রূপবতী ব্রাহ্মণকন্যা প্রতিমা এবং গরিব চাষিপুত্র আহমেদের প্রেমের সম্পর্ক গ্রামে বিষবৃক্ষের মতো যে ডালপালা ছড়ায়, তার শেকড় খোঁজেন লেখক। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সমাজ-বাস্তবতার পটভূমিতে মধ্যবিত্ত এক হিন্দু পরিবারকে কেন্দ্রে রেখে এ উপন্যাসে মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিপন্নতাবোধ। মুক্তিযুদ্ধের লড়াকু চেতনা নিয়েও নিজ পরিবারের দেশত্যাগের ট্রাজেডি রুখতে ব্যর্থ হয় রণজিৎ। বহুমাত্রিক বাস্তবের দক্ষ কথাশিল্পী মঞ্জু সরকারের এ উপন্যাসটি ১৯৯০ সালে প্রথম প্রকাশের পরই ব্যাপকভাবে পাঠকনন্দিত হয়, এবং লাভ করে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার।
মঞ্জু সরকার (Manju Sarkar) বাংলাদেশের বিশিষ্ট কথাশিল্পী, গল্পকার ও উপন্যাসিক। মঞ্জু সরকারের জন্ম ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৩, রংপুরে। একাডেমিক শিক্ষা রংপুরের কৈলাশ রঞ্জন হাই স্কুল ও কারমাইকেল কলেজে। পেশাগত জীবনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রকাশনা কর্মকর্তা হিসেবে স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণের পর, দৈনিক আমার দেশ এবং দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে দশ বছর সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে স্বাধীন ও সার্বক্ষণিক লেখক। গল্প, উপন্যাস ছাড়াও বেশ কিছু শিশু-কিশোর গ্রন্থের প্রণেতা। এ যাবত প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা অর্ধ শতাধিক। কথাসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন বাংলা একাডেমি, ফিলিপস, আলাওল, বগুড়া লেখক চক্র ও ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার। শিশু-কিশোর গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম’-এর অনারারি ফেলোশিপ প্রাপ্তি উপলক্ষে তিনমাস রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: অবিনাশী আয়োজন, উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা, রূপান্তরের গল্পগাথা, মঙ্গকালের মানুষ, তমস, নগ্ন আগন্তুক, প্রতিমা উপাখ্যান।
'৪৭ সালের দেশভাগের পর, পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের দেশ ত্যাগের যে ধারা শুরু হয়েছিল, ৭৬ বছর পরও সেই ধারা অব্যাহত আছে। কখনো রাজনৈতিক কারণ, কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সামাজিক, অর্থনৈতিক বা অন্যকোন কারণ। দেশত্যাগ এখনো অভ্যাহত।
ঠিক এমনি একটি হিন্দু পরিবারের দেশত্যাগের ঘটনা দিয়ে শেষ হয় 'প্রতিমা উপাখ্যান' উপন্যাসের।
'প্রাতিমা' নামক চরিত্র গল্পের প্রধান চরিত্র মনে হলেও, তাকে নিয়ে কিছুটা ঘটনা, কিছুটা রটনা ছাড়া এই উপন্যাসের অন্য কোথাও তার উপস্তিতি নেই। যদিও, মূল কাহিনীর শুরু প্রতিমাকে ঘিরেই। কাহিনীর নায়ক বরং প্রতিমার বড় ভাই 'রণজিত', যে কিনা একজন মুক্তিযোদ্ধা।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করার পর দেশে এক পরিবর্তন আসে। মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠে '৭১ এর সাম্প্রদায়িকতা আর রাজাকার-শান্তিবাহিনী। সেই শান্তিবাহিনীর প্রধান শরফ হাজি হয়ে উঠে রণজিতের প্রধান প্রতিপক্ষ।
প্রতিমার গৃহশিক্ষক আহমদ এর প্রেমের সম্পর্ক, আর এই বিষয়ে নানা ব্যাখ্যা, অপব্যাখ্যা, অপবাদ, সমালোচনা, গুজব সব কিছু মিলিয়ে কাহিনীর শুরু। আর রণজিত এর বাম-রাজনীতির মতাদর্শ আরও আগুনে ঘি ঢালে। এসব কিছুর ফয়দা লুটতে শরফ হাজি সদা প্রস্তুত। অবশেষে সে সফল হয়, বামনভিটাকে সে বানিয়ে ফেলে হাজিবাড়ি।
এই সব কিছু ছাপিয়ে আরও দুইটা বিষয়বস্তু এই উপাখ্যানের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। একটা ভালবাসার সম্পর্ক। সেটা প্রতিমা-আহমদ হোক কিংবা রনজিত আর তাদের বাড়ির কাজের লোক ললিতার হোক। আরেক আখ্যান, ললিতা ও তার স্বামী বোচার আখ্যান। দরিদ্রতা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের আখ্যান।
মঞ্জু সরকারের 'প্রতিমা উপ্যাখ্যান' প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। এরপর 'আলাওল সাহিত্য পুরষ্কার' লাভ করে উপন্যাসটি। ছোট্ট একটা উপন্যাস, অথচ কাহিনীর বিস্তার আর গভীরতার বিচারে এক অসামান্য সৃষ্টি এই উপাখ্যান।
স্বাধীনতার পরে কিছু বছর পার হয়েছে,যে বাঙালী জাতীয়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালী দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলো,সেই বাংলাদেশেই এখন মানুষের ভিতরে ভিতরে কট্টরপন্থী,ইন্ডিয়া/হিন্দুবিদ্বেষী মনোভাব ফুসে উঠছে।এরই মধ্যে গ্রামের একমাত্র বিএসসি পাশ আহমদ হঠাৎ স্কুলের চাকরীতে ইস্তফা দিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়,আর স্কুলের দেয়ালে লেখা ভেসে ওঠে "প্রতিমা+আহমদ"। কে এই প্রতিমা? গ্রামের একমাত্র বামুন পরিবার অবিনাশ ডাক্তার।তার সন্তান রণজিৎ ও প্রতিমা।রণজিৎ মুক্তিযোদ্ধা,যুদ্ধ থেকে ফেরত এসে গ্রামের রাজাকারের বিচার বসিয়েছিল,এখন রাজনীতি ও সমাজসেবক,তাই গ্রামে যথেষ্ট প্রতিপত্তি আছে তার।অন্যদিকে প্রতিমা ডাকসাইটে সুন্দরী,হিন্দু-মুসলিম অনেকেই প্রতিমাকে নিয়ে আদিরসাত্মক স্বপ্ন ও গল্পে মশগুল থাকে,কিন্তু রণজিৎ এর ভয়ে কেউ মাথা চাড়া দেয়না।এমতাবস্থায় আহমদের সাথে প্রতিমার সম্পর্কের গুজবে গ্রাম নড়েচড়ে বসে,অন্যদিকে একমাত্র দুধেল গাই-উপার্জনক্ষম ছেলে চলে যাওয়ায় আহমদের পরিবার ক্ষিপ্ত,আর রণজিৎ এর উপর স্বাধীনতার বিরদ্ধ শক্তি লোকজনের আক্রোশ তো অনেকদিনের।এই ঘটনাকে কেন্দ্র তাদের সুযোগ হয় প্রতিশোধ নেয়ার।
সবমিলিয়ে গভীর সামাজিক উপন্যাস বলা চলে।কারণ এক উপন্যাসেই গ্রামীণ সমাজের প্রচলিত সহজ-সরল ধারণাকে কলা দেখিয়ে গ্রাম্য রাজনীতির নোংরা রূপ তুলে ধরা হয়েছে,এমনকি প্রোটাগনিস্টদের দৃঢ় আদর্শ চরিত্রের বদলে রক্ত-মাংসের-কামনা-বাসনাসমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।সামাজিক উপন্যাস তো এমনই হয়,তাই না?কাহিনী ও চরিত্রের একাধিক স্তর দেয়া ছাড়া প্রচলিত ফরম্যাটের বাইরে চিন্তার খোরাক যোগানো সার্থক সামাজিক উপন্যাস লেখা আসলে এখন বিরল।