|| রিভিউ ||
বইঃ ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন (বেলা দুই ঘটিকা হইতে)
লেখকঃ নসিব পঞ্চম জিহাদী
প্রকাশকঃ বুক স্ট্রিট
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
ঘরানাঃ মিস্ট্রি থ্রিলার
প্রচ্ছদঃ আদনান আহমেদ রিজন ও নসিব পঞ্চম জিহাদী
পৃষ্ঠাঃ ১২৮
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৮০ টাকা
ফরম্যাটঃ হার্ডকভার
কাহিনি সংক্ষেপঃ পুরান ঢাকার জনসন রোডে পানির লাইন মেরামতের কাজ চলছে। লাইনের সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য ওয়াসা'র ইঞ্জিনিয়ার রকিব উদ্দিনকে নামতে হলো ম্যানহোলে। ভূগর্ভস্থ ঢাকার ভেতরে গিয়ে তিনি অদ্ভুত আর রহস্যময় একটা জিনিস খেয়াল করলেন। সেটা নিয়ে যখন তিনি তাঁর সুপারভাইজার ও কলিগদের সাথে আলোচনা করতে গেলেন, তাঁকে বলা হলো চুপ করে যেতে৷ কোন একটা অলিখিত নিয়মে এই ব্যাপারটা নিয়ে কখনোই কেউ কোন আলোচনা করে না। অগত্যা চুপ করে যেতে হলো রকিব উদ্দিনকে।
সিনেমা বানাচ্ছে তরুণ ফিল্মমেকার তাসমান ফারাবী। সিনেমার দৃশ্যের জন্য এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে সাথে নিয়ে সে যোগাড় করলো ডায়ালওয়ালা এক পুরোনো টেলিফোন সেট৷ লাল সেই টেলিফোন জন্ম দিলো আরেক রহস্যের। প্রতিরাতে ঠিক দুইটার সময় ফোনটা থেকে ভেসে আসে অপরিচিত ও ভৌতিক ফিসফাস শব্দ। মনে হয়, ফোনের অপরপার্শ্বে যে আছে সে মনের কথা বুঝতে পারে। অনুসন্ধিৎসু স্বভাবের ফারাবী লেগে পড়ে এই রহস্যের সমাধান করতে৷ আর এটা করতে গিয়েই রাতারাতি সে নিখোঁজ হয়ে যায়।
ফারাবী নিখোঁজ হওয়ার পর ওর বন্ধুদের হাতে এসে পড়ে দুটো সূত্র। এক, একটা অজানা ভাষায় লেখা কাগজ ও দুই, একটা চিরকুট যেটাতে টাইপরাইটারের পুরোনো বাংলা ফন্টে লেখা 'ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন (বেলা দুই ঘটিকা হইতে)'। এই দুই সূত্র সম্বল করেই তারা অবসরপ্তাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মনসুর সাহেবের শরণাপন্ন হয়। আর তিনি তাদেরকে সন্ধান দেন ভাষাবিদ ও আলোকচিত্রী লুৎফর রেহমানের। বেরিয়ে আসে প্রাচীন ভাষা রংগরংগ ও নিষ্ঠুর এক সিক্রেট সোসাইটি 'দ্য অর্গানাইজেশন'-এর নাম। প্রশ্ন ওঠে বহুদিন আগে নিজের ডান হাত নিজেই কেটে ফেলা কিছু মানুষের সাথে এসবের সম্পর্ক কি সেটা নিয়ে। ফারাবীর অন্তর্ধান রহস্য আরো ঘনীভূত হয়।
ঢাকার তেজগাঁও থেকে ঘটনা গিয়ে ঠেকলো ফরাশগঞ্জ রোডের নর্থব্রুক হলে গিয়ে। জে���খানায় মারা যাওয়া এক অপরাধীর নামও চলে এলো দৃশ্যপটে। সবকিছু দেখেশুনে সন্দেহ জাগলো, আমাদেরকে আসলে যা দেখানো হয় তা কতোটুকু সত্যি?
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ নসিব পঞ্চম জিহাদী'র প্রথম বই 'মাঝরাতে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন'-এর সিক্যুয়েল 'ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন'। প্রথমটার সাথে কম্পেয়ার করতে চাই না আমি এটাকে। কারণ, দুটোর প্লট টোটালি ডিফারেন্ট। কম্পেয়ার করার মানসিকতা ছিলো না জন্যেই হয়তো সি��ুয়েলটা আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। আসলে এক বসায় পড়ে শেষ করে ফেলার মতো বই 'ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন'। 'মাঝরাতে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন'-এ যেমন লেখক একটা ভয়ের আবহ সৃষ্টি করেছিলেন তেমন এই বইটাতে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক ধরণের রহস্যের আবহ। আর সৃষ্ট এই রহস্যের আবহটা মানিয়ে গেছে প্লটের সাথে।
নসিব পঞ্চম জিহাদী'র লেখায় হিউমারের কমতি কখনোই থাকে না। তাঁর পূর্ববর্তী দুটো বইয়ের মতো এটাও ছিলো হাস্যরসে পরিপূর্ণ। মাঝেমাঝেই হেসে উঠেছি। বিশেষ করে ওয়াসি ভাই চরিত্রটার সাথে কথোপকথনের জায়গাগুলো বেশ মজার ছিলো। রসকষহীন না হওয়ার কারণে 'ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন' পড়তে গিয়ে কোন রকম ক্লান্তি অনুভব হয়নি। উপন্যাসের শেষটা মোটামুটি ভালো লাগলেও আরো কিছুটা ভেরিয়েশন আনা যেতো বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। চিরকুটের ব্যাপারে একটা প্রশ্নের উত্তর পাইনি৷ সম্ভবত এই ব্যাপারটা নসিব পঞ্চম জিহাদী তাঁর এই সিরিজের পরবর্তী বইয়ে খোলাসা করবেন। আবারো যে একটা সিকুয়েল আসতে যাচ্ছে, তা মোটামুটি নিশ্চিত আমি। দেখা যাক।
এবার আসি ভুলভ্রান্তির ব্যাপারে। লেখকের গল্প বলার ধরণ যতোই ভালো হোক না কেন কিছু টাইপিং মিসটেক মাঝেমাঝেই বিরক্তির উদ্রেক করেছে বইটা পড়ার সময়। একটাতে তো বিরক্তি লেগেছে সবচেয়ে বেশি। ৩৩ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, 'একটা শব্দই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার ভেসে আসছে যেন। শব্দটার বাংলা করলে দাঁড়ায় - ঞাঘ য়ামান!' এই 'ঞাঘ য়ামান'এর কি বুঝবো, বলুন? এটা সম্ভবত কনভার্শন প্রবলেম। এই ভুলগুলোর দিকে খেয়াল রাখা উচিৎ বই প্রকাশের আগে৷ যাই হোক, একটা সাইন্টিফিক ইনফো ভুল দেয়া হয়েছে 'ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন'-এ। এখানে বলা হয়েছে একটা নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিকে কনভার্ট করে ২০ হার্টযের নিচে নিয়ে এলে মানুষ শুনতে পাবে। আসলে, মানুষের শ্রবণসীমা ২০ হার্টয থেকে ২০,০০০ হার্টয। ২০ হার্টযের নিচের ও ২০,০০০ হার্টযের ওপরের ফ্রিকোয়েন্সির কোন শব্দ মানুষের কান শুনতে পারে না। বইটার পরবর্তী এডিশনে এই ভুলটাও শুধরে নেয়া হবে আশা করি।
আদনান আহমেদ রিজন ও নসিব পঞ্চম জিহাদী'র যৌথভাবে করা প্রচ্ছদটা অসাধারণ লেগেছে। আগ্রহী পাঠকরা চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন 'ফুল লাগলে চেয়ে নিবেন'। তবে তার আগে নতুন পাঠকরা অবশ্যই 'মাঝরাতে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন' পড়ে নেবেন।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৩.৭৫/৫
গুডরিডস রেটিংঃ ৩.৯২/৫
#Review_of_2021_29
#বই_নিয়ে_গল্প_হোক
~ শুভাগত দীপ ~
(১৭ জুলাই, ২০২১, বিকাল ৩ টা ১ মিনিট; নাটোর)