সভ্যতা থেকে অনেক দূরে কোন দুর্গম অঞ্চলে যখন শেষ বিকালের আলো নিভে আসে তখন একটা মাথা গোঁজার ঠাইয়ের কথা ভাবতে হয়। সারাদিনের ক্লান্ত শরীর বিশ্রাম নিয়ে চায়, কিন্তু ক্ষিদে মিটাতে আগুন ধরিয়ে চুলায় রান্না বসাতে হয়। শুতে যাওয়ার সময় বুনো পরিবেশের নিস্তব্ধতা চিড়ে দেওয়া ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, সকালে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেওয়া পাখিদের কোলাহল আর সূর্যের প্রথম কিরণ এসবই আমাদের প্রকৃতির ছন্দের সাথে একাত্ন হতে শিখায়।
আমাদের আটকে পড়া গৎ বাঁধা শহুরে জীবনের সাথে প্রাচীন যুগের যাযাবরদের মুক্ত জীবন যাপন পদ্ধতির একটি সংযোগ হচ্ছে ট্রেকিং। কোন ট্রেক শেষে ফিরে আসার পর এক অনাবিল আনন্দ সমস্ত সত্তা জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। নিজের জীবন সম্পর্কে জন্মায় এক নতুন ধারণা।
ট্রেক করার সময় অচেনা পরিবেশ ও পথে নানা রকম অনিশ্চয়তা রোমাঞ্চ হিসেবে আমাদের সামনে চলে আসে। আমরা এই অনিশ্চিত পরিস্থিতির সাথে কিভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারি এর উপরই ট্রেকিংয়ের আনন্দ পুরোপুরি নির্ভর করে। সেই আনন্দকে বাড়িয়ে দিতে ট্রেকিং সম্পর্কিত প্রাথমিক পথ প্রদর্শক ধারার বই ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি।
আমার দেখা সকল আলসে মানুষ- পাহাড়ে যান। আলসে তো আলসে একেবারে রাজ আলসে একেকজন। একেবারে ডেডলাইনের শেষ মুহুর্তে কাজ শুরু করে। শেষ করতে পারার কথা তো নাই। পারলেও কোনমতে শেষ করা আরকি। এই যে ভোগান্তি পুরো টিমের, সেইটা পুষিয়ে দিয়ে আসে নিজে পাহাড়ে গিয়ে। প্যারা ট্যারা খেয়ে একেবারে নাজেহাল হয়ে ফেরত আসে এই লোকগুলোই। এরপরে আবার যে সেই।
কিন্তু, এই একটা জায়গাতেই ওনাদের নিষ্ঠা, একাগ্রতা, উদ্যম প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে রাখে। তারই ধারাবাহিকতায় স্টাডি করেন একেকজন, ট্রায়াল এন্ড এরর করে করে একটা জিনিস নিখুঁত করে নেন। ট্রেকিং বিষয়টা তাই শ্রদ্ধার সাথেই দেখি। নিজের গন্ডি থেকে বেরোনোর ভয় থেকেই আর পাহাড়ে যাওয়া হয়না, করা হয়না এক্সট্রিম ট্রেক।
আমার মত ট্রেকিং ভয়কাতুরে লোকের জন্য নিঃসন্দেহে একটা গাইডবুক এটি। আরেকটু ছবি থাকলে একেবারে ৫ এ ৫ বসিয়ে দেওয়া যেতো।
বেশ দারুণ বই। এ ধরনের বই বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। কারণ, এখানে ঐতিহ্যগতভাবে হাইকিং-ট্রেকিংয়ের সংস্কৃতি ছিল না। তাই সে সম্বন্ধে বই পুস্তকও রচিত হয়নি। নানা কারণে গত ১০-১৫ বছরে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ট্রেকিং সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছে। আর তার প্রেক্ষিতেই অনেকদিন ধরে এ বিষয়ের উপর প্রয়োজন ছিল উপযুক্ত কিছু বই ও ভিডিও। সালেহীন আরশাদী রচিত 'ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি' বইটি বাংলাদেশে ট্রেকিং বিষয়ক রিসোর্সের একটি অভাব পূরণ করলো।
এর আলোচ্য বিষয় বিগিনার লেভেলের ট্রেকারদের জন্য। লেখকের লেখার ধরন বেশ দারুণ। সহজেই পড়া যায়, আনন্দও পাওয়া যায়। এখানে যা আলোচিত হয়েছে তা একজন উঠতি ট্রেকারকে ভালো মানের ট্রেকার হবার পথে গাইড করবে। বই প্রকাশের ব্যাপারে প্রকাশক যথেষ্ট যত্নবান। ভেতরের সজ্জায় রুচিশীলতা চোখে পড়ার মতো। অন্যান্য প্রকাশনীর বইও এমন সাজানো গোছানো হওয়া উচিত।
বাংলা ভাষায় এ বিষয়ের উপর এমন বই আরো হোক, এ ধরনের বইয়ের সমাদর আরো বাড়ুক।
লকডাউন, কঠোর লকডাউনের পর যখন দেশে 'শাটডাউন' চলছে, এমন একটা সময়ে ১-২ জুলাই ঘরে বসে বসে পাহাড়ে না যেতে পারার আক্ষেপ মেটাতে পড়ে ফেললাম 'ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি' বইটা। একেবারে নিখাঁদ ননফিকশন এবং আদতে গাইড-বই হওয়া সত্ত্বেও, পুরো সময়টা নিজেকে কল্পনায় পাহাড়ে, ঝিরিতে দেখতে পেয়েছিলাম। যারা ট্রেকিং মিস করছেন, এই সময়টাতে উল্টেপাল্টে দেখতে পারেন বইটা। এবার ভেতরের কথায় আসি। আমরা যে যতটুকু অভিজ্ঞতা নিয়েছি ট্রেকিংয়ের, সবার ক্ষেত্রেই এটা সত্য, যে, যতবার ট্রেকিং করার সুযোগ হয়, তত পরিণত চিন্তা করতে শিখি আমরা। আমাদের প্রায় সবারই শুরুটা বোধহয় হয়েছে আমার মতো : টার্ম ব্রেকে বাড়ি যাবার জন্য যত জামাকাপড় ব্যাগে ভরেছিলাম, সব নিয়েই কমলাবাজার থেকে বগালেক উঠেছিলাম। ব্যাগের ওজনকে পাত্তা না দেওয়ার ওই ভুল জীবনে দ্বিতীয়বার আর করিনি। বাংলাদেশে আমরা যারা পাহাড়ে যাই, অধিকাংশই 'গাইডেড ট্যুর' দিই। টাকা ঢাললে পাহাড়িরা রীতিমতো কোলে করে পাড়ায় নিয়ে পৌঁছায় আমাদের, ফেরতও দিয়ে যায়। খাওয়া/পানির চিন্তা করতে হয় না, রাতে থাকার জায়গা বা বিছানার চিন্তা নাই। এর বাইরেও, নিজেকে প্রকৃতির হাতে সঁপে দিয়ে, সব দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েও ওসব জায়গায় যাওয়া যায়। Wild, অথবা A Walk in the Woods সিনেমাগুলো যদি দেখে থাকেন, সেরকম চিত্রই দেখতে পাবেন। এভাবে, প্রকৃতির মাঝে বেড়াতে যেয়ে নিজের দায়িত্বে কিভাবে তা সমাধা করে আসতে হয়, তারই একটা নমুনা আছে 'ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি'-তে। বইয়ের অধ্যায়-বন্টনে তাকালে দেখা যাবে, একদম শুরুর কাজ, অর্থাৎ, প্রস্তুতি, সাজসরঞ্জাম (ইক্যুইপমেন্টস), পরিকল্পনা থেকে শুরু করা হয়েছে। তারপর ব্যাগ কিভাবে প্যাক করতে হবে তার ওপরও আছে এক অধ্যায়। নেভিগেশন, খাবার-দাবার, ক্যাম্পিং, আগুন, রোগ-বালাই এইসবের ওপর একেকটা করে অধ্যায় আছে। আমার পছন্দের একটা অধ্যায় হলো 'ট্রেক নীতি', যেখানে ট্রেকিং কে করে কেন করে, আমি কেন করছি, এইসব নিয়ে চিন্তা করতে আর সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো হয়েছে। সুন্দর ব্যাপার হচ্ছে, পুরো বইটা সাজানো হয়েছে 'আমি যদি এটা জানতাম তবে কি করতাম' এই ধাঁচে। খাদ্যতালিকায় পুষ্টি কি কি লাগে, সাথে নিউট্রিশন টেবিল উল্লেখ করে আমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। একেক ধাঁচের টেরেইনের জন্য বা লোকসংখ্যার জন্য কি কি প্রযোজ্য তা দেখানো হয়েছে, যাতে করে আমার ক্ষেত্রে কোনটা উপযোগী তা স্বাধীনভাবে আমি ভেবে নিতে পারি।
কিছু বইয়ের কাছে বারবার ফিরতে হয়, এই যেমন আয়মান সাদিকের ডিজাইন করা 'ট্রাভেল বাংলাদেশ' বইটা আমি যেকোন নতুন জেলা ঘুরতে যাবার আগে হাতে নিই সবার আগে। এখন দেখতে পাচ্ছি কখনো পাহাড়ে যেতে হলে প্রস্তুতির নানাদিক মিলিয়ে দেখতে হবে 'ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি'র সাথে। এই ধাঁচের বই বাংলা ভাষায় আগে লেখা হয়ে থাকলেও বাংলাদেশে এটাই প্রথম। উল্লেখ্য, অন্যগুলো এদেশে তেমন সুলভ না। অদ্রি এবং লেখককে ধন্যবাদ এই উদ্যোগটি নেওয়ার জন্য। সালেহীন আরশাদীর লেখা সুখপাঠ্য। কিছু সংকলনে লেখা দেওয়ার বাইরেও ফেইসবুকে প্রকৃতি ও ভ্রমণ নিয়ে লেখালেখি করেন।
"ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি" বইটির কভারে নাম দেখলেই সবার মনে হতে পারে, কেবল পাহাড়-পর্বতে ট্রেকিং করতে চায় এমন মানুষদেরই এই বই পড়া উচিৎ। এই ধারণা অবশ্যই সত্যি, কিন্তু এই সত্য ছাপিয়েও বইটা আমাদের সবার জন্যেই পড়া উচিৎ! সবার কেন পড়া উচিৎ, সেটা শেষেই বলি। আগে "ট্রেকিংয়ে আগ্রহী" মানুষদের জন্য কি লেখা আছে সেসব নিয়ে বলার চেষ্টা করি।
প্রথমেই বলি বইটা যেহেতু ননফিকশান, তাই অনেকের মনে হতে পারে ভুরিভুরি গাইডেন্স কিংবা কাটখোট্টা শারীরিক শিক্ষার মতো একটা বই এটা। কিন্তু, পড়া শুরু করলে বুঝতে পারা যায় লেখক প্রয়োজনীয় সকল তথ্য-উপাত্ত এবং সেসবের গাইডেন্স ছাড়াও ট্রেকিং যে একটা জীবনদর্শন হতে পারে সেটার একটা সম্যক ধারণা দিয়েছেন। সাথে নিজের প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতার ভান্ডার থেকে কিছু ছোট-খাটো টোটকা দিয়েছেন। ফলে, বইটা পড়তে গিয়ে মনে আরো বেশি উদ্দীপনা আর উৎসাহ কাজ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় বইয়ের শুরুতেই "ট্রেকিং কী?" ডেফিনেশানে লেখক লিখেছেনঃ "ট্রেকিং একটি লাইফস্টাইল যা আমাদের শেখায় কম জিনিস দিয়ে কিভাবে প্রকৃতিতে টিকে থাকা যায়।"
এই সংজ্ঞা থেকে শুরু করে সোলো অথবা দলগত ভাবে কোন পরিবেশে কিভাবে ট্রেকিংয়ের পরিকল্পনা করতে হয়, নিজের ব্যাকপ্যাকে কী-কী সাজসরঞ্জাম থাকা উচিৎ, খাদ্য তালিকা কোন খাদ্য কি পরিমান থাকা উচিৎ , নেভিগেশান, ক্যাম্পিং, সম্ভব্য বাধা বিপত্তি- রোগ বালাইর অবস্ট্রাকল পা�� করা থেকে শুরু করে সুঁই-সুতোর কি কাজ থাকতে পারে সেইসবের নিঁখুত বর্ণনা দিয়েছেন।
তবে, এসব ছাড়িয়েও ব্যাক্তিগত ভাবে আমার সবচে' ভালো লেগেছে লেখক এখানে ট্রেকিংয়ের কোন নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড সেট করতে চাননি। বরং আমাদের প্রত্যকেরই যে আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে, সেইসব বৈশিষ্ট্যের সাথে কিভাবে এডাপ্ট করলে নিজেদের ট্রেকিং আরো বেশি উপভোগ্য এবং অর্থবহ হবে তা এক্সপ্লেইন করেছেন।
ট্রেকিংয়ের এতসব খুঁটিনাটির বিশুদ্ধ বিবরণ অনন্ত বাংলা ভাষায় আর একটিও নেই। ফলে, বইটা ট্রেকিংয়ে আগ্রহীদের জন্য অসম্ভব জরুরী একটি বইয়ে রূপ নিয়েছে। এবং ভালো বিষয় হচ্ছে মাত্র ২২০ পৃষ্ঠার বইটা এত হ্যান্ডি যে চাইলে পকেটেও গুজে রেখে নিশ্চিন্তে ট্রেকিং শুরু করা যাবে।
এবার বলি পাহাড়-পর্বতে আগ্রহী হওয়া ছাড়াও আমাদের সব মানুষের যে জন্য বইটা পড়া উচিৎ তা হচ্ছে; "প্রকৃতি"। হিউম্যান সিভিলাইজেশানের শুরু থেকেই আমরা মানুষেরা এই প্রকৃতির বিশাল এবং সবচে' বেশি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মনে করলেও সমস্ত প্রাণিজগৎ এবং উদ্ভিদ জগতের ক্ষতি করতে-করতে পৃথিবী নামক গ্রহের সবচাইতে বেশি ক্ষতি আমরাই করেছি। অথচ, আমরা দাবি করি এই পৃথিবী আমাদের মানুষদের পৃথিবী।
তাই, এখন সময় এসেছে প্রকৃতির কাছে নিজেদের কলঙ্ক গুছানোর। কিভাবে প্রকৃতির কাছে নিজেদের সেই কলঙ্ক গুছাবো তার কয়েকটা মেটাফর আছে এই বইতে। একটা উদাহরণ দেই; আমরা সাধারণত কোথাও ঘুরতে গেলে পানিতে খাবারের অবশিষ্টাংশ ফেলে দেই, ভাবি যে পানিতে থাকা মাছেদের খাদ্য দিয়েছি, খারাপ কিছুতো করিনি। কিন্তু, লেখক এসব খাদ্যের অবশিষ্টাংশ ফেলতে নিষেধ করেছেন। কারণ, পানিতে থাকা মাছেদের খাদ্যাভাসের সাথে মানুষের স্বাদ বা খাদ্যভাসের কোন মিল নেই। ফলে, আমাদের খাদ্য খেয়ে মাছের খাদ্য সার্কেল নষ্ট হয়ে যায়। এটা প্রাকৃতিক উপাদান পানি এবং মাছ উভয়ের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর, যার নেতিবাচক প্রভাব পাই আমরা দীর্ঘদিন পরে। এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে নিঁখুত অথচ সহজ করে লেখা এই বইটি আমাদের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রকৃতির প্রতি আরো বেশি সদয় হবার জন্য গভীর উপলব্ধিতে সাহায্য করবে। শুধুমাত্র বিশাল প্রকৃতির অংশ "মানুষ" হিসেবে প্রকৃতিকে কিভাবে আরেকটু ভালোভাবে ব্যবহার করে পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য করে তুলতে পারি সেজন্য হলেও আমাদের অন্তত একবার বইটি পড়া দেখা হতে পারে চমৎকার একটি বিষয়!