চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলার অবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে৷ মূল প্রতিপাদ্য পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুর দিকেই বাংলার মুসলিম শাসনের উপর নেমে আসা কালোমেঘের থাবা৷ রামরাজত্বের স্বপ্নে বিভোর কপট ও চতুর গণেশ ছিলো সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের প্রধান অমাত্য৷ সুলতানের সামনে আনুগত্যের যার সীমা নেই, আর ভেতর থেকে মুসলিম আমির ওমরাদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল লাগিয়ে সুলতানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা চুড়ান্ত করে রেখেছে৷ সুলতান যতদিনে টের পেলেন ততদিনে দেরি হয়ে গেছে৷ গুপ্তহত্যার শিকার হলেন আজম শাহ৷
আরও দু'দফা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়িযে সুলতান পাল্টিয়ে ১৪১৪ সালে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় গণেশ৷ তারপর শুরু হয় অত্যাচার নির্যাতনের স্টীমরোলার ও মুসলিম গণহত্যা৷ এই সময় বাংলার দরবেশ ছিলেন নুর কুতুবুল আলম৷ তিনি শতাব্দীর সেরা চিঠিটি লিখলেন জৈনপুরের সুলতান ইবরাহিম শর্কীকে৷ গণেশকে শায়েস্তা করার জন্য এগিয়ে এলেন শর্কী৷ তারপর গণেশের চাতুরীর কাছে বাংলার আকাশ আরও কিছু দিন মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও দরবেশের আধ্যাত্মিকতার এক ফসল সেই মেঘ কেটে ঠিকই একদিন স্বর্ণালি রোদ্দুর ফিরিয়ে আনে বাংলায়৷
বইটির শুরুর দিকে কয়েকটি অধ্যায়ে দরবেশ নুর কুতুবুল আলমের পূর্বপুরুষদের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং বাল্যকাল থেকে তাঁর আধ্যাত্মিক সফরের বিবরণ দেয়া হয়েছে৷
সমালোচনা: ইতিহাসের চেয়ে সাহিত্যের কচকচানি বেশি ছিলো৷ "প্রমাণ পেলেন জ্ঞানের, নিশ্চিত হলেন সততার, করলেন প্রতিকার" - অনেকটুকু অংশ এই ধরণের বাক্যগঠনে লেখা৷ ব্যক্তিগতভাবে এই বাক্যরীতি পছন্দ করি না৷
আর্য শাসন(বিশেষত সেন) যুগে বাংলার আদি অধিবাসীদের ওপর অত্যাচার, তাদেরকে ধর্মীয় শাস্ত্র থেকে সামাজিক অবকাঠামো সবক্ষেত্রেই অচ্ছুৎ, পক্ষীজাত কিংবা অসুর জ্ঞান করার(!?) যুগ থেকে ইসলামের সুশাসন প্রতিষ্ঠার সামান্য বিবরণ দিয়ে বইয়ের শুরু।
গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের শাসনকালে পুনরায় দানা বেঁধে উঠছে বিদ্রোহের আভাস, ষড়যন্ত্র পৌছে গেছে মসনদে, মূল হোতা বসে আছে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে সুলতানের আস্থাভাজন হয়ে।
গুছিয়ে আনা জালে পতন হলো সুলতানের। গুপ্তহত্যা! অন্তর্কোন্দলে লিপ্ত আমির অমাত্যদের সামনে সাধুটি হয়ে সেজে থাকা ষড়যন্ত্রীই হয়ে উঠলো ক্রীড়নক।
বাংলার মুসলমান প্রজার ওপর নেমে এলো রৌরবের পার্থিব রূপ। মসজিদের ওপর আঘাত এলো। ঐতিহ্যের ধারক বাহক খানকাগুলো হয়ে উঠছিলো প্রজাদের শেষ আশ্রয়। সেই খানকাতেও রক্তের ধারা বইলো।
একটা চিঠি চলেছে, শতাব্দী মাড়িয়ে। স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা হয়ে, আযানের মিষ্টি সুরের প্রথম তাকবীরে চিঠিটি চলেছে। কী ছিলো সেই চিঠিতে? কে ছিলেন প্রেরক নূর কুতুবুল আলম। কেমন প্রাণবন্ত ছিলো আমাদের খানকাগুলো? তাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাবাদি কেমন ছিলো? কেমন ছিলো পূর্বসূরীদের আত্নত্যাগ, সরলতা আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির গল্প?
শেকড় চিনতে চান? কবে থেকে বাঙালী হয়ে উঠলেন জানতে চান? সেই সোনারগাঁ হয়ে খানকায় গিয়ে কাঙালভোজে শরীক হতে চান? ফিরতে চান এক আধ্যাত্মিক, সম্ভ্রম জাগানিয়া পরিবেশে?
ছোট্ট এই বইটায় চেপে সময় পরিভ্রমণ করে আসুন। চিন্তার জটকে ধাক্কা দিন। সুন্দর সময় কাটুক।
রেদোয়ান উপহার হিসেবে দিয়েছিল বইটা, বেশ সহজপাঠ্য। দুই-তিন বসায় পড়া শেষ। রিভিউ লিখতে এসে দেখছিলাম চেনাজানা কারও রিভিউ আছে নাকি আগের। লিনাস ভাইয়ের রিভিউ পড়ে মনে হল একদম এটাই আমারও অভিব্যক্তি। হুবহু কোট করে দিলাম,
" বাংলায় ইসলামের এক সেবকের অজানা অধ্যায় জানলাম। যদিও মাঝে কিছু জায়গায় খেই হারিয়ে গেছে কাহিনীর সুতোর, তবুও বেশ ভাল একটি বই। রাজা গণেশের মত যারা চায় একটি মাত্র সম্প্রদায়ই থাকুক তার রাজত্বে তাদের কার্যপদ্ধতি বুঝে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাড়িয়ে সম্প্রীতির জন্য কাজ করে যেতে হবে। "
বাংলায় ইসলামের এক সেবকের অজানা অধ্যায় জানলাম। যদিও মাঝে কিছু জায়গায় খেই হারিয়ে গেছে কাহিনীর সুতোর, তবুও বেশ ভাল একটি বই। রাজা গণেশের মত যারা চায় একটি মাত্র সম্প্রদায়ই থাকুক তার রাজত্বে তাদের কার্যপদ্ধতি বুঝে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাড়িয়ে সম্প্রীতির জন্য কাজ করে যেতে হবে।
এক কথায় অসাধারণ। এর আগে আমার বাংলার ইতিহাসের জ্ঞান স্কুলের সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ক্ষুদ্র দুয়েকটা চ্যাপ্টার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই বইয়ে বিস্তারিত জানতে পারলাম এই বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি সম্পর্কে।
ইতিহাসকে খুবই সুন্দরভাবে গল্পের ছলে তুলে ধরা হয়েছে। লেখনীর প্রশংসা করতেই হবে। মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায়ের সন্ধান পাবেন, যেটি হয়তো কালের বিবর্তনে ঢাকা পড়েছে।