আমরা—মানে সেই প্রজন্ম, যারা বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাতে পেয়েছিল ‘হ্যারি পটার’, চোখে পেয়েছিল ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’-এর বিশাল কান্ডারি মধ্য-পৃথিবী, পরে Marvel Universe-এর একেকটা চরিত্র হয়ে আমাদের মধ্যেই বাসা বেঁধেছিল কিশোর স্বপ্নে। আমাদের কাছে “ফ্যান্টাসি” একদম নেশার মতো—চোখের নিচে ঘুম জমলেও পাতা বন্ধ করা যায় না, পিঠে ব্যথা জমলেও পাতার পর পাতা উল্টে যেতে হয়। আর যদি সেই ফ্যান্টাসির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ভালো লেখা, স্পন্দিত কাহিনি আর অবিশ্বাস্য world-building—তবে সে তো হয়ে দাঁড়ায় একপ্রকার আত্মার আশ্রয়।
সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের প্রলয়যোদ্ধা এই অর্থে আমার কাছে এক অসামান্য আবিষ্কার। এবং, আমি বলছি না শুধুমাত্র পাঠক হিসেবে—বলছি একজন সেই পাঠক হিসেবে, যে বিশ্বসাহিত্যের ফ্যান্টাসি শিকড় গেঁথে বসে আছে হৃদয়ের তলে।
World-building বা বিশ্বনির্মাণ ফ্যান্টাসি সাহিত্যের আত্মা। Tolkien-এর Middle-earth যেমন তার হাজার বছরের ইতিহাস, নিজস্ব ভাষা, ধর্ম, ভূগোল ও জাতিগোষ্ঠী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক পৌরাণিক স্তম্ভ হয়ে, ঠিক তেমনিভাবেই, প্রলয়যোদ্ধা তার নিজস্ব জগৎ গড়ে তোলে—সেখানেও আছে অভী, মেঘবর্ণ, বজ্রধরদের মতো চরিত্র, আছে শত্রুতা, অস্ত্র ও অতীতগাঁথা, আছে রাজনৈতিক কূটচাল, সমাজের স্তরবিন্যাস, এমনকি আছে নিজস্ব পরিভাষা—যেমন "ময়ূরবজ্র", "হিমকুশলতা", "নিয়তিলাঞ্ছন", "ঐশিকশ্রেষ্ঠ", "রাক্ষস", "অর্ধরাক্ষস", "নীরসেনা", “চন্দ্রহাস”—যা প্রতিটি পাতায় ধ্বনিত করে এক নিজস্ব বাস্তবতার প্রতিধ্বনি।
Le Guin যেমন তাঁর Earthsea-তে “true name”-এর মধ্য দিয়ে ম্যাজিককে ব্যাখ্যা করেছিলেন, Jemisin-এর “Stillness” ভূখণ্ডের মতোই এখানে প্রলয়যোদ্ধা-র জগৎও দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের জ্যোতির্বিদ্যা, অস্ত্রতত্ত্ব, রাজনীতি ও পূর্বাভাসের ভিত্তিতে। সবচেয়ে বড়ো কথা—এটা নিছক এক অভিযাত্রা নয়, বরং এক অন্বেষণ—কে আমি? কী আমার ভূমিকা? এবং, প্রলয় কি সত্যিই ধ্বংস, নাকি রূপান্তরের পূর্বশর্ত?
আমি মনে করতে পারি সেই দুপুরটা, যেদিন আমি অভীর সঙ্গে পথ চলা শুরু করেছিলাম। আমার জীবনের এক জটিল সময় ছিল সেটা—বহু দিক থেকে ক্লান্ত, মানসিকভাবে খানিকটা নিঃসঙ্গ, কাগজের মধ্যে আশ্রয় খুঁজছিলাম। আর সেখানেই শুরু হল সেই অ্যাডভেঞ্চার, যে অ্যাডভেঞ্চারে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে—তবে যেন আবার খুঁজেও পেয়েছিলাম।
প্রতিটি সফল ফ্যান্টাসি উপন্যাসই আদতে তার পাঠককে বলে—“তুমি শুধু পাঠক নও, তুমি সঙ্গী, তুমি গোপন যোদ্ধা।” প্রলয়যোদ্ধা তার সেই বৃ��্তিতে উজ্জ্বলভাবে সফল। অভী নিছকই এক হিরো নয়, সে এক প্রতীক—আমাদের মতো সাধারণ, ভুল করতে পারে, ভাঙতে পারে, কিন্তু ঠিক সময়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। আর এটাই তো এক সত্যিকারের হিরোয়ের সংজ্ঞা।
এ বই শুধুই কিশোরদের জন্য নয়—যদিও সেটা তার প্রান্তিক দর্শন। এই বই এক আদর্শ crossover text—যা কিশোরের কল্পনা আর প্রাপ্তবয়স্কের আত্মদ্বন্দ্বের মাঝখানে একটা সেতুবন্ধন তৈরি করে। আপনি যদি অতীত-প্রীতিতে ভরা হন, যদি রামায়ণ-মহাভারতের অলৌকিক অস্ত্রে বিশ্বাস রাখেন, বা যদি আজকের দিনেও আপনাকে খোঁজ করতে হয় নিজের ভিতরে লুকিয়ে থাকা সাহসিকতাকে—তবে প্রলয়যোদ্ধা আপনার জন্যই।
একবার পড়া শেষ করে আমি দীর্ঘদিন ধরে অনুভব করছিলাম সেই শূন্যতা—যে শূন্যতা একটা ভালো বই শেষ হলে এসে বসে বুকের ভিতরে। যেমনটা লেগেছিল Half-Blood Prince পড়ার পরে, যেমনটা ছিল Return of the King শেষ করার মুহূর্তে। সেই অনুভব আবার ফিরেছে—এটাই লেখকের সার্থকতা।
সব শেষে শুধু একটা অনুরোধ: সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের এই প্রয়াস যেন একক প্রচেষ্টা হয়ে না থাকে। যেন এটিকে অনুসরণ করেন আরও লেখক, আরও প্রকাশক, আরও পাঠক। কারণ বাংলা সাহিত্যে ফ্যান্টাসি লেখা সম্ভব—এ বই তার সপ্রমাণ দলিল।
আর হ্যাঁ, এই যুদ্ধ কিন্তু শেষ নয়। অভীর মতো, আপনিও—আমি—আমরা সবাইই হয়তো একেকজন প্রলয়যোদ্ধা। শুধু জানতে বাকি, আমাদের "চন্দ্রহাস" কোথায় রাখা আছে।
গল্প-সংক্ষেপ: গল্পের কেন্দ্রে অভী—মাত্র পনেরো বছরের এক অনাথ কিশোর। শুরুটা যেন এক চেনা লোককথার মতো—কাকাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিল ‘সোনার পাখি’ ধরতে, কিন্তু বাস্তব তার জন্য বেছে রেখেছিল এক ভিন্নতর, ভয়ংকরতর নিয়তি। হঠাৎ করেই তার জীবনে আবির্ভাব ঘটে এক রহস্যময় যোদ্ধার—যে তাকে টেনে নেয় এমন এক অভিযানে, যেখানে পদে পদে অপেক্ষা করছে রহস্য, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রাচীন ইতিহাসের ছায়া, আর এক অনাগত বিপর্যয়ের অশনি সংকেত।
এই পৃথিবী শুধু মানুষের নয়—এখানে সহবাস করছে রাক্ষস, অর্ধরাক্ষস, এবং কিছু অনন্ত-জ্ঞানসম্পন্ন ঐশিক সত্তা। আর এই তিন শক্তির মাঝে দুলে উঠছে এক অদৃশ্য যুদ্ধ, যার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুই পক্ষই। যুদ্ধ এখনও শুরু হয়নি, কিন্তু আকাশে বজ্রের গন্ধ—প্রলয় যেন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
এই ভয়ংকর দ্বন্দ্বের মূলচক্রে ঘুরছে এমন কিছু অস্ত্র, যেগুলির কথা আমরা পুঁথিপত্রে পড়েছি—রামায়ণ-মহাভারতের দেবতাদত্ত মারণাস্ত্র: পরশুরামের রক্তপিপাসু কুঠার, ভীমের কালান্তক গদা, মহাদেবের চন্দ্রহাস—যেগুলির একটিও ব্যবহার করেই নাকি রাম ভেঙেছিলেন হরধনু, কুরুক্ষেত্র থেমেছিল নিঃশেষে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এসব অস্ত্র আজ কোথায়? বিস্মৃত কোনো পুরাণে, না কি বাস্তবের অন্ধকারে? যদি জানা যায়, আজও কোনো গোপন প্রতিষ্ঠান এই অস্ত্রগুলিকে রক্ষা করে চলেছে, এবং তাদের মধ্যেই কেউ একজন—অত্যন্ত হিংস্র, প্রায় অমিতশক্তিধর এক রাক্ষস—চেষ্টা করছে এই অস্ত্রের সাহায্যে বন্দীদশা ভেঙে ফিরে আসতে, তবে?
‘প্রলয়যোদ্ধা’-র গল্প এই সম্ভাবনার উপর দাঁড়িয়ে—যেখানে অতীতের অস্ত্র, ভবিষ্যতের লড়াই, আর এক কিশোরের ভাগ্য অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে পড়ে একটি বিশাল প্রেক্ষাপটে। এই কিশোর কি পারবে জানতে, কে সেই “অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণীর” প্রলয়যোদ্ধা—যার আগমনে ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে সমগ্র মানবসভ্যতা?
এ গল্প একাই নয়, একঝাঁক চরিত্রের সঙ্গে এগোয়—সমরোত্তম যোদ্ধা মেঘবর্ণ, বজ্রধর, শ্যামশ্রী; জটিল রাজনীতি, বন্ধুত্ব আর প্রতারণার রোমাঞ্চে এগিয়ে চলে অভীর অভিযান, যেখানে কোনো সাদা-কালো নেই—আছে ধূসর, বিষণ্ণ, বিস্ময়কর এক দুনিয়া।
এটা কেবল রূপকথা নয়—এটি অস্তিত্বের চূড়ান্ত সঙ্কট, এক জাগতিক যুদ্ধের অন্তঃসার। কেবল অ্যাডভেঞ্চার নয়—এখানে প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি লড়াই এক আত্মপরিচয়ের নির্মম খোঁজ। এই কাহিনিতে প্রলয় মানে শুধু ধ্বংস নয়—প্রলয় এক বিপ্লব, এক অভ্যুত্থান, যা পুরনো বিশ্বকে পুড়িয়ে তুলে আনে এক নতুন সম্ভাবনার রেখাচিত্র।
আর তার থেকেও ভয়ানক, অনিবার্য প্রশ্নটি হল—কে সেই “অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণীর প্রলয়যোদ্ধা”?
সে কি আদতে এক রক্ষক, না এক বিধ্বংসী?
সে কি পাণ্ডবের উত্তরসূরি, না রাবণের নবপ্রেত?
তার আগমনে কি সত্যিই ধূলিসাৎ হবে সমগ্র মানবসভ্যতা?
নাকি, ধ্বংসের ছদ্মবেশেই লুকিয়ে আছে এক নবজাগরণের বীজ?
এই জিজ্ঞাসাই গল্পের মর্মস্থল, আর ‘প্রলয়যোদ্ধা’ সেই রক্তমাখা দরজার নাম—যেটি খুললেই একসাথে হাওয়া লাগে ইতিহাস, ভবিষ্যৎ, আর একটা ক্ষুদ্র কিশোরের অপরিসীম নিয়তি।
ব্যক্তিগত পাঠ-প্রতিক্রিয়া: ২৭২ পৃষ্ঠার একটি সুবৃহৎ ‘এপিক অ্যাডভেঞ্চার ফ্যান্টাসি’ উপন্যাস, তাও আবার বাংলা ভাষায় এবং সম্পূর্ণ ভারতীয় পটভূমিতে !! সত্যি বলতে, আমার এই আলোচনা বইটির প্রতি আমার ‘অনুভূতি’র বহিঃপ্রকাশ মাত্র ।
▪️এই উপন্যাসের পটভূমি আমাদেরই চেনা পৃথিবী—তবে এক কুহেলিকামণ্ডিত ছায়াপথে দাঁড়িয়ে। যেখানে আলো আর অন্ধকার একে অপরকে অনুসরণ করে চলে, আর পরিচিতের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অপরিচয়ের বিস্ময়। এই পৃথিবী যেমন আমাদের, তেমনই নয়। এখানে মানুষ আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের পাশে ঘোরাফেরা করছে রাক্ষস, অর্ধরাক্ষস এবং ‘ঐশিক’ প্রজাতির অস্তিত্ব, যাদের ক্ষমতা বাস্তবের সীমা অতিক্রম করে পৌরাণিকের ভেতর বিচরণ করে।
কিন্তু এই জাদুপ্রবাহিত জগতে নায়ক হিসেবে উঠে আসে এমন একজন—যে কোনও অর্পিত নায়ক নয়। ‘অভী’ হল এক পনেরো বছরের অনাথ কিশোর, যে কোনও মহাজাগতিক শক্তির অধিকারী নয়। সে ভুল করে, হোঁচট খায়, ভেঙে পড়ে—কিন্তু আবার উঠে দাঁড়ায়। তার ভেতর সেই জেদ আছে, যা অগ্নিপরীক্ষায় পুড়ে এক অনন্য ধাতুতে রূপ নেয়। এই অচেনা দুনিয়ায় সে ধীরে ধীরে খুঁজে পায় নিজের স্থান, নিজের উদ্দেশ্য—আর এভাবেই সে হয়ে ওঠে গল্পের হৃদস্পন্দন।
▪️বিশ্বসাহিত্যের পাঠকদের জন্য তুলনার হাতছানি সবসময় লোভনীয়—Tolkien-এর Middle-Earth, Rowling-এর Hogwarts, কিংবা Martin-এর Westeros-এর মতো বিশাল বিশ্বগঠনের স্পর্শ এখানে রয়েছে বইকি। আমিও ঠিক সেই দ্বিধা নিয়েই পড়া শুরু করেছিলাম, প্রথমে ধরে নিয়েছিলাম হয়তো এটি আরেকটা derivative fantasy হবে। কিন্তু ক'টা অধ্যায় পেরতেই লেখকের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর আর কল্পনাশক্তির স্কেল আমাকে চমকে দেয়। সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায় রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের উপাদানগুলিকে নিয়ে এমনভাবে গল্প বুনেছেন যে প্রতি পৃষ্ঠায় তা হয়ে উঠেছে আমাদের নিজস্ব লোকস্মৃতির পুনর্জন্ম। এটি নিছক ছায়ানুবর্তী নয়—এ এক স্বকীয় নির্মাণ, দেশজ অভিজ্ঞতায় ভেজা।
▪️বিশেষত চরিত্রায়ন আর নামের ব্যবহারে লেখকের অভিনবত্ব স্পষ্ট। প্রতিটি চরিত্র যেন নিজেদের নিজস্ব ছায়া ও আলোকছটায় আলাদা আলাদা রঙে আঁকা। ‘অভী’ ছাড়াও পাঠকের মনে গেঁথে যায় সমরোত্তম মেঘবর্ণ, বজ্রধর, শ্যামশ্রী, পর্বত, চঞ্চল, লীনা, নিধি, উর্ণায়ু এবং ভয়ঙ্কর রাক্ষসনায়ক শর্বর। কেউ মহান, কেউ ধূসর, কেউ গভীর ছলনায় মোড়া—কিন্তু সকলেই জৈবিক, জীবন্ত।
আর এদের আশেপাশে ছড়িয়ে আছে সেইসব অস্ত্র, যাদের নাম শোনা যায় পৌরাণিক শাস্ত্রে—পরশুরামের কুঠার, ভীমের কালান্তক গদা, চন্দ্রহাস, আর আরও কত কী! গল্পে উঠে আসে ‘মৃত দেবতার নদী’র মতো দুর্লভ কাল্পনিক প্রতীক—যা বাংলা ফ্যান্টাসির জগতে এক অভূতপূর্ব সংযোজন।
▪️তবে একে কেবল এপিক অ্যাডভেঞ্চার ফ্যান্টাসি বললে সংজ্ঞার গণ্ডি ছোট হয়ে পড়ে। কারণ এই উপন্যাস কেবল রাক্ষস-মানুষের দ্বন্দ্ব নয়, এটি বিশ্বাস আর বিশ্বাসঘাতকতার গল্প, এটি প্রেম আর আত্মত্যাগের কাব্য, এটি রাজনৈতিক ছলনার আবরণে ঢাকা এক করুণ নৈতিক প্রশ্ন। এখানে ক্ষমতা চাইতে নেই—কারণ ��্ষমতার মুখে রক্ত জমে থাকে। এখানে ভালোবাসা নিঃস্বার্থ নয়, কিন্তু ত্যাগময়।
সত্যি বলতে—তথ্য-ভারাক্রান্ত না করেও যে এমন বর্ণময়, গতিময় ও হৃদয়স্পর্শী কাহিনী বলা যায়, তা এই প্রথম উপন্যাসেই প্রমাণ করে দিয়েছেন লেখক। এই বইটির প্রতিটি অধ্যায় যেন একেকটি খচিত স্বপ্ন, যার ভাষা, গতি আর আবেগ—তিনেই বাজিমাত।
এটি সেই গল্প, যা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও পাঠকের মনের গুহায় বহুক্ষণ ধরে প্রতিধ্বনিত হয়।
▪️বইটির প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ‘অরণ্যমন প্রকাশনী’ যে কতটা যত্ন নিয়ে প্রলয়যোদ্ধা প্রকাশ করেছে, তা স্পষ্ট—চোখ ধাঁধানো প্রচ্ছদ, প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে ঝকঝকে অলংকরণধর্মী হেড-পিস, আর চমৎকার টাইপসেটিং—সব মিলিয়ে বইটি শুধুই পড়ার নয়, দেখারও আনন্দ। মুদ্রণ-প্রমাদ বলতে গেলে প্রায় নেই, যা আজকের দিনে বিরল বলেই মানতে হবে। শুধু একটা ছোট্ট আক্ষেপ থেকেই যায়—যদি কয়েকটি মূল চরিত্র বা দৃশ্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইলাস্ট্রেশন থাকত, তবে সেটি এই ফ্যান্টাসি জগতের আরও অনন্য চিত্রায়ন তৈরি করতে পারত। তবুও, যা আছে, তাতেই পাঠকের কল্পনার ডানায় আগুন লাগে।
শেষে যা বলার থাকে: বাংলা সাহিত্যে ফ্যান্টাসি নিয়ে সাম্প্রতিককালে অনেক ভাল কাজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসর ও পৌরাণিক মেটিরিয়ালকে কেন্দ্রে রেখে এমন পরিণত অ্যাডভেঞ্চার ফ্যান্টাসি বিরল। প্রলয়যোদ্ধা শুধু এক দুর্ধর্ষ কাহিনিই নয়, বরং একটি ধারা গঠনের সূচনা—যা ভবিষ্যতের বাংলা ফ্যান্টাসি সাহিত্যকে আলাদা গাম্ভীর্য ও অভিমুখ দিতে পারে।
যারা রূপকথা, পৌরাণিক থিম আর অ্যাডভেঞ্চারের মিশেলে তৈরি কাহিনিতে হারিয়ে যেতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য প্রলয়যোদ্ধা একেবারে মিস না-করা-পাঠ্য। আর যারা ইতিমধ্যেই এই বইয়ের মায়াজালে ঢুকে পড়েছেন—তাঁদের জন্য এখন একটাই প্রশ্ন: পরবর্তী খণ্ড কবে আসছে?