নামটা অদ্ভুত, তাই না? বইটাতে আকৃষ্ট হওয়ার প্রথম কারণ এই অদ্ভুত নামটাই। দ্বিতীয় কারণ বিভিন্ন বইয়ের গ্রুপ এবং গুডরিডসে বইটার প্রচুর পজিটিভ রিভিউ। তাইতো গত মাসে এক বইয়ের গ্রুপের বদৌলতে সুযোগ পেয়েই বইটা কিনে ফেলি আর এখন মাসের প্রথমেই পড়ে ফেললাম অদ্ভুত নামের অদ্ভুত সুন্দর এই বইটা।
বইটা সম্পর্কে আমার কথা বলার আগে, দাঁড়ান, দু-একটা গল্প সম্পর্কে বলি। ( এই দুই প্যারায় স্পয়লার আছে) প্রথমেই বলা যাক ‘ শেষ মাথাটি কাটা পড়ার আগে' গল্পটার কথা। এক সকালে ঘুম থেকে উঠেই কথক দেখতে পেল সে ব্যতীত তার বাড়ির সবাই এবং শহরের সবাই মাথাবিহীন হয়ে পড়েছে। স্বপ্ন দেখছে ভেবে চোখ-মুখে পানি নেওয়ার পরও যখন অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না তখন সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গেল কথক, সাথে দুশ্চিন্তা তো আছেই। রাস্তায় নেমে সে আরও অবাক হলো। মাথাবিহীন হওয়ায় সবাই কেমন নিশ্চিন্তে চলছে, কেউ কোনো প্রতিবাদ করছে না, মাথা থাকাই অপরাধ হয়ে গিয়েছে শহরে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে মাথা কেটে নেওয়ার অপারেশন চলছে। কি অবাক লাগছে আজগুবি ব্যাপার ভেবে? তাহলে মাথার জায়গায় বিবেক বা চিন্তাশক্তি বসিয়ে গল্পটা ফের পড়ুন।
এবার বলি নাম গল্প ‘ মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ’র কথা। শহরে নতুন একটা রেস্তোরাঁ এসেছে, সেখানে নাকি টাটকা মানুষের মাংস পাওয়া যায়। তো কথক টাটকা মানুষের মাংসের টেস্ট নিতে চলে গেল বন্ধুসমেত। সেখানেই দেখল কিভাবে মালিকপক্ষ যুদ্ধ থেকে, শহরের বস্তি থেকে টাটকা মানুষের মাংস সরবরাহ বজায় রাখছে। তাহলে কি কোনো মানুষ এর প্রতিবাদ করছে না? সেটাও কথক দেখতে পারল তার পাশের টেবিলেই। টাটকা মানুষের মাংস খেতে খেতে একদল স্যুট-কোট পরা মানুষ মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা করছে। কি বোঝা যাচ্ছে না গল্পটা? যুদ্ধ আর ব্যবসার বলি হওয়া কোটি কোটি মানুষ আর দুমুখো কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর কথা ভাবলেই পরিস্কার হবে।
কি বোঝা যাচ্ছে লেখকের স্টাইল? হুম সেটাই, আপাত দৃষ্টিতে অবাস্তব আর অদ্ভুত ঘটনার মাধ্যমে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা-ই তুলে ধরেছেন লেখক। ডার্ক হিউমার, পরাবাস্তবতা, সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার-স্যাপার, ভৌতিক আবহ ইত্যাদি ব্যবহার করে লেখক এত নিপুণভাবে গল্পগুলো বলেছেন যে প্রায় প্রতিটা গল্পেই মুগ্ধ হতে হয়। হ্যাঁ প্রায় প্রতিটা, কেননা স্বভাবতই একটা সংকলনের একুশটা গল্পের মধ্যে দু-চারটা অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের হবেই। তাছাড়া কিছু গল্প যে মাঝামাঝি অবস্থাতে থাকতেই অনুমান করা যায় নি, সেটাও না। তারপরও প্রায় প্রতিটা গল্পের টুইস্টগুলো ভীষণ ভালো ছিল। একটি খুনের স্বীকারোক্তির শেষদিকের দু-দুটি টুইস্ট, বঙ্গবন্ধুকে চিঠির ছোট্ট একটা বাক্য, বিড়াল-পোস্টমর্টেম, গল্প না বা নিছক কল্পনা ইত্যাদি গল্পের শেষদিকের দু-চারটি কলমের আঁচড়-ই গল্পগুলো অনবদ্য করেছে।
আর যেটা বললাম, লেখকের সমাজ-সচেতনতার প্রশংসা করতেই হয়। ভঙ্গুর প্রশাসন, বিরোধীমত দমন, সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন, সমাজের তিলকে তাল করার প্রবণতা, বাকস্বাধীনতা, করোনা পরিস্থিতি, সংবাদপত্র ও কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর মূল্যবোধ ও ব্যবসা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, গৃহকর্মী নির্যাতন, পতিতাবৃত্তি ইত্যাদি বিস্তৃত পরিসরে কাজ করেছেন লেখক। আর লেখনী এত সরল অথচ এত টু-দ্য-পয়েন্ট যে মুগ্ধ হতে হয়। একদম মেদহীন লেখনী, লেখক যা বলতে চেয়েছেন সেটাই স্পষ্ট করে বলে গিয়েছেন প্রতিটা গল্পে।
তো শেষ করি এটা বলে যে লেখকের লেখনী ও বিষয়বস্তু নির্বাচনে মুগ্ধ হয়েছি। তো তাঁর বাকিগুলো পড়ার ইচ্ছা রইলো যত দ্রুত সম্ভব।