পৃথিবীর দুটো চরম সত্য হলো সৃষ্টিআর ধ্বংস। এই দুই মেরুর মাঝে লালিত হয় জীবন, যার জানালায়,দুয়ারে, ছাদে, অলিন্দেখেলে বেড়ায় রোদ, ছায়া, কুয়াশা, বৃষ্টি। এসব নিয়েই গড়ে ওঠে গান-গল্প-কবিতা । এমনই কিছু কথা অমোঘ জীবন দর্শনেররসে সিক্ত হয়ে কবিতা রূপে, কবি কাবেরী 'অপরাজিতা' দত্ত চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ার কবিতাগুচ্ছের সংকলন "গভীরে যাও" শীর্ষক বইটির মধ্যে সমাগত হয়েছে। এই কবিতার সংকলন পাঠকের নিজের মনের গভীরে ডুব দেওয়ারই আহ্বান। ~ সুমিত লাল চৌধুরী
ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর দুটো চরম সত্য হলো সৃষ্টি আর ধ্বংস। যেমনটা সত্য হলো জীবন ও মৃত্যু। এই দুই মেরুর মাঝে লালিত হয় জীবন যার জানালায়, দুয়ারে, ছাদে, অলিন্দে খেলে বেড়ায় রোদ, ছায়া, কুয়াশা, বৃষ্টি। এসব নিয়েই গড়ে ওঠে গান-গল্প-কবিতা, যা বলে আমাদেরই যাপনের অনেক অনেক অব্যক্ত অশ্রুত কথা। এমনই কিছু কথা অমোঘ জীবন দর্শনের রসে সিক্ত হয়ে কবিতা রূপে, কবি কাবেরী 'অপরাজিতা' চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ার কবিতাগুচ্ছের সংকলন "গভীরে যাও" শীর্ষক বইটির মধ্যে সমাগত হয়েছে। শিরোনামই ইঙ্গিত দেয়, কি বার্তা নিয়ে অর্ধশত কবিতার ডালি আমাদের সামনে সাজিয়ে এনেছেন কবি। জীবন মাত্রই ঠিক-ভুলের আলো ছায়ার মধ্যে হেঁটে যাওয়া সুদীর্ঘ পথ। সে পথে কখনো দুর্বাঘাস-ফুলের পাপড়ি, কখনো বা পাথর-কাঁটা ধুলোয় ভরা। এ পথে উত্থান ও পতন অনিবার্য। কবি কাবেরী চট্টোপাধ্যায় মহাশয়া, তার কবিতার মাধ্যমে তাই অক্লেশে ভয়-কুণ্ঠা হীন ভাবে হেঁটে যাওয়ার সাহস সঞ্চার করেন, প্রেরণা যোগান। "মন পালাবার পথ খুঁজতে গিয়ে,ওই ভয় জাগানো, কালো-অতল সাগরে ডুব দিল মুক্তির সন্ধানে!" এই পংক্তিটি সুস্পষ্ট ভাবে কবির জীবন দর্শনকে তুলে ধরে। বিপদ বা ঝুঁকির কুঞ্চিত ভ্রু'কে উপেক্ষা করে পতঙ্গের মতো শিখায় আত্মহুতিই যেন তার অধিক প্রিয়। তাই তো তিনি অকপটে লিখলেন "আমি শৈশব দেখেছি, তাই অচেনাকে ভয় করি না আর!" অতিমারিতে ত্রস্ত পৃথিবীর দৈন্যতার সম্মুখে ফিরে আসার শক্তি প্রয়োজন। এমন শক্তিশালী কবিতা, যা জীবনের পটে সেজে ওঠা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে জয়গান পাঠক মনে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে বৈকি। কবি'র কলম তাই গর্জে উঠে বলে- "না, এখানেই শেষ নয়- এ নয় সমাপ্তি! এ শুধু এক আচম্বিত বিরতি..." নুইয়ে পড়া, ভেঙে ঝুরো ঝুরো হয়ে ন্যুব্জ জীবনকে কাবেরী দেবীর কবিতা যেন নতুন মেরুদন্ড প্রদান করে, শক্তি যোগায় অনাবিল। কাবেরী দেবীর বৈচিত্র্যময় জীবনের একফালি, বিশিষ্ট কবি শ্রী পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের আলোকপাতে বইয়ের "কথা মুখে" উজ্জ্বল। পেশাদারি সাংবাদিকতা, সম্পাদনা, সাহিত্য শ্রম, ব্যবসায়িক উদ্যোগ- সব মিলিয়ে আমাদের মনে ওনার প্রতি বিপুল সম্ভ্রম জাগায়, জাগায় তার সাথে প্রশ্ন- ঠিক কোন কোন ধাতুর মিশ্রনে এমন মানবী সৃষ্ট হন! আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে ইস্পাতের প্রাচুর্য্যই, কিন্তু ওই ব্যক্তিত্বের বর্মে লুকোনো রয়েছে যে এক কিশোরী মন তা ধরা পড়ে বারে বারে তার শ্যামল নরম কবিতার স্পন্দিত পংক্তিতে- "কোথা থেকে পেঁজা পেঁজা মেঘে ছেয়ে গেল আকাশ/নীল...ঘন নীলের মাঝে রচিল ছন্দের... কবিতা।" প্রকৃতি প্রেমী মন শিলংয়ের রূপ আস্বাদন করতে করতে বলছে আবার- " এ কি স্বপ্ন রূপে বাস্তব, নাকি বাস্তব রূপে স্বপ্ন!" কবি কাবেরী চ্যাটার্জির কবিতা শৈলী স্বতন্ত্র। কবিতার আরাধনায় ওনার আরাধ্য স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ওনার কবিতায়, কবিগুরুর প্রতি তার অসীম শ্রদ্ধা ও আস্থা ফুটে ওঠে ওনারই কলমে- "হে কবি! তোমাকে দেব সব/ উজাড় করে দেব তোমার বাণী, তোমার ভাষা, তোমার পৃথিবী/তোমাকেই উজাড় করে দেব" কবিগুরুর প্রতি সমর্পিত মনের বহিঃপ্রকাশ এর চাইতে সুন্দর ভাবে বলা যায় কি না, জানা নেই। কবি নিজেকে 'অপরাজিতা' নামেই শুনতে ভালোবাসেন। বহুলাংশে তার কবিতা বাস্তবের জীবনযুদ্ধ আর অন্তরের চলমান দোলাচলের প্রতিচ্ছবি। জয়, পরাজয় আর অমীমাংসিত জীবনধারার গল্প। কবি জীবনের ভুল ত্রুটির ঔরসজাত কষ্টের কথা স্বীকার করেছেন আবার বলে দিয়েছেন তার উর্দ্ধে ওঠার মন্ত্র। পতনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে উত্থানের সূত্র, তা কবি বিশ্বাস করেন প্রবলভাবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভেসে ওঠে যে সব হতাশার দাপটে হেরে যাওয়া মুখের ভিড়, কবি তা অমূলক মনে করেন। নিকষ কালো রাতের পরেই যে একটা সুন্দর সকাল অপেক্ষা করে, কবি এই ভাবনাতেই বিশ্বাসী। এই বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত তার অপরিসীম সুন্দর পৃথিবীর প্রতি সুতীব্র টান, দুর্দমনীয় ভালোবাসা। তিনি তাই লিখছেন " আমার শিকড় আজও সজীব/প্রচন্ড ক্ষত, ভীষণ জ্বালা... যন্ত্রনায় কাতর/তবু সে হয়নি মৃত" এই পংক্তি পড়লে শিউরে ওঠে গা, ফুটে ওঠে রক্ত। জেগে ওঠে স্পৃহা, মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে যুদ্ধের, শেষ বিন্দু অব্দি লড়াই করার অদম্য সাহস! কবি কাবেরী 'অপরাজিতা' চট্টোপাধ্যায় মহোদয়ার কবিতার সংকলন নিজের মনের গভীরে ডুব দেওয়ারই আহ্বান। এই অবগাহন প্রয়োজন নিজের অন্তরালে বিস্মৃত সম্পদকে আবিষ্কার করতে। এই আবিষ্কারই একমাত্র পথ উত্তরণের। কবি'র কবিতার একটি পংক্তি ব্যক্ত করে ওনার কালজয়ী দর্শন "মহাকাল বুঝিয়ে গেল আমি মরিনি। আমি অপরাজিতা।" সু-গভীর দর্শনের মোড়কে পঞ্চাশটি কবিতা হতাশার মাটিতে রোপণ করা পঞ্চাশটি শুভ আশার চারাগাছ, যা "গভীরে যাও" বইটিকে অনন্য, সুপাঠ্য ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। কবি কাবেরী চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ার সুযোগ্য পুত্র শ্রী অনীশ চট্টোপাধ্যায়ের শৈল্পিক গুণে বইয়ের প্রচ্ছদ, কবি'র দর্শনের আক্ষরিক প্রতিফলন। মনের অতল যেন প্রচ্ছদের ওই সমুদ্র নীল যার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে নিজের সত্বার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়া পাঠক মন। 'লিমেরিক লাভার্স পাবলিশার্সের' উদ্যোগে এবং এই মুদ্রণ সংস্থার পরিচিত পেশাদারিত্বে ঝকঝকে এই বইটি পাঠক মন জয় করবে এক নজরেই। সুপাঠ্য এই কবিতার বই শুধু কবিতার বই হয়ে নয়, বরং প্রয়োজনীয় প্রাণবায়ু যোগান দেবে হরেক বয়সী প্রাপ্তমনস্ক কবিতাপ্রেমীদের, আগামীদের।