বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসের সরস বিবরণ, মধ্যযুগের বাংলা : বখতিয়ার খলজি থেকে সিরাজ-উদ-দৌলা। রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক পক্ষপাত এড়িয়ে লেখক তুলে এনেছেন মধ্যযুগের শাসকদের উত্থান-পতনের আখ্যান। বাঙালি পাঠক মধ্যযুগের এই শাসকদের চেনেন, কিন্তু পুরোপুরি জানেন না। এই বইতে উঠে এসেছে তাঁদের জীবনের অজানা নানা দিক—তাঁদের আকাঙ্ক্ষা, সাহস, বীরত্ব, দুর্ভাগ্য, এমনকি বিশ্বাসঘাতকতার গল্পও। পাঠক, গৌড়-বঙ্গ-সমতটের পথে ইতিহাসের এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় আপনাকে স্বাগত।
মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাস জানার জন্য এ বইটা সূচনাবিন্দু হিসেবে কাজ করতে পারে।সংক্ষেপে কিন্তু প্রাণবন্ত ভঙ্গিতে লিখেছেন খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার। পড়তে পড়তে দুইটা ব্যাপারে আফসোস হোলো -
১. এতো লোভ আর লোভ শাসকদের! সব দেশের শাসকদেরই অবশ্য লোভ থাকে কিন্তু এতো এতো বেখেয়ালি কর্মকাণ্ড থাকে না! প্রচণ্ডরকম দূরদর্শিতার অভাব ছিলো এদের। পুরো ইতিহাসটাই যেন ছেলেখেলা। ২.আমাদের পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস অংশগুলো এমন প্রাঞ্জল হয় না কেন? কাঠখোট্টা তথ্যনির্ভর প্রবন্ধের বদলে এই ধরনের লেখা পাঠ্যবইয়ে স্থান পেলে শিক্ষার্থীরা ইতিহাসের ব্যাপারে আগ্রহ পেতো।
কলেবরে একদম ছোটো হলেও ব্যাপ্তিতে সমগ্র বাংলার ইতিহাসকেই ধারণ করেছে বইটি। একদম ক্রিস্প কন্টেন্ট। যতটুকু জানলে মোটামুটি ধারণা হবে এই জনপদের ইতিহাস সম্পর্কে, পুরোটাই আছে এতে।
মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসের পাঠ শুরু করার জন্য এই বইটা চমৎকার। মেদহীন সাবলীল লেখা এবং বেশ ঝরঝরেও। ছোটখাটো তথ্য সমৃদ্ধ বইটি পাঠকের মনে ইতিহাস নিয়ে কৌতূহল জাগিয়ে দিবে খুব সহজে।
বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাস বাঙালি বিবর্জিত শাসনের ইতিহাস।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের মহাকাশে গুটিকয়েক তারকা বাঙালির নামে অঙ্কিত আছে। তাদের ভেতর একমাত্র বাঙালি হিন্দু শাসকের নাম পাওয়া যায় রাজা গণেশ। মাত্র তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল তার শাসনকাল। তারপর তারই পুত্র যদু ওরফে সুলতান জালালউদ্দীন এবং বংশ ক্রমান্বয়ে জালালউদ্দীনের পুত্র শামসউদ্দিন। শেষোক্ত দুজন ধর্মান্তরিত হলেও ইসলাম ধর্মের বড় পৃষ্ঠপোষক হিসাবে ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছেন।
বাঙালির মধ্য যুগের ইতিহাস শুরু হয় আফগানিস্তানের হেলমন্দ নদীর ধারে আগা নামক স্থানে বসবাসরত প্রচণ্ড কষ্টসহিষ্ণু একটা উপজাতি থেকে। প্রকৃতি আর প্রতিবেশি দুই ছিল তাদের সমান শক্র। জীবন মানেই যেখানে যুদ্ধ আর যার প্রতিটি নিবাসি যোদ্ধা। সেই রুক্ষ অঞ্চল থেকে এক যুবক সুদূর বাংলায় এসে বাংলার নতুন যুগের সূচনা ঘটান। তিনি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি।
অতঃপর ভাগ্যের চোরাপথে কিংবা রাজনৈতি বিচক্ষণতায় একেরপর অবাঙালি সুলতান বাংলার রাজনৈতিক মঞ্চের প্রধান ব্যক্তির ভূমিকা পালন করেন। কখনো তুর্কি, কখনো আফগানি, এমনকি কখনো হাবসি সুলতানেরাও বাংলার ইতিহাসে নিজেদের নাম স্থায়ী করে গেছেন।
এসব নামের মধ্যে বাংলা নামটি সবথেকে বেশি ঋণী সুলতান শামসউদ্দীন ইলিয়াস শাহের নিকট। বঙ্গ নামের সাথে আল শব্দের সংযুক্তি কিছু আগে থেকে প্রচলিত থাকলেও ইলিয়াস শাহ একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেন 'শাহ ই বাঙ্গালাহ' উপাধি গ্রহণের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ এই অঞ্চলের মানুষ তাদের বাঙালি নামটি পেয়েছেন ইলিয়াস শাহের সময় থেকেই।
বাংলা ভাষা তো হলো, বাঙালি পরিচয়ও হলো। কিন্তু তার অগ্রগতি আর সমৃদ্ধি যার হাত ধরে শুরু হয় তিনি হলে রুকনউদ্দিন বারবক শাহ। এই সুলতান বাংলা সাহিত্যের রাষ্টীয় পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। তাঁর উৎসাহে মালাধর বসু বাংলায় শ্রীকৃষ্ণ বিজয় কাব্য অনুবাদ করেন। তাঁরই আদেশে কৃত্তিবাস ওঝা বাংলায় রামায়ণ অনুবাদ করেন। বাংলা সাহিত্য দুহাত ভরে আরবি, ফারসি, সংস্কৃত থেকে মণি মানিক্য নিতে শুরু করলো তার সময় থেকেই।
মধ্যযুগের সবথেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক চরিত্র হলো বিশ্বম্ভর মিশ্র, যাকে আমরা আজ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নামে বেশি চিনি। হিন্দুসমাজে সবথেকে বড় ব্যাধি ছুৎমার্গ নিয়ে তিনি সম্ভবত প্রথম সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও তাঁর এই প্রয়াস বাংলার রাজনীতি ও সাহিত্য গভীর প্রভাব রেখে গিয়েছিল। অখন্ড বাংলার পশ্চিম দিকে এখনো হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর মধ্যযুগের সাহিত্য বৈষ্ণব দর্শনের আধিপত্য দেখে আমরা সেটা বুঝতে পারি।
মোট ১৬ টি পরিচ্ছেদে লেখক খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার তার মধ্যযুগের বাংলা গ্রন্থে বাংলার মধ্যে যুগের ইতিহাস সারসংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। শুরু করেছেন বখতিয়ার খলজিকে নিয়ে শেষ করেছেন মির কাসিমকে দিয়ে। এরমধ্যে আরও আছেন ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ, আছেন গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, ঈশা খাঁ, প্রতাপাদিত্য, শায়েস্তা খান, আছেন মুর্শিদ কুলি খান, আলিবর্দি খান এবং অবশ্যই সিরাজ-উদ-দৌলা।
মাত্র ১৪২ পৃষ্ঠার বইটি খুব বেশি তথ্য জানা আসা করা যায় না। যারা মধ্যযুগের বাংলার শাসনের ইতিহাসের মোটামুটি একটা চিত্র দেখতে চান তাদের জন্য বইটি সাহায্যজনক হতে পারে। তবে যারা বিস্তারিত পড়েন বা পড়তে চান এসব শাসকদের সম্পর্কে তারাও পড়তে পারেন। হয়তো দু চারটা তথ্য আর রেফারেন্স আপনাকের তথ্যভান্ডারকে সমৃদ্ধ করলো।
বইটি সবথেকে ভাল লাগার দিক হলো। পুরোদস্তুর একটি নন-ফিকশন বই হওয়া সত্ত্বেও বইটা খুব অবলীলায় পড়ে শেষ করা যায়। এত সহজ আর সাবলীল লেখার ঢঙ ইতিহাসের বইতে কমই দেখা যায়। তবে পড়ার সময় মনে রাখতে হবে লেখক ইতিহাসবিদ নন। অর্থনীতির ছাত্র লেখক নৃতত্ত্ব ও ইতিহাসকে ভালোবেসে প্রচুর পড়াশোনা থেকে লিখেছেন বইটি। তাই কোন তথ্যের সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে বিভ্রান্ত মনে হলে সেই বিভ্রান্তি দূর করার দায়িত্ব পাঠককের নিজেকেই নিতে হবে।
বাঙালিরা বরাবরই স্বাধীনচেতা জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। যার দরুণ যুদ্ধ-বিগ্রহ, ক্ষমতার রদবদল, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, অর্ন্তকোন্দল কিংবা বহিঃশত্রুর আক্রমণ সর্বদা ছিল বাংলা ভূখন্ডে। তখনকার বাংলা আজকের মত ছিল না। ভারত বিভক্তির আগে বাংলা বড় একটি প্রদেশ ছিল এবং এখানের শাসকেরা স্বাধীনভাবেই শাসন করে গেছেন। তুর্কি সেনাপতি খলজির বাংলা বিজয়ের শুরু থেকে ব্রিটিশদের ক্ষমতা দখলের মধ্যবর্তী সময়কে মধ্যযুগ হিসেবে বিবেচিত করে বইটিতে বাংলার ক্ষমতার রদবদলের ইতিহাস উঠে এসেছে।
বাঙালিরা স্বাধীনচেতা জাতি হলেও এরা সবসময়ই বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়ে এসেছে। ফলশ্রুতিতে বাঙালিদের বাইরের শাসকেরা বিশ্বাসঘাতকদের সাহায্য নিয়ে শাসন করে গেছেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা জয়ের মাধ্যমে এই অঞ্চলে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। হিন্দু রাজা লক্ষ্মণ সেন পালিয়ে গেলে খুব সহজেই ক্ষমতা গ্রহণ করেন খলজি। হিন্দু বর্ণাশ্রম এর প্রতি তিক্ততা থেকে অনেক হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং খলজির হস্তক্ষেপে সুফি-সাধকদের মাধ্যমে বাংলায় ইসলাম ধর্ম অনুসারী উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে।
বাংলা শাসনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছিল শাহী বংশ। ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের আমলে বাংলার পূর্ব সীমান্ত যেমন নির্ধারণ হয়ে যায় তেমনি বারবক শাহের আমলে বাংলা ভাষার প্রসার ও প্রচার হয়। শাহী বংশের শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দুইটি ঘটনা ��লো রাজা গণেশ ও মালিক আন্দিল তথা ফিরোজ শাহের শাসনামল। ফিরোজ শাহ হাবশি শাসনের সূচনা করেন। হিন্দু রাজা গণেশ কিছুকাল শাসন করলেও মোগল আক্রমণের ভয়ে নিজের ছেলে যদুকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে ক্ষমতায় বসান এবং পেছন থেকে নিজে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। রাজা গণেশ বাংলার শেষ হিন্দু রাজা হলেও নিজের ছেলেকে ইসলামে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে মূলত ইসলামী শাসনব্যবস্থাকেই দীর্ঘায়িত করেছেন।
বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম ছিলেন ঈসা-খাঁ। সোনারগাঁও এলাকায় রাজধানী বসিয়ে তিনি দীর্ঘদিন শাসন করেছেন ওই অঞ্চল। চাঁদ রায়ের কন্যা স্বর্ণময়ীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক হয় তাঁর। স্বর্ণময়ী ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করেন ঈসা-খাঁ কে। ঈসা-খাঁ এর আমলে মোগল অভিযান পরিচালিত হলেও তারা বাংলা অধিকার করতে পারেনি, তাই তাদের প্রতিবারই পরাজিত হয়ে ফেরত যেতে হয়েছে। অবশ্য তাঁর পুত্র মুসা-খাঁ মোগলদের হাতে পরাজিত হন এবং তাদের আনুগত্য স্বীকার করে নেন। শেরশাহের গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড নির্মাণ কিংবা মোগল বাদশাহ হুমায়ুনকে পরাজিত করে দিল্লির ক্ষমতা দখল, শায়েস্তা খানের চট্টগ্রাম জয়ের মাধ্যমে জলদস্যু দমন এবং বাংলার প্রথম নবাব হিসেবে মুর্শিদ কুলি খানের ঢাকার উন্নয়ন আমাদের মধ্যযুগের শাসকদের অন্যতম সাফল্য।
কোনো শাসনব্যবস্থাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একটা সময় তাকে বিদায় নিতে হয়ই। তেমনিভাবে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূর্য পশ্চিম দিগন্তে হেলতে থাকে। এই সময়ে আলিবর্দি খান সুযোগের সদ্বব্যবহার করে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। মোগল, মারাঠা কিংবা আফগানদের বিরুদ্ধে তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করলেও প্রাসাদের যুদ্ধে তিনি নিজের উত্তরাধীকারীকে নিরাপদ রেখে যেতে পারেন নি। নাতি সিরাজউদ্দৌলাকে ক্ষমতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এদিকে ক্ষমতার অন্যান্য ভাগিদাররা ষড়যন্ত্র শুরু করেন; যার শেষ দৃশ্য দেখা যায় পলাশীতে। যুদ্ধে পরাজিত এবং পরবর্তীতে নিহত হলে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের মৃত্যু দিয়ে বাংলা দুইশ বছরের জন্য ব্রিটিশদের হস্তগত হয়। যদিও এর কিছুকাল পরে মীর জাফরের জামাতা মীর কাসিম মোগলদের সহায়তা নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। অথচ দেখা যায় পলাশীর ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হয়েছে বক্সারের ময়দানে। যুদ্ধে মীর কাসিম শুধু পরাজিতই হলেন না, সাথে করে মোগল সাম্রাজ্যকেও ব্রিটিশদের হাতে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করে দিলেন।
বইটি অসংখ্য তথ্য দিয়ে ভরা। আমাদের ইতিহাসের বিজয়ী, পরাজিত, হতোদ্যম চরিত্রকে দেখতে পাই এখানে। বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যারাই শাসকের কাছাকাছি গিয়েছেন তারাই ক্ষমতার লোভে নিজ শাসককে হত্যা করতে পিছপা হন নি। আপন ভাই, বাবা কিংবা নিকট আত্মীয়স্বজনকে অবলীলায় হত্যা করে ক্ষমতায় বসার পথকে কণ্টক মুক্ত করেছেন তারা। ইতিহাস সবাইকে সমানভাবে দেখেনা। কাউকে করেছে বিজয়ী আবার কাউকে দেখিয়েছে অত্যাচারী শাসক হিসেবে। এটা ইতিহাসবিদদের ইচ্ছাকৃত বলার চাইতে অসচেতনতা বলাটাই শ্রেয়। ইতিহাস বারবার ফিরে এসেছে এই বাংলায়। তবুও কেউ শিক্ষা নেয়নি, ভবিষ্যতেও যে নিবে এটা নিয়ে সন্দেহ করাটা অমূলক নয়।
দারুণ একটা বই পড়লাম। অনেক কিছু জানলাম নতুন করে, বিস্তারিতভাবে। যা শুধু নামে নামে জেনে এসেছিলাম, সেইসব চরিত্রকেই দেখলাম নতুন আঙ্গিকে। লেখককে ধন্যবাদ এমন একটি বই আমাদের উপহার দেয়ার জন্য। হ্যাপি রিডিং।
মধ্যযুগের বাংলা - ইখতিয়ার উদ্দিন থেকে সিরাজ-উদ-দৌলা বইটি যথার্থই সরস এবং সুখপাঠ্য একটি বই। অনেকটা ছোটবেলায় নতুন সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে আগ্রহের সাথে বাংলার ইতিহাস পড়ার দিনগুলো মনে পড়ে যায়। বইটি লাইট-রিডিং এর জন্য যথার্থ হলেও রেফারেন্স ম্যাটেরিয়াল হিসেবে তেমন একটা উপযুক্ত মনে হয়নি। বইটিতে কেবলমাত্র শাসকগণ এবং তাদের ব্যক্তিজীবনের উপর ফোকাস করার ফলে তৎকালীন বাংলার জনমানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে খুব বেশী জানা সম্ভব হয় না। তবে কেউ যদি সময় কাটানো, এবং পাশাপাশি মধ্যযুগের বাংলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে চান, সেক্ষেত্রে এ বইটি একটি চমৎকার মাধ্যম হতে পারে।
'মধ্যযুগের বাংলা' ইতিহাসের বই হলেও,তথ্যপ্রমাণে খটমটে ইতিহাস নয়। গতিময়, সরল,সরস ইতিহাসের বই। মধ্যযুগের পুরোটা এতে উঠে না আসলেও,লেখক কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে তুলে ধরেছেন এতে। পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন লখনৌতি থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদের নানান অধ্যায়ের সাথে। বিকৃত কিংবা অতিরঞ্জিত তথ্যের সমুদ্র থেকে তুলে এনেছেন ঐতিহাসিক সত্য।
ইতিহাসের খটমটে বই যাদের পড়তে ভালো লাগেনা,তারা ছোট এই বইটি পড়ে দেখতে পারেন। আর কিছু না হোক,অন্ততপক্ষে ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ জাগতে পারে। ১৪১ পৃষ্টার ছোট্ট এই বইয়ে,সরস লেখনীতে মধ্যযুগের অলিগলিতে ভ্রমণ করিয়ে আনার জন্য খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন।
ইতিহাস শুধু গল্প নয়, ইতিহাস একটা আবেগও। ইতিহাস অদৃশ্য আবার দৃশ্যমানও। এই ইতিহাসকে সাধারণ এর কাছে দৃশ্যমান করে প্রেজেন্ট করা এত সহজ নয়। খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে কাজটি করেছেন।
লেবার অফ লাভ, মানে যে কাজ ভালবেসে করা হয়, সেটা দেখলে বোঝা যায়। এই বইটা লেবার অফ লাভ বলেই এর বিন্যাস, উপস্থাপনে যত্ন ও বিচক্ষণতার ছাপ স্পষ্ট। বইটি তথ্যবহুল, কিন্তু তথ্যে ভারাক্রান্ত নয়। পন্ডিতি চালে বা কোন অধ্যাপকের লেখার মতও নয়।
ভূমিকায় লেখক খুব অসাধারণ কিছু কথা বলেছেন যে, তিনি যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছেন এবং নিজের বিবেচনামত ইতিহাসকে ছেঁকে পরিবেশন করেছেন। কোন নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার ট্রাই করেছেন। কোনরকম অতিশায়ন তিনি বর্জন করেছেন। বইটি পড়লে তার এই বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়।
সুন্দর, ছিমছাম, গোছালো, সুপাঠ্য ও সুবিন্যস্ত। যত সামনে এগিয়েছেন, লেখক তত পাঠকের ইমোশনকে ক্যাপচার করতে পেরেছেন। অনেক জায়গায় নিজস্ব মতামত ও পড়াশোনা দিয়ে প্রচলিত বিশ্বাসের খণ্ডন করেছেন। ক্রমাগত আমাদের ইতিহাস থেকে বাস্তবে টেনে এনে দেখিয়েছেন, কি ছিলাম আর কি হয়েছি!
চমৎকার। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার! এই ছোট্ট বইটা বাংলার ইতিহাস চর্চায় একটা উজ্জ্বল সংযোজন হয়ে রইবে, এই আশাই করছি।
4.5/ 5
P.S: তবে হ্যাঁ, পরবর্তী সংস্করণ গুলিতে আলোচ্য সময়গুলিতে বাংলার তৎকালীন মানচিত্র সংযোজন এর অনুরোধ রইল। এই একটা বিষয় ছাড়া আর বাকিসব খুবই পারফেক্ট আছে।
সম্প্রতি জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের ভুল উপস্থাপনা নিয়ে বেশ ঝড় চলছে ফেসবুক মহলে, ঠিক এ সময়ই বইটা হাতে নেয়ার সুযোগ হলো। ১২-১৮ শতাব্দী, মোট ছয়শো বছরের ইতিহাস লেখক ষোলোটা অধ্যায়ে ঠেসে দিয়েছেন। বেশিরভাগ গল্পই একটু আধটু জানতাম তবুও পড়তে অনেক ভালো লাগলো। ইতিহাসের বই হিসেবে এতো সহজ-সরস উপস্থাপনা বেশ চমকে দেয়ার মতো।
লেখক ছোটবেলা থেকেই ইতিহাসের গল্প শুনে বড় হয়েছেন। বড় হয়ে ইতিহাসের বই পড়েছেন। সেখান থেকে জন্মানো একটা দায়বদ্ধতা থেকেই হয়তো বইটা লেখা। তরুণ তুর্কী বখতিয়ার খলজি, আবেগপ্রবণ শাসক গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, স্থিতধী আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, নিঃসঙ্গ যোদ্ধা রাজা গণেশ– এনাদের কেউ হয়তো বুদ্ধি আর কৌশলের বদৌলতে জীবদ্দশার বিরাট একটা সময় বাংলায় শান্তি বজায় রেখেছিলেন আবার কেউ কেউ উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা নির্বুদ্ধিতার কাছে বলি হয়ে হারিয়েছেন সবকিছু। মানসিক আঘাত, হতাশা, যন্ত্রণাকে ইতিহাস পাত্তা দেয় না। এজন্যেই হয়তো মাত্র তেইশ বছর বয়সে, নেতৃত্বের গুণাবলী বিকশিত হবার আগেই, ইংরেজদের হাতে হেরে যাওয়া সিরাজকে ইতিহাস পরাজিত যোদ্ধার চোখেই দেখবে।
বইয়ের যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে, লেখক সবগুলো ঘটনা বেশ ইতিবাচক ভঙ্গিতে লিখেছেন। অতিরঞ্জন ভাব খুব সযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং এক্ষেত্রে তিনি বেশ সফলতারই পরিচয় দিয়েছেন। সুতরাং মধ্যযুগের বাংলাকে চোখ বন্ধ করে দশে নয় দেয়া যায়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য ১: এই বই মানুষজনকে রেকমেন্ড করার মতো একটা বই।
বিশেষ দ্রষ্টব্য ২: বইটা পড়ার সময় বারবার উদ্ভাসের এক ভাইয়ার কথা কানে বাজছিল। সাধারণ জ্ঞানের পাঁচ-ছয়টা ক্লাস করেছিলাম ওনার। ক্লাসগুলো এতো চমৎকার ছিল যে তখন থেকে ইতিহাসের প্রতি হালকা-পাতলা আগ্রহ জন্মেছে। বইটা পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো ওই ভাইয়ার ক্লাসে ফিরে গেছি।
ইতিহাস সমাজ বাস্তবতার দলিল। অতীতের বস্তুনিষ্ঠ ঘটনা ও সেই ঘটনার চরিত্র গুলো ইতিহাসের উপাদন হয়ে থাকে। ইতিহাসের পটপরিবর্তন হয়েছে বারবারই, ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি কখনই। ক্ষমতা যোগ্যতাকে বাঝে মাঝেই হারিয়ে দিয়েছে, সিংহাসন হয়েছে রক্তাক্ত। সিংহাসনের কাছে স্নেহের বাঁধন বা রক্তের সম্পর্কের মূল্য থাকেনি। কলুষিত সেই সব কাহিনির সাথে বীরত্বের কাহিনিও স্থান পেয়েছে ইতিহাসে। তবে সেই সময়ে যাঁরা ইতিহাস লিখেছেন তাঁদের উপর নির্ভর করে কাহিনি কতোটা সত্যি বা মিথ্যা মিশ্রিত।
বাংলায় শেষ নবাব বলে খ্যাত সিরাজ-উদ-দৌলা যতখানি সিনেমার নায়ক, ইতিহাসের ততোখানি না। তাঁর ভাবমূর্তি অনেক খানি নষ্ট করেছেন ইংরেজরা তাদের স্বার্থের কারনে। আবার সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পর জাতীয়তাবাদীরা ইংরেজদের নাকচ করার জন্য তাঁকে এক মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীর রূপ দিতে চেষ্টা করেছেন। তিনি আসলে ভাগ্যহীন নবাবজাদা, নবাব হিসেবে বিকশিত হয়ে ওঠার সুযোগ তিনি পান নাই।
তবে সিরাজ-উদ-দৌলাকে বাংলার শেষ নবাব বলা হলেও শেষের পরে পুনশ্চ বলে কিছু থাকে সেই পুনশ্চ হিসেবে ছিলেন মীর কাসিম। বাংলার সূর্য অস্তমিত হলের রশ্মি কিছু টা থেকেছে। তবে মীর কাসিমের লড়াইটা ইংরেজটা নস্যাৎ করে দিয়েছিল। আর তখন থেকেই বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসন শুরু হয়। পুরো ইউরোপে তখন আধুনিক যুগের প্রথম পর্ব শেষ হয়ে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছে। মীর কাসিম মধ্যযুগ ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় পানি ঢেলে দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের হাত ধরে শুরু হলো আধুনিক যুগ।
"মধ্যযুগের বাংলা" বইটার শুরুটা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি সময় থেকে। যারা কোন ইতিহাস না জানে তারাও জানে যে তিনি ১৭ জন অশ্বারোহী নিয়ে রাজা লক্ষ্ণণ সেনকে পরাজিত করে নদীয়া জয় করেন এবং বাংলায় হিন্দু রাজবংশের পরাজয় ঘটে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি কে ছিলেন? তার জন্ম, জীবন, অর্জন, পরাজয় ও জীবনের শেষটা কেমন কেটেছে? ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির সময় থেকে ধারাবাহিক ভাবে পরবর্তী সব রাজবংশ ও রাজাদের বর্ননা লেখক তুলে এনেছেন। ইতিহাসের কঠিক কোন ভাষার প্রয়োগ এখানে নাই, সাবলীল সুন্দর বর্ণনায় ইতিহাসের ঘটনার বর্ণনা। দীর্ঘ একটা যুগকে কী চমৎকার ভাবে ছোট্ট বইয়ের দুই মলাটে বেঁধে ফেললেন লেখক।
স্কুলজীবনে সমাজ বইতে যে নামগুলো পড়েছিলাম তার বিবরণ উঠে এসেছে বইতে। রণকৌশল, ষড়যন্ত্র আর বিচক্ষণতা এসবই ছিলো মধ্যযুগের ক্ষমতা দখলের মূল কারণ। লেখক প্রত্যেকটি চরিত্রের উঠে আসার পেছনের গল্পসহ দিয়েছেন। এতে প্রত্যেকটি চরিত্রের গুরুত্ব বেড়েছে। ইতিহাসের পাশাপাশি লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণও রয়েছে বইতে। আমার কাছে ব্যাপারটা ভালোই লেগেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা কিভাবে অন্য ধর্মের সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিন শাসন করলো, কিভাবে বাংলার স্বাধীনচেতা মনোভাব সৃষ্টি হলো অথবা কেনই বা বঙ্গের গুরুত্ব দিল্লী সরকারের কাছে অত্যধিক ছিলো তা জানতে হলে পড়তে হবে পুরো বই। চমৎকার শৈলীতে বর্ণনা করা বইটিকে ৫ তারকা দেয়ার মতোই মনে হয়েছে।
এই বইটা পুরোপুরি ফিকশন তো নয়ই আবার খটমটে নন-ফিকশনের মত দুর্ভেদ্য না। বলা যায় সুখপাঠ্য। একেবারে তথ্য দিয়ে ভরপুর ভারাক্রান্ত বই না, আবার একদম ছোট আকারের ইতিহাসের পুস্তিকাও না। মূলত ইতিহাসপ্রেমী পাঠকদের ইতিহাসের ভূত মাথায় চাপিয়ে দিতে এই বই প্রভাবকের কাজ করতে পারে বলে আমার ধারণা। লেখার বাইরে "বাতিঘর"-এর বই আমাকে মোহিত করেছে বারবার। পৃষ্ঠার মান, বইয়ের বাধাই, ফন্ট এবং সর্বশেষ প্রচ্ছদ।বইয়ের পৃষ্ঠায় হাত দিলেই মন গলে যায়। সব মিলিয়ে দারুণ। হ্যাপি রিডিং 💙
মধ্যযুগের অর্থাৎ ১২০০ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করা ২০ জন শাসকদের ক্ষমতা আরোহণ, ক্ষমতায় টিকে থাকতে রাজনীতি ও যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস খুব সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আছে বইটিতে। অর্থনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবার কারণে বিদেশীদের নজর ছিল এই অঞ্চলের উপর। ভাগ্যান্বেষী বিদেশিরা কখনো পেশীশক্তি, কখনো কূটনীতি, কখনো বা গুপ্ত হত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা আরোহণ করেছেন। অল্প কয়েক জন কেবল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ভাবে ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়েছেন। মাত্র ৬০০ বছরে ১৪ টি পরিবারের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল, ঐ যুগে যা বিরল; এই অঞ্চলের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।
বাংলার ইতিহাসের প্রাথমিক ধারণা দিতে লেখক খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার প্রচেষ্টার প্রশংসা করতেই হয়।
Bought this book thinking of "baby history" version of sultani amol, that it'd be more entertaining than informing. Finished after 2 months, pausing a page here and there because so many details and references kept pulling my hair 😪
This book chronologically narrates each successive sultan and hinges on a single character trait for each. That was it's kinda similar to western non-fiction and biography. Liked the approach.
I applaud the writet for such a comprehensive and durable work. This would probably meet 2/3rd of most history buffs demand. What I would remark is Mr. Shahriar could as easily write a book just with his own words and impressions of the people he wrote about and it would still be pretty enjoyable.
মধ্যযুগে বাংলার একটি বৈশিষ্ট্য ছিলো। যেই শাসনের অধিকার পেতো, হয়ে উঠতো স্বাধীনচেতা। যার দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।
বখতিয়ার খলজির আক্রমণ দিয়ে মধ্যযুগের যে স্বাধীন মনোভাবের সূচনা হয়েছিলো তার শেষ হয়েছিলো সিরাজ-উদ-দৌ��াকে পরাজিত করার মাধ্যমে। এর মাঝে এসেছেন অনেক শাসক যারা ক্ষমতা পেয়েই বিদ্রোহী হয়ে উঠতেন। মধ্যযুগে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ হয়েছে মোঘলদের সাথে৷ বার বার বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে অনেক সময় তারাও হয়ে যেতো ক্লান্ত৷ বেছে নিতো সন্ধির পথ।
মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে রচনা হয়েছে অনেক বই। সেই হিসেবে ১৪৪ পৃষ্ঠার এই বইটি তেমন কিছুই না। কারণ মধ্যযুগের ইতিহাস ঘটনাবহুল ইতিহাস৷ তবে নতুন পাঠক হিসেবে প্রতিটি বিষয়ে আপনার জানার আগ্রহ সৃষ্টি করতে বইটি যথেষ্ট।
মধ্যযুগের শাসকদের আকাঙ্ক্ষা, সাহস, বীরত্ব, দুর্ভাগ্য এমনকি বিশ্বাসঘাতকতার গল্প পাওয়া যাবে ছোট এই বইটিতে। যা পরবর্তীতে এই সম্পর্কে জানতে আগ্রহ সৃষ্টি করবে৷
সরস গতিময়তার ইতিহাস প্রবাহ৷ শুরু হয়েছে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির আমল থেকে। শেষ হয়েছে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পুনশ্চ হয়ে থেকে যাওয়া মির কাসিমে। তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত না করে সময় প্রবাহ এবং লেখার প্রবাহ দুটোই একই সাথে গতিশীল রাখার চেষ্টা করেছেন লেখক। ফলে যারা ইতিহাসের বই শুনলেই নাক সিঁটকান, তাদের কাছেও বইটা বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠার কথা। নানান ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে বাংলার ইতিহাস। কখনো শাসক এসেছেন আফগানিস্তান থেকে, কেউ মুঘল বংশধর, কেউ হাবশী ক্রীতদাস, কেউ বা ধর্মান্তরিত শাসক। কিন্তু সকলেরই দায় কিংবা অবদান উভয়েই রয়েছে আজকের এই বাংলার পেছনে। কেউ কেউ শিল্পানুরাগী ছিলেন, কেউ ছিলেন সাম্প্রদায়িক, কেউ বা স্থাপত্যশৈলীকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। কোন শাসক এসেছেন বংশানুক্রমে, কেউ এসেছেন যোগ্যতা প্রমাণ করে আবার কেউ বা ছলচাতুরির আশ্রয়ে। বিদ্রোহে ফুটিফাটা বাংলার নাম বুলগাকপুর, এমনি এমনি হয়নি। বাংলা সবসময়ই স্বাধীন থাকতে চেয়েছে, ফলে রক্ত ঝরেছে বারংবার। ইতিহাসের এই শাসকদের আমাদের সকলেরই কমবেশি জানা। এই বইটার মাধ্যমে একদম ধারাবাহিকভাবে আবারো একটা স্পষ্ট ধারণা হয়ে যাবে। শেষপাতে ডেজার্ট হিসেবে লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ যোগ করেছে নতুন মাত্রা। সব মিলিয়ে খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারের মধ্যযুগের বাংলা বইটি প্রত্যাশা মেটাতে সার্থক হয়েছে। অন্তত আমার।
Interesting book. Very easy and bite-sized read. The book kinda rekindled an interest in me to read more about the history of Bengal and the Indian subcontinent. I remember most of the historical figures mentioned in the book from the high school days, as we used to cram their biography for exams. However, as an adult reader, those same figures seemed more intriguing and nuanced as the author unveiled their dynamics. Kudos to the author for that. Highly recommended if you want a primer on the history of our region through the Middle Ages.
ভেবেছিলাম বইটাতে মধ্যযুগের বাংলার সাধারণ মানুষ, তৎকালীন সমাজের সঙ্গে শাসকদের গল্প বলা হবে। পড়ার সময় আবিষ্কার করলাম, প্রথম দুটি বিষয় নয় বরং শাসকদের জীবন ও তাদের ক্ষমতাদখলের কাহিনী এই বইয়ের মূল বিষয়বস্তু। লেখকের প্রাঞ্জল ভাষায় কিছু সময়ের জন্য বাংলার সেই মধ্যযুগের ইতিহাসের পাতা থেকে ঘুরে আসার জন্য এই বইটা বেশ চমৎকার।
ইতিহাস জানতে বোধহয় সবারই কমবেশি ভালো লাগে। কিন্তু সেই ইতিহাস যদি হয় খটমটে ভাষায় তবে ভালো লাগা যেন কর্পূরের মত উবে যায়। যেমনটা হয় অ্যাকাডেমিক বইয়ের ইতিহাস পাঠে। সেদিক থেকে খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারের 'মধ্যযুগের বাংলা'কে ব্যতিক্রমই বলা যায়। লেখক সরল ভাষায় গল্পের মতো করে বলে গেছেন মধ্যযুগের গল্প। দৃশ্যপটে একের পর এক হাজির হয়েছে রথী-মহারথীরা। কৈশোরে মুখস্থ করা নাম ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয় থেকে শুরু করে পলাশীর প্রান্তরে সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় সবই উঠে এসেছে৷ যারা ইতিহাস পছন্দ করেন তাদের আশা করি বেশ ভালো লাগবে৷
মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসের পর্ব বদলের ক্ষণগুলো কুয়াশায় ঢাকা, ষড়যন্ত্র বিশ্বাসঘাতকতার পুনরাবৃত্তিতে ভরা। শুরু থেকে বাংলার ইতিহাসেরর মধ্যযুগের যখন শেষ হতে চলেছে, তখনও অবস্থাটা এ রকমই ছিলো। ১২০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের বাংলার মধ্য যুগের এই সময়ের মধ্যে বাংলার উত্তর পশ্চিম থেকে আসা একের পর এক অভিযাত্রীদের সঙ্গে স্থানীয় ক্ষমতাধরদের বারবার সংঘর্ষ হয়েছে। প্রাসাদের বাইরের রাজনীতি যেমন অস্তির ছিলো, তেমনই প্রাসাদের ভিতরের রাজনীতিও ছিলো চরম ভারসাম্যহীন। ক্ষমতা, যুদ্ধ, বিশ্বাসঘাতকতার একের পর এক নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে এই বাংলার বুকে যার কারণে আস্তে আস্তে অস্তমিত হয়েছিলো স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য।
তেমনই এক সময়ের বাংলার বহু বর্ণাঢ্য চরিত্রের মধ্য থেকে লেখক কিছু প্রধান চরিত্রকে বেছে নিয়েছেন এই বইয়ে। তাদের সাথে পাঠককে ঘুরে দেখিয়েছেন মধ্যযুগের বাংলার লখনৌতি, সূবর্ণগ্রাম, চট্টগ্রাম, সপ্তগ্রাম আর মুর্শিদাবাদের ছায়াচ্ছন্ন পথ-ঘাট, রাজপ্রাসাদের অলিগলি, রক্তাক্ত ক্ষমতার লোভের। খুঁজেছেন ইতিহাস নির্ভর আখ্যানের মধ্য দিয়ে বাঙালির রাজনীতি, সমাজদর্শন আর স্বাধীনচেতা মনোভাবের উৎস।
বইটিতে লেখক অনেকগুলো বর্ণাঢ্য চরিত্রের বর্ণনা এনেছেন যাদের অনেকেই আমার পরিচিত আবার অনেকের আগে নামও শুনিনি। বইটিকে লেখক খুব বেশি তথ্য উপাত্ত দেননি, তাই এই বই পন্ডিতদের জন্য নয়, আমার মতো নির্মোহ সহজসরল অল্পে সবকিছু নিয়ে একটা ধারণা নিতে চাওয়া অনুসন্ধানি পাঠকের জন্য, যারা অতি তথ্যের ভারে বিরক্ত হয়।
লেখক বইয়ের প্রথম চরিত্র আফগানিস্তানের হেলমন্দ নদীর ধারের এক দরিদ্র পরিবারে জন্য নেওয়া ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজিকে দিয়ে শুরু করেছেন যিনি সূদুর আফগানিস্তান থেকে এসে ভারত বাংলাদেশের বিশাল রাজ্যের অধিপতি হয়েছিলেন সেই ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন।
শুধু তাই নয় সেই ইতিহাস বখতিয়ার খলজিকে দিয়ে শুরু করে একে একে ফখরউদ্দীন মুবারক শাহ, শামসউদ্দীন ইলিয়াস শাহ, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, রাজা গণেশ, রুকনউদ্দীন বারবক শাহ, মালিক আন্দিল ও বিশ্বম্ভর মিশ্র, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, শেরশাহ ও নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন, ঈসা খাঁ ও মুসা খাঁ, প্রতাপাদিত্য, শায়েস্তা খান, মুর্শিদ কুলি খান, আলিবর্দি খান, সিরাজ-উদ-দৌলা হয়ে শেষ করেছেন মির কাসিমকে দিয়ে।
বইটি পড়লেই কিছু কিছু চরিত্রের প্রতি আমার গল্প-উপন্যাস পড়ে ধারণা হওয়া সেই মনোভাবও পরিবর্তন হয়ে গেছে। ইতিহাসে কাউকেই পরিপূর্ণ সৎ বলা যাবে না, এদের প্রত্যেকেই রচনা করে গেছে রক্তাক্ত, বিশ্বাসঘাতকতা আর কুটিল রাজনীতিতে ভরা এক অনন্য অধ্যায়। এর এদিকে একের পর এক পেরেক পড়েছে বাংলার স্বাধীনতার কফিনে।
বইটি উপভোগে লেখকের বর্ণনা অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে, একেবারে নির্মোহ ভাবে প্রতিটি চরিত্র এবং তাদের কার্যপরিধি তুলে এনেছেন সেই সাথে প্রত্যেকের যোগসূত্র সহ উপস্থাপন করেছেন তাও এতে অল্প পৃষ্ঠাতে যে তা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। আমার মতে প্রতিটি বাঙ্গালিরই এই বইটি পড়া উচিত, এবং কি যারা ভারি ভারি তথ্যের জন্য বাংলার ইতিহাস পড়তে বিরক্তবোধ করেন তাদের জন্য এই বই সেই বিরক্ত কাটানোর মহৌষধ বলা যায়। স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যের আস্তে আস্তে অস্তমিত হওয়ার গল্প সবারই জানা উচিত, সেই সাথে জানা উচিত এইসব চরিত্রগুলোর কাউকেই সাধু ভাবা যায় না। 'মধ্যযুগের বাংলা' বাংলার ইতিহাস নিয়ে লেখা আমার প্রিয় বইগুলোর একটা হয়ে থাকবে।
বাংলার ইতিহাস হচ্ছে রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। যুগের পর যুগ রক্তক্ষরনের পর বাংলা এই অবস্থানে এসেছে। আসলে ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় যে বাংলায় রক্তক্ষয়ী ইতিহাস সবচেয়ে বেশি। বিশেষ ভাবে ইংরেজ শাসনের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত পুরোটা সময় নিজেদের অথবা শত্রুর সাথে মোকাবেলা করেই কাটিয়ে দিতে হয়েছে। . এই বইটি বেশ ছোট তবে তথ্য সমৃদ্ধ। কিন্তু লেখক এত তথ্যের সমন্বয় ঘটাতে গিয়েছে বেশ দ্রুত লয়ে চলে গিয়েছেন বলে আমি ধারণা করেছি। এই ধরনের বই বেশ বড় কলেবরে লেখা হয়ে থাকে। আর প্রতিটি পয়েন্ট বেশ সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা হয়। সমস্যা হচ্ছে লেখক এত দ্রুত ইতিহাসের পরিবর্তন দেখিয়েছেন যে পাঠক কিছুটা হলেও দ্বিধায় পরে যাবে। . কোন এক ঘটনার পর অন্য ঘটনার সম্পৃক্ততা বোঝাতে দুই তিন লাইনেই শেষ করে দিয়েছেন যা বেশ দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। এছাড়া বই সার্বিক দিক থেকে বেশ ভাল।
স্কুলে থাকাকালীন ইতিহাস ভিত্তিক বই গুলো পড়তে তেমন আগ্রহ পেতাম না, অথচ এ বইটি একনাগাড়ে শেষ করে ফেলেছি!!
লেখক এখানে মধ্যযুগের শাসন(১২০০-১৮০০ইং), বখতিয়ার খলজি হতে সিরাজ-উদ-দৌলা পর্যন্ত, সরল ভাষায় 'রাজ্য দখল ও শাসনামল' উপস্থাপন করেন।
শাসনাৃলের ধারাবাহিকতা থাকার, রাজ্যবিস্তারের উদ্দেশ্যে ধর্মপ্রচার, সিংহাসনের জন্য ধর্মান্তর, সিংহাসনের জন্য বাবা, ভাই কিংবা আত্মীয়েদর মধ্যে যুদ্ধ ইত্যাদি অনেক বিষয় ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়।
"সুশাসনের ব্যর্থতা যে জনগনের দুর্ভোগ আর শাসকের স্থায়ী গ্লানী ডেকে আনে, ইতিহাসের এই শিক্ষা থেকেও কেউই কিছু শেখে না।"
"কোন শাসনব্যবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। জোর করে কোন শাসনব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী করতে গেলে অন্তঃকোন্দল কিংবা বাইরের শত্রুর আক্রমণ কিংবা এই দুটোই সেই শাসনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলে।"
Sapiens পড়ার পর থেকে Humanaties এর বিষয়গুলোর প্রতি বেশ আগ্রহ তৈরী হয় যেগুলো এর আগে অবহেলা করে এসেছি। সেই কৌতুহল থেকে কিছু ইতিহাসের বই বড়া হয়েছে যার সবগুলোই ইংরেজিতে। বাংলায় সাধারণ পাঠকদের জন্য লেখা ইতিসের কিছু পড়তে গেলেই দেখা যায় প্রতিটি বাক্য জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয় ইত্যাদি আবেগে পরিপূর্ণ। মাশরুফ হোসাইনের ফেসবুক স্ট্যাটাসে বইটির খোঁজ পাই। তিনি বইটিকে তেল-চর্বিমুক্ত বলে দাবি করেন। সাথে সাথেই আর্ডার করে ফেলি।
তেল চর্বি একেবারে নেই তা নয়। তবে যেটুকু আছে সহ্য করার মত। ক্ষমতার কেন্দ্রের ঘটনা প্রবাহের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবস্থার দিকেও একটু নজর দিলে আমার ভাল লাগত। লেখকের কাছে এমন আরো বই এর প্রত্যাশা ও শুভকামনা রইল।
বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি চমৎকার তথ্যবহুল কিন্তু বাহুল্য বর্জিত বই। লেখক প্রাঞ্জল ভাষায় বাংলায় মধ্যযুগের ইতিহাস যেভাবে লিখেছেন তা একবারে পুরোটা না পড়ে শেষ করা মুশকিল। লেখায় মুন্সিয়ানার ছাপ স্পষ্ট। ভাল লেগেছে।
বেশ অনেকদিন সময় নিয়ে পড়লাম। ভালোই লাগছে। অনেক অজানা বিষয় জানলাম। ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ থাকলে পড়তে পারেন। তবে যেহেতু এটা ঐতিহাসিক কল্পকাহিনি না, শুধুই ইতিহাস, সময় নিটে পড়াই ভালো হবে।