"Tell Me, What Do You Think Is The Ultimate Fear? I Really Thought That I'd Already Reached The Darkest Of The Dark, But Then, Ahead Of Me, I Beheld A Darkness Even Greater Still,"- Johan liebert, monster.
শূন্যতা, অন্ধকার, এই দুটো বিষয় একটি কয়েনের একটি পিঠ। আমাদের জীবনে আমরা যেখানে ভাবি, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও অন্ধকার স্থান হলো মানুষের মস্তিষ্ক। সেখানেই আমাদের অলক্ষে ঘটে যায় এমন কিছু ঘটনা, যা দেখলে আমরা হয়তো বুঝতে পারতাম। মানুষ থেকেও ভয়ঙ্কর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হলো এই পৃথিবী।
মানুষের সবচেয়ে আদিম প্রবৃত্তি কী জানেন? পাপ, এই ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু এই শব্দটি সৃষ্টি থেকে আমাদের সঙ্গে করে এসেছে। আমরা একে ছাড়তে চেয়েছি যুগে যুগে, তবে এই পাপ আমাদের ছাড়েনি। কখনো এই পাপ আমাদের ছাড়তে চেয়েছে, কিন্তু আমরা একে ছাড়িনি।
সৃষ্টির প্রথম আদম ও হাওয়ার মাধ্যমে শুরু এই পাপের। স্বর্গে সুখে বসবাস করে দুজন সত্তা যারা হেরে গিয়েছিল আদিম রিপুর কাছে। শয়তানের প্ররোচনায়, ঈশ্বরের নিষদ্ধ করা ফল খেয়েছিল তারা। প্রথমে হাওয়া খেলেন, তারপর খেলেন আদম। যার গলাতেই আটকে গিয়েছিল সেই নিষিদ্ধ ফল, যে ফলটিকে কিছু জায়গায় আপেল হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
বৃত্তবন্দী আসলে এই বিষয়টার উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়েছে। গল্পের শুরুতেই লেখক স্টাবলিশ করে দিয়েছেন এই গল্পের শেষাংশ।
সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টিতে এক বিশেষ চিহ্ন রেখে গিয়েছেন। জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন তিনি, এই মর্তের সবকিছু। ভালোকে মূল্যায়ন করতে সৃষ্টি করেছেন খারাপের। ঠিক তেমনি ভালোবাসাকে রক্ষা করতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে হিংসা, জিঘাংসার। পৃথিবীতে শান্তি আনতে সৃষ্টি হয়েছে যুদ্ধের।
ঠিক সেভাবে পুরুষের পূর্ণতার জন্য তৈরি হয়েছে নারী। একই ভাবে তদ্বিপরীত।
এই একটা বক্তব্য দিয়ে শুরু হয় বৃত্তবন্দীর গল্প। আর লেখক খুব সুন্দর করেই চরিত্রের মাধ্যমে এটা ফুটিয়ে তুলেছেন পাতায় পাতায়। যেখানে মুহিতকে কিছুটা অন্তর্মুখী হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেখানে তার সঙ্গী ইরান সম্পূর্ণ তার বিপরীত।
পুরো গল্প জুড়ে মুহিত চেষ্টা করে গিয়েছে, তার পুরোনো অতীতকে পিছনে ফেলে আসতে। সে চাকরিতে জয়েন করার পর, প্রায় সকলকেই উপেক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। ইরানকে করেছে সন্দেহ। শুধু তাই না, তাকে বিভিন্ন ভাবে খোঁচা মারা হলে সে জবাব দিয়েছে কঠোরোতার সাথে।
একই দিকে ইরান হলো তার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথমদিন চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই, সে সকলের সাথে কথা বলেছে। চালক আসনে বসে থাকা লোকটার সাথেও কথা বলেছে নানা বিষয়ে। সে যেভাবে বহির্মুখী সেভাবে সে যোগাযোগ রক্ষা করতে চেয়েছে সবার সাথে। এমনকি প্রথমদিনেই মুহিতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও সে প্রশ্ন করেনি। তাছাড়া মুহিত যেখানে অপমানের জবাবে কাঠখোট্টা উত্তর দিচ্ছিল, সেখানে ইরান খোঁচা মারা কথাগুলোকে হজম করছিল বেশ ভালোভাবেই। তাই বলে কী সেও ছেড়ে দিয়েছে? কখনো দিয়েছে, কখনো দেয়নি। তবে যখন দিয়েছে তার উত্তর ছিল শান্ত প্রকৃতির।
কয়েনের বিপরীত দুই পিঠের এই মানুষ দুজন কিন্তু ব্যক্তিজীবনেও ভিন্ন। মুহিত যেখানে নিজের পরিবারকে, তার কর্মজীবন থেকে দূরে রাখতে চায়। সেখানে ইরান তার মার সাথে কর্মজীবনের বেশ কিছু জিনিস নিয়ে আলোচনাও করে।
দুজন বিপরীতমুখী মানুষ দুজনকে লেখক এক কেইসে ফেলে, গল্পের শুরুটাকে এভাবেই দাঁড় করিয়েছেন। যা আসলেই চমৎকার।
নারী, পুরুষ, দুটো ভিন্ন সত্তা। কিন্তু তারা দুজন মিলেই একটি সুখের সংসার গঠিত হয়। তারা একে অপরের পরিপূরক। এই যে একে অপরের অপূর্ণ বিষয়গুলোকে আমরা একসাথে মিটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, এটা কিন্তু বিয়ে কিংবা প্রেমের সম্পর্কে হবে তেমন কিন্তু না।
দুজন বন্ধুর মধ্যেও এমন কিছু হতে পারে। হতে পারে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যেও। এমনকি হতে পারে মুহিত ও ইরানের মধ্যেও। তারা আলাদা আলদা ভাবে কিন্তু কেইসটা কখনোই সলভ করতে পারতো না। কিন্তু তারা দুজনে যখন একসাথে কাজ করল, তখনই তারা এক হলো। আর তখনই তারা সফল হলো তাদের কাজে।
বৃত্তবন্দীর সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, ঠিক এই জিনিসটা আমি গল্পের শেষাংশে গিয়েও পেয়েছি। আমি দেখেছি, কীভাবে মুহিত খাপছাড়া ভাবেই তদন্তের শেষাংশে এগিয়ে যায়। আর একইভাবে ইরান খুব চাতুরতার সাথে তদন্ত সম্পন্ন করে। তারা দুজনেই বিপরীত ভাবে, তবুও একসাথে এভাবে পুরো তদন্ত শেষ করাটা বোঝায়, বৃত্তবন্দী কতো চমৎকার একটি কাজ।
আবার ফিরে আসি, আদম হাওয়া ও আপেলের গল্পে। এই ফিলোসফিটা লেখক খুব বিষদভাবেই বর্ণনা করেছেন। কেন কীভাবে খুনগুলো হয়েছে। কেন শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছে আপেল। কীভাবে একটি পাপ আমাদেরকে নিয়ে এসেছে স্বর্গ থেকে মর্তে।
তবে আমি একটু বিষয়টা এলাবোরেট করতে চাই, আমরা দেখতে পাই খুনি মুক্তার হৃদপিণ্ড কেটে, ঠিক মাঝখানে একটি আপেল বসিয়ে দিয়েছে। এর পিছনে কি কারণ তা কিন্তু আমরা জনি। তবে কেন হৃদপিণ্ডই?
ওয়েল আমরা যদি মুক্তার জীবন দেখি, সে তার স্বামীকে ধোকা দিয়ে পরকীয়া করত। স্বামীর অগোচরে পুরোনো প্রেমিকের সাথে প্রণয় ছিল মেয়েটার। বিষয়টা তার স্বামীকে কষ্ট দিয়েছিল খুব। লোকটার হৃদয় ভেঙ্গেছিল।
এই যে হৃদয় ভাঙ্গা একটি অপরাধ, সেই অপরাধের শাস্তি রিপ্রেজেন্ট করে মুক্তার মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা।
অজিতের ক্ষেত্রেও কিন্তু সেই একই বিষয় লক্ষ্য করা যায়। সে সবসময় মানুষকে ব্যবহার করত, সে মানুষের বিশ্বাস ভাঙতো। আর যখন আমরা দেখি, কেউ আমাদের শুধু ব্যবহার করছে। সেই কেউ একজন আমাদের বিশ্বাস ভাঙছে অগোচরে। তখন আমরা হজম করতে পারি না। গলায় যেন আটকে যায় বিষয়টা।
ঠিক এই দিকটাই রিপ্রেজেন্ট করে অজিতের মৃত্যুর পর, গলা কেটে সেখানে বসিয়ে দেওয়া আপেলটি।
কিন্তু এখানে সবচেয়ে মজার বিষয় কী জানেন? এখানে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, মুক্তার এই ধোকা দেওয়া ও অজিতের মানুষকে ব্যবহার করা, দুটো আসলে একই অর্থ রাখে। আর তা হলো বিশ্বাসঘাতকতা। দুটো আলদা ঘটনা, কিন্তু দুটোর অর্থ এক।
যেভাবে বারংবার বইতে ফিরে এসেছে এই বাক্যগুলো, "আমরা অভিন্ন, তুমি ও আমি আমরা এক"।
বই শেষে আমরা দেখতে পারি, মুহিত, তার পুরোনো ট্রমা পেরিয়ে এসেছে। সে নিজেকে এগিয়ে নিয়েছে, হাসিখুশি থাকছে। সে আসতে আসতে সকলের সাথে সহজ থাকছে।
একই জিনিস আমরা দেখতে পারি ইরানের মধ্যেও। সেও এগিয়ে এসেছে তার পুরোনো জীবন থেকে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে লাইফে এগিয়ে যাবে। বাবার ধ্বন সম্পদে আলালের ঘরের দুলাল না হয়ে, নিজে একা থাকবে।
মুহিত যেখানে, জীবন সম্পর্ক জানতো, সে জীবনের অনেক অন্ধকার অংশ দেখছে, এমনকি মাঝে মাঝে ইরানকে নিয়েও হিংসা করেছে। সেই মুহিত জীবনে এগিয়ে এসে এখন হাসছে। সে তার হতাশাকে ওভারকাম করেছে।
একই ভাবে ইরানও তার অপূর্ণতাকে ওভারকাম করতে পেরেছে। সে জীবনের মানে বুঝতে পেরেছে।
তবুও, আমরা কী আদৌ আমাদের সকল সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে পারি?
এই প্রশ্নের উত্তরে ইরানের দীর্ঘশ্বাস বুঝিয়ে দেয়, উত্তরটা কতটা কঠিন।
একই ভাবে, আমরা কী কখনো, আমাদের সব পাপ মোচন করতে পারি? আদৌ কী কোনো আমরা কোনো ক্ষমতা রাখি, খারাপকে মর্ত থেকে দূর করে দেওয়ার?
গল্পের ইরান ও বইয়ের শেষ পাতা আমাদের দিনশেষে এটাই মনে করিয়ে দেয়, আমরা কখনোই পূর্ণ সন্তুষ্টি পাব না, আর না আমরা থামাতে পারব খারাপ মুহূর্ত সংঘটিত হওয়াকে।
পৃথিবীর সৃষ্টিলঘ্ন থেকে শেষ পর্যন্ত, এভাবেই যুগে যুগে পৃথিবীর সব অন্ধকার অধ্যায়ের পাতাগুলো খুলতে থাকবে, আর অন্ধকারগুলো হতে থাকবে, ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্করতম।
লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ, এমন একটা বই লেখার জন্য।