খ্রিস্টজন্মের তিনশো সত্তর বছর আগে মগধের সিংহাসনে অভিষিক্ত হয়েছিলেন বিন্দুসার-পুত্র অশোক। ধর্মরাজ্য স্থাপনের সংকল্প নিয়ে মৌর্যসম্রাট প্রিয়দর্শনের সম্রাট অশোক প্রিয়দর্শী হয়ে ওঠার সে অনুপম গাথা ভাস্বর করেছে ইতিহাসের পাতা। কিন্তু সে পৃথক প্রসঙ্গ। অশোক বিন্দুসারের কোনো অখ্যাত রানির পুত্র। মাতৃকুলে ছিল না রাজরক্তের কৌলীন্য। কোনোমতেই তিনি হতে পারেন না পিতার রাজ্যের নৈসর্গিক দাবিদার। সম্রাট বিন্দুসার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী চয়ন করেও যাননি। সেক্ষেত্রে সর্বার্থেই তাঁর অগ্রমহিষীর পুত্র সুসীমের সিংহাসনে বসবার কথা। অথচ চার বছর পরে অভিষেক হয়েছে অশোকের। কিন্তু কীভাবে জ্যেষ্ঠভ্রাতা সুসীমকে অতিক্রম করে কনিষ্ঠকুমার সিংহাসনে আসীন হলেন, তা আজ বিস্মৃতির অন্ধকারে। ইতিহাস ঐ চতুর্বর্ষব্যাপী অশান্ত ঘটনাপঞ্জীর কোনো বিশ্বস্ত বয়ান সঞ্চয় করে রাখেনি। হিরণ্ময় নৈঃশব্দে মূক হয়ে আছে মহাকালখণ্ডটি। দুইপ্রান্তের আলোকিত সূত্রগুলির ঐতিহাসিক গ্রন্থিটি অদৃশ্য এক অপার্থিব অন্ধকারে। ঐতিহাসিকদের একটা সহজবোধ্য অনুমান হল ভ্রাতৃবিরোধ। সিংহাসন দখলের লড়াই চলেছিল চার বছর। ভাই-এ ভাই-এ হানাহানি। বৌদ্ধ গ্রন্থে আছে কুলকলঙ্কের কিছু রক্তাক্ত ইঙ্গিত। পুরাণ-গ্রন্থাদিতেও সম্রাট আত্মীয় হননকারী রূপে উক্ত। সেখানে বলা আছে, বহু ভ্রাতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল তাঁর হাত। রাজ্যলাভের নিমিত্ত অশোক মেতে উঠেছিলেন অনধিকার ক্ষমতার প্রয়োগে। হিংসার আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। বয়েছিল অগণিত শোণিত-ধারা। কিন্তু শিলাকীর্ণ অক্ষরগুলি যে আজও রয়ে গেছে ! তারা মিথ্যে বলতে পারে না। দুই সহস্রাব্দীরও বেশি সময়ের শীত-গ্রীষ্ম ঝঞ্ঝাবৃষ্টি পেরিয়ে সেগুলি পৌঁছে দিয়েছে সুদূর অতীতের কিছু অকপট বার্তা। জড় পাথরের মাঝে উন্মোচিত হয় সুদূর অতীতের আলোকিত ইতিহাস। কোনো এক প্রিয়দর্শী রাজার হৃদয়মোক্ষণ করা আত্মোপলব্ধ জীবনদর্শন! এক দিগ্বিজয়ী সম্রাট-কথিত অনাহত শান্তির বাণী। বহু ভ্রাতৃরক্তে হাত রঞ্জিত করে সিংহাসনে আরোহণ এবং কলিঙ্গ যুদ্ধের গণহত্যার শোকে অস্ত্র ত্যাগ।-- প্রচলিত ইতিহাস-ভাষ্যের এই দুই বৈপরীত্য মিলবে কীভাবে? রহস্যাবৃত ঐ চতুর্বর্ষতেই উত্তর রয়েছে সব প্রশ্নের। আসছে ঐতিহাসিক আখ্যান, 'মগ্নপাষাণ'।
গল্পটা মৌর্য সাম্রাজ্যের এক অস্থির সময়ের- সম্রাট বিন্দুসারের মৃত্যু এবং অশোকের সিংহাসন লাভের মধ্যেকার অশান্ত চার বছরের। লেখক তার অদ্ভুত সুন্দর বর্ননায় সেই সময়কে তুলে ধরেছেন মাত্র তিনশ পাতার মধ্যে। এই গল্প শুধু বন্য রাজকুমার অশোকেরই নয় বরং গ্রামের মেয়ে কারুবাকি, নগরবধু অশ্বলেখা , এক প্রতারিত বন্ধুত্ব আর এর মাঝে পড়া এক অসহায় বালক যার মৃত্যু লেখা ছিল তারই পিতার হাতে। লেখক এখানে রাজনৈতিক ঘটনাবলীর চেয়ে ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের চিত্র বেশি তুলে ধরেছেন। লেখকের লেখনী ছিল কাহিনীর স্রোতের সাথে মানানসই, অনেকটাই কাব্যময়- যা ইদানিং অনেক লেখকের মাঝেই দেখা যায় না। খুবই ভাল লেগেছে।
ভারতের ইতিহাসে সম্রাট অশোকের নাম চিরকালীন। মৌর্য বংশের কুলপ্রদীপ এই মগধনরেশের বীরগাঁথা আজও জনমানসে যথেষ্ট কৌতূহল উদ্রেক করে। কলিঙ্গ যুদ্ধ এবং চণ্ডাশোকের ধর্মাশোকে উত্তরণের কাহিনী সকলেরই জানা। বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক হিসেবেও অশোকের সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। তাঁর শাসনকালে তৈরি স্তুপগুলি তো জনপ্রিয় পর্যটন স্থল। আর অশোক চক্র দেশের জাতীয় পতাকায় সমুজ্জ্বল।
কিন্তু এই অশোকের জীবনে রয়েছে এক অজানা অধ্যায়। সম্রাট বিন্দুসারের প্রয়াণের পর নিজের সহোদরদের হত্যা করে কীভাবে সিংহাসন লাভ করেছিলেন তিনি, তা নিয়ে ধোয়াঁশা আজও। সম্রাট পদে আসীন হওয়ার আগে তাঁর জীবনের বেশ কিছু বছরের হিসেব নেই ইতিহাসের পাতায়। লেখক সূর্যনাথ ভট্টাচার্যের এই আখ্যানে উঠে এসেছে সেই গল্পই।
সম্রাট বিন্দুসারের এক নিচ কুলের রানীর সন্তান 'প্রিয়দর্শন'। রাজমহলে তাচ্ছিল্যের পাত্র সে। অগ্রমহিষীর সন্তান সুসীমের সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব। তাঁর বন্য স্বভাবের জন্য প্রজারা ভয় পেতেন তাঁকে। সম্রাটের মৃত্যুর পর এক ভয়াল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় পাটালিপুত্র। মগধের পরবর্তী নরেশ কে হবেন তা নিয়ে শুরু হল দুই ভাইয়ে ভয়ঙ্কর লড়াই, যা চলল দীর্ঘ চার বছর। এই দ্বন্দে নানা সময় নানা পাত্রের আগমন। জড়িয়ে গেল তিন্দারী গ্রামের হতভাগ্য, নিষ্পাপ নিবাসীদের ভবিষ্যৎও।
সূর্যনাথ ভট্টাচার্যের অসামান্য লেখনীর মাধ্যমে অশোকের জীবনকাহিনী এক অন্য মাত্রা পায়। তাঁর ভাষার দক্ষতা, লেখায় অপ্রচলিত শব্দকোষের মন্ত্রমুগ্ধকর ব্যবহার বাংলা ভাষাপ্রেমী হিসেবে সমৃদ্ধ করে পাঠককে। গল্পের ঠাসবুনোট ও নাটকীয়তার সংমিশ্রণ বিবশ করে একনাগাড়ে বইটি পড়ে যেতে। আর শেষ পাতার পর রবীন্দ্রনাথের অমোঘ সেই লাইনের কথা মনে পড়ে, 'শেষ হইয়াও হইল না শেষ' - ইচ্ছে হয় যেন শীঘ্রই এই আখ্যানের সিক্যুয়াল প্রকাশ হয়।
ইতিহাসধর্মী লেখা আজকাল প্রকাশিত হচ্ছে প্রচুর। কিন্তু অধিকাংশ কাজই পাতে দেওয়ার মত নয়। মধ্যমতার এই ভিড়ে 'মগ্নপাষাণ' অবশ্যই তফাতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
ঐতিহাসিক গল্প, উপন্যাস আমার খুবই পছন্দের জঁর। শরদিন্দুর 'ঝিন্দের বন্দী' নভেলখানা সবে শেষ করেছি। গৌরিশঙ্কর, কস্তুরি, ধনঞ্জয়, ময়ূরবাহনরা মাথায় ভর করে আছেন তখনো। অন্তিমপর্বে দুষ্টের দমন আর গৌরির অচল বৌদিকে লেখা চিঠি অথচ চিঠির শেষে গৌরির নিজের পরিচয়খানা মুছে আরেক পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠা ---- সব মিলিয়ে বেশ একটা দুঃখ সুখের মিশেল হাওয়া মনে। সেসময়টাতেই এক বন্ধু বললেন মগ্নপাষান বইখানা পড়ে দেখতে। দিদির বাড়ি বইখানা ছিলো। ঘটনাচক্রে আমিও তখন দিদির বাড়িতেই! পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এই দিদির বাড়ি যে কখানা বই শুরু করেছি তার সবকটাই মনে এক অদ্ভুত দাগ কেটে রেখে গেছে। এ বইখানাও তার ব্যতিক্রম নয়।
বইটির প্রেক্ষাপট আড়াই হাজার বৎসর পূর্বের মগধ সাম্রাজ্য। সময়কাল সম্রাট বিন্দুসারের মৃত্যুপরবর্তী চারবছর। যে সময়টা সমস্ত মগধ সাম্রাজ্য জুড়ে চলছিলো অরাজকতা, গুপ্তহত্যা, ষড়যন্ত্র, সিংহাসন দখলের রক্তক্ষয়ী ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত। বইটির কাহিনী যাঁকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে তিনি মগধ সাম্রাজ্যের কনিষ্ঠ রাজকুমার। প্রিয়দর্শন। মাতৃকুলের বংশকৌলিন্য নেই। তাই রাজকুমার হলেও সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী তিনি নন। প্রজারা ভয় পায় তার চন্ডরূপকে । 'স্বভাবে উগ্র, সিদ্ধান্তে হঠকারী, পরিচয়ে বন্য! শুধু মানবিকতার প্রশ্নে তিনি দেবতাকেও ভয় পান না।'- এই দুই লাইন ই পাঠকের মনে কনিষ্ঠ কুমার সম্পর্কিত যাবতীয় ধ্যান ধারনা গড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ২৬৩ পাতা জুড়ে রচিত হয়েছে সেই 'বন্য রাজকুমারে'র আখ্যান। তাঁর চন্ড থেকে ধর্মে উত্তরণ। ধর্মরাজ্য স্থাপনের সংকল্প নিয়ে আর্যাবর্তের সর্বকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ এক সম্রাট হয়ে উঠার যাত্রা।
বইটির প্রাককথনে লেখক নিজেই বলেছেন, 'এ উপন্যাস সম্রাট অশোকের জীবনালেখ্য নয়। তিনি এই আখ্যায়িকার নায়ক নন…. তিনি এখানে প্রিয়দর্শন নামে উপস্থিত।" তারপর প্রাককথনের তৃতীয় প্যারায় লেখক জানিয়েছেন, এ উপন্যাসের কাহিনী সম্পূর্ণত কাল্পনিক। সুতরাং ঐতিহাসিক সত্যাসত্য, যুক্তিতর্কের নিরিখে পাঠ এ বই দাবী করে না। বরং তাতে উপন্যাসটি পাঠের রসমাধুর্য বিনষ্ট ই হবে। সম্রাট বিন্দুসারের মৃত্যুপরবর্তী সময়ে মগধের রাজকার্য কিভাবে পরিচালনা হয়েছিলো এবং কিভাবেই বা বংশকৌলিন্যহীন বন্য রাজকুমার আর্যাবর্তের সুমহান সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীরূপে সিংহাসনে আরোহন করলেন, তার চন্ড থেকে ধর্মে উত্তরণের কারন কি শুধুই কলিঙ্গ যুদ্ধ নাকি সে যুগের সংকীর্ণ ব্রাহ্মণ্যবাদ, ঘৃণ্য বর্ণবাদের বিপরীতে মানবিক গুণের বলেই তিনি আকর্ষিত হয়েছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রতি--মূলত এ উপন্যাসে এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর অন্বেষন করেছেন লেখক। ঐতিহাসিক উপাদানের সাথে কল্পনা মিশিয়ে।
প্রিয়দর্শন বাদেও এই উপন্যাসের প্রত্যেকটা চরিত্রকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে ফুঁটিয়ে তুলেছেন লেখক। তারা প্রত্যেকে বড় মায়াময়। উজ্জ্বল। কারুবাকি, কারুমালি, সুবর্ণ, জয়ন্ত, সুসীম, টিয়ারেস, আচার্য কাকন্দ, ভিক্ষু নরোপা, আসন্ধিমিত্রা, রানি বেদিশা, মহীন্দ্র, সঙ্ঘমিত্রা - সবাই খুব জীবন্ত। স্বমহিমায় উজ্জ্বল। পড়তে পড়তে প্রতারক জয়ন্তকে ঘৃণা হলেও ভিক্ষু অমিত্রসিদ্ধিকে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। অশ্বলেখার জন্য মনের ভেতরে কেমন যেন এক শূণ্যতা ছড়িয়ে থাকে। মৃত্যুসজ্জায় যখন অশ্বলেখা অমিত্রসিদ্ধিকে বলে," এত দেরীতে তোমার সময় হলো?" - গলার মাঝে দলাপাকিয়ে কান্না উঠে আসে হঠাৎ..! সুবর্ণের উদারতা, ভালোবাসার জন্য অপেক্ষার কাছে হাঁটু মুড়ে বসে থাকতে ইচ্ছে হয়। আর কারুবাকি…. রুবা… বিম্বের জন্যে অপেক্ষায় থাকা সে তপস্বীনিকে বিম্বের কাছে ফিরে আসার জন্য কেন যেন খুব রাগ হয় শেষে!
আর প্রিয়দর্শন…! সবশেষে তার নির্দেশে তিন্দারির পাহাড়ের গায়ে প্রোথিত হওয়া অনুতপ্ত পিতৃহৃদয়ের বিলাপ, অপত্যশোকের মর্মান্তিক হাহাকারের মাঝে তার পূর্বের সমস্ত হঠকারি আচরন, রূঢ় ব্যবহার এমনকি আত্মজহত্যাও ক্ষমা করে দিতে ইচ্ছে হয়! অনুতপ্ত এক বৃদ্ধ সম্রাটের প্রতি ক্ষোভ বা রাগ নয়, অদ্ভুত এক দুঃখে ভারী হয়ে আসে মন।
গোটা উপন্যাসটির দৃশ্যায়ন খুবই অসাধারন। বিশেষত সবশেষে কলিঙ্গ যুদ্ধের দৃশ্যকল্পটি। এতোটাই নিখুঁত এবং সুন্দর দৃশ্যায়ন যে কলিঙ্গরাজের বিধবা স্ত্রী-পুত্রও যেন চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠেন! উপন্যাসটির ভাষা এবং বর্ণনাভঙ্গি অসাধারন। তৎসম শব্দের ব্যবহার, যুগোপযোগী শব্দচয়ন, প্রাচীনগন্ধী ভাষা উপন্যাসটির গুরুগম্ভীর ভাবের সাথে সাথে আলাদা মাধুর্য এনে দিয়েছে। অথচ এই গুরুগম্ভীর ভাষা কোথাও পাঠকের পড়ার গতি শ্লথ করে না। বরং সাবলীল ভাবে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা নেশার মতো শেষ হতে থাকে।
আর যা মন কাড়ে তা হলো বইটির প্রচ্ছদ। অসাধারন আঁকা এবং বইটির বিষয়ের সাথে একদম যথাযথ।
এককথায় উপন্যাসটি অদ্ভুত রকমের ভালো। ঐতিহাসিক জঁর যাদের পছন্দ এই বইটি পড়ে দেখতে পারেন। ঠকবেন না এটা নিশ্চিত। বরং পাঠ শেষে শরদিন্দুর ঐতিহাসিক গল্পগুলোর মতোই এক অদ্ভুত মনকেমনের ভালোলাগায় ভরে থাকবে মন। আর আমার মতো ভ্রমণপিপাসু পাঠকেরা তিন্দারি গ্রাম খুঁজতে যাওয়ার প্ল্যান কষতে থাকবেন মনে মনে…।
বছরের ৩৩ নম্বর উপন্যাস ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস মগ্নপাষাণ।। সুলেখক সূর্যনাথ ভট্টাচার্য এর লেখা এর আগে আরেকটি ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস পড়েছিলাম এবং মুগ্ধ হয়েছিলাম, আর তখনই ঠিক করি এনার লেখা সবকটি উপন্যাসই পড়তে হবে।। সুপ্রকাশ প্রকাশনীর ৩০% এর ছাড়বেলায় সংগ্রহ করি মগ্নপাষাণ ও ধ্রুবচন্দ্রিমা। এই উপন্যাসের কাহিনী'র কেন্দ্রবিন্দু সম্রাট অশোক।। কাহিনীর কোথাও যদিও তাঁকে এই নামে অভিহিত করা হয়নি। চণ্ড এবং প্রিয়দর্শী হিসাবেই সম্রাটের সাথে পাঠক পরিচিত হয়েছে।।
♦️ পটভূমি -
খ্রিস্ট জন্মের ২৭০ বছর আগে মগধের সিংহাসন অলংকৃত করেছিলেন মৌর্য বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোক। পিতা বিন্দুসারের অগ্রমহিষীর পুত্র সুসীমকে অতিক্রম করে কিভাবে অশোক মগধ সম্রাট হয়েছিলেন, সেই ঘটনা আজ বিস্মৃতির অতলে। পাঠ্য পুস্তক গুলোতেও এর বিস্তৃত বর্ণনা সেরকম পাওয়া যায় না। বিন্দুসারের মৃত্যু এবং সম্রাট অশোকের মগধ এর সিংহাসনে অভিষেকের মাঝে চার বছর ব্যবধান ছিল। কি কি ঘটেছিলো এই সময়ে? কিভাবে কুমার সুসীম শিকার হয়েছিলেন এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের। কেনই বা সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধে মত্ত হয়েছিলেন। শুধুই কি কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তপাত না আরও কিছু ঘটনা ছিল , যার কারণে চন্ড নামে খ্যাত অশোকের মনোজগতে পরিবর্তন হয়েছিলো। সম্রাট অশোকের সিংহাসনের আরোহণের পেছনে ছিল অশ্মলেখা ওরফে কারুমালির এক অনন্য অবদান, যে ছিল একাধারে মগধের নগরনটি এবং সম্রাট অশোকের দ্বিতীয় রানী কারুবাকির অগ্রজা ...তার খোঁজ রাখেনি কোনো বাজার চলতি ইতিহাস বই । সেই সকল ঘটনা জানতে হলে, অবশ্যই মগ্নপাষাণ পড়তে হবে। সম্রাট ছাড়াও আরও কিছু চরিত্র আবর্তিত হয়েছে কাহিনী জুড়ে। সম্রাট পিতা বিন্দুসার, ভ্রাতা সুসীম, মিত্র সুবর্ণ, ভ্রাতুষ্পুত্র সুমীর, কারুবালি-কারুমালি দুই তিন্দারী কন্যা যার মধ্যে আবার কারুমালি হলেন সম্রাটের বিবাহিতা মহিষী। আরও আরও চরিত্ররা আছে। পিতা বিন্দুসারের মৃত্যুর পর কে হবেন মগধাধিপতি, সেই নিয়ে দুই গোষ্ঠী তথা প্রিয়দর্শী এবং সুসীম এর মধ্যে চলতে থাকল গুপ্ত হত্যার হোলি খেলা। যে মগধ এ একসময় শান্তি বিরাজ করত, তথাগতের আশিসে ধন্য হয়েছিল যে মগধ সেই মেতে ওঠে স্বজনের রক্তে রাঙানো হোলি খেলায়। সেসময়কার মগধ এ ছিল চূড়ান্ত বিশৃখলা সহ গুপ্ত হত্যার কাজ। স্বাভাবিক ভাবেই মগধ ছিল অশান্ত। অশান্তির কারণ? অবশ্যই সিংহাসন।
♦️ পাঠ প্রতিক্রিয়া -
ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস মানেই, ইতিহাসের আবিষ্কৃত অনাবিষ্কৃত সব জায়গার ফাঁকেই লেখকের কল্পনাসূত্র।। এই উপন্যাসেও লেখক সেই পথেই হেঁটেছেন।। আর এই পথে লেখকের সঙ্গী হলেন সম্রাট অশোক।। কাহিনীটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক হলেও প্রধান উপাদান ছিল সম্রাটের শিলালিপিগুলো।। সম্রাট বিন্দুসারের মৃত্যুর চার বছর পর রাজ্যাভিষেক হয় অশোকের। কনিষ্ঠ কোনও এক রানীর পুত্র হিসেবে তাঁর রাজা হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। উপরন্তু তাঁর সামনে ছিল সম্রাট বিন্দুসারের জ্যেষ্ঠ পুত্র সুসীম। তবে কেন সম্রাটের মৃত্যুর পরেই সুসীম রাজা হলেন না এবং চার বছর অরক্ষিত রইল মগধের সিংহাসন, আর কিভাবেই বা চার বছর পর প্রিয়দর্শন হলেন মগধরাজ সম্রাট অশোক, ইতিহাসের সেই অজানা অলিখিত পৃষ্ঠাগুলির ফাঁক লেখক নিজের কল্পনায় ভরিয়েছেন। লিখেছেন তাঁর প্রিয় ইতিহাস নায়কের এক অন্য জীবন আখ্যান। এই বইটি প্রচারের আড়ালে থাকা ইতিহাসের অজানা ,বিস্মৃত, অবহেলিত তথ্যের আকর। যারা ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, অবশ্যই বলবো এই বইটি পড়তে...হতাশ হবেন না।।
কাহিনির সূত্রপাত পাটলিপুত্র থেকে দশ ক্রোশ দূরের একটি ছোট্ট গ্রাম তিন্দারি থেকে। প্রকৃতি যেন এই গ্রামটিকে অরণ্যসংকুল পার্বত্যভূমি দিয়ে ঘিরে লুকিয়ে রেখেছে। কিছু বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে মৌর্য সাম্রাজ্যের ভাগ্য তথা মৌর্য কুলভূষণ সম্রাট অশোকের জীবনের সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে এই গ্রামটি। 'মগ্নপাষান' উপন্যাসটিতে সম্রাট অশোকের জীবনের অনালোকিত অধ্যায়গুলি তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সমগ্র উপন্যাস জুড়ে একবারও 'অশোক' নামটি উচ্চারিত হয়নি। মা সুভদ্রাঙ্গীর দেওয়া প্রিয়দর্শন নামেই এই উপন্যাসে অশোকের পরিচয়। যে অশোক নিজের বহু ভ্রাতার রক্তে হস্ত রঞ্জিত করে সিংহাসনে বসেছিলেন, কলিঙ্গ যুদ্ধের গণহত্যাকেই কি কেবল সেই অশোকের হৃদয় পরিবর্তনের কারণ বলা যায়? নাকি চন্ডাশোকের ধর্মাশোক হওয়ার পিছনে আরো কোনো কারণ ছিল? কল্পনা ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে লেখক সেই প্রশ্নের উত্তরই অন্বেষণ করেছেন। লেখকের অসামান্য লেখনী ও কাহিনির আকর্ষণে পাতার পর পাতা অনায়াসে পড়ে ফেলা যায়।