Dhansere started on January 12, 2012 and has been producing quality books to connect authors and readers. Deliberately and resolutely independent, Dhansere maintains close relationships with the authors, designers and printers we work with to ensure that everyone involved in the production of one of our volumes gets a fair deal, as well as supporting local, independent business. We believe that a story can evoke a large range of emotions; they can make you cry, make you laugh and, most importantly, change a life. All of our books and authors are enormously special in their own way. We are completely dedicated to each of our authors, and work hands on with authors and media contacts in order to give every book the best start in life. Our publishing expertise has turned debut authors into bestsellers. That’s why we don’t offer one-size-fits-all publishing deals. Instead, we work closely with our authors on an individual basis to provide the support and publishing expertise you need. We do hope you enjoy perusing the witty, irreverent, radical and brilliant selection of books we have here.
বিবিধ বিষয় নিয়ে বইটি। তবে প্রাধান্য পেয়েছে স্মৃতিচারণ। কদিন আগেই রাহুল সাংকৃত্যায়নের ভবঘুরে শাস্ত্র পড়েছিলাম। সেই ভবঘুরের নীতির সাথে সন্মাত্রানন্দের অনেকটাই মিল।
স্মৃতিচারণ হলেও আসলে বইটিতে কথা রয়েছে মানুষের। কত কত মানুষ, কত অজানা গল্প তাদের। কেউ বাউল, কেউ শিক্ষক, কেউ বা আধপাগল! তবু তাদের মধ্যেও যে দার্শনিক হয়ে বসে আছে কেউ কেউ, সেই খোঁজ খুঁজতে যাওয়ার ধৈর্য আমাদের মতো সাংসারিক মানুষের থাকেই না বোধহয়।
নদী, পাখি, প্রজাপতি সমস্তকিছুকে ভালোবাসা আর সেই ভালোবাসার কথা এমন মোহময়, মায়াময় করে লেখার কলম বোধহয় বাউণ্ডুলের হাতেই মানায়, আর তাঁদের হাতেই বোধহয় ভালো খোলে কলমটা। প্রকৃতির উদারতার জন্যই এমন হয় হয়তো।
ধুলামাটির বাউল বইতে বাউল এর আদি অর্থ থেকে একটু সরে এসেছেন লেখক, তাঁর লেখায় তাই মনু নদী আর মনু বাউলানি একাকার হয়ে যায়।
ছোট ছোট সব লেখা। কী যে মিষ্টি! টুকটুক করে কেবল পড়তেই ইচ্ছে করে। পড়তে পড়তে ভাবনা পেয়ে বসে রাশি রাশি। সমস্ত ভাবনা হয়তো কোন তীরে এসে পৌঁছায় না, তাই এই ধরনের বই আসলে সমাপ্তও হয় না। মানুষের জীবন যতদিন আছে, এই ভাবনারাও ততদিন ডানা মেলে উড়তে থাকবে আকাশে...
ভীষণ রকম মুগ্ধতা নিয়ে পড়লাম। ছোট ছোট লেখা। কখনো নদীকে নিয়ে, কখনো মানুষকে নিয়ে, কখনো নদী বা বৃষ্টি বা গাছ নিয়ে। ছোট ছোট বিষয়কে কি মায়াময় করে লিখেছেন।
"এই পৃথিবী বাউলের এবং এখনও অবধি আমি একজন মানুষকেও দেখিনি, নিহিত পরিচয়ে যে বাউল নয়। যতই সে ঘর বাঁধুক, যতই সংসারে জড়িয়ে পড়ুক, প্রতিটি মানুষেরই ভেতরে এই বাউলের বীজ আছে। জাগ্রৎ থেকে স্বপ্নে, স্বপ্ন থেকে সুষুপ্তিতে, সুষুপ্তি থেকে আবার জাগরে, শিশুকাল থেকে কৈশোর-যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে, জন্ম থেকে জন্মান্তরে, ভালোবেসে ব্যথা পেয়ে আবার আনন্দদেউল ছুঁয়ে ছুঁয়ে মানুষের আত্মা চলেছে তীর্থ থেকে তীর্থান্তরে, চলার পথ তার কখনো ফুরিয়ে যায় না।" চলার এই ধুলা মাটির পথেরই টুকরো টুকরো অনুভব, মায়া, প্রকৃতিসঙ্গে বিলীয়মান সত্তার আর্দ্র প্রতিচ্ছবি, পথ চলতে চলতে মিলে যাওয়া সহ-পথিকের মায়ামেদুর ছবি- এসবই সযত্ন মায়ায় গাঁথা হয়েছে 'ধুলা মাটির বাউল' এ। সুদক্ষ কথক সন্মাত্রানন্দ। একান্ত ব্যক্তিগত একটি নদী বয়ে চলা লেখকের অনুভবের অক্ষরগুলো এত প্রগাঢ় মায়ায় মেশানো যে তাকে দূরের কিংবা অন্য লোকের বলে বোধ হয় না। লেখক যেমন বলেছেন নিহিত পরিচয়ে সকলেই বাউল- বাস্তবিকই হয়ত তাই। তাই যে পাঠক বাউল মন নিয়ে জাগতিক পরিসরে আটকে আছে সে হয়ত বইটি পড়তে পড়তে নিজেকেও মেলে দেয় ধূলোপথে কিংবা নিশ্চিন্দিপুরের স্মৃতিমায়ায়। কেমন এক সহজ হৃদয়নিংড়ানো অনুভব- নিহিত পরিচয়ে প্রত্যেকেই যেমন বাউল, তেমনি প্রত্যেকের ভেতরে ঘুমিয়ে আছে একজন করে অপু- ''আবার মনে হতো, আমিও কি নই অপু? আমরা? প্রত্যেকেই?আমরা ভুলে গেছি আমাদের 'অপুত্ব', তাইতো এত অবসাদ, এত দুঃখ। ভেতরে অপু আছে, তাকে ঘুম পাড়িয়ে আমরা সকলেই শ্রীযুক্ত অপূর্ব রায় সেজে বসেছি। সে সত্ত্বেও বুকের পাঁজরঘেরা বেড়ার ঘরে অপু ঘুমায়। যদি একবার ডাক আসে ওই নীল আকাশটার গা থেকে, বিছানার উপর আড়মোড়া ভেঙে চোখ কচলে আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই সেই 'অপু' জেগে উঠবে। অপুর ঘুম না ভাঙলে শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, আধ্যাত্ম কিচ্ছুটি যে হবার নয়!"
সাধনতত্ত্বের যে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তাৎপর্যে ‘বাউল’ শব্দটি আমরা সুধীর চক্রবর্তী প্রমুখের লেখায় পাই, সন্মাত্রানন্দ সেই অভিপ্রায় থেকে সরে এসে শব্দটিকে খুঁজেছেন ‘বাতুল’ এবং ‘বাউন্ডুলে’তে – “‘বাউন্ডুলে’ শব্দ থেকে যদি ‘বাউল’ এসে থাকে, তবে সেই উৎস-নির্দেশের সঙ্গেই আমার এ লেখাগুলি অধিক সাযুজ্যপূর্ণ।” সে কারণেই নদীবিলাসী মানুষটির প্রিয়া মনুনদী হয়তো হয়ে ওঠে উৎসর্গপত্রের ‘মনুবাউলানি’ – অস্থির, চঞ্চলমতি যে কেবল পথে নামারই ডাক দেয়। বইয়ের প্রথম পর্ব সব অর্থেই ভ্রাম্যমাণ, বাউন্ডুলে – লেখকের জীবনবোধের শিকড়, কাণ্ড, শাখা-প্রশাখায় সে ছুটে বেড়ায় অনায়াসে। কখনও বেলুড় মঠ, কখনও মেদিনীপুর, কখনও উত্তরাখণ্ডের মায়াবতীর অদ্বৈত আশ্রম পেরিয়ে পুরনো লোহাঘাট, আবার পরমুহূর্তেই সুদূর দক্ষিণের কপালীশ্বর কোয়েল – অবিচ্ছিন্ন অন্তর্কথন বয়ে যায় এই সমস্ত অক্ষ-দ্রাঘিমারেখা পেরিয়ে। মিশে যেতে থাকে স্মৃতির প্রকোষ্ঠগুলি একে অন্যের সঙ্গে; সন্ন্যাসজীবনের অভিজ্ঞতার নিচে পূর্বাশ্রমের স্মৃতির চলন, বা শৈশবের স্মৃতির অন্য পিঠে সন্ন্যাসের প্রাতিষ্ঠানিকতা-পরবর্তী বাউলজীবনের যাত্রাপথ নির্দেশিত হয়।
নিশ্চিতভাবেই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এই আলোচনা যদি না প্রকৃতির সঙ্গে লেখকের যে ঘনিষ্ঠ আলাপ, তার উল্লেখ করি। সন্মাত্রানন্দের প্রাকৃতিক দৃশ্যকল্প বিভূতিভূষণকে মনে করায়, কিন্তু একইসঙ্গে সেই দৃশ্যে মিশে থাকে রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক নিবদ্ধতা, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়র্থ, ওয়াল্ট হুইটম্যান, বা হেনরি থ্যুরোর ‘প্যান্থেইজম’ – যা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না ঈশ্বরকে, যে দর্শনে এই ঘটমান ব্রহ্মাণ্ডই ঈশ্বর। প্রথম পর্বের ‘প্রকৃতিসম্বোধন’ বা দ্বিতীয় পর্বের ‘প্রকৃতিপ্রণয়ব্যথিত’ অধ্যায়গুলি তো বটেই, তার বাইরেও বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে আঁজলা ভরে অমৃতপানের আখ্যান – “ওই নদী ... এই আকাশ ... এই গাছপালা ... মানুষ ... আকাশজোড়া কত তারা ... এই বিরাট প্রকৃতিই আমার সাধনসঙ্গিনী।”
বৌদ্ধিক সংবেদন এই বইয়ের লেখাগুলির মূল সুর। কাব্যধর্ম, অভিমান, নির্মল হাস্যরস ও বিষাদ প্রাণসঞ্চার করে প্রতি ছত্রে। স্থানবিশেষে কিছু বর্ণনা হয়তো অতিমাত্রায় কাব্যময়, বা শ্রীমা সারদাদেবীকে লেখা মনোগত চিঠি অথবা স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে লেখকের নির্জন কথোপকথন ভাবাধিক্যে হয়তো বা বইয়ের দুটি পর্বের পরিসরেরই অতীত। তাঁরা যত না পথের সঞ্চয়, তারও চেয়ে বেশি সন্মাত্রানন্দের দর্শনের মর্মস্থল।
(বইয়ের দেশ - এ প্রকাশিত হয়েছিল সম্পূর্ণ রিভিউটি)
“...পথ দিয়ে হাঁটছি, পথের পাশে গন্ধরাজ ফুলের গাছ আমাকে নাম ধরে ডাকছে, মনে হচ্ছে যেন কিশোরী একটি মেয়ে মুখে হাত চাপা দিয়ে অর্ধস্ফুট শব্দে হেসে উঠল। খুব চটুলা হয়েছিস তো, সুগন্ধবতী? উত্তর না দিয়ে আরও উতরোল কোনো পরিহাসে এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে। এবং সেই মাঠের ধারে অর্জুন গাছটার গম্ভীর প্রবীণ ভাব, দার্শনিকের মতো মাথা তুলে রেখেছে, আর তার ডালগুলো বিকেলের বাতাসে থিরথির করে কেঁপে উঠে আমাকে বলছে, 'নেতি, নেতি, নেতি'। তুমি দেহ নও, মন নও, বুদ্ধি নও, অহমিকা নও, জড় নও, তুমি আসলে আমিই, আমি তুমিই। কোথা থেকে একটা পাখি বাসন্তী রাত্রির নৈঃশব্দ্যকে কানায় কানায় ভরিয়ে তুলে আমার শিয়রে বারবার বলত, 'ত্ব-���ে-বা-হং, ত্ব-মে-বা-হং' তুমি আমিই, তুমি আমিই। লোকে ওদের নানা নামে ডাকে। বাঙালিরা নাম দিয়েছে, 'বউ কথা কও', ককবরক ভাষায় ওদের নাম 'কক্ তা সাদি'— কথা বোলো না। আমি কিন্তু শুনতাম, 'ত্ব-মে-বা-হং, ত্ব-মে-বা-হং'— তুমি আমিই, তুমি আমিই। আর সেই তক্ষক বা টোককে, যে একটানে বলে যেত, 'তৎ সৎ, তৎ সৎ' — সেইই একমাত্র সত্য, আর সব অলীক, অচিরস্থায়ী স্বপ্নবৎ৷ মোহময়ী প্রকৃতি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলছে, চুপ করো। আমিই তোমার শিক্ষিকা, তোমার আচার্যা, অতি সাবধানে যা বলছি, শ্রবণ করো৷ আমাকে প্রেমিকারূপে পেতে হলে তোমাকে জ্ঞানী হতে হবে৷ তোমাকে আমার যাজ্ঞবল্ক্য হতে হবে, তবেই হব আমি তোমার প্রিয়দয়িতা মৈত্রেয়ী।”
আদ্যা চিরন্তনী প্রকৃতি যেমন ভবঘুরে মানুষের থিতু হবার রসদ জুগিয়ে সূচনা করে নতুন সভ্যতার, তেমনি কখনও নতুন করে জাগিয়ে তোলে তার চিরপথিক প্রবৃত্তিকে। মৃত্যুনদীতে স্নান করিয়ে আবার জীবনের উপত্যকা বেয়ে নিয়ে যায় নতুন কোনো উপলব্ধির শিখরে। অবিচ্ছিন্ন হয়েও বিচিত্র তার রূপ, বিবিধ তার অনুভব৷ তাই তো বহুযুগ আগের এক বৈশাখী পূর্ণিমার রাত্রিতে যে অমোঘ আকর্ষণে শাক্যসিংহ বাধ্য হয়েছিলেন প্রাসাদ ছেড়ে ধুলিধূসর পথে নামতে, সেই আহ্বান কেউ হয়তো পায় টেলিস্কোপে চোখ রেখে দেখা কোনো এক প্রাগৈতিহাসিক নীহারিকার অচেনা এক নক্ষত্র থেকে ছুটে আসা আলোর ঝর্ণাধারায়, কেউ বা দেখে মাইক্রোস্কোপের অবজেক্টিভের নিচে কোষকলার সুনিপুণ বিন্যাসে৷ ঘরছাড়ার সুর— সে তো প্রকৃতি তার প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ের তন্ত্রীতেই বেঁধে দেয়, কিন্তু সেই সুরের টানে ঘর ছাড়া সবার হয়ে ওঠে না। সিদ্ধার্থের মতো রাজবেশ ছেড়ে কজনই বা অঙ্গে জড়াতে পারে শ্মশানের সেই পরিত্যক্ত বস্ত্র, মাটির রঙে নিজেকে রাঙিয়ে যে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেছে তার পূর্বাশ্রমের স্মৃতি — ঠিক যথার্থ সন্ন্যাসীর মতো। লিখতে বসেছি যে বইখানা নিয়ে, তা এমন একজনের গল্প, যিনি ধুলোমাটির পথ আর গৈরিকা স্রোতোস্বিনীর টানে সত্যি সত্যিই বেরিয়েছিলেন পথে৷ অবশ্য এখানে আত্বজৈবনিক উপাদান নেহাতই সামান্য৷ ভাগীরথীর তীরে সন্ন্যাসে দীক্ষা; তারপর সেই যে মাধুকরীর 'সাপি' কাঁধে উঠল, তাকে নিয়েই ঘুরে বেড়ালেন গঙ্গা থেকে শুরু করে কাবেরী-গোদাবরীর তীরে, আর সাপিতে জমালেন পথের গল্প। সে গল্পগুলো সাপি থেকে বেরিয়ে রূপ নিল এক গেরুয়া প্রচ্ছদের বইয়ের, নাম “ধুলা মাটির বাউল”। বইটির দুটি অংশের মধ্যে প্রথমটির নামেই বইটির নামকরণ, তাতে আছে তাঁর জীবনপথের বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প, বেশিরভাগই সন্ন্যাস পরবর্তী, অল্প কিছু পূর্বাশ্রমের আবছা স্মৃতি। আর দ্বিতীয় অংশটি তাঁর বিবেকনগর স্কুলের দায়িত্ব পালনকালে ত্রিপুরাতে কাটানো সময়ের আলেখ্য, নাম “ধুলামাটির ঘরবাড়ি”। মোট ৫৫টি আপাত বিচ্ছিন্ন মুক্তগদ্যের এই সংকলন, তার উপজীব্য চেনা-অচেনা নানা মানুষ, মানবিক আবেগ, উচ্ছ্বাস কিংবা প্রকৃতিবন্দনা। তবে সবগুলো কোথায় যেন একসুরে বাঁধা— যে সুর প্রতিনিয়ত উৎসারিত হচ্ছে বিশ্বপ্রকৃতির প্রতিটি ধুলিকণা থেকে, যা হাজার হাজার বছর আগে ধরা পড়েছিল বৈদিক ঋষিকবিদের চেতনায়, আর যা আজও বাজে বাউলের একতারার তানে।
This entire review has been hidden because of spoilers.
ধুলামাটির বাউল - সন্মাত্রানন্দ রচিত একটি মুক্তগদ্যের সংকলন। বইটির নামের মধ্যেই কেমন যেন মাটির গন্ধ পাওয়া যায়, তাই না। বইটি যখন কিনি, তখন বইয়ের নাম আর প্রচ্ছদ দেখেই খুব আগ্রহী হয়েছিলাম। তার আগে অবশ্য সন্মাত্রানন্দের "নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা", "ছায়াচরাচর", "তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনি", "ভামতী অশ্রুমতী" পড়া হয়ে গেছে, তাঁর লেখার প্রতি ভালোবাসা, মুগ্ধতা এবং প্রত্যাশা জন্মেছে। "ধুলামাটির বাউল" বইটিতে মোট ২০ টি গদ্য আছে।
বাউল শব্দটি শুনলে, যে ছবিটি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে , তা হলো গ্রামের মাটির ধুলামাখা পথ ধরে গান গাইতে গাইতে আপন মনে হেঁটে চলেছেন একজন মানুষ,উদাস তাঁর দৃষ্টি আকাশপানে চেয়ে আছে, আর হাতে একতারা। তবে, এই বইটি কিন্তু সে অর্থে কোনো বাউলের বা বাউলদের জীবনাশ্রয়ী লেখা নয়, বরং এটা বলা যেতেই পারে যে, এ বই আমাদের প্রত্যেকের মনের মধ্যে লুকানো বাউলটিকে খুঁজে পাওয়ার রাস্তার সন্ধান দেয়।
বাউন্ডুলে- ঘরছাড়া জীবনের কথা সহজ ভাবে এবং কিছুটা গল্পচ্ছলে বলা হয়েছে এই বইটির মাধ্যমে এবং সেখানেই তার মাধুর্য। লেখকের আত্মজীবনী মূলক উপাদান স্বল্প পরিমাণে থাকলেও, মূলত ঘরছাড়া, মুক্ত, বিবাগী জীবনের চিত্রই পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে তাঁর লেখাগুলির মধ্য দিয়ে। তাঁর ভ্রাম্যমাণ "বাউন্ডুলে" জীবনের পথের পাশে জুটে যাওয়া মানুষজন, নানা অভিজ্ঞতা, আর ভাবনাগুলিই এই বইটির মূল উপজীব্য। গল্পের আদল কিছু ক্ষেত্রে তৈরী হলেও, মুলত একাকী, নিঃসঙ্গ জীবনের অনুভবগুলিই তাঁর এই বইয়ের প্রধান বিষয়বস্তু। নির্মোহ এবং নৈর্ব্যক্তিক লেখাগুলি অসাধারণ বাক্যবিন্যাস এবং ভাষামাধুর্যের সমন্বয়ে এক অপার মুগ্ধতা সৃষ্টি করে, তার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির রুপের অনিন্দ্যসুন্দর বর্ণনা এবং কিছুক্ষেত্রে ইতিহাস সংলগ্নতা, সব মিলিয়ে প্রতিটি লেখাই অত্যন্ত সুপাঠ্য এবং মনোগ্রাহী।
এক কথায় "ধুলামাটির বাউল" সন্মত্রানন্দের এক অনন্য সৃষ্টি। লেখকের ভাষাতেই বলি - "এই পৃথিবী বাউলের এবং এখনও অবধি আমি এমন একজন মানুষকেও দেখিনি, নিহিত পরিচয়ে যে বাউল নয়। যতই ঘর বাঁধুক, যতই সংসারে জড়িয়ে পড়ুক, প্রতিটি মানুষেরই ভেতরে এই বাউলের বীজ আছে। জাগ্রত থেকে স্বপ্নে, স্বপ্ন থেকে সুযুপ্তিতে, সুযুপ্তি থেকে আবার জাগরে, শিশুকাল থেকে কৈশোর - যৌবন পেড়িয়ে বার্ধক্যে, জন্ম থেকে জন্মান্তরে, ভালোবেসে ব্যাথা পেয়ে আনন্দদেউল ছুঁয়ে ছুঁয়ে মানুষের আত্মা চলেছে তীর্থ থেকে তীর্থান্তরে, চলার পথ তার কখনও ফুরিয়ে যায় না। "
এই বইটির বিষয়ে আর কিছু লিখবো না, কারণ এর বেশি কিছু লেখা, আমার ক্ষমতা এবং সাধ্যের অতীত। তবে এর লেখাগুলি পড়লে অশান্ত মন শান্ত হয়, জীবনের চলার পথে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা নতুন করে ভাবতে শেখায়, গতানুগতিক জীবনদর্শনকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং সেইসাথে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে সাহায্য করে। এসবই আমার একান্ত ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি থেকেই বলছি। আজকের দিনে, এই অত্যাধুনিক, আত্মমগ্ন, স্বার্থান্বেষী এবং চরম ভোগবাদী সমাজজীবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে, দিশেহারা মানুষজনের কাছে এই বইটি এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা বলেই মনে হয়েছে।
বইটি পড়লে "ম্যাথিউসাহেব", " ফকিরসাহেবা", "নিরাপদ কবিরাজ", " কমলবাবু", "ত্রিদিবদা", "কচিদিদা", "অবোধমাঝি" এবং আরো অনেকে মিলে, পাঠককে এক অতি পরিচিত, অথচ মনের গভীরে লুকানো (আমাদের subconscious mind) এক জগতে নিয়ে যাবেন, এবং সেই জগতের সাথে পরিচয় হবার পরে মনে হবে আরে! এ যেন আমার কতদিনের চেনা জানা। এটাই মুগ্ধতা! আমার নিজের কাছে এই বইটি আত্মানুসন্ধানের (Introspection) প্রথম পদক্ষেপ।
This entire review has been hidden because of spoilers.