Jump to ratings and reviews
Rate this book

বরফকল

Rate this book
শেফালি বেগম ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি সে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিতা অসংখ্য মেয়ের যন্ত্রণা, নিগ্রহ ও ক্ষোভের প্রতিভূ হয়ে উঠবে। ঘটনাচক্রে তাকে যখন তা-ই হতে হলো, সে যত না বিস্মিত হলো, বিপদগ্রস্ত বোধ করল অনেক বেশি। পিতৃপরিচয়হীন সন্তানকে নিয়ে পথ চলতে গিয়ে লাঞ্ছনা-গঞ্জনায় পরিত্রাণহীন জীবন তাকে বাধ্য করল কোথাও থিতু না হয়ে পালিয়ে বেড়াতে। কিন্তু তার ভাষায় ‘এট্টুন দ্যাশ, কই যাই’ এ-ই যেন তাকে তার নিয়তিকে চিনিয়ে দিল। সে নিরুদ্দিষ্ট হলো। রেখে গেল তার শিশুসন্তানকে, আর সন্তানের কাঁধে তারই পলায়নপর জীবন। সেই শিশুসন্তান বড় হয়ে অবাক হয়ে লক্ষ করল সে তার মায়ের পদচ্ছাপেই পা ফেলে চলেছে। তার মা পালাত তাকে নিয়ে, সে পালাচ্ছে তার সন্তানকে নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধে প্রাপ্তি হিসাবে বিজয়টা অবশ্যই মহান গৌরবের, তবে মুক্তিযুদ্ধ যে এক অপ্রাপ্তি ও অবিজয়েরও বয়ান, শেফালি বেগম তা দেখে দেখে অপমানে-গ্লানিতে-দুর্ভোগে দিশেহারা হয়ে যা ভেবেছে তা কি তার নিজস্ব, ভ্রান্ত উপলব্ধি? এর জবাব খুঁজতে পাঠককে কিছু প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের এতকাল পরেও যেসবের মুখোমুখি হতে নানা এজেন্ডাশাসিত রাজনীতি ও দেশপ্রেমের ঘোলা আয়না বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

230 pages, Hardcover

First published January 1, 2021

6 people are currently reading
227 people want to read

About the author

Wasi Ahmed

25 books22 followers
ওয়াসি আহমেদের জন্ম ১৯৫৪ সালে, সিলেট শহরের নাইওরপুলে। স্কুলের পাঠ বৃহত্তর সিলেটের নানা জায়গায়। পরবর্তী শিক্ষাজীবন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা দিয়ে লেখালেখির শুরু। ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত কবিতা সংকলন ‘শবযাত্রী স্বজন’। কথাসাহিত্যে, বিশেষত গল্পে, মনোনিবেশ আশির দশকে। প্রথম গল্প সংকলন ‘ছায়াদণ্ডি ও অন্যান্য’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। পুস্তকাকারে প্রথম উপন্যাস ‘মেঘপাহাড়’ প্রকাশ পায় ২০০০ সালে। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালনসহ কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা অঙ্গনে। লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সব প্রধান সাহিত্য পুরস্কার।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
44 (55%)
4 stars
33 (41%)
3 stars
2 (2%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 30 of 31 reviews
Profile Image for Harun Ahmed.
1,668 reviews430 followers
January 28, 2024
সরাসরি "বরফকল" এর কাহিনি না বলে অন্য গল্পের মাধ্যমে উপন্যাসের পটভূমি সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা দেওয়া যাক। প্রথমটা মঈনুল আহসান সাবেরের "রেলস্টেশনে শোনা গল্প" থেকে। স্বামী মুক্তিযোদ্ধা, স্ত্রী বীরাঙ্গনা। যুদ্ধ শেষে দলে দলে মানুষ এদের বাসায় আসতে শুরু করলো। মুক্তিযোদ্ধাকে নয়, বীরাঙ্গনাকে দেখতে।তারা বিশ্বাস করতে পারছে না যুদ্ধে ধর্ষিতাকে কেউ এভাবে সসম্মানে ঘরে তুলেছে।স্বামীর বীরত্ব নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই, স্ত্রীকে ক্যাম্পে কীভাবে কীভাবে নির্যাতন করেছে, গায়ে কাপড় রাখতে দিতো কি দিতো না সে ব্যাপারে সবাই জানতে উৎসুক। অতিষ্ঠ হয়ে স্বামী স্ত্রী নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যায়। রেলস্টেশনে বসে স্বামী এই গল্পটা শোনানোর সময় কথককে প্রশ্ন করে - যে জাতি শুধু ক্ষয়ের গল্প শুনতে চায় তারা আসলে কতদূর যেতে পারবে?
দ্বিতীয় গল্পটা ওয়াসি আহমেদেরই "উদ্ধার পুনরুদ্ধার। " শারাবান তহুরা নামের এক মেয়ে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। একজন তাকে ধর্ষণ করার সময় অন্য এক লোক এসে ধর্ষককে সরিয়ে দ্যায়। তহুরা ভাবে উদ্ধারকর্তা এসেছে। আশ্চর্য!! সেই উদ্ধারকর্তাই তাকে আবার ধর্ষণ করতে শুরু করে। একই ঘটনা বারংবার ঘটতে থাকে। তখন-

"ধর্ষক ও উদ্ধারকারী গুলিয়ে যায়। তাদের যার যার নিজস্ব আদল-নকশা পটপরিবর্তনের ক্ষিপ্র উত্থান-পতনে অভিন্ন দেখায়। বস্তুত তাদের মুখ নজরে আসে না। আসে যা, ত্যানার পুঁটলি। ছিপির মতো মুখে এই আটকানো, এই খোলা। বিরতিহীন। একমাত্র স্থির শরাবান তহুরা- আবহমান চিৎ–রোদবৃষ্টিতে, ঋতুচক্রের পালাবদলে তপ্ত পোড়া ভেজা মাটির মতো।"

নারীকে উদ্ধার করবে বলে যে-ই আসে, শেষ পর্যন্ত সে তার নিজের উদ্দেশ্যই চরিতার্থ করে,নারীর অবস্থার সহজে পরিবর্তন হয় না।

লেখক ওয়াসি আহমেদ বরাবরই ঠাণ্ডা, নিচু স্বরে গল্প বলেন।তিনি কোনোকিছু পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেন না। চরম অতিনাটকীয় বিষয়ও তিনি উপস্থাপন করেন নির্বিকারচিত্তে। এই নির্বিকারত্ব পাঠককে যেন আরো বেশি করে চেপে ধরে।পাঠককে স্বস্তি দিতে চান না লেখক।তিনি চান পাঠকের বোধের জাগরণ। তার লেখা পড়ে নিজেদের দিকে নতুন করে ফিরে তাকাতে বাধ্য হই আমরা। তার সর্বশেষ উপন্যাস "বরফকল" এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো বেশি সত্যি।

আমাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধে আছে অনেক গ্লানি, অপ্রাপ্তি ও অবিজয়। অনেক জ্বলন্ত ইস্যুর মধ্যে ছিলো সাড়ে তিন লক্ষ বীরাঙ্গনা ইস্যু। আমরা সমাধান বের না করে চাপা দিয়ে রেখেছি সব। ভেবেছি ভুলে গেলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে!! দেশটা যেন বরফকল।বরফকল মৃত প্রাণকে সতেজ রাখে আর সতেজ প্রাণকে করে মৃত। সব সাপ, সব কাক, সব খুনি চোখ আজো জ্যান্ত।আর এই বরফকলের আততায়ী শীতে আজো নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে শেফালি, চম্পা, জবা-রা। এই বরফকল থেকে কি কখনো মুক্তি মিলবে? পথ খুঁজে পাবে জাফর সাদিক? এই জনপদের অমীমাংসিত জিজ্ঞাসার উত্তর মিলবে? উত্তরটা আমাদেরই বের করতে হবে।

(২২মে, ২০২২)
Profile Image for Injamamul  Haque  Joy.
100 reviews114 followers
March 3, 2023
"জাফর সাদেক তাকে প্রশ্ন করেছিলো, স্বাধীন দেশে তার কেমন লাগছে? দ্রুত চোখের পলক ফেলে শেফালি সোজা ক্যামেরায় চোখ রেখেছিলো। একটু আগের কোঁচকানো চোখের পাতা, পরিপাটি আলোটা যেন তাকে আর বিরক্ত করছে না। শেফালি ধীরে, পরিষ্কার গলায় বলেছিলো, দেশটা স্বাধীন হয়ে তাকে পরাধীন করেছে। যুদ্ধটা যদি না হতো তাহলে তার মত লাখ লাখ মেয়েদের জীবনটা বরবাদ হত না।"

লেখক ওয়াসি আহমেদ বোধহয় এই বইটা লেখার সময় কল্পনাও করতে পারেনি যে, মুক্তিযুদ্ধের সাইড এফেক্ট নিয়ে লেখা অন্যতম বেস্ট বইটা তিনি লেখতে যাচ্ছেন। যেখানে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে উপেক্ষিত অংশটা— বীরাঙ্গনাদের দূর্ভোগ, বাংলার রক্ষণশীল সমাজের অকৃতজ্ঞতা, যুদ্ধশিশুদের যাযাবরের মত লোকচক্ষু এড়িয়ে নিরাপত্তার ভয়ে পালিয়ে বেড়ানোটা। থাকবে হানাদার বাহিনীর কাপুরুষোচিত অত্যাচার, সদ্য স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষের নানা অনাচার।

বইয়ের গল্পটা রেখাবু-শেফালী-চম্পাবু-জবা-জাফর সাদেক চরিত্র কটাকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। শেফালি, পালিয়ে বেড়ানো এক বীরাঙ্গনা। যার সবচেয়ে বড় দোষ হচ্ছে সে পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা ধর্ষিত হওয়া। তার দোষ হচ্ছে সে বীরাঙ্গনা উপাধীপ্রাপ্ত। এই রক্ষণশীল সমাজে তার মুখ দেখানো মানা। চম্পা, যে একজন যুদ্ধশিশু। যাকে নিরাপদ ভবিষ্যৎ দেওয়ার জন্য তার মা শেফালি তাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক রেখা বুবুর কাছে রেখে গিয়েছিলো। রক্ষণশীল সমাজের দৃষ্টিতে তারও একটা গুরুতর দোষ আছে। তার দোষ হচ্ছে সে একজন যুদ্ধশিশু। যার জন্ম হয়েছে পুনর্বাসন কেন্দ্রে, পিতৃ পরিচয়হীনতা নিয়ে। যার জন্য তাকে স্বামী এবং শ্বশুর বাড়ি কর্তৃক দূর করা হয়েছে। যাকে এখনো মেয়ে জবাকে নিয়ে নিজের যুদ্ধশিশু তকমা থেকে রেহাই পেতে পালিয়ে বেড়াতে হয় নিজের স্বামী, পরিবার ও পরিচিত জনদের কাছ থেকে।

রেখা, যাকে শেফালি রেখাবু বলে ডাকে। সে-ই শেফালিকে পাকিস্তানি সেনা বাংকার থেকে উদ্ধার করে পুনর্বাসন কেন্দ্রে এনে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। যার কাছে বড় হয়েছেন শেফালির মেয়ে চম্পা এবং চম্পার মেয়ে জবা। শেফালির মত আরও অনেককেই যুদ্ধপরবর্তী সময়ে আগলে রেখেছিলেন তিনি। আর এনার ভাষ্যে এবং এনাকে কেন্দ্র করেই গড়িয়েছে পুরো বইয়ের কাহিনী।

এই বইয়ের আরও একটা অন্যতম চরিত্র হচ্ছেন জাফর সাদেক। উন্নত জীবন এবং ফটোগ্রাফির নেশায় পড়ে যুদ্ধের আগে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। যার কাছে আদতে নিজ দেশের কোনো মূল্য ছিলো না। কিন্তু ঘটনাচক্রে হঠাৎ একদিন পত্রিকায় এক পাকিস্তানি কমান্ডারের সাক্ষাৎকারের একটা অংশে চোখ আটকে যায় তার,
"This is war, you rape the woman."

এটা দেখার পর তার টনক নড়ল, তিনি বুঝতে পারলেন যতটা ভেবেছিলেন তার চেয়েও অনেক খারাপ অবস্থা দেশের নারীদের। আর তারপরই দেশে ফিরে এসে শাপলা নামক এক অর্গানাইজেশনের সাথে যুক্ত হয়ে ধর্ষক, পাষণ্ড হানাদার বাহিনীদের জেনেভা ক্রাইম ল এর ওয়্যার ক্রাইমের আওতায় আনতে তোড়জোড় শুরু করে দিলেন। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সহকর্মী ফাহমিদা এবং অ্যানমেরিকে সঙ্গে নিয়ে প্রমাণ জোগাড় করতে নেমে পড়লেন মাঠে।

যে-কোন যুদ্ধেই নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে হয় নারী ও শিশুদের। সব যুদ্ধেই বিঘ্নিত হয় নারীদের নিরাপত্তা। নারীদের ব্যাবহার করা হয় ওয়্যার উইপন হিসেবে। উন্নত বিশ্বে যুদ্ধে অত্যাচারিত হয়ে পরবর্তীতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারলেও তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত, রক্ষণশীল দেশে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা হয় না তাদের। নারীদের পদে পদে পোহাতে হয় বিড়ম্বনা, গ্লানি। 'বরফকল' বইয়ে সে গল্পই বলেছেন লেখক ওয়াসি আহমেদ। এই বইটা আসলে ইতিহাস আশ্রিত রিয়েলিস্টিক ফিকশন। গল্পটা মুক্তিযুদ্ধের সময়টা কেন্দ্র করে এগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রীক লেখা হলেও এটা যুদ্ধমুখী গল্প নয়, গল্পটা জীবন মুখী। গল্পে যুদ্ধের চেয়ে বেশী ফোকাস করা হয়েছে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বীরাঙ্গনাদের দুর্ভোগ আর তাদের পালিয়ে বেড়ানোর কথা। এতে প্রাধান্য পেয়েছে একজন বীরাঙ্গনা ও তার পরবর্তী দুই প্রজন্মের নিগ্রহের কথা। এতে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী মানুষের মানসিক দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েন। বইটাতে ফোকাস পেয়েছে বাঙ্গালীর নারী কেন্দ্রিক রক্ষণশীলতা নামক দগদগে ঘাঁ'এর কথা। আস���ে এটা আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির দর্পন স্বরুপ। এখনো বাংলাদেশ সেই একাত্তরের মানসিকতা নিয়ে ঘুরছে। সেই একাত্তরে যেমন পাক-সেনাদের দ্বারা অত্যাচারিত নারী জায়গায় জায়গায় উপেক্ষা এবং পীড়নের স্বীকার হত, ঠিক তেমনি এখনো এদেশে ধর্ষিতাদের মুখ গুঁজে থাকতে হয় সমাজ থেকে। সন্দেহের আঙুল সেসময়ের মত এখনো ঘুরেফিরে স্থির হয় ধৃত, অত্যাচারিত নারীর দিকে।

গল্পের প্লট যতটা চমৎকার, ঠিক ততটাই চমৎকার লেখক ওয়াসি আহমেদের লেখনী। পুরো গল্পে মায়াময় লেখায় ফুটিয়ে দুলেছে চম্পা-শেফালি-রেখার মানসিক দ্বন্দ্ব। গল্পের কোথাও আবেগের আশ্রয় নেন নি। লিখে গেছেন ঝড়ের মুখে উড়ে চলা পাতার মত। চরিত্রগুলোকেও তুলে ধরেছেন অমায়িক ভাবে। কিছুটা আক্ষেপ, কিছুটা বিষণ্ণতা, কিছুটা আশা-নিরাশা এবং চম্পা-জবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝে সুখপাঠ্য এই বরফকল বইটা।।
Profile Image for NaYeeM.
229 reviews65 followers
October 17, 2021
"রেপ তাহলে এক পোষ মানানোর হাতিয়ার, দখলদার সৈন্যদের এনোনিমাস পিতৃত্বের ফলে যে সন্তানের জন্ম হবে, সে ধর্ষিতার পেট থেকে খসে পড়ামাত্র একটি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য ভেঙে দিতে তৎপর থাকবে"


এই গল্পে বীরাঙ্গনা হলো "শেফালি"।। তার মেয়ের নাম হলো চম্পা এবং চম্পার মেয়ের নাম 'জবা'...
শিফালি বারবার মানুষের কাছে লাঞ্চিত হচ্ছিল, ঘৃণার মুখে পড়ছিল বলেই তার মেয়ে চম্পাকে রেখে পালিয়ে যায় গ্রামে এবং একা বসবাস করতে থাকে।। কারণ, জাফর সাদেক নামের এক সাংবাদিকের সামনে ঠোঁটকাটা সব কথা বলার বলার পর শেফালি বীরাঙ্গনা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠে।। এরপর থেকে আর সে মাথা উঁচু করে বাঁচতে গেলেই মানুষজন যেন মাথা নামিয়ে দেয়।
সে যেখানেই কাজ করতে যেতো সেখানেই তাকে আশপাশের মানুষগুলো চিনে ফেলতো.....
এভাবে তার মা-এর অতীত বয়ে বেড়াতে হয়েছে চম্পাকে.....

আচ্ছা?? শেফালির দোষ কি ছিল??
সে যুদ্ধের সময়ে ধর্ষিত হয়েছে, এটাই তার অপরাধ??
তাদের যে একটা সম্মান দেওয়া হলো "বীরাঙ্গনা" বলে, এই নামের মতো বীরাঙ্গনারা কতটা সম্মান পেল???
তারা তো একজন যুদ্ধা থেকেও কম ভূমিকা রাখেনি, তবুও কেন আমরা তাদের সম্মান দেওয়ার বদলে উল্টো সম্মানহানি করলাম, তাদের লাঞ্চিত করলাম???
সব প্রশ্নের ভিত্তি ঐ একটাই প্রশ্ন, আমরা কি আদৌও স্বাধীন হতে পেরেছিলাম??
আমরা স্বাধীন হলে ঐ বীরাঙ্গনা রা পরাধীন থেকে গিয়েছিল কেন আমাদের চোখে??
যুদ্ধতে না হয় তারা ধর্ষিত হয়েছিল, কিন্তু এরপরে কি আমাদের থেকে প্রাপ্য সম্মান তারা পেতে পারতো না??


লেখক হয়তো লেখতে লেখতে বুঝেন নি উনি কতবড় একটা মাস্টারপিস তৈরী করে ফেলেছেন।। এই বইটা যদি আরেকটু মানুষের কাছে সাড়া পেতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাসে ক্লাসিকে জায়গা করে নিবে।। শুধু শুধু বলছি না কথাগুলো।
লেখক বেশ লেখাপড়া করেছেন বইটি লেখতে বুঝা যাচ্ছিলো।। কিন্তু উনি শুধু তথ্য মিশিয়ে কাহিনী একটা বলেই শেষ করেছেন তা একদমই না। উনি লেখার দিকে অনেক অনেক মনোযোগ দিয়েছেন।। উনার বাক্য গঠনে যেমন অন্যরকম একটা শৈল্পিকতা আছে, তেমনি infoগুলো নিয়ে গল্প সাজিয়েছেন বেশ স্মার্টভাবে।। আপনি বইটি পড়লেই উনার লেখাতে smartness লক্ষ্য করবেন....


এটিই আমার পড়া ওয়াসি আহমেদ-এর প্রথম কোনো বই। প্রথম কোনো বইয়ে এমন বিশাল পরিমাণে একটা ধাক্কা খাব আশা করিনি!!
লেখকের সাথে যাত্রা আরো লম্বা হবে তো অবশ্যই!
উনার আরো বই পড়তে মুখিয়ে আছি......


আর হা, মাস্ট মাস্ট রিড একটা বই। অবশ্যই পড়া উচিত পাঠকদের, আমার মতে



"যুদ্ধে, এমনকি অনেক দেশের ভিতরেও বিদ্রোহ বা অরাজকতা থামাতে মিলিটারির রোলে মেয়েদের নির্যাতনের ব্যাপারটা ফোরফ্রন্টে আসে না। ভিয়েতনামের কথা চিন্তা করেন। এর কারণ কি জানেন? যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পাশে মেয়েদের নির্যাতনের ব্যাপরটা সাইড শো হিসাবেই থাকে। অন্য কারণ হলো রেপ ইজ আ উইপন অব ওয়ার। যুদ্ধে কোন পক্ষ কী অস্ত্র ব্যবহার করবে এ নিয়ে কোনো প্রটোকল নেই। রাইফেল, না মেশিনগান, না নাপাম বোমা—কেউ প্রশ্ন তুলবে না। এখন রেপও যদি যুদ্ধের অস্ত্র হয়, তাহলে কে কী বলবে! আর রেপ তো গ্রাজ, মানুষ খুন করা যেমন।"


Profile Image for Shuhan Rizwan.
Author 7 books1,109 followers
July 6, 2021
বিস্তারিত পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখছি একটা ওয়েবজিনের জন্য, আপাতত তাৎক্ষণিক ভাবনাটাকেই লিখে রাখা যাক।

পৃথিবীর যে কোনো যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ত্যাগটা স্বীকার করতে হয় নারীদেরই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তাই হয়েছিলো। অথচ রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে বীরাঙ্গনাদের বাংলাদেশ রীতিমতো অগ্রাহ্য করে গেছে। শাহীন আখতারের 'তালাশ' উপন্যাসের কথা মনে পড়ছে, খুব নিষ্করুণ এবং মনের-ওপর-চাপ-ফেলা ভঙ্গীতে সেটা স্পর্শ করে গেছিলো এই বিষয়গুলো।

ওয়াসি আহমেদের আলোচ্য উপন্যাসের গল্প মোটা দাগে সেই বীরাঙ্গনাদের তালাশকেই স্মরণ করায় ঠিকই, তবে তিনি আলো ফেলতে চেয়েছেন বীরাঙ্গনাদের পরের প্রজন্মের ওপরও। 'টেল মোর, শো লেস' ধাঁচের আখ্যানের কারণেই হয়তো, উপন্যাসকে যদি অন্য কারো জুতায় পা গলানোর একটা মাধ্যম বলে ধরে নেই, ওয়াসির প্রচেষ্টাকে খানিক খামতিপূর্ণ মনে হয় সেদিকে। তবে বিষয়বস্তুর কারণে এই উপন্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
Profile Image for Mahmudur Rahman.
Author 13 books357 followers
January 31, 2021
This is war. You rape the women

১.
গত পঞ্চাশ বছরে আমরা পাখি পড়ার মতো কতগুলো কথা মুখস্ত করেছি; ত্রিশ লক্ষ প্রাণ, দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জত তার মধ্যে অন্যতম। ২০২১ সালে এসে 'ধর্ষণে ধর্ষিতার সম্মান যায় না বরং ধর্ষকেরই (এমনকি কেউ কেউ রাষ্ট্র টেনে আনে) ইজ্জত যায়'-এর পাশাপাশি ধর্ষিতাকে একটা স্বাভাবিক জীবন দেওয়ার কথা যখন বলা হচ্ছে তখন এসে ১৯৭১ এ বাঙ্কার থেকে উদ্ধার করা নারীদের কথা একবার ফের ভাবা যায়, জাতির পিতা যাদেরকে নিজের পিতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের নাম হয়েছিল বীরাঙ্গনা।

মুক্তিযুদ্ধের ৫ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার, বীর উত্তম মীর শওকত আলী এক সাক্ষাৎকারে* বলেছিলেন কোথাও (নাম মনে নেই আমার) একটা ক্যাম্পে পাকিস্তানীদের পরাজিত করে সেই ক্যাম্পের বাঙ্কারে যে কয়জন মেয়ে পেয়েছিলেন তাদের কারও গায়ে পেটিকোট ব্লাউজ ছাড়া কোন পোশাক ছিল না। শাড়ি দেওয়া হতো না কেননা তাহলে এরা ফাঁস নিয়ে মারা যায়। আর পরাজয়ের পর শওকত আর তাঁর দল যে মেয়েদের পেয়েছিলেন, পাকিস্তানিরা যাওয়ার আগে তাদের পেট কেটে রেখে গিয়েছিল উলম্ব রেখায়। শওকত আলী একটি মেয়েকে পেয়েছিলেন যার প্রাণপাখি তখনও ওড়েনি। সে নাকি শওকত আলীকে প্রশ্ন করেছিল, 'আমরা কী স্বাধীন হবো?'

যুদ্ধের পর এই মেয়েদের মাঝে যারা বেঁচে ছিল তাদের নিয়ে আলাদা করে কাজ করা হয়েছিল। আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি হয়েছিল। আমরা সেসব জানি। নীলিমা ইবরাহীম যাদের পড়া আছে তারা অনেকে হয়ত এইসব 'বীরাঙ্গনা'দের জীবনের কথা পড়েছেন। কারও জীবন স্বাভাবিক হয়েছিল, কারও হয়নি। কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে উপাধি দিয়ে যে সম্মান তাদের দেওয়া হয়েছিল, আসলেই সে সম্মান তারা পেয়েছিলেন? নাকি অনেকের জীবন দুর্বিষহ হয়েছিল ওই উপাধির কারণে?

২.
ওয়াসি আহমেদের এই উপন্যাস কিংবা উপাখ্যান শেফালি নামের এক বীরাঙ্গনাকে কেন্দ্র করে। বিয়ের রাতে বাসর ফেলে অনেক যুবক যুদ্ধে গিয়েছিল, আমাদের সিনেমায়, সাহিত্যে একথা বারবার এসেছে কিন্তু যুদ্ধে যদি কোন তরুণীর বিয়ে ভেঙে যায় আর তারপর সে চলে যায় হানাদারের বাঙ্কারে, তাঁর জীবন কেমন হয় সেকথা এর আগে কেউ লেখার প্রয়োজন মনে করেচিলেন কিনা আমার জানা নেই। ওয়াসি আহমেদ লিখলেন এবং কেবল শেফালির কথাই নয়, তিনি লিখেছেন শেফালির পরবর্তী প্রজন্মের কথা। সেখানে চম্পা এক যুদ্ধশিশু, যার পিতার পরিচয় নেই কিন্তু চম্পার মেয়ে জবার পিতার পরিচয় থাকা সত্ত্বেও শেফালি কিংবা চম্পার জীবন থেকে সে খুব একটা সরতে পারে না।

'বরফকল' উপন্যাসে তিন প্রজন্মের নারীর পাশাপাশি উঠে এসেছে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের কথা। সেই সাথে যুদ্ধশিশু বলে যাদের পরিচয়, তাদের পরবর্তী জীবন কেমন হয়েছে তাও এসেছে কিছু কিছু। নীলিমা ইবরাহীম কিংবা নানা জার্নাল যাদের পড়া আছে তাদের জন্য এসব তথ্য নতুন নয় কিন্তু এই বই তাদের ভালো লাগবে এ কারণে যে ওয়াসি আহমেদ তাঁর উপন্যাসেও বাস্তব অবস্থা কী চমৎকার তুলে ধরেছেন ফ্যাক্ট থেকে সরে না গিয়ে।

উপন্যাসের নির্মাণ প্রসঙ্গে বলতে হয়, কখনও পুনর্বাসন কেন্দ্রের কর্মী, কখনও চম্পা, কখনও শেফালির নিজ জবানীতে আর কখনও লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা এই উপন্যাসের এক একটা অংশ এক এক ভাবে আমাদের কাছে ধরা দেয়। ভাষা, উপস্থাপনা, চরিত্র চিত্রণ এতো নিখুঁত যে মনে হয় ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করছি। এই উপন্যাসের সবচেয়ে ভালো একটা দিক জাফর সাদেক, যে উপন্যাসে থেকেও নেই। একজন প্রায় নন-এনটিটি থেকে তিনি দেশের অবস্থা এবং যুদ্ধে নারী নির্যাতনের বিচারের দাবীতে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতিতাদের যে আরও নির্যাতনের মধ্যে ফেললেন, সেই একটি উদাহরণ থেকে ওয়াসি আমাদের হয়ত বোঝাতে চেয়েছেন সেদিন কিংবা আজকেও আমাদের 'অ্যাক্টিভিটি' আর নারীদের জীবন বাস্তবতা দুই ভিন্ন বিষয়।

৩.
দিকচিহ্নহীন নদীতে যেমন জাফর সাদেকের স্পিডবোট ভেসে চলে, আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা এখনও সেই অবস্থানে আছি। সমাজ আর মানবিক দৃষ্টিকোণ মেলে না, রাজনীতি তো কখনও না। তাই তত্ত্ব, কাজ আর বাস্তবতার অমিলের মাঝে কিছু নির্দিষ্ট কথার মধ্যে আমরা ঘুরপাক খাই। কিন্তু মানুষের যে জীবন, এই সমাজে নারীর যে অবস্থান; তা আমাদের আবিষ্কার করা হয়নি। মুক্তিজুদ্ধ নিয়ে বহু উপন্যাস লেখা হলেও যেভাবে ওয়াসি আহমেদ ভেবেছেন, যা বরফকল দেখায়, তা আমাদের কারও কারও জানা থাকলেও সকলের জানা নয়।

সেই অজানাকে মূর্ত করার জন্য ওয়াসি আহমেদকে ধন্যবাদ।
Profile Image for Mahrin Ferdous.
Author 8 books208 followers
May 13, 2025
৪.৫
দীর্ঘদিন ধরে ২০০ পাতার বেশি কোনও বই না পড়ার ক্লান্ত সময়ে হাতে নিলাম ওয়াসি আহমেদের উপন্যাস 'বরফকল'। পড়া শুরু করতেই বুঝলাম—এটা কোনো আরামদায়ক পাঠ নয়, বরং অসম্ভব অস্বস্তিকর...

ভাষায় প্রাঞ্জল অথচ মনস্তাত্ত্বিকভাবে তীব্র দাগ ফেলা উপন্যাসটি ১৯৭১ ও একাত্তর পরবর্তী যুদ্ধশিশু, ধর্ষণের শিকার নারী এবং 'বীরাঙ্গনা' নামক রাষ্ট্রীয় অভিধার ভেতরে ও বাইরে থাকা নারীজীবনের ক্ষতচিহ্ন এবং এক অস্থির মানসিক পরিস্থিতির কাহিনি বলে যায়। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এখানে তিন প্রজন্মব্যাপী বিস্তৃত বেদনাময় জীবনের গল্পটি ওয়াসি আহমেদ বলে গেছেন দূর থেকে, যেন তিনি একজন চিত্রকর। যিনি শুধুই দৃশ্য আঁকেন, তবে তাতে নিজস্ব মন্তব্য রাখেন না। কিন্তু সেই নিরপেক্ষতার মধ্যেও যখন রেখার চোখের অশ্রুদানি মমতায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, চম্পার সূঁচ–সুতোয় গাঁথায় ক্যাথারসিস রচিত হয়, কিংবা শেফালির সরলতা থেকে জটিলতর হয়ে ওঠা রূপান্তরের প্রতিটি বাঁক স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তখন বোঝা যায়, এখানে ঔপন্যাসিক দূরে থেকেও খুব কাছে।

বই পড়তে পড়তে নতুন করে ভাবতে হয়, ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধির মধ্যে ‘বীরত্ব’ ঠিক কতটা আছে? আর কতটাই বা চাপা পড়ে থাকা লজ্জা, একাকিত্ব, সামাজিক বর্জন? মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যেখানে এত কাব্য, এত গান, এত ইতিহাস—সেখানে একাত্তরের নারীদের গোপন, না বলা, অনুচ্চারিত দুঃখ বারবার কেবল থেকে যায় পাদপ্রদীপের বাইরে। সেই ভাবনাই জানায়, এই উপন্যাস শুধু গল্প নয়, এক জরুরি স্মৃতি পুনরুদ্ধার।

যুদ্ধের সময় ধর্ষণ কীভাবে কৌশলগত অস্ত্র হয়ে ওঠে—বরফকল সেই বয়ানকে শুধু ব্যক্তিগত নয়, রাজনৈতিক এবং মানবিক জায়গা থেকেও বিশ্লেষণ করে। বসনিয়া, রুয়ান্ডা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘কমফোর্ট উইমেন’ কিংবা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের ধর্ষিত নারী ও যুদ্ধশিশুদের ট্র্যাজেডি—সকল ইতিহাস যেন এখানে এসে এক বিন্দুতে মিলিত হয়। পাঠক হিসেবে এই উপলব্ধি আরও তীব্র হয় যখন বুঝি, একটা রাষ্ট্র কীভাবে 'বীরাঙ্গনা' উপাধি দিয়ে এক গভীর জখমকে ঢাকতে চেয়েছে, অথচ সেই ক্ষতের সুষ্ঠু চিকিৎসার জন্য দায়িত্ব ও সঠিক পদক্ষেপ নেয়নি।

একইসাথে মস্তিষ্কে সপাটে বাড়ি মেরে ওঠে—বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় নারীদের প্রতি অবমাননা, তাঁদের অস্তিত্বহীন করে ফেলার গোয়ার্তুমি। অজস্র মানুষ ইতিহাস থেকে শেখে না, মনেও রাখে না—ঠিক কোন কোন ভেদাভেদ মানুষকে বন্যপশুর থেকে আলাদা করে তোলে।

এই উপন্যাসে ওয়াসি আহমেদ যেভাবে শেফালি, চম্পা, রেখা, মান্তু কিংবা জবার মনোজগতে অনায়াসে প্রবেশ করেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর! তিনি পাঠককে কেবল গল্প শোনাননি, পাঠককে তাঁর চরিত্রগুলোর সঙ্গে বসিয়ে দিয়েছেন সহজাত অথচ গভীর এক সংলাপে—যা মনে দাগ কেটে যাবে বহুদিন।

কিন্তু, একটা আফসোস থেকে গেলো—উপন্যাসটা প্রকাশের প্রায় ৪ বছর পর পড়তে পারলাম বলে। দেশ থেকে দূরে থাকার বিচ্ছিন্নতা যেন এই আক্ষেপটাকেই আরেকটু তীক্ষ্ণ করে তুলল। শাহীন আখতারের 'তালাশ' এর পাশাপাশি 'বরফকল' ও এ সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরী। বইগুলো নিয়ে পাঠকদের আরও আলাপ উঠে আসার অপেক্ষায় থাকলাম...
Profile Image for Ashkin Ayub.
464 reviews230 followers
September 18, 2021
অবস্থাবিশেষে মনুষ্য হিংস্র জন্তু মাত্র

বঙ্কিমের আনন্দমঠ থেকে মেরে দিলাম। আজকাল নিজের অস্তিত্ব নিয়ে খুবই সংশয়ের মধ্যে থাকি। কি বলবো বলেন? সাহস এর 'স' নাই বললেই চলে। কোন কিছু বলতে গেলেই অবস্থা বেগতিক হয়ে যায়, প্রায় সবাই বিচারক হয়ে যায়। মনে হতে থাকে, সবাই যেন ওঁত পেতে আছে। আম পছন্দ বললে কাঁঠালের অপমান হয়ে যায়, ঘাড় মটকাতে আসে। তাই ঘাড় বাচাতে সাবধানে কথা বলি, খুব সাবধানে। তবুও মাঝে মধ্যে শেষ রক্ষা হয়না।

বস্তির মানুষ, ছাপোষা মধ্যবিত্ত আবার হালের সাবঅল্টার্ন যাই বলি না কেন, এদের বাদ দিয়ে আসলে উন্নতিটা ঠিক কোথায়? বিশাল বিশাল বিল্ডিং ঠিক কত মানুষের বাস সেটার উত্তরই পাবা কোথায় পাওয়া যাবে? চিন্তা হয় কিন্তু প্রকাশ করতে গেলে তো আবার সবাই রাগ করে।

আজকাল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তেমন একটা অনুভূতি দেখি না। হয়ত লোক দেখানো অনুভূতি দেখি কিন্তু মনে ধরে না। আবার আমি দেখি না বলে যে অন্য কেউ দেখায় না সেটাও না। আবার আসল বা নকল অনুভূতি কেমন সেটা নিয়েও থিসিস/বিবাদ চাচ্ছিনা। আবার সত্যি সত্যি অনুভূতি থাকতেই হবে এমনটাও দাবী করছিনা। বোধহয় নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের অনুভূতি জিনিসটা জটিল অনেক।

ওয়াসি আহমেদ এর লেখা এই প্রথম পড়া। বেশ ঝরঝরে। তথাকথিত সুশীল সমাজের স্পর্শকাতর বিষয় বলে গন্য বীরাঙ্গনা ও বীরাঙ্গনাদের পরের প্রজন্মের ওপরও ২৩০ পাতার একটা উপন্যাস পড়তে গিয়ে কোথাও কোন হোঁচট খেতে হয়নি। কিন্তু বার বার নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হয়েছে। আমাদের দেশ কি আসলেই স্বাধীন?

শেফালি বেগম, চম্পা বা জবারা কি কখনো স্বাধীন হবে না??
Profile Image for Amit Das.
179 reviews118 followers
April 21, 2021
শুধু এই বছরেরই না, এ যাবৎ আমার পড়া শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি 'বরফকল'। গত বছর শাহীন আখতারের 'তালাশ' একই সাথে মুগ্ধ ও স্তব্ধ করে দিয়েছিল। একই ঘটনা ঘটল ওয়াসি আহমেদের এই মাস্টারপিসের ক্ষেত্রেও।

এটি সেই উপন্যাস যেখানে লেখক একটি জনপদের এক জিজ্ঞাসার বহুরৈখিক আখ্যান টেনেছেন যেই জিজ্ঞাসা অমীমাংসিত থেকে যায় যখন মুক্তিযুদ্ধকালীন নিগ্রহের শিকার শেফালি বেগমের পলায়নপর জীবন শুধুমাত্র তার একার থাকে না, সেই একই নিয়তি তার সন্তানের জীবনেও নেমে আসে!

আমার পড়া ওয়াসি আহমেদের প্রথম উপন্যাস ছিল এটি। একটি মাত্র লেখা পড়েই লেখকের সব রচনা পড়ে ফেলার ইচ্ছা হয়েছে, এরকমটা খুব কমজনের ক্ষেত্রেই হয়েছে; ওয়াসি আহমেদ তাঁদের মধ্যে একজন।
Profile Image for Farzana Raisa.
533 reviews239 followers
March 6, 2024
যে কোন যুদ্ধে, যুদ্ধ বাদই দিলাম.. যে কোন ঘটনায় নারী হচ্ছে পুরুষের কাছে প্রতাপ দেখানোর অন্যতম বড় অস্ত্র। ধর্ষণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায় হলেও যুগে যুগে এই অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে আসছে অসংখ্য নারী। ৭১ এ পাক বাহিনির নির্মম অত্যাচারের কথা বলি কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি সৈন্যদের নির্যাতন.. এগুলো তো উদাহরণমাত্র। যুদ্ধে নারীদের প্রতি সহিংসতা দেখিয়ে প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙেচুরে দেওয়া আক্রমণকারীর অন্যতম অস্ত্র। যার রেশ শেষ হয় না যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার কয়েক প্রজন্ম পর পর্যন্ত। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিংবা যোদ্ধাদের গ্লোরিফাই করে অনেক সময় অনেক কিছু লেখা হয়েছে, দেখানো হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা যাদের বীরাঙ্গনা বা ওয়ার হিরোইন বলে চিনি, তাদের কাছে যুদ্ধের সময়টা একটা দু:সহ স্মৃতি ছাড়া আর কিছু নয়। যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করাও মনে হয় তাদের সেই ভয়ংকর মুহূর্তগুলোর স্মৃতিকে উসকে দেয়া। শুধু যুদ্ধকালীন সময় না, যুদ্ধের পরেও যুদ্ধ করে যেতে হয়েছে সেই নারীদের। সরকারি হিসেবে কিংবা বই পত্রে পড়ি সেসময় দুই লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিলো। কিন্তু কোন কোন গবেষকদের মতে, সে সংখ্যাটা তার চেয়েও বেশি। অনেকে আড়ালে আবডালে থেকে, ভাগ্যবতীরা পরিবারের সাপোর্ট পেয়ে জীবনটাকে কিছুটা হলেও গুছিয়ে নিতে পেরেছেন। বাকিরা? শুধুমাত্র বীরাঙ্গনা বলে জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে। ওয়াসি আহমেদের 'বরফকল' উপন্যাস এমনই একজন ভাগ্যহত নারীকে নিয়ে লেখা... যে জীবনভর কেবল পালিয়েই বেড়িয়েছে।

ভাগ্যবিড়ম্বিত এ নারীর সাথে সাথে এসেছে আরও অনেক চরিত্র। তাদের উদ্ধার করে যে পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল, সেই কেন্দ্রের প্রধান, সমাজকর্মী যাকে আমরা চিনি 'রেখাবু' নামে। দেশের সাথে, পরিবারের সাথে প্রায় সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলা এক বাউণ্ডুলে যুবক জাফর সাদিক। যে কিনা প্রথমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মাথা না ঘামালেও একটা পত্রিকার হেডলাইন দেখে তাড়িত হয়ে চলে আসে শুধুমাত্র 'কিছু একটা' করবে বলে। 'কিছু একটা' করেও সে... তারপর? এই বইয়ে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিন্তু খুব স্পর্শকাতর আরেকটা বিষয়, 'যুদ্ধ শিশু'। ওয়ার হিরোইনদের জীবন যা হোক.. এক রকম ভাবে কেটে গেছে। কেমন ছিলো তাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম? বাবার পরিচয় তো নেই-ই.. এদের কেউ কেউ মায়ের পরিচয়টা পর্যন্ত জানতো না। কেউ কেউ তাদের পরিচয় জানলেও সমাজে তাদের অবস্থা কেমন ছিলো? তাদের কেউ কেউ আবার দত্তক হিসেবে চলে গিয়েছিল বিভিন্ন দেশে। উন্নত দেশে, উন্নত শিক্ষা পাবার পরও তাদের জীবন কেমন ছিলো.. সেটাও দেখানো হয়েছে উপন্যাসে।


বরফকল উপন্যাসে খুব নিস্পৃহ ভঙ্গিতে খুব ভয়ংকর বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন লেখক। কখনও কেন্দ্রের সেই সমাজকর্মীর মুখ দিয়ে.. কখনও ন্যারেটিভে। বইজুড়ে থাকা নির্মম বাস্তবতা আপনাকে স্থবির করে দিবে। আর যদি এই প্রজন্মের হয়ে থাকেন.. যুদ্ধের সময় কিশোরী কিংবা তরুণী.. না, ভুল বললাম, একজন নারী হয়ে সেসময়কার ভয়ংকর অনিশ্চিত আর আতঙ্কময় সময়গুলো পার করতে হয়নি বলে নিজেই নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিবেন। ভদ্রলোক একটা ক্লাসিক বই লিখে ফেলেছেন।
Profile Image for Ifsad Shadhin.
115 reviews24 followers
April 14, 2021
মোটাদাগে বীরাঙ্গনারা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাজুয়ালটি। ইতিহাস সবসময় ক্যাজুয়ালটিদেরকে একটা সংখ্যা দান করেই ক্ষান্ত দেয়।

বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ‘দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানীর বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের স্বাধীনতা’— ছোটবেলা থেকে এটুকুই হলো বীরাঙ্গনা সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে মজার ব্যাপার বোধহয় আমাদের সমাজের বীরাঙ্গনাদের ট্রিটমেন্ট। ক্যান্সার সদৃশ বস্তু জ্ঞাত করে বাংলাদেশ হয়তো তার এই হতভাগ্যদের লুকিয়ে রেখেছে, নাহলে পদে পদে হীন করে বেমালুম ভুলে যাবার চেষ্টা করেছে।

নারীর কুমারীত্ব বা ভার্জিনিটি এদেশে ঠিক নারীদের জন্য নয়, তা হলো পুরুষদের ইগো এবং কাম-স্কেলে নারী মূল্যায়নের এক উপযোগ মাত্র। ‘মা*ী’ কিংবা ‘বেশ্যা’ গোত্রীয় অশ্লীল শব্দের কোনো পুরুষবাচক প্রতিশব্দ পাবেন না। ইংরেজি ‘ম্যান-হোর্’ বাংলায় ম্যানহোর্-ই থেকে যায়। কারণ নারীর শরীর কিংবা রূপ কিংবা তার একান্ত ব্যক্তিগত বেডরুমে সে কি করে তাই জাজ করেই আমাদের সমাজের কাজ চলে যায়। নিজেকে আয়নার সে দেখে না।
আবার এখানে স্টকহোমে সিন্ড্রমও কাজ করে। কোনো নারী ধর্ষিত হবার পর নিজের প্রাইভেট স্পেসের লঙ্ঘন কিংবা কন্সেন্টের অবমূল্যায়নে যতোটা না ট্রমাটাইজড হয়, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত থাকে সমাজের কথা ভেবে। “লোকের সামনে মুখ দেখাবো কিভাবে?”
অদ্ভুত এক কনানড্রাম!

স্বাধীন রাষ্ট্রে তাই যখন বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হলো, তাদের পুনর্বাসনের জন্য নানান পদক্ষেপ নেয়া হলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বললেন, ‘কাঁদিস না। কোনও চিন্তা নেই, আমি তো আছি। তোদের কোনও দুঃখ আমি রাখবো না।’ – তখন ব্যাপারটা হিতেবিপরীত হয়ে হলো মরার উপর খাঁড়ার ঘা। সমাজ উল্টো এই চিহ্নিত হতভাগ্যদের এড়িয়ে চললো, যারা বরঞ্চ লুকিয়ে ঝুঁকিয়ে বাঁচতো, তারাও পড়লো এই আজব রোষানলে।

এসব তো গেল সত্তরের দশকের কথা। ২০২১ সালে এসে কি আমরা কোনো উন্নয়ন করতে পেরেছি? মোটেই না। এখনও ধর্ষিতার বিয়ে হলে সেটা নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন আসে। কি আজব, বিয়ে তো মেয়েটার হওয়া উচিত এমনিতেই। ও তো দোষী না, তাহলে এটা নিয়ে এতো বাড়াবাড়ির কি আছে? কিন্তু ওইযে, আমরা ৭০ এর দশকে থেকে এখনো তো এগোতে পারিনি। তাই আমাদের কাছে এটাই উদযাপন যোগ্য সংবাদ।

‘বরফকল’ ইতিহাস আশ্রিত ফিকশন। বীরাঙ্গনার তিন প্রজন্ম সমাজের কাছে যেভাবে নিগৃহীত হয়েছে, তারই এক খন্ডচিত্র। বইয়ের ভাষায়, ‘মুক্তিযুদ্ধকালীন নিগ্রহের শিকার এক নারী নিজের পলায়নপর জীবন নিয়ে ভেবেছিল পলায়নটা তার একার, কিন্তু যখন তার নিয়তি তার সন্তানের ওপরও ভর করে, তখন তা আর তার একার থাকে না, হয়ে ওঠে এক জনপদের অমীমাংসিত জিজ্ঞাসা। এ উপন্যাস এই অমীমাংসিত জিজ্ঞাসার বহুরৈখিক আখ্যান।’


বইটা খুব চমৎকার লেগেছে। বীরাঙ্গনাদের নিয়ে যতোবার পড়ি ততবারই অবাক হই, খুবই অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে ভুগি। এই বইও তার ব্যতিক্রম নয়।



সিরিয়াসলি, একবার হলেও ‘বরফকল’ সবার পড়া উচিত। নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে চিরপরিচিত সমাজ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দেখা যাবে।
Profile Image for Anik Chowdhury.
176 reviews35 followers
September 25, 2021
স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের জয় বিজয় হয়েছিলো তবে এই বিজয়ের সাথে সাথে আমরা যা মাথা পেতে নিয়েছিলাম তা হলো ত্রিশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু। যারা বলিদান করেছিলো নিজেদের জীবন। তবে আরো কিছু মানুষ আছেন যারা ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন নীরবে। সমাজ হয়তো তাদের নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামায় নাই। আমরা হয়তো ওদের রক্তের রঙটাও জানি না। ওদের রক্ত দিয়ে একটা সমুদ্র গড়া না গেলেও হয়তো ডোবা বানানো যেতো। তাদের সংখ্যাটা নেহাৎ কম নয়। সাড়ে তিন লাখের উপরে। অনেকের মতে সেই সংখ্যাটা আরো বেশি। আর উনারা হলেন আমাদের দেশের বীরাঙ্গনা। যারা নীরবে সহ্য করেছিলো নির্যাতন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কী তারা স্বাধীন হয়েছিলো?
এই বইতে শেফালীর একটা উক্তি খুব করে ভাবাতে বাধ্য করে। সে বলেছিলো, দেশটা স্বাধীন হয়ে তাকে পরাধীন করেছে; যুদ্ধটা যদি না হতো তার মতো লাখ লাখ মেয়ের জীবন বরবাদ হতে না।
তাছাড়া কেমন ভাবে দিন কাটাচ্ছে যুদ্ধশিশু? সেসময়ে বীরাঙ্গনা নারীরা যেসব শিশুর জন্ম দিয়েছিলো তাদের বলা হতো যুদ্ধশিশু।
আর পাকিস্তানের সৈন্যরা কতটা ঘৃন্য হলেই বা বলতে পারে, " It was war! You rape the women!

পাঠক প্রতিক্রিয়া যদি দিতে হয় তাহলে একটা কথা বলবো এই বইটা আমার জীবনে পড়া সবচেয়ে ভালো বইগুলোর একটা হয়ে গিয়েছে। কেন? কারণ লেখক এখানে আমাকে এমন সব সত্য এবং প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন যার মুখোমুখি হওয়া খুব কঠিন। কিছু রেখে যাওয়া কথা এখনো ভাবচ্ছে আমাকে। আপনাকেও ভাবতে বাধ্য করবে। এই বইটাতে বীরাঙ্গনা এবং তার উত্তরসূরিরা বর্তমানে আমাদের সমাজে কীভাবে বেঁচে আছেন তার সচিত্র অবস্থান দেখাতে চেয়েছেন লেখক। লেখক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন জায়গায় আলোকপাত করেছেন। যার ফলে আমি আরো ভাবার সুযোগ পেয়েছি।
Profile Image for Samiur Rashid Abir.
218 reviews43 followers
September 14, 2022
এ ধরণের লেখা আমি পড়তে পারি না। পড়লে মনের মধ্যে সীমাহীন ক্রোধ আর হতাশার সঞ্চার ঘটে। কিন্তু অত্যন্ত টাইট শিডিউল এর মাঝেও বইটা পড়লাম। সময় পেলেই পড়ছিলাম। কারণ, ওয়াসি আহমেদের লেখনী। শুধুমাত্র লেখনীর জোরেই বইটা শেষ পর্যন্ত পড়ে যেতে পারছি।

সমাজের রীতিনীতির সীমাবদ্ধতা বুঝার সবচেয়ে সহজাত উপায় হচ্ছে সেখানের অত্যাচারিত এর উপর সমাজের নিষ্ঠুরতার রূপখানা দেখা। নইলে দেখেন, সমাজ রক্ষার অন্যতম কারিগর যারা সংস্কৃতি, সমাজ রক্ষার যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত তাদের ই বলিদান দিতে হয়। যার সম্মানের দরুন একটা পরিবারের কয়েকটা প্রাণ বেঁচে গেছে সমাজের ভয়ে সেই মানুষটাকে নিয়ে আবার সেই পরিবারের লজ্জায় পড়ার মতন দুঃসহ জিনিস আর হতে পারে না। এত এত যুদ্ধ কেটে গেল, বিশ্বযুদ্ধ ও পার হয়ে গেল। তবুও জেনোসাইডের পাশাপাশি ক্রাইম হিসাবে রেপ জায়গা পেল না।

জাফর সাদেকের মতন মানুষ রা শেফালী বেগমদের অধিকার আদায়ের যতই চেষ্টা করুক। মানব মনের রিফর্মেশন ছাড়া আইনের রিফর্মেশনে কোন লাভ ই হবে না। যুদ্ধের একটা হাতিয়ার স্বরূপ ঘৃণ্যতম কাজে একটা জেনারেশন শুধু না, তিন জেনারেশনের যে অস্তিত্বহীনতার মতন ব্যাপার ঘটছে তা সত্যিই দুঃখজনক। আমার ক্ষুদ্র মনে প্রশ্ন জাগে, বীরাঙ্গনা দের কোনটা বেশি পীড়াদায়ক লেগেছে, মিলিটারিদের অত্যাচার নাকি যুদ্ধের পরে স্বজাতিদের ঘৃণা?

মাস্ট রিড একটা বই। এসব বই অন্তরে ধাক্কা দিবে, অন্তরে ক্রোধের সঞ্চার ঘটাবে এবং দিনশেষে একটু ভাবতে শেখাবে, মানুষ এতও নিষ্ঠুর হয়!
Profile Image for Mahbub Mayukh Rishad.
57 reviews15 followers
May 19, 2021
অস্বস্তিকর। কেন অস্বস্তিকর? এমন একটা বিষয় নিয়ে উপন্যাসটি লেখা, এমন একটা গল্প অস্বস্তি না লেগে পারেই না। ন্যারেটিভের এক্সপেরিমেন্ট, দুর্দান্ত গতিশীল ভাষা, মর্মস্পর্শী গল্প। বীরাঙ্গনা, যুদ্ধশিশু- আমরা গর্ব নিয়ে বলি নাকি আফসোস নিয়ে নাকি লজ্জা নিয়ে? আর যারা তার ভেতর দিয়ে গেছে তাদের মনের অবস্থা আসলে কেমন থাকে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে বরফকল।
Profile Image for Habib Rahman.
77 reviews1 follower
January 5, 2025
❝It was war, you rape the women! ❞

সময়টা ১৯৭১। দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রাম শেষে ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্তে স্নান করে ছোট্ট এই দেশ পেল চমৎকার একটি শব্দ ব্যবহার করবার অধিকার। স্বাধীন, স্বাধীনতা। এই স্বাধীন হতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি তাদের আমরা বলি মুক্তিযোদ্ধা। অস্ত্র হাতে জীবন বাজি রাখা রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধাদের ভূষিত করা হয়েছে নানা খেতাবে। বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম,বীর প্রতীক। তাঁদেরকে ভাসানো হয়েছে ভূয়সী প্রশংসায়। অমর করে রাখা হয়েছে চিরদিনের জন্য এদেশের ইতিহাসে। তাদের মহীরুহ সম ছায়ায় আড়াল হয়ে গেছে তিন কিংবা চার লক্ষ মানুষের ভিন্ন এক সংগ্রামের গল্প। তাদেরকে খেতাব দেয়া হয়েছিল বীরাঙ্গনা। যাদের কেউ ছিলেন নাবালিকা কিশোরী, কেউবা নারী,কেউবা থুত্থুড়ে বৃদ্ধা । দখলদারদের বাংকার কিংবা ক্যাম্পে উলঙ্গ অবস্থায় দিনের পর দিন নির্যাতিত নিপীড়িত এই নারীদেরকে আড়াল করবার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল স্বাধীনতার পর। দেশটা তখন যেন উটপাখির দেশ হয়ে গিয়েছিল । উট পাখি যেমন বিপদ দেখলে বালিতে মুখ ডুবিয়ে ভাবে সে নিরাপদ, তেমনি তখনকার সময়ে ভীষণ স্পর্শকাতর বীরাঙ্গনা ইস্যুতে সরকার থেকে শুরু করে দেশের সবাই যেন উটপাখি বনে গিয়েছিলেন।

একজন বাদে। পাগলাটে এক সাংবাদিক বিদেশ থেকে সদ্য স্বাধীন এ দেশে পা রেখেছিলেন একটা মাত্র লাইনের উসিলায়। জেলখানায় আটক এক পাকিস্তানি সৈনিকের It was war, you rape the women এই অনুশোচনাহীন দম্ভোক্তি শুনে শপথ নিয়েছিলেন বীরাঙ্গনা ইস্যুতে দেশ থেকে শুরু করে সমগ্র বিশ্বের মাঝে আলোড়ন তৈরি করবেন, পাপিষ্ঠদের আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে শাস্তি দেবেন। পেয়েও গেলেন একজনকে। লাজ-লজ্জা ছুঁড়ে ফেলে যে প্রস্তুত তার মত হাজারো বীরাঙ্গনার উপর করা অত্যাচার এর গা শিউরানো গাঁথা প্রকাশ করতে। তার নাম শেফালি। ইন্টারভিউতে ক্যামেরার সামনে দ্বিধাহীন চোখে শেফালি বোমা ফাটায়। অকম্পিত গলায় বলে, মুক্তিযুদ্ধ এ দেশকে স্বাধীন করেছে ঠিকই কিন্তু পরাধীন করেছে তার মত সবাইকে। কেন? উত্তর জানা নেই।

ছোট্ট এই পাঠক জীবনে বেশ কিছু ভালো ভালো বই পড়া হয়েছে। তবে আমার মনে পড়ে না কোনো বই আমাকে এতটা আবেগ মথিত করেছে কখনো। যেখানে এ বইটির সাইজের অন্যান্য বই দিন দুয়েকের মাঝে শেষ করে ফেলি সেখানে এ বইটি পড়ে শেষ করতে পাক্কা নয় দিন লেগেছে। একটানা পড়তে পারিনি বইটা, বেশ কয়েকটা সিটিংয়ে শেষ করতে হয়েছে। এর মূল কারণ লেখকের লেখনশৈলী। বীরাঙ্গনাদের দুর্বিষহ জীবনের আবেগ বিবর্জিত, সাদামাটা কিন্তু রোমহষর্ক বর্ণনা গুলো এতটা দাগ কাটে যে একটানা পড়লে মনে বেশ প্রেশার পড়ে। তাছাড়া বইটির পটভূমি আমার নিজ গ্রাম হওয়ায় গল্পটা বেশ আপন আপন মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল গল্পের মাঝে আমিও বুঝি একটি চরিত্র।

বইটি নিয়ে আরো কিছু লিখবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু কী লিখব ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। বারবার ব্যাকস্পেস চেপে লিখা মুছে আবার নতুন করে লিখতে বিরক্ত লাগছে নিজের উপরই, নিজের অক্ষমতার উপর। শুধু এটুকুই বলব, বইটা পড়ুন। ভালো একটা বই।
হ্যাপি রিডিং

বরফকল
ওয়াসি আহমেদ
৩৫০ টাকা
Profile Image for Adham Alif.
335 reviews81 followers
May 13, 2023
বছরের অন্যতম সেরা বইটা পড়ে ফেললাম মনে হয়। ওয়াসি আহমেদ তার গদ্যশৈলী দিয়ে মুগ্ধ করলেন।
সবার জন্যই বইটা রিকমান্ডেড।
Profile Image for Shotabdi.
820 reviews203 followers
July 18, 2022
পালাচ্ছে দিনরাত্রি, পালাচ্ছে ১২ মাস
কোথায় থামবে?

কেন পালাচ্ছে? কে পালাচ্ছে?
পালাচ্ছে শেফালি, পালাচ্ছে চম্পা, পালাচ্ছে মান্তু, পালাচ্ছে জাফর সাদিক। সবাই পালাচ্ছে। কেউ পালাচ্ছ��� সমাজের কাছ থেকে, কেউ পালাচ্ছে সংসার থেকে, কেউ পালাচ্ছে অপরাধী হয়ে আবার কেউ পালাচ্ছে নিজের কাছ থেকে৷ একটাই উদ্দেশ্য, বাঁচা।

যুদ্ধাপরাধ এর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণ্য এবং অপরাধীর চাইতে ভিক্টিমের প্রতি বেশি অমানবিক আচরণ করা হয়েছে যুদ্ধকালীন পাকসেনা কর্তৃক ধর্ষিতা নারীদের সাথে। এই বিষয়টা স্পর্শকাতর। একদিকে মেয়েরা সয়েছে অবর্ণনীয় শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার, অপরদিকে যুদ্ধ শেষে তাদের মেনে নিতে সমাজ করেছে গড়িমসি। সরকার, এনজিও বা বিদেশী সংস্থার সাহায্য পেলেও সমাজে স্বাভাবিকভাবে ফিরে যেতে পেরেছে খুব কম বীরাঙ্গনা। এর সাথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু যুদ্ধশিশু। এদের মা বাঙালি, বাবা পাকিস্তানি৷ এরা সমাজে, এমনকি নিজের মায়ের কাছেও অপ্রত্যাশিত, ভীতিকর ক্ষেত্রবিশেষে ঘৃণ্যও।

যুদ্ধের সময় শেফালি এক সাধারণ গ্রাম্য কিশোরী, যার কদিন পরেই বিয়ে হওয়ার কথা। মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের শেফালি পরিবারের সাথে পালাতে গিয়ে অন্ধকারে ক্ষেতের মধ্যে আলাদা হয়ে গিয়ে পড়ল রাজাকার-পাকিস্তানিদের হাতে৷ যুদ্ধ শেষে তার পরিবার তাকে ফিরিয়ে নিল না, মৃতপ্রায় অবস্থা থেকে কেন্দ্রের একজন সহানুভূতিশীল সমাজকর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রমে সে সুস্থ হল, জন্ম দিল চম্পার। কিন্তু এরপর? জাফর সাদিক বলে এক সাংবাদিকের কাছে নিজের মনের সকল কথা উজাড় করে দিয়ে সাময়িক শান্তি পেলেও শেফালি বীরাঙ্গনা হিসেবে হয়ে গেল কুখ্যাত বা বিখ্যাত। যার ফলস্বরূপ সে কাজ পায় না, তার মেয়েকেও সবাই দেখে ঘৃণার চোখে। সেই থেকে শেফালির পালানো শুরু।

পরবর্তীতে মেয়ে চম্পার বাবার পরিচয় না থাকায় তার বিয়েটাও ভেঙে যায়, একমাত্র সন্তান জবাকে নিয়ে তাকেও পালিয়ে বেড়াতে হয়। জবাকে আশ্রয় দেন সেই কেন্দ্রের মালাকা। শেষ পর্যন্ত, শেফালি, চম্পা এদের পরিণতি কী হয়?

আফসোস হয় ওয়াসি আহমেদের মতো কোয়ালিটিপূর্ণ এবং জনপ্রিয় হওয়ার মতো লেখক থাকা সত্ত্বেও লোকে তাঁকে তেমন করে চিনল না। শহীদুল জহির বা মাহমুদুল হকের লেখার বিষয় বা শৈলী বুঝতে হয়তো সাধারণ পাঠকের প্রথমে একটু হোঁচট খেতে হয়। কিন্তু অত্যন্ত সাবলীল ভাষা আর সহজ লেখনরীতি মেনে দারুণভাবে বিষয়বস্তু ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা এঁনার রয়েছে। যুদ্ধপরাধ এর মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে হাত থেকে রাখা যায় না এমন মানের একটি উপন্যাস লেখা মুখের কথা নয়। একই সাথে কাজ নিয়ে যথেষ্ট গবেষণাও করেছেন লেখক। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে এটি ক্লাসিক আখ্যা পাওয়ার দাবি রাখে।
Profile Image for প্রিয়াক্ষী ঘোষ.
364 reviews34 followers
January 17, 2024
১৯৭১ সালটা বাংলাদেশ এবং এদেশের মানুষের জন্য বড় বিপর্যয়ের সময়। গোটা সময়টা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গেছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেকেই অংশগ্রহণ করেছেন । দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু বিনিময়ে দিতে হয়েছে অনেকের প্রাণ ও সম্ভ্রম। যুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মানুষকে অনেক ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় দিতে হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হয়ে দেশ স্বাধীন হলেও কিছু মানুষ হয়ে পড়লো পরাধীন-- যারা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী ছিল বিভিন্ন ক্যাম্পে।
তাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলো। সেখানেই অনেক সন্তানের জন্ম দিলেন এবং পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন।
তাদের মধ্যে ছিল শেফালী।
বীরাঙ্গনা উপাধি দেওয়া হলো বটে তবে এটাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। এর প্রভাব তাদের সন্তানের উপর এসে পড়লো।
যুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে এমনই সব বীরাঙ্গনা ও তাদের সন্তানদের নিয়ে লেখক ওয়াসি আহমেদ এর "বরফকল"।

আমি মনে করতাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যা-কিছু ভালো লেখা সব লেখা শেষ, এখন এই সময়ে এসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভালো আর কী লেখা হতে পারে!
আশ্চর্য! ২০২১ সালের বইমেলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে এতো চমৎকার একটা বই।
Profile Image for সন্ধ্যাশশী বন্ধু .
369 reviews12 followers
June 2, 2023
শেফালী বলেছিল,"দেশটা স্বাধীন হয়ে তাকে পরাধীন করেছে;যুদ্ধটা যদি না হতো তার মতো লাখ লাখ মেয়ের জীবন বরবাদ হতো না
পৃথিবীর সৃষ্টি লগ্ন থেকে আজ অব্দি মেয়েরা কখনোই স্বাধীন ছিল না,ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভবনা ও দেখি না। বাংলাদেশের মত থার্ড ওয়াল্ডের গরিব দেশের কাছে মেয়েদের স্বাধীনতা চাওয়া ও ভুল। এমনকি পৃথিবীর উন্নত যে সকল দেশের মানুষ দাবি করে মেয়েরা স্বাধীন, সেটা অনেকটাই ভিত্তিহীন। আমার কথা হয়তো খারাপ শোনাতে পারে,কিন্তু এটাই সত্যি যে " পৃথিবীর কাছে মেয়েরা একেকটা পুতুল। যেমন খুশি নাড়ে চাড়ে, দেখার আশ মিটে গেছে তো এবার ছুঁড়ে মার। " না হলে কেন পৃথিবীতে সব কিছু মেয়েরা পরে পাবে? কেন তাদের নিজের অধিকার সংগ্রাম করে ছিনিয়ে নিতে হবে,পুরুষ নামক রাজার থেকে?

যুদ্ধের মত এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে মেয়েরা জীবন দিল,নিজের সম্ভ্রম দিল। এর পরেও নারী বীর না। যুদ্ধে মানুষকে হত্যা করা যত টা অপরাধ,তার চেয়ে বড় অপরাধ একটা নারীকে লাঞ্ছিত করা। কিন্তু এদেশে এসব কিছুই না। যত যা বলা হোক,ক্ষমতা পেয়ে পুরুষ জাত টা একটা ইতর জাতে পরিণত হয়ছে,এর প্রভাব পড়বেই।

"বরফকল" পড়লাম। খুব ঠান্ডা মাথায় শেষ করলাম। শেষ পাতায় যখন আসলাম,আমার মাথা পুরোপুরি খালি। আমি কিছু লেখার অবস্থায় নেই,সব পরিষ্কার ফাঁকা! ঘন্টাদুয়েক পর ভাবলাম,না কিছু একটা লিখি। " বরফকল " আহামরি ভালো বই আমি বলব না। তবে এই বই পাঠক এমন এক সত্যতের মুখোমুখি দাঁড় করাবে,এতদিনের ধ্যান ধারণাতে চিড় ধরবে। ওয়াসি আহমেদের দক্ষ হাতের লেখা বইটা অন্য মাত্রা দিয়েছে।
Profile Image for Tanoy Bhowal.
63 reviews4 followers
October 23, 2022
একজন বীরাঙ্গনা ও তার পরিবারের আত্মজীবন, তাদের চারপাশ, বেড়া উঠার ধরন কে যদি উপন্যাসের মূল বিষয় হিসেবে ধরি, তাহলে অত্যুক্তি হবে না বোধ হয়।
বইটা অনেকটা যুদ্ধের পরবর্তী ঘটনার বিন্যাস, যেখানে বীরাঙ্গনাদের যুদ্ধ পরবর্তী বেঁচে থাকার অনন্ত প্রচেষ্টা, কৃচ্ছ্রসাধন ও যুদ্ধশিশুদের ভবিষ্যতের আশায় অনন্য সংগ্রামই মুখ্য হয়ে উঠেছে। যারা ইতিমধ্যে, " আমি বীরাঙ্গনা বলছি " বইটা পড়েছেন, এই বইটা তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ ওই বইতে বীরাঙ্গনাদের যুদ্ধকালীন সময়ে, পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে যে নির্মম নির্যাতনের নগ্ন বর্ণনা ফুটে উঠেছিলো, এখান এইসব কিছু নেই। এখানে বীরাঙ্গনাদের যুদ্ধ পরবর্তী বিষয়টাকেই মুখ্য করে ফুটায় তোলা হয়েছে।
যাই হোক, গল্পের মূল নায়িকা আসলে দুইজন, বীরাঙ্গনা শেফালি ও তার মেয়ে চম্পা। যুদ্ধে ফলে দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু তাদের মত নারীদের করল পরাধীন, কলঙ্কিত। কলঙ্কের প্রলেপ আরো দৃঢ় ভাবে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রইলো, প্রাপ্ত উপাধির জন্য " বীরাঙ্গনা "। যে উপাধিতে নেই তাদের কোনো প্রচেষ্টা, নেই তাদের কোনো খেতাবের ইচ্ছা।
"যুদ্ধটা যদি না হতো, তার মতো লাখ লাখ মেয়ের জীবন বরবাদ হতো না " - পৃষ্ঠা ২১১।

" শেফালির মত বীরাঙ্গনাদের যুদ্ধের কারণে যাদের জন্ম তাদের একটা নামও আছে - যুদ্ধ শিশু। নাম খারাপ না, তবে বীরাঙ্গনা শব্দটায় একটু ভয় জাগানো অদ্ভুত ব্যাপার আছে। দুইটাই সরকারের দেওয়া নাম।নামে দুই, আসলে এক- দুইজনেই ভাগে। মানুষের চিনে ফেলার ভয় ব্যতিরেকে আর অন্য কিছু না " - পৃষ্ঠা ২২২।
Profile Image for Kripasindhu  Joy.
547 reviews
April 7, 2024
মুক্তিযুদ্ধের কথা আসলেই ত্রিশ লাখ মানুষের মৃত্যু কিংবা কোটি মানুষের দেশ ছাড়ার কথাই বেশি বলা হয়। আর যারা যুদ্ধ করেছে তাদের বীরত্ব এর কথা। সাহিত্যেও একই কথা খাটে। এর আড়ালে বীরাঙ্গনাদের কথা কেউ সামনে আনে না। তাদের নিয়ে কথা হয়েছে কম, লেখালেখিও হয়েছে কম। তারা যেন গুরুত্বপূর্ণ নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যেন তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের মতো।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় আর বীরত্ব যেমন আনন্দ দেয় তেমনি এমন নারীদের কথা আমাদের বিষন্ন করে দেয়।
Profile Image for Mehedi Hasan Bappi.
40 reviews1 follower
November 7, 2025
দীর্ঘ অসুস্থতা নিয়ে ধীরে ধীরে শেষ করলাম।
বীরাঙ্গনা শেফালী বেগম আক্ষেপ রেখে গেলো - কিভাবে দেশটা স্বাধীন হয়েও তাকে পরাধীনতায় রেখে গেছে। চম্পা কিংবা জবার আক্ষেপ যুদ্ধশিশু কিংবা তার পরবর্তী প্রজন্মের যাপিত জীবন কি শুধুমাত্র দুঃখ ক্লেশে ভরা।
সাংবাদিক জাফর সাদেক কি অনুতাপ বয়ে বেড়াচ্ছে? হয়তো, কিংবা না।
Profile Image for Muntasir Dhip.
165 reviews3 followers
July 2, 2024
আমার মনে হচ্ছে এ বছরের সেরা উপন্যাসটা পড়ে ফেললাম!
Profile Image for Fårzâñã Täzrē.
279 reviews21 followers
October 1, 2024
"যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে

জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে ॥

সব যে হয়ে গেল কালো, নিবে গেল দীপের আলো,

আকাশ-পানে হাত বাড়ালেম কাহার তরে?"

সে তো চেয়েছিল একজন বীরাঙ্গনাকে যে চোখ ভিজিয়ে নিজের যন্ত্রণার কাঁদুনি গাইবে, এর বেশি তাঁর কী আশা করার ছিল! কিন্তু যাকে পেল, সে চোখ ভেজানো বা কাঁদুনি গাওয়া দূরের, ক্যামেরার আলো-ঠিকরানো চোখে চোখ রেখে কী অবলীলায়ই না বলে গেছে—কোনো উসকানি ছাড়া কথার পিঠে কথা বসিয়েছে, যেন নিজে না, অন্য কেউ তাঁর গলায় বসে একের পর এক কথা জুগিয়ে গেছে।

ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে উত্তেজনায় জাফর সাদেকের কি তখন মনে হয়নি এতটা আশা করেনি? আলোয় ভেসে যাওয়া মুখ মোমের মতো গলছিল, এদিকে শানিত চোখের ঈষৎ কোঁচকানো ভঙ্গি মুখের কথার চেয়ে যেন বেশিই বলেছিল। সেই না-বলা কথার হদিস পেতেই কি জাফর সাদেক প্রশ্নটা করেছিল, তার পর জবাবটা যখন শুনল, সে কি তাঁর কানকে বিশ্বাস করতে পেরেছিল?

"অনেক দিনের অনেক কথা, ব্যাকুলতা, বাঁধা বেদন-ডোরে
মনের মাঝে উঠেছে আজ ভ'রে
যখন পূজার হোমানলে উঠবে জ্বলে একে একে তারা
আকাশ-পানে ছুটবে বাঁধন-হারা
অস্তরবির ছবির সাথে মিলবে আয়োজন
আমার ব্যথার পূজা হবে সমাপন"

যখন একটা ঘটনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের সময়কে থমকে দেয়, যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পালিয়ে বেড়ায় সত্যের মুখোমুখি হতে তখন সেটা কার কাছে বলা যায়? কে করবে সেই ব্যথার পূজার সমাপন?

যখন ব্যথার পর ব্যথা জমতে জমতে শক্ত বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায় তখন সেই ব্যথার বরফকলে আস্তে আস্তে জমতে থাকে সময়। সে বড় কঠিন সময়। সে বড় কঠিন অসুখ, যে অসুখ মনের অসুখ। যার চিকিৎসা করতে পারবে না এই সমাজ। বরং খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে সেখানে ছড়িয়ে দেবে বিষ। বিষাক্ত হয়ে বরফকলে জমে যাবে মন। সেখান থেকে বের হবার রাস্তা কে জানে! প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সেই বরফকলে চাপা পড়ে আছে।

অবুঝ শিশু যখন প্রশ্ন করে "আচ্ছা মায়ের কী দোষ ছিল?" তখন এই প্রশ্নের কী উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়? দোষ কার? এই সমাজের নাকি তাঁর মায়ের? বরফকলে চাপা পড়ে থাকা প্রতিটি জীবন্ত লাশের গল্প এটা। যারা মরে গেছে বেঁচে গেছে। জীবন্ত লাশেরা আজও বরফকলে চাপা পড়ে আছে।

🔥 শেফালি মেয়েটির নাম। ফুলের মতোই স্নিগ্ধ দেখতে। কিন্তু যখন সে এসেছিল তাঁর অবস্থা ছিল এত খারাপ যে সবার মনে সংশয় ছিল সে বাঁচবে কী না। সংস্থার পরিচালক নিজে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছিল মেয়েটিকে। বারবার হিঁচকি তুলে কেঁপে কেঁপে উঠছে। মেয়েটিকে দেখে বড্ড মায়া হলো রেখাবুর। শেফালি পরে এই নামেই ডাকতো তাঁকে।

জড়িয়ে ধরে রাখতে গিয়ে হাত যায় তলপেটে। পেট ফুলে আছে। তারমানে এই মেয়ে গর্ভবতী। কী সর্বনাশ! একে তো বাঁচাতে হবে। বাচ্চাটা মরে যাবে নাহলে। শেফালিকে নিয়ে আসা হয়েছে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে। চিকিৎসায় শেফালি একটু সুস্থ হলো। কিন্তু সারাদিন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, কারো সাথে কথা বলে না।

শেফালি জানতে পেরেছিল সে গর্ভবতী। কিন্তু সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই। একদিন সুঁই সুতা চেয়ে কাঁথা সেলাই শুরু করলো সেই থেকে কাঁথা সেলাই করে চলেছে। সবাই ভাবলো যাক এবার একটু স্বাভাবিক হবে মেয়েটা।

কিন্তু ডেলিভারির পর হাসপাতালে শেফালির চিৎকার শুনে দৌড়ে এসে রেখাবু দেখলেন শেফালি নার্সকে বলছে বাচ্চাটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে। আছাড় দিয়ে মেরে ফেলতে। রেখাবু ছিনিয়ে নিয়ে আঁচল দিয়ে বাচ্চাটাকে জড়িয়ে নিলেন। ফুটফুটে এক মেয়ে সন্তান। শেফালি কেন একে মেরে ফেলতে চায়। এই নিস্পাপ প্রানের কী দোষ?

🔥চম্পা গার্মেন্টসে কাজ করে। স্বামীর ঘর ছেড়ে বহুদিন আগে সে বেরিয়ে এসেছে। আর কখনো ফিরে যায়নি। এখন মেয়েটাকে বুকে নিয়ে সারাজীবন কাটাতে চায় সে। বস্তিতে মেয়েটাকে একা রেখে কাজে বের হয় চিন্তা থাকে কিন্তু কিছু করার নেই।

একদিন হঠাৎ করেই কাজ থেকে ফিরে এসে মেয়ে জবাকে বলে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে। তাঁরা আর এখানে থাকবে না কাউয়া এসে গেছে। জবা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। অনেকদিন আগে মা এভাবেই তাঁকে নিয়ে আরেক বস্তি থেকে পালিয়ে এখানে এসেছিল কাউয়ার কথা বলে। এই কাউয়া কারা?

মাকে জিজ্ঞেস করতেই চম্পা বলে মনে নাই সে বলেছিল কাউয়ারা ক্যাচ ক্যাচ করে, খারাপ কথা বলে। জবাকে নিয়ে চম্পা পালাতে যায়। কিছুতেই কাউয়াদের থেকে কেউ যেন জানতে না পারে অতীত। যার জন্য একদিন চম্পার মা শেফালি পালিয়ে গিয়েছিল তাঁকে ছেড়ে। আজ আবার সেই সময়। কিন্তু গার্মেন্টসে বেতন বকেয়া না নিলে ক্ষতি। জবাকে নিয়ে আম্মার কাছে রেখে আসতে হবে। যেভাবে তাঁকে একদিন রেখে গিয়েছিল মা শেফালি।

🔥 ছোট্ট জবা কিছুতেই বুঝতে পারে না মা এত ভয় কেন পাচ্ছে। কাউয়ারা কী করবে তাঁদের! বস্তিতে সবাই ওকে কত ভালোবাসে। পাশের ঘরের মর্জিনার মা বুড়ি জবাকে আদর করে খুব। জবা অবশ্য মায়ের অস্থির মুখ দেখে নিজেই বুদ্ধি দেয় নানুর বাড়িতে যাবার। চম্পার সেই আম্মা। যাকে শেফালি ডাকতো রেখাবু।

জবা ক্লাস থ্রি অবদি পড়ে আর স্কুলে যায়নি। নানু পরে তাঁকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। জবা বাবার নাম মায়ের নাম লেখা শিখেছে। চম্পাও নিশ্চিত হয় জবাকে এই বাসায় রেখে।

🔥 শেফালি তাঁকে ডাকতো রেখাবু। চম্পা ডাকে আম্মা। ১৯৭১ সালের বহু নির্যাতিতা বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তাঁদের সাথে থেকে প্রতিটি মেয়েকে সাহস যুগিয়েছেন। এসব বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছিল তখন সরকার "war heroin" বলে। শেখ মুজিবুর রহমানের বলেছিলেন বীরাঙ্গনারা যেন বাবার নামের জায়গায় তাঁর নাম লিখে দেয়। রাষ্ট্র শুধু তাঁদের কাজ সারলো।

কিন্তু এই সমাজ তাঁদের আপন করে নিতে পেরেছিল কী? পাকিস্তানি হানাদারদের লালসার শিকার এসব মেয়েদের সমাজ ঘৃণার চো��ে দেখতে শুরু করে। এদের পরিবারের সদস্যরা পর্যন্ত এদের গ্ৰহন করতে অস্বীকৃতি জানায়। এই মেয়েগুলো তাহলে কী করবে? কোথায় যাবে?

অনেক মেয়ে নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে লজ্জায়, ঘৃণায়। যাঁরা বেঁচে আছে তাঁরা একেকজন জীবন্ত লাশ। অনেকের পেটে বাচ্চা। কেউ কেউ আছাড় মেরে, গলা টিপে খুন করেছে নিজের বাচ্চাকে জন্মের পর। কেউ আবার নীরবে মাদার তেরেসার আশ্রমে রেখে গেছে।

রেখাবু, চম্পার আম্মা এমন অসংখ্য বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে জেনেছেন কত গল্প। কিন্তু শেফালি ছিল রেখাবুর খুব কাছের তাই এখন পর্যন্ত শেফালি, শেফালির মেয়ে চম্পার সাথে তাঁর যোগাযোগ আছে।

🔥 জাফর সাদিক লোকটি বহুকাল ছিলেন আমেরিকায়। যুদ্ধের সময় বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকার খবর দেখে একটা হেডলাইন তাঁর রাগ, ঘৃণা বাড়িয়ে দিল "it was war, you raped" মানে যুদ্ধ করছে বলেই কী মেয়েদের উপর অত্যাচার করে তাঁদের ধ র্ষণ করতে হবে? পাকিস্তানি হানাদারদের এ কেমন মনোভাব। এ কেমন লালসা! পাকিস্তানি জেনারেল নিজেও নাকি সৈন্যদের উদ্বুদ্ধ করতো এই কাজে! ছিঃ! ছিঃ! এই ঘৃণ্য কাজ করে ওঁরা ভারতে যাচ্ছে বন্দী হিসেবে। ওদের কোনো বিচার হবে না! যুদ্ধ শেষ মানে কী সব শেষ?

জাফর সাদিক এর আগে দেশের জন্য এতটা ভাবতে পারেননি। এই মেয়েগুলো তাঁকে ভাবতে বাধ্য করেছে। দেশ স্বাধীনের পর একেকক জায়গা থেকে তুলে আনা হয়েছে এদের। কত রাত না জানি এরা ওই হা���়েনাদের শয্যাসঙ্গিনী হয়েছে বাধ্য হয়ে। জাফর আর কিছু ভাবতে পারেন না। নিজের ছন্নছাড়া জীবন ভুলে চলে এলেন বাংলাদেশ। উদ্দেশ্যে সারা পৃথিবীতে জানাবেন এই ঘৃণ্য অপরাধ। বিশ্ব যা জানে এই অপরাধের মাত্রা তার থেকে দ্বিগুণ। জাফর সাদিক বিচার চাইবেন এই বীরাঙ্গনাদের জন্য।

🔥 অভিশপ্ত প্রজন্মের কথা 🔥

একটা অভিশাপে যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের জীবন বরফকলে জমে থাকে সেই জীবন চড়ুইয়ের নয়, সে জীবন কন্টকময়। শেফালি ভুল করেছিল একটা। জাফর সাদিকের কাছে অকপটে ক্যামেরার সামনে বলে গেছে নিজের সর্বনাশের কথা। যার জন্য কী ভুগতে হচ্ছে আজ চম্পা থেকে জবাকেও?

এটা কী কোনো ভুল আদৌও ছিল? এই সমাজ কেন বীরাঙ্গনাদের নিয়ে হাসি তামাশা করছে? কেন এদের যোগ্য সম্মান দিতে কষ্ট হয় সমাজের? বীরাঙ্গনা মানে কী অভিশাপ? এই অভিশাপ তো এরা স্বেচ্ছায় নেয়নি গো! এদের বাধ্য করা হয়েছিল সেদিনগুলোতে। তবে আজ কেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে? কেন পালিয়ে যেতে হবে চম্পাদের? তাঁরা তো চায় নি এ জীবন! তাঁরা কী চেয়েছিল শুনতে রাস্তায় জারজ শব্দটি!

কবে মুক্তি পাবে চম্পারা এই জীবন থেকে? নিজের মাকে পর্যন্ত চোখের দেখা দেখতে পায়না মেয়েটি। আজকে নিজের মেয়ে জবাকেও কী একই পরিনতি ভুগতে হবে? বীরাঙ্গনা বলে সম্মান দেখাতে না পারুক এই সমাজ অন্তত ঘৃণা না করুক।

🔥 পাঠ প্রতিক্রিয়া 🔥

"বরফকল" ওয়াসি আহমেদের লেখা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি সুন্দর উপস্থাপনা। বরফকল নামটির সার্থকতা বুঝতে হলে আপনাকে পুরো বইটি খুব ধৈর্য্য নিয়ে পড়তে হবে। নাহলে বুঝতে পারবেন না নামকরণের সার্থকতা।

ওয়াসি আহমেদের লেখা এর আগে একটি বই পড়েছিলাম আমি। লেখক বেশ ভালো লেখেন। তবে এই বইটিতে উনি আগের সবকিছু ছাপিয়ে গেছেন। গল্পের প্লট সাজানো থেকে শুরু করে চরিত্রায়ন সব মিলিয়ে খুব স্নিগ্ধ উপস্থাপন।

এই গল্পটা আর দশটা গল্প থেকে আলাদা খুব সেনসেটিভ একটা টপিকে লেখা। এবং পড়ার পর আমার মনে হয়েছে লেখক যে প্রশ্ন রেখেছেন এই সমাজের কাছে তা যৌক্তিক। এবং আমরা এখনো ধর্ষকের থেকে ধর্ষিতাকে দায়ী করতে বেশি পছন্দ করি যেমনটা হয়েছিল একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের সাথে।

আচ্ছা এরাও তো মানুষ। কেন এদের ঘৃণা করতে হবে? কেন কু প্রস্তাব দিতে হবে যে পাকিস্তানিদের দিতে পেরেছ আমাকেও কিছু দাও এবার। এই ঘৃণ্য অপরাধ যারা করেছে তাঁদের ঘৃণা করুন আজীবন। এসব মা বোনদের সম্মান করতে শিখো হে সমাজ।

যুদ্ধ শিশু হওয়া অপরাধ নয়। সবার বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এই বই চেতনাকে জাগ্ৰত করবে। এই বই দর্পণ হয়ে সমাজের নোংরা রুপ দেখাবে। তাঁরা বীরাঙ্গনা, তাঁরা বাঙালি জাতির ইতিহাসের অংশ।

ওয়াসি আহমেদের এই বইটি পড়ার সাজেশন অবশ্যই দিতে পারি এক টুকরো মুক্তিযুদ্ধকে তুলে আনার জন্য। লেখক ভালো লিখেছেন এবং লেখনী বেশ গভীর। এখানে তিনি বেশ সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন চেতনা।

🔥 বইয়ের নাম: "বরফকল"
🔥 লেখক: ওয়াসি আহমেদ
🔥 প্রকাশনা: কথা প্রকাশ
🔥 পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৩০
Profile Image for Monjur  Morshed  Prottoy .
22 reviews11 followers
July 28, 2023
জাফর সাদেক তাকে প্রশ্ন করেছিল স্বাধীন দেশে তার কেমন লাগছে? দ্রুত পলক ফেলে শেফালি সোজা ক্যামেরায় চোখ রেখেছিল, একটু আগের কোচকানো চোখের পাতা পরিপাটি, আলোটা যেন তাকে আর উক্ত্যক্ত করছিল না। শেফালি ধীরে, পরিষ্কার গলায় বলেছিল দেশটা স্বাধীন হয়ে তাকে পরাধীন করেছে, যুদ্ধটা যদি না হতো তার মতো লাখ লাখ মেয়ের জীবন বরবাদ হতো না।
Profile Image for Humayun Kabir.
12 reviews1 follower
November 30, 2022
"যেখানেই যাও চলে, হয়নাকো জীবনের কোনো রূপান্তর;
এক ক্ষুধা এক স্বপ্ন এক ব্যথা বিচ্ছেদের কাহিনী ধুসর
ম্লান চুলে দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাঙ্খার ঘর!’
-বলিল অশ্বত্থ সেই নড়ে-নড়ে অন্ধকারে মাথার উপর।"

জীবনানন্দ দাশের কবিতার এই পংক্তিমালা যেন পালিয়ে বেড়ানো বীরাঙ্গনা শেফালির কথাই বলে। কেবল শেফালি নয়, তার মেয়ে যুদ্ধশিশু "চম্পা" এ-র জীবনেও ঘটতে থাকা নানা অঘটনের কথাও বলে। পিতৃপরিচয়হীন চম্পাকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে শেফালীকে অনেক অপমান, লাঞ্ছনা, ঘৃণার এক কণ্টকাকীর্ণ পথ চলতে হয়। জীবনের এক পর্যায়ে এসে চম্পা উপলব্ধি করে সেও ঠিক তার মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করছে-সেও তার মায়ের মতো নিজের মেয়ে জবা'কে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এ যেন অন্তহীন এক লুপ যেখানে তিনটি প্রজন্ম আটকে পড়েছে।

গল্প সংক্ষেপ : উন্নত জীবন ও ফটোগ্রাফারির নেশায় বিলেত যাওয়া জাফর সাদেকের টনক নড়ে পত্রিকার একটি নিউজ দেখে। যেই ভাবা সেই কাজ। সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে তিনি দেশে চলে এসে যুদ্ধে নির্যাতিতা নারীদের নিয়ে কাজ শুরু করেন একটি এনজিওর সাথে। ধর্ষক-হানাদার বাহিনীদের যুদ্ধাপরাধের আওতায় আনতে শুরু হয় জাফর সাদেকের এক দীর্ঘ জার্নি। এই জার্নিতে দূর্ভাগ্যবশত যুক্ত হয় শেফালি। জাফর সাদেককে দেওয়া শেফালির একটি সাক্ষাৎকার তাসের ঘরের মতো তছনছ করে দেয় পরপর তিনটি প্রজন্মের জীবন।

পাঠ প্রতিক্রিয়া : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু গল্প-উপন্যাস পড়া হলেও মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী ঘটনাবলী নিয়ে বিশেষ কোনো বই পড়া হয়নি। এই বইটা পড়ে আমি যেন ছোটখাটো একটি ধাক্কা খাই এবং যুদ্ধকে ভিন্নভাবে উপলব্ধি করতে পারি। আমরা বীরাঙ্গনাদের নিয়ে এখন যতটা মাতামাতি করি যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাদের জীবন কখনোই সহজ ছিলো না। অধিকাংশ প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাননি। এত ত্যাগে-তিতিক্ষার বিনিময়ে পেয়েছেন অন্তহীন ঘৃণা এবং লাঞ্ছনা। এই লাঞ্ছনা থেকে বাদ যায়নি যুদ্ধশিশুরাও। সেইসব বীরাঙ্গনা এবং যুদ্ধশিশুদের গল্পকে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ওয়াসি আহমেদ। যেকোন যুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ জনগণ, নারী ও শিশুরাই। আর নারী যখন যুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন সেটি হয় আরও ভয়াভহ। যে নারীরা যুদ্ধে এত বড় অবদান রাখলো সেই নারীদের সমাজ কখনোই স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেনি। যেসব বীরাঙ্গনাদের কারণে আমরা স্বাধীন হয়েছি, সেইসব বীরাঙ্গনা সেই স্বাধীনতার স্বাদ কখনোই পাননি। এ কারণে হয়তো জাফর সাদেকের প্রশ্নের জবাবে শেফালি অকপটে বলে "দেশটা স্বাধীন হয়ে তাকে পরাধীন করেছে। যুদ্ধটা যদি না হতো তাহলে তার মতো লাখ লাখ মেয়েদের জীবন বরবাদ হতো না।"

যুদ্ধের বাইরে গিয়ে এমন চমৎকার অথচ হৃদয়স্পর্শী টপিক নিয়ে লেখার জন্য ওয়াসি আহমেদ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। একবার অতীত, একবার বর্তমান সময়-আবারো অতীত থিমে লিখতে গিয়ে তিনি পাঠককে সফলভাবে একটি টাইম ট্রাভেল করিয়েছেন। শেফালির দূর্ভোগময় জীবনের পুনরাবৃত্তি মেয়ে চম্পার জীবনে দেখিয়ে দুটো আলাদা আলাদা টাইমলাইনকে তিনি একই সুতোয় গেঁথেছেন। যা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং ছিলো তার জন্য। আবার এতকিছুর মাঝে তিনি রেখাবুর মতো একটি সফল চরিত্র তৈরি করতে পেরেছেন যারা সেইসব বীরাঙ্গনাদের আগলে রেখেছিলেন দিনের পর দিন। রেখাবুরা যেন শেফালির মতো দূর্ভোগের শিকার হাজারো বীরাঙ্গনাদের জীবনে সাক্ষাৎ দেবদূত। বরফকলের মাধ্যমে ওয়াসি আহমেদের লেখার সাথে আমার জার্নি শুরু হলো। সামনে আরও ধাক্কা খাবার জন্য প্রস্তুত রইলাম।

সীমাবদ্ধতা : সব বইয়েই সীমাবদ্ধতা থাকে, এটিও ব্যতিক্রম নয়। শেফালির পালিয়ে বেড়ানো জীবনের সাথে চম্পার জীবনকে রিলেট করতে গিয়ে চম্পাকে অনেক বেশি স্পেস দিতে হয়েছে। ফলে জাফর সাদিক শুরুতে অনেক বেশি স্পেচ পেলেও হুট করে যেন ম্লান হয়ে যান। বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুর ব্যালেন্সে যুদ্ধশিশু বেশি হাইলাইট পেয়েছে বলে মনে হয়েছে। মন্তুর ঘটনা সারপ্রাইজিং হলেও জবা-চম্পার মতোই পালিয়ে বেড়ানোর পরিণতি না দেখিয়ে ভিন্নভাবে দেখালে হয়তো আরেকটু বৈচিত্র্য থাকতো।

উপসংহার : পাঠপ্রতিক্রিয়া একটু বেশিই দীর্ঘ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এবার শেষ করি। পাঠকদের জন্য হাইলি রেকোমেন্ডেড বই এটি। এই বইটি ইতিহাস আশ্রিত সফল উপন্যাস। বাস্তবতা ও ফিকশনের এমন মেলবন্ধন বাংলা সাহিত্যে বিরল। সুখপাঠ্য এই বই পড়ার সময় পাঠকও বিষণ্ন হবে, মনে ক্ষোভ জাগবে এবং অনেক প্রশ্ন মাথায় নিয়ে শেষ হইয়াও হইবে না শেষ এই বরফকলে জিইয়ে রাখা অন্তহীন দুঃখ।

উপন্যাস : বরফকল
লেখক : ওয়াসি আহমেদ
P.R : 4/5
Profile Image for Ronel Barua.
48 reviews6 followers
November 27, 2025
দেশ স্বাধীন হলো, জাতীয় সংগীত পেল, মানচিত্র বদলাল,ফুটলো মানুষের মুখে বিজয়ের হাসি। যেন পৃথিবী নতুন আলোয় রঙিন হলো। কিন্তু আলো যত বেড়ে উঠলো, ততই গাঢ় হয়ে উঠলো তাদের জীবন —যারা আড়ালে রয়ে গেল, রিহ্যাব সেন্টারের একঘেয়ে সাদা বিছানায়, মৃত্যুর অপেক্ষায়, কিংবা বেঁচে থাকা নামের লজ্জাকে বুকে নিয়ে।
তাদের একজন ছিল শেফালি।

যে শেফালির গায়ে নরপশুর কামড় বসেছিল,এমন কামড়, যা মাংসের ক্ষত নয়, রক্তের ভেতর ঢুকে তিন প্রজন্মের স্মৃতিতে রয়ে যাওয়া ক্ষত।

বছর যায়, দেশ বদলে যায়, সরকার পাল্টায়, কিন্তু শেফালির সেই দাগটুকু ঠিকই লাল হয়ে ফুটে থাকে চম্পা ও জবা’র কাঁধে, তিন প্রজন্ম ধরে। হয়তো হবে আরো দীর্ঘ, যেন কাঁচা জবার লাল পাঁপড়িতে আগুন ধরিয়ে কেউ বলেছে—এই দাগ শুকাবে না, এই দাগ জিনিসটা বংশানুগত।

ওদিকে জাফর সাদেক তিন লাখ সম্ভ্রমহানির হিসাব খুঁজতে বেরিয়েছিলেন; নথিপত্রে, সাক্ষ্যে, দেশজোড়া কথার ভিড়ে, তিনি খুঁজেছেন বিচার। তবে…!

বিজয় কখনো সম্পূর্ণ হয় না, যদি বিজয়ের যন্ত্রণা প্রজন্ম ধরে ঘুরে বেড়ায়।
যুদ্ধ শেষ হলেও কিছু যুদ্ধ চলতে থাকে কেবল বন্দুক ছাড়া।
শেফালি তার দাগ বয়ে চলে, চম্পা তার দাগ বয়ে চলে, জবা তার দাগ বয়ে চলে, আর আমরা! আমরা বুঝতে পারি কি না, তার ওপর নির্ভর করে ইতিহাসটা কীভাবে লেখা হবে।

আশা ছিল লেখক চম্পা-জবার পাশাপাশি বীরাঙ্গনার পুত্র সন্তানদের কাহিনীও তুলবেন, এনেছিলেন। তবে তা অতি অল্প ছিল। তবুও বইটির সাবলীল ভাষা, হৃদয় নিড়ানো স্মৃতি—স্পর্শ করে গেছে শিরা-উপশিরা।

২৬/১১/২০২৫
Profile Image for Uzzal Orpheus.
61 reviews6 followers
May 6, 2022
পড়ার সময় হটাৎ হটাৎ বুঝতে পারছিলাম না যে কার কথা বলা হচ্ছে? শেফালী, চম্পা নাকি জবা? মনে হচ্ছিল তিনজনই একই মানুষ। সম্ভবত লেখক সচেতন বা অবচেতন ভাবে তার লেখনীর মাধ্যমে এটাই ঘটাতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি সফল হয়েছেন। বেশ ভালো লেগেছে। এছাড়া, কোন লেখকের প্রথম কোন বই পড়ে ভালো লাগলে, সে অনুভূতিও মনে রাখার মত, যেমন ঘটেছল ইমতিয়ার সামীমের লেখা পড়ার পর।
Profile Image for Alauddin Ajad.
40 reviews3 followers
September 25, 2025
পাকিস্তানকে ঘৃণা করবো এবং যারা পাকিস্তানের কথা শুনলে শিহরিত হন,পুলকের আতিশয্যে অর্গাজম পর্যন্ত হয়ে যায় তাদেরকেও আজীবন ঘৃণা করবো! " আজকেও ক্যান পুরনো কাসুন্দি ঘাটবো আমরা?দেশপ্রেমিকরা দেশ উদ্ধার করে ফেলবে...একাত্তরে ক্যান জামাতের সিদ্ধান্ত ঠিক ছিলো এখন এসে বুঝতেসি" মার্কা কথাবার্তা যারা কন এখনো...তাদের উদ্দেশ্যে একটাই বার্তা আমার-"আপনাদের চুদিনা!"
11 reviews
March 4, 2023
চমৎকার। সবার পরা উচিত। আমাদের সমাজ কতটা অমানবিক, এই বই পরলে বুঝা যাবে। শেফালির interview এর শেষ লাইনটা ভুলতে পারছি না।
ওয়াসি আহমদ এর লিখা আগে পড়া হয়নি। শিশিযাপন already কিনে ফেলেছি।
Displaying 1 - 30 of 31 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.