুমিয়া কর্ণেলের পোষা টিয়াপাখির জন্য নানা ধরণের পোকা-মাকড় এনে দেয়, তেমনই এক জায়গা থেকে নানা ধরণের পোকা-মাকড় আনার সময় নিয়ে তার সাথে আসে এক আশ্চর্য পতঙ্গ। এই আশ্চর্যকর পতঙ্গের মস্তক, ধড় আর লেজ সব একাকার, পা বা শুঁড় কিছুই নেই। "পতঙ্গ রহস্য" গল্পটি শুরু থেকে খুব সাধারণ লাগলেও শেষ দিকে এক অদ্ভুত দিকে মোড় দেয় যা ভালো লেগেছে।
নীল দরজার রহস্য: সংকলনের সবথেকে বড় গল্প "নীল দরজার রহস্য"। এই গল্পে কুটি কবিরাজ এক আশ্চর্য ওষুধ বানাতে তিহুরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি আর তার বন্ধু তুলু ওগলুলু মন্দির এবং নীল দরজার গোলকধাঁধার ভিতরে ফেঁসে যান। এখন কিভাবে তারা সেই গোলকধাঁধায় পড়েন এবং তার পরবর্তী এক অদ্ভুত ঘটনাক্রম নিয়েই এই গল্প। সাই ফাই আর হররের মিশেলে নীল দরজার রহস্য গল্পটি দুর্দান্ত লাগলো, বিশেষ করে ওগলুলু মন্দিরের কনসেপ্টটি। তবে কয়েকটি সাবপ্লটের ব্যাখ্যা পেলাম না এই গল্পে।
কে: কুটি কবিরাজ এই গল্পে খুনের ফাঁদে ফেসে গিয়েছেন। সেই মামলার সুলুক সন্ধানে নামেন তিনি আর টুলু। হরর এলিমেন্ট থাকলেও এই গল্পটা তেমন একটা জুৎসই মনে হলোনা, গল্পের সাসপেন্সের থেকে সামাজিক ম্যাসেজ দেয়াই এই গল্পের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো বলে মনে হয়েছে।
পাথর রহস্য: কয়েক বছর আগে মিশরে যেয়ে কুটি কবিরাজ একটি পিরামিডে ঢুকে একটি পাথরে নিজের নাম লিখে দিয়ে আসে। অনেক বছর পরে সেই পাথর কুটি নিয়ে আসে নিজের বাংলো নির্জনে। এবং তারপর থেকেই শুরু হতে থাকে বাংলোকে ঘিরে অদ্ভুত সব ঘটনা। এই গল্পটা ভালোই হরর ভাইবের লাগলো।
ঘুর্ণি হাওয়ার রহস্য: এবারে তুলু জানতে পারে এক পীরের মুরিদ হয়েছেন কুটি কবিরাজ। এদিকে সেখানে গিয়ে কুটির সাথে দেখা হবার পরে তারা ভনুয়ার হাওরে প্রত্যক্ষ করেন এক অদ্ভুত ঘুর্ণি হাওয়ার। সেই ঘুর্ণি হাওয়ার রহস্য নিয়েই এই গল্পটি লেখা। সংকলনের অন্যতম দুর্বল গল্প, ভালো লাগেনি তেমন।
দুরের নক্ষত্র: এবারে কুটি কবিরাজের চিঠি পেয়ে তার বাংলো নির্জনে চলে আসে তুলু। সেখানে এসে জানতে পারে কোন এক অতিপ্রাকৃত শক্তি তাকে গোপনে লক্ষ্য করছে। ইন্টারেস্টিং প্লট হলেও দুরের নক্ষত্র গল্পটির বর্ণনাভঙ্গি দুর্বল লাগলো।
ওগলুলু: নীল পাহাড়ের রহস্য এর সেই ওগলুলু মন্দিরের খোজে এবার কুটি কবিরাজ এবং তার বন্ধু তুলু বেরিয়ে পড়েন এবং তার পরবর্তী ঘটনা নিয়ে গল্পটির কাহিনি। পুরো গল্পের প্লট, লেখনশৈলী এবং হরর এলিমেন্ট বেশ দুর্দান্ত লাগলেও ফিনিশিং এ গিয়ে তৃপ্তি পেলাম না।
অন্য পৃষ্ঠা: কর্ণেল তুলু জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। যখন যায় যায় অবস্থা তখন কুটি কবিরাজ তাকে বাঁচানোর উপায় বের করার চেষ্টা করতে থাকেন, এ নিয়েই এই গল্পের কাহিনি আবর্তিত। এই গল্পটা বেশি ভালো লাগলো না, কিছুটা ওভার ড্রামাটিক মনে হয়েছে।
জাফলংয়ের ঘটনা: কুটি কবিরাজ এবার সন্দেহ করেছে তার মালী রহমত আলী মানুষ নয়, অন্য কিছু। সে রহস্য নিয়েই এই গল্পটি। একদমই ভালো লাগলো না এই গল্পটি।
এবার আসি আমার দৃষ্টিতে সংকলনের সব থেকে দারুন গল্প পুরোনো বাড়ির রহস্য- এ। এই গল্পে জানা যায় কুটি কবিরাজের এবার শখ হয়েছে এক শতবর্ষী বাড়ি কেনার। সেরকম একটা বাড়ি পেয়েও যায় তিনি। তবে তিনি আর তার বন্ধু তুলু সেই বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন এই অঞ্চলে এই বাড়ির থেকেও পুরোনো এক বাড়ি রয়েছে। সেই বাড়িতে গেলেই নাকি রাতে অদ্ভুত মোহময় সঙ্গীত শোনা যায়। এই গল্পটা খুবই ভালো লাগলো, অনেকটা মিউজিক্যাল হররের স্বাদ পেলাম। যেমন ক্লাসিক হরর স্টোরিলাইন , তেমনই দুর্দান্ত ফিনিশিং পুরোনো বাড়ির রহস্য কে সংকলনের অন্যান্য গল্পগুলো থেকে আলাদা করে তুলেছে। - সবমিলিয়ে ভালো-খারাপ হিসেব করে দেখলে যে সময়ে গল্পগুলো লেখা হয়েছে সেই সময়ের হিসেবে বেশ ইন্টারেস্টিং এক গল্প সংকলন হচ্ছে জামশেদ মুস্তফির হাড়। সাধু-চলিত এবং আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণে বইটির ভাষারীতি কিছুটা অন্যরকম লাগলো, তাছাড়া বেশিরভাগ গল্পে কুটির বন্ধু তুলুর উত্তম পুরুষের বর্ণনা ভঙ্গি গল্পের কাহিনি বুঝতে কাজে দিয়েছে। ষাটোর্দ্ধ দুই বয়স্ক মানুষের চরিত্রায়ণও গল্প অনুসারে ভালোই হয়েছে, দুজনের পূর্বের ইতিহাসে কিছুটা ধোঁয়াশায় রয়ে গেছে অবশ্য। বইটির আরেক উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে তখনকার সময়ের সিলেট এবং তার আশপাশের অঞ্চলের বর্ণনা যা দারুন লেগেছে। অনেক গল্প বিংশ শতাব্দীতে লেখা হলেও হিউমারের প্রয়োগ ভালোই লেগেছে পুরো বই জুড়ে। তবে বেশিরভাগ গল্পই নন লিনিয়ার স্টাইলে বলা হলেও কখনো কখনো এ ধরনের বর্ণনাভঙ্গি খাপ খায়নি গল্পের সাথে। - প্রোডাকশনের দিকে তাকালে অনেক জায়গায় জামশেদ মুস্তফির হাড় বইটিকে প্রিমিয়াম প্রিন্টের বই হিসেবে আখ্যায়িত করতে দেখেছি। অবশ্য এখানে যে স্টাইলের গল্প বলা হয়েছে তাতে কিছু আর্টওয়ার্ক যোগ করলে আরো প্রিমিয়াম ফিল আসতো। আর বইতে সম্ভবত ১০০ গ্রামের কাগজ দেয়া হয়েছে, তাই ২৩০ পেইজের বই হাতে নেয়ার পরে মনে হয়েছে ৩৫০ পৃষ্ঠার কোন বই হাতে নিলাম। প্রচ্ছদও একেবারেই সাদামাটা লাগলো আর ভেতরে ছোটখাট টাইপো দেখলাম, যেগুলো আরো ভালোভাবে সম্পাদনা করলে কমে যেত। তাই আমার মনে হয় বইয়ের মূল্য অনুসারে আরো ভালো প্রোডাকশনের বই দেয়া যেতে পারতো, সে কারণে আমার কাছে বইটিকে প্রিমিয়াম প্রিন্টের কোন কিছু মনে হয়নি । - এক কথায়, বিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে দুই ষাটো��্দ্ধ বৃদ্ধের দারুণ কিছু অতিপ্রাকৃতিক অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে জামশেদ মুস্তফির হাড় বইটি লেখা। যাদের এ ধরণের অতিপ্রাকৃতিক ছোটগল্প পড়তে পছন্দ তারা বইটি পড়ে দেখতে পারেন। সামনে এ ধরণের আরো সংকলন আশা করছি কুটি কবিরাজকে ঘিরে।
কুটি কবিরাজ আর তার বন্ধু কর্নেল তুলুকে নিয়ে লেখা 'জামশেদ মুস্তফির হাড়' গল্পটা পড়েনি, নব্বই দশকের এমন পাঠক বিরল। আমিও পড়েছি সেটা কিশোর অবস্থায়, সাথে আরো ২-১টা গল্পও আগে পড়া। সঙ্কলনের অন্য গল্পগুলো আমার কাছে নতুন। এই বইটির ব্যাপারে, বা বইয়ের গল্পগুলোর ব্যাপারে, আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। ভাল'র দিকে বলতে গেলে, সিলেট-আসাম-শিলংয়ের বনপাহাড়ীর এমন অপরূপ বর্ণনা খুব কম বাংলা বইতেই পাওয়া যায়, অতিপ্রাকৃত কাহিনীতে তো পাওয়াই যায় না। কাল্পনিক শহর হলেও অনেক জায়গাতেই বাস্তব জায়গাগুলোর বর্ণনাই ব্যবহার করেছেন লেখক। ভাষাটাও একদমই অন্যরকম; কুটি কবিরাজের সাধু ভাষা, কর্নেল তুলু'র চলিত ভাষার মাঝে মাঝে আঞ্চলিক শব্দগুলোর এত চমৎকার ব্যবহারও দুর্লভ, একদম মিশে যেতে হয়। এই ভাষা আর গল্প বলার গুণেই সাদামাটা বেশ কিছু কাহিনীও উপভোগ্য হয়ে উঠেছে আর একেবারেই কিছু গালগপ্পো হয়ে উঠেছে পঠনযোগ্য। বাংলাদেশের নবীন যেসব লেখক থ্রিলার-হরর-ফ্যান্টাসি লেখেন, তাদের অনেকেই চমৎকার গল্প থাকার পরেও স্রেফ শিশুতোষ লেখার ধরণ আর গল্প বলার ক্ষমতার অভাবে পুরো বইটাকে আবর্জনা বানিয়ে ফেলেন। এদের জন্য আবদুল হাই মিনারের লেখা অনুকরণীয়। কাহিনীর ব্যাপারে বলতে গেলে, খুব যে একটা আহামরি কাহিনী আছে কোনটায় তা নয়, কেবল বর্ণনার কারণেই অনেকগুলো গল্প জমে গেছে। বেশিরভাগ কাহিনীই আকাশ থেকে পড়া, সম্ভবত প্রায় সবক'টাই গল্প বলে, উপন্যাস হলে অন্যরকম হতেও পারতো। এমনকি কুটিরও তেমন কোন ব্যাকগ্রাউন্ড গড়ে তোলা হয়নি, সে একজন ভবঘুরে স্বভাবের কবিরাজ এইটুকু বাদে। এছাড়া অন্যান্য কোন গল্পের চরিত্রেরই কোন আগামাথা নেই। সবক'টা গল্পঐ কিশোরদের গল্প শোনানোর একটা ধরণ আছে; লেখার অসাধারণ স্টাইলের সাথে সেটা বেশ বেমানান। সব মিলিয়ে, সকলের পড়া উচিত স্রেফ গল্প বলা আর বর্ণনা উপভোগ করার জন্য, কাহিনীতে বেশি গভীরতা না খোঁজাই ভাল। তারানাথ তান্ত্রিকের মত কাল্ট ক্লাসিক হবার মত সম্ভাবনা ছিল কুটি কবিরাজের, সেটা হলো না এটাই যা আফসোস। আমার সার্বিক রেটিং ৩.৫।
বাংলাদেশে মৌলিক উইয়ার্ড ফিকশন জনরার জনক যদি আব্দুল হাই মিনার বলা হয় তাহলে কি ভুল হবে? কি দুর্দান্ত সব গল্প এই সংকলন এ!আধিভৌতিক, সাই ফাই,মাল্টিভার্স রিলেটেড গল্প,ফ্যান্টাসি সব কিছুর মিশেলে যেন পয়সা উসুল করার মতো একটা বই।আশি নব্বই দশকে এমন লিখা কল্পনাও করতে পারি না।আর কি সুন্দর উপমা প্রয়োগ করে লেখনী।এক কথায় মুগ্ধ করার মতো বই।
এক 'অতীব বিচিত্র ঘটনা' ঘটতে যাচ্ছে জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে কুটি-কবিরাজ। ওদিকে চিঠি পেয়ে তার বন্ধু কর্ণেল মুনতাসির হায়দার ওরফে তুলু চিন্তায় মারা যাচ্ছেন আর ছুটে আসতে আসতে ভাবছেন, হতভাগা আবার কোন ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে কে জানে!
মোটামুটি ১৪টি গল্প সব একই প্যাটার্নে সাজানো। দুই ষাটোর্ধ্ব কিউট বুড়োর রীতিমতো এডভেঞ্চার আর অলৌকিকতার নেশায় ঘটানো অদ্ভুত সব কান্ডকারখানা নিয়েই সাজানো প্রতিটি গল্প। দুই বুড়ো মেইন ক্যারেক্টার যেখানে, সেখানে একশন ছাড়া আতঙ্ক কিভাবে সৃষ্টি করা যায় সেটা ছিলো বেশ ইন্টারেস্টিং। প্রথম গল্প, জামশেদ মুস্তফির হাড় পড়ার পরেই মনে হচ্ছিলো এই গল্পটা আমার পড়া। অনেক আগে কিশোর পত্রিকা, কিশোর কন্ঠ, রহস্য পত্রিকা এসব কিশোর ম্যাগাজিন বেশ পড়তাম। সেই হিসেবে গল্প পড়ে ফেলাটা অস্বাভাবিক কিছুই নয়। অনেক দিন পর কিশোর বেলার সেই ঘ্রাণ পেলাম যেন বইটা পড়ে।
আহামরি কোনো বিচিত্র গল্প ছিল না। তবে যে সময়কালে লেখা, সেই সময়কালে অলৌকিকতার আদলে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখা, প্যারালাল ইউনিভার্সের ব্যবহার, চমৎকৃত করেছে বইকি। 'বেশিরভাগ গল্প' পড়ে যেতে বেশ আরাম। আগ্রহ ধরে রেখেছিলো বেশ। টানা পড়ে যেতেও বিরক্ত লাগেনি। ঝরঝরে বর্ণণা, আর দুই বুড়ো প্রোটাগনিস্টের কিউট কিউট সব কাজকারবার নিয়ে ভালোই মজে ছিলাম দুটো দিন। সাথে জাফলং এর পাহাড়ি প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিচিত্র খাবারের বর্ণণা, ছোট ছোট হাস্যরস প্রকৃত অর্থেই একটা ভালো এক্সপেরিয়েন্স। অনেকটা তারানাথ তান্ত্রিকের আবহাওয়া যেন। আমি নিশ্চিত আমার কৈশোরে এই বইটি পেলে আমি অনেক খুশি হতাম। বিষয়ের দিক থেকে খুব জমাট কিছু না পেলেও এখনকার বহু লেখকের তুলনায়, এই টপিক দিয়েই বেশ জমিয়ে রাখতে পেরেছেন লেখক আবদুল হাই মিনার, শুধুমাত্র তাঁর লেখনীর জাদুতে। এই সকল বিষয়ের বাইরেও, বন্ধুর প্রতি বন্ধুর ভালোবাসা, মায়া এই প্রায় হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কটাকে সুক্ষ্ণভাবে তুলে ধরেছেন লেখক সার্থক ভাবে।
শৈশব-কৈশোরের সেই নস্টালজিয়া কিছুটা হতেও পাইয়ে দিতে সক্ষম বইটি, তাই চাইলে তুলে নিতে পারেন কুটি-কবিরাজ সমগ্রের প্রথম খন্ড, জামশেদ মুস্তফির হাড়।
❝ষাটোর্ধ্ব দুই বুড়া তাদের কান্ড দেখে চক্ষু ছানাবড়া, ভয়ের তাদের নেই কোন ছাড় হাতে পেয়েছে জামশেদ মুস্তফির হাড়!❞
মাথার খুলি, য জ্ঞ, ব লি দান আর ভ য়ং ক র দেখতে তান্ত্রিকের গল্প তো জানা আছে বেশ। এবারে রহস্য কিংবা অতিপ্রাকৃত ঘটনার মূল চরিত্র একজন কবিরাজ। চেনা নাম তার কুটি-কবিরাজ। সহযোগী হলেন তারই বাল্যকালের বন্ধু কর্ণেল মুনতাসির হায়দার ওরফে তুলু।
দুজনেই ষাটোর্ধ্ব বুড়ো। কিন্তু রহস্য সমাধান কিংবা কুটি দাদুর ভাষায় ❛অতীব আশ্চর্য ঘটনা❜ প্রত্যক্ষ করার ব্যাপারে দুই বন্ধুর জুড়ি নেই। বয়স সেখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। পরিবারের পিছুটান না থাকা এই দুই বন্ধুই একটা পরিবার। মাস অন্তর অন্তর কুটি-কবিরাজের চিঠি আসে তুলু দাদুর কাছে। যার মূলভাব, ❛❛অতীব আশ্চর্য ঘটনা❜ ঘটিয়াছে তুলু। তুমি একবার আসিয়া প্রত্যক্ষ করিয়া একটা মতামত দাও।❜ ব্যস, শুরু হয়ে যায় তাদের অভিযান। কখনো ভৌতিক, কখনো কল্পনার কিছু যা অকল্পনীয়, কখনো বৈজ্ঞানিক কোনো ঘটনা আবার কখনো ব্যাখ্যাতীত কিছুর মুখোমুখি হোন তারা। যার শুরু হয় ❛জামশেদ মুস্তফির হাড়❜ এর ঘটনা থেকে। এ ঘটনার যবনিকা পাঠ ছিল মুখ হা করে দেয়ার মতো।
এরপর থেকে নিয়মিত বিরতিতে দুই বুড়ো বিভিন্ন ❛অতীব আশ্চর্য ঘটনা❜ এর সম্মুখীন হোন। ফতেহগড়ের তান্ত্রিক ত্রিলোচন হোড়ের রহস্য, বাদুড় দ্বারা প্রায় প্রাণ যাওয়ার মতো অব���্থা থেকে বেরিয়ে আসার গল্প, চওড়া কাঁধ-পুরু গোড়ালির সেই বালকের রহস্যের সম্মুখীন হতে থাকে তারা। রহস্য সমাধানের সাথে উদরপূর্তিও চলতে থাকে বেশ। নানা পদের খাবার অনায়াসে এই বয়সেও বাঁধাহীনভাবেই খেয়ে যায় তারা। এরপর সামনে আসে পতঙ্গের রহস্য। ম রা ছোট্ট একটা পতঙ্গ কী করে শার্টের পকেট এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যেতে পারে? চিন্তায় কুচিয়ে যায় কবিরাজ। এরপর তাদের সামনে আসে নীল দরজার রহস্য। গা হিম করে দেয়া এই নীল দরজা আর মন্দিরের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে কত সময় কাটিয়ে দেয় তারা?
❛অতীব আশ্চর্য ঘটনা❜ নিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াত�� কুটি দাদু ফেঁ সে যায় পুলিশ কেসে। উদ্ধার করতে পত্র পাঠায় তুলু দাদুকে। পত্রপাঠ তুলু দাদু হাজির বন্ধুর ❛নির্জন❜ বাড়িতে। সেখানে পরপর তিনটে একই ধারার খু নে র রহস্য জানতে গিয়ে স্বচক্ষে দেখে চতুর্থ খু ন। ধারাবাহিক এই হ ত্যা র রহস্য হৃদয়স্পর্শী। তবে এ যাত্রায় বেঁচে যায় কুটি দাদু।
বছর দশেক আগে মিশরের পিরামিডের পাথরে নাম লিখে আসেন কুটি-তুলু দাদু জুটি। সেই পাথর কী করে দশ বছর বাদে জাফলংয়ে হাজির তা দেখে তো মাথায় হাত! এর পেছনে কী আছে? অতিপ্রাকৃত কিছু না অন্য কোনো সত্তা?
পাথর রহস্যের পর কেটে গেছে এক বছর। এরপর আবার নতুন এক ❛অতীব আশ্চর্য ঘটনা❜ এর স্বাক্ষী হতে যাচ্ছেন কুটি-তুলু দাদু জুটি। কুটি দাদু এবার মুরিদ হয়েছেন এক বাচ্চা মাওলানার। তার সাথে ঘূর্ণি হাওয়ার মাঝে অভূতপূর্ব এক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন তারা। পরিতৃপ্তি আর ভালো লাগায় জুড়িয়ে যায় তাদের মন।
❛অতীব আশ্চর্য ঘটনা❜ কে ছাপিয়ে এবার কুটি দাদুর চিঠি ছিল ❛জান-হিম-করে-দেয়া❜। মৃ ত্যু ভয় জেকে বসেছে তাকে। কারা যেন দূর থেকে লক্ষ্য রাখছে তার দিকে। ভয়ে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছেন তিনি। তুলু দাদু ছুটলেন আবার। কে বা কারা নজর রাখছে তার বন্ধুর গতিবিধির উপর? জানতেই হবে।
❛ওগলুলু❜ অর্থ ❛ভূতের শহর❜। সেই ত্রিশ বছর আগে নীল দরজার রহস্য ভেদ করতে গিয়ে দুই বন্ধু গিয়েছিলেন ওগলুলু নামের সেই শহরে। সেই শহর আবার ডাকছে তাদের। কোন বিপদের সম্মুখীন হবে এবার তারা? জান নিয়ে ফিরতে পারবে তো? এবারের রহস্যের সমাধান আছে অন্য পৃষ্ঠাতে। এবার রহস্য থেকেও বেশি জড়িয়ে আছে আবেগ। সমাধান করতেই হবে। তবে এবারের চ্যালেঞ্জ একা কুটি দাদুর।
পুরোনো সবকিছুতেই একটা ইতিহাস, একটা রহস্যের গন্ধ কিংবা অতিপ্রাকৃত একটা গন্ধ থাকে। তেমনি পুরোনো বাড়িকে ঘিরে থাকে মিথ, ভৌতিক কোনো গল্প। কুটি দাদুর ইচ্ছে তেমন পুরোনো কোনো বাড়ি খরিদ করবেন। সে উদ্দেশ্যেই আবার যাত্রা শুরু দুই বন্ধুর। খোঁজ পায় এমন এক পুরোনো বাড়ির। যে বাড়িতে শীতের রাতে ভুবন ভোলানো সুর শোনা যায়। এ সুরের উৎপত্তি কোথায়? তুলু দাদু দাঁড় করিয়েছেন একটা ব্যাখ্যা। ব্যাখ্যাই কী সব?
পথে প্রান্তরে কিংবা দূর কোথাও ❛অতীব আশ্চর্য ঘটনা❜ দেখতে দেখতে এবার কুটি-তুলু দাদু জুটি সম্মুখীন ঘরের অবাস্তব এক ঘটনায়। কুটি দাদুর মালী রহমতকে নিয়ে এবারের আশ্চর্য ঘটনা। ঘটনার উৎপত্তি কুটি দাদুর মাধ্যমে। আর শেষ?
আচ্ছা, এই যে এত বছর কেটে যায় ষাটোর্ধ্ব দুই বুড়োর বয়সের গাছপাথর কি নেই? অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল আর কবিরাজি ছেড়ে দেয়া কুটি কী করে দিনাতিপাত করে? এর রহস্য কোথায় আছে? জানতে হলে পড়তে হবে ❛জামশেদ মুস্তফির হাড়❜।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
বিশাল কাহিনি সংক্ষেপ দিয়ে দিয়েছি। তবে গল্প সমগ্রের ক্ষেত্রে প্রতিটা গল্প নিয়ে একটু কথা না বললে শান্তি লাগে না এই আরকি। ১৯৯০ সালে সেবা প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছিল আবদুল হাই মিনারের লেখা ❛জামশেদ মুস্তফির হাড়❜। কুটি কবিরাজ লেখকের একটি কাল্পনিক চরিত্র। অদ্ভুত এক চরিত্র। যার সহযোগী তার বন্ধু তুলু। তাদের বিভিন্ন ঘটনার গল্প নিয়ে ২০২১সালে প্রতিচ্ছবি প্রকাশনী প্রকাশ করে ❛কুটি-কবিরাজ সমগ্র-১❜। সমগ্রে ১৪টি গল্প রয়েছে। বইটির ঘরনা বিচার করতে গেলে নানাভাবে বলা যাবে। তবে প্রকাশকের ভাষ্যমতে একে ❛ভৌতিক বিজ্ঞান গল্প❜ ধারায় ফেলা যায়। ১৪টি গল্পের প্রতিটি ছিল ভিন্ন। ভৌতিক, কিছুটা সাই-ফাই ধারার আবার একেবারেই অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটনার অবতারণা করেছেন লেখক। সমগ্রের প্রথম গল্প অর্থাৎ ❛জামশেদ মুস্তফির হাড়❜ দিয়ে যাত্রা শুরু হয় দুই বুড়োর। এ গল্পের শুরুটা ঐ তন্ত্র মন্ত্র জাতীয় ঠেকছিল। তবে শেষে এসে বেশ ভালোভাবেই চমকে দিয়েছেন লেখক। ১৪টি গল্পের মাঝে প্রথমটি শুরু হিসেবে বেশ ভালো লেগেছে। মাঝের কিছু মোটামুটি মানের ছিল। তবে ❛পতঙ্গ রহস্য❜ গল্পের শেষটুকুতেও লেখক ঘরনা বদলে দিয়েছেন নিমিষেই। ❛কে❜ গল্পে লেখক ভৌতিকতার মাঝে সুন্দর একটা মেসেজ দিয়ে দিয়েছেন যেটা খুব ভালো লেগেছে। ❛পুরোনো বাড়ির রহস্য❜ গল্পের পরিবেশ দারুন লেগেছে। মেলোডি সাথে অতিপ্রাকৃতের স্বাদ ছিল দারুণ। তুলনামূলক দুর্বল লেগেছে ❛বাদুড়❜, ❛ঘূর্ণি হাওয়ার রহস্য❜, ❛ওগলুলু❜। ঘটনার অবতারণা বেশ শক্তভাবে করলেও শেষে গিয়ে কেমন সাধারণ মানের ইতি টেনেছেন মনে হয়েছে। ❛অতীব আশ্চর্য ঘটনা❜ এর পাশাপাশি লেখক এই দুই বুড়োর খাওয়া যে রাশভারী দেখিয়েছেন সেটা প্রশংসার দাবিদার। নানা পদের খাবারের বর্ণনা, রন্ধনকৌশল একেবারে মুখরোচক করে লিখেছেন। আমি ছাড়া অন্য যেকোনো খাবার নিয়ে নখরা না করা কেউ খাবারের বর্ণনায় জিভ লকলক করতে বাধ্য হবে। আমার ক্ষেত্রে উল্টো হয়েছে। পৃথিবীর খুব খুবই সীমিত কিছু খাবার আমি অনেক বাছবিচার করে খাই বলে খাবারের বর্ণনাগুলো আমি অনেকটা স্কিপ করে যাচ্ছিলাম। তবে আমার মতো খাওয়া নিয়ে নক্তা না থাকলে ভেড়ার মাংসের সাথে খিচুড়ির বর্ণনা আপনার ভালো লাগতে পারে।
প্রোডাকশন:
২৩০পৃষ্ঠার বইটি দেখলে ৩৫০-৪০০পৃষ্ঠার মনে হয়। প্রোডাকশন বেশ ভালো। শক্তপোক্ত বই। পেইজগুলো অনেক বেশি পুরু। এক পৃষ্ঠা শেষ করে পরবর্তী পৃষ্ঠায় যেতে গিয়ে কয়েকবার ভেবেছি দুই পৃষ্ঠা উল্টে ফেললাম নাকি! হরর পড়তে ভয়ভয় কিংবা ছমছম লাগার ফলে যদি আপনি হরর এড়িয়ে যান সেক্ষেত্রে এই বইটি নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন। গা ছমছম করা কিছু নেই। তবে ভালোলাগার বেশ ভালো রসদ আছে বইটিতে।
কুটি আর তুলু। একজন কবিরাজ আরেকজন কর্নেল। কী কাজ এই দুই বুড়োর? বুড়ো বলছি কারণ দুইজনের বয়স প্রায় ষাটোর্ধ্ব! অদ্ভুতুড়ে কাজ নিয়ে দুই বুড়োর ভীমরতি না-কি নেশা সে জানতে হলে তাদের সাথে সফরে বের হতে হবে! ভুতুড়ে আবার কেন টানলাম? সেইরকম কিছু আছে? শুধু আছে বলাটা ভুল, এমন অনেককিছু আছে যা চিন্তার বাইরে? মানে আউট অব দ্য ওয়ার্ল্ড? ধরে নেন তা-ই!
অলৌকিক এমনসব ১৪টি কাণ্ডকারখানা নিয়ে ভর্তি এই ❛জামশেদ মুস্তফির হাড়❜ বইটি। কিছু গল্প বেশ রহস্যময়, কিছু গল্পের ব্যাখা দেওয়া মুশকিল আর কিছু তো কল্পনাতীত! ❛জামশেদ মুস্তফির হাড়❜ বইটির নামকরণ এই সংকলনের প্রথম গল্পের নামানুসারে। কারণ শুরুটা এইখানে। এই জামশেদ মুস্তফিরের পেছনে কুটি কবিরাজ কাটিয়ে দিয়েছে পাক্কা ২৫ বছর! কেন? সে-ই ঘটনা জানতে দ্বারস্থ হওয়া লাগবে কর্নেল (অব:) গোলাম আহমদ মুনতাসির তুলু দাদুর। কারণ এই কুটি বাবুর একমাত্র ভরসা আর বিশ্বাসের পাত্র এই তুলু দাদু। একজন কর্নেল হয়েও অবিশ্বাস্য এমন অনেক ঘটনার মুখোমুখি না হলে হয়তো বিশ্বাস করতেন না যে দুনিয়াতে অপার্থিব কতকিছু ঘটে। ‘অতীব বিচিত্র ঘটনা’ বলে তুলু দাদু এইসব ঘটনাকে আখ্যা দিয়ে থাকে। আর এ-ও মাথায় আসে না কেন সব রহস্য কবিরাজ কুটিকে ঘিরে সৃষ্টি হয়।
১৪টি গল্পের মধ্যে ‘পতঙ্গ রহস্য’, ‘নীল দরজার রহস্য’, ‘ওগলুলু’ ও ‘পুরোনো বাড়ির রহস্য’ বেশ ভালো লেগেছে। বাকি গল্পগুলোর মধ্যে ‘জামশেদ মুস্তফির হাড়’ অর্থাৎ প্রথম গল্পটি বেশ চমকপ্রদ। অন্যান্য গল্পগুলোর কোনোটার ব্যাখা নেই (অতিপ্রাকৃত জানি, ব্যাখা থাকবে না। কিন্তু নির্��িষ্ট কিছু কারণ থাকে কোনো ঘটনা ঘটিত হওয়ার পেছনে আমি সেই ‘ব্যাখা’ বোঝাতে চাচ্ছি), কোনোটার ফিনিশিং দুর্বল, কোনোটা অতি নাটকীয়৷ হয়তো অনেকের সবকয়টি গল্পও ভালো লেগে যেতে পারে।
লেখনশৈলীর বিষয়ে বলতে গেলে খুবই মিশ্র। অর্থাৎ সাধু ভাষায় লেখা কুটির চিঠি, আঞ্চলিক সংলাপ সাথে চলিত ভাষা তো আছেই৷ একেবারে স্মুথ বলা যাচ্ছে না অর্থাৎ গল্পগুলো পড়ে আর লেখনশৈলীর কারুকাজে যে মুহূর্তে ভয়ের উৎপত্তি হবে সেইরকম না৷ প্রত্যকটি গল্পের টুইস্ট এইখানে মূল হাতিয়ার। ৯০ এর দশকের সময়ে যেহেতু গল্পগুলো লেখা সে-ই ফ্লেভার অনুযায়ী ভালোই। তবে সম্পাদনার দরকার ছিল অনেক। বিশেষ করে বাক্যে। বানান ভুলেরও শেষ নেই।
কুটি কবিরাজ আর কর্নেল মুনতাসির তুলু এইখানে মেইন প্রোটাগনিস্ট। তাদের ব্যাকস্টোরি অত জবরদস্ত দেখানো হয়নি, হালকার ওপরে ঝাপসা প্রলেপ। তবে লেখক সীমিত পরিচয়ের সাথে আচার আচরণ কেমন সেটা প্রত্যকটি গল্পের অভ্যন্তরে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। চালাকি করেছেন এখানে। অবশ্য গল্পের ভোলে একবার পড়লে এতকিছু খেয়ালে তেমন আসবে না।
‘নীল দরজার রহস্য’ ও 'ওগলুলু’ গল্প দুইটি তখনকার সময়ে লেখক কী ভেবে লেখেছে তার বিস্তারিত জানতে ইচ্ছে করছে। যারা নেটফ্লিক্স ফেমাস জার্মান ওয়েব সিরিজ ‘ডার্ক’ দেখেছেন তারা এই গল্পটির সাথে অনেককিছু রিলেট করতে পারবেন। জোশ। এই গল্পকে পুরোপুরি অতিপ্রাকৃত বলা সম্ভব না, সাই-ফাইয়ের আবহ পুরোপুরি রয়েছে। এছাড়া সংলাপে তুলুর কুটিকে উদ্দেশ্য করে বলা ‘হতভাগা’ ঠাট্টা শব্দের প্রয়োগ বেশ মজা লেগেছে।
❛জামশেদ মুস্তফির হাড়❜ বইটি পড়ে এমন সব রেসিপির নাম জানতে পেরেছি পারতপক্ষে কখনও খাইনি। রীতিমতো লোভ লাগিয়ে দিয়েছে বুড়ো দুটো। এই খাওয়ার বিষয়টি বেশ রসালো লেগেছে। এই বই পড়ার সময় কিছু খাওয়ার নিয়ে বসিয়েন।
প্রোডাকশন নিয়ে বলতে গেলে প্রচ্ছদে প্রথম গল্পের একটি দৃশ্য রয়েছে। অথচ বইটি আরও দারুণ প্রচ্ছদ ডির্জাব করে৷ যা-ই হোক, ১০০ গ্রামের কাগজ দেওয়াতে বইটিকে অনেক মোটা লেগেছে। ২৩৪ পেজের বই বলে মনে হয়নি প্রথমে। বাঁধাই মোটামুটি। সবমিলিয়ে দামের দিক থেকে প্রোডাকশন কোয়ালিটি আরও বেটার হতে পারত।
➠ বই : জামশেদ মুস্তফির হাড় | কুটি-কবিরাজ সমগ্র-১ ➠ লেখক : আবদুল হাই মিনার ➠ জনরা : অতিপ্রাকৃত গল্প সংকলন ➠ প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০২১ ➠ প্রচ্ছদ : আমাজন ভার্সন অবলম্বনে ➠ প্রকাশনা : প্রতিচ্ছবি প্রকাশনী ➠ মুদ্রিত মূল্য : ৪৫০ টাকা মাত্র ➠ পৃষ্ঠা : ২৩৪
শেষ করলাম এখন, খুব বেশি দিন ধরে পড়তে হইসে এমন না, কিন্তু গ্যাপ দিয়ে দিয়েই তো পড়তে হইসে। একেকটা গল্প পড়ে কেমন লাগল লিখে রাখতে চাচ্ছিলাম, অন্যগুলার জন্য যেমন করসি বা করতেসি। কিন্তু করে করে আর করা হইল না। যাই হোক এখন আগের গুলা আর পরের গুলা কেমন লাগল, একটা জেনারেল ফিলিং, আর কিছু স্পেসিফিক ফিলিং লিখি -
এমনিতে লেখার হাত বা ভাষা বেশ ভাল, কিন্তু হ্যাঁ, নদীয়া ঘেঁষা - যেহেতু বেশ আগেকার লেখা প্রথম গল্পগুলা, এটা অবাক হওয়ার মত কিছু না। - আরেকটা পসিটিভ হচ্ছে বেশ কিছু লোকাল আর ইসলামী শব্দের ব্যবহার। যদিও ইসলামী শব্দ আর দোয়াদুরুদ আরেকটু কম হলে ভাল হইত মনে হয়। তারপর, কর্নেল দিয়ে সেন্টেন্স শুরু না করে শেষ করলে তো হয় না। কবিরাজও কি কাজ করে? সবসময় অবশ্যই না। আর ভাই, জড়াজড়ি বেশিবেশি। চিনচিনা ঘাম সব জায়গায়। ওভারইউসেজ সম্পর্কে সচেতনতা অনেক বাড়ানো দরকার ছিল। আর এগুলার থেকে বেশি প্রব্লেমেটিক হচ্ছে দুইটা জিনিস, একটা বিচিত্র ঘটনায় পারটিসিপেশন নিয়ে কথাবার্তা, আর একচুয়াল পারটিসিপেশনের সময়কার পারটিসিপেশন নিয়ে কথাবার্তা কাজ করে না। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে, ন্যারেশনের টেকনিক হিসাবে ঘটনার ক্রম/সিকোয়েন্স বা টাইমলাইন আগে পড়ে করাটা একদম ভাল ভাবে হ্যান্ডল করা হয় নাই, এজন্য কাজ করে না একদম। কুটির সাধুভাষা পড়তে খুব ভাল লাগে।
সব গল্পে না অবশ্য, মাঝের দিকে কিছু গল্পে একটু বেশি ছিল সবকিছু, আচ্ছা স্পেসিফিকালি বলি -
জামশেদ মুস্তফির হাড়ঃ ইন্টারেস্টিং, যদিও ক্লাইম্যাক্সটা প্রেডিক্টেবল ছিল। ভাষাটা এটাতেই নোটিস করসি প্রথমে। সাস্পেন্স ও ভালই ছিল, খারাপ না। এইটা প্রথম টেলস এর প্রথম গল্প গোল্ডবাগের কথা মনে করায় দিসিল।
ফতেহগড়ের তান্ত্রিকঃ ভালই, কিন্তু আগেরটার থেকে হয়ত অল্প একটু কম প্রেডিক্টেবল, কিন্তু স্টোরিটেলিং আগেরটার থেকে একটু কম ভাল। এটাও তো টেলস এর একটা গল্পের মত মনে হচ্ছিল এক সময়, কিন্তু এখন মনে পরতেসে না।
বাদুড় - এইটা মি ভাল্ডেমারের কথা মনে করায় দিসিলো। নাকি প্রোফেসর শঙ্কু ও হাড়ের কথা ভাবসিলাম? না মনে হয়।
বালক-রহস্য - ভালই।
পতঙ্গ-রহস্য - এইটা পুরাপুরি প্রোফেসর শঙ্কু ও গোলক-রহস্য এর কথা মনে করায় দিবে।
নীল দরজার রহস্য - এইটা থেকে খুব সম্ভবত আরেকটা ফেজ শুরু। অনেক বড়, আগের গুলা ছোট ছোট ছিল। এইটাতেই টাইমলাইনের এদিক ওইদিক হওয়াটা সবচেয়ে বেশি চোখে পরে। আর আডভেঞ্চার, সাস্পেন্স, চেজটা কোন সেন্স-মেক করে না তেমন। প্রেডিক্টেবল কিছুটা, দরজার ব্যাপারটা। কিন্তু ওই প্যারালাল ইউনিভার্স এর দুই ঝাড়ুর এক্সপ্লেনেশন টা বেশ ভাল। মেয়ে দুইটার নাম যে কুটি জানত, কেন জানত এইটা আনরিজল্ভড থেকে গেসে। খুব সম্ভবত ওভারসাইট।
কে? - এইটা এতটা প্রেডিক্টেবল ছিল না, আর ক্লাইম্যাক্সটা বেশ ইন্টারেস্টিং। কিন্তু অন্য সবার পাথর হয়ে যাওয়া আরো ভাল ভাবে হ্যান্ডেল করা দরকার ছিল।
পাথর-রহস্য - এইটা বেশ ইন্টারেস্টিং ছিল, যদিও আরেকটু ভাল ভাবে লজিকটা দাড়া করানো খুব দরকার ছিল। সব পিরামিড কি তাহলে এইক্ষনে উড়ে চলে গেসে মিশর থেকে কুটি-তুলুর জগতে?
ঘূর্ণি হাওয়ার রহস্য- এইটার ক্লাইম্যাক্স কোন সেন্স মেক করে না। গল্পটাই কোন সেন্স মেক করে না। এইটা বেশ বাজে। এর পর থেকেই মনে হয় পড়তে ইচ্ছা করতেসিল না আর, নাকি? হ্যাঁ তাই মনে হচ্ছে।
দূরের নক্ষত্র - এইটার লজিকও দুর্বল। জাপান থেকেই পাথর টা নিয়ে যায় নাই কেন? ওই গর্তের থেকে বের করতে পারে নাই, অথচ সিলেট থেকে মহাবিশ্বের অন্য প্রান্তে নিয়ে যেতে পারসে? আর এইটার লজিক ইউজ করে সোনা না শুধু, সম্পদের চ্যালেঞ্জ ছাড়াও, বয়সের বড় চ্যালেঞ্জটা হ্যান্ডল করা যাইত। এইটাই তো মিথ - সব ধাতুকে সোনা বানায়, আর অমরত্ব দেয় সব মানুষ (বা কার্বন-বেসড লাইফফর্মকে?)।
ওগলুলু - এটা এই কালেকশনের সবচেয়ে ভাল গল্প ছিল। এটা খুবই ভাল। কিন্তু আশ্চর্য জনক ভাবে এই একটা গল্পই প্রপারলি শেষ করে নাই -আর তার চেয়েও বড় কথা এর পরের গল্পে এইটার কন্টিনিউএশন নাই। অথচ এইটারই বেশি দরকার ছিল।
অন্য পৃষ্ঠা - ভাল না বেশি। খালি সাধু ভাষাটাই ভাল। টাইমলাইন এইদিক সেইদিক করাটা এনার হয় না আসলে।
পুরোনো বাড়ির রহস্য - ভালই।
জাফলংয়ের ঘটনা - এইটা তাহলে মি, ভাল্ডেমারের টা যেটার কথা ভূমিকায় বলসিল। এই তথ্য জেনে আমার ক্লাসিফিকেশন এদিক সেদিক হয়ে গেসে, এইটাও কি তাহলে অনেক আগে লেখা গল্পগুলার একটা? কিন্তু মনে তো হয় না, যেহেতু আগের গুলার সাথে কানেকশন আসে (ওয়াসেক এর কথা ভাবতেসি মূলত)। যাইহোক এটা সরাসরি ভাল্ডেমার, আর বাদূর আমার কাছে অসরাসরি ভাল্ডেমার - ওই কঙ্কাল হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা। যদিও এইটাতে একটা ইনকন্সিটেন্সি ছিল কথা বলা নিয়ে, কঙ্কাল হওয়ার আগে বা পরে যেটা আরেকটু ভাল ভাবে হ্যান্ডল করা দরকার ছিল।
পো শেষ করলে কি আরো অনেক গল্পের সাথে মিল পাইতাম? খ্যাল করতে হবে যখন পড়ব।
পাঠকদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় এবং প্রায় কাল্ট হয়ে ওঠা কুটি কবিরাজের নানা কাহিনি একসঙ্গে পড়তে পাওয়া বড়োই আনন্দের বিষয় ছিল। শরীফুল হাসানের ভূমিকা এবং প্রকাশকের বক্তব্যের পর এই বইয়ে, অর্থাৎ সমগ্রর প্রথম খণ্ডে পেলাম নিম্নলিখিত ক'টি গল্পকে~ ১. জামশেদ মুস্তফির হাড়; ২. ফতেহগড়ের তান্ত্রিক; ৩. বাদুড়; ৪. বালক-রহস্য; ৫. পতঙ্গ-রহস্য; ৬. নীল দরজার রহস্য; ৭. কে? ৮. পাথর-রহস্য; ৯. ঘুর্ণি হাওয়ার রহস্য; ১০. দূরের নক্ষত্র; ১১. ওগলুলু; ১২. অন্যপৃষ্ঠা; ১৩. পুরোনো বাড়ির রহস্য; ১৪. জাফলঙের ঘটনা। এদের মধ্যে অধিকাংশই নিতান্ত শিশুতোষ ফ্যান্টাসি— যাতে গথিক উপাদান, হিউমার, আর নানাবিধ সুখাদ্যের মিশ্রণ ঘটেছে। তবে কয়েকটি গল্পে বিচিত্র ভঙ্গিতে কল্পবিজ্ঞানের বড়ো ভালো-ভালো কিছু বিষয় উত্থাপিত ও উল্লিখিত হয়েছে। সেই গল্পগুলো নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনার অবকাশ আছে। কুটি কবিরাজ আর তাঁর বন্ধুর সঙ্গে সময়টা বেশ ভালোই কাটল।
কর্ণেল মুনতাসির হায়দার ওরফে তুলু এবং মির্জা শিপহার বেগ ওরফে কুটি কবিরাজ- দুই ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ। তাদের "অতীব বিচিত্র ঘটনা"বলির সমাহার এই বই। সাইন্স ফিকশন, প্যারানর্মাল, হরর - সবধরনের স্বাদই পেয়েছি এই গল্পগ্রন্থে। তারানাথ তান্ত্রিকের পর আরেকটা বই পেলাম যেখানে হরর/সুপারন্যাচারাল গল্প লেখা হয়েছে প্রকৃতি আর খাবারের অসাধারণ বর্ণনাকে সাথে রেখে। গল্পগুলোর কলেবর ছোট হলেও ফ্লো খুবই স্মুদ লেগেছে। জনাব মিনারের লেখার হাত নিয়ে বলার কিছু নেই। উনার মত উপমা দিতে নিপুণ লেখক কমই দেখেছি। একটা উদাহরণ দেইঃ "আকাশের গনগনে কমলা লাল রঙের আগুনের গোলকটা যেন নিতান্ত অনিচ্ছায় হেলে পড়ছে পশ্চিম আকাশে।" সূর্যাস্তের এমন যথাযথ উপমা খুব কমই দেখেছি। এছাড়াও কোথাও লেখায় বিরক্তি আসে নি। কিছু কিছু জায়গায় উনি সাস্পেন্স তৈরি করে ধরে রেখেছেন, এবং সফল এক্সিকিউশনও করেছেন। উনার মত লেখকের খোঁজ পাওয়া এই বইয়ের আরেক প্লাস পয়েন্ট। গল্পগুলোর আরেকটা ভালো দিক, কমিক রিলিফগুলো। একেবারে বালখিল্য না, একেবারে ভারীও না। দুই বন্ধু প্রবীণের মাঝে যেমন হয় তেমনই। তাদের বন্ধুত্বের গভীরতা যেন উঠে এসেছিল এসব ছোটোখাট রসিকতার মধ্যে। এগুলো পড়ে নিজের মনেও ইচ্ছা হবে বুড়ো বয়সে এমন কোনো বন্ধু পেতে। তবে সঙ্কলনের একটা দুর্বল দিক হচ্ছে কয়েকটা গল্প যেই পজিশনে থাকতো সেই পজিশনে নেই। যেমন রহমতের মৃত্যুর কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে কয়েকটা গল্পে। অথচ এই গল্প একদম শেষের দিকে। এটার জন্যে পড়তে অসুবিধা হচ্ছিল। আবার ওগলুলুর গল্পের শেষও হয় নি। এখানে সঙ্কলন পড়তে গিয়ে তাল কেটে গিয়েছিল। তবে এটাকে আমি নেহায়েতই সঙ্কলকের দোষ বলবো। সব মিলিয়ে এই বই দারুণ সুখপাঠ্য। হরর, সুপারন্যাচারাল, সাইফাই, এমন জন্রার মিশেল পাওয়া দুর্লভ। অপেক্ষায় আছি দ্বিতীয় সমগ্রের অপেক্ষায়।
ঠিক জমল না!! যতটা আশা করেছিলাম, ততটা পাইনি। তবে অবশ্যই খারাপ না, ভালোই, ই প্রত্যয় যুক্ত ভালো আর কি, অথচ দুর্দান্ত হতে পারত। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে সুস্বাদু খাবার তৈরীর সব উপকরণ থাকলেও সেগুলো অল্প আঁচে বেশিক্ষণ চুলায় রাখা হয়নি, চুলায় চড়িয়েই নামিয়ে নেয়া হয়েছে। কয়েকটা গল্পে সুন্দরভাবেই অতিপ্রাকৃত আবহ তৈরী করে যখনি ঘটনাটা ঘটেছে সাথে সাথেই শেষ হয়ে গেছে। ঠিক এ কারণেই দুর্দান্ত না হয়ে "ভালোই" হয়ে গেল। গল্পগুলোর শেষ অংশগুলো আরেকটু বিস্তৃত হলে, অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোর ভেতরে মেইন ক্যারেক্টাররা আরেকটু বেশি থাকলে জমত। তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, লেখকের বর্ণনাভঙ্গি আসলেই সুন্দর। কাহিনীর মধ্যে খাদ থাকলেও সেই কাহিনী বর্ণনা একদমই খাদহীন নিরেট, সাথে আছে পরিমিত পরিমাণে হিউমার। আর হ্যাঁ, বইতে সব গল্পই অতিপ্রাকৃত না, কয়েকটা সায়েন্স ফিকশন ও আছে। সেটা আগে জানা না থাকায় ঘটনাগুলোকে অতিপ্রাকৃত ব্যাপারস্যাপার ভাবলেও পরে দেখি জিনিসটা আসলে (কল্প)বিজ্ঞান, ব্যাপারটা ভালোই লেগেছে। তো, শুধু গল্পের জন্য ৩, লেখকের সেই গল্প বলার ভঙ্গীর জন্য এক্সট্রা ০.৫ মিলে ৩.৫ (অথচ আমার এক্সপেক্টেশন ছিল ৪.৫ এর!!!)।
Bangladeshi literature is seeing the rise of original horror/thriller/sci-fi genre. Way before it was cool and widely accepted, a man was ahead of his time, and he made a series based on Kuti Kobiraj back in 1990. What is the extent of the adventure of Kuti Kobiraj? It's a mix of science fiction, horror and thriller. He achieved something precious which current writers failed in most cases. His stories are magnetic. The writing never let the reader stray from the story. Back in 1990, when people had to read something from a book to write, he built a parallel world through his imagination.
It has everything I love. A book free from angsty teenage protagonists or young dashing man? ✅ A parallel world based on one of most beautiful places of Bangladesh? ✅ Exquisite description of food? ✅ Free of over explanation? ✅ An eccentric way of portraying a situation? ✅
If it was not BD, he would be appreciated by people of all ages. Probably, Kuti Kobiraj would have his own movies and a cult following too.I am sad that Seba and others buried this gem of a series .
কুটি কবিরাজ আর তার বন্ধু কর্নেল ওরফে তুলু বয়সে প্রায় সত্তরের কাছাকাছি দুই বুড়ো। অদ্ভুত সব কর্মকান্ড করে বেড়াতে ভালবাসে। ছোট ছোট গল্প আকারে তাদের এই কীর্তি-কলাপ লেখা হয়েছে মূলত ডায়রী আকারে।
লেখকের ভাষাতেই যদি বলি, বইতে এক্সক্লামেটরি সেন্সের বাড়াবাড়ি ছিল বেশ। প্রাঞ্জলতার অভাব বা এমন আরো দাঁতভাঙা শব্দ টেনে না এনে বরং বলব, এ বই হয়তো অল্প বয়সে পড়ার বই। সাধারণত বই পড়াটা বয়সের বাটখারা দিয়ে মাপতে যাই নি কখনো। এই বই পড়েই প্রথম মনে হল, ছোট বয়সে পড়লে এত বিরক্ত লাগতো না হয়তো পড়তে।
সবগুলো গল্পের ভেতর 'নীল দরজার রহস্য', 'অন্যপৃষ্ঠা' আর 'পুরোনো বাড়ির রহস্য' গল্প তিনটা ভাল লেগেছে মোটামুটি। বইতে বিচিত্র সব খাবার দাবারের বর্ণনা ছিল, সেই অংশটা মজার। সব মিলিয়ে পড়ে দেখা যায় এমন বই আরকি।
পার্সোনাল রেটিং : ৩.২৫/৫ ওভারঅল খারাপ লাগে নি। কুটি কবিরাজের সাথে কিছুটা নস্টালজিয়া, কিছুটা কল্প-বিজ্ঞান, কিছুটা রহস্য, আর অনেকটা ভয়- এসব একত্রে মিশ্রিত। বইয়ের কোনও গল্পই আসলে চরমভাবে মনে দাগ ফেলে যাওয়ার মত কিংবা অতি উৎকৃষ্ট কিছু নয় তবে দুই ষাটোর্ধ্ব 'বাচ্চা-বুড়োর' সাথে সময়টা খারাপ কাটবে না। অতি অদ্ভুত অদ্ভুত যতসব যাত্রা ও ধারণা। এক, দুই করে বইয়ের যত সামনে এগোনো হয় তত মনে হতে থাকে পরের গল্পে কি অদ্ভুত বিষয় অপেক্ষা করছে কে জানে? ঠিক যেমন কুটি-কবিরাজের বন্ধু তুলু ভাবতেই থাকেন, "হতভাগা আবার কোন ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে কে জানে!"
গল্পগুলোর কলেবর ছোট তাই কিছু গল্পের ক্ষেত্রে মনে হয় যথাযথ ব্যাখ্যা ছাড়াই শেষ হয়ে গেল তবে অতিপ্রাকৃত গল্পগুলোর ক্ষেত্রে এটা বলতে গেলে এক সর্বজনীন বিষয়। ৯০'এর দশকে আমাদের সাহিত্যে লিখে যাওয়া এমন বিজ্ঞান ও অতিপ্রাকৃত মিশ্রিত গল্পগুচ্ছ অবশ্যই এক প্রশংসনীয় ব্যাপার।
আগে কিছু নেগেটিভ নিয়ে বলি। প্রায় ক্ষেত্রেই সুঠাম বা ভালো সাস্থ্যের অধিকারীদের এখানে শুয়োরের দেহের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এটা খানিকটা চোখে লেগেছে। আর পরে যেই জিনিসটা সেটা হল বানান ভুল। পুরো বইতে প্রচুর বানান ভুল ছিলো। যার পুরোটাই কিন্তু প্রুফ রীডার আর পাবলিশারের ঘাড়ে পড়ে।
এবার পজেটিভ। পুরো বইটাই দিনলিপি আকারে লেখা। এবং অত্যন্ত সুপাঠ্য। পড়তে পড়তে আমি ছবির মত দেখতে পাচ্ছিলাম ঘটনা গুলি। আর বিষয়বস্তুও অনেক বিশাল। স্বর্ন কংকাল থেকে শুরু হয়ে সাইফাই এলিমেন্ট যেমন এসেছে তেমনি এসেছে অতিপ্রাকৃতিক বিষয়বস্তু। সাবলীল ভাষাতে লেখা বইটি প্রিটীন+ সবার জন্যেই সমান আনন্দের হবে।
যে সময়ের লেখা, সেই সময়ের হিসেবে বেশ ভালো। এই সময়ে বা আমার বয়সে (প্রায় ত্রিশ) এসে পড়তে ক্রিটিকাল চিন্তা এসেই পড়ে। সেখান থেকেই বলতে হয় গল্পগুলো সব মিলে কাল্ট ক্ল্যাসিক হইতে পারত কিন্তু হইল না। এর অন্যতম একটা কারণ হছে মিনার সাহেবের মতো লোকেদের মধ্যে একজন গল্পকার থাকে কিন্তু পেশাগত জীবন তাদেরকে সেই গল্প জমিয়ে লেখার সময় দেয় না। ভাষা আরেকটু সাজালে, গল্প বলাকে সময়ের সঙ্গে আরেকটু ঘুরিয়ে দিলেই সেটা হতো।
প্রতিচ্ছবি খুব দ্রুত বইটা বের করেছিল সম্ভবত। অনেক জায়গায় বানানে উ-কার, ও-কার হয়ে যাওয়া, কিছু জায়গায় বাক্য হারায়ে যাওয়ার মতো ঘটনা পড়ার ক্ষেত্রে স্বাদ নষ্ট করছে।
প্রথম থেকে পড়ছি আর ভাবছি, ইসসস! যদি জামশেদ মুস্তফির হাড় আমিও পেতাম-.- লা লা টাইপ জিন্দেগী, খাও দাও ঘুরো। আর মন চাইলে পাগলামী করো। কাহিনী আমার কাছে আহামরি কিছু লাগেনি। ওভাররেটেড লাগছে! তবে মজাও লেগেছে। বুড়ো বয়সে দুই বুড়ো মিলে যে সব অ্যাডভেঞ্চারটাই না দিলো। লেখার ভঙ্গি সুন্দর, কোন ভুল ত্রুটিও তেমন নেই। মনে হয়, স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা পড়লে বেশী মজা পাবে।
বইটির কতিপয় গল্পের প্লট বেশ চমৎকার।গল্প পড়ে মনেই হবে না সেগুলো নব্বই দশকের দিকে লেখা!লেখনীও মোটামুটি ভালোই।একটানা পড়ে যাওয়ার মত। বইটি পড়ে পুরনো রহস্যপত্রিকা পড়ার মত অনুভূতি হচ্ছিলো।