এক ঘরে অন্ধকারে বসে থাকেন বাবা। একা। কারো সঙ্গে কথা বলেন না। অন্য ঘরে এক ধর্ষকামী পুরুষের যৌনদাসত্ব স্বীকার করে নেন মা। মাঝের ঘরে বেড়ে ওঠে এক কিশোর। উপন্যাসের নায়ক। বড় হয়ে সে নিজের যৌন-পরিচয় নির্ণয় করতে একের পর এক নারীর সামনে দাঁড় করায় নিজেকে।
গৃহে একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রী-সন্তান পরিচয়ে থাকলেও এই তিনজন মানুষের আলাদা একটা পরিচয় আছে। তাদের সেই গোপন পরিচয় এবং অস্বাভাবিক আচরণের কারণ পাঠক জানবেন কতগুলো বিস্মৃত মানুষের অনির্ভরযোগ্য বয়ানে।
বাংলাদেশের ডেসটোপিয়ান ধারার এ উপন্যাসে মোজাফ্ফরের নির্মেদ গদ্য, অকপট ভাষা, জাদুবাস্তবতা-পরাবাস্তবতা, আকর্ষণীয় নির্মিতি, সব মিলে পাঠক একটি রহস্যমন্ডিত গল্পের ভেতর নিজের দেশ ও সময়কে আবিষ্কার করবেন।
কথাশিল্পী-প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মোজাফ্ফর হোসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে বাংলা একাডেমির অনুবাদ উপবিভাগে কর্মরত। প্রধানত ছোটগল্পকার। পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচক ও অনুবাদক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে। অতীত একটা ভিনদেশ গল্পগ্রন্থের জন্য তিনি এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্য পুরস্কার এবং স্বাধীন দেশের পরাধীন মানুষেরা গল্পগ্রন্থের জন্য আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। এছাড়াও ছোটগল্পের জন্য তিনি অরণি সাহিত্য পুরস্কার ও বৈশাখি টেলিভিশন পুরস্কারে ভূষিত হন।
সুরুজের ছেলেবেলা ছিলো দুঃস্বপ্নের মতো। নিজের মাকে সে অন্যপুরুষের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে দ্যাখে। সে সম্পর্কও চরম অস্বাভাবিক। বাবা একা বসে থাকেন নিজ ঘরে, নীরবে। কানাডা থেকে বহুবছর পর গল্প লেখার প্রয়োজনে দেশে ফেরত আসে সুরুজ। বাবাকে সাথে নিয়ে পূর্বপুরুষের ভিটায় যাত্রা করে সে। সেই যাত্রার প্রথমেই সুরুজ জানতে পারে তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মা বীরাঙ্গনা! একে একে অনেক গোপন তথ্য, অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ে জানতে যেয়ে এক তমসাচ্ছন্ন সময় ও তার ধূসর চরিত্রদের গোলকধাঁধায় পড়ে যায় সে। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের বিপরীত দিকের অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন, অনেক লজ্জা এখনো আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। লেখক সুরুজের সাথে সাথে পাঠকদের সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধানে যে অভিযাত্রায় নিয়ে যান তা থেকে আরো নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়, অন্ধকার থেকে আরো গভীরতর অন্ধকারে নিজেদের আবিষ্কার করি আমরা। লেখকের প্রধান গুণ, তার বক্তব্য স্পষ্ট ও স্বচ্ছ।প্রধান সমস্যাও হচ্ছে, তার বক্তব্য মাঝেমধ্যে দৃষ্টিকটুভাবে স্পষ্ট। বক্তব্য পুরোপুরি "বক্তব্যধর্মী " হয়ে গেলে ঝামেলা। সৌভাগ্যবশত "তিমিরযাত্রা"র সেরা অংশ হচ্ছে এর উপসংহার। নাম ও বিষয়বস্তু যেমন দাবি করে, উপসংহার ঠিক তেমন ধোঁয়াশাপূর্ণ, রূপক ও ইঙ্গিতে ঋদ্ধ; আমাদের অমীমাংসিত প্রশ্ন ও দ্বিধাজর্জর মানসিকতার মতোই দিকচিহ্নহীন। তবে কি মুক্তি নেই? বাবা যেমন বলেছেন, "প্রশ্নের অভাবে অনেক উত্তর আমরা হারিয়ে ফেলেছি", ঠিক তেমনি প্রশ্ন করতে করতেই হয়তো উত্তরটা আমরা খুঁজে পাবো একদিন।
আমি প্রায় সময় বলি কিছু কিছু বই আছে যেগুলো পড়ার পরে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে হয়, তিমিরযাত্রা হচ্ছে সেরকমই একটা বই। বইটা নিয়ে আমি জানতে পারি কারণ বইটা এইবছর কালি ও কলম পুরষ্কার পেয়েছে।
বইটার কাহিনী হচ্ছে কানাডা ফেরত এক যুবক সুরুজ, যে তার বাবাকে দেখে কথা না বলে দিনের পর দিন অন্ধকারে বসে থাকতে, যার মাকে এক ধর্ষকামী পুরুষের যৌনদাসত্বের স্বীকার হতে হয়। সেই সাথে সুরুজ নিজেও নিজের পরিচয় খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু কেন? একদিন ডাক্তারের পরামর্শে সে তার বাবাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারে তার বাবা ছিল একজন মুক্তিযুদ্ধা এবং মা ছিল একজন বীরাঙ্গনা এবং সে নিজেই একজন যুদ্ধশিশু! মুক্তিযুদ্ধের আরো অনেক ঘটনা উঠে আসে, রাজাকার, গ্রাম্য ফতোয়াবাজ লোকজন, আসল মুক্তিযুদ্ধাদের হয়রানির শিকার, আর গা শিরশির করে উঠা মেয়েদের ধর্ষণের কথা, অত্যাচারের কথা। যেটা শাহীন আখতার এর তালাশ পড়ার সময়ও আমার অনেক কষ্ট হয়েছে পড়তে।
বইটাতে জাদুবাস্তবতার একটা দিকও ছিল যেই জনরাটা আমার অনেক প্রিয়, তাই পড়তে আমার অনেক ভালো লেগেছে। এটাকে ডিস্টোপিয়ান নভেল বললেও আমি বলবো মোজাফফর হোসেন যুদ্ধপরবর্তী অনেক টপিকই নিয়ে এসেছেন স্যাটায়ার হিসেবে লিখে, যেগুলো খুবই সত্যি ঘটনা। ইমতিয়ার শামীম এর বইয়ের মতো অনেক টপিক সম্পর্কে জানার বিষয়টা উস্কে দিয়েছেন লেখক। যে বিষয়গুলো আমাদের জেনারেশনের গুটিকয়েকজন জানে বলতে গেলে।
যেই যুদ্ধ বাবাকে বোবা করে দিয়েছে, যেই যুদ্ধে মায়ের স্তন কেটে ফেলেছে, যেই ছেলে নিজেকে হিন্দু বলবে নাকি মুসলমান বলবে সেটা বলতে পারেনা, সেই যুদ্ধতো হয়েছে, কিন্তু আমরা কি এখনো স্বাধীন হতে পেরেছি? এই পরাধীনতার বিষয়টাও উঠে এসেছে বইতে।
মোজাফফর হোসেন হচ্ছেন আমার এইবছরের সেরা লেখক আবিষ্কারের মধ্যে একজন। উনার 'মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ' পড়ে আমি যেই ধাক্কা খেয়েছিলাম, এই বইটাও সেরকমই একটা বই। উনার লেখা নিয়ে কিছু বলার নেই, অসাধারণ লিখেন উনি। তবে পাঞ্জেরীর বইতে কিছু বানান ভুল পাবো এটা এক্সপেক্ট করিনি। তাছাড়া বইয়ের বাইন্ডিং খুবই ভালো ছিল, শুধু প্রচ্ছদটা একটু অপছন্দ হয়েছে।
অনেকগুলো গল্পগ্রন্থের পরে এটা লেখকের প্রথম উপন্যাস এবং প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত। পরবর্তী বইয়ের জন্য শুভকামনা রইলো। আমি এক তারা কাটতেছি কারণ বইয়ের এন্ডিংটা অন্যরকম এক্সপেক্ট করেছিলাম।
বেশ কিছুদিন বিরতির পরে লেখকের বইটা পড়তে শুরু করি। লেখক মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং সামাজিক অসংগতিগুলো তুলে এনেছেন উপন্যাসে বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে। পড়তে পড়তে কেমন যন্ত্রণা তৈরি হবে আর এরপরে হবে প্রবল ক্রোধ।
ইডিপাসকে যেমন জোকাস্ট্রা বারবার সতর্ক করে বলে ‘অধিক সত্য জানতে চেও না।’ ঠিক তেমনি উপন্যাসের নায়ক সুরুজকে তার মা বারবার সত্য জানতে না চাইবার জন্য নিষেধ করে। সেসব নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে সুরুজ যখন তার বাবাকে নিয়ে অতীত খুঁজতে বের হয় তখন সে শুধু অন্ধকারই আবিষ্কার করে ঘটনাসমূহের ইতিহাসে। আর এভাবে ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনাগুলো যা দেখতে বা জানতে আমরা চাইনা তার মুখোমুখি হয় পাঠক।
মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তীকালে রাজাকারদের উত্থানকে উপজীব্য করে লেখা হলেও সমতালে সেখানে সমকামিতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, অস্বাভাবিক যৌনতা, অভিজিৎ রায় হত্যা, ব্লগার হত্যা, বাউল এবং মাজার, মাদক ব্যবসা, সৌদি প্রবাসী গৃহকর্মীদের উপর নির্যাতন ইত্যাদি নানা বিষয় এবং সে সকল ঘটনার ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়েছেন নানান চরিত্রের মাধ্যমে।
এত এত বিষয় ছোট একটা উপন্যাসে তুলে ধরতে গিয়ে মাঝে মাঝে গল্পটা আরোপিত মনে হয়েছে। সব কিছুর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কখোনো মনে হয়েছে প্রবন্ধ পড়ছি। সব ইস্যুকে একসাথে আনতেই যদি হত তাহলে দৃশ্যপটগুলো আরেকটু বিশদ করার দরকার ছিল মনে হয়। তাড়াহুরো করে সকল অসংগতি আনতে গিয়ে কেমন একটা অস্বস্তি তৈরি হয়। এসব বিষয় পাশে সরিয়ে রাখলে গল্পটা নতুন প্রজন্মের চিন্তার জায়গায় অবশ্যই বড়সর কম্পন তৈরি করবে।
বছরের প্রথম বই, যেন বিরিয়ানির প্রথম লোকমায় এলাচি... এই বইতে একটা ব্যাপার ছাড়া (সুরুজের মায়ের পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্পে থেকে ফিরে আসার পর বিকৃত যৌন চাহিদার সৃষ্টি) এমন কিছু পাইনাই যার মধ্যে কোন অভিনবত্ব ছিলো। অভিনব কিছু বলাই যে লেখকের একমাত্র কাজ তা বলছি না, অনেক বড়মাপের লেখককে দেখেছি একেবারে চেনা গল্পই এমন করে বলেছেন যে পড়তে ভালো লেগেছে। "তিমিরযাত্রা"র কাহিনী প্রচন্ড রকমের দূর্বল - মুক্তিযুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর একটা বিষয় নিয়ে এরকম দূর্বল স্টোরি লাইনের উপন্যাস না লিখলেও চলত। উ���ন্যাসটি অসংখ্য লুপ হোলে ভরা (সুরুজ কিভাবে হঠাৎ করে কিশোর বয়সে গ্রাম থেকে কানাডা চলে গেল, গাজীউলের হঠাৎ এন্ট্রি আবার হঠাৎ প্রস্থান, আরও আছে)। চরিত্রগুলোর কথোপকখন শুনে এতো বানানো, এতো মেকি লেগেছে! "তিনি বলেন, আমি বললাম, তারা বলল" - এভাবে উপন্যাস কে লেখে??
মোজাফফর হোসেনের বেস্ট কাজ হয় এখন পর্যন্ত "মানুষের মাংসের রেস্তোরা"- ওইটা আমি সবার প্রথমেই পড়ে ফেলেছি। এরপর "অতীত একটা ভীনদেশ" এ তাও যা প্রত্যাশা বজায় ছিলো, এই বইতে খুবই হতাশ হলাম।
This entire review has been hidden because of spoilers.
'তিমিরযাত্রা', উপন্যাস রিভিউ ও ফেসবুক পোস্টের নির্বাচিত অংশ। *** ...তিমিরযাত্রা পড়তে পড়তে রাগে গলা শুকিয়ে আসছিল, মুখের মধ্যে একধরনের তেঁতোভাব। একশ ১৪৫ পাতার উপন্যাসটি পড়তে পড়তে কয়েকবার নামিয়ে রাখতে হয়ছে। উপন্যাসটির লেখক মোজাফ্ফর হোসেন মনে হলো আমাদের সাহিত্যজগতে একটা গ্রেনেড ছুঁড়ে মারলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সমাজব্যবস্থার সবগুলো কালো অধ্যায়ে সার্চলাইটের আলো ফেলেছেন। --রিটন খান *** এ কথা মানতে হবে কিছু কিছু গ্রন্থ সময়ের থেকে এগিয়ে থাকে। এই এগিয়ে থাকার কারণে অনেক সময় পাঠক এবং সমকালীন সমাজকে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, আবার কখনো কখনো হোঁচটও খেতে হয়। আগেই বলেছি, আমরা ইতিহাস ভুলে যাওয়া জাতি। ...নৈতিকতা, আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এসব নিয়ে ভাবার আমাদের সময় কই? দেখতে পাই ফ্রয়েডের স্যাডিজম এবং ম্যাসোসিজম-এর ব্যবহারও উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে। কথা হল বর্তমান সময়ের পাঠক উপন্যাসটির এই ফ্রয়ডীয় তত্ত্বগুলোকে কতটুকু হজম করতে পারবেন, সেটিও এই উপন্যাসের বড় চ্যালেঞ্জ।...উপন্যাসটিকে আমরা আমাদের অবক্ষয়ের দলিল হিসেবেও ভাবতে পারি। অবক্ষয়েরও একটা ইতিহাস থাকে! কানাডা থেকে সুরুজ এসেছিলেন তার আত্মপরিচয়ের খোঁজে অথচ মনে হয় এই আত্মপরিচয়ের খোঁজে নেমেছে বাংলাদেশ নিজেই। সুরুজ এখানে একটি উপলক্ষ্য মাত্র! --আদনান সৈয়দ **** মোজাফফর ঘটনাকে এমনভাবে বাঁকবদল করেন যে মানসিকভাবে আদৌ প্রস্তুতি থাকে না পাঠকের। মন্ত্রমুগ্ধের মতো কেবল ঘটনার সাথে নিজেকে টেনে নিয়ে যায়। বাবার কথা না বলার কারণকে জানতে গিয়ে সুরুজ বাবাকে নিয়ে চলে আসলো গ্রামে। মায়ের কিছুটা অমতেই। মায়ের কেন অমত ছিলো এটাই হয়তো পুরো উপন্যাসের সোনার কাঠি রুপোর কাঠি। --সুমী সিকান্দার *** উপন্যাসের কথক সুরুজ, তার বীরাঙ্গনা মা ও জন্মদাতা নয় এমন পিতাকে কেন্দ্র করে যে আখ্যান রচিত হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে লেখক যেমন তুলে ধরেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা, কতো কতো সংগ্রাম-ত্যাগ-রক্ত-সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা; তেমনি তুলে ধরেছেন যুদ্ধের পরেও যে যুদ্ধ থাকে তার ব্যর্থতা। উপন্যাসে লেখক খুঁজেছেন সামগ্রিক নয়, ব্যক্তির ইতিহাস। --হাবীবুল্লাহ রাসেল *** "তিমিরযাত্রা" পাঠ শেষ করলাম। অনেকদিন পর একটি ভালো উপন্যাস পড়লাম যা মাত্র ১৪২পৃষ্ঠার মাঝে বেশ কিছু মৌলিক বক্তব্য রেখেছে ও পাঠককে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে জীবনের সাথে জড়িত অনেক বিষয় নিয়ে। আমার কখনো মনে হয়েছে আমি দর্শন পড়ছি। অস্তিত্ববাদের ধারণার অস্তিত্ব পুরো উপন্যাস জুড়ে বিদ্যমান। শিকড়ের সন্ধান লাভে মূল চরিত্র সুরুজের অনড় অবস্থান আমাকে ইডিপাসের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। সত্য সবসময় স্বস্তি দেয় না। তবুও মানুষ সত্যিটা জানতে চায়। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সুরুজ নিজেও তার ব্যতিক্রম নয়। --জুলফিকার পারভেজ *** "Read it (তিমিরযাত্রা). A dystopian novel A mother in her tortured sadistic life would never want to die again because she died long time ago; and the father does not know his true existence and prefer darkness. .. and so on. Poor son surj, how old he is? Mixture of realism, existentialism, surrealism, supernaturalism and magic realism. Keep up the dystopianism Mojaffor Hossain." --Saleha Chowdhury *** আজকে পড়লাম তিমির যাত্রা উপন্যাসটি। কোন রকম বিরতি ছাড়া ৪.৩০ঘন্টায় বইটি পড়ে শেষ করলাম। আমি বিরতি নিতে চাইলেও লেখক ও কাহিনি আমাকে আটকিয়ে রাখছে শেষ পর্যন্ত। আমাকে আলিমেয়েলির মতো থার্ড জেন্ডার চরিত্র টি মুগ্ধ করেছে। বিরতি বলতে মাঝে মাঝে বইটিকে আমার বুকের সাথে চেপে ধরেছি আর ভেবেছি স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস টা কেমন ছিল। এখানে একটি পরিবারের বা একটি গ্রামের কথা বলেছেন। কিন্তু আমার মনে হয় সামগ্রিক চিত্রটা সামনে নিয়ে এসেছেন। যদিও শুরুতে একটা আডাল্টভাষা নিয়ে ভয় ছিল। পরবর্তীতে সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। আমরা যারা সাধারণ তারা প্রচলিত ইতিহাস টাকে জানি কিন্তু ভিতরের গল্পটা আরও বর্বর ও আরও কষ্টের।আমার ব্যক্তিগত অভিমত বইটি পড়লে একটা নতুন ইতিহাসের পাঠ নিতে পারবে সবাই। --মো. সাজ্জাদ হোসেন *** ‘তিমিরযাত্রা’ উপন্যাসটি এইমাত্র শেষ করলাম। বিস্ময় কাটছে না, ঘোর কাটছে না, স্তব্ধতা কাটছে না। এরকম পরিস্থিতিতে কিছু লেখা যায় না। কিছু অনুভূতির বিশ্লেষণ হয় না। এই উপন্যাস সেরকমই। মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক অভিঘাত এই উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য। --এমরান কবির *** সুরুজের এই উপলব্ধির ভাঙচুরটাই মূলত উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয়। সুরুজের আবিষ্কারগুলো পাঠককে নিঃসন্দেহে ভাবায়। একবার আবিষ্কার করছে সে মুক্তিযোদ্ধা পিতার সন্তান। আরেকবার সে আবিষ্কার করছে সে একজন বীরাঙ্গনার সন্তান এবং সাথে সাথে এটাও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বীর মুক্তিযোদ্ধা পিতা তার জৈবিক পিতা নন। অন্যদিকে একটা সম্ভাবনাও উঁকি দেয় যে, সে রাজাকারের সন্তান! --আখতার মাহমুদ *** উত্তরাধুনিক প্যাটার্নে ‘তিমিরযাত্রা’ আখ্যানের শুরুতেই লেখক পাঠকদের সাথে কিছু বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করাটাকে যুতসই মনে করেছেন। যেমন আখ্যানের ন্যারেটর বাংলাদেশি কানাডা-প্রবাসী একজন ডায়াসপোরা লেখক। তার কোনও অতীত নেই, বাবা আছেন তিনি একটি অন্ধকার ঘরে একা বসে থাকেন, কারো সঙ্গে কথা বলেন না। আর আছেন মা, শৈশবে যার বিকৃত যৌন-আচরণ দেখে কথকের মনে নারীশরীরের প্রতি জন্ম দিয়েছে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঘৃণা। --কবির মুকুল প্রদীপ *** উপন্যাসটা সুরুজের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের এক চমৎকার বয়ান। লেখার চরিত্রের জন্য তথ্য খুঁজতে গিয়ে নিজেই দাঁড়িয়ে যায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত অতীতের মুখোমুখি! যে গল্পের আসলে কোনো ব্যাখ্যা নেই, যে ব্যথার কোনো উপশম নেই, কেবল সয়ে যেতে হয়। এই উপন্যাসে অতীত সেই নগ্নশরীর, যা দেখার পর প্রিয় নারীকেও আর ভালোবাসা যায় না! --আরিয়াণ অপূর্ব দাস *** ভিন্ন বয়ানে মুক্তিযুদ্ধ ও তৎপরবর্তী সমাজের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক অবক্ষয় ও যাপিত বাস্তব জীবনকে নির্মেদ গদ্য, জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা ও নির্মাণ-শৈলির অনন্যতায় কথাশিল্পী মোজাফ্ফর হোসেন ধরতে চেষ্টা করেছেন তাঁর প্রথম উপন্যাস 'তিমিরযাত্রা'য়(২০২০)। --সিদ্ধার্থ অভিজিৎ
'তিমিরযাত্রা' হলো একটা জার্নি, আক্ষরিক অর্থেও, ভাবগত অর্থেও। অন্ধকারের উদ্দেশ্যে যাত্রা। একটি অন্ধকার সময়ে যাত্রা। অতীতকে বিস্মৃত অন্ধকার থেকে হাতরে খুঁজে বের করার যাত্রা। যে অতীত একদিন ঠাঁই দিতে চায়নি তার বুকে, সেই অতীতকেই অনেকগুলো বছর পর আলো জ্বেলে খুঁজতে আসে এক প্রবাসী যুবক। পিতা হারিয়েছেন স্মৃতি, পরিচয়। জীবনটা অন্ধকারে খুঁটি গেড়ে কাটিয়ে দিয়েছেন। বোবা হয়ে থেকেছেন এতগুলো সময়, একটা সময় আশ্চর্য হয়েছেন শুনে যে তিনি বেঁচেই আছেন। স্মৃতিকে মানুষ বাঁচিয���ে রাখেনা, স্মৃতিই বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে। তাই-ই যখন হারিয়ে গেলো, এ জীবন নাকি মৃত্যু, স্বন্ধ্যা নাকি বিকেল, আলো নাকি অন্ধকার এ ভেবে ভ্রম কি হতেই পারেনা? সেসব অন্ধকার অতীত যেনো তেড়েফুঁড়ে ছুঁতে না পারে সেজন্যই কি ছেলেবেলায় যুবককে দূর দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল? নাকি ছেলেবেলায় বারবার মা-কে ঘুলঘুলি দিয়ে অন্য পুরুষের সাথে অস্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্কে নগ্নাবস্থায় দেখে ট্রমাটাইজড হয়ে যাওয়ায়? বাবার ই কি হয়েছিল? মা কেনো জানাতে চান নি কখনো কিছু? কেনো বাবা নগ্ন হয়ে বসে থাকতেন একা অন্ধকার ঘরে? সেসব উত্তর এবার খুঁজবে বলেই যুবক সংকল্প করে, তাহলে তিমিরেই নাহয় যাত্রা করা যাক?
স্প্যানিশ ওই প্রবাদটার মতো হেসে ওঠেন ঈশ্বর। ওইযে প্রবাদটা, ঈশ্বরকে যদি হাসাতে চাও তাহলে তাকে বলো যে তোমার কিছু পরিকল্পনা আছে!
ব্যক্তি ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে একটি রাষ্ট্রের অস্বস্তিকর ইতিহাস। পিতা-পুত্রের বয়সের পাটিগণিতটা বদলে যায় পিতা পুত্রের রসায়নে। সে ইতিহাসে বাংলাদেশ নামে একটি দেশ আসলে কখনো স্বাধীন হয়েছিলো কিনা তা স্বগর্বে প্রশ্ন করতে পারে একজন যুদ্ধাপরাধী। যাদের জন্য দেশটা স্বাধীন করেছিলো একসময় মুক্তিকামী মানুষেরা, তারাই হয়ে ওঠে ক্যানিবাল। এ এক যুদ্ধ পরবর্তী অসহিষ্ণু, অস্বাভাবিক, অতি সত্য গল্প। এ গল্পটা লিখতে হলে, গল্পটাকেই আগে ভুলতে হবে।
লেখক মোজাফফর হোসেন আমাকে চমকে দিয়েছেন। আমি যে আশায় বইটি পড়তে বসেছিলাম, সে আশায় বইটি শেষ করতে পারিনি। একটা খচখচানি ভাব বুকের ভেতরে সেধিয়ে রয়েছে। যুদ্ধপরবর্তী যে অসহ্য দেশটা আমরা পেলাম, যে অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্থাপন আমরা করলাম, যে অতীত যুবকটি পেলো সেটির প্রেজেন্টেশন হয়েছে অত্যন্ত গভীর ও বুদ্ধিদীপ্ত দার্শনিক কথোপকথনের মাধ্যমে। লেখকের প্রতি সে কারণে আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেছে শতগুণ। শুধু সামাজিক সমস্যার অতি পোর্ট্রেতে সামান্যই খেদ রয়ে যায়। তবুও এই অস্বস্তিকর অনুভূতির জন্য এই বইটিকে বছরের অন্যতম সেরা পঠিত বইগুলোর মাঝে স্থান দিয়েছি আমি।
যে জন্মের জন্ম অন্ধকারে, যে সময়ের সৃষ্টি অন্ধকারে, যে কলুষ কাদাই অতি আপন, সর্বদাই ছিল। বৃথাই সেই অন্ধকার কে আলো জ্বেলে বিলিন করতে ছুটে যাই আমরা। যেমনটা একপাল কুকুর ছুটে যায় কোনো মোটরগাড়িকে তাড়া করে। অতঃপর অনতিদূর ছুটে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে, বুঝতে পারে এ ছুটে যাওয়া অর্থহীন। পরাজিত নেত্রে বলে উঠে, ঘেউ!
বইটা শুরুর লাইন থেকে শেষ লাইন, পুরোটাই ডিপ্রেসিং। তবে খারাপভাবে না। বইটা একজন মানুষের যে নিজ গ্রামে ফিরে যায় তার আত্মপরিচয় জানতে, কারণ তার বাবা-মা তাকে নিজেদের ব্যাপারে কখনো কিছুই বলেনি। আমাদের গল্পের নায়ক স্মৃতি হাতরে বেড়িয়ে তার আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়া বাবাকে নিয়ে চলে যায় তাদের গ্রামে। সেখানে কি খুজে পাবে সে? কেনই বা তার মা তাকে বারবার সাবধান করছিল গ্রামে না ফেরত যেতে? শেষতক কি নিজের শেকড় খুজে পায় আমাদের নায়ক? গল্পের পুরো মহলে একটা স্তব্ধতা রয়েছে। একটানা পড়ে গেছি, ঘোর সৃষ্টি হয়েছে। বইটাতে মুক্তিযুদ্ধের আলাপ আছে, তবে আরো বেশি আছে যুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধের কথা। আমাদের ব্যর্থ সমাজের কথা। স্বাধীনতা পাওয়ার পরের না জানা গল্প এবং অভিযোগের কথা। একজন রাজাকারের একবার হেরে গিয়ে বারেবারে জিতে যাওয়ার কথা, ও স্বাধীনতা চাওয়া মানুষদের একবার জিতে গিয়ে প্রতিদিন ধুকে মরার কথা। যে গল্পে এসব এলিমেন্ট আছে সে গল্পের লেখনশৈলীকেও একইরকম হতে হয়। এখানে হয়েছে। বইটা অসাধারণ, নামের মত আক্ষরিক অর্থেই অন্ধকারের যাত্রা এটা।
মোজাফ্ফর হোসেন এ সময়ের জনপ্রিয় ও আলোচিত একজন লেখক। অসাধারণ তার লেখনশৈলী, প্রাঞ্জল ভাষা ও ভাবনার গভীরতা। তিমিরযাত্রা তার প্রথম উপন্যাস যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে রচিত।
১৪২ পৃষ্ঠার ছোট্ট একটি উপন্যাস তিমিরযাত্রা কিন্তু তার পটভূমি, চরিত্র, ঘটনার শিকড় অনেক গভীর।
উপন্যাসের মূল চরিত্রে মানসিক ভারসাম্যহীন মুসলিম বাবা শফিক, বীরাঙ্গনা হিন্দু মা গীতা ও তাদের একমাত্র ছেলে সুরুজ।
সুরুজ কানাডা থেকে দেশে এসে আবিস্কার করেন তার বাবা মানসিক ভারসাম্যহীন, মাও মানসিকভাবে অসুস্থ। ডাক্তারের পরামর্শে বাবাকে নিয়ে নিজ গ্রামে যান মেহেরপুরে। গ্রামের বিভিন্ন মানুষের বয়ানে জানতে পারেন ভারসাম্যহীন বাবা,মা ও নিজের অজানা অনেক কথা, অনেক গল্প। সামনে আসে একের পর এক অজানা অতীত, সেই অতীতের আয়নায় ধরা পড়ে - মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মের নামে ভণ্ডামি, নৈতিক অবক্ষয়, সংখ্যালঘু, রাজাকারদের নির্যাতন, ব্যক্তিগত হতাশা ও পাওয়া না পাওয়ার চিত্র।
নির্মেদ গদ্য, অকপট ভাষা,সাহিত্যের রস ও রহস্যময় উপস্থাপনের কারনে পুরোটা উপন্যাস ছিল উপভোগ্য।
নিঃসন্দেহে, তিমিরযাত্রা বাংলাসাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি।
ভালোবাসা নিবেন লেখক এরকম ব্যতিক্রমধর্মী একটি শিল্পকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য।
একজন মুক্তিযোদ্ধার তার জন্মস্থলে যাওয়া এবং যুদ্ধশিশুর বিষণ্ণতা ও অতীতের ইতিহাস আবিষ্কারের গল্প। চিরচেনা প্লট, প্রথমে স্লো হলেও শেষে গতি পায়। ইসলামের নামে গ্রামবাংলার কুসংস্কারগুলো কিছুটা হলেও অতিরঞ্জিত। তবে যুদ্ধকালীন নিষ্ঠুরতা বেশ বাস্তব। মন্দ না। আবার মাস্টারপিসও নয়। তবে বর্তমান দুর্নীতিগ্রস্ত ও শয়তানের দেশের কথা বারবার মনে করিয়ে দিল।
এবছর আমি যেসকল বই পড়েছি তার বেশিরভাগ ই ছিলো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক।আর "তিমিরযাত্রা" আমার এ বছরের পড়া সবথেকে সেরা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই।
লেখকের বহুল আলোচিত বই "মানুষের মাংসের রেস্তোরা" সংগ্রহে থাকার পরেও কেন যে পড়িনি তা আমি জানি না।তিমিরযাত্রা বইটার সন্ধ্যান লাই বুক্সটাগ্রামের কল্যাণে।সেদিন বাতিঘরে বসেই পুরো বইটা শেষ করেছি।
"তিমিরযাত্রা" মুক্তিযুদ্ধের উপর ভিত্তি করে এক অসাধারণ প্লট নিয়ে লেখা হয়েছে।যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যোদ্ধাদের ততকালীন অবস্থা নিয়ে লেখা।পাকিস্তানিদের অত্যাচারের কথা মোটামুটি সবাই ই জানি তাদের অত্যাচারের মধ্যে অন্যতম ছিলো মেয়েদের তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যেয়ে অমানুষিক আচরণ করা।সেই মেয়েদের মধ্যে যারা ফিরে আসতে পেরেছে যুদ্ধ শেষে পরিবার পরিজন তাদের ত্যাগ করেছে ফলে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে অনেকে দেশ ছেড়েছে সমাজে নানাভাবে পতিত হয়েছে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। তখন যেই শিশুদের জন্ম হয়েছিলো যাদের যুদ্ধশিশু বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাদের পরিচয়ের জন্য তারা লাঞ্চিত হয়েছে অথবা কেউ মিথ্যা পরিচয়ের ছায়ায় থেকেছে। একজন যোদ্ধা জানেনা সে যুদ্ধে কেন গেছে।
তিমিরযাত্রা বইটা নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বইগুলোর একটা।লেখাটা শেষ করে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম প্রায় পনেরো-বিশ মিনিট।মনে শুধু প্রশ্ন জাগ্রত হয়েছিলো, এমন এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম যা শব্ধ দিয়ে ব্যক্ত করা সম্ভব নাহ।