রামায়ণ-মহাভারতে মারণাস্ত্রের যে বিপুল সম্ভার আমরা দেখেছি, আজ এতকাল পরে সেই বিচিত্রক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রগুলি কোথায় আছে, কেউ কি জানে? কোথায় গেল পরশুরামের কুঠার, যা দিয়ে নাকি এত নরহত্যা হয়েছিল যে সেই রক্তে পাঁচ-পাঁচটা হ্রদ তৈরি হয়েছিল সমন্তপঞ্চকে? কোথায় আছে ভীমের কালান্তক লৌহগদা, যার আঘাতে চূর্ণ হয়েছিল মহাবল দুর্যোধনের ঊরু? রাম হরধনু ভঙ্গ করার পর জনকরাজা কী করেছিলেন তার ভাঙা টুকরোগুলো নিয়ে? কী হবে যদি জানা যায় এইসব দিব্য অস্ত্রের কয়েকটিকে আজও সংগোপনে একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে মানবচক্ষুর আড়াল থেকে লুকিয়ে রেখেছে একদল বীর যোদ্ধা, আর এদেরই কোনো একটিকে ব্যবহার করে বন্দীদশা থেকে ফিরে আসতে চাইছে এক অমিত শক্তিশালী, হিংস্র রাক্ষস?
গল্পের নায়ক বছর পনেরোর অনাথ কিশোর অভী বেরিয়েছিল সোনার পাখি ধরতে, কিন্তু তার জীবনটাই পালটে গেল এক রহস্যময় যোদ্ধার আবির্ভাবে। তার সঙ্গে অভিযানে বেরিয়ে সে জানতে পারল, রাক্ষসদের সঙ্গে মানুষদের প্রলয়ংকর যুদ্ধ শুরু হওয়া সময়ের অপেক্ষামাত্র। আর তার চেয়েও ভয়ংকর জিজ্ঞাস্যঃ কে সেই অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণীর প্রলয়যোদ্ধা, যার আগমনে ধ্বংস হয়ে যেতে চলেছে সমগ্র মানবসভ্যতা?
সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের জন্ম মেদিনীপুর শহরে ১৯৮৫ সালে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। পেশায় স্কুলশিক্ষক। নেশায় পাঠক। দুঃসাহসে লেখক। লেখেন মূলত কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসি। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখালিখি করছেন দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গল্প-সংকলনে। বাংলায় তাঁর ফ্যান্টাসি-অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস ‘প্রলয়যোদ্ধা’ ইতিমধ্যেই পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকার একাধিক স্পেকুলেটিভ সংকলন ও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু গল্প। হলিউডে অনুষ্ঠিত কল্পসাহিত্য প্রতিযোগিতা এল. রন হাবার্ডের নামাঙ্কিত ‘রাইটার্স অব দ্য ফিউচার’-এ একমাত্র ভারতীয় হিসাবে পরপর তিন বছর পেয়েছেন ‘অনারেবল মেনশন’-এর সম্মান। ভালোবাসেন বেড়াল, ব্যাটম্যান, সুকুমার রায় এবং নলেন গুড়ের সন্দেশ।
বাংলায় মৌলিক ফ্যান্টাসি বিশেষ লেখা হয় না। আসলে রূপকথা আর লোককথার থেকে আলাদা, অনেকাংশে নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আধুনিক সমাজচেতনার ফসল এই ঘরানায় লেখালেখি খুব সহজ নয়। আলোচ্য বইয়ের লেখক ইংরেজিতে এই ধারায় লেখালেখি করেছেন বলেই হয়তো তিনি ব্যাপারটা বুঝেছেন। এই বইয়ে, তাঁর মেধা ও শ্রমের ফসল হয়ে আমাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করেছে এক জটিল, বহুস্তরীয় পৃথিবী। সেখানে চরিত্ররা আমাদের কাছে পুরোপুরি অচেনা না হলেও তাদের লক্ষ্য এবং চলন অনেকটাই আলাদা। রাজনীতি, বা আরও স্পষ্ট করে বললে ক্ষমতার লোভে দ্বন্দ্বই এই কাহিনির কেন্দ্রে আছে। মহাকাব্যের মতো এতেও আমরা দেখি ধূসর চরিত্রদের আনাগোনা। আর এরই পটভূমিতে ধীরে-ধীরে জ্বলে ওঠে একজন— তার ভবিতব্যকে সত্যি করতে, এক নায়ক হয়ে উঠতে। হিরোইক ফ্যান্টাসির ক্যাম্পবেলীয় মডেল অনুসরণ করায় মনে হতেই পারে যে এই কাহিনির নায়কের চরিত্রটি হয়তো কোনো বিদেশি চরিত্রের আদলেই গড়া। কিন্তু তার পরিবেশ ও পরিপ্রেক্ষিতটি খাঁটি দেশজ এবং বহুলাংশে রূপকথাধর্মী— যা এই লেখাটিকে দেশজ শিকড়ের সঙ্গে জুড়েই রাখে। আর হ্যাঁ, লেখা অত্যন্ত গতিময়। অ্যাকশনের তুলনায় সংলাপের আধিক্য থাকলেও তা কখনোই সেই গতিকে কমিয়ে দেয় না। কল্পকাহিনির অনুরাগী পাঠক এই বইটি— অর্থাৎ ট্রিলজির প্রথম খণ্ডটি পড়ে আনন্দ পাবেন বলেই আমার অনুমান। অলমিতি।
ভারতীয় পটভূমিকায় ভারতীয় চরিত্রদের নিয়ে লেখক সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায় সৃষ্টি করেছেন এপিক এডভেঞ্চার-ফ্যান্টাসি কাহিনী - 'প্রলয়যোদ্ধা'।
কাহিনী সংক্ষেপে - গল্পের নায়ক বছর পনেরোর অনাথ কিশোর অভী বেরিয়েছিল সোনার পাখি ধরতে, কিন্তু তার জীবনটাই পালটে গেল এক রহস্যময় যোদ্ধার আবির্ভাবে। তার সঙ্গে অভিযানে বেরিয়ে সে জানতে পারল, রাক্ষসদের সঙ্গে মানুষদের প্রলয়ংকর যুদ্ধ শুরু হওয়া সময়ের অপেক্ষামাত্র। আর তার চেয়েও ভয়ংকর জিজ্ঞাস্যঃ কে সেই অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণীর প্রলয়যোদ্ধা, যার আগমনে ধ্বংস হয়ে যেতে চলেছে সমগ্র মানবসভ্যতা?
বইয়ের ভূমিকা থেকে জানতে পারা যায় লেখক অদ্যপ্রান্ত ফ্যান্টাসি ঘরানার লেখার একনিষ্ঠ পাঠক বা ফ্যান, এবং বাংলায় এই বিষয় নিয়ে লেখার অভাব তাকে ভীষণভাবে পীড়া দেয়। যার ফলস্বরূপ এই হিরোয়িক ফ্যান্টাসি কাহিনীর জন্ম। কাহিনী পড়লে বোঝা যায় এই ফ্যান্টাসি ঘরানার উপর লেখকের দখল কতটা মজবুত এবং কাহিনী শুরু থেকেই পাঠককে আকর্ষিত করতে থাকে লেখকের লেখনীর গুনে। কাহিনীর প্রতিটি চরিত্র নির্মাণে লেখক প্রচুর পরিশ্রম এবং সময় দিয়েছেন। তাই কাহিনী অগ্রসর হবার সাথে এই চরিত্রগুলির সাথে পাঠক নিজেদেরকে একাত্ম অনুভব করতে পারবেন। মানুষ, রাক্ষস, অর্ধরাক্ষস কত ভিন্ন ধরনের চরিত্র রয়েছে এই কাহিনীতে। এই বইয়ের প্রতিটি চরিত্রই নিজস্ব দোষগুনে শুধুমাত্র তাদের নিজস্বতা ধরে রাখতেই সক্ষম হয়নি, পাঠকদের মনে একটা আলাদা জায়গা করে নিতেও সক্ষম হয়েছে। তাই মূল কাহিনীকে ছাপিয়ে বার বার উঠে এসেছে তাদের অকৃত্রিম বন্ধুত্বের কথা, বীরত্ত্বের কথা, একতার কথা, কঠিন সময়ে সমরগরিমা অক্ষুন্ন রাখার কথা, পারিবারিক মূল্যবোধের কথা, সর্বপরি সকল ভেদাভেদ ভুলে সকলকে ভালবাসার কথা। বইপাঠ শেষ করার পরও এই চরিত্রগুলি মাথার মধ্যে বেশ কয়েকদিন ঘুরপাক খেতে থাকবে একথা জোর দিয়ে বলা চলে।
রামায়ন- মহাভারতে ব্যবহৃত বিভিন্ন মারণাস্ত্রের কথাও রয়েছে এই কাহিনীতে - যেমন পরশুরামের কুঠার, ভীমের কালান্তক লৌহগদা, রামের ভাঙ্গা হরধনুর টুকরো। রয়েছে নানান দিব্যাস্ত্র সংরক্ষণের একটি গুপ্ত প্রতিষ্ঠানের কথা যা মানবচক্ষুর আড়াল থেকে লুকিয়ে রেখেছে একদল বীর যোদ্ধা। আর এদেরই কোনো একটিকে ব্যবহার করে বন্দীদশা থেকে ফিরে আসতে চাইছে এক অমিত শক্তিশালী, হিংস্র রাক্ষস?
এছাড়া এই বইতে রয়েছে বিভিন্ন Mythical Creatures বা legendary creatures এর কথা, যা এর আগে আমরা শুধুমাত্র বিদেশী ফ্যান্টাসি কাহিনীতেই দেখতে পেতাম। মূল কাহিনীর সাথে সামঞ্জস্য রেখে খুব সুন্দরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এদেরকে। যার মজা পাঠকরা এই বই পাঠ করলে বুঝতে পারবেন।
সবশেষে বলা চলে ভালো এপিক ফ্যান্টাসি কাহিনী নিয়ে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের মনে যে প্রত্যাশা ছিল তা অনেকটাই পূরণ করতে সক্ষম হবে লেখক সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের 'প্রলয়যোদ্ধা'।
আমরা... অর্থাৎ যারা একটু বড়ো হওয়ার পরেই তাদের সাথে পরিচয় হয়েছে ‘পটার-দুনিয়ার’ বা ‘লর্ড অফ্ দ্য রিংস’ সিরিজের, আরও একটু বড়ো হয়ে প্রথমে ‘স্পাইডারম্যান’ এবং পরে গোটা ‘মার্ভেল ইউনিভার্স’ রীতিমতো গিলে খাই যারা... তাদের কাছে ‘ফ্যান্টাসি’ বিষয়ক যেকোনো কিছুই একদম নেশার বস্তুর মতো । এদের মধ্যে যারা আমার মতো ‘বই’ পড়তে ভালোবাসেন, তাদের কাছে একটি ‘ফ্যান্টাসি’ উপন্যাস কোনো গুপ্তধনের চেয়ে কম কিছু না । আসলে, বই পড়তে পড়তে আমরা বাস্তব জীবনের দুঃখ-কষ্ট-ব্যর্থতা ভুলে ডুবে যেতে চাই লেখকের সৃষ্টি করা কাল্পনিক জগতে । সেই কাল্পনিক জগতে আরও সুন্দরভাবে ডানা মেলা যায় যদি বইটির বিষয়বস্তু হয় ‘অ্যাডভেঞ্চার ফ্যান্টাসি’ ।
📝 গল্প-সংক্ষেপ : গল্পের নায়ক ‘অভী’ বছর পনেরোর অনাথ কিশোর । সে বেড়িয়েছিল তার কাকার সাথে ‘সোনার পাখি’ ধরতে, কিন্তু হঠাৎ তার জীবনটাই পালটে গেল এক রহস্যময় যোদ্ধার আবির্ভাবে । তার সঙ্গে অভিযানে বেরিয়ে সে জানতে পারল - রাক্ষসদের সঙ্গে মানুষদের প্রলয়ংকর যুদ্ধ শুরু হওয়া সময়ের অপেক্ষামাত্র ।
▪️রামায়ণ-মহাভারতে মারণাস্ত্রের যে বিপুল সম্ভার আমরা দেখেছি, আজ এতকাল পরে সেই বিচিত্রক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রগুলি কোথায় আছে কেউ কি জানে ? কী হবে যদি জানা যায় এইসব ‘দিব্য অস্ত্র’র কয়েকটিকে আজও সংগোপনে একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে মানবচক্ষুর আড়াল থেকে লুকিয়ে রেখেছে একদল বীর যোদ্ধা । আর এদেরই মধ্যে কোনো একটি অস্ত্রকে ব্যবহার করে বন্দীদশা থেকে ফিরে আসতে চাইছে এক অমিত শক্তিশালী, হিংস্র ‘রাক্ষস’ ?
▪️আর তার চেয়েও ভয়ংকর জিজ্ঞাস্য এই যে - কে সেই অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণীর ‘প্রলয়যোদ্ধা’, যার আগমনে ধ্বংস হয়ে যেতে চলেছে সমগ্র মানবসভ্যতা ?
📝 পাঠ-প্রতিক্রিয়া : কি পড়লাম এটা !! ২৭২ পৃষ্ঠার একটি সুবৃহৎ ‘এপিক অ্যাডভেঞ্চার ফ্যান্টাসি’ উপন্যাস, তাও আবার বাংলা ভাষায় এবং সম্পূর্ণ ভারতীয় পটভূমিতে !! সত্যি বলতে, আমার এই আলোচনা বইটির প্রতি আমার ‘অনুভূতি’র বহিঃপ্রকাশ মাত্র ।
▪️এই উপন্যাসের পটভূমি আমাদেরই চেনা পৃথিবী । কিন্তু সেখানকার পরিবেশ, প্রকৃতি একটু অন্যরকম... মায়া এবং রূপকথায় মোড়া । এই পৃথিবীতে মানুষ ছাড়াও আছে রাক্ষস, অর্ধরাক্ষস এবং ‘ঐশিক’রা । গল্পের মূল চরিত্র অভী কিন্তু কোনো বিশেষ শক্তিসম্পন্ন কেউ নয়... বরং খুবই সাধারণ একজন, যার ভুল-ত্রুটিও হয়, সে আঘাত পেয়ে ভেঙ্গেও পড়ে । কিন্তু নিয়তির তাড়নায় তার সাথে ঘটে চলে অদ্ভুত সব ঘটনা, যার মধ্যে জড়িয়ে পড়তে থাকে সে । এইসব ভুল-ত্রুটির বাধা পেরিয়েও নিজের কর্তব্য পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে সে, আর ঠিক এই কারণেই সে হয়ে ওঠে গল্পের নায়ক ।
▪️বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত সব ‘অ্যাডভেঞ্চার ফ্যান্টাসি’র সাথে এই উপন্যাসের পটভূমির মিল পাচ্ছেন তো ? বিশ্বাস করুন, আমিও পড়তে শুরু করেছিলাম এই দ্বিধা নিয়েই, পড়তে পড়তে বারবার তুলনা করার ইচ্ছা চলে আসছিল মনের মধ্যে । কিন্তু কয়েকটি অধ্যায় পড়তেই লেখকের স্বতন্ত্রতার পরিচয় পেলাম । লেখক ভূমিকায় বলেছেন তিনি ফ্যান্টাসির ভক্ত, আমার মনে হয় কথাটি না বলে দিলেও যে কেউ বুঝতে পারবে উপন্যাস পড়লে । তিনি যেভাবে রামায়ণ-মহাভারত এবং পুরাণের সাথে ফ্যান্টাসি মিশিয়ে প্রতি পাতায় পাতায় রূপকথার জাল বুনেছেন, তা এককথায় ‘অনবদ্য’।
▪️এই উপন্যাসের অন্যতম বিশেষত্ব এর চরিত্রায়ন এবং কাহিনীর সাথে সামঞ্জস্য রেখে সুন্দর সব নামের ব্যবহার । কাহিনীর ব্যাপ্তি বড়ো হওয়ার কারণে গল্পে অনেক চরিত্র আছে, কিন্তু প্রতিটি চরিত্রই ভীষণভাবে স্বতন্ত্র । মূল চরিত্র অভী ছাড়াও... সমরোত্তম ‘মেঘবর্ণ’, সমরোত্তম ‘বজ্রধর’, সমরোত্তম ‘শ্যামশ্রী’ থেকে শুরু করে পর্বত, লীনা, নিধি, চঞ্চল, নারদ, রাক্ষস দলনেতা ‘শর্বর’ এবং উর্ণায়ু... এই প্রতিটি চরিত্রই পাঠকের মনে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে । কাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রামায়ণ-মহাভারতের যুগে ব্যবহৃত বিভিন্ন ‘দৈব অস্ত্র’... যেমন - পরশুরামের কুঠার, ভীমের কালান্তক লৌহগদা, মহাদেবের ‘চন্দ্রহাস’ প্রভৃতি । এছাড়াও আছে ‘মৃত দেবতার নদী’ এবং বিভিন্ন ‘কাল্পনিক জীব’এর বর্ণনা... যা বাংলা ফ্যান্টাসির জগতে রীতিমতো দুর্লভ ।
▪️শুধু ‘এপিক অ্যাডভেঞ্চার ফ্যান্টাসি’ বললে আসলে কিছুই বলা হয় না এই উপন্যাস সম্পর্কে । এই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তুর সাথে রয়েছে প্রেম, বন্ধুত্ব, রাজনৈতিক কূটকৌশল, বিশ্বাসঘাতকতা, ক্ষমতার লোভ, আত্মত্যাগের কাহিনী এবং স্বার্থহীন ভালোবাসা... আর আছে কয়েকটি অনবদ্য ট্যুইস্ট, যা এই কাহিনীতে অন্যরকম মাত্রা যোগ করেছে । এতকিছু বিষয় থাকা সত্বেও কোথাও কাহিনীর টানটান ভাব একটুও নষ্ট হয়নি । তথ্য-ভারাক্রান্ত না করেও যে সুন্দরভাবে ‘ফ্যান্টাসি’ গল্প শোনানো যায়, তা লেখক দেখিয়ে দিয়েছেন তার প্রথম উপন্যাসেই ।
▪️বইটির প্রোডাকশন কোয়ালিটি বেশ সুন্দর । দুর্দান্ত প্রচ্ছদ, প্রতি অধ্যায়ের শুরুতে আকর্ষণীয় হেড-পিস্ এবং মুদ্রণ-প্রমাদহীন বই পরিবেশন করার জন্য ‘অরণ্যমন প্রকাশনী’কে অনেক ভালোবাসা জানাই । শুধু যদি কয়েকটি ভালো ইলাস্ট্রেশন যোগ করা যেত, তাহলে মনে হয় আক্ষেপের আর অবকাশ থাকতো না ।
🔹বাংলা সাহিত্যে ‘ফ্যান্টাসি’ নিয়ে ইদানিং বেশ কিছু কাজ হয়েছে, কিন্তু ভারতীয় পটভূমির পরিপ্রেক্ষিতে এইরকম দুর্দান্ত ‘অ্যাডভেঞ্চার ফ্যান্টাসি’ আর লেখা হয়েছে বলে আমার মনে হয় না । যারা ‘রূপকথা’র গল্প পড়তে পছন্দ করেন, তারা একবার পড়ে দেখুন... ভীষণ অন্যরকম স্বাদ পাবেন । আর যারা ইতিমধ্যেই পড়ে ফেলেছেন, তারা অপেক্ষা করতে থাকুন পরবর্তী পর্বের জন্য ।
মিস্টবর্ণের মতো স্ট্রং ফ্যান্টাসি উপন্যাস পড়ে শেষ করে ভেবেছিলাম সব ফ্যান্টাসি উপন্যাসই হয়তো এরকমই ভালো হবে। সেই আশা নিয়ে বাংলাদেশের সব থেকে ওভার হাইপড বই জুলিয়ানের 'আশিয়ানী' পড়তে শুরু করেছিলাম। কিন্তু ২৫০ পাতা অব্দি পড়ার পরেও এরকম শিশুতোষ সুলভ গল্প আমাকে তৃপ্ত করতে পারেনি। সেই থেকে আমার ধারণা হলো বিদেশে ফ্যান্টাসি/ কল্পবিজ্ঞান নিয়ে ভালো কাজ হলেও আমাদের বাংলা ভাষায় হয়তোবা সেই লেভেলের ফ্যান্টাসি উপন্যাস লেখা হয়না। বা সেরকম প্রতিভা হয়তো আমাদের বর্তমান বাংলা সাহিত্যে কারো নেই। এরপরে কি মনে হতে জানি না অরণ্যমন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত লেখক সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'প্রলয়যোদ্ধা' বইটা হাতে তুলে নিলাম। এবং আমার বাংলায় ভালো ফ্যান্টাসি উপন্যাস লেখা হয়না এই ধারণা যেন খড়কুটোর মতো উড়ে গেলো। পড়তে পড়তে হারিয়ে গেলাম অভী, মেঘবর্ণ, ঐশিকশ্রেষ্ঠদের দুনিয়ায়। কি অসাধারণ ভাষা নৈপুণ্য লেখকের, কি অসাধারণ কাহিনী নির্মাণের ক্ষমতা। নিমেষের মধ্যে কাল সারারাত যেন আমাকে দিয়ে পড়িয়ে নিলো বইটা। এতটাই হারিয়ে গেছিলাম অভী, মেঘবর্ণ, বজ্রধর, ঐশিকশ্রেষ্ঠদের দুনিয়ার এই অসাধারণ গল্পে। এখন বাকি দুটো খন্ড 'প্রলয়বহ্নি' ও 'প্রলয়মেঘ' বইগুলি কিনে পড়ার অপেক্ষায় আছি। যারা ফ্যান্টাসি উপন্যাস পছন্দ করেন তাদের জন্য এই বইটা অবশ্যই হাইলি রেকমেন্ডেড।
হ্যারি পটার, পার্সি জ্যাকসন পড়ার পরে মনে হয়েছে বাংলায় এতো কিছু আছে, তবে এইরকম একটা ধারায় খুব বেশি কিছু নেই কেনো। প্রলয়যোদ্ধা পড়ে সেই আফসোস আর নেই।
মানুষের মন সবসময় কল্পনা করতে ভালোবাসে। ভালোবাসে হারিয়ে যেতে এমন সব আশ্চর্য দুনিয়ায় যেখানে কল্পনা গিয়ে বাস্তবের সাথে মিশে এক আদর্শ সমাজের সৃষ্টি হয়। সেখানে এমন অনেক কিছু সম্ভব হয়, যা বাস্তবে আমরা শুধু ভাবতেই সক্ষম।
এরকমই একটি দুনিয়ার নায়ক অভী। সোনার পাখির খোঁজে গিয়ে সে দেখা পায় এক রহস্যময় যোদ্ধার। তার সাথে সে পাড়ি দেয় এক অন্য দুনিয়ায়। সেখানে সে জানতে পারে রাক্ষস আর মানুষদের মধ্যে প্রলয় যুদ্ধ বাঁধতে চলেছে। এরপর অভীর রোমাঞ্চকর অভিযানে কি কি হয় সেটা জানার জন্য বইটা পড়াই ভালো। এর বেশি কিছু বলে মজা নষ্ট করতে আমি চাই না।
রামায়ণ-মহাভারতকে যদি কোনো আলাদা ইউনিভার্স হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সেখানে ঘটা প্রত্যেকটি ঘটনা নিঃসন্দেহে এক একটি অতি রোমাঞ্চকর অভিযান। নানা রকম অস্ত্রের ব্যবহার, রাজনীতি, সমাজধারা সব কিছু মিলিয়ে দারুন ব্যাপার। সেইখান থেকেই অস্ত্রের রেফারেন্স নিয়ে লেখক তৈরি করেছেন এক চমৎকার কাহিনী। পড়তে গিয়ে কোথাও এক মুহূর্তের জন্য আটকাতে হয়নি। খুব মসৃণভাবে সম্পূর্ন কাহিনী এগিয়ে গেছে নিজস্ব ছন্দে। সব থেকে ভালো লেগেছে ভাষার সুন্দর ব্যবহার। ফ্যান্টাসি যারা মোটামুটি নিয়মিত পড়েন তারা জানেন যে কিছু ব্যাপার আগের থেকে আন্দাজ করা যায় এখানে। কিছু জায়গায় পরিণতি বুঝতে পারলেও তার জন্য ভালো লাগা একটুও কমেনি। যুদ্ধের মুহূর্ত গুলোও খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিছু জায়গায় আর একটু ভালো ভাবে বর্ণনা দরকার বলে মনে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেটাও কোনোভাবে কিছু গভীর প্রভাব ফেলেনি।
সব মিলিয়ে লেখক চমৎকার একটি ফ্যান্টাসি উপন্যাস এ সফলভাবে পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন তা বলাই বাহুল্য। মূলত কিশোর উপন্যাস হলেও সব বয়সের পাঠককেরই পছন্দ হবে সেটা নিশ্চিত। এতদিন বইটা চোখের সামনে থাকলেও কেন যে পড়িনি তার বেশ আফসোস হচ্ছে।
শেষে পরের বইয়ের হিন্ট দিয়ে শেষ করেছেন। এর পরের পার্ট “প্রলয়বহ্নি“ অনেকদিন আগেই বেরিয়ে গেছে।
এখনও এই বই পড়ে না থাকলে চোখ বন্ধ করে পড়ে নিন। কোনোমতেই হতাশ হবেন না।
সদ্য পড়ে শেষ করলাম সৌম্য সুন্দর মুখোপাধ্যায়ের লেখা মোস্ট প্রবাবলি প্রথম বাংলা ফ্যান্টাসি সিরিজের প্রথম বই 'প্রলয়যোদ্ধা'। বাংলা সাহিত্যে মৌলিক ফ্যান্টাসি সিরিজের যে অভাব রয়েছে, সেই খরা কাটাতে লেখকের এই প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়।
ভালো লাগার দিকগুলো: ১. স্বতন্ত্র গল্প: একদম নতুন এবং মৌলিক এক পটভূমি। ২. লেখনী: লেখকের সাবলীল লেখনী পাঠককে গল্পের গভীরে নিয়ে যায়। ৩. টুইস্ট: শেষের দিকে বেশ কিছু turn and twist আছে, যা পরবর্তী অংশ পড়ার আগ্রহকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। ৪. মান: বইটির Page quality and font বেশ ভালো, যা পড়ার অভিজ্ঞতাকে আরামদায়ক করে তোলে।
ভালো না লাগার দিকগুলো: ১. World Building: ফ্যান্টাসি গল্পের প্রাণ হলো তার জগত। লেখক আরেকটু সময় নিয়ে জগতটি নির্মাণ করতে পারতেন। ২. অতি-মানবিক নায়ক: গল্পের প্রধান চরিত্র অভীকে লেখক একটু বেশিই heroic করে ফেলেছেন। সমরায়তনে আসার সাথে সাথেই সে এমন কিছু করতে শুরু করে যা একজন পরিণত পাঠকের কাছে কিছুটা অবাস্তব বা 'বোকা বোকা' মনে হতে পারে। ৩. মুদ্রণপ্রমাদ: বইটিতে কিছু মারাত্মক printing error আছে, যেমন চরিত্রের নাম অদলবদল হয়ে গেছে, যা গল্পের খেই হারিয়ে ফেলে।
সামগ্রিক মতামত: সব মিলিয়ে বইটি বেশ উপভোগ্য। বিশেষ করে কিশোর বয়সীদের জন্য এটি একটি যথোপযুক্ত অ্যাডভেঞ্চার। তবে পরিণত পাঠকদেরও বইটি মন্দ লাগবে না। বাংলা সাহিত্য জগতে এটি সত্যিই একটি প্রশংসনীয় কাজ। উপরে উল্লেখিত কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও, সিরিজের বাকি বইগুলো নিয়ে আমি আশাবাদী।
এই সিরিজের তিনটি বই-ই সংগ্রহ করেছি। এখন দেখা যাক নেক্সট পার্টে অভীর জন্য কী অপেক্ষা করে আছে!
Among all the Heroic Fantasy or Fantasy Fiction I have read, This is the Best. It is a MUST read. Enigmatic portrayal of the plot. The unveiling of every layer of the mystery is indeed bone chilling. A marvelous work of today's time.
Modern day fantasy classic !! Imagination, thrill and crafty climax at its best! It will take the reader in a different state of mind altogether !Wonderful work!!!👍