শাহবাগ পানে হেঁটে চলেছি। রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে স্কুলড্রেস পরা কিশোর ছেলে মেয়েরা- ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস।’ রাজপথ ছেয়ে আছে নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতায়- ‘একটি কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে সারা শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে।’ মরক্কো থেকে ভেসে এসেছে ট্রলারটি, গন্তব্য স্পেন। দু’শো মানুষ ধুঁকছে সেখানে। আধুনিক সভ্যতা অবশ্য ওদের মানুষ বলে ডাকে না, ডাকে শরণার্থী। খাবার নেই, পানি শেষ। একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে ওরা। সেই নৌকায় শরণার্থীদের মাঝে জায়গা করে নিয়েছে সোনালী চুল, নীল চোখের এক শ্বেতাঙ্গ মেয়ে। ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর হয়ে মরতে বসা এই এশিয়ান শরণার্থীদের দলে কী করছে সে? কিশোর বয়েস এখনো পার হয়নি, বইখাতা নিয়ে ছোটাছুটির বয়সে সাব মেশিনগান হাতে ফেরারি হয়ে ছুটে চলতে হয় তনককে। সেনাবাহিনী ধেয়ে আসছে। সামনে বিপ্লব অথবা মৃত্যু। ফ্রান্স, স্পেনের বাস্ক থেকে শুরু করে রাঙামাটির গহীন বনে, ঢাকার রাজপথে কিংবা উত্তরবঙ্গের প্রবল শীতে অধরা হয়ে আছে এক পরম আরাধ্য। মিলবে কি তার দেখা?
এই গল্পের স্থান সত্য, কাল সত্য, ইতিহাস সত্য, মিথ্যা কেবল এর চরিত্রগুলো।
তিনজন মানুষের তিনটা আলাদা গল্প।তিন গল্পে একটাই মিল- ম্যারিওন,তনক ও গল্পকথক তিনজনই বিপ্লব করতে চায়,সশস্ত্র বা শান্তিপূর্ণ। কিন্তু বিপ্লব সহজে সফল হয় না।বিপ্লবের পথ রক্তাক্ত, বিপ্লবের পথ বন্ধুর। "মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল" স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের গল্প।পৃথিবীর যে প্রান্তেই অবস্থান করি না কেন,যেখান থেকেই সমাজকে বদলাতে চাই না কেন,যে পদ্ধতিতেই বদলাতে চাই না কেন- সবার পরিণতি অভিন্ন। উপন্যাসে ম্যারিওন আর তনকের অংশে একটা করে নিটোল গল্প আছে।কিন্তু কথকের গল্প,যা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে ঘিরে আবর্তিত,প্রায় পুরোটাই তথ্যে ভরা এবং যে তথ্য অতি সাম্প্রতিক হওয়ায় আমাদের সবার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। এ অংশে একটা পরিপূর্ণ গল্পের অভাব বোধ করেছি ব্যক্তিগতভাবে। ম্যারিওন ও কথকের গল্প শেষে যা ঘটলো সেই মোচড়টাও অতি ব্যবহারে জীর্ণ।
মোহতাসিম হাদী রাফি'র লেখা বেশ পরিণত।প্রথম বই বলে মনে হয়নি।তিনি তার তীব্র আবেগ পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পেরেছেন। মাটিতে ফুটে থাকবে ক্লাস্টার ফুল, রাজপথে লেগে থাকবে রক্তের দাগ,তবু মানুষ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখবেই।
কোনটা বেশি পীড়া দেয়? অন্যের কাছে পরাধীন হয়ে থাকতে? নাকি নিজের কাছে নিজে জিম্মি হয়ে থাকতে?
২০১৮ সালের মাঝ বরাবর। কোনো একটা ব্যাপারে এতটাই মানসিক আঘাত পেয়েছিলাম তা পৌছে যায় শরীরে। আস্তে আস্তে টায়ফয়েড ও এসে চেপে ধরে। ঘোরের ভিতর চলছিল সময় টা। কখন জেগে থাকতাম আর কখন ঘুমিয়ে ঠিক টের পেতাম না। আমার দুই স্টেটই অনেকটা লুসিড ছিল। তবে নিয়মিত একজন আপডেট জানাতো আন্দোলন এর কি হচ্ছে। কতটা জঘন্য ভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে তারা। শান্তনা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারিনি। যা যা ঘটে তাদের সাথে তা কখনো কোনো মিডিয়া ও ওঠেনি, কোনো সাহিত্যিকের কলমেও আসেনি। ওগুলো চাপা পরে গেছে। ভিক্টিমদের আর্তনাদ কখনো কারোর কানে পৌছে না।
রাফী ভাই পুরাপুরি সফল তার প্রথম উপন্যাসে। কতটা দারুন ভাবে পাঠক কে লেখা দিয়ে স্পর্শ করলে স্মৃতি পুরো জাগ্রত হয়ে ওঠে? স্বপ্ন দেখি, অনেকদূর এগিয়ে যাবেন।
বলতে আমার ও ইচ্ছে হয় -- ❝ যখন আমি মারা যাব, আমাকে এমন কোথাও কবর দিও, ওদের মতো যেন আমার কবরটিতেও ওমন ক্লাস্টার ফুল ফোটে ❞
স্পর্শকাতর ব্যাপার নিয়ে ফিকশন লিখতে সাহসের প্রয়োজন আছে। কারণ দিনশেষে বেঁচে থাকা আর পেটে ভাত জোগাড় করবার তাগিদটাই মধ্যবিত্তের অস্তিত্বের ভিত্তি। সেই দ্বি-মুখী তাগিদের বজ্রআঁটুনি গলে কেউ না কেউ বেরিয়ে আসে মাঝেসাঝে। আচমকা। হুটহাট। ঠাসঠুস। আবার সত্য-মিথ্যের মিশেলটাও হতে হয় সুষম। যাতে পাঠকসত্ত্বাকে তৃপ্তি দেয়া যায়। সত্যিকে আঁকড়ে ধরে মিথ্যে অভিনয় কাঁচা হলে মেজাজ যারপরনাই খারাপ হবার সমূহ সম্ভাবনা।
মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল তেমনই সত্যি-মিথ্যের মিশ্রণে নিপুণ বুনটে লেখা ১৫৮ পৃষ্ঠার উপন্যাস। বাংলাদেশের জন্মের পর ঘটে গেছে বেশ কিছু বিতর্কিত, ন্যাক্কারজনক ও উপরিমহলের জন্য লজ্জাজনক কিছু ঘটনা। ঝরেছে নাম না জানা অসংখ্য মানুষের রক্ত, জন্ম হয়েছে আন্দোলনের, মুখ থুবড়ে পড়েছে গণতন্ত্র আর খুলেছে সভ্য সমাজের মুখোশ। কয়টা বলা যায়? যে কয়টা বলা যায় সে কয়টার গল্পই এক সুতোতে বেঁধেছেন লেখক।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি সেটেলার, সেনাবাহিনী আর জুম্ম জাতীয়তাবাদের সংঘর্ষের কাহিনি মনে করিয়ে দেয় দেশের ভেতর কোনো এক কালে ঘটে যাওয়া করুণ এক বাস্তব সময়ের কথা। তনক নামের এক কিশোরের যখন প্রেমিকার ঠোঁটে অবগাহন করবার কথা তখন সে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে গেছে গুলিবিদ্ধ কমরেডকে।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে নিস্ফল আন্দোলন নিয়ে কোনো লেখককে এই প্রথম দেখলাম দুই মলাটে তুলে আনতে। এই ব্যাপারটার জন্যই মোহতাসিম হাদী রাফীকে ধন্যবাদ দিতে হয়। তরুণ-কিশোরদের সম্মিলিত দাবির কথা ছাপাখানার কালিতে দেখবার প্রয়োজন ছিলো খুব। কীভাবে জন্ম নিলো আন্দোলন আর কীভাবে মুখ থুবড়ে পড়লো একটা ন্যায্য দাবি, তার স্মৃতি জীবন্ত হয়ে থাকুক বুকশেলফে চুপটি করে। কাহিনির এই অংশটা কিছুটা তথ্যবহুল বিবরণী হয়ে গেলেও তা মেনে নেয়া যায়। এরই মাঝে আলতো করে ছুঁয়ে গেছেন চা-বাগানে খেটে যাওয়া শ্রমিকদের নীরব কান্নার স্রোতকে। একশো টাকা দৈনিক মজুরি পাওয়া শ্রমিকের বাঁকা হয়ে যাওয়া মেরুদণ্ড সোজা যাতে না হতে পারে সে জন্যই নিত্যদিন চলে নীরব শোষণ। সেসব নাহয় না-ই জানলেন তেমন। কী দরকার?
লেখক নিজভূমের কথা পড়াতে পড়াতে আচমকা টেনে নিয়ে গেছেন বাস্ক আন্দোলনের মাঝে। আচ্ছা বাস্ক কাদের বলা হয় সে সম্পর্কে দুই লাইন বলে নিই- বাস্ক হচ্ছে ইউরোপীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। বাস্করা কখনো স্বাধীন ভূখণ্ডের অংশীদার হতে পারেনি। স্বাধীনতার প্রশ্নে আঘাত এসেছে বহুবার, নিষিদ্ধ হয়েছে তাদের মাতৃভাষা ইউস্কেরা। তবে স্বাধীন মাটি না পেলেও ভাষার অধিকার আদায়ে রক্ত দিয়েছে আমাদের মতোই। স্পেন আর ফ্রান্সের দ্বি-মুখী টানা-হ্যাঁচড়ায় কখনোই পায়নি নিজেদের ন্যায্য অধিকারের নিশ্চয়তা। দুই দেশের সীমান্তে গা-ঘেঁষে অবস্থান করায় চিড়ে-চ্যাপ্টা হয়েছে বাস্করা। আর সেই বাস্কদের একজন- ম্যারিওনের সংগ্রামের গল্পই শুনি আমরা। দেশ যেটাই হোক না কেন, শোষণ আর আন্দোলনের চেহারাটা কিন্তু একই থাকে চিরদিন।
এতকিছুর মধ্যেও মিলেমিশে গেছে জীবননান্দ দাশের কবিতা আর হ্যালুসিনেশনের রহস্যময়তা, জাদুবাস্তবতা, গল্প বলার তাড়না আর ন’টা-পাঁচটা গোলকধাঁধায় হারানো জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণার কথা।
আরেকটা কথা না বললেই না, বইয়ের পটভূমির বিস্তৃতি এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত। কখনো নেপালের পাহাড়ে, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে; আবার কখনো ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেনের অলি-গলি, মহাসড়কে ছুটেছে গল্পের চরিত্ররা। প্রতি অধ্যায়ের নাম আর চিত্রায়ণ খুবই মানানসই হয়েছে। ছবিগুলো আর সাররিয়েলিস্টিক একটা প্রচ্ছদের জন্য নিশাত তাসনিম ঐশীকে ধন্যবাদ দিতেই হয়।
লেখার মাঝে পাওয়া যায় লেখককে, এই বইয়ের লেখকও সম্ভবত নিজের অব্যক্ত অভিজ্ঞতা, কিছু করবার-বলবার-বলতে না পারবার জেদ আর গৎবাঁধা নিয়ম ভাঙার প্রচণ্ড ইচ্ছের টুকরো টুকরো খণ্ড দিয়েই লিখেছেন ‘মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল।’
বই না, একটা দলিল হিসেবেই সংগ্রহে থাকুক নাহয়। সত্যি ঘটনার দলিল, মিথ্যে ঘটনার দলিল।
মোহতাসিম হাদী রাফীর প্রথম মৌলিক উপন্যাস "মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল"। বইটার পাণ্ডুলিপি পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল ২০২০ সালের এপ্রিল মা��ে। সাবজেক্ট, ন্যারেটিভ, এক্সিকিউশন- প্রচণ্ড ম্যাচিওরড; নেশা ধরানো। এইটুকু বয়সে (!) হাদী এমন একটা উপন্যাস লিখে ফেলেছে, ভাবলে হিংসা হয়। আপনি থ্রিলার পড়তে ভালোবাসেন? সমকালীন উপন্যাস? কবিতা? জাদুবাস্তব গল্প? বিপ্লবের আখ্যান? সুনীল? বুদ্ধদেব বসু? পাঠক হিসেবে যা কিছুই প্রেফারেন্স থাকুক, ক্লাস্টার ফুল আপনাকে মুগ্ধ করবে।
লেখকের প্রথম মৌলিক বই হিসেবে খুবই পরিণত লেখনশৈলী। বাঁধা ধরা কোন গল্প নাই। মূলত বিপ্লবের গল্প বলতে চেয়েছেন লেখক। বাংলাদেশের পাহাড়ি সম্প্রদায় এবং স্পেন-ফ্রান্সের বাস্ক সম্প্রদায়ের গল্প। পজিটিভ দিক হচ্ছে গল্পে নিরপেক্ষতা বজায় ছিল। এছাড়া লেখক বেশ সাহসীও বলতে হবে। বেশ কিছু স্পর্শকাতর দিক উঠে এসেছে গল্পে। তবে সবথেকে পজিটিভ দিক হচ্ছে গল্পের ফ্লো খুব সুন্দর। কোথাও আরোপিত মনে হয় নি।
প্রথম বই হিসেবে প্লট সিলেকশন এবং গল্প বলার ধরণ বেশ চমকপ্রদ। মোহতাসিম হাদী রাফীর পরবর্তী মৌলিক বইয়ের অপেক্ষায় থাকবো।
'আল কিনারে নাহর গাছে বগা বগা ফুল ফুল কে দেখিয়া ছুড়ি ধ্যাচাকে চামড়াইল, গাছের মধ্যে তুলসী বাটার মধ্যে পান সাদা সাহেব ফাঁকি দিয়া চলাইলি আসাম।'
আমি মুগ্ধ! একটানা পড়ায় লেখকের তীব্র আবেগের মাদকতা ধরে ফেলেছে আমাকেও। বিপ্লব, প্রেম আর সংহতি, এসবকিছু মিলিয়ে লেখা হয়েছে লেখকের প্রথম বই 'মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল'। বইটি কিনেছিলাম আমি সড়ক আন্দোলনের গল্প ভেবে। পড়বার আগ পর্যন্ত আমার ঠিক ধারণা পরিষ্কার ছিলোনা এটি কি ধরণের বই।
বহুল তথ্য সমৃদ্ধ এই ছোট্ট বইটায় ছোট ছোট করে অনেকগুলো গুরুগম্ভীর বিষয়ের অবতারণা ঘটেছে। ছিলো অসংখ্য ছোট ছোট সাহিত্য, গান কিংবা বইয়ের রেফারেন্স। ছিলো একটা মুক্তির স্বপ্ন দেখা জীবন চাওয়ার আকাঙ্খা। ছিলো প্রেম, ছিল দ্রোহ, ছিল মানবিক অসহায়ত্ব। কিন্তু তিনটি বিপ্লবের গল্পে উঠে এসেছে সামষ্টিক একটাই উপসংহার। বাস্ক থেকে শুরু করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়ে পার্বত্য অঞ্চলকে ঘিরে বিপ্লবের গল্পগুলো বলে গেছে তনক, ম্যারিওন কিংবা লেখক নিজে। ন্যাশনালিজম আর কাঁটাতারের দিকে তাকিয়ে মানুষ হিসেবে কবেই ভুলে গেছি আমরা আসলে কি চেয়েছিলাম। সিসিফাসে বন্দী হয়ে একটা গৎবাঁধা নির্মম জীবনে কিভাবে যে আটকে পড়ে আছি সবাই, ভেবে দেখবার সময় কই? সেই ইংরেজ সাদা সাহেব থেকে শুরু করে এখনকার নিজের দেশীয় শাসক, সবাই ফাঁকি দিয়ে আসামে চালিয়ে দিচ্ছে। সংখ্যালঘুরা শোষিত হচ্ছে সবখানে। সবখানেই আমরা ভুলতে বসছি 'মানুষ' হিসেবে মানুষের মূল্য। রক্তে রক্তে সড়ক থেকে পাহাড় ভেসে যাচ্ছে। নির্মমতা শেষ হচ্ছেনা। আসলেই তো, কোনটা বেশি পীড়া দেয়? অন্যের কাছে পরাধীন হয়ে থাকতে? নাকি নিজের কাছে নিজে জিম্মি হয়ে থাকতে? কত মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা যে করেছে মানুষ, কিভাবে ভুলে যাচ্ছিলাম সেসব ভাবি। হাজার ফুট মাটির গভীরে থেকেও সেসব বিপ্লবী মানুষের মর্মবেদনার জানানই দেয় বোধ হয় মাটিতে ফুটে থাকা ক্লাস্টার ফুল।
বইটি প্রথম বই হিসেবে অত্যন্ত পরিপক্ক। সুন্দর উপমাময় লেখা। একটিবারের জন্যও মনে হয়নি লেখক ছাত্রাবস্থায় এরকম একটি লেখা লিখে বসে আছেন। বইটির একটা বড় অংশ জুড়ে আছে পার্বত্য অঞ্চলের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণণা, শোষিত মানুষের বর্ণণা। আর সড়ক আন্দোলনের কথা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বলা কিংবা শান্তিবাহিনীর সূচনা, কিভাবে কোথায় কে ভুল সেসব ইতিহাস যেভাবে তুলে ধরেছেন লেখক, অতোটা বলা আসলেই চরম সাহসীকতার পরিচায়ক। সড়ক আন্দোলনের গল্পের আশায় কেনা বইটি হয়তো শুধু এই অংশটুকুর মন ভরাতে ব্যার্থ হলেও মন ভরিয়ে দিয়েছে সামগ্রিক বিবেচনায়। খুব সামান্য কিছু বিষয় ছিলো সাংঘর্ষিক। সেসব নিয়েও কফির টেবিলে ঝড় তোলা সম্ভব।
আমি বইটি রেকোমেন্ড করবো। সমসাময়িক সময়ে লেখা ভিন্নচিন্তার একটি সুন্দর বিষাদঘেরা বই। যেটি আসলেই মাথায় প্রশ্ন ঢুকিয়ে দিয়েছে যে, যে সার্বভৌমত্ব মানুষকে মানুষের মতো করে বাঁচতে দেয় না সে সার্বভৌমত্ব দিয়ে কী হবে?
তিনজন মানুষের তিনটা গল্প। স্থান-কাল-পাত্র ভিন্ন। তবে গাঁথা একই সূত্রে। এটা বিপ্লবের গল্প। সবার মনে অনুরণিত হতে থাকা না বলতে পারা কথার উদগীরণ।
প্রথম বই হিসেবে কোন এক্সপেকটেশন ছিল না। লেখকের সাহিত্যজ্ঞান তুমুল। গল্পের পরিণতির দিকে যে সীদ্ধান্ত উপস্থাপন করেছে লেখক তা কিছুটা হরমোনাল মনে হয়েছে। তা না হলে সলিড ৫ ★ দেওয়ার মতো একটা বই নিঃসন্দেহে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ একদিন পড়াতে পড়াতে আমি আমার ছাত্রকে বলেছিলাম, "যাদেরকে আমরা আদিবাসী বা উপজাতি বলে ডাকি তারাই যে এখানকার আদি বাসিন্দা ও এই জায়গার প্রকৃত মালিক এটা কি জানো? বরং আমরাই অনেক পরে এসেছি। আমরা আসলে দখলদার।" আমার ছাত্র খুব অবাক হয়েছিলো সেদিন। আমি শুধু ওকে এটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম যে অতীতে আমাদের পূর্বপুরুষরা আর এখন আমরা 'আদিবাসী' নাম দিয়ে কাদেরকে কোণঠাসা করে রেখেছি।
সত্য বলতে সাহস লাগে। আর কিছু সত্য আছে, যেগুলো বলতে ও যেগুলোর মুখোমুখি হতে আরো বেশি সাহসের প্রয়োজন হয়। তরুণ লেখক মোহতাসিম হাদী রাফী তাঁর প্রথম মৌলিক বইয়ে তেমনই কিছু সাহসী সত্য তুলে ধরেছেন। হোক গল্পের আকারে, কিন্তু সত্য তো সত্যই। তাই না? পাহাড়ের অশান্তির আঁচ কিন্তু আমাদের এই সমতলভূমির মানুষদের গায়ে সেভাবে কোনদিনই লাগেনি। লাগার কথাও না। আমরা সেটাই দেখতে পাই, যেটা আমাদেরকে অদৃশ্য ক্ষমতাবান সূত্রধররা দেখান। যাই হোক, যখন পাহাড়ি শান্তি বাহিনীর সাথে দেশের সেনাবাহিনীর সংঘাত চলছে, একের পর এক পাহাড়ি গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে সেটেলাররা, নির্বিচারে গণহত্যা চালানো হচ্ছে তাদের ওপর, সেই অস্থির সময়টাকে আবারো তুলে এনেছেন লেখক তাঁর 'মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল'-এ।
এই উপন্যাসিকা থেকে ধারণা পেয়েছি বাস্ক ন্যাশনালিজম মুভমেন্ট সম্পর্কেও। মোহতাসিম হাদী রাফী বেশ দারুণভাবে দেখিয়েছেন, তথাকথিত বিশ্বশান্তির ধামাধরা ভাষা দেশ ও সীমানা ভেদে আলাদা হলেও বিপ্লবের ভাষা সর্বত্রই এক। সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগুরুদের নির্যাতন ও নিষ্পেষণকে কোনভাবেই সুগারকোটেড করে জাস্টিফাই করা যায়নি, যাবে না। জন্মসূত্রে পাওয়া স্বাধীনতা যখন হারিয়ে যায়, বিপ্লব জরুরি হয়ে পড়ে। ঠিক বেঁচে থাকতে গেলে যেমন অক্সিজেন জরুরি। 'মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল'-এর ম্যারিওন চরিত্রটাকে সম্ভবত আমি কোনদিনই ভুলতে পারবো না।
২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন তো আমার চোখের সামনে ঘটা। সেই সময়টাকেও লেখক আবারো একবার জীবন্ত করে তুলেছেন পাঠকের চোখের সামনে। এতো ছোট বয়সে এমন পরিণত লেখা আমাকে অবাক করেছে, মুগ্ধ করেছে। মো���তাসিম হাদী রাফী'র অনুবাদের সাথে আমি আগে থেকেই পরিচিত ছিলাম। আজ পরিচিত হলাম তাঁর মৌলিকের সাথে। প্রথম কাজ দিয়ে তিনি কতোটা বাজিমাত করবেন, সে বিষয়ে যাবো না। তবে এটুকু বলতে চাই যে, গল্প বলার যে অসাধারণ গুণ তাঁর ভেতরে আছে তিনি যেন সেটার চর্চা অব্যাহত রাখেন।
কিছু বই নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। খুব দরকার। 'মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল' এমনই একটা বই। আরো অনেক কথাই আমার এই রিভিউয়ে লিখতে ��েয়েছিলাম। পারলাম না। সবটা বোধহয় বলা বা লেখা যায়ও না। বানান জনিত কিছু সমস্যা খেয়াল করেছি। যেমন অমন-কে ওমন, দমকা হাওয়া-কে ধমকা হাওয়া, লজ্জা-কে লজ্জ্বা, নিরীহ-কে নীরিহ লেখা হয়েছে।
বইটার প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে। বাঁধাই আর কাগজের মান নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। ভিন্ন ধরণের কিছু পড়তে চাইলে 'মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল' পড়তে পারেন। রিকমেন্ডেড।
নিজস্ব সময়ের ডকুমেন্টেশন সব বড় লেখকদের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এবং সেটা প্রথম বইতেই করতে পারা দারুণ ব্যাপার। লেখকের গল্প বলার তাড়নার মতো গল্প লেখার হাত ও বেশ শক্তিশালী। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে লেখা এই বই সমসাময়িক সময় কে নিয়ে নতুন চিন্তায় পাঠককে উৎসাহি করে তুলে। লেখনশৈলী ভালো, কবিতার আনুষঙ্গিক ব্যবহার যথাযথ ছিলো।
বইয়ের নাম: মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল লেখক: মোহতাসিম হাদী রাফী প্রকাশনী: বাতিঘর প্রকাশকাল: ২০২২ রেটিং: ৪.৫/৫
❝এই পৃথিবীর মরা ঘাসে তবু মুক্তির ফুল ফোটে !!!❞
অনেক সময় শুধু বইয়ের নাম বা প্রচ্ছদ সুন্দর দেখে কিনে ফেলি। ❝মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল❞ বইটা হঠাৎ চোখে পড়েছিল বইমেলায় নামের জন্য। প্রিয় ব্যান্ড মেঘদলের গানের একটা লাইন থেকে বইটির নাম দেয়া। লেখক মোহতাসিম হাদী রাফী যথেষ্ট অপরিচিত আমার কাছে। পরে দেখি এটাই লেখকের প্রথম বই, ২০২২ এ বের হয়েছে। কোনো কিছু না ভেবেই কেন যেন বইটি নিয়ে নেই। যাই হোক, হতাশ হতে হয়নি- ঠিক বই-ই হাতে পড়েছিল।
বইয়ের প্লট সমসাময়িক পৃথিবী নিয়ে, যে দিকটা সবসময় চোখে পড়ে না, শোষিত ও নিপিড়ীত জনগোষ্ঠীর বিপ্লব নিয়ে। যদিও ক্রমাগত পুজির সাথে যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে এ বিপ্লবগুলো। কখনো ফ্রান্সের বাস্করা লড়ে যাচ্ছে নিজেদের স্বাধীনতার জন্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীরা ক্রমাগত যুদ্ধ করছে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে, আর কসমোপলিটান শহর ঢাকায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাস্তায় নেমে পড়েছে এক ঝাক কিশোর কিশোরী। ❝একটা কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে সারা শহর উত্থাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে।❞
সমসাময়িক এইরকম হট টপিক নিয়ে গল্প বলা সবসময়ই কঠিন - তার উপর যদি তা হয় এমন জনপদের- যেখানে কঠিন অনুশাসনে শব্দগুলো ফুল হয়ে ফুটতে পারে না। লেখক গল্প সাজিয়েছেন তিন জনের মধ্য দিয়ে, ম্যারিয়ানা, তনক আর গল্প কথক নিজে - যারা স্বপ্ন দেখেন এক সুন্দর পৃথিবীর - ইউটোপিয়ার। তাদের কারো পথ সশস্ত্র, কারো শান্তিপূর্ণ - কিন্তু কেউ কি পারবে সফল হতে? নাকি এই স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাবে পুজির নামে এক অনন্ত চক্রে? দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় এই শোষিত মানুষদের - হঠাৎ করে হয়ত উত্তাল হয়ে উঠে যান্ত্রিক এই শহর- কিন্তু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না কখনোই। চিন্তার খোরাক জাগানোর মতো ১৬০ পৃষ্ঠার ছোট্ট এই উপন্যাসটি।
নতুন লেখক হিসেবে লেখক মোহতাসিম হাদী রাফী-র লেখা খুব-ই প্রানবন্ত লেগেছে,- লেখকের ভিতর থেকে যেন এসেছে এই উপন্যাসিকা- লেখকের ভাষায় যা নির্বাণ। ভবিষ্যতে আরও লেখার অপেক্ষায় রইলাম। শুভকামনা!
৪.৫/৫ অন্যরকম একটা প্লট আর দারুণ লিখনশৈলী। লেখকের প্রথম বইতে এতোটা ম্যাচুরিটি আশা করিনি। তাই হয়তো উপভোগের মাত্রাটা বেশি ছিল। অদ্ভুতভাবে দুই ভিন্ন দেশের দুই সংখ্যালঘু জাতির স্বাধীনতার আন্দোলনকে এক সুতোয় গেথেছেন লেখক। সাথে মাঝেমধ্যে বলে গেছেন নিজের গল্প। ছোট্ট বইটা যেন এক নিমিষে শেষ হয়ে গেছে। শুভকামনা লেখকের জন্য।
সহজ কথায় বলতে গেলে বইটা বিপ্লবের গল্প বলে, পৃথিবীজুড়ে সংখ্যালঘুদের নিপীড়নের গল্প বলে, ক্ষমতাসীনের আগ্রাসনের গল্প বলে।
পার্বত্য শান্তিচুক্তি থেকে শুরু করে বাস্ক ন্যাশনালিজম মুভমেন্ট অথবা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন - সবগুলোরই মূলে ভালোভাবে খেয়ে পরে মাথা উঁচু করে নিরাপদে বাঁচতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। হোক সে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলের আন্দোলন অথবা সাধারণ স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের দাবী। কেউ নিজের সার্বভৌমত্বের দাবীতে অনড়, কেউবা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে নিরাপদে বাঁচতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নামে রাজপথে। আর দিনে একশ টাকা পারিশ্রমিক পাওয়া চা বাগানের শ্রমিক দেশবাসীকে চা পানের বিলাসিতার সুযোগ করে দিয়ে নিজের অন্ন সংস্থানে অপারগ। বিপ্লবী হোক অথবা হোক আমজনতা, সকলের রক্তে রঞ্জিত আজ পাহাড় কিংবা রাজপথ। নাম না জানা কতজনের সমাধি ছেয়ে আছে ক্লাস্টারফুলে।
"কোনটা বেশী পীড়া দেয়? অন্যের কাছে পরাধীন হয়ে থাকতে? নাকি নিজের কাছে নিজে জিম্মি হয়ে থাকতে?"
ছোট্ট একটা বইতে লেখক তুলে এনেছেন কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের পরিসংখ্যান, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্বাপর, বন্যাকবলিত অগনিত মানুষের দূর্ভোগ, বাস্ক ন্যাশনালিজম মুভমেন্টের শুরু ও শেষ, ফ্রান্স এবং স্পেনে বাস্কদের দুর্দশা, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, চা বাগানের শ্রমিকদের দূর্ভোগ। ছোট ছোট কিছু গান আর কবিতার উপস্থিতিতে পুরো লেখনী হয়ে উঠেছিলো বেশ উপভোগ্য। প্রথম মৌলিক উপন্যাস হিসাবে প্লট এবং লেখনী দুটোই বেশ পরিপক্ব। তবুও লেখনীতে উন্নতির জায়গা নিঃসন্দেহে আছে।
যে সার্বভৌমত্ব মানুষকে মানুষের মত করে বাঁচতে দেয় না সেই সার্বভৌমত্ব দিয়ে কী হবে? জন লেননের ইমাজিনের সীমান্তবিহীন ইউটোপিয়াই কী মুক্তির পথ?
শুরুতে কেমন যেনো গল্পটা ধরতে কষ্ট হচ্ছিলো। কিন্তু কিছু পথ যাবার পরে দেখি অসাধারণ একটা বই। এমন কিছু ব্যাপার নিয়ে লিখেছে যেটা নিয়ে হয়ত এখন অনেকে কথা বলবে না বা ভয় পাবে ICT Act এর জন্য। সুন্দর অনেক সুন্দর।
"একটা কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে সারা শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে।"
লেখক বিপ্লবের গল্প বলতে চেয়েছেন, এর প্রয়োজনে বাঁকে বাঁকে কাছের মানুষদের থেকে দূরে সরে যাওয়ার গল্প বলেছেন। তার সাথে মিশে থাকা তীব্র আবেগ ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। মনে হয়নি এটি তার প্রথম লিখা, পড়তে পড়তে বারবারই নিজেকে চরিত্রগুলোর সাথে একাত্ম মনে হচ্ছিল। পাশাপাশি গল্পের সাথে উঠে আসা বিভিন্ন কাব্যাংশ এটিকে অন্য মাত্রা দিচ্ছিল।
এতো ছোট একটা বই অথচ পড়তে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি। গত তিনদিন ধরে একবারের জন্যও পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারলাম না । অন্য কোন এক সময় চেষ্টা করব। এখন এইটা পড়তে যাওয়া মানে সেধে রিডার্স ব্লকে ঢুকা।।
**৭০ পৃষ্ঠা পড়ে রেটিং দিতে চাচ্ছি না।ভবিষ্যতে আরো একবার চেষ্টা করার ইচ্ছে রাখলাম।
মতের মিল হলো না বলে বিশাল একটা ভূখণ্ডকে কেঁ টে ছিঁ ড়ে দুইভাগ করা হলো। সেই দুইভাগের একভাগের মধ্যেও মিল হলো না। আবার আলাদা হয়ে দুটো দেশে পরিণত হলো। এবার বুঝি মুক্তি মেলে? কিন্তু মুক্তি কি কোথাও মেলে? অস্তিত্বের ল ড়া ই করতে করতেই এক সময় মহাকালের পথে যাত্রা করতে হয়। পাহাড়িদের সাথে সমতলের বিবাদ বহু পুরনো। সেটেলারদের নি র্যা ত নে তটস্থ পাহাড়বাসি। একদিন একটু শান্তিতে থাকলে পরদিনই সুদে আসলে মূল্য চুকাতে হয়। আদিবাসীদের বসতি জ্বা লা ও- পো ড়া ও অব্যাহত থাকে। এমনই এক আদিবাসী তনক। অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া ছেলেটা গল্পের বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসে। ভালোবাসে বান্ধবী শ্যাফালির সাথে ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু আদিবাসী তো! সুখের জীবন তো বেশিদিন রয় না। নিজ চোখে দাদা-দাদীর বসতি ছাই হতে দেখে সে, দেখে তাদের পুড়ে যাওয়া দেহাবশেষ। জিদ চেপে যায়। যে বয়সে পিঠে স্কুলব্যাগ থাকার কথা সে বয়সে রা ই ফে লে র ভার বয়ে বেড়ায়। শান্তিবাহিনীতে রঞ্জুদার সাথে যোগ দেয়। পাহাড়বাসীর মুক্তি কি মেলে? ম্যারিওন, একজন বাস্ক। ফ্রান্স আর স্পেনের কাঁ টা তা রে আটকে যাওয়া জনগোষ্ঠী। নিজের স্বাধীনতা আর অধিকার রক্ষায় ইতায় যোগ দেয়। সংগ্রাম করবে। কিন্তু এই সংখ্যালঘুর সংগ্রামের শেষ আছে কি? গল্পকথক ছুটেছেন নির্বাণ লাভের আশায়। নিজের গল্প শুনিয়ে যেতে চান আজীবন। ভালো শ্রোতা দরকার। নিজের সবটুক উগড়ে দিতে হবে। তবেই মিলবে নির্বাণ। গল্পবলিয়ে তো বহু আছে ভালো শ্রোতা কয়জন? শাহবাগের আন্দোলন, বাস্ক আন্দোলন, বাঙালি-আদিবাসী আন্দোলন সব জল যেন গড়িয়ে একদিকে যাচ্ছে। এত আন্দোলনের শেষ পরিণতি কী? মুক্তি মিলবে অবশেষে? পাঠ প্রতিক্রিয়া: গল্পকথক, ম্যারিওন, তনক তিনটা চরিত্র। ভিন্ন তাদের জীবন, ভিন্ন তাদের ঘটনা। তবে লক্ষ্য তাদের এক। ছুটছে মুক্তির আশায়, স্বাধীনতার আশায়। কেউ জাতি হিসেবে স্বাধীনতা চায় তো কেউ চায় জীবনের স্বাধীনতা। ম্যারিওন আর তনক যেন একে ওপরের প্রতিচ্ছবি। সংখ্যালঘুদের মাথার উপর সংখ্যাগুরুদের কাঠাল ভেঙে খাওয়া তো সেই আদ্দিকালের ঘটনা। যা চলেই আসছে। স্বাধীন ভূখণ্ডে থেকেও যারা পরাধীন, দেশের হয়েও তারা দেশের কেউ না। লেখক সংলাপের চেয়ে গল্প বলাটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। গল্পকথকের আড়ালের মানুষটা যেন স্বয়ং লেখক। নিজের চিন্তাধারা বইতে তুলে ধরেছেন। অনেক স্পর্শকাতর বিষয় লেখায় অকপটে তুলে ধরেছেন। এজন্য তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। ২০১৮ সালের সেই সড়ক আন্দোলনের কথা কী দারুণভাবেই না তুলে ধরেছেন! সি ন্ডি কে ট, নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাছে জি ম্মি হয়ে থাকার কথা, পাহাড়ে সেটেলারদের ত্রা সে র রাজত্ব আর মানুষের অসহায়তার কথা নির্দ্বিধায় বলে গেছেন। প্রথম লেখা বই হিসেবে লেখকের দারুণ কাজ। পড়তে গিয়ে চিন্তার খোরাক বাড়িয়ে দিয়েছেন। নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনাগুলো পড়তে গিয়ে সে সময়ের কথাগুলো মনে পড়ে গিয়েছিল। কী দারুণ ভাবেই না তুলে এনেছেন লেখাগুলো! সাথে উপমা, কবিতার প্রয়োগগুলো মিলে গেছিল। এই বইয়ের শেষটা অসাধারণ। এমনভাবে শেষ হওয়া তৃপ্তিদায়ক। আক্ষেপ থাকে না। বরং পাঠক বইয়ের শেষে এসেও নতুন করে ভাবনার অতলে হারিয়ে যায়। বইটাকে লেখক কয়েকটা অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। প্রতিটা অধ্যায়ের নামও দিয়েছেন ঘটনার সাথে মিল রেখে। কবিতা বা গানের চরণ ব্যবহার করেছেন। সাথে সুন্দর স্কেচ ছিল। সবমিলিয়ে উপভোগ্য ছিল বেশ। বাতিঘর প্রকাশনী থ্রিলার বইয়ের উপর বেশি প্রাধান্য দিলেও এ বইটি একেবারেই ভিন্ন ধারার। বাতিঘর নতুন লেখকদের অগ্রাধিকার সবসময় সবার উপরে। সে হিসেবে এই বইয়ের লেখক প্রশংসা পাবার যোগ্য। প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন: প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে। বানান ভুলের পরিমাণ খুবই কম। বইয়ের বাঁধাইও বেশ ভালো।
কোন একটা লেখায় ডিটেইলিং কেমন সেটা আমার মতন পাঠকের জন্য বড় একটা ফ্যাক্টর। কেননা, আমি যা পড়ি তা কল্পনায় আমার চোখে ভাসে। ডিটেইলিং যত সুক্ষ্ম, আমার কল্পনাটা তত স্পষ্ট ও সুন্দর হয়। সবাই এই কাজটা সুচারুভাবে পারেন না। অনেকে ডিটেইলিং করতে গিয়ে লেখায় মেদ বাড়ান আবার অনেকের লেখা বুঝতেই কষ্ট হয়ে যায়। তবে এই বইয়ের সবচেয়ে মুগ্ধকর বিষয়টাই ছিল ডিটেইলিং, মনে হচ্ছিল আমি তিব্বত কিংবা রাঙ্গামাটি বা কাপ্তাই লেকের ঐসব জায়গায় হাঁটতেছি এখন। কিংবা ম্যারিওনের উপাখ্যানে ইউরোপের যেসব বর্ণনা আসছে তার ডিটেইলিং এর জন্যও বেশ ঘাঁটাঘাঁটি করা লাগছে লেখকের।
লেখকের প্রথম বই হিসাবে লেখনী বেশ ম্যাচুরড আর চমৎকার। গল্পের প্রধান দুই চরিত্রের বয়ানে লেখক অনেকগুলা বিষয় তুলে আনছেন, সার্বভৌমত্ব কিংবা পাহাড়িদের সংগ্রাম কিংবা ১৮ সালের ছাত্র আন্দোলন। ১৮ এর ছাত্র আন্দোলনের সময় আমি নিজেও অ্যাডমিশন পরিক্ষার্থী ছিলাম এবং আন্দোলন আমি যেখানে কোচিং করতাম সেখানেও হইছে। যাক গে, আন্দোলনের সফলতা কিংবা ব্যর্থতা সুন্দরভাবে উঠে আসলেও বইয়ে এর দরকার ছিল না আমার মতে। যদিও ইরার মৃত্যুর সাথে কানেক্ট করার জন্য আনা হইছে তাও বইয়ের প্রধান দুই গল্পের ফ্লো টাই ভাল্লাগতেছিল বেশি। একটা জায়গা একটু বেশি মেলোড্রামাটিক হয়ে গেছে। মেলোড্রামার খেলা খেলার এই বদঅভ্যাস হরিশংকর জলদাসেরও আছে। ওভারলি বইটা অনেক ভাল লাগছে। এক নিমিষে পড়ে ফেলার মতন সুস্বাদু গদ্য।
মাঝে বেশ কয়েকদিন বই পড়া হচ্ছিল না। কি মনে করে বইমেলায় কেনা বইটা হাতে নিলাম। আই অ্যাম গ্ল্যাড যে আমি তুলে নিছি। অনেকদিন পর একটা বই শেষ হল তাও তৃপ্তির সাথে। রেকমেন্ডেড।
"একটা কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে, কবে সারা শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে।"
মোহতাসিম হাদী রাফীর প্রথম মৌলিক বই "মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল" বইটি বেশ মায়াময়। লেখকের লেখনী বেশ ইউনিক লাগল। প্রথম বইয়েই তিনি বাজিমাত করেছেন। লেখকের লেখায় মাদকতা আছে। নেশা ধরে যায় কেমন যেন! ১৫৮ পৃষ্ঠার ছোট্ট এই বইটা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। দারুণ! অনবদ্য!
গল্পের দুইটা ভাগ আছে। এক ভাগে আছে তনক। আরেকপাশে আছে গল্পকথক নিজে। গল্পকথকের সাথে ম্যারিওন নামের এক লাস্যময়ী বিদেশি। তিন আলাদা চরিত্র, আলাদা ব্যক্তিত্ব; তবে কোথাও যেন ওরা এক। তিনজনেই বিপ্লব চায়। কারো বিপ্লব স্বাধীনতা অর্জনের জন্য, কেউ বা চায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আবার ক��রো বিপ্লব নিজের সাথে, নিজের জীবনের সাথে; যেখানে থাকে মুক্তির পথ খুঁজে নেয়ার নিরন্তর চেষ্টা। আবার কোথাও কোথাও বিপ্লব মানে সংঘাত নয়, নয় বিদ্বেষের আগুন। বিপ্লব হতে পারে এক রাষ্ট্র, এক জাতি প্রতিষ্ঠার আশায়-ও।
"মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল" উপন্যাসিকায় একে একে উঠে এসেছে পাহাড়ি অঞ্চলে থাকা মানুষদের দুর্দশার কথা। তাদের নিপীড়নের কথা। উঠে এসেছে সড়ক আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা। কিছুদিনের জন্য ছাত্রদের জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় যে বদলে গিয়েছিলে ঢাকা শহরের চিত্র। লেখক তুলে ধরেছেন বাস্ক অঞ্চলের মানুষদের স্বাধীকার আন্দোলনের বিষয়। ওরাও স্বাধীনতা চায়। কারো মুখাপেক্ষী হয়ে নয়, নিজেদের মতো বাঁচতে চায়। পারে কী?
লেখকের প্রথম বই হিসেবে যে পরিপক্কতার দেখা পেয়েছি, প্রশংসা করার মতো। এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে লেখা সাহসী সিদ্ধান্ত-ও বটে। লেখকের গল্প বলার ধরন অসাধারণ। বর্ণনা দুর্দান্ত লেগেছে। পার্বত্য অঞ্চলের বর্ণনা তিনি যেভাবে করেছেন, যেন পুরো পাহাড়ের চারিপাশ দেখতে পারছিলাম। শোষণ, নিপীড়ন, অত্যাচারের দৃশ্যও সামান্য হলেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
লেখকের চমৎকার লেখনীর সাথে অসাধারণ কিছু উপমার ব্যবহার যেন খাপে খাপ মিলে গিয়েছিল। বাহুল্য একেবারেই ছিল না। বিশেষ ক্ষেত্রে এক দুই শব্দে অনেক কিছু বুঝিয়ে দেওয়া বেশ ছিল। সংলাপের চেয়ে লেখক গল্প বলায় মনোযোগী ছিলেন। এই বইয়ের ক্ষেত্রে যা যথাযথ লেগেছে। সংলাপেও গল্প বলা-ই প্রাধান্য ছিল।
"মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল" বইটির সবচেয়ে ভালো যে বিষয় লেগেছে, তা বানান ভুলের সংখ্যা কমে যাওয়া। বাতিঘর প্রকাশনীর বইয়ে বানান ভুল শূন্যের কোটায়, সেটা একটা অর্জন বটে। দুয়েকটা যা-ও মুদ্রণ প্রমাদ ছিল, তা আমলে না নিলেও চলে। বইটির প্রোডাকশন কোয়ালিটি যথেষ্ট ভালো। আর প্রচ্ছদ, আমার বিশেষ পছন্দের। মনে হয় যেন জলরঙে আঁকা।
এই বইটি আমি রিকমেন্ড করব। এক অন্যরকম মাদকতায় ভরা ভিন্ন ধরার লেখার সাথে পরিচয় হওয়া যাবে। আমার মনে হয়, লেখক সামাজিক উপন্যাসে ভালো করবেন। যদিও "মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল" অনেকটাই সামাজিক উপন্যাস ধারার। আমার ইচ্ছা লেখক বিশাল কলেবরের কোনো এক লেখার সাথে পরিচিত হওয়ার। নেশা ধরানো বিষাদ মাখা লেখায় বুদ হতে চাই। লেখকের জন্য শুভকামনা।
"কোনটা বেশি পীড়া দেয়? অন্যের কাছে পরাধীন হয়ে থাকতে? না-কি নিজের কাছে নিজে জিম্মি হয়ে থাকতে?"
বইটার সবথেকে পজেটিভ দিক হল লেখনশৈলী। সুন্দরভাবে গল্পটা বলা হয়েছে। পুরো গল্প জুড়েই রয়েছে বিষণ্নতার ছাপ। বিভিন্ন উপমাগুলো আরও বাড়িয়ে দিয়েছে সেই ছাপ। কিছুটা জাদুবাস্তব ভাবও রয়েছে। পুরো কাহিনীতে মিলিত হয়েছে তিনটা গল্প, তিনটা বিপ্লবের গল্প। বাস্কদের, পাহাড়ী এলাকার জনগোষ্ঠীর ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের গল্প। এসব আন্দোলনের করুণ ঘটনাগুলো নিয়েই উপন্যাসিকা সাজানো। সবমিলিয়ে মোটামোটি লেগেছে। লেখকের জন্য শুভকামনা, আরও নতুন কিছুর অপেক্ষায় থাকলাম
বইটা সুন্দর। লেখকের লেখা ভালো লেগেছে। গল্পের প্লটটা ইন্টারেস্টিং। ফ্ল্যাপে বলা আছে, 'গল্পের স্থান সত্য, কাল সত্য, ইতিহাস সত্য—মিথ্যা কেবল চরিত্রগুলো।' ছোট্ট করে বলি, বইটি রচনা হয়েছে পুরাতন ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সময়ের ছোট্ট ছোট্ট কাহিনীকে অবলম্বন করে। যেমন ছাত্র আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলনকারী এসবকে ঘিরেই মূল বই।
ছোট্ট বইটা চমৎকার। শেষ করার পর মনে হলো, এত তারাতাড়ি শেষ না হলেও পারতো। আরেকটু বিস্তারিত লেখলে মনে হয় পূর্ণ তৃপ্তি পেতাম। এই কথা বলার একটা বিশেষ কারণের একটি হলো ছোটবেলা থেকে আমি নিজেই রাঙ্গামাটিতে মানুষ হওয়া। লেখকের মূল লেখার প্রায় অর্ধেক অংশ জুড়ে রাঙ্গামাটি রয়েছে। রাঙ্গামাটির ইতিহাস, জায়গার বিবরণ, শান্তিবাহিনী উত্থানের তথ্য কম বেশি জানা থাকলেও আরো নতুন অনেক তথ্য লেখা থেকে পেয়েছি। আগেই বলেছি রাঙ্গামাটির সাথে আমার একটা সম্পর্ক আছে, সেটা খুব গভীর ভাবে। তাই কেউ যখন এই জেলা নিয়ে কথা বলে তখন খুব ভালো লাগে। যদিও মোটামুটি তিন পার্বত্য জেলার কথাই আছে। তবুও মেইন ফোকাসে রাঙ্গামাটি ছিলো। এই একটা কারণে বইটা বিশেষ ভালো লেগেছে। বাকিসব মিলিয়ে বইটা ভালো। স্পর্শকাতর অনেক বিষয় লেখার মধ্যে এনেছেন। যার মধ্যে তৎকালীন সরকার কর্তৃক পাহাড়ে বাঙালি বসতি বৃদ্ধি, পাহাড়ে সেনা মোতায়েন, ছাত্র আন্দোলনের সময় সরকারের উপর মহল থেকে বলা নানান বিবৃতি, শান্তিবাহিনী সূচনা লগ্ন, কাপ্তাই লেক তৈরির ফলে ঘর ছাড়া মানুষের কথাসহ বিভিন্ন বিষয়, যেগুলো আমাকে চমৎকৃত করেছে।
এই মাইন্ড বেন্ডিং থিওরি আবিষ্কার করতে পেরেছি আমি বইটি শেষ করে। থিওরিটি খুবি অতিরঞ্জিত এবং অবাস্তব মনে হতে পারে, কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে হয়তো একমত হবেন।
একটি ছোট্ট উপন্যাসিকা। তিনজনের গল্প। এর মধ্যে দেশ, ভূরাজনীতি এবং প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়ার পরও দুই জনের আখ্যানে কি অপূর্ব মিল!
তনক। তৎকালীন সময়ে সমতলের স্যাটালার এবং পাহাড়িদের নিজেদের মধ্যকার প্রচন্ড হিংস্রতার বাই-প্রোডাক্ট এই অল্প বয়সি ছেলে। একই দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও চরম বৈষম্য এবং নৃশংসতার শিকার তনকের সুন্দর শৈশব পাল্টে যায়। আর্মি, শান্তিবাহিনী এবং জনসংহতির ওয়ারে একটি পক্ষ বেছে নেয় সে।
ম্যারিওন। অন্য জগতের স্বর্ণকেশী যেন। ঘটনাচক্রে বাস্কের স্বাধীনতাসংগ্রামে জড়িয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশ-বিদেশ পাড়ি দিয়ে কখনো মার্সেনারি আবার কখনো স্বাধীনতাকামীর রোলে দেখা যায় তাকে। ঘটনাচক্রে তার সাথে দেখা হয়ে যায় গল্পকারের।
গল্পকার। তনক এবং ম্যারিওনের আখ্যানদ্বয় যেন ভিন্ন আয়নায় দেখা প্রায় একই ধরণের গল্প। কিন্তু বাংলাদেশে "নিরাপদ সড়ক চাই" এর মতো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এক আন্দোলনের কি নিদারুন অপচয় ঘটেছে তা অতি দুঃখের সাথে চেয়ে চেয়ে দেখা একজন।
গল্প অত্যন্ত দ্রুত গতির। একই সাথে প্রাঞ্জল ভাষায় লিখা এই আখ্যান নাকি অল্পবয়সি লেখক মোহতাসিম হাদী রাফির প্রথম মৌলিক লেখা! প্রথম লেখায় স্টোরিটেলিং এর মুক্তার মালা একটি একটি করে এত যত্নের সাথে এবং সুন্দর করে গাথার নিদর্শন পেলাম মনে হয় এই বছরে দ্বিতীয়বার। মুগ্ধ করা এবং মুগ্ধ হওয়া দু'টোই এক ধরণের ক্ষমতা। লেখক তার ক্ষমতা দেখিয়েছেন তার অভিষেক মৌলিক হিসেবে অসাধারণ লেখনীর মাধ্যমে এবং আমি গল্পের ভিতর দিয়ে এক মুগ্ধতার জার্নি করে আসলাম। চমৎকার, চমৎকার এবং চমৎকার।
লেখকের সহজাত লেখালেখির উৎকর্ষতা বারবার বলার মতো বিষয়। সঙ্গত কারণে তার লেখায় সাহসেরও দেখা পেলাম। এই স্টোরি কেউ থ্রিলার, কেউ সামাজিক আখ্যান, কেউবা জাদুবাস্তবতার এক ঝলক দেখানো এক মনস্তাত্ত্বিক জনরা হিসেবে মনে করতে পারেন।
গল্পের সবকিছুই সত্যি আবার চরিত্রগুলো কাল্পনিক। গল্প, ফিকশন এবং বাস্তবতা কোথাও এক হয়ে গিয়েছে আবার কোথাও সব একসাথে হয়ে গেছে ধ্বংসপ্রাপ্ত।
তবে সবকিছু নির্দেশ করে ব্যর্থ বিপ্লবের এক কবরের দিকে। মাটিতে ক্লাস্টার ফুল ফুটে থাকে অনেকসময়।
যেকোন কবর তো মাটির সাথেই মিশে থাকে। কখনো একটু উঁচু হয়ে পাহাড়ের মতো আবার কখনো সমতলের মতো। দেখা যায় না। বুঝা যায় না সেখানে কি আদৌ কবর আছে নাকি শুধুমাত্র মাটি।
কবরে শুয়ে আছে অনেক ব্যর্থতা। আবার কবরের উপর হয়তো ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল।
বুক রিভিউ
মাটিতে ফুটে আছে ক্লাস্টার ফুল
লেখক : মোহতাসিম হাদী রাফী
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২২
প্রকাশনা : বাতিঘর প্রকাশনী
প্রচ্ছদ এবং অলংকরণ : নিশাত তাসনিম ঐশি ( দারুন কাজ করেছেন )
প্রথমেই সকলের নিকট বলে রাখি, অধমের গোস্তাকি মাফ করবেন। এই বইয়ের রিভিউ আমি দিতে পারব কিনা জানি না। তবে পাঠ প্রতিক্রিয়া হিসেবে আপনারা পড়তে পারেন। বইয়ের শুরুতেই দেখা যায় লেখক নেপাল ভ্রমণে যান, সেখানে এক বিদেশিনী, ম্যারিয়নের সাথে দেখা হয়। একই সাথে চলতে থাকে দুইটি কাহিনি, ম্যারিয়ন এবং লেখকের বর্ণনায় তনকের কাহিনি। ম্যারিয়ন হল জাতিতে বাস্ক, যে ফরাসি না। ফরাসি অধিকৃত নিজের এলাকাকে মুক্ত করতে চায়। এজন্য সে ইতা নামের এক সংগঠনের সাথে যুক্ত। অন্যদিকে আরেকজন নায়ক তনক বাংলাদেশের দক্ষিণের রাঙামাটির আদিবাসী সমাজের লোক। ছোটবেলায় সে বাবার কাছে শুনেছে, কীভাবে কাপ্তাই জলবিদ্যুতের কারণে হাজার হাজার মানুষের জমি বিলীন হয়েছে। এরপর নিজের চোখে দেখেছে সেটেলারদের আগমন। নিজের গ্রাম পুড়ে যেতে দেখেছে। সে নিজে এসব দেখে একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত আছে, যারা তাদের মুক্তির জন্য কাজ করছে। তনক এবং ম্যারিয়ন যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। দুজনেই নিজেদের এলাকাকে মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে, সেটা সশস্ত্র পথেই। এরই মাঝে লেখক নিজের গল্প বলেছেন, তার নিজের দ্বন্দ্বের গল্প৷ ২০১৮ সড়ক আন্দোলনের আশার কথা এবং অত্যন্ত নির্মমভাবে সেই স্বপ্ন নিভে যাওয়ার গল্প। লেখক পুরো অংশজুড়ে তনক কিংবা ম্যারিয়নের মাধ্যমে নিজের দর্শন তুলে ধরেছেন। ম্যারিয়ন একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে বন্দুক তুলে নেয়, জাতীয়তাবোধের সমস্ত সীমানা তার মন থেকে মুছে যায়। সে কল্পনা করে এক কাঁটাতারবিহীন পৃথিবী। আদতে এটি লেখকেরই দর্শন, এমন এক পৃথিবীর যেখানে কোনো সীমানা থাকবে না। কোনো ম্যারিয়ন কিংবা তনককে বন্দুক কাঁধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় দৌড়ে বেড়াতে হবে না। তনক রঞ্জনদাকে বলেছিল, সে তার দাদা দাদীকে যেখানে কবর দিয়েছে সেখানটা ছেয়ে গেছে ক্লাস্টার ফুলে। লেখক হয়তো এমন একটা স্বপ্ন দেখেন, যেখানে ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠবে ক্লাস্টার ফুল, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো। সেই ফুলগুলোকে কেউ নির্মমভাবে পিষে দেবে না। বইতে অনেক কন্ট্রোভার্সিয়াল ইস্যু তুলে ধরেছেন লেখক, অনেক তথ্য দিয়েছেন এসব ঘটনার নেপথ্যের। ভাবতেই অবাক লাগে আমার বয়সী একটা ছেলে এরকম বই লিখেছেন। লেখকের দর্শনের সাথে পাঠক একমত নাও হতে পারেন। তবে বইটি পড়ে পাঠক বিষয়গুলো নিয়ে ভাববে, এটুকু বলা যায়। লেখকের লেখনশৈলী ভালো, বইয়ের ভাষাও প্রাঞ্জল। বাতিঘর সাধারণ থ্রিলার নিয়ে কাজ করে বেশি, এ ধরনের বই বাতিঘরের ব্যানারে আসাটাও একটা চমকের ব্যাপার। বইয়ের প্রোডাকশন ভালো, বাতিঘরের বই এমনিতেই সাশ্রয়ী। আর ছাপাও ঠিক আছে, তেমন মুদ্রণপ্রমাদ চোখে পড়ে না। লেখকের জন্য শুভকামনা।
মাস্টারপিস। একজন পাঠকের যে জনরার বই-ই পছন্দ হয়ে থাকুক না কেন, এই বইটা তার ভাল্লাগবে। আর ২০১৮ এর 'নিরাপদ সড়ক চাই' আন্দোলনটাকে তুলে ধরার জন্য লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা রইলো।
পার্বত্য চট্রগ্রামের আদিবাসী হোক, ইউরোপের বাস্ক জনগোষ্ঠী হোক আর সিকিম-দার্জিলিং-কালিম্পং এর গোর্খারাই হোক; এদের ওপর সংখ্যা লঘিষ্ঠদের অত্যাচারের প্যাটার্ন সেই একই। সেই গল্পই উঠে এসেছে লেখকের লেখায়। এর মাঝে ২০১৮ সালের 'নিরাপদ সড়ক চাই' আন্দোলনের গল্পও উঠে এসেছে। লেখকের লিখনশৈলী মার্ভেলাস এবং প্রতিটা গল্প দারুণ সুন্দরভাবে উঠে আসলেও আমার মনে হয়েছে আলাদা আলাদা গল্পগুলোর সংযোগটা আরো ভালোভাবে আসতে পারতো। খানিকটা খাপছাড়া মনে হয়েছে আমার কাছে। সে হিসেবে বইটাকে উপন্যাস হিসেবে আমার খানিকটা দূর্বলই মনে হয়েছে।
It was as if the two parallel storylines spoke of one same story. A very relevant book. The politically aware youth of today can relate heavily with the story. And it did not feel like it's a work of a greenhorn either. Thoroughly enjoyed the book. The book was a trip itself.