What do you think?


দ্বারকানাথ - পরাধীন দেশের রাজপুত্র
দীর্ঘ অমানিশার শেষে তখন পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রথম আলো ফুটে ওঠার পালা ৷ কলকাতায় আসছেন রামমোহন রায় ! তাঁর আগমন যেন সোনার কাঠি ছুঁইয়ে দিচ্ছে ঘোর নিদ্রামগ্ণ জাতির দেহে৷ প্রথম যে মানুষটি সেই ঘুম ভেঙে উঠে এলেন, এবং পরবর্তীতে যাঁর নাম আমরা মুছে ফেললাম, তিনিই দ্বারকানাথ ঠাকুর ৷ এই মানুষটিই নবজাগরণের সেই বিস্মৃত পশ্চাৎপট, যাঁর ছবিতে কখনো আলো পড়েনি ৷ সেই পট, যার উপরে ফুটে ওঠে রামমোহন রায়, ডিরোজিও, ডেভিড হেয়ারের উজ্জ্বল ছবি ৷ ভারতবর্ষের চিকিৎসাব্যবস্থা, চিত্রকলা,গ্রন্থাগার আন্দোলন, অভিনয়শিল্প, প্রথম রাজনৈতিক সভা, ব্যবসাবাণিজ্য...এমন অসীম অনন্ত ক্ষেত্রে তাঁর অন্তহীন দান আমরা অনায়াসে বিস্মৃত হই ৷ উত্তরপুরুষদের বানিয়ে-তোলা এক ছবিকেই আমরা দ্বারকানাথ ঠাকুর বলে জেনে এসেছি সার্ধশতবর্ষ ধরে ৷ একবারও সত্যকে চিনতে চাইনি ৷ এই বই সেই দ্বিধান্বিত, খণ্ডবিখণ্ড, উদার অথচ প্রশ্ণাতুর মানুষটির মুখে একঝলক আলো ফেলেছে ৷ নতুন আলোয় দেখা দিচ্ছে এক বিস্ময়কর মহাচরিত্র ৷ দ্বারকানাথ ঠাকুর ৷ পরাধীন দেশের রাজপুত্র!... এক আশ্চর্য উন্মোচন ৷
339 pages, Hardcover
First published January 1, 2020
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 4 of 4 reviews
November 15, 2024
এই বইটা শুধু বাংলা জীবনভিত্তিক উপন্যাসের ধারাতেই নয়, বরং গোটা বাংলা সাহিত্যেই একটি দিকচিহ্ন।
কেন?
প্রথমত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, ঠাকুর পরিবারের একাধিক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের সক্রিয় চেষ্টায় দ্বারকানাথের যে ভয়াবহ চরিত্রহনন ঘটেছিল, একা তাঁদের মহড়া নিয়েছেন লেখক। তার জন্য তাঁকে যে গবেষণা করতে হয়েছে, তা অতুলনীয়। তারই ফলে তিনি বহুল-প্রচলিত বইয়ের মাধ্যমে বাঙালির মনে প্রোথিত অলীক গল্পদেরও দুরমুশ করতে পেরেছেন। এ শুধু শ্রম বা মেধা নয়, সাহসেরও কাজ।
দ্বিতীয়ত, নীরস তথ্য আর ঘটনাক্রমকে সুললিত লেখনীর মাধ্যমে সজীব ও সরস করে তুলেছেন লেখক। ইতিহাসের পাতায় পাওয়া নামগুলো রক্তমাংসের মানুষ হয়ে উঠেছে। তাদের অনুভূতিরা স্পর্শ করেছে আমাদের। বলুন তো, এ কি সহজ কাজ?
তৃতীয়ত, বইটিকে শুদ্ধ আকারে ও রুচিসম্মত উপায়ে পরিবেশন করে প্রাপ্য সম্মান জানানো হয়েছে। বিশ্বাস করুন, বহু ভালো কাজ প্রকাশকের অবহেলায় নষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে তেমনটা হতে দেওয়া হয়নি। প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে বর্ণশুদ্ধি— সর্বত্র দেখা গেছে যত্নের ছাপ। এ জিনিস সত্যিই প্রশংসনীয়।
সব মিলিয়ে আবারও বলব, এ এক অসাধারণ বই। এর মাধ্যমে দ্বারকানাথের রাহুমুক্তি কতদূর ঘটল, তার বিচার ভবিষ্যৎই করবে। তবে মন্দকথার কুয়াশায় ঢাকা মানুষটির তেজোদৃপ্ত, কাঁটার মুকুট পরে থাকা চেহারা আমাদের সামনে যে স্পষ্ট হয়ে দেখা দিল— এ-বিষয়ে সংশয় নেই।
এমন বই পড়া দরকার। প্লিজ পড়ুন।
কেন?
প্রথমত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, ঠাকুর পরিবারের একাধিক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের সক্রিয় চেষ্টায় দ্বারকানাথের যে ভয়াবহ চরিত্রহনন ঘটেছিল, একা তাঁদের মহড়া নিয়েছেন লেখক। তার জন্য তাঁকে যে গবেষণা করতে হয়েছে, তা অতুলনীয়। তারই ফলে তিনি বহুল-প্রচলিত বইয়ের মাধ্যমে বাঙালির মনে প্রোথিত অলীক গল্পদেরও দুরমুশ করতে পেরেছেন। এ শুধু শ্রম বা মেধা নয়, সাহসেরও কাজ।
দ্বিতীয়ত, নীরস তথ্য আর ঘটনাক্রমকে সুললিত লেখনীর মাধ্যমে সজীব ও সরস করে তুলেছেন লেখক। ইতিহাসের পাতায় পাওয়া নামগুলো রক্তমাংসের মানুষ হয়ে উঠেছে। তাদের অনুভূতিরা স্পর্শ করেছে আমাদের। বলুন তো, এ কি সহজ কাজ?
তৃতীয়ত, বইটিকে শুদ্ধ আকারে ও রুচিসম্মত উপায়ে পরিবেশন করে প্রাপ্য সম্মান জানানো হয়েছে। বিশ্বাস করুন, বহু ভালো কাজ প্রকাশকের অবহেলায় নষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে তেমনটা হতে দেওয়া হয়নি। প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে বর্ণশুদ্ধি— সর্বত্র দেখা গেছে যত্নের ছাপ। এ জিনিস সত্যিই প্রশংসনীয়।
সব মিলিয়ে আবারও বলব, এ এক অসাধারণ বই। এর মাধ্যমে দ্বারকানাথের রাহুমুক্তি কতদূর ঘটল, তার বিচার ভবিষ্যৎই করবে। তবে মন্দকথার কুয়াশায় ঢাকা মানুষটির তেজোদৃপ্ত, কাঁটার মুকুট পরে থাকা চেহারা আমাদের সামনে যে স্পষ্ট হয়ে দেখা দিল— এ-বিষয়ে সংশয় নেই।
এমন বই পড়া দরকার। প্লিজ পড়ুন।
December 2, 2021
কিছু বই আছে এমন যে খুব প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করেও পরে হতাশ করে। আবার কিছু কিছু বই এর ব্যাপারে বিন্দুমাত্র প্রত্যাশা না থাকলেও পড়ার পর তৃপ্তির রেশ ছড়িয়ে দেয়। এই বইটি দ্বিতীয় দলের। রাজা ভট্টাচার্যের নামের সাথেই আগে পরিচিত ছিলাম না, না এই বই নিয়ে আগে কোন আলোচনা পড়া ছিল। তবু বইয়ের নামটি এবং যাকে নিয়ে লেখা সেই মানুষটি আমার আগ্রহ সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট ছিল। প্রথম আলো, সেই সময় বা কেরী সাহেবের মুন্সী এই ধরণের ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়ার সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল আগে। এই বইটিও ইতিহাস ঠিক নয়, ঐতিহাসিক উপন্যাস। যশোর থেকে আসা কুশারী পদবীধারী পিরালি ব্রাহ্মণদের একটি শাখা বা পরিবার কলকতা শহরের পত্তনের আগে থেকেই সেখানে থিতু হন। জাতে ব্রাহ্মণ বলে তাদেরকে ঠাকুর বলে ডাকতো অনেকেই, সেটিই তাদের পদবী হয়ে দাঁড়ায় কালক্রমে। সেই ঠাকুরবাড়ির নীলমণি ঠাকুর ছোট ভাই দর্পনারায়ণের সাথে মতান্তর হলে চলে গিয়েছিলেন জোড়াসাঁকো অঞ্চলে। তার ছেলে রামলোচন পৈত্রিক সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ পেলেও সেই সম্পত্তি বাড়িয়েছিলেন। নিজের চেষ্টায় হয়ে উঠেছিলেন একজন ক্ষুদ্র জমিদার। তখন পর্যন্ত দর্পনারায়ণের পাথুরিয়াঘাটের ঠাকুর পরিবারের অংশটিই ছিল ধনাঢ্য এবং শহর কলকাতার পরিচিত ও প্রভাবশালী পরিবার।
রামলোচন আর ছোট ভাই রামমণি বিয়ে করেছিলেন আপন দুই বোনকে। বড় বোন অলকাসুন্দরী ছিলেন রামলোচনের স্ত্রী। জন্মের পরপরই তার কন্যা সন্তানটি মারা গেলে তার অসুস্থ ছোট বোন নিজের সদ্যজাত পুত্রটিকে বড় বোনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এবং এর পরপরই মারা যান। সেই সন্তানটিই দ্বারকানাথ ঠাকুর। মাতৃহীন হয়েও তাকে মা হারা হতে হয় নি কিন্তু কিশোর বয়সেই পিতৃহীন হতে হয়েছিল। রামলোচন যে সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন তাতে দ্বারকানাথ একটি বিলাসী ক্ষুদ্র জমিদার হিসেবে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন বা সব সম্পত্তি উড়িয়েও দিতে পারতেন। এর কোনটাই তিনি করেন নি। শেরবোর্নের পাঠশালায় ইংরেজি তো শিখেছিলেন তারপর নিজের আগ্রহে তখনকার কলকাতার প্রসিদ্ধ ইংরেজ আইনজীবি ফার্গুসনের কাছ থেকে পাঠ নিয়েছিলেন আইন শিক্ষার। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই হয়ে উঠেছিলেন কলকাতার সেরা আইন ব্যবসায়ী। পৈত্রিক জমিদারী তো ধরে রেখেছিলেনই সাথে তা বিস্তৃত করেছিলেন আরও বহুগুণ। সেখানেই শেষ না, শুরু বলা যায়। বাণিজ্যে তিনি ছিলেন প্রচন্ড রকম সফল, বানিয়া নয় আক্ষরিক অর্থে হয়েছিলেন কোম্পানির আমলের সবচেয়ে বড় বাঙালি শিল্পপতি। রাণীগঞ্জের কয়লাখনিই হোক কিংবা চীনে আফিমের ব্যবসা কিংবা নিজের মালিকানাধীন ব্যাংক সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল তার ব্যবসা। রেশম, চিনি, নীল, বীমা কিংবা জাহাজ শিল্প কোথায় ছিলেন না তিনি? অবশ্য একা নন, সাথে সহযোগী সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন বন্ধুপ্রতিম উইলিয়াম কার। দুজনের নামে গঠিত হয়েছিল কার ঠাকুর কোম্পানী। আবার একই সাথে করেছেন কোম্পানীর চাকরিও, সল্ট এন্ড ওপিয়াম বোর্ডের প্রথমে সেরেস্তাদার পরে দেওয়ান। তবে এগুলো তার কেবল আর্থিক সাফল্যের কথা। পাথুরিয়াঘাটার সম্পর্কে কাকা গোপীমোহন ঠাকুরের মাধ্যমে তার পরিচয় এবং সখ্যতা হয়েছিল সমকালীন শ্রেষ্ঠ বাঙালি রামমোহন রায়ের সাথে। সেই অসমবয়েসী বন্ধুত্ব তার ভেতরের কুসংস্কার ভেঙ্গে দিয়ে তাকে করেছিল এক নতুন মানুষ। রামমোহনের সহযোদ্ধা হয়ে দ্বারকানাথও সতীদাহ প্রথা রোধ আইন তৈরির পিছনের অন্যতম নায়ক। এছাড়া হিন্দু কলেজ, মেডিকেল স্কুল, ব্রাহ্ম সমাজ সব ক্ষেত্রেই রামমোহনের সাথে ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডে রামমোহনের মৃত্যুর পর নিজেই টিকিয়ে রেখেছিলেন এসব প্রতিষ্ঠান। নিজেও সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছিলেন পাথুরিয়াঘাটের ঠাকুর পরিবারের কনিষ্ঠ ভ্রাতা প্রসন্নকুমার ঠাকুরকে। তার উদ্যোগেই সৃষ্টি হয়েছিল জমিদারদের সংগঠন ল্যান্ডহোল্ডার্স এসোশিয়েশন। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয় ডাক্তার তৈরিতে বিপুল অর্থসাহায্য করেছিলেন তিনি তবু তার পিতার মতো মা অলকাসুন্দরীও প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিলেন যদিও তখন দ্বারকানাথ বিপুল বৈভবের মালিক। দূভাগ্যক্রমে তখন তিনি ছিলেন ভারতের পশ্চিম অঞ্চল ভ্রমণে ব্যপ্ত। নিজে গোড়ামীর উর্ধ্বে
যেতে পেরেছিলেন বলেই তার সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয় স্ত্রী দিগম্বরীর যে দূরত্ব দিগম্বরীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘোচে নি। বেলগাছিয়া ভিলায় তিনি প্রভাবশালীদের জন্য আয়োজন করতেন আড়ম্বরপূর্ণ ভোজের, স্বয়ং ভারতের বড়লাট পর্যন্ত তাতে এসেছিলেন একবার আর সাধারণ ইংরেজ দম্পতিদের জন্য সেটা তো ছিল মধুচন্দ্রিমা যাপনের আদর্শ জায়গা। সমকালীন গোড়া সমাজ তাকে নিয়ে কুৎসা রটিয়েছে বারবার তিনি কর্ণপাতও করেন নি।
রামমোহনের পর তিনিও কালাপানি পার হয়ে ইউরোপে যাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছেন একবার নয় দুই দুই বার। স্বয়ং রাণী ভিক্টোরিয়ার সাথে তার ছিল প্রত্যক্ষ যোগাযোগ, অনেকবার বৃটিশ রাজপরিবারের সান্নিধ্যে যাবার সুযোগ হয়েছিল তার। ফ্রান্সের সম্রাট লুই ফিলিপসহ প্যারিসের বিদগ্ধ মহলেও তিনি হয়েছিলেন সাদরে সমাদৃত। ইংল্যান্ডে তার নামের সামনে লোকে যুক্ত করে নিয়েছিলো প্রিন্স খেতাবটি। কোন রাজার সন্তান ছিলেন না তিনি, না কোন প্রাতিষ্ঠানিক খেতাব পেয়েছিলেন। তবু এই একাধারে জমিদার, ব্যবসায়ী, সমাজ সংস্কারক এবং সমকালীন বাঙালি সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষটি ছিলেন এক অঘোষিত রাজপুত্র। বিপুল অমিতব্যয় তিনি করেছেন জীবনের শেষপ্রান্তে ইউরোপে গিয়ে, প্যারিসে এক ভোজসভায় আগত নারী অতিথিদের প্রত্যেককে দান করেছিলেন এক একটি বহুমূল্যবান কাশ্মিরী শাল, শেষ পর্যায়ে ব্যবসায়েও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন। তার জীবদ্দশাতেই বেশকিছু সম্পত্তি বিক্রিও করে দিতে হয়েছিল। তার জেষ্ঠ পুত্র দেবেন্দ্রনাথ পরবর্তীতে ব্রাহ্ম সমাজের হাল ধরে বিখ্যাত হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পৈত্রিক ব্যবসা তার সন্তানেরা ধরে রাখতে পারেন নি। তবু দূরদর্শী ও বিচক্ষণ দ্বারকানাথই তার মৃত্যুর পর তার বংশধরদের পতনের হাত থেকে রক্ষা করে গিয়েছিলেন বেশ কিছু জমিদারি ট্রাস্টি করে দিয়ে। নতুবা তার মৃত্যুর পরই হয়তো জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির পতন হতে পারতো। দেশপ্রেমিক এবং স্বাধীনচেতা এই মানুষটির পরিকল্পনা ছিল ভারতে রেলপথ বসানোর নিজের উদ্যোগে। তা তিনি সফল করে যেতে পারেন নি অকালমৃত্যুর কারণে। এমন বহু পরিকল্পনা তার মৃত্যুতে আর সফল হয়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়বার ইউরোপ ভ্রমণে গিয়ে অল্প কিছুদিন রোগভোগের পর মৃত্যু ঘটে আমৃত্য যোদ্ধা, নিঃসঙ্গ এক মহান পুরুষের। সাফল্যের চুড়ায় উঠেও, বহু মানুষের সাথে থেকেও যিনি ছিলেন একাকী, পরাধীন দেশের রাজ্যহীন রাজপুত্র দ্বারকানাথ ঠাকুরের।
রামলোচন আর ছোট ভাই রামমণি বিয়ে করেছিলেন আপন দুই বোনকে। বড় বোন অলকাসুন্দরী ছিলেন রামলোচনের স্ত্রী। জন্মের পরপরই তার কন্যা সন্তানটি মারা গেলে তার অসুস্থ ছোট বোন নিজের সদ্যজাত পুত্রটিকে বড় বোনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এবং এর পরপরই মারা যান। সেই সন্তানটিই দ্বারকানাথ ঠাকুর। মাতৃহীন হয়েও তাকে মা হারা হতে হয় নি কিন্তু কিশোর বয়সেই পিতৃহীন হতে হয়েছিল। রামলোচন যে সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন তাতে দ্বারকানাথ একটি বিলাসী ক্ষুদ্র জমিদার হিসেবে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন বা সব সম্পত্তি উড়িয়েও দিতে পারতেন। এর কোনটাই তিনি করেন নি। শেরবোর্নের পাঠশালায় ইংরেজি তো শিখেছিলেন তারপর নিজের আগ্রহে তখনকার কলকাতার প্রসিদ্ধ ইংরেজ আইনজীবি ফার্গুসনের কাছ থেকে পাঠ নিয়েছিলেন আইন শিক্ষার। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই হয়ে উঠেছিলেন কলকাতার সেরা আইন ব্যবসায়ী। পৈত্রিক জমিদারী তো ধরে রেখেছিলেনই সাথে তা বিস্তৃত করেছিলেন আরও বহুগুণ। সেখানেই শেষ না, শুরু বলা যায়। বাণিজ্যে তিনি ছিলেন প্রচন্ড রকম সফল, বানিয়া নয় আক্ষরিক অর্থে হয়েছিলেন কোম্পানির আমলের সবচেয়ে বড় বাঙালি শিল্পপতি। রাণীগঞ্জের কয়লাখনিই হোক কিংবা চীনে আফিমের ব্যবসা কিংবা নিজের মালিকানাধীন ব্যাংক সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল তার ব্যবসা। রেশম, চিনি, নীল, বীমা কিংবা জাহাজ শিল্প কোথায় ছিলেন না তিনি? অবশ্য একা নন, সাথে সহযোগী সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন বন্ধুপ্রতিম উইলিয়াম কার। দুজনের নামে গঠিত হয়েছিল কার ঠাকুর কোম্পানী। আবার একই সাথে করেছেন কোম্পানীর চাকরিও, সল্ট এন্ড ওপিয়াম বোর্ডের প্রথমে সেরেস্তাদার পরে দেওয়ান। তবে এগুলো তার কেবল আর্থিক সাফল্যের কথা। পাথুরিয়াঘাটার সম্পর্কে কাকা গোপীমোহন ঠাকুরের মাধ্যমে তার পরিচয় এবং সখ্যতা হয়েছিল সমকালীন শ্রেষ্ঠ বাঙালি রামমোহন রায়ের সাথে। সেই অসমবয়েসী বন্ধুত্ব তার ভেতরের কুসংস্কার ভেঙ্গে দিয়ে তাকে করেছিল এক নতুন মানুষ। রামমোহনের সহযোদ্ধা হয়ে দ্বারকানাথও সতীদাহ প্রথা রোধ আইন তৈরির পিছনের অন্যতম নায়ক। এছাড়া হিন্দু কলেজ, মেডিকেল স্কুল, ব্রাহ্ম সমাজ সব ক্ষেত্রেই রামমোহনের সাথে ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডে রামমোহনের মৃত্যুর পর নিজেই টিকিয়ে রেখেছিলেন এসব প্রতিষ্ঠান। নিজেও সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছিলেন পাথুরিয়াঘাটের ঠাকুর পরিবারের কনিষ্ঠ ভ্রাতা প্রসন্নকুমার ঠাকুরকে। তার উদ্যোগেই সৃষ্টি হয়েছিল জমিদারদের সংগঠন ল্যান্ডহোল্ডার্স এসোশিয়েশন। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয় ডাক্তার তৈরিতে বিপুল অর্থসাহায্য করেছিলেন তিনি তবু তার পিতার মতো মা অলকাসুন্দরীও প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিলেন যদিও তখন দ্বারকানাথ বিপুল বৈভবের মালিক। দূভাগ্যক্রমে তখন তিনি ছিলেন ভারতের পশ্চিম অঞ্চল ভ্রমণে ব্যপ্ত। নিজে গোড়ামীর উর্ধ্বে
যেতে পেরেছিলেন বলেই তার সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয় স্ত্রী দিগম্বরীর যে দূরত্ব দিগম্বরীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘোচে নি। বেলগাছিয়া ভিলায় তিনি প্রভাবশালীদের জন্য আয়োজন করতেন আড়ম্বরপূর্ণ ভোজের, স্বয়ং ভারতের বড়লাট পর্যন্ত তাতে এসেছিলেন একবার আর সাধারণ ইংরেজ দম্পতিদের জন্য সেটা তো ছিল মধুচন্দ্রিমা যাপনের আদর্শ জায়গা। সমকালীন গোড়া সমাজ তাকে নিয়ে কুৎসা রটিয়েছে বারবার তিনি কর্ণপাতও করেন নি।
রামমোহনের পর তিনিও কালাপানি পার হয়ে ইউরোপে যাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছেন একবার নয় দুই দুই বার। স্বয়ং রাণী ভিক্টোরিয়ার সাথে তার ছিল প্রত্যক্ষ যোগাযোগ, অনেকবার বৃটিশ রাজপরিবারের সান্নিধ্যে যাবার সুযোগ হয়েছিল তার। ফ্রান্সের সম্রাট লুই ফিলিপসহ প্যারিসের বিদগ্ধ মহলেও তিনি হয়েছিলেন সাদরে সমাদৃত। ইংল্যান্ডে তার নামের সামনে লোকে যুক্ত করে নিয়েছিলো প্রিন্স খেতাবটি। কোন রাজার সন্তান ছিলেন না তিনি, না কোন প্রাতিষ্ঠানিক খেতাব পেয়েছিলেন। তবু এই একাধারে জমিদার, ব্যবসায়ী, সমাজ সংস্কারক এবং সমকালীন বাঙালি সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষটি ছিলেন এক অঘোষিত রাজপুত্র। বিপুল অমিতব্যয় তিনি করেছেন জীবনের শেষপ্রান্তে ইউরোপে গিয়ে, প্যারিসে এক ভোজসভায় আগত নারী অতিথিদের প্রত্যেককে দান করেছিলেন এক একটি বহুমূল্যবান কাশ্মিরী শাল, শেষ পর্যায়ে ব্যবসায়েও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন। তার জীবদ্দশাতেই বেশকিছু সম্পত্তি বিক্রিও করে দিতে হয়েছিল। তার জেষ্ঠ পুত্র দেবেন্দ্রনাথ পরবর্তীতে ব্রাহ্ম সমাজের হাল ধরে বিখ্যাত হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পৈত্রিক ব্যবসা তার সন্তানেরা ধরে রাখতে পারেন নি। তবু দূরদর্শী ও বিচক্ষণ দ্বারকানাথই তার মৃত্যুর পর তার বংশধরদের পতনের হাত থেকে রক্ষা করে গিয়েছিলেন বেশ কিছু জমিদারি ট্রাস্টি করে দিয়ে। নতুবা তার মৃত্যুর পরই হয়তো জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির পতন হতে পারতো। দেশপ্রেমিক এবং স্বাধীনচেতা এই মানুষটির পরিকল্পনা ছিল ভারতে রেলপথ বসানোর নিজের উদ্যোগে। তা তিনি সফল করে যেতে পারেন নি অকালমৃত্যুর কারণে। এমন বহু পরিকল্পনা তার মৃত্যুতে আর সফল হয়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়বার ইউরোপ ভ্রমণে গিয়ে অল্প কিছুদিন রোগভোগের পর মৃত্যু ঘটে আমৃত্য যোদ্ধা, নিঃসঙ্গ এক মহান পুরুষের। সাফল্যের চুড়ায় উঠেও, বহু মানুষের সাথে থেকেও যিনি ছিলেন একাকী, পরাধীন দেশের রাজ্যহীন রাজপুত্র দ্বারকানাথ ঠাকুরের।
February 25, 2024
এই বই দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনী অবলম্বনে লেখা।এতে এনার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত লেখাতে ফুটে উঠেছে সেই সময়ের অনেক আজানা কথা।এক সাধারন জমিদার পুত্র থেকে অসাধরণ উদ্যোগপতির কাহিনি।সেই সময়ের বাবুদের মত না হয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন বাঙ্গালিরাও ব্যাবসা করতে পারে এবং ইংরেজদের উপর আধিপত্য করে ব্যাবসা বিস্তার করতে পারে।বাবার মৃত্যু তাকে ব্যথিত করেছিল এবং তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন কলকাতার চিকিৎসা ব্যাবস্থার উন্নতি করবেন।তার জন্যই সম্ভব হয়েছিলা অস্ত্রোপাচার শিক্ষা এবং প্রথম মরা কাটার কৃতিত্ত অর্জন করেন মধুসুদন গুপ্ত।আর দ্বারকানাথকে বিচলিত করাছিল সতীদাহ প্রথা।তার এবং রাম মোহন রায়ের সাহায্যে বন্ধ হয় এই নিষ্ঠুর প্রথা।আর সহ্য করতে করতে হয়েছিলো মায়ের অন্তর্জিলি যাত্রা যা তাকে খুব কষ্ট দিয়েছিলো এবং সেই সাথে প্রচলিত ব্রাহ্মণ বাদের উপর প্রচন্ড ঘৃনার জন্ম দিয়েছিলো।এর পর পর তার স্ত্রী আর পুত্র বিয়োগ হয়।তবু কোন কিছু তে না থেমে উনি উদ্যোগ চালিয়ে গেছেন।এই সুবিশাল উপন্যাসে আরো অনেক কিছু আজানা তথ্য আছে।তবে তথ্যের চাপে একঘেয়ে হয়ে যায় নি।অনেকদিন পরে একটা উপন্যাস পরে খুব ভালো লাগলো।
একটা জিনিস খারাপ লাগলো এখানে বাবার মা কে দিদিমা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।এটা অবশ্যই ঠাকুমা হবে।
আমার রেটিং ৫/৫
একটা জিনিস খারাপ লাগলো এখানে বাবার মা কে দিদিমা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।এটা অবশ্যই ঠাকুমা হবে।
আমার রেটিং ৫/৫
April 26, 2021
রবিঠাকুরের ভারতবর্ষ তথা বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জনের আগে ঠাকুর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে খুব আড়ম্বরভাবে কেউই মাথা ঘামায়নি। অথচ তাঁর বাপ-দাদারাও কিন্তু অসামান্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজীবনীতে মাত্র ২০ বছরের বিবরণ দিয়েছেন। বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারাকানাথের জীবনী লিখতে গিয়েও প্রায়ই অসম্পূর্ণভাবে থমকে দাঁড়াতে দেখা যায় ক্ষিতিন্দ্রনাথ ঠাকুর অথবা কৃষ্ণ কৃপালানীকে। উপরোক্ত বইগুলো তথ্যসম্ভারে যথেষ্ট সমৃদ্ধ এবং ভরসার যোগ্য, তবে একজন জমিদার থেকে একজন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী হয়ে উঠার পথে দ্বারকানাথ যেভাবে নিজের মানসিক ও ব্যবহারিক ক্রমবিকাশের সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, তা রাজা ভট্টাচার্যের এই বইতে অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় ফুটে উঠেছে। তিন খণ্ডে বিস্তৃত এই অখণ্ড বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছেন তিন-ধারার দ্বারকানাথ।
রাজা ভট্টাচার্য তাঁর এই বইতে দ্বারকানাথ ছাড়া আরোও দুজন মানুষকে নিয়ে সুদীর্ঘ ও সুবিস্তৃত আলোচনা করেছেন; এক ― রাজা রামমোহন রায়, দুই ― দিগম্বরী দেবী। রামমোহন রায় ছিলেন দ্বারকানাথের জীবিত ঈশ্বররূপী সখা। অন্যদিকে দ্বারকানাথের স্ত্রী দিগম্বরী স্বামীর বেশীর ভাগ কাজেরই বিরোধিতা করলেও তিনি ছিলেন দ্বারকানাথের অবচেতন মনের শক্তি-সঞ্চালিকা। নবযুগের চিন্তার ছোঁয়ায় এবং বাবুয়ানির আকর্ষণে দ্বারকানাথের হিন্দুয়ানির প্রতি আস্থা ক্রমশঃ ঢলতে থাকায় তিনি বাড়ির নিত্যপূজা থেকে বঞ্চিত হন। আর ঠিক তখনই দিগম্বরী দেবীকে নিতে হয়েছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন পদক্ষেপ। ব্রাহ্মণদের পরামর্শে তিনি ঠিক করলেন যে তিনি স্বামীর যত্নআত্তি করবেন, তারপরে স্নান করে শুদ্ধ হবেন কিন্তু রাতে স্বামীসংসর্গ করবেন না! তাঁর জন্য নির্দিষ্ট হল বৈঠকখানার একটি শয্যা ও আলাদা রান্নার ব্যবস্থা। নিজের সাত্ত্বিক জীবনের সাথে ভূমিকা মেলাতে পারেননি বলেই স্বামীসহবাসের সুখ থেকে নিজেকে আজীবনের জন্য দূরে রেখেছিলেন। তারপর? তারপর কি হল প্রিন্স দ্বারকানাথের? চিরসখা রামমোহনের মৃত্যুতে ও সহধর্মিণীর কাছ থেকে প্রেমচ্যুত হয়ে কোথায় আশ্রয় নিয়েছিলেন দ্বারকানাথ? সেই সব প্রশ্নের উত্তর সুমার্জিতভাবে সাক্ষী হয়ে আছে রাজা ভট্টাচার্যের 'দ্বারকানাথ'-এ। দ্বারকানাথের জীবনকাহিনী ছাড়াও তৎকালীন ঠাকুর পরিবারের অন্দরমহলে আরও কাছ থেকে ঘুরে দেখার এবং সেই সময়ের ভারতবর্ষকে আরেকটু বেশি করে চেনার জন্য এই বইটি পড়া অবশ্যই কর্তব্য।
রাজা ভট্টাচার্য তাঁর এই বইতে দ্বারকানাথ ছাড়া আরোও দুজন মানুষকে নিয়ে সুদীর্ঘ ও সুবিস্তৃত আলোচনা করেছেন; এক ― রাজা রামমোহন রায়, দুই ― দিগম্বরী দেবী। রামমোহন রায় ছিলেন দ্বারকানাথের জীবিত ঈশ্বররূপী সখা। অন্যদিকে দ্বারকানাথের স্ত্রী দিগম্বরী স্বামীর বেশীর ভাগ কাজেরই বিরোধিতা করলেও তিনি ছিলেন দ্বারকানাথের অবচেতন মনের শক্তি-সঞ্চালিকা। নবযুগের চিন্তার ছোঁয়ায় এবং বাবুয়ানির আকর্ষণে দ্বারকানাথের হিন্দুয়ানির প্রতি আস্থা ক্রমশঃ ঢলতে থাকায় তিনি বাড়ির নিত্যপূজা থেকে বঞ্চিত হন। আর ঠিক তখনই দিগম্বরী দেবীকে নিতে হয়েছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন পদক্ষেপ। ব্রাহ্মণদের পরামর্শে তিনি ঠিক করলেন যে তিনি স্বামীর যত্নআত্তি করবেন, তারপরে স্নান করে শুদ্ধ হবেন কিন্তু রাতে স্বামীসংসর্গ করবেন না! তাঁর জন্য নির্দিষ্ট হল বৈঠকখানার একটি শয্যা ও আলাদা রান্নার ব্যবস্থা। নিজের সাত্ত্বিক জীবনের সাথে ভূমিকা মেলাতে পারেননি বলেই স্বামীসহবাসের সুখ থেকে নিজেকে আজীবনের জন্য দূরে রেখেছিলেন। তারপর? তারপর কি হল প্রিন্স দ্বারকানাথের? চিরসখা রামমোহনের মৃত্যুতে ও সহধর্মিণীর কাছ থেকে প্রেমচ্যুত হয়ে কোথায় আশ্রয় নিয়েছিলেন দ্বারকানাথ? সেই সব প্রশ্নের উত্তর সুমার্জিতভাবে সাক্ষী হয়ে আছে রাজা ভট্টাচার্যের 'দ্বারকানাথ'-এ। দ্বারকানাথের জীবনকাহিনী ছাড়াও তৎকালীন ঠাকুর পরিবারের অন্দরমহলে আরও কাছ থেকে ঘুরে দেখার এবং সেই সময়ের ভারতবর্ষকে আরেকটু বেশি করে চেনার জন্য এই বইটি পড়া অবশ্যই কর্তব্য।
Displaying 1 - 4 of 4 reviews




