ককেশাস অঞ্চলের দেশ জর্জিয়ার রাজধানী তিব্লিসিতে ভ্রমণের একপর্যায়ে লেখক খুঁজে পান কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া এক ছাপাখানা। সোভিয়েত দেশের এক নম্বর মানুষ হবারও বহু আগে এই ছাপাখানা থেকেই স্তালিন লুকিয়ে চুরিয়ে ইস্তেহার ছাপাতেন। ছাপাখানার ছাইচাপা ইতিহাস আবিষ্কারের পর নেহাত দৈবক্রমে লেখকের সাথে পরিচয় হয় এ সময়ের জনপ্রিয় জর্জিয়ান লেখক দাতো তুরাশভিলির। দাতো লেখককে তার বন্ধুসভায় নিমন্ত্রণ জানান। সেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে আরও কয়েকজন মানুষের সাথে পরিচয় হবার সূত্রে লেখক জানতে পারেন সাম্প্রতিক সময়ে জর্জিয়ার রাজনৈতিক টানাপোড়ানের ইতিবৃত্ত। এরপর আমরা লেখককে খুঁজে পাই মধ্য এশিয়ায়। উজবেকিস্তানের সমরকন্দ শহরে তৈমুর লং-এর সমাধি আর ইমাম বুখারির মাজার দর্শনের পর বুখারা শহরের সুউচ্চ মিনার আমাদেরকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। সেখানে গিয়ে জাপানি তরুণী সাউরির মুখ থেকে শুনি ভিন্ন দেশের ভিন্ন সমাজের ছিন্নকথা। সাউরিকে বিদায় জানিয়ে রাজধানী তাসখন্দে এলে কুকেলবাসি মাদ্রাসার দুয়ার খুলে অভ্যর্থনা জানান এক রহস্যময় চিত্রকর। মাদ্রাসার ভেতরকার একটি ঘরকেই যিনি বানিয়েছেন চিত্রশালা। তার কাছ থেকে নানা কৌতূহলী প্রশ্নের জবাব মিলবার পর আমরা এবারে পাড়ি জমাই কাজাখস্তানের এক সময়কার রাজধানী শহর আলমাটি-তে, যেখানে নীলনয়না এক জার্মান-রুশি নারী আমাদের জন্যে তার জীবনের আলেখ্য নিয়ে অপেক্ষমাণ।
পড়া শেষ! এ বছর পড়া পঞ্চাশতম বই! সেন্ট্রাল এশিয়ার চারটি দেশকে নিয়ে লেখা কয়েকটি ছোটগল্প। আমাকে কখনো ইউরোপ, আমেরিকা টানেনি। সেন্ট্রাল আফ্রিকার এই দেশগুলো টেনেছে প্রকটভাবে। খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছি তাই গল্পগুলো। আশাহতো হইনি এক বিন্দু। বরং দেশগুলোতে যাবার ইচ্ছে বেড়ে গিয়েছে আরও অনেকখানি।
গালের একটি তিলের বিনিময়ে সমরকন্দ-বুখারা বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন কবি। সেই সমরকন্দ-বুখারার নিজস্ব আকর্ষণ ও যে কম নয়, সেটি বলাই বাহুল্য।
মধ্য এশিয়ার এই কয়টি দেশ, যেগুলো আলাদা হয়েছে রাশিয়া থেকে, সেসব নিয়ে লেখা বা পড়া কোনটাই তেমন একটা হয়ে ওঠে নি আমার। তাই সঞ্জয় দে এর এই 'তাসখন্দের সুফি চিত্রকর' বইটির নাম যখন জানি, তখনই বেশ একটা আগ্রহ বোধ করি।
প্রথমে ভেবেছিলাম বইটি হয়তো ছোট গল্প গোছের কিছু৷ পরে বাতিঘরের পেজে দেখলাম এটি ভ্রমণকাহিনীর অন্তর্ভুক্ত। ব্যস, আর দ্বিতীয়বার না চিন্তা করে কিনে নিলাম। তুর্কমেনিস্তান ছাড়া বাকি কটা দেশ কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিযস্তান, তাজিকিস্তান এবং অপর আরেকটি দেশ জর্জিয়া ঘুরে লেখক তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ এবং অনুভূতি দিয়ে সাজিয়েছেন এই বইখানা৷ সমরকন্দ-বুখারার চোখ ধাঁধানো স্থাপত্য দেখার পাশাপাশি লেখক দেখেছেন তৈমুর লং এর সমাধি, ইমাম বুখারির মাজার।
স্তেপবাসিনী এক নিঃসঙ্গ তরুণীর সাথে কথাবার্তাকালীন উঠে এসেছে সেখানকার রাজনৈতিক ছবি এবং সামাজিক জীবন। লেখকের জর্জিয়ার বিখ্যাত লেখক দাতো তুরাশভিলি এর সাথে দেখা হওয়া এবং পরবর্তীতে তাঁর সুবাদে দেখা হয়েছে সেখানকার স্থানীয় আরো কজনের সাথে, যাদের চোখ দিয়ে আমরাও দেখে নিয়েছি জর্জিয়াকে৷
তাসখন্দে কুকেলবাসি মাদ্রাসার দুয়ার খুলে অভ্যর্থনা জানান সেই সুফি চিত্রকর, মুজাফফর তাঁর নাম। তাঁর কাছ থেকে মেলে নানান কৌতূহলী প্রশ্নোত্তর। মাদ্রাসার ভেতরেই তিনি বানিয়েছেন এক রহস্যময় চিত্রশালা। দেখা হয়, জাপানি তরুণী সাউরির সাথে। জাপানের টুকরো কথাও উঠে আসে এর ফলে৷
রাজনীতি এবং ভৌগোলিক অবস্থান উভয় দিক দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ এই কটা দেশ সম্পর্কে জানতে গেলে নানান অজানা ঘটনাবলি জানার পাশাপাশি উঠে আসে অনেক রহস্যময় কাহিনী। যেমন শুরুতেই লেখক গল্প বলেছেন এক রহস্যময় ছাপাখানার, যখন স্তালিন ছিলেন না রাশিয়ার প্রধানতম ব্যক্তি, তখন গোপনীয় নানান ইশতেহার নাকি সেই ছাপাখানাতেই ছাপা হত।
লেখক এর লেখা এই প্রথম পড়লাম। বেশ সাবলীল লেখনশৈলী আর বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যের গুণে বেশ ভালোই লাগল তাসখন্দের সুফি চিত্রকর বইটি। লেখক ব্যক্তিগত জীবনে পড়াশোনা করেছেন তড়িৎ কৌশল এবং ব্যবসায় প্রশাসনে৷ বাস করেন স্যান ডিয়েগোতে, জন্ম শেরপুর এ। লেখালেখির জগতে অনুপ্রবেশ ব্লগে লেখার মাধ্যমে, প্রকাশিত হয়েছে আরো কয়েকটি ভ্রমণকাহিনী। নিয়মিত লেখেন জাতীয় দৈনিকে।
বইটি মধ্য এশিয়ার ৪ টি দেশ- উজবেকিস্তান, কিরগিযস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান এবং ককেশাস অঞ্চলের দেশ জর্জিয়া ভ্রমণ নিয়ে নয়টি গল্প এবং অসংখ্য ফটোগ্রাফ রয়েছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষেত্রে শৈশব কৈশোরে রাজধানীর নাম, আর এরপরে কিছুটা রাজনৈতিক ইতিহাস, এছাড়া একাডেমিক বইয়ের বাইরের বই পড়ার সুবাদে বাংলাদেশে একসময় প্রিন্ট হওয়া রাদুগা - প্রগতির বইয়ে এসব অঞ্চলের রূপকথা-উপকথা পড়া হয়েছে। ঐ পর্যন্তই সার। এর থেকে বেশি কিছু জানা নাই। তাই, ভ্রমণ কাহিনি এমনিতেই পরিতৃপ্তি দেয়, তার উপর, কম পরিচিত দেশগুলোর ভ্রমণ কাহিনি।
লেখকের ভ্রমণ কাহিনিতে যেমন স্থানিক বর্ণনা থাকে, তেমনি ঐ স্থানের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাস, ঐ অঞ্চলে বসবাসরত অধিবাসীদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, তাদের দুঃখ-কষ্টের গল্প, রাজনৈতিক পীড়নে তাদের অভিজ্ঞতা অনেক কিছুই উঠে আসে তাঁর লেখায়। এখানের ৯টি গল্পই লেখকের মুন্সিয়ানায় সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে।
জর্জিয়ার রাজধানী তিব্লিসিতে ভ্রমণের এক পর্যায়ে লেখক খুঁজে পান এক ছাপাখানা যা সোভিয়েত ইউনিয়নের উন্মেষের সময়ে ব্যবহৃত হতো, যেখান থেকে স্তালিন ইস্তেহার ছাপাতেন। জর্জিয়ায় দৈবক্রমে দেখা হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের টালমাটাল সময়ের ছাত্রনেতা, বর্তমানের প্রখ্যাত লেখক, দাতো তুরশাভিলি'র সঙ্গে। কাজাখস্তানে শিম্বুলাক পর্বত হাইকিং-এর সময়ে সহযাত্রী তরুণীর বিরহ কথা শুনতে পাই, যেখানে প্রোথিত আছে সোভিয়েত ইউনিয়নের একসময়ের দমন-পীড়নের ইতিহাস, যাতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় পারিবারিক জীবন- সামাজিক জীবন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পর, এবং আফগানিস্তানে যুদ্ধ - বিদ্রোহের মাঝেও প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তানের প্রতিরোধ, উন্নয়ন, সে সময়ের ইতিহাস মুগ্ধ করে। উজবেকিস্তানের সমরখন্দে তৈমুর লং এর সমাধি, ইমাম বুখারীর মাজার দর্শনের পর বুখারা শহরের সুউচ্চ মিনার হাতছানি দিয়ে ডাকে আামাদের। সেখানে সহযাত্রী জাপানি তরুণী সাউরির মুখে শুনি ভিন্ন গল্প। তাসখন্দে মাদ্রাসায় সন্ধান পাই রহস্যময় চিত্রকরের যিনি মাদ্রাসা ভেতরকার ঘরেই সুফি ভাবধারায় ছবি আঁকেন। জানতে পারি আধ্যাত্মিকতার গল্পের সাথে স্থাপত্যবিদ্যার টুকিটাকি। ইতালির ভেনিস হয়ে সিল্করুট হয়ে প্রাচ্যদেশীয় শিল্প সংমিশ্রণে নতুন ভাবধারার শিল্পের উন্মেষ হয় উজবেকিস্তানে।
খুব হৃদয়স্পর্শী গল্পগুলি নিয়ে বইটা মূল্যবান হয়ে উঠেছে অবশ্যপাঠ্য "তাসখন্দের সুফি চিত্রকর " বইটি।
লেখনী বেশ সুন্দর, কখনও ইতিহাস এর জীর্ণ পাতায় প্রবেশ করতে কোন আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন হয় না আবার কখনও খুব সুইফটলি বর্তমান সময়ের সাথে খুব রিলেট করতে পারা, একদম বেখাপ্পা লাগে না। তবে সোভিয়েত নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লেখকের কিছুটা বিরক্তি বারবার লেখায় এসেছে। পুনরাবৃ্তি ভালো ঠেকে নি। শুরুর দিকের "আভলাবারি রোডের ছাপাখানা" আর শেষের "তাসখন্দ এর সুফি চিত্রকর" ভীষণ ভালো লেগেছে।