দীনেন্দ্রকুমার যে পল্লীবাংলাকে দেখেছিলেন, তা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিষাক্ত নিশ্বাসে পুড়ে যাওয়া গ্রাম। যে গ্রামে অভাব, দারিদ্র্য আর বেঁচে থাকার অসংগতি পদে পদে। যে গ্রামে পুরোনো সমাজ ভেঙে গেছে অথচ নতুন সমাজ গড়ে ওঠেনি। তাঁর পর্যবেক্ষণের পরিসরে সমাজ-ইতিহাসের অনেকানেক উপাদান ও উপকরণ ছড়িয়ে আছে। তাছাড়া এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে কৃষি ও গ্রামভিত্তিক সমাজে বাসকারী একটি বৃহৎ জাতিগত সমাজগোষ্ঠীর যাপিত জীবনের ইতিহাস—দেশ-কাল-পরিস্থিতির ব্যাখ্যাত্তীর্ণ ভূমিপ্রজ জীবনকথা।
বই : সেকালের সমাজচিত্র লেখক: দীনেন্দ্র কুমার রায় প্রকাশক : সুপ্রকাশ
কলকাতার পুরাকাল সম্বন্ধে বেশ কিছু বই পড়েছি। কিন্তু পল্লী সমাজ সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত। পল্লীসমাজ সম্পর্কে আমার ধারণা মূলত শরৎচন্দ্র এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা পড়েই তৈরি হয়েছে| পল্লীসমাজের নিখুঁত বর্ণনা সমৃদ্ধ এরকম একটি নন ফিকশন প্রকাশের জন্য সুপ্রকাশ কে ধন্যবাদ । আমার একটা বদভ্যাস আছে, খুব কম বইয়ের ভূমিকা পড়ি । তবে এই লেখার মুখবন্ধ না পড়লে অনেক কিছু হারাতাম । এই বইয়ের ৮ টি প্রবন্ধের সামান্য পরিচয় দিলাম ।
১) প্রজাপতির নির্বন্ধ : পণ আদায়ের ছিল চাতুরীর কৌতুক মিশ্রিত নিখুঁত বর্ণনা ।
২) নব বৈশাখের এক দিন : এক প্রবীনের স্মৃতিচারণের মাধ্যমে সেকালের সমাজের বিভিন্ন খন্ডচিত্র ।
৩) পল্লীগ্রামের রথতলায় : রথের মেলার মজা । তালপাতার ছাতার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
৪) গ্রাম্য দলাদলি : আমি লুচি পাগল মানুষ , জেনে খুশি হলাম আমাদের পূর্বপুরুষেরাও লুচির জয়জয়কার করতেন ।
সেকালের সমাজচিত্র লেখক - দীনেন্দ্রকুমার রায় প্রকাশনী - সুপ্রকাশ সম্পাদনা - শতঞ্জীব রাহা মূল্য - ২০০ টাকা।।
বছরের ১৪ নম্বর বই একটি নন ফিকশন প্রবন্ধ সংকলন, নন ফিকশন সেই ভাবে পড়াই হয় না, এই বলে বলে এই বইটি বছরের দ্বিতীয় নন ফিকশন সেকালের সমাজচিত্র।। সেকাল বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে লেখাগুলির রচনাকাল যা কিনা আজ থেকে প্রায় ৮০ - ১০০ বছর আগের এবং লেখকের বাল্যকাল যা প্রায় ১৫০ বছর আগের।। সমাজচিত্র ব্যাপারটি সরল ভাষায় আজকের পাঠকের কাছে দেড়শ বছর আগে থেকে আজকের দিন পর্যন্ত ঠিক কিভাবে এবং কি পরিমানে বঙ্গ সমাজ, 'চরিত্র' এবং 'চিত্র' পরিবর্তিত হয়েছে তার এক সংক্ষিপ্ত বিবরণ।। সম্পাদকের লেখা থেকেই বলি যে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জীবনরসসিক্ত কথাখ্যানধর্মী সহজ সরল বিবরণ সমন্বিত এই বিশেষ ধরনের রচনাকে শ্রী সুকুমার সেন 'চিত্র ও চরিত্র' নাম দিয়েছিলেন।।দীনেন্দ্রকুমার রায় শুধু সাহিত্যিক এই বন্ধনীতে না রেখে,তাকে যদি কথাচিত্রকর বলি তাহলে বোধহয় যোগ্য মর্যাদা পাবে।। বইটির সম্পাদক শতঞ্জীব রাহা, লেখক দীনেন্দ্রকুমার রায়ের অসংখ্য রচনার মধ্যে থেকে আটটি প্রবন্ধ বেছে নিয়েছেন।। প্রতিটি রচনাই ছোট, মাত্র ১০-১৫ পৃষ্ঠার।। যেহেতু সমস্ত লেখাগুলি সে সময়ের সমাজচিত্র বিষয়ক তাই আলাদা করে এখানে প্রতিটি রচনার সংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রয়োজন নেই।। তাই এখানে শুধুমাত্র প্রতিটি রচনার নাম এবং খুব কম শব্দে রচনাটি কি সম্বন্ধে সেটা লিখে রাখলাম।।
🔷🔷 প্রজাপতির নির্বন্ধ - গ্রাম্য সমাজজীবনে বিবাহের বর্ণনা এবং হরিমোহন মজুমদারের হাস্যরস।।
🔷🔷 নব বৈশাখের এক দিন - লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ সঙ্গে মেছুড়ে মাস্টার'এর কান্ডকারখানা বেশ মজার।।
🔷🔷 পল্লী গ্রামের রথতলায় - গ্রাম্য রথের মেলা এবং তৎকালীন সমাজ সম্বন্ধে একটি অপরূপ লেখচিত্র।।
🔷🔷 গ্রাম্য দলাদলি - ব্রাহ্মণ সমাজের আভ্যন্তরীণ জাতিভেদ এবং সেই সম্পর্কিত দলাদলির দলিল।। সঙ্গে গ্রামের মানুষদের ভেতরে থাকা অদ্ভুত কিছু রসিক দৃষ্টিভঙ্গি।।
🔷🔷 শ্রী পঞ্চমীর পল্লী - কৃষ্ণচন্দ্রপুরের পল্লী জীবন সম্পর্কিত একটি স্মৃতিচারণামূলক রচনা।
🔷🔷 বলরামের দোল - বঙ্গ সমাজে সনাতন ধর্মের বাইরে একটি সহজিয়া ধর্ম হাড়ি সম্প্রদায়ের উত্থান নিয়ে রচনা।।
🔷🔷 সেকালের পল্লীর বাসন্তী মেলা - লেখকের বাল্যকালে দেখা একটি জাঁকজমকপূর্ণ বর্ণাঢ্য মেলার বিবরণ।।
🔷🔷 পিটুনি মাস্টার - লেখকের এক বিশেষ বাল্যবন্ধুর বেত্রাঘাত জর্জরিত জীবন সংকলন ও পরিশেষে শিক্ষকতার এমন এক অংশ যা মেদুরতায় আচ্ছন্ন করে।।
♦️♦️ পাঠ প্রতিক্রিয়া -
সমাজচিত্র কথাটা যতখানি সহজ, ততখানি বোধহয় ভাষায় প্রকাশ করা সহজ নয়।। যা দেখি,তাই কি লিখে দেওয়া যায়! না বোধহয়।। লেখক কিন্তু তাই করেছেন, এমন সহজ সরল ও সাবলীল বর্ণনা প্রত্যেকটি ঘটনার, প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানের, উৎসবের, পড়তে পড়তে মনে হবে আপনিও সেই বর্ণনার এক চরিত্র বিশেষ।। দীনেন্দ্রকুমার রায় এর বলিষ্ঠ কলম নিয়ে আমার বলার সাহস নেই, একটা নস্টালজিয়া ও অজানা ইতিহাস সুন্দর গদ্যের মোড়কে এসে দাঁড়িয়েছে পাঠকের কাছে।। এর মধ্যে যে শুধুই রসিকতার গদ্য আছে, তা কিন্তু নয়।। পড়তে পড়তে একাকীত্বও যেন গ্রাস করেছে, তাই হয়তো তিনি লিখেছেন - "আমি নিঃশব্দে একাকী গ্রামের দিকে অগ্রসর হইলাম।।আজও এইভাবে এই দীর্ঘ জীবনের পথে একাকী অগ্রসর হইয়াছি।। আমার চতুর্দিকে এক নূতন জগৎ প্রসারিত, তাহার সুখ-দুঃখ,হর্ষ-কল্লোলের সহিত আমার পরিচয় নাই।। আমার আত্মীয়,বন্ধু,সমবয়স্ক সঙ্গীরা প্রায় সকলেই একে একে চলিয়া গিয়াছে।। তাই মনে হইতেছে, আমি নিতান্ত অসহায়,একাকী; আজ এই জীবন-সন্ধ্যায় একাকী পথের ধারে নিষ্প্রভ নেত্রের ক্ষীণ দৃষ্টি চতুর্দিকে প্রসারিত করিয়া ভাবিতেছি,কবে-আর কতদিন পরে আমার এই দীর্ঘযাত্রার অবসান হইবে।।" পল্লী সমাজের নিখুঁত বর্ণনা সমৃদ্ধ এরকম একটি নন ফিকশন প্রবন্ধ সংকলন এর জন্যে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতে হয় প্রকাশক সুপ্রকাশ প্রকাশনীকে।। শেষে বলবো যারা যারা এখনো বাংলা পল্লী সমাজ এর সম্পর্কিত এই বইটি পড়েননি, হয়তো অনেক কিছুই মিস করছেন, তাই অবশ্যই পড়ুন।।