ইতালীয় বিপ্লবী আন্তনিও গ্রামসির রাষ্ট্রচিন্তা—বিশেষ করে তাঁর বহু আলোচিত হেজিমনি তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে এ বইয়ে। ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির কারাগারে বন্দী গ্রামসি তাঁর ২৯ খণ্ডের প্রিজন নোটবুকস-এ আধুনিক কালে রাষ্ট্র ও রাজনীতির বাস্তব ধরন বিষয়ে অত্যন্ত মৌলিক এক বিশ্লেষণ হাজির করেছিলেন। তারই আলোকে এ বইয়ে গ্রামসির দার্শনিক মনীষার পরিচয় ও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
আলতাফ পারভেজের জন্ম ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬। দর্শনশাস্ত্রে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন শেষ করেন। ছাত্রত্ব ও ছাত্র রাজনীতির পর সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু। পরে গবেষণা ও শিক্ষকতায় সংশ্লিষ্টতা। প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি। যার মধ্যে আছে—‘কারাজীবন, কারাব্যবস্থা, কারা বিদ্রোহ : অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা’, ‘অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নের তাহের ও জাসদ রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের নারীর ভূ-সম্পদের লড়াই’, 'মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ'।
আন্তোনিও গ্রামসি বিংশ শতকের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন দার্শনিক। জেলে বসে লেখা তার prison notebooks বহুল পঠিত ও চর্চিত। বইটা পড়ে বোঝা গেলো তার তত্ত্ব মোটামুটি সবার কাছে পরিচিত, শুধু জানতাম না যে তত্ত্বটা গ্রামসির, বিশেষত "হেজিমনি তত্ত্ব।" আধুনিক রাষ্ট্র শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তার জনগণকে অধীন রাখে না। চিন্তা, সংস্কৃতি, আদর্শ প্রভৃতি ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এমনভাবে জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে যে, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাসত্ব মেনে নেয়। "হেজিমনি প্রভুত্বধর্মী নয়, - আধিপত্যধর্মী।" বা এখানে "প্রভুর জম্য দাসদের ভালোবাসা" প্রকাশিত হয়। এখানে ব্যাপার হচ্ছে, বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করা হয় যাতে মানুষ মনে করে যে তারা স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির বলেই সরকারকে সমর্থন জানাচ্ছে।
"নেতৃত্বের ক্ষমতা লাভ ও ক্ষমতা স্থায়ীকরণ চেষ্টার কৌশলসমূহই হলো হেজিমনি। " এটি একটি ছদ্ম একনায়কতন্ত্র, কিন্তু আমরা গণতন্ত্র ভেবে আপ্লুত হই। বাংলাদেশ, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কীভাবে হেজিমনির মাধ্যমে জনগণকে বিভিন্ন চেতনা, ধর্মমত ও আদর্শের কথা বলে বিভ্রান্ত করা হয়। সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি - সবখানেই এই হেজিমনি কাজ করে। বাংলাদেশে গত ১৬ বছর গনতন্ত্রের নামে একনায়কতন্ত্র চালু ছিলো, কেন মানুষ আন্দোলন করছে না বুঝতাম না। গ্রামসির তত্ত্ব পড়ে এই রহস্য কিছুটা বোঝা গেলো। সরকার কোনো একটা আদর্শ এতো বেশি মাত্রায় প্রচার করে (আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে "মুক্তিযুদ্ধের চেতনা") যাতে মানুষ মনে করে সে আন্দোলন করলে তা একধরনের নৈতিক অপরাধ হবে। এই অপরাধবোধ তাদের আন্দোলন থেকে বিরত রাখে। গ্রামসির প্রায় শতবর্ষী তত্ত্ব কিছু ক্ষেত্রে বর্তমান জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বোঝাতে অসমর্থ হলেও তিনি প্রাসঙ্গিক থেকে যাবেন সবসময়।
"বুদ্ধিজীবী" প্রসঙ্গে আন্তনিও গ্রামসির ব্যাখা আমার সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।
"বুদ্ধিজীবী কী?" প্রশ্নের উত্তরে গ্রামসি বলেছেন — সব মানুষই বুদ্ধিজীবী, কারণ প্রত্যেকেরই জীবনবোধ নিয়ে নিজস্ব দর্শন আছে, যদিও সবাই বুদ্ধিজীবী হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করতে পারে না। বুদ্ধিজীবিতা হলো মূলত ক্ষমতার চর্চা — কোনো বিশেষ স্রোতের পক্ষপাতী হয়ে বুদ্ধিজীবিরা চায় সমাজে সেই স্রোতকে এস্টাবলিশ করতে।
গ্রামসির মতে, বুদ্ধিজীবীরা হলেন জনগণের প্রতিনিধি। জনগণ তাদের দাবি-দাওয়া-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশে অপারগ হয়, বা সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে পারে না — তাদের হয়ে, তাদেরকে সঙ্গে করে যারা ক্ষমতার চর্চা করে তারা। ১৯৩০ সালের মুসো'লিনীর ফ্যাসিস্ট ইতালিতে বসে গ্রামসি বুদ্ধিজীবীদের আহবান করেছিলেন তারা যেন প্রোলেতারিয়েতের হয়ে ক্ষমতাচর্চা করে, কৃষক-শ্রমিক-দরিদ্রদের একজোট করে রাষ্ট্রে হেজিমনি তৈরী করে বুর্জোয়া প্রভাবকে দমন করে। কেননা এই কাজটাই বুর্জোয়াদের জন্যে বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা করছে।
বুর্জোয়াদের ক্ষমতা দখলে রাখার পদ্বতি ব্যাখায় গ্রামসি ম্যাকিয়াভেলির তত্ত্বকে সামনে নিয়ে আসেন। তাঁর ব্যাখায় — ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ক্ষমতায় থাকে দমনপীড়ন এবং সম্মতি উভয়ের মাধ্যমেই। তারা ক্ষেত্রবিশেষে কারো উপর দমনপীড়ন চালায়, কিন্ত দমনপীড়নের মাধ্যমে দীর্ঘ-স্থিতিশীল ক্ষমতাচর্চা সম্ভব হয়ে উঠে না। সেজন্য রাষ্ট্রে তারা নিজস্ব কালচারের বিস্তার ঘটায়ে সিভিল সোসাইটির সম্মতি আদায় করে ক্ষমতায় টিকে থাকে। তিনি এর নাম দেন 'হেজিমনি'।
গ্রামসির সংজ্ঞায় সিভিল সোসাইটি বলতে কেবল শিক্ষিত মানুষদের বোঝায় না — কালচারাল মিডিয়া, নিউজমিডিয়া,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এস আলম টাইপ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, অরগানাইজেশান সব হলো সিভিল সোসাইটির উদাহরণ। সিভিল সোসাইটি হলো বুর্জোয়াদের দুর্গস্বরূপ — এদেরকে না ভেঙ্গে ক্ষমতাসীনের হেজিমনি ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
গ্রামসি কেবল ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্টের ক্ষমতাচর্চাই ব্যাখা করেননি বরং তার সমাধানও বলেছেন। তাঁর হিসেবে এই হেজিমনি ধ্বংসের উপায় হলো একটা পাল্টা হেজিমনি প্রস্তত করা, অন্যসব গোষ্ঠী একজোট হয়ে একটা "ঐতিহাসিক ব্লক" নির্মাণ করা। ঐতিহাসিক ব্লক বলতে বোঝায় বিশেষ মুহূর্তে এক ক্ষমতাসীন পক্ষকে দমনে বাকি সব পক্ষ যাদের মধ্যে মিল-অমিল দুটোই থাকবে — কিছু সময়ের জন্যে অমিলকে ভুলে একজোট হয়ে ক্ষমতা দখল।
জুলাই গণ অভ্যুত্থানের দিকে তাকালে গ্রামসিকে আরো ভালোভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। এতদিন ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ তাদের বুদ্ধিজীবীর সহায়তায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে সিভিল সোসাইটির সমর্থন নিয়ে, আবার অন্য গোষ্ঠীর উপর দমনপীড়ন চালায়ে (যেমন ইসলামিস্ট) ক্ষমতায় বসে ছিল। বিগত পাঁচ বছরের কার্যক্রম যদি লক্ষ্য করেন তবে দেখবেন অনেক বুদ্ধিজীবীই ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়েছেন, গ্র্যাজুয়ালি জনগণ এবং সিভিল সোসাইটিতে ক্ষমতাবিস্তার করেছেন। শেষমেশ জুলাইয়ে যেভাবে বিএনপি-জামাত-খেলাফতি-বাম-আমজনতা সব একজোট হয়ে আন্দোলন করলো তা হলো গ্রামসির "ঐতিহাসিক ব্লক"। প্রথমে নীরব বিপ্লব, পরবর্তীতে সম্মুখ যুদ্ধ।
গ্রামসির সংজ্ঞায় বুদ্ধিজীবী মূলত দুধরনের — জৈব বুদ্ধিজীবী এবং প্রথাগত বুদ্ধিজীবী। এতক্ষণ মূলত জৈব বুদ্ধিজীবীর কথা বললাম, প্রথাগত বুদ্ধিজীবী হলো সাধারণ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-শিল্পী-শিক্ষক ইত্যাদি যারা মূলত বুদ্ধি বেঁচে জীবিকা নির্বাহ করে। যারা কোন ক্ষমতাচর্চা করে না। তবে গ্রামসির মতে অনেক সময়ে এই প্রথাগতরাও জৈব বুদ্ধিজীবীতে রূপান্তরিত হতে পারে।
তাঁর মতে রাজনৈতিক দলগুলোও হেজিমনিচর্চা করে, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাও একেকজন বুদ্ধিজীবী।
আন্তনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) জীবন সহজ ছিল না। একেবারে ছোট থাকতে পড়ে গিয়ে মারাত্নক আহত হন যার প্রভাব বয়ে বেড়াতে হয়েছে আজীবন। খর্বকায় - দুর্বল ছিলেন, সোজা হয়ে হাঁটতে পারতেন না। প্রথম জীবনে কমিউনিস্ট রাজনীতিতে ঢুকলেও একটা সময়ে বুঝতে পারছিলেন ফ্যাসিস্টদের হাতে কমিউনিস্টরা দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক সময় সমাধানও দিয়েছিলেন, কেউ গায়ে মাখেনি। ছোট এই জীবনের শেষ দশ বছর কারাগারেই কাটাতে হয় ফ্যাসিস্ট মুসো'লিনীর কারণে। সেসময় লেখা শুরু করেন কারাগারে, ইতালি এবং বিশ্বের ভবিষ্যৎ কর্তব্য নিয়ে — যা নিয়ে হয় তাঁর বিখ্যাত প্রিজন ডায়েরিজ।কারাগার থেকে এসব লেখা স্ক্রিনিং করা হতো বলে এসময়ে অনেক সাংকেতিক শব্দও ব্যবহার করেন।
ইতালির দার্শনিক ও বামপন্থী কর্মী আন্তোনিও গ্রামসি মুসোলিনির জেলে থেকে যেই তাত্ত্বিক আলোচনা গ্রন্থিত করেন, তা 'প্রিজন নোটবুকস' নামে প্রকাশ পায় তার মৃত্যুর পরে। আলতাফ পারভেজ গ্রামসির লেখা ও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গুলোর সংগে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছেন দেশের পাঠকদের। যেই ধারণা গুলো এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তে গুরুত্বপূর্ণ-
১. সিভিল সোসাইটি কিভাবে স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রাখে, এবং রাষ্ট্র কিভাবে বুদ্ধিজীবীদের ব্যাবহার করে ক্ষমতায় টিকে থাকে
২. স্টাটাস কো এর বিরুদ্ধে ন��ুন জনমত তৈরি করায় সাংস্কৃতিক উপাদানের গুরুত্ব কোথায়
৩. সম্মতি ও দমনের ভারসাম্যে কিভাবে রাষ্ট্র ও জনগণের বোঝাপড়া তৈরি হয়
৪. সমাজে বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান কোথায়, তার দায় কই এবং সামগ্রিক পরিসরে তার কার্যক্রম কি হওয়া উচিত
লেখকের ভাষণ প্রাঞ্জল, ওনার অন্য বই গুলো পড়ার আগ্রহ থাকবে সামনে৷ বইয়ের কিছু জায়গায় রিপিটিটিভ মনে হয়েছে। দেশের প্রেক্ষাপটে ধারণা গুলো নিয়ে অনেক কথা বলা যেত, যেটা বোধহয় সচেতনভাবে এভয়েড করেছেন। কিন্তু বুদ্ধিমান পাঠক লেসন নিতে ভুল করবেন না।
রাষ্ট্র, সিভিল সোসাইটী, বুদ্ধিজীবিতা, দমন ও সম্মতি উৎপাদনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ইত্যাদি প্রসঙ্গে গ্রামসির বক্তব্য লেখব গুছিয়ে বাংলায় দুই মলাটের ভেতর এনেছেন। জরুরি কাজ।
According to Gramsci not only economic relations and modes of production but culture is also the base of superstructure. Superstructure are two types political society (law, police, army, judiciary, government-repressive state apparatus) and civil society (religion, cultural organizations, NGOs, intellectuals, literature, music, art-ideological state apparatus). Bourgeoisie rulling class creates their own bourgeoisie culture, bourgeoisie art, bourgeoisie music, bourgeoisie literature, bourgeoisie intellectuals and bourgeoisie civil society to establish cultural hegemony with the intention to protect their bourgeoisie interest and to establish bourgeoisie political hegemony. Political hegemony depends on cultural hegemony. Cultural hegemony is equaly important as economic relations and modes of production to maintain political hegemony. If proletariat class wants to conquer state power then they have to create their own proletariat literature, proletariat music, proletariat art, proletariat culture, proletariat counter culture and proletariat cultural hegemony. Superstructure is built on base. Culture is the base of political superstructure. When bourgeoisie rulling class conduct a revolution on their behalf to protect bourgeoisie interest and to prevent proletariat revolution then it’s called passive revolution or alternative revolution. The examples of passive revolutions or alternative revolutions are Gandhiism in India, Fordism in USA, Fascism in Italy. Proletariat class will not be able to conquer state power untill and unless they become able to create their own culture, counter culture and cultural hegemony. To conquer the political power you have to conquer the culture first. Create your own culture and establish your cultural hegemony. Also, build a historical bloc- alliance with other groups and classes. There are two types of intellectuals, traditional and organic. Traditional intellectuals acquire knowledge but don’t try to change the real world. They are detouched from mass people. They try to maintain the conservative status quo. Organic intellectuals are revolutionary in nature and spirit. Organic intellectuals acquire knowledge to change the real world with the intention to conduct a revolution towards progress and development. They arises out of the mass people and understand the pulse of the mass people. They want revolution, they want to take the society forward.