ব্লার্ব থেকে : কালাপাহাড় নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন মন্দির ধ্বংসকারী সেনানায়কের প্রতিমূর্তি। বাংলা ও ওড়িশার বহু মন্দির, বিগ্রহ ধ্বংস করেছিলেন তিনি। কিন্তু জানেন কি তিনি ছিলেন একজন ধর্মনিষ্ঠ হিন্দু ব্রাহ্মণ? নিয়মিত বিষ্ণু পূজা করতেন। তাহলে কীভাবে নায়ক থেকে হয়ে উঠলেন খলনায়ক? সত্যিই কি খলনায়ক?
ইতিপূর্বে বাংলা সাহিত্যে কালাপাহাড় চরিত্রটিকে নিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে কাজ হলেও, তার জীবন নিয়ে দেড় লক্ষেরও বেশি শব্দের উপন্যাস এই প্রথম। কালাপাহাড়, হিন্দু কালাপাহাড়, মুসলিম কালাপাহাড় এবার যে পাঠককে এক অন্য আয়নার সামনে দাঁড় করাবে তা বলাই বাহুল্য।
২০২৪ সাল ৫৯০ পেজের অসাধারণ একটা বই দিয়ে শুরু করলাম। এই জনরার বই আমার সব থেকে বেশি পছন্দের। বইয়ে কালাপাহাড়ের যুবক থেকে শুরু করে শেষ সময়ের কাহিনী তুলে এনেছে লেখক। অনেক অনেক মজার তথ্য জানতে পারলাম বই থেকে এর মাঝে বেশি অবাক হয়েছি কংসনারায়ণ প্রথম শরতকালীন দুর্গাপূজার প্রচনল করেন বাংলাতে।
কালাপাহাড় বাংলার ইতিহাসের বহু পরিচিত এক নাম, কিন্তু এই চরিত্রের ব্যাপারে খুব অল্পই আমরা জানি. তিনি এক মুসলিম সেনাপতি ছিলেন, যিনি বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেন। এর বাইরে তার কোনো পরিচয় সহজে চোখে পড়ে না. তাই স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা কৌতূহল জাগে সুজন বাবুর এই বইটি নিয়ে. কিন্তু কোনো পাঠ প্রতিক্রিয়া বা সমালোচনা চোখে না পড়াতে বইটা গত প্রায় ২ বছর ধরে বইটা wishlist এ থাকা সত্ত্বেও কিনিনি. এবার কি মনে হলো, কিনেই ফেললাম বইটা.
এক কথায় বলতে গেলে বইটা 'unputdownable'. প্রায় ৬০০ পাতার এই ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস পড়তে একবারো মনে হয়নি যে বইটার গতি শিথিল হয়েছে. বইটার শুরু কালাপাহাড়ের যুবক বয়স থেকে, যেখানে আমাদের পরিচয় হয় রাজীবলোচন রায়ের সাথে, বুদ্ধি ও বাহুর জোরে সফলতা তার হাথে এবং এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তার সামনে. জীবন যেন তাকে পৃথিবীতেই স্বর্গের সুখ এনে দিয়েছে. কিন্তু ভাগ্যের ফেরে ও সমাজের চাপে এই রাজীব ই হয়ে ওঠেন মোহাম্মদ ফরম আলী, ওরফে কালাপাহাড়.
কিন্তু এই উপন্যাস রাজীবের কালাপাহাড় হয়ে ওঠার কাহিনী নয়. এটি একটি জীবনের হাথে প্রতাড়িত মানুষের কাহিনী. জীবন তাকে আঘাত দিয়েছে নানা ভাবে, কিন্তু তিনি হার মেনে থেমে যাননি কখনো. একই সাথে এটি সমকালীন বাংলার ইতিহাসের এবং তখনকার সমাজজীবনের এর যথার্থ চিত্রণ. এখানে রয়েছে কররানী সুলতানদের সময়কার বাংলার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বাউল সমাজের উত্থান, তাতে বিভাজনের প্রথম ছাপ, এতে আছে কামরূপের রাজবংশের ইতিহাস, সেই বিখ্যাত চিলা রাই এর কথা যাকে নিয়ে গান আজও শোনা যায় কামতার folk culture-এ . সুজন বাবুর লেখা এর আগে কখনো পড়িনি. অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় উনি উপন্যাসটাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, পড়তে গিয়ে কোথাও হোঁচট লাগে না. লেখকের কলমের জোরে সেই সময়ের সমাজ ও চরিত্র যেন ফুটে ওঠে চোখের সামনে.
শেষে যে কথা না বললেই নয়, তাহলো পালকের প্রকাশনা. বইটার প্রচ্ছদ, পাতার মান, বাইন্ডিং দুর্দান্ত. মুদ্রণ প্রমাদ প্রায় নেই বললেই চলে.এভাবেই এগিয়ে চলুন আপনারা এবং আরও ভালো ভালো বই উপহার দিন আমাদের হাথে.