ছয় মাসের ব্যবধানে দুই দুটো খুন হলো। মৃতদেহে রেখে যাওয়া হয় কিছু অদ্ভূত চিহ্ন। খুন দুটো কি একই মানুষ করেছে, নাকি ভিন্ন মানুষ? তদন্তে নামলো পিবিআই-এর হোমিসাইড সেকশনের ইন্সপেক্টর মুহিত এবং এসআই ইরান। তাদের সবারই গোপন অতীত আছে যেটা কেউ জানে না। খুন দুটোর অদ্ভূত প্রকৃতি মুহিত এবং ইরানকে দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দিলো। তাই তারা সাহায্য নিতে বাধ্য হলো ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্ট ড. জামিউল পাশার। ক্রমেই জট পাকাতে লাগলো রহস্য। মুহিত, ইরান এবং ড. পাশা কি পারবেন এই জটিল রহস্যের সমাধান করতে?
এক বীভৎস মৃত্যু। একটি শিশুর অপহরণ; অথচ প্রাইম সাসপেক্ট তখন পুলিশের হাতে। আরও একটি বীভৎস মৃত্যু— যার সঙ্গে প্রথমটির মিল।আছে, আবার নেইও। ভাঙাচোরা অথচ সৎ পুলিশ অফিসার মুহিত এবং তার নতুন পার্টনার ইরান মরিয়া হয়ে খুঁজতে লাগল অপরাধীদের। তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন নামকরা ক্রিমিনলজিস্ট জামিউল পাশা। তারপর কী হল?
আমার পড়া, সাম্প্রতিক কালের শ্রেষ্ঠ ক্রাইম থ্রিলার হিসেবে এই বইটিকে চিহ্নিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করছি না। এর কারণ~ প্রথমত, অসম্ভব গতিময় এই উপন্যাস পড়া শুরু করলে মাঝপথে ছেড়ে ওঠা শুধু কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভব। 'থ্রিলার' বিশেষণটিকে যথার্থ বলে প্রমাণ করেছে এটি। দ্বিতীয়ত, লেখার ভাষা অত্যন্ত সহজ— ক্ষেত্রবিশেষে সুললিত, আবার পরিস্থিতি অন্যরকম হলে ক্রূর। তৃতীয়ত, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার তখনই উপভোগ্য হয়, যখন বিশ্বাসযোগ্য চরিত্রদের মনের আলোছায়া দিয়েই ঔপন্যাসিক আমাদের বাধ্য করেন কাহিনির গভীরে ঢুকে ঘটনাক্রমকে অনুসরণ করতে। এখানে সেটাই হয়েছে। বইয়ের প্রচ্ছদটি ভারি সুন্দর। ছাপা ও বাঁধাই চমৎকার হলেও বানানের অবস্থা শোচনীয়; পরবর্তী সংস্করণে সেগুলো শুধরে নিলে ভালো হয়। মুহিত ও ইরানের পরবর্তী অনুসন্ধানের কাহিনি পড়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলাম।
ছয় মাস আগে হওয়া খুনের অপরাধীকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পিবিআইয়ের দুই গোয়েন্দা মুহিত এবং ইরান। ৬ মাস পর যখন একই ধরণের অদ্ভুত প্রকৃতির আরেকটা খুনের ঘটনা ঘটলো তখন বেশ স্বাভাবিকভাবেই তারা ধরে নিয়েছিল এটা একই লোকের কাজ। কিন্তু ফরেনসিক জানালো দুটো ঘটনা ভিন্ন দুই খুনীর কাজ। দ্বিধান্বিত দুই গোয়েন্দা সাহায্যের আশায় হাত বাড়ালো বিখ্যাত মনোবিদ ড. জামিউল পাশার দিকে। রহস্য সমাধানে শুধু খুনী নয়, ফিরে যেতে হবে তাদের সকলের ফেলে আসা অতীতে।
বইটা শেষ করে প্রথম যে কথাটা মাথায় এসেছিল, তা হলো বহুদিন পর কোনো মৌলিক থ্রিলার পড়ে এতো তৃপ্তি পেলাম। এমনকি শেষ কবে কোনো মৌলিক থ্রিলার পড়ে এতোটা মুগ্ধ হয়েছি তা জানতে আমাকে গুডরিডসের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। বইপাড়ায় আমার একটা দূর্নাম আছে মৌলিক থ্রিলারের সমালোচনা করার। কিন্তু এই বইটা আমাকে কোথাও সেই সুযোগটুকু দেয়নি। বইটা সাজানো হয়েছে তিন ভাগে। আমি রিভিউটাও সেভাবেই সাজানোর চেষ্টা করবো।
দ্য ফার্স্ট কেস
শুরুতেই আমরা পরিচিত হই পিবিএর তুখোড় গোয়েন্দা মুহিতের সাথে। তার একটা ধোঁয়াশাময় অতীত রয়েছে। যে অতীতের কারনে কর্মস্থলে বেশ কঠিন একটা সময় পার করছে সে। এরই মাঝে তার পার্টনার হিসাবে দেয়া হয় ইরানকে, সদ্য একাডেমি থেকে বের হওয়া এক তরুণ। যে নিজেও একটা বিশৃঙ্খল অতীত পিছনে ফেলে এসেছে। ঢাকার এক ফ্ল্যাটে খুবই নৃশংস এবং ভয়াবহতার সাথে খুন করা হলো এক নারীকে। মুহিত এবং ইরানের কাঁধেই এসে পড়লো সেই খুনের তদন্তভার। এই খুনটার বর্ণনা এতোটাই ভয়াবয় এবং বিদঘুটে যে পড়তে গিয়ে আমার গা গুলিয়ে আসছিল। তবে সেটার দরকার ছিল। লেখকের কল্পনা শক্তির প্রশংসা করতে হয় এ জায়গায়। দেশী বিদেশী এতো থ্রিলার পড়ার পরেও এমন অদ্ভুত কিছু এর আগে পড়া হয়নি আমার। এরপর যথারীতি চলে তদন্ত প্রক্রিয়া। একের পর এক জিজ্ঞাসাবাদ, সূত্র, ধাওয়া আর বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝেই অপহৃত হয়ে যায় ছোট্র এক শিশু। তদন্তে চলে আসে নতুন মোড়। খুবই গোছানো একটা তদন্ত প্রক্রিয়া দেখিয়েছেন লেখক। ভিকটিমের জীবনের অনেক অতীতে গিয়ে খুঁজে এনেছেন সূত্র। তবুও দুই গোয়েন্দা যখন জমাট রহস্যের জালে আটকা, তখন তার সাইকোলজি বোঝার জন্য তারা সাহায্য চায় ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্ট ড. পাশার কাছে।
সৃষ্টির সূচনায় অ্যাডাম এবং ইভ ছিলেন স্বর্গে। বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও ইবলিশের প্ররোচনায় তারা নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেললেন। আমাদের দেশে তা গন্ধম ফল নামে জানা হলেও, পবিত্র কোরআন কিংবা কোনো ধর্মগ্রন্থেই কিন্তু সেই ফলের নাম উল্লেখ নেই।
সৃষ্টির শুরুর এই ধর্মীয় তত্ত্বের সাথে খুব চমৎকারভাবে ক্রিমিনালের সাইকোলজি ব্লেন্ড করেছেন লেখক। এই পর্বের মূল কালপ্রিটের অবয়ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাঠকের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছেন লেখক। শেষ পর্যন্ত সকল সূত্রমতে তারা যখন আসল অপরাধী পর্যন্ত পৌছায়, ততক্ষণে গা ঢাকা দিয়েছে সেই অপরাধী। যদিও আমার শুরু থেকেই সন্দেহ হচ্ছিলো এই লোককে, তবুও যেভাবে পুরো প্লটটা নিয়ে এগিয়েছেন লেখক, তাতে করে অনুমান মিলে গেলেও একবিন্দু খারাপ লাগেনি। তেমন কোনো মেজর টুইস্ট না থাকলেও তাই গল্পের গতি, রহস্যের তীব্রতা, দুই গোয়েন্দার মানসিক টানাপোড়েন সব মিলিয়ে অত্যন্ত সুখপাঠ্য হয়েছে প্রথম পর্ব।
দ্য সেকেন্ড কেস
সম্পূর্ণ নতুন একটা সেটিংস এর উপর দ্বিতীয় পর্ব সাজিয়েছেন লেখক। আগের পর্বে ছিল বাড়িওয়ালা, ভাড়াটিয়া, প্রেম, ভালোবাসা আর বিবলিক্যাল রেফারেন্স টাইপ সিচুয়েশন। আর এই পর্ব এগিয়েছে পুরোটাই কর্পোরেট লেভেল ধরে। এখানে উঠে এসেছে বন্ধুত্ব, মাদক, মাফিয়া, ক্ষমতা, দম্ভ, আর হিংসা। নিজ জমিতে মাথায় চাপাতির আঘাত নিয়ে খুন হলেন অজিত নামের এক লোক। সমস্যা হলো তার খুনের স্থানেও পাওয়া গেল সেই আদিম পাপের ফল। কিন্তু কোনোভাবেই আগের খুনের সাথে এটার কোনো যোগসূত্র বের করতে সক্ষম হয় না মুহিত এবং ইরান। এই পর্বটা এগিয়েছে আরো কিছু পুলিশ প্রসিডিউরাল সহ আরো দ্রুত গতিতে। এই পর্বে অবশ্য বেশ ভালো রকমের একটা টুইস্ট দিয়েছেন লেখক। সাথে যেভাবে এবারের খুনের ব্যাপারটারকে সাথে নিয়ে সাব-ইন্সপেক্টর ইরানের অতীতের কালো অধ্যায়গুলোকে সামনে এনেছেন, সেটার জন্য আলাদা সাধুবাদ প্রাপ্য তিনি। খুবই চমৎকারভাবে মূল তদন্তকে আলোতে রেখেই দুই গোয়েন্দার অতীতের সকল অজানা বিষয়গুলোকে খোলাসা করেছেন। এই পর্বে খুনী অবশ্য ধরা পড়ে যায় সহজেই। কিন্তু এখনো অজানা রয়ে গিয়েছে অনেক প্রশ্নের উত্তর।
দ্য সাইকোলজিক্যাল টার্নস
আগের পর্বের শেষের দিক থেকে হয়ে আসা সন্দেহটা এই পর্বের প্রথম চ্যাপ্টার পড়েই বাস্তবে পরিণত হয় আমার জন্য। আমি বুঝে যাই সবকিছুর আড়ালে কে কলকাঠি নেড়েছে। এবার শুধু ধরা পড়ার অপেক্ষা। কিন্তু আসলেই কি আমি যা বুঝেছি সেটাই বাস্তব? পরের কিছু চ্যাপ্টার পড়তে গিয়ে এমনই একটা অনুভূতি তৈরী হয় আমার মাঝে। শেষ পর্যন্ত ধারণাটা মিলে গেলেও একদম শেষ পাতাতেও টুইস্টের একটা ধাক্কা দিয়েছেন লেখক। বইয়ের শেষটা নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট বলবো না। তবে অনেক অনেক মৌলিক থ্রিলার লেখকের তুলনায় অবশ্যই ভালো একটা এন্ডিং দিয়েছেন তিনি। হাসপাতালের অংশটুকুতে মুহিতের কাছ থেকে আরেকটু বেটার কিছু আশা করেছিলাম। যেভাবে তারা মূল বিপদটুকু পাশ কাটিয়েছে সেটা অবশ্য বেশ চমকপ্রদ। সব মিলিয়ে আরেকটু বেশী সময় ধরে সাসপেন্স থাকলে ভালো হতো, তবে আমি হতাশ নই।
কেনো বইটা অন্য অনেক মৌলিক থ্রিলারের চেয়ে এগিয়ে?
প্রথমেই বলতে হয় লেখকের লিখনশৈলীর কথা। চমৎক���র একটা প্লট সাজানোর পাশাপাশি, সেটাকে পরিনতি দেয়ার ক্ষেত্রেও দারুণ ভাষার ব্যবহার এবং সুন্দর শব্দচয়ন করেছেন তিনি। শুরুর দিকে ইংরেজি শব্���ের অধিক ব্যবহারে একটু খারাপ লাগলেও, পরবর্তীতে বাংলা ভাষার চমৎকার উপস্থাপনা সেটাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। এরপর প্রশংসা করতে হয় দুটা আলাদা খুনের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা দুইটা পরিবেশে সৃষ্টি করার ব্যাপারটার। খুনগুলোর বিভৎসতা, এর রহস্য এগুলা তো বইয়ের প্রাণ। পাশাপাশি যেভাবে চরিত্রগুলোর ব্যাকস্টোরি টেনেছেন সেটাও অনেক ভালো লেগেছে। প্রতিটা চরিত্রের ব্যাকস্টোরির বেশ ভালো পরিমাণে গুরুত্ব রয়েছে বইতে। আর এই সবকিছুই করেছেন গল্পের ফ্লো'টাকে একবিন্দু নষ্ট না করে। মেদহীন কিন্তু যতোটুকু ডিটেইলস দেয়া দরকার ঠিক ততটুকুই দিয়েছেন। এছাড়াও পুলিশ প্রসিডিউরাল ক্রাইম থ্রিলার হিসাবে শুরু করা বইটাকে যেভাবে শেষে গিয়ে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে পরিণত করেছেন সেটার জন্যও উনাকে বাহবা দিতে হয়।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৯.৫/১০ ( বাংলা মৌলিক থ্রিলারের হিসাবে নিঃসন্দেহে মাস্টারপিস। হাইলি রেকমেন্ডেড এবং অবশ্যই মাস্টরিড সকল থ্রিলার পাঠকদের জন্য )
প্রোডাকশন: ২০২১ সালে বের হওয়া বইটির প্রোডাকশন এভারেজ টাইপ। তবে বইটাতে তেমন কোনো বানান ভুল চোখে পড়েনি। তাই বলা যায় প্রকাশনী বেশ যত্ন নিয়েই বের করেছে বইটা। প্রচ্ছদটা আমার অত্যন্ত ভালো লেগেছে। মিনিমাল কিন্তু বেশ ডার্ক একটা ভাইব আছে।
পুনশ্চঃ তাকরীম ফুয়াদ নিঃসন্দেহে আমার প্রিয় একজন লেখকে পরিণত হয়েছেন। এর আগে উনার ইনিগমা পড়েছিলাম সেটাও বেশ ভালো।লেগেছিলো। এই লেখককে নিয়ে বইপাড়ায় আমি একদমই আলোচনা দেখি না। অথচ উনি এরচেয়ে অনেক বেশী আলোচনা ডিজার্ভ করেন। হাইপ যদি কাউকে নিয়ে করতে হয় তাহলে ইনাকে নিয়েই করা উচিত। খুব কম মৌলিক থ্রিলার লেখক আমি পেয়েছি যারা শেষে এসে তালগোলা না পাকিয়ে সুন্দরভাবে বইয়ের এন্ডিং টানতে পেরেছেন। এই লোক দুইটা বইয়েই সেই কাজটা করেছেন অত্যন্ত সুন্দরভাবে। বৃত্তবন্দী পড়েছি বন্ধুর কাছ থেকে ধার এনে। কিন্তু নেক্সট টাইম আমি যেদিনই কোনো বইয়ের পার্সেল নেই না কেনো এই বইটাও সেই তালিকায় থাকবে। এটা কিনতে হবে এবং কালেকশনে রাখতে হবে টাইপ বই।
🔮 বইয়ের নাম: বৃত্তবন্দী 🔮 লেখক: তাকরীম ফুয়াদ 🔮 প্রকাশনী: ঈহা প্রকাশ 🔮 প্রচ্ছদ: সুজন 🔮 পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৮৭ 🔮 বর্তমান মূদ্রিত মূল্য: ৪৪০ টাকা
We are living in the era of premeditation and the perfect crime. Our criminals are no longer helpless children who could plead love as their excuse. On the contrary, they are adults and the have the perfect alibi: philosophy, which can be used for any purpose- even for transforming murderers into judges. — Albert Camus - বৃত্তবন্দী - ইরান, পিবিআই এর হোমিসাইড সেকশনে সদ্য যোগ দেয়া এক তরুণ এসআই। ডিপার্টমেন্টের বেশ নাম কামানো অফিসার মুহিতের সহকারী হিসেবে যোগ দেয় সে। ইরানের জয়েনিং এর প্রথম দিনেই তাদের হাতে এসে পড়ে এক চাঞ্চল্যকর কেস।
তাদের বস সিরাজ ভুইয়ার কথা মোতাবেক তারা এক ফ্লাটে গিয়ে দেখতে পারে বিভৎস এক হত্যাকান্ড। এই হত্যাকাণ্ডের সুলুক সন্ধানে নেমে পড়ে তারা, তাদের সাথে যোগ দেয় অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. জামিউল পাশা। এখন কেনই বা এমন বিভৎস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে? এই হত্যাকান্ডের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে কারা? মুহিত আর ইরান কি পারবে এই রহস্যের সমাধান করতে? তা জানতে হলে পড়তে হবে লেখক তাকরীম ফুয়াদ এর মার্ডার মিস্ট্রি ঘরানার উপন্যাস "বৃত্তবন্দী"। - "বৃত্তবন্দী" বইটি মূলত মার্ডার মিস্ট্রি এবং পুলিশ প্রসিডিউরাল ভিত্তিক উপন্যাস, এই উপন্যাসের শেষ দিকে অবশ্য কিছুটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের আবেশও রয়েছে। তিন খন্ডের এই বইয়ের প্রথম খন্ডটি গতানুগতিক পুলিশ প্রসিডিউরাল ভিত্তিক বইই মনে হচ্ছিল, দ্বিতীয় খন্ডেও কিছুটা খাপছাড়া লেখনশৈলী লক্ষ্য করলাম, তবে বইটির ৩য় খন্ডটি বেশ দুর্দান্ত লাগলো প্রথম দুই খন্ডের থেকে। শেষদিকের কিছু টুইস্ট বেশ প্রেডিক্টেবল লাগলেও যেভাবে সেগুলোর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তা পড়তে বেশ ভালোই লাগলো। - "বৃত্তবন্দী" বইয়ের মূল দুই প্রোটাগনিস্ট এর ক্ষেত্রে মুহিতের তুলনায় ইরান বেশি ফোকাস পেয়েছে মনে হলো। তাদের থেকে বেশ কয়েকজন পার্শ্বচরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড বেশি ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে। বইয়ের কাহিনি অনুসারে যেভাবে সাসপেন্স তৈরি করা হয়েছে শেষদিকে এসে তার সমাপ্তি ভালোভাবেই দেয়া গেছে। বইয়ের নামকরণ এবং তার ব্যাখ্যাও বেশ সন্তোষজনক। - "বৃত্তবন্দী" বইয়ের বাহ্যিকদিক থেকে প্রোডাকশন বেশ ভালো। বইয়ের প্রচ্ছদে অবশ্য মনে হয়েছে আরো কাজ করা যেতে পারতো। তবে বইয়ের সম্পাদনা তেমন সন্তোষজনক নয়, বইতে টাইপো এবং বানান ভুল বেশ ভালো পরিমাণেই রয়েছে। বইটির প্রকাশনী সামনে এদিকটি খেয়ালে রাখবেন আশা করি। - এক কথায়, বাংলা মৌলিক ক্রাইম থ্রিলারে ভালোমানের এক সংযোজন হচ্ছে "বৃত্তবন্দী"। যারা মৌলিক ক্রাইম থ্রিলার বা পুলিশ প্রসিডিউরাল ভিত্তিক বই পড়তে পছন্দ করেন তারা বইটি পড়ে দেখতে পারেন। লেখকের পরবর্তী বইয়ের জন্য শুভকামনা রইলো।
পাপ... পাপের শুরু কবে থেকে বলতে পারবেন? যদি ধর্মীয় দিক বিবেচনা করি তাহলে আদি মানব হযরত আদম (আঃ) ও আদি মানবী হাওয়া (আঃ) যখন শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহ তাআ'লার আদেশ অমান্য করে নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করেন পাপের সূচনা তখন থেকেই। পাপের শাস্তিস্বরূপ তাঁদের পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়... তারপরই মানবজাতির সৃষ্টি। এই ঘটনা কমবেশি আমরা সবাই জানি। কিন্তু মনে কি কখনও প্রশ্ন জেগেছে নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের মাধ্যমে মানুষের জিনোমেই আসলে পাপ ঢুকে গেছে কিনা! পাপী আমরা সকলেই, কেউ বেশি তো কেউ কম। আমাদের পাপের হিসাব করবেন আমাদের রব, এমনটাই জানি আমরা কিন্তু যদি সেই হিসাব করা শুরু করে রক্তমাংসের গড়া কোনো মানুষ তাহলে সেই হিসাব কি নিরপেক্ষ বলা যায়? মোরালিটির একটা স্ট্যান্ডার্ড সমাজ- পরিবার ছোট থেকেই আমাদের শেখায়। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে কি একই হয়? আদোও কেউ কি সেভাবেই চিন্তা করে?
❝নারী ও পুরুষ একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। প্রকৃতির তৈরি জুড়ি। তারা দুইয়ে মিলে এক। আবার একের ভেতর দুই। তুমি আর আমি। আমি আর তুমি।❞
মুক্তা ফ্লাটে যাওয়ার পর থেকে একবারও বের হয়নি, কোনো সাড়াশব্দও নায়। নুরুউদ্দিন সাহেব বিরক্ত হয়ে ওঠেন নতুন ভাড়��টিয়ার উপর। আসতে না আসতে কি জ্বালা! মিস্ত্রি দিয়ে দরজা ভেঙে ভিতরে যা দেখেন... জীবনেও ভুলতে পারবেন না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এতো বিভৎস কাটাছেঁড়ার পর হৃদয়পিন্ডের শূন্য কোটরে দেখা যাচ্ছে রক্তেমাখা সবুজ একটা আপেল!!!
মাসখানেক পরও পিবিআইয়ের ইন্সপেক্টর মুহিত ভুলতে পারে না মুক্তা হত্যা রহস্য! দুঃস্বপ্ন আরও অনেকেরও।কিন্তু মুহিত ভিতর থেকে পুড়তে থাকে এই কথা ভেবে মুক্তার ছোট ছ��লে রেশানকে নিয়ে উধাও হয়েছে একজন বিকৃত মস্তিষ্কের কেউ! পুরাতন ক্ষতে আবার ক্ষত সৃষ্টি হয় যখন আবার এক বিভৎস লাশের গলায় পাওয়া যায় সবুজ আপেল! কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী খুনী এবার ভিন্ন কেউ। কিন্তু কীভাবে সম্ভব একই চিন্তাধারার দুজন খুনী!!! সবুজ আপেলের রহস্যই বা কী?
❝পারফেক্ট ক্রাইম❞ কী? সোজা কথায়, যে ক্রাইমকে স্লভ করা সম্ভব না। আবার এমনও বলা যায় যে, অপরাধী কে জানা আছে কিন্তু অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব না। তো আবার এটাও বলা যায়, অপরাধ হয়ে গেছে কিন্তু কেউ টেরই পায়নি। তবে একটা প্রশ্ন; অপরাধী যখন নিজেই জানে না বা বুঝে না যে সে অপরাধ করেছে তাহলেও কি সেটা পারফেক্ট ক্রাইম না? মোটিভ পাওয়া না গেলে অপরাধীকে কি এতো সহজে ধরা সম্ভব? পারফেক্ট ক্রাইম নিয়ে কথা এজন্যই বললাম কারণ বইয়ের প্লট পারফেক্ট ক্রাইম ও পাপের থিওরির উপর বেজড। ক্রাইম ও পারফেক্ট ক্রাইমের মধ্যে পার্থক্য বইটা পড়েই ভালোমতো বুঝেছি। সাইকোলজি, পুলিশ প্রসিডিওর, থিওরি দিয়ে লেখক দারুণ একটা বই লিখেছেন।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাহিনী ধীরে এগিয়েছে। কারণ অবশ্য ডিটেলিং তবে আমার এটাই ভালো লেগেছে। খুন, খুনি, সাইকোলজিক্যাল টার্ম, পুলিশি প্রসিডিওর, চরিত্রায়ন, ব্যাকস্টোরি সুন্দরভাবে একে অপরের সাথে মার্জ করেছে। ইরানের ব্যাকস্টোরি যেভাবে ধীরে ধীরে খোলাসা করা হয়েছে মুহিতেরও ওভাবে হলে ভালো হতো। কেমন জানি তাড়াহুড়োর একটা ছাপ আছে। বইয়ের কাহিনী তিন অংশে দেখানো হয়েছে। প্রথম দু'অংশের রহস্যের জবাব মিলবে শেষ অংশে। তবে এক জায়গায় একটু অসংগতি মনে হয়েছে। যখন শাহজাদ হুট করে এতো বছরের রহস্য ইরানকে বলে দেয়। কাউকেই যখন বলে নায়, বলতে চায়ও না কিন্তু খুব একটা ক্লোজও না এমন একজনকে হঠাৎই নিজের এতো বড় সিক্রেট বলে দেওয়াটা কেমন জানি! আরেকটা জিনিসের কথা বলতে চাই সেটা হচ্ছে ভিক্টিমদের ট্রিগার পয়েন্ট। ট্রিগার পয়েন্ট দিয়ে কোনো তথ্যকে মস্তিষ্কের কোনো অংশ বন্ধ করা যায় আবার নিয়ন্ত্রণও। কিন্তু ভিক্টিমদের ট্রিগার পয়েন্ট কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এটা নিয়ে তেমন পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়নি। কন্ট্রোলারের জীবন- মৃত্যুর সাথে ভিক্টিম সরাসরি কীভাবে জুড়ে যাচ্ছে? খটকাগুলো বাদ দিলে বহুদিন মনে রাখার মতো একটা বই।
বইয়ের প্রুফ রিডিংয়ে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। চরিত্রের নাম, শব্দ- বাক্যে বেশ কিছু অসংগতি আছে। বাক্যে শব্দ মিসিংও চোখে পড়েছে। ওভারঅল প্রোডাকশন ভালো বলা যায়।
একটা মজার প্রশ্ন করতে চাই। যারা বইটা পড়েছেন তারা বুঝতে পারবেন। প্রশ্নটা হলো: ভিক্টিম- ১ ও ভিক্টিম- ২ কে কন্ট্রোল করছে কন্ট্রোলার- ১। আবার কন্ট্রোলার- ১ কে কন্ট্রোল করছে কন্ট্রোলার- ২। কন্ট্রোলার- ২ এর কথামতোই কিন্তু কন্ট্রোলার- ১ নিজের অজান্তেই ভিক্টিম- ১ ও ২ কে দিয়ে অপরাধ করিয়েছে। তাহলে অপরাধের পাপ আসলে কোন কন্ট্রোলারের উপর বর্তায়? কন্ট্রোলার- ২ শেষে বলছে সে মাত্র একজনকে খুন করেছে। আদোও কি তাই?
তিন ভাগ বইয়ে- স্ল্যাশার থ্রিলার দিয়ে শুরু, রিভেঞ্জ জনরা হয়ে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে শেষ হলো। শেষে একটু প্যারাডক্সিকাল! ভিক্টিম ১,২ কাজ করলো কন্ট্রোলার ১ এর মাধ্যমে! শেষ পেজে আবার পেলাম কন্ট্রোলার ২ মহাশয় কে, কন্ট্রোলার ২ পারফেক্ট ক্রাইম করলো,স্ত্রী মেয়ের প্রতিশোধ নিলো সবার অগোচরে! তারাহুরো ফিনিশিং টার জন্য ৫ তারা দিতে পারলাম না!
'Sometimes the hardest thing about committing the perfect crime can be keeping your genius to yourself.' Sarah Lacy
ছয় মাস ব্যবধানে দুই দুটো খুন হলো। মৃতদেহে রেখে যাওয়া হয় কিছু অদ্ভূত চিহ্ন। খুন দুটো কি একই মানুষ করেছে, নাকি ভিন্ন মানুষ? তদন্তে নামলো পিবিআই-এর হোমিসাইড সেকশনের ইন্সপেক্টর মুহিত এবং এসআই ইরান। তাদের সবারই গোপন অতীত আছে যেটা কেউ জানে না। খুন দুটোর অদ্ভুত প্রকৃতি মুহিত এবং ইরানকে দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলো দিলো। তাই তারা সাহায্য নিতে বাধ্য হলো ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্ট ড.জামিউল পাশার।
ক্রমেই জট পাকাতে লাগলো রহস্য। মুহিত,ইরান এবং ড.পাশা কি পারবেন এই জটিল রহস্যের সমাধান করতে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া ---------------------------- আর পাঁচটা সাইকো থ্রিলারের মতই এতেও রয়েছে খুন, জখম ও অন্যান্য সাইকোলজিক্যাল টার্ম। তাহলে বইটার বিশেষত্ব কোথায়? সেটাই জানানোর চেষ্টা করছি।
● প্লট হঠাৎই নির্জন ঘরে পাওয়া গেল একজন নারীর মৃতদেহ । নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে তাকে। এতটাই বীভৎস পরিণতি দেওয়া হয়েছে লাশটাকে যে সেটা দেখে খোদ পিবিআই অফিসার ইরান ও মুহিতের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। কোনো ধারালো ছুরি দিয়ে মেয়েটার কণ্ঠনালী চিঁড়ে খাদ্যনালী টেনে বের করে ফেলা হয়েছে , নগ্ন দেহটার বুকের মাঝখান থেকে নাভী অবধি ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটা হয়েছে । এরপর কোরবানীর পশুর চামড়া যেভাবে ছিলে ফেলা হয় সেভাবে মেয়েটার বুক ও পিঠের চামড়া ছেলা হয়েছে ; বৃহদন্ত্র বাইরে বেরিয়ে এসেছে। আর সুনিপুণ হাতে কেটে নেওয়া হয়েছে হৃৎপিণ্ড ; ফাঁকাস্থানে ঠেসে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে সবুজ রঙের একটা আপেল। এতটা নৃশংসভাবে কে বা কারা খুন করছে? কেন করছে? আর ক্ষতস্থানে আপেল ই বা কীসের নিদর্শন?
মোট তিন খন্ডে ভাগ করা হয়েছে প্লটটা। প্রতিটি খণ্ড ই যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং।
● চরিত্রায়ন ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে লেখক প্রায় শতভাগ সফল। প্রতিটি চরিত্র খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। এমনকি পার্শ্ব চরিত্রগুলোও যথেষ্ট উপভোগ্য লেগেছে আমার কাছে। আর এজন্য লেখক বিশেষ ধন্যবাদ পাবেন। শেষ কবে এতটা নিখুত চরিত্রায়ন পড়েছি মনে নেই (সম্ভবত জুবায়ের আলমের শব্দযাত্রা লেখক সংঘে শেষবার এমনটা পেয়েছি) ।
● ভাষাশৈলী ও স্টোরিটেলিং এখানেও লেখক দারুণ কাজ দেখিয়েছেন। বইটির ভাষা সাবলীল ছিল এবং লেখকের গল্প বলার ভঙ্গিও যথেষ্ট উপভোগ্য।
● গল্পের আবহ তৈরি ও বর্ণনা বইটির সবথেকে প্লাস পয়েন্ট সম্ভবত এটাই। লেখকের বর্ণনাভঙ্গি খুব বেশি ভলো লেগেছে আমার। রীতিমত গল্পে প্রবেশ করেছিলাম বইটা পড়তে পড়তে। প্রথম খণ্ডে বর্ণনাশৈলী এতবেশী বাস্তবিক যে খুনের বিবরণগুলো পড়ে রীতিমত ভয় পেয়েছি। এছাড়া নিতান্ত একপেশে ভাবে খুন ও খুনীকে ঘিরে গল্প এগোয়নি। মুহিতের মনস্তত্ত্ব, ইরানের দার্শনিক জীবনভাবনা সহ নানাদিকে প্লটের শাখাপ্রশাখা বিস্তার লাভ করেছে। ফলে গল্পটা খুব বেশি বাস্তবিক লেগেছে আমার কাছে।
● ছন্দপতন গল্প শুরু থেকেই গতিশীল ছিল। প্রথম খণ্ড রীতিমত গোগ্রাসে গিলেছি। দ্বিতীয় খণ্ডে এসে কিছুটা ছন্দপতন লক্ষণীয়। পাশাপাশি সাময়িক তাড়াহুড়োর ছাপ আছে দ্বিতীয় খণ্ডে। তবে সেটা তৃতীয় খণ্ডে গিয়ে বেশ ভালোমতনই ওভারকাম করেছেন লেখক। তৃতীয় খণ্ডটার অনেকাংশ জুড়েই ছিল এক্সপ্লেনেশন। কাব্যিক ভাষায় নামকরণ করলে তিনটি খণ্ডের এমন নামকরণ করা চলে - উদ্ভব, সংকট, সমাধান।
● পরিণতি ও লজিক বইটির তৃতীয় খণ্ড পুরোপুরি সাইকোলজিক্যাল টার্মে ঠাসা। তবে ভালো বর্ণনাভঙ্গির কারণে তা পড়ে মোটেই বিরক্ত হইনি। বরং ক্রমশ সাসপেন্স বাড়িয়ে লেখক বইটির পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়েছেন। গল্পের পরিণতি কিছুটা অতিরঞ্জিত লেগেছে। তবে শেষ পৃষ্ঠার, শেষ প্যারার টুইস্টে রীতিমত চোয়াল ঝুলে গিয়েছে। পারফেক্ট এন্ডিং বোধ করি এমনটা ই হয়।
● প্রোডাকশন প্রোডাকশন নিয়ে কিছুটা অভিযোগ আছে। তবে তার আগে একজন মানুষের প্রশংসা না করলেই নয়। তিনি হলেন প্রচ্ছদশিল্পী সুজন। প্রচ্ছদের কালার গ্রেডের সাথে এলিমেন্টের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মত। ঈহাপ্রকাশের পৃষ্ঠার মান ও বাঁধাই বরাবরের মত এবারও বেশ ভালো। তবে বইতে বেশ কিছু বানা ভুল চোখে পড়েছে। কিছু বানান ভুলে রীতিমত মেজাজ খারাপ হয়েছে আমার। যেমন : কষ্ট( পৃষ্ঠা - ৯৪), দৃষ্টি(১৪০), সৃষ্টি (১৭৩) - একই ধাচের শব্দের বানান ভুল রয়েছে। এছাড়া 'শাহাদাত' বানানটা সম্ভবত মোট দুইবার 'শাহাদ' লেখা হয়েছে। তারপর ৭৫ তম পৃষ্ঠায় 'মনোভাবটালনরম' - এই শব্দের মানে কী সেটা প্রুফ রিডার রা ই বোধ করি ভালো বলতে পারবেন।
সব মিলিয়ে এই ছিল 'বৃত্তবন্দী' কথন। বাকিদের কথা আমি জানিনা তবে বৃত্তবন্দী বইটা মোটাদাগে আমার ভালো লেগেছে। আমার তরফ থেকে রেকমেন্ডেড। লেখকের জন্য রইলো শুভকামনা।
এক নজরে, বই : বৃত্তবন্দী লেখক : তাকরীম ফুয়াদ প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারী, ২০২১ প্রকাশনী : ঈহা প্রকাশ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৮৭ মুদ্রিত মুল্য : ৪৪০ টাকা ব্যক্তিগত রেটিং : ৫/৫
পারফেক্ট ক্রাইম! — বলে কি আদৌ কিছু হয়? একজন অপরাধী যখন অপরাধ করে, তার মনের মধ্যে নিশ্চয়ই ভয় কাজ করে। দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়। যত শক্ত মনের মানুষ-ই হোক না কেন, মনের উপর নিয়ন্ত্রণ হয়তো করা সবসময় সম্ভব হয় না। সেই থেকে অপরাধ করার সময় কোনো না কোনো ভুল হয়েই যায়। যার সূত্র ধরে অপরাধী পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া খুব বেশি সম্ভব।
কিন্তু যদি কোনো অপরাধ পারফেক্ট ক্রাইমের উদাহরণ হয়? চোখের সামনে অপরাধী থাকার পরও প্রমাণ করা যাচ্ছে না। কিংবা যে অপরাধ সংগঠিত হয়েছে, বা যার মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে— তার মূল পর্যন্ত পৌঁছানো যাচ্ছে না। একে কি বলে পারফেক্ট ক্রাইম? না-কি পারফেক্ট ক্রাইমের সংজ্ঞা ভিন্ন? কীভাবে একটি পারফেক্ট ক্রাইম সংগঠিত হয়? প্রশ্নটা মাঝেমাঝেই ভাবায়। সবচেয়ে বেশি ভাবায় পারফেক্ট টাইম বলে আদৌ কি কিছু আছে?
▪️কাহিনি সংক্ষেপ :
বেশ কিছুদিন আগের একটি ঘটনায় বিক্ষিপ্ত মুহিত। যে ঘটনা চাইলেও ভুলে থাকা যায় না। মনের মধ্যে এক ধরনের চাপ নিয়ে ঘোরাফেরা করছে। যা বদলে দিয়েছে পিবিআইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইনভেস্টিগেটর মুহিতের জীবন। মনের মধ্যে দানা বেঁধেছে সন্দেহ। যা তাকে কাজ করতে দিচ্ছে না। সহকর্মীদের সাথে এক ধরনের দুরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে অভিযোগের তীর ধেয়ে আসছে মুহিতের দিকে। কথা চলছিল বদলির। পিবিআই প্রধান, সিরাজ স্যারের আস্থাভাজন মুহিত কিছুদিনের ছুটি কাটিয়ে আবার কাজে ফিরেছে। কাজে ফিরেই আবিষ্কার করেছে নিজের নতুন সহকর্মীকে। সদ্য পিবিআইতে জয়েন করা ইরানের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে মুহিতের জানা নেই। অতীতের ভয় তাকে কুড়েকুড়ে খায়। ইরানের সাথেও কি এমন কিছু ঘটবে?
মুক্তা মেয়েটা সদ্য বাড়িভাড়া নিয়েছে। স্বামী–সন্তান নিয়ে থাকবে সে, এমনটিই কথা হয়েছে। যদিও বাড়ির মালিক এখনই স্বামীর দেখা পায়নি। হয়তো ব্যস্ততার জন্য দেখা মেলে না। একটু একটু করে জিনিসপত্র এনে নতুন বাড়ি গোছগাছ করছে। এমন-ই এক সময় সে ভাড়া বাড়িতে এসেছে। কিন্তু সময় পেরিয়ে যায়, মুক্তার দেখা মেলে না। মূলত গোছগাছ করে দ্রুতই বেরিয়ে যায় সে। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলেও,মুক্তা বেরিয়ে আসে না। এক চাপা উৎকণ্ঠায় বাড়ির মালিক বেশ কয়েকবার মুক্তাকে ডাকে। তবুও যেন মুক্তার সাড়া নেই। কিন্তু ঘর ভেতর থেকে বন্ধ। সাহস সঞ্চয় করে দরজা ভাঙা হয়। এরপর যা দেখা যায়, তা কোনো সুস্থ মানুষকে সুস্থ থাকতে দিবে বলে মনে হয় না!
নতুন সহকর্মী ইরানকে নিয়ে এমনই এক কেসে মনোনিবেশ করেছে মুহিত। কিন্তু লাশের অবস্থা বিশেষ সুবিধার না। এভাবেও মানুষ মেরে ফেলা যায়! কী বিভৎস! কন্ঠনালী পর্যন্ত চিড়ে গেলে হয়েছে, জরায়ু কেটে ফেলা হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হৃদপিন্ড নিখোঁজ। তার জায়গায় একটি আপেল শোভা পাচ্ছে। এই আপেলের রহস্য কী? কোনো মেসেজ? না-কি পাগলাটে খুনির রহস্যময় কাজ?
তদন্ত শুরু করল মুহিত আর ইরান। তদন্তের এক পর্যায়ে অনেক কিছুই জানা যায়। সন্দেহের তীর ধেয়ে যায় মুক্তার স্বামীর দিকে। একই সাথে দৃশ্যপটে আসে মুক্তার সাবেক প্রেমিকও। কার দায় এই খুনের পেছনে? ওদিকে কে বা কারা যেন তুলে নিয়ে গিয়েছে মুক্তার ছেলে রেশানকে। খুনের তদন্ত সমাপ্ত হয়নি, কোনো সূত্র নেই। এমন অবস্থায় একজন বাচ্চাকে হারিয়ে দিশেহারা মুহিত। বাচ্চাটার যদি কোনো ক্ষতি হয়। এই তদন্তে অনেক কিছু জানা যায়, যা বিস্ময়ের জন্ম দেয়! হতবাক করে দেয়। এমনও হয়! সবচেয়ে বিস্ময় এমন এক ফোনকল, যা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না মুহিত। ইরানকে নিয়ে ছুটে চলছে রহস্য সমাধানে। কিন্তু সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ যে মানুষের হাতে থাকে না। এমন এক রহস্য সমাধান করতে পারবে তো দুইজন?
ছয় মাস পেরিয়ে গেছে ইতোমধ্যে। চোখের পলকে কেটে যায় সময়। নিজের বাড়ির আঙিনায় খুন হয় অজিত নামের একজন। যার কন্ঠনালী চিড়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে আবারও আপেলের রহস্য। এই আপেল কীসের ইঙ্গিত করছে? আগের খুনের সাথে এই খুনের যোগসূত্র কী? কোনো সিরিয়াল কিলারের কাজ? মুহিত আর ইরান এবার ঝাপিয়ে পড়েছে। এবার আর খুনিকে ছাড়া যাবে না। যেভাবেই হোক, পাকড়াও করতে হবে ভয়ংকর এই খুনিকে।
এই খুনের সাথে মিশে আছে ইরানের অতীত। মিশে আছে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্তর্দ্বন্দ্ব। মুহিত আর ইরানের সাথে তদন্তে যুক্ত হয়েছে ক্রিমিনালোজিস্ট ড. জামিউল পাশা। এখানে মিশে আছে প্রতিশোধ, মানুষের মনস্তত্ত্বের অদ্ভুত খেল। যেখানে মানুষ নিয়ন্ত্রক হতে চায়, অন্যের উপর নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এই অসীম ক্ষমতা পেলে নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতে দ্বিধা করে না।
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
“বৃত্তবন্দী” বইটিকে এক কথায় বলা যায়, পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার। ক্রাইম থ্রিলার বললেও এক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবেও আখ্যা দেওয়া বোধহয় দোষের হবে না। দারুণ এক গল্প, গল্পের এগিয়ে যাওয়া, রহস্য, তদন্ত, চমক — সবকিছু যেন মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। অনেকদিন পর তৃপ্তি নিয়ে কোনো থ্রিলার উপন্যাস শেষ করলাম।
লেখক তাকরীম ফুয়াদের লেখা এর আগে পড়া হয়নি। প্রথম লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। বিশেষ করে লেখকের গল্প বলার ধরন বেশ পছন্দ হয়েছে। “বৃত্তবন্দী” বইয়ের বিচারে মূলত দুইভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে মুক্তার খুনের ঘটনা, আর দ্বিতীয়ভাগে অজিত। দুইটা ঘটনা আদতে আলাদা মনে হলেও পরবর্তীতে এক সুতোয় কীভাবে বাঁধা যায়, লেখক সেই কাজটি দক্ষতার সাথে করে দেখিয়েছে। এই দুইভাগের পাশাপাশি আরও একটি অলিখিত অংশ আমার নজরে এসেছে, যে অংশে লেখক একটু একটু করে রহস্যের যবনিকাপাত ঘটিয়েছেন। তবে লেখক যে কাজটি করে সফল হয়েছেন, তা পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখাতে।
ঘটনা অনেক ছিল, সেই সাথে লেখকের সমন্বয় সাধনের তারিফ করতে হয়। তদন্ত প্রক্রিয়া পুরোপুরি আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সংলাপ, দুই সহকর্মীর কথা বলার মাধ্যমে রহস্যের সুতো ছড়ানো, কিংবা জিজ্ঞাসাবাদের মতো ঘটনায় লেখক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আগেই বলেছি, লেখকের গল্প বলার ধরন আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। কিছু কিছু ঘটনার রেশ লেখক ধরে রাখতে পেরেছিলেন বেশ ভালোভাবেই। যেমন কোনো এক রহস্যের আভাস লেখক দিয়েছেন, কিন্তু তা তখনই খোলাসা করেননি। পাঠকের আগ্রহ ধরে রেখে দুই কি তিন ��ধ্যায় পর ঘটনার খোলসা করেছেন। এই বিষয়টা ভালো লেগেছে।
সবচেয়ে যে বিষয়টি আকর্ষণীয় লেগেছে সেটা হচ্ছে লেখকের বইয়ের মাঝে চমক ছড়িয়ে দেওয়া। একটা পর্যায়ে এসে আসল অপরাধী কে বোঝা যায়। আমি অন্তত ধারণা করতে পারি। কিন্তু তারপরও লেখক যেভাবে ঘটনাগুলো সাজিয়েছেন, একসময় এসে দ্বিধা কাজ করেছে। অপরাধী আগেভাগে ধরা পড়ার পরও লেখক সমাপ্তি টানেননি। গল্পের মাঝেও গল্প থাকে, সেই গল্পের রেশ ধরে লেখক চমকের পর চমক দিয়ে গিয়েছেন। শেষটা আরো বেশি চমকপ্রদ। শেষের আগে ধরা যায়নি কে আসল অপরাধী। কিংবা বলা ভালো, সত্যিই কি মূল অপরাধীর শাস্তি হয়েছে। না-কি সবটাই ভ্রম! একটি পারফেক্ট ক্রাইমের উদাহরণ।
বইয়ের সবটা ভালো হলেও কিছু ক্ষেত্রে আরেকটু ভালো হতে পারত। বিশেষ করে সংলাপের অংশ। একজন কেয়ারটেকার শুদ্ধ ভাষায় কথা বলছে, সেটা হজম করার মতো না। এটা হয়তো ঠিক, দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকলে শুদ্ধ ভাষা আয়ত্ত হয়। কিন্তু এমন কিছু শব্দচয়ন সংলাপের সময় লেখক উল্লেখ করেছেন, যেটা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। কথ্য ভাষা আর লেখ্য ভাষার কিছুটা পার্থক্য আছে, সেটা ধর্তব্য নিয়ে সংলাপ গঠন করলে কিছু অংশে পড়তে আরাম লাগত।
▪️চরিত্র :
“বৃত্তবন্দী”-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ চরিত্র। এই অংশ লেখক যেভাবে চিত্রায়ন করেছেন, বিষয়টা মুগ্ধ করার মতো। খুব যে বেশি চরিত্রের সমাবেশ বইতে ছিল এমন না, তদন্ত প্রক্রিয়া চলাকালে অনেক চরিত্রই হুট করে আসে। আবার প্রয়োজন মিটিয়ে হারিয়ে যায়। এমন কিছু চরিত্রের আনাগোনা বইতে ছিল। তারাও প্রয়োজন মতো যতটুকু দরকার, তেমন জায়গা পেয়েছিল। তবে লেখকের দুর্দান্ত কাজ ছিল মূল চরিত্রগুলো নিয়ে।
বিশেষ করে মুহিত আর ইরানকে লেখক পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। প্রতিটি মানুষ ভিন্ন, তাদের মন মানসিকতা ভিন্ন। তাদের প্রত্যেকের অতীত আছে। এই অতীতকে সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন লেখক। একই সাথে বর্তমানের যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, প্রশংসনীয়। লেখকের চরিত্র গঠনে মূল এই দুইটি চরিত্রকেই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না। একই কথা খাটে ড. জামিউল পাশাকে নিয়েও। দারুণভাবে চিত্রায়িত করেছেন লেখক। যে বিষয়টি পছন্দ হয়েছে, মুহিতকে লেখক অতিমানবীয়ভাবে উপস্থাপন করেননি। বরং একজন টিমম্যান হিসেবে দেখিয়েছেন, যেখানে ইরানের গুরুত্ব ছিল। ইরানকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে মুহিত কাজ করে গিয়েছে।
খল চরিত্রগুলোকেও সমানভাবে মূল্যায়ন করেছেন লেখক। ফলে তাদের জীবন, জীবনের অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে। কেন তাদের এই অপরাধ কর্ম, বুঝতে সেই বিষয়গুলো জরুরি ছিল। এই সমাজে প্রতিটি ঘটনা সংগঠিত হয় একটির সাথে আরেকটির সংযোগ রেখে। সেই সংযোগের সুতো কখনও অদৃশ্য থাকে বলে দেখা যায় না, কিন্তু একবার সঠিক সুতোয় টান পড়লে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কাকতালীয়, না অন্যকিছু?
বইটি মানুষের মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে। একটি চরিত্রকে বুঝতে তার মনের অভ্যন্তরে ঢুকতে হয়। এই কাজটি পারা যায় না বলেই আমরা মানুষ চিনতে ভুল করি। মানুষের জীবনে কিছু অধ্যায় থাকে, হয়তো অন্ধকার। কিংবা কোনক্ষেত্রে এটা আলোকিত। কারণ এই বিষয়টা আপেক্ষিক। আমাদের কাছে যা খারাপ, অন্যের কাছে তা ভালোও হতে পারে। ফলে মানুষ যখন কোনো কার্য সম্পাদন করে, সেটা তার অবচেতন মনে ভালোর প্রতিমূর্তি। এই মূর্তিকে নিয়ন্ত্রণ গেলে সেই মানুষটিকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করে? ঘুড়ি ওড়ানোর নাটাই কার হাতে থাকে, সেটাই যে বের করা সম্ভব হয় না।
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
বইটির নাম “বৃত্তবন্দী” কেন? এই প্রশ্ন বই পড়ার সময় বারবার মনের মধ্যে এসেছিল। কিন্তু উত্তর পাইনি। কিন্তু শেষে এসে মনে হয়েছে, এরচেয়ে যোগ্য নাম আর হয় না। এখানে লেখকের সার্থকতা। বানান ভুল তেমন চোখে না পড়লেও কিছু জায়গায় কী/কি-এর ব্যবহারে ভুল ছিল। দুয়েকটা ছাপার ভুল ছিল, যা গল্পের গতিপথে বাঁধা হয়নি।
সম্পাদনা আরেকটু ভালো হতে পারত। তাহলে সংলাপে যে কিছুটা দুর্বলতা ছিল, তা দূর করা সম্ভব হতো বলে মনে করি। বাঁধাই, প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে অভিযোগ করার কিছু নেই। প্রচ্ছদটাও ভীষণ পছন্দ হয়েছে। গল্পটাকে ধারণ করে? হয়তো…
▪️পরিশেষে, আমরা প্রত্যেকেই একটা বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাই। হারিয়ে যাই অতলে। কিন্তু বৃত্তের বাইরের কোনো পথ খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। যেন বন্দী দশায় হারিয়ে যেতে যেতে শেষ চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু এই বৃত্তের খেল যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি কি বন্দীত্ব থেকে মুক্তি দিবেন?
'আনডাররেটেড বই' তকমা পাওয়া বইগুলোর ক্ষেত্রে আমার ভাগ্য ৫০-৫০! হয় একদম রত্ন খুঁজে পাই, নতুবা একদম যা-তা। এই বইটি ঠিক আন্ডাররেটেড বলা চলেনা আসলে। গুডরিডস জুড়ে অসং্খ্য ভালো রিভিউ আছে বইটার। তবু হয়তো এত রেটিং তুলনা কম সং্খ্যক মানুষ বইটির কথা জানেন সেকারণে আন্ডাররেটেড ডাকা হচ্ছে। আর বাংলা সাহিত্যে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার কম এমনিতেই, যে ক'টা আছে খুব একটা পাতে তোলার মত হয়না। যে কয়টা কিছুটা ভালো লাগে ও নিয়েই লাফালাফি করি আমরা। এটি একটি পাঠক সমাদৃত সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। যদিও আমার ব্যক্তিগতভাবে এভারেজ লেগেছে। তাই গুডরিডসে সবার মতামতের সাথে একমত হতে পারিনি। বইটার ভালো দিক হচ্ছে এর বিস্তৃতি। একটা ঘটনার সাথে আরেক ঘটনার কানেকশন বিল্ডিং। কারণ ঠিক ৫০% পর থেকেই অন্য একটা কাহিনী শুরু।
যেসব বিষয় ভালো লাগেনি, দেশী সব থ্রিলার প্রায় একই দোষে দুষ্ট। একঘেয়ে সংলাপ, গতি আছে কিন্তু ডেপথ নেই, লেখকের কোনো ফিলোসোফি বা ইনসাইট বলতে কিছু থাকেনা সংলাপে, শুধু অতিনাটকীয়তা। একই প্যাটার্নে গল্প সাজানো, শুরুতে রহস্যময় ঘটনার দৃশ্য, তারপর কাল্ট সৃষ্টি করে ফেলা কিন্তু মেসড আপ এক ডিটেকটিভ এর কেস নিয়ে ছোটাছুটি, একঘেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ।
ডিটেকটিভ মুহিতের এত প্রশংসা করলো বইতে, একই কথা বারবার বললো তার ডার্ক সিক্রেট নিয়ে, কিন্তু আমার কাছে মোটেই ডিটেকটিভ কে ব্রাইট ডিটেকটিভ লাগেনাই। একেবারেই না। খুবই প্রেডিকটেবল কাজকাম করে খুনি পালিয়ে যাচ্ছে। আমি পাঠক বুঝে যাচ্ছি সব, ডিটেকটিভ মাঠে থেকেও বুঝছেন না। মাঝে হঠাৎ দুই সাইকোলজিস্ট এসে কাহিনী টেকওভার করে ফেললেন। বেশ প্রেডিকটেবল গল্প।
দিস ইজ নট দ্যা অনলি ওয়ে টু টেল আ স্টোরি। গল্প সাধারণ হলেও কিন্তু সমস্যা নাই। এ ধরণের মার্ডার মিস্ট্রি পাঠক পড়ে আনন্দ পায় দাবার চাল গুলোর জন্য। গুডরিডস এর রেটিং অনুযায়ী আমার একার খারাপ ভালো লাগায় কিছু আসে যায়না, তবে একই ঘরাণায়, একই জিনিশ বেশিদিন তাও একই ভাবে লেখা হলে পাঠক টিকে থাকেনা। নতুন কিছু করা উচিত লেখকদের।
ফিলোসোফি দূর্বল হলেও গল্পের চিন্তাভাবনা ভালো, আমার চোখে ওসব খুঁটিনাটি পড়ে বোধহয় মানটা কমে গেছে। হতে পারে অন্য কারো ভালো লাগতে পারে, চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
বেশি আশা করাটায় কি বেশি হয়ে গেছে? হতে পারে। বলছি তাকরীম ফুয়াদের লিখা 'বৃত্তবন্দী' বইয়ের কথা। তাকরীম ফুয়াদের ���িখা এই প্রথম পড়লাম। লেখনী চমৎকার। এই বিষয়ে কোনো অভিযোগের সুযোগ নাই। ক্যারেক্টারগুলাও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে, ঘাঁপলা হচ্ছে কাহিনী। থ্রিলার হিসেবে এভারেজের উপরে যাওয়াই যাবে না।
বইয়ের কাহিনী হচ্ছে এরকম, ছয় মাসের ব্যবধানে দুই দুইটা খুন হয়ে যায়। মৃতদেহ বিকৃত করে রেখে দেয়া হচ্ছে একটা আপেল। কেনোই বা খুন হচ্ছে? খুনটা করছে কে? আর, খুনের সাথে আপেলের সংযোগই বা কি? তদন্তে নামলো পিবিআই-এর হোমিসাইড সেকশনের ইন্সপেক্টর মুহিত আর এসআই ইরান। তারা কি পারবে এই জটিল রহস্যের সমাধান করে খুনীকে ধরতে?
লেখকের লেখনী খুব সহজবোধ্য। এইটা একটা ভালো দিক। তবে, মনে দাগ কাটার মতো কিছু নাই। সময় কাটানোর জন্য একবার পড়তে পারেন। এর বেশি কিছু আশা করলে হয়তো আমার মতোই কিছুটা হতাশ হবেন।
বর্তমান ক্রাইম থ্রিল��রে গৎবাঁধা কিছু ব্যাপার আছে। যেমন প্রথমেই একটা খুন হবে। গোয়েন্দাপ্রবর অসুখী হবেন। তার কোনো অন্ধকারাবৃত অতীত থাকবে। পুরাণের ব্যবহার থাকবে। অপরাধের পেছনে কোনো দর্শন কাজ করবে। এতোসব ফর্মুলা নিয়ে জমজমাট উপন্যাস লেখা ও পাঠকের মনে উত্তেজনা সঞ্চার করা কঠিন কাজ। তাকরীম ফুয়াদ সেই কাজটিই করেছেন। বইয়ের নেতিবাচক দিক আছে কয়েকটা।যেমন - সন্দেহ করার মতো মানুষ গল্পে খুব বেশি নেই, আমি মাঝামাঝি পর্যায়ে যাকে সন্দেহ করেছিলাম শেষমেশ সে-ই কালপ্রিট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু খুব গোছানো লেখা। ক্লাইম্যাক্স ও এন্টি-ক্লাইম্যাক্স দুইটাই উপভোগ্য। ইরান ও মুহিতকে নিয়ে লেখক আর কোনো উপন্যাস লিখে থাকলে সাগ্রহে পড়বো।
There is no such thing like perfection, in simple words it does not exist. But here Takrim somehow created something which went very close to that elusive thing. Yeah, this one is one borderline perfect novel. Second half is bit complicated, ending could have bit more clarity, but damn, overall this one literally put me in awe. One time or not i don't know, but it is a must read.
"Tell Me, What Do You Think Is The Ultimate Fear? I Really Thought That I'd Already Reached The Darkest Of The Dark, But Then, Ahead Of Me, I Beheld A Darkness Even Greater Still,"- Johan liebert, monster.
শূন্যতা, অন্ধকার, এই দুটো বিষয় একটি কয়েনের একটি পিঠ। আমাদের জীবনে আমরা যেখানে ভাবি, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও অন্ধকার স্থান হলো মানুষের মস্তিষ্ক। সেখানেই আমাদের অলক্ষে ঘটে যায় এমন কিছু ঘটনা, যা দেখলে আমরা হয়তো বুঝতে পারতাম। মানুষ থেকেও ভয়ঙ্কর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হলো এই পৃথিবী।
মানুষের সবচেয়ে আদিম প্রবৃত্তি কী জানেন? পাপ, এই ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু এই শব্দটি সৃষ্টি থেকে আমাদের সঙ্গে করে এসেছে। আমরা একে ছাড়তে চেয়েছি যুগে যুগে, তবে এই পাপ আমাদের ছাড়েনি। কখনো এই পাপ আমাদের ছাড়তে চেয়েছে, কিন্তু আমরা একে ছাড়িনি।
সৃষ্টির প্রথম আদম ও হাওয়ার মাধ্যমে শুরু এই পাপের। স্বর্গে সুখে বসবাস করে দুজন সত্তা যারা হেরে গিয়েছিল আদিম রিপুর কাছে। শয়তানের প্ররোচনায়, ঈশ্বরের নিষদ্ধ করা ফল খেয়েছিল তারা। প্রথমে হাওয়া খেলেন, তারপর খেলেন আদম। যার গলাতেই আটকে গিয়েছিল সেই নিষিদ্ধ ফল, যে ফলটিকে কিছু জায়গায় আপেল হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
বৃত্তবন্দী আসলে এই বিষয়টার উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়েছে। গল্পের শুরুতেই লেখক স্টাবলিশ করে দিয়েছেন এই গল্পের শেষাংশ।
সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টিতে এক বিশেষ চিহ্ন রেখে গিয়েছেন। জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন তিনি, এই মর্তের সবকিছু। ভালোকে মূল্যায়ন করতে সৃষ্টি করেছেন খারাপের। ঠিক তেমনি ভালোবাসাকে রক্ষা করতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে হিংসা, জিঘাংসার। পৃথিবীতে শান্তি আনতে সৃষ্টি হয়েছে যুদ্ধের।
ঠিক সেভাবে পুরুষের পূর্ণতার জন্য তৈরি হয়েছে নারী। একই ভাবে তদ্বিপরীত।
এই একটা বক্তব্য দিয়ে শুরু হয় বৃত্তবন্দীর গল্প। আর লেখক খুব সুন্দর করেই চরিত্রের মাধ্যমে এটা ফুটিয়ে তুলেছেন পাতায় পাতায়। যেখানে মুহিতকে কিছুটা অন্তর্মুখী হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেখানে তার সঙ্গী ইরান সম্পূর্ণ তার বিপরীত।
পুরো গল্প জুড়ে মুহিত চেষ্টা করে গিয়েছে, তার পুরোনো অতীতকে পিছনে ফেলে আসতে। সে চাকরিতে জয়েন করার পর, প্রায় সকলকেই উপেক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। ইরানকে করেছে সন্দেহ। শুধু তাই না, তাকে বিভিন্ন ভাবে খোঁচা মারা হলে সে জবাব দিয়েছে কঠোরোতার সাথে।
একই দিকে ইরান হলো তার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথমদিন চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই, সে সকলের সাথে কথা বলেছে। চালক আসনে বসে থাকা লোকটার সাথেও কথা বলেছে নানা বিষয়ে। সে যেভাবে বহির্মুখী সেভাবে সে যোগাযোগ রক্ষা করতে চেয়েছে সবার সাথে। এমনকি প্রথমদিনেই মুহিতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও সে প্রশ্ন করেনি। তাছাড়া মুহিত যেখানে অপমানের জবাবে কাঠখোট্টা উত্তর দিচ্ছিল, সেখানে ইরান খোঁচা মারা কথাগুলোকে হজম করছিল বেশ ভালোভাবেই। তাই বলে কী সেও ছেড়ে দিয়েছে? কখনো দিয়েছে, কখনো দেয়নি। তবে যখন দিয়েছে তার উত্তর ছিল শান্ত প্রকৃতির।
কয়েনের বিপরীত দুই পিঠের এই মানুষ দুজন কিন্তু ব্যক্তিজীবনেও ভিন্ন। মুহিত যেখানে নিজের পরিবারকে, তার কর্মজীবন থেকে দূরে রাখতে চায়। সেখানে ইরান তার মার সাথে কর্মজীবনের বেশ কিছু জিনিস নিয়ে আলোচনাও করে।
দুজন বিপরীতমুখী মানুষ দুজনকে লেখক এক কেইসে ফেলে, গল্পের শুরুটাকে এভাবেই দাঁড় করিয়েছেন। যা আসলেই চমৎকার।
নারী, পুরুষ, দুটো ভিন্ন সত্তা। কিন্তু তারা দুজন মিলেই একটি সুখের সংসার গঠিত হয়। তারা একে অপরের পরিপূরক। এই যে একে অপরের অপূর্ণ বিষয়গুলোকে আমরা একসাথে মিটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, এটা কিন্তু বিয়ে কিংবা প্রেমের সম্পর্কে হবে তেমন কিন্তু না।
দুজন বন্ধুর মধ্যেও এমন কিছু হতে পারে। হতে পারে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যেও। এমনকি হতে পারে মুহিত ও ইরানের মধ্যেও। তারা আলাদা আলদা ভাবে কিন্তু কেইসটা কখনোই সলভ করতে পারতো না। কিন্তু তারা দুজনে যখন একসাথে কাজ করল, তখনই তারা এক হলো। আর তখনই তারা সফল হলো তাদের কাজে।
বৃত্তবন্দীর সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, ঠিক এই জিনিসটা আমি গল্পের শেষাংশে গিয়েও পেয়েছি। আমি দেখেছি, কীভাবে মুহিত খাপছাড়া ভাবেই তদন্তের শেষাংশে এগিয়ে যায়। আর একইভাবে ইরান খুব চাতুরতার সাথে তদন্ত সম্পন্ন করে। তারা দুজনেই বিপরীত ভাবে, তবুও একসাথে এভাবে পুরো তদন্ত শেষ করাটা বোঝায়, বৃত্তবন্দী কতো চমৎকার একটি কাজ।
আবার ফিরে আসি, আদম হাওয়া ও আপেলের গল্পে। এই ফিলোসফিটা লেখক খুব বিষদভাবেই বর্ণনা করেছেন। কেন কীভাবে খুনগুলো হয়েছে। কেন শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছে আপেল। কীভাবে একটি পাপ আমাদেরকে নিয়ে এসেছে স্বর্গ থেকে মর্তে।
তবে আমি একটু বিষয়টা এলাবোরেট করতে চাই, আমরা দেখতে পাই খুনি মুক্তার হৃদপিণ্ড কেটে, ঠিক মাঝখানে একটি আপেল বসিয়ে দিয়েছে। এর পিছনে কি কারণ তা কিন্তু আমরা জনি। তবে কেন হৃদপিণ্ডই?
ওয়েল আমরা যদি মুক্তার জীবন দেখি, সে তার স্বামীকে ধোকা দিয়ে পরকীয়া করত। স্বামীর অগোচরে পুরোনো প্রেমিকের সাথে প্রণয় ছিল মেয়েটার। বিষয়টা তার স্বামীকে কষ্ট দিয়েছিল খুব। লোকটার হৃদয় ভেঙ্গেছিল।
এই যে হৃদয় ভাঙ্গা একটি অপরাধ, সেই অপরাধের শাস্তি রিপ্রেজেন্ট করে মুক্তার মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা।
অজিতের ক্ষেত্রেও কিন্তু সেই একই বিষয় লক্ষ্য করা যায়। সে সবসময় মানুষকে ব্যবহার করত, সে মানুষের বিশ্বাস ভাঙতো। আর যখন আমরা দেখি, কেউ আমাদের শুধু ব্যবহার করছে। সেই কেউ একজন আমাদের বিশ্বাস ভাঙছে অগোচরে। তখন আমরা হজম করতে পারি না। গলায় যেন আটকে যায় বিষয়টা।
ঠিক এই দিকটাই রিপ্রেজেন্ট করে অজিতের মৃত্যুর পর, গলা কেটে সেখানে বসিয়ে দেওয়া আপেলটি।
কিন্তু এখানে সবচেয়ে মজার বিষয় কী জানেন? এখানে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, মুক্তার এই ধোকা দেওয়া ও অজিতের মানুষকে ব্যবহার করা, দুটো আসলে একই অর্থ রাখে। আর তা হলো বিশ্বাসঘাতকতা। দুটো আলদা ঘটনা, কিন্তু দুটোর অর্থ এক।
যেভাবে বারংবার বইতে ফিরে এসেছে এই বাক্যগুলো, "আমরা অভিন্ন, তুমি ও আমি আমরা এক"।
বই শেষে আমরা দেখতে পারি, মুহিত, তার পুরোনো ট্রমা পেরিয়ে এসেছে। সে নিজেকে এগিয়ে নিয়েছে, হাসিখুশি থাকছে। সে আসতে আসতে সকলের সাথে সহজ থাকছে।
একই জিনিস আমরা দেখতে পারি ইরানের মধ্যেও। সেও এগিয়ে এসেছে তার পুরোনো জীবন থেকে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে লাইফে এগিয়ে যাবে। বাবার ধ্বন সম্পদে আলালের ঘরের দুলাল না হয়ে, নিজে একা থাকবে।
মুহিত যেখানে, জীবন সম্পর্ক জানতো, সে জীবনের অনেক অন্ধকার অংশ দেখছে, এমনকি মাঝে মাঝে ইরানকে নিয়েও হিংসা করেছে। সেই মুহিত জীবনে এগিয়ে এসে এখন হাসছে। সে তার হতাশাকে ওভারকাম করেছে।
একই ভাবে ইরানও তার অপূর্ণতাকে ওভারকাম করতে পেরেছে। সে জীবনের মানে বুঝতে পেরেছে।
তবুও, আমরা কী আদৌ আমাদের সকল সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারি?
এই প্রশ্নের উত্তরে ইরানের দীর্ঘশ্বাস বুঝিয়ে দেয়, উত্তরটা কতটা কঠিন।
একই ভাবে, আমরা কী কখনো, আমাদের সব পাপ মোচন করতে পারি? আদৌ কী কোনো আমরা কোনো ক্ষমতা রাখি, খারাপকে মর্ত থেকে দূর করে দেওয়ার?
গল্পের ইরান ও বইয়ের শেষ পাতা আমাদের দিনশেষে এটাই মনে করিয়ে দেয়, আমরা কখনোই পূর্ণ সন্তুষ্টি পাব না, আর না আমরা থামাতে পারব খারাপ মুহূর্ত সংঘটিত হওয়াকে।
পৃথিবীর সৃষ্টিলঘ্ন থেকে শেষ পর্যন্ত, এভাবেই যুগে যুগে পৃথিবীর সব অন্ধকার অধ্যায়ের পাতাগুলো খুলতে থাকবে, আর অন্ধকারগুলো হতে থাকবে, ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্করতম।
লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ, এমন একটা বই লেখার জন্য।
This entire review has been hidden because of spoilers.
বই : বৃত্তবন্দী লেখক : তাকরীম ফুয়াদ প্রকাশনি : ঈহা জনরা : সাইকোলজিকাল থ্রিলার আমার রেটিং : ৫/৫
প্লট : ছয় মাসের মধ্যে দুই দুইটা খুন! এক ই স্টাইলে বীভৎস ভংগিতে লাশের গলা চিরে ফেলে রাখা হয়েছে লাশ দুইটিকে। এর মধ্যে হার্টের জায়গায় গুঁজে দেওয়া হয়েছে আপেল!কিন্তু এই আপেল কেন? কীসের প্রতীক এই আপেল?সিরিয়াল কিলিং না অন্য কিছু? তদন্তে নামল পিবিয়াই এর দুই গোয়েন্দা মুহিত এবং ইরান। কি সত্য লুকিয়ে আছে খুন হওয়া মানুষগুলোর মধ্যে?পারবে কি তাঁরা খুনীর পরিচয় বের করতে?
পাঠ-ভাবনা : পুলিশ প্রসিডিওয়ারাল থ্রিলার এর সাথে যদি সাইকোলজির দুর্দান্ত সংমিশ্রণ থাকে তাহলে সেই থ্রিলার টা কেমন হবে? এক কথায় যাকে বলে " পেইজ টার্নার"। ★গল্পের শুরুতেই প্রথমে মুক্তা নামে একটি মেয়ে বীভৎস আকারে খুন হয়।খুনের বর্ণনা লেখক যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছে সেটাও প্রশংসার দাবিদার। একেবারে গা গুলিয়ে দেওয়ার মত!তারপর শুরু হয় পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন ( পিবিয়াই) এর দুই গোয়েন্দা অর্থ্যাৎ এই গল্পের দুই মূল চরিত্র "মুহিত" এবং "ইরান" এর ইনভেস্টিগেশন। এর মাঝেই লেখক গল্পের আরেক চরিত্র "ড.জামিউল পাশা"এর সাত্থে পরিচয় করিয়ে দেন।দারুনভাবেই নিখুঁত তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গল্পটি এগিয়ে যায়। ধাপে ধাপে বর্ণনা এর মাধ্যমে তদন্ত প্রক্রিয়ার সকল ধাপ গল্পের মাধ্যমে দারুন ভাবে ফুটিয়ে তুলেন লেখক যা বোর হওয়ার বিন্দুমাত্র চান্স নেই। ★এরপর ই সম্পুর্ণ নতুন গল্পের মাধ্যমে আরেক খন্ড শুরু হয়। আরেকটি খুন! আরেকটি তদন্ত প্রক্রিয়া।সেখানেও সুষ্ঠুভাবে তদন্ত প্রক্রিয়ার বর্ণনা,দুই মূল চরিত্র এর ব্যাকস্টোরির পাশাপাশি জামিউল পাশার ব্যাকস্টোরি টা গল্পে আলাদা মাত্রা যুক্ত করে। ★হ্যাঁ দ্বিতীয় খন্ডেই আপনি জেনে যাবেন খুনি কে।ভাবছেন গল্প শেষ?কিন্তু না এরপর ই লেখক আসল দাও মেরেছেন আরেক খন্ডে সম্পুর্ন ভাবে নিয়ে এসেছেন সাইকোলজির খেল। মানুষের জীবনের অন্ধকার দিক(ডার্ক সিক্রেট),মনস্তাত্ত্বিক ভাবনা,দৈত্ব সত্তা,সাইকোলজিকাল টার্ম গুলো দারুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ★আসল টুইস্ট টা যদিও ধরে ফেলেছিলাম বেশ আগেই কিন্তু লেখকের অসাধারণ লিখনশৈলী,মানুষের মনের অন্ধকার দিকটার বর্ণনা,ভিলেনের মনস্তাত্ত্বিক খেল,নিখুঁত তদন্ত প্রক্রিয়া এসবের জন্য বইটি আমার কাছে দারুন লেগেছে। একদম ৫/৫। ★চমৎকার লেখনশৈলী এবং বাক্য গঠন। চুম্বকের মত আকর্ষন করায় পাতার পর পাতা উল্টে গেছি। এক মুহুর্তের জন্য ও মনে হয়নি বোর লাগার কোন চান্স আছে। পুলিশি তদন্ত গুলো যেমন নিপুণ ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তেমনি সাইকোলজির টার্মগুলো মাথা গুলিয়ে যাবে এমন নয় বরং সহজ সাবলীল ভাষায় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ★আন্ডাররেটেড বইয়ের নাম বললে আমি নিঃসন্দেহে এই বইটার নাম বলব। যতটা হাইপ পাওয়া উচিত ছিল সেরকম হাইপ নেই গল্পটা কে নিয়ে অথচ সব দিক দিয়ে টপ ক্লাস একটা মৌলিক থ্রিলার বৃত্তবন্দী বইটি।
-------------------------------------------- কখনও এমন হয়েছে কী? আপনি কোন লেখক সম্পর্কে আগে থেকে তেমন কিছু না জেনে শূন্য প্রত্যাশা নিয়ে পড়তে গিয়ে লেখকের ও লেখার প্রেমে পড়ে গিয়েছেন? কিংবা শেষ পর্যন্ত পড়ার পর ভেবেছেন, কেন এতো পরে উনার বইয়ের সন্ধান পেয়েছেন? ওয়েল দ্যাটস দ্যা ইন্ট্রোডাকশন অফ টুডে'স রিভিউ অভ "বৃত্তবন্দী"
'বৃত্তবন্দী' নামটা এক শব্দের হলেও, নামটার ভেতরেই একটা রহস্য আছে৷ মিসির আলী সিরিজের "বাঘবন্দি"র কথা খেয়াল আছে? তেমনি থ্রিলার হলেও বিশাল বিশাল ক্রিঞ্জি নাম না দিয়েও যে এক শব্দে চমৎকার কিছু শিরোনাম দেওয়া সম্ভব এ কারণেই প্রথমেই এক মার্ক পাবেন লেখক৷
এরপর আসি মূল গল্পে৷ পিবিআই অফিসার মুহিত ও সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অফিসার ইরান, সাই���োলজিস্ট জামিল পাশাকে গল্পের বুনন৷ ২৮৭ পেইজের স্ট্যান্ডার্ড সাইজের থ্রিলার বই হলেও এই উপন্যাসে নেই, পাতায় পাতায় থ্রিল, টুইস্টের পর টুইস্ট৷ তাও কেন এই বইটিকে আমি 'মাস্টারপিস'বলে আখ্যায়িত করছি কারণটা এর প্রেক্ষাপট ও প্রেক্ষাপটের বিস্তার ও যুক্তিযুক্ত পরিণতির জন্যে৷ সাইকোলজি তথা মানুষের মস্তিষ্কের বিভিন্ন দিক, বিভিন্ন সংজ্ঞা লেখক বেশ উপভোগ্য করে তুলে ধরেছেন৷ ভায়োলেন্সের যে বিষয়টা, সেটিও তীব্র হলেও, এই ধরনের উপন্যাসের জন্যে সহনীয়ই বলা চলে৷
অন্যান্য যেসব ভালো লাগার বিষয় ছিল, তা হলো পরিশীলিত ভাষায়, বিন্দু বিন্দু করে আগ্রহ জমাতে জমাতে লেখক শেষে চমৎকার একটা টুইস্ট দিয়ে লেখাটা সমাপ্ত করেছেন৷ আপনি প্রতিটা মূখ্য চরিত্রের ভেতরে চলা খণ্ডযুদ্ধ, মানসিক পরিস্থিতি যেন চোখের সামনে দেখতে পাবেন, লেখকের এই মুন্সীয়ানাকে সাধুবাদ দিতেই হয়৷
আর বেশী কিছু না বলাই ভালো৷ যারা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার বা ক্রাইম থ্রিলার পছন্দ করে, তাঁদের জন্যে সুখপাঠ্য হতে পারে বৃত্তবন্দী৷ এবং এটি এই বছরে আমার পড়া অন্যতম সেরা বই নিঃসন্দেহে, যদিও সামনে অনেকগুলো বই আছে হাতে৷
কি আন্ডাররেটেড একটা বই! বছর সমাপ্ত করার জন্যে পারফেক্ট। বইটা তিন খণ্ডে বিভক্ত। প্রতিটা খণ্ড সুন্দর করে গোছানো। প্রথম খণ্ড প্রথম খুন নিয়ে, দ্বিতীয়টা দ্বিতীয় খুন, আর তৃতীয়টা ক্লাইম্যাক্স। দ্বিতীয় খণ্ডের শুরুতে লেখা একটু খাপছাড়া লেগেছে এরপরে ঠিক হয়ে গেছে। প্রথমেই বলি চরিত্রায়ণ। মুহিত ও ইরান দুটি চমৎকার ডিটেক্টিভ চরিত্র যাদের প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত মনস্তাত্ত্বিক ইস্যুস আছে। তাদের রসায়নটা পুরো বই জুড়ে গ্রো করেছে। মুহিতের মানসিক রিকভারিতেও এই রসায়ন ভালো অনুঘটক ছিল। প্রতিটা খণ্ডেই বেশ কিছু চরিত্রের ডেভেলপমেন্ট ঘটেছে। চরিত্রগুলোর নাম উল্লেখ করলাম না স্পয়লার এড়াতে। তবে বুঝাই যাচ্ছিল কোন খণ্ডে কার উপর ফোকাস করা হচ্ছে। লেখনী এক কথায় মেদবিহীন। বাড়তি বিবরণ নেই কিছুর। পেসিং খুব ভালো, আমার কখনো বোরড লাগে নাই। এছাড়াও সংলাপসর্বস্ব, ফলে বেশিরভাগ অংশই দুই ডিটেক্টিভের pov এ এগিয়েছে। খুনের বর্ণনা প্রচণ্ড ভায়োলেন্ট কাজেই দুর্বল হৃদয়ের কেউ না পড়লেই ভালো। তবে বর্ণনাটা আমার কাছে বেশ পছন্দ হয়েছে, সুক্ষ্ম বর্ণনার ফলে গল্পের একটা শক্ত ভিত এখানে দাঁড়িয়ে গেছে। যেহেতু সাইকোলজিক্যাল বই, মনস্তত্ত্বের বিষয় তো থাকবেই। দার্শনিক আলোচনাগুলো মনে ধরার মত। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট বইয়ের। এছাড়া ইরানের দর্শন পাঠককে ভাবনার খোরাক দিবে নিশ্চিতভাবেই। বইয়ের নেগেটিভ দিকও আছে। প্রথমত তর্জনীকে শাহাদাত আঙুল বলে কখনো জানতাম না। এছাড়া ১৮৪ পৃষ্ঠায় ইরান ও মুহিতের আলোচনা আগের সাথে খাপছাড়া লেগেছে, এটা আরেকটু স্পষ্ট হতে পারত। সবশেষে প্রচ্ছদ বেমানান। কারণ আপেলের রঙ সবুজ হবার কথা, লাল নয়। আশা করা যায় এগুলো ঠিক করা হবে।
খু নের তদন্ত প্রক্রিয়া ও সমস্যার জট খুলতে মরিয়া হয়ে যাওয়া পিবিআই-এর হোমিসাইড সেকশনের ইন্সপেক্টর মুহিত এবং এসআই ইরান জুটির কার্যকলাপ বেশ উপভোগ করেছি। বৃত্তবন্দী উপন্যাসে প্রত্যেকটা চরিত্রের একটা অন্ধকার দিক দেখানো হয়েছে। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে বইটা চমৎকার। বীভৎস হ ত্যা, শিশু অ পহরণ একটার পর একটার রহস্যময় ঘটনা বই থেকে চোখ সরাতেই দেয় না। পুরো বইটা মানুষের কিছু সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার কেন্দ্র করেই ফুটে উঠেছে। কাহিনী টা চমৎকার হলেও গল্পের মেইন কালপিট কে আগে থেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিলাম । টুইস্ট এ পারফেক্ট ক্রাইমকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। বইয়ের ভাষায় বলতে গেলে মোস্ট পারফেক্ট ক্রাইম সেটাই যেখানে সবার চোখের অন্তরালে যে একটা ক্রাইম হয়ে গেছে সেটাই কেউ টের পাবে না।
বইয়ের নাম :- বৃত্তবন্দী লেখক :- তাকরীম ফুয়াদ প্রচ্ছদ :- সুজন প্রকাশনী :- ঈহা পৃষ্ঠা :- ২৮৭ মুদ্রিত মূল্য :- ৪৪০ টাকা।
দুর্দান্ত। সমসাময়িক সময়ে মুখবইয়ে হাইপে উঠা কয়েকটি থ্রিলার বই পড়ে খুবই হতাশ হয়েছিলাম। এই বইটি পড়ে দারুন লাগলো।খুবই আন্ডার রেটেড এই বইটা। এই বই নিয়ে আরো আলোচনা হওয়া উচিৎ। থ্রিলার লাভারদের অবশ্যই এই বই পড়া উচিৎ।
খুবই সাদামাটা ধরণের থ্রিলার। প্লটে তেমন কোনো ইউনিকনেস নেই, ডিটেইলিং কম, চরিত্রায়ন সুন্দর। প্লটহোল অল্পস্বল্প আছে, তবে খুব বেশি না। সব মিলিয়ে মোটামুটি মানের সাধারণ একটা থ্রিলার বলা যেতে পারে।
বৃত্তবন্দী! ঈহা প্রকাশনীর ব্যানারে প্রকাশিত এ বছরের একটি মৌলিক থ্রিলার৷ সত্যি বলতে, এই বইটি নিয়ে আমার তেমন উচ্চাশা ছিল না৷কারণ,সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের জনরাটা আমার তেমন পছন্দের ছিল না কখনই। খুব কাছের একজন মানুষ জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল বইটি। যে মানুষটি বই উপহার দিয়েছিল তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে গতরাতে পড়তে বসে পড়ি বইটি৷ ব্যালকনির বাতি জ্বালিয়ে ইজি চেয়ারে বসে কফি খেতে খেতে শূন্য প্রত্যাশা নিয়ে বসে পড়া বইটা যে রীতিমতো বিস্মিত করেছে। বই পড়া যখন সমাপ্ত হয়, তখন রাতের অন্ধকার গাঢ়, নিশ্চুপ, সুনসান প্রকৃতি৷ একরাশ মুগ্ধতা এবং উপন্যাসটির ভাবার্থ আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল অনেকটা সময়৷
উপন্যাসটির সূচনা গতানুগতিক ক্রাইম থ্রিলারের মতই একাধিক খুনের রহস্যের ���ট থেকে শুরু হয়৷ যেখানে উপন্যাসের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পিবিআই অফিসার মুহিত। বিষণ্ণ ও মনমরা স্বভাবের চরিত্রটার পাশাপাশি সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত মেধাবী অফিসার ইরান, মুহিতের সহযোগী হিসেবে উল্লেখিত খুনের সমাধানে লেগে পড়ে৷ দু'টো চরিত্র অনেকটা একে অপরের বিপরীত হলেও একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে দু'জনেরই। সেটা হলো একটা অতীত কালো অধ্যায়৷ সেখান থেকে গল্প এগুতে থাকে। এবং প্রেক্ষাপট এগুতে এগুতে ইন্টেন্স পর্যায়ে চলে যেতে থাকে। একটা পর্যায়ে, এমন একটা সমাপ্তির হয় যা ছিল অকল্পনীয় ও মর্মস্পর্শী।
লেখকের সাবলীল বর্ণনা, মানব মস্তিষ্কের রহস্যের নানান পরিভাষা যথাসম্ভব উপভোগ্য করে তুলে ধরাতে উপন্যাসটি এক মুহূর্তের জন্যে বিরক্ত লাগে নি৷ উপন্যাস শেষে মাথায় ঘুরতে থাকে উপন্যাসের একটি প্রিয় লাইন, "আমাদের জীবনটা আসলেই একটা ভ্রম৷ যার ভ্রম কেটে যায়, সত্যিকারের পৃথিবীটা কিরকম৷"
আমার রেটিংঃ ৪.৭৫/৫ (.২৫ কিছু বানান ভুলের কারণে কাটতে হয়েছে।)
বাংলা থ্রিলার-পাঠকের মনে আজকাল একটা নিরুত্তাপ অবিশ্বাস ঘাঁটি গেড়ে বসেছে—“মৌলিক থ্রিলার? না ভাই, অতটা আশা করা নেহাতই বোকামি।” কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে ট্যাগ ঝুলিয়ে দেন—“বাংলায় থ্রিলার মানেই ক্লিশে চরিত্র, সস্তা মোচড়, আর দুর্বল অনুকরণ।” এই হতাশাজর্জর ছায়াপথে যখন মনে হয় আলো সম্পূর্ণ নিভে এসেছে, ঠিক তখনই কোনো এক সাহসী লেখক এসে চোখে আঙুল দিয়ে মনে করিয়ে দেন — না, মৌলিকতা এখনও মৃত নয়। শুধু তাকে খুঁজে পাওয়ার মতো চোখ চাই।
তাকরীম ফুয়াদের ‘বৃত্তবন্দী’ ঠিক তেমন এক বিস্ময়—মৌলিকতার স্বাদে ভেজা, মনস্তত্ত্বে বুনা, এবং এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণের মতো শিহরণ-জাগানো।
একদিকে নৃশংস সিরিয়াল কিলিং, অন্যদিকে গভীর ব্যক্তিগত ট্রমার ছায়া—সব মিলিয়ে এই উপন্যাস এক অদ্ভুত, অথচ দারুণভাবে কার্যকর ক্রস-জঁরার হাইব্রিড। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, পুলিশ প্রসিডিউরাল, এবং ন্যূনতম দর্শনের সংলগ্নতা—এই বই যেন রেমন্ড চ্যান্ডলার, ফয়েলস ওয়ার আর ফ্রয়েডকে এক গার্হস্থ্য টেবিলে বসিয়ে গল্প শোনাতে চায়। এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অসম্ভব সংমিশ্রণটি একেবারে অপূর্বভাবে কাজ করেছে।
কাহিনি: আপেলখেকো ঈভের ছায়া এক খুনে?
গল্পের শুরু এক বিভৎস খুন দিয়ে। ঢাকার এক ফ্ল্যাটে পাওয়া গেল এক নারীর মৃতদেহ। তার হৃদপিণ্ড অনুপস্থিত, আর সেই শূন্য কোটরে রাখা রক্তমাখা একটা আপেল। হ্যাঁ, ঠিক পড়েছেন—একটা আপেল! এই এক অদ্ভুত, প্রতীকময়, কিন্তু খোলসা না করা উপমা দিয়েই ‘বৃত্তবন্দী’ আমাদের বিস্ময়ের ভেতরে ছুঁড়ে ফেলে।
তদন্তে নামে পিবিআই অফিসার মুহিত এবং সদ্য একাডেমি থেকে উঠে আসা ইরান। তাদের দুজনেরই পেছনে আছে জটিল এক অতীত। মুহিত একটি পূর্ববর্তী কেসে নিজের মানসিক স্থৈর্য হারিয়ে ফেলেছে, যার ছাপ পড়ে তার সিদ্ধান্তে ও আচরণে। অন্যদিকে ইরান নিজের এক গোপন ট্র্যাজেডির ভারে নুয়ে থাকা এক তরুণ।
এই খুনের তদন্তে গতি আসে, মোড় নেয়, একাধিক সন্দেহভাজন আসে, শিশুপুত্র অপহরণের ঘটনাও ঘটে, কিন্তু খুনী বারবার হাতছাড়া হয়ে যায়। পাঠক যখন ভাবছে—"হয়তো এবার রহস্য উন্মোচিত হবে," তখন আসে নতুন খুন। এবার অন্য জায়গায়, অন্য প্রেক্ষাপটে—তবু গলার ক্ষত আর আপেলের উপস্থিতি এক অদ্ভুত déjà vu তৈরি করে। কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে: খুনী আলাদা।
এখানেই লেখক উল্টে দেন টেবিল। খুনী একজন না, দুজন ? না কি কেউ আছে তারও ওপরে — এক ‘কন্ট্রোলার’? বইটির শেষ অংশে এই প্রশ্নই কেন্দ্রে চলে আসে। আর তখনই যুক্ত হয় এক বিশেষ চরিত্র — ক্রিমিনাল সাইকোলজিস্ট ড. জামিউল পাশা। এরপর শুরু হয় সেই পরত-উন্মোচন যার শেষ গন্তব্যে পাঠক পৌঁছান একদম শেষ পাতায়, এক চমকপ্রদ মোড়ে।
চরিত্রেরা প্লট নয়, প্লটের নির্মাতা—এবং তাদের মানসিক ভূদৃশ্যই এই উপন্যাসের আসল জাদু।
প্রথমেই আসি মুহিতের কথায়। একজন পরিণত, অভিজ্ঞ তদন্তকারী হলেও, মুহিত আসলে এক বিষণ্ণ আত্মার অধিকারী—আত্মগ্লানিতে জর্জরিত, নিঃসঙ্গ, কিছুটা ভাঙাচোরা এক মানুষ। তার চরিত্রে অতিমানবিক বুদ্ধি নেই, বরং আছে আমাদের মতো দ্বিধা, আবেগ, ভুলের পর ভুল, এবং টিমওয়ার্কের অম্লমধুর গন্ধ। তাই সে আমাদের পরিচিত হয়ে ওঠে—পুলিশ অফিসার না হয়ে যেন পাশের বাড়ির এক গম্ভীর আত্মীয়, যার চোখের নিচে ঘুমহীনতার ছায়া আর মনে অপার না-বলা কথার ভার।
এর পাশে দাঁড়িয়ে ইরান—উচ্চাভিলাষী, আত্মকেন্দ্রিক, কিন্তু ধীরে ধীরে তার ভেতরের জট খুলতে খুলতে পাঠক বুঝতে পারে, সে আসলে অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি মানুষের মতো। লেখক তার চরিত্রকে গড়ে তুলেছেন স্তর ধরে—একেকটা স্তর খোলার সঙ্গে সঙ্গে আবিষ্কার হয় এক ভারী অতীত, মনস্তাত্ত্বিক ট্রিগার, এবং শূন্যতার গহ্বর। ইরান আসলে নিজেই একটা রহস্য, যে ধীরে ধীরে খুলে যায়, কিন্তু কখনোই পুরোটা ধরা দেয় না।
এরপর আসে সেই রহস্যময় চরিত্র—ড. জামিউল পাশা। তাকে শুধুমাত্র গাইড বা মোরালিস্ট বললে কম বলা হয়। বরং তিনি যেন হ্যামলেটের পোলোনিয়াস আর হ্যানিবল লেক্টারের এক অদ্ভুত মিশ্রণ—দর্শন ও অন্ধকার একসঙ্গে বয়ে নিয়ে আসা এক enigmatic presence। তিনি কখনো আলোর দিশারি, কখনো নিয়ন্ত্রণপ্রেমী, আবার কখনো দর্শককে দ্বিধায় ফেলে দেওয়া কৌশলী কন্ট্রোলার। শেষদিকে এসে, তার উপস্থিতি যেন এক প্রশ্নচিহ্ন—কে আসলে চালক আর কে কেবল যাত্রী?
মুক্তা, রেশান, শাহজাদ ও অজিত—এই চারটি চরিত্রকেও লেখক অযত্নে ফেলেননি। বরং প্রত্যেকেই নিজস্ব আলোয় আলাদা হয়ে ওঠে। তারা কেবল প্লট এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যন্ত্র নয়, বরং একেকজন স্বতন্ত্র সত্তা, একেকটা মাইন্ডস্কেপ—যাদের আবেগ, সিদ্ধান্ত, এবং উপস্থিতি গল্পকে বেঁধে রাখে আর পাঠককে বারবার টেনে আনে মনস্তত্ত্বের অরণ্যে।
এই চরিত্রসমূহই ‘বৃত্তবন্দী’-কে শুধুমাত্র একটি থ্রিলার না বানিয়ে তুলেছে এক মনস্তাত্ত্বিক ডায়রির মতো—যেখানে খুনের পিছনে লুকিয়ে থাকে মানুষ, আর মানুষের পিছনে থাকে অন্ধকার।
থিম ও মনস্তত্ত্ব: পাপ, ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ
‘বৃত্তবন্দী’ কেবল একটি মার্ডার থ্রিলার নয়। এটা একেবারে আদিম মানবজন্ম থেকে শুরু হওয়া "পাপ" নামক ধারণার একটি মনস্তাত্ত্বিক অন্বেষণ।
নিষিদ্ধ ফল, আপেল, আদম-হাওয়া—এই উপাদানগুলি এখানে শুধু উপকরণ নয়, বরং প্রতীক। লেখক পাপের ধারণাকে এক আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক ভাষ্যরূপে তুলে ধরেছেন। প্রশ্ন করেছেন:
একজন মানুষ যদি অন্যকে দিয়ে অপরাধ করিয়ে নেয়, সে নিজে কতখানি দোষী?
“কন্ট্রোলার” যদি আরেক কন্ট্রোলারের হাতে চালিত হয়, তাহলে পাপের দায় কার?
এমনকি যদি কেউ নিজের অপরাধ সম্পর্কে সচেতন না থাকে, তাহলে সে কি অপরাধী?
এখানে আসে ‘পারফেক্ট ক্রাইম’ এর ধারণা। একজন অপরাধী যদি নিজেও না জানে সে অপরাধ করেছে, সেটাও কি পারফেক্ট ক্রাইম? এই থিমগুলোকে পাঠকের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, বরং রহস্য-তদন্তের আবরণে তারা ধীরে ধীরে গেঁথে গিয়েছে।
ভাষা, নির্মাণশৈলী ও কাঠামো: নিটোল এক বুনন
‘বৃত্তবন্দী’ তিনটি ভিন্ন অংশে ভাগ করা। প্রতিটি অংশেই আলাদা কেস, আলাদা টোন। প্রথমটা ক্লাসিক থ্রিলার ফর্মে, দ্বিতীয়টি কর্পোরেট অপরাধ ও মানসিক শোষণের দুনিয়া, আর তৃতীয়টি সাইকো-ফিলোসফিকাল থ্রিলারে রূপ নেয়। এই বহুরূপিতা বইটিকে গতি দিয়েছে, এবং পাঠক একঘেয়ে অনুভব করেন না।
ভাষা মসৃণ, সাবলীল। প্রথম দিকে কিছু ইংরেজি শব্দ এবং কিছু স্থানভিত্তিক সংলাপ “বলে দিচ্ছে” অনুভূতি জন্ম দিতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে লেখার সৌন্দর্য আচ্ছন্ন করে। সংলাপগুলো সংযত ও বাস্তববাদী।
একটা বড় প্লাসপয়েন্ট হচ্ছে বইয়ের তদন্ত প্রক্রিয়া। জিজ্ঞাসাবাদ, প্রমাণ সংগ্রহ, ফরেনসিক রেফারেন্স—সব মিলিয়ে এটি পুলিশের কাজের একটি বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরেছে, যা আমাদের বাংলা সাহিত্যে প্রায় অনুপস্থিত।
দুর্বলতা: কিছু বিষণ্ণ slip-up
১) সংলাপের বাস্তবতা: কিছু চরিত্রের সংলাপ, বিশেষত নিম্নবিত্ত কেয়ারটেকার বা গৃহপরিচারিকা চরিত্রে, অস্বাভাবিকভাবে পরিশীলিত ভাষায় লেখা হয়েছে। এদের কথ্যভাষার বাস্তবতায় কিছুটা ছেদ পড়েছে।
২) প্রুফরিডিং: বইটিতে কিছু বানান ভুল, কী/কি ব্যবহারে অসঙ্গতি এবং চরিত্রের নাম ও ঘটনা বর্ণনায় সামান্য অসামঞ্জস্য আছে। যদিও এগুলো গল্পের গতিকে থামায় না, তবে খানিক মনঃক্ষুণ্ণ করে।
৩) মনস্তত্ত্বের ব্যাখ্যায় ঝাপসা রেখা: কন্ট্রোলার ও ভিকটিমদের মধ্যে ‘ট্রিগার পয়েন্ট’ ব্যবস্থাটি দুর্দান্ত কল্পনা হলেও, এর বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যায় কিছুটা আবছা ভাব রয়ে গেছে।
আমার পাঠ অনুভূতি: পাঠশেষে চমকের বৃত্তে
লাস্ট টু পেজ টুইস্টের কথা না বললেই নয়। যারা থ্রিলার পড়ে মাঝপথে ‘predict’ করে আনন্দ পান, তাদের জন্য এই বই এক চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত আপনি ধরতেই পারবেন না কারা কার marionette, কার হাতে সুতো।
এই বই পাঠের পর যে প্রশ্নটা মাথায় ঘুরতে থাকে— “আমরা কি আদৌ স্বাধীন ইচ্ছায় কোনো কাজ করি, না কি আমাদেরই কেউ চালাচ্ছে?” এটাই তো এক ধরনের “বৃত্তবন্দীত্ব”, তাই না?
শেষে যা বলার থাকে: বৃত্তবন্দী নয়, চক্রব্যূহ
‘বৃত্তবন্দী’ নামে বইটি আদতে একটি চক্রব্যূহ, যেখানে পাঠক, চরিত্র, এমনকি খুনীও জানে না প্লটের আসল চালক কে। তাকরীম ফুয়াদ এমন একটি গল্প বুনেছেন যা পাঠককে শুধু বিনোদন দেয় না, ভাবায়।
বাংলা মৌলিক থ্রিলার সাহিত্যে এমন কাজ বিরল। এই বই হাইপড নয়, কিন্তু হাইপড হওয়া উচিত। এটি শুধু পড়া নয়, চর্চা করার মতো থ্রিলার।
যারা Sharp Objects, Se7en, বা True Detective ঘরানার থ্রিলার ভালোবাসেন—এটি আপনার জন্য মাস্টরিড। এবং হ্যাঁ, এটা কেবল ‘কিনে পড়া’র বই না, কালেকশনে রাখার বই।
পুনশ্চঃ তাকরীম ফুয়াদের নামটা বাংলা থ্রিলার সাহিত্যে আরো অনেক বেশি উচ্চারিত হওয়া উচিত। এই বই পড়ে তার লেখা ইনিগমা এখন তালিকায় চলে এসেছে। লেখকের জন্য একটাই বার্তা—"আপনি আমাদের বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছেন। লিখে যান। আমরা অপেক্ষায় আছি।"