চার-চারবার এইচএসসি পাশ করার ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে হাল ছেড়ে দিলো হান্নান। বর্তমানে সে একটি বহুজাতিক কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার, কারণ তার মামা সেই কোম্পানির কান্ট্রি হেড। অফিসের লোকজনের কাছে অবশ্য সে "মাস্টার্স ফ্রম ম্যানচেস্টার।"
হান্নানের ওঠাবসা সমাজের উঁচুশ্রেণীর ফাতরা ছেলেপিলের সাথে। সেই ফাতরা ছেলেপিলেদের একজনের নাম পঞ্চম।
পঞ্চম একদিন জানালো, গাজীপুর শালবন থেকে দুই কিলোমিটার দূরে একটা জায়গা আছে। সেখানে এমন এক বস্তু পাওয়া যায়, যা খেলে তুখোড় 'পিনিকের' সন্ধান মেলে। হান্নান দেরি না করে সেখানে চলে গেলো। তারপর ভীষণ ঝড়ের কবলে পড়ে ফিরে এলো পঞ্চমের লাশের কাটা মাথা সাথে নিয়ে।
ফেরার পর দেখা গেলো হান্নানের মামার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। হঠাৎ করেই বললেন, "তুই যদি কখনও বোতলে পরী আটকাতে পারিস, তবেই এই বিপদ থেকে মুক্তি পাবি। নাহলে সামনে ঘোর বিপদ।" এদিকে পঞ্চমের কাটা মাথা কথা বলতে শুরু করল। ভীষণ মেজাজ গরম ওর। তবে গালিগালাজ করেও সঠিক বুদ্ধি বাতলে দেয় বারবার।
নিরুপায় হান্নান উপায় খুঁজতে মাঝরাতে রাস্তায় নামল। সাথে পঞ্চমের কাটা মাথা, পেছনে পুলিশ এবং বারোটি হিংস্র কুকুর। শেষপর্যন্ত খোঁজ মিলল মগবাজারের এক সস্তা হোটেলের। সেখানে কবিগুরুর মতো চেহারার শামীম উদিন কাঁধে দুটো কাক নিয়ে ঘরে ঢুকে বললেন, "চমৎকার, ধরা যাক দু-একটা পরী এবার।"
পুরো পৃথিবী জুড়ে নেমে এসেছে চিরস্থায়ী সন্ধ্যা। পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে ভয়ঙ্কর এক শত্রু। হান্নান কি পারবে ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্রকে রুখে দিয়ে পৃথিবীকে রক্ষা করতে?
মাত্র পড়ে শেষ করলাম বইটা। মাথা এখনও বনবন করে ঘুরছে (in the best sense). একটু চেষ্টা করে দেখি চিন্তাগুলো গোছানো যায় কিনা:
যা ভালো লেগেছে
এই বই পড়ার প্রথম আর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে লেখার ধরন। ঠিক কী স্টাইলের লেখা তা বোঝানো কঠিন, এমন কিছু আমি আগে পড়েছি কিনা মনে পড়ে না। প্রচণ্ড বেগে একটার পর একটা ঘটনা ঘটতে থাকে, যেগুলোর প্রায় সবই অসম্ভব। একজনের পর একজন চরিত্র আসতে থাকে, যারা সবাই সত্যি বলতে উন্মাদ। ক্রমাগত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায় ঘটনা, যে জায়গাগুলো বাস্তব না স্বপ্ন (নাকি দুঃস্বপ্ন) তা এক দেখায় বোঝা যায় না।
এই কল্পনার ঘূর্ণিঝড় হয়তো কাঁচা লেখকের হাতে বেসামাল হয়ে উঠতো, পাগলা ঘোড়ার মতো এদিক-ওদিক ছুটে যেতো, কিন্তু রাফির হাত একবারও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে বলে মনে হয়নি। আর লেখকের প্রসঙ্গ যেহেতু এলোই, এটা নিয়ে একটু কথা বলা যাক।
প্রত্যেকটা গল্প, প্রত্যেকটা উপন্যাস হচ্ছে একেকটা মহাবিশ্ব। আমাদের মহাবিশ্ব যেমন ফিজিক্সের নিয়মে চলে, তেমন গল্প-উপন্যাসের মহাবিশ্বগুলোরও নিজস্ব নিয়ম থাকে। কেউ আমাদের জগতের নিয়মগুলো ধার করেন। কেউ নিজস্ব নিয়ম সৃষ্টি করেন। ‘হান্নান’-এর ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টা ঘটেছে। আমি খাঁটি রিয়েলিজম জিনিসটা অত্যন্ত অপছন্দ করি, তাই লেখক বা লেখিকার তৈরি করা মহাবিশ্বে সময় কাটাতে ভালো লাগে। যার কল্পনা যতো অদ্ভুত, যতো সমৃদ্ধ, তার জগতে সময় কাটানো ততো মজার। বাস্তবে যে দু’টো জিনিস কখনও একসাথে দেখা যায় না, ভালো লেখকেরা তাদের জগতে সহজেই সেগুলোর সুন্দর মিল দেখাতে পারেন।
রাফির মাথার ভেতর যে জগতটা আছে সেটা নিঃসন্দেহে অদ্ভুত, আর সমৃদ্ধ। পৃথিবীর আর কোন বইতে গুপি গাইন আর মিড একসাথে দেখা যাবে? ফেসবুকের ফেইক আইডি আর কবিগুরুর গীতাঞ্জলি? থরের হাতুড়ি আর দোস্তো চৌধুরী?
তবে এতো ভারি ভারি কথা বলতে যেয়ে একটা জরুরি বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছি। বইটা প্রচণ্ড মজার। আমি বই পড়তে পড়তে সাধারণত জোরে হাসি না (কারণ আমি একজন বিরক্ত বোকাচোদা টাইপের মানুষ) কিন্তু এটা পড়তে যেয়ে যে কতোবার হেসেছি তার হিসেব নেই। ‘...তা দেখার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না’, ‘নেশাখোর মাত্রই অমানুষ’-এর মতো পরিচিত লাইনকে নতুন কনটেক্সটে নিয়ে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যে না হেসে উপায় ছিলো না।
যা ভালো লাগেনি
বইয়ের এক জায়গায় কয়েকজন ওয়াই করে ব্যুফে খেতে চায়। বাস্তবে তা অসম্ভব।
বিঃদ্রঃ রমজান মাসে এই বই পড়লে ইফতার আর সেহরির মাঝামাঝি সময়ে পড়াই ভালো।
যা বুঝলাম, আমি হচ্ছি এই হান্নানের মতই কাঠবলদ, গাছবলদ অথবা ভোদাই। গুডরিডস এ রেটিং আর রিভিউ দেখে অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা না করে ট্যাকের পয়সা নষ্ট করে বই কিনে ফেললাম। পড়তে গিয়ে দেখি রেটিংকারিরা লেখকের ভাই ব্রাদার গোত্রীয় লোক, এমনকি অনেকে আবার বইয়ে ক্যামিও ও দিয়েছেন! থাক, তাতে অন্তত এই রেটিং রহস্যের সমাধান হল।
প্লটের ৮০% নর্স মিথলজির তর্জমা (যেটা আবার লেখক নিজেই আগে প্রকাশ করেছেন, মানে এই বইয়ের জন্য আলাদা করে কোন কষ্ট করা লাগে নাই!)। আর এর সাথে কিছু আষাঢ়ে গল্প যোগ করে আর "হিউমার" হিসাবে বিভিন্ন বাংলা মিম আর ট্রোপ দিয়ে যেই অখাদ্য তৈরি হয়েছে, সেগুলো ফেসবুকে ছোট খাট স্ট্যাটাস হিসাবে ঠিক আছে। দেখলাম, হাসলাম, বা বিরক্ত হলাম, স্ক্রল করে চলে গেলাম। এগুলো বই হয়ে ছাপা মানে কাগজের অপচয়, বুকশেলফ এর জায়গায় অপচয়। এরপর থেকে গুডরিডস এ নতুন বইয়ের রেটিং দেখে কেনার আগে দশবার ভাববো।
ওররররররররে! পুরাই উরাধুরা একটা বই পড়লাম বলতে হয়। বইয়ের নামটা যেমন, বইটাও পুরাই কমিক স্টাইলে লেখা।
হান্নান, মানে যে বইয়ের মেইন কারেক্টার সে চারবার এইচএসসি ফেল করেও একটা কোম্পানির এক্সিকিউটিভ, কারণ ওর মামা কোম্পানির কান্ট্রি হেড। তারপর একদিন হান্নান আর তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু পঞ্চম পিনিক(পিকনিক না কিন্তু, আপনি ঠিকই পড়েছেন) করতে এক জায়গায় যায়, পিনিকের বদলে হান্নানকে ফিরতে হয় পঞ্চমের কাটা মাথা নিয়ে!
পুরো বই জুড়ে ছিল অনেক বাংলা সিনেমা, নাটক, গান, কবিতার রেফারেন্স। জীবনানন্দের কবিতা দেখে খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। আর সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিল রিক আর মর্টির রেফারেন্স দেখে।কারণ এটা আমার প্রিয় সিরিজের মধ্যে একটা।
নর্স মিথোলজির কথা আলাদা করে আর কি বলবো, বইটা পড়লেই বুঝবেন বই জুড়েই নর্স মিথে ভরপুর ছিল।
বাংলা সিনেমার গান আর ডিপজলের 'পুত কইরা দিবো' দেখে এতো হাসি পেয়েছিল, তাও এটা নাকি দুইবোনের ঘুম পাড়ানির গান ছিল! :v
ওয়াসি ভাইয়ের লেখা খুবই চমৎকার। বইটা পড়ার সময় কোথায় বোর হওয়ার কোন চান্স নাই, উল্টো আপনার পেট ফেটে হাসি আসবে। কুকুরদের নিয়ে একটা মন্তব্য খুবই ভালো লেগেছে।
"এই শহরটা যে আসলে কুত্তারাই চালায়, সেই কথা কি আর খুইলা কওনের উপায় আছে?"
না আপনি চিন্তা করেন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কে বাঁচাতে পারে দুইজন মানুষ যাদের নামের অদ্যাক্ষর 'হ' আর 'প' দিয়ে শুরু। একজন হল হ্যারি পটার, যার নির্দেশিকা চিহ্ন কপালে। আরেকজন হলো আমাদের হান্নান পাটোয়ারি, যার নির্দেশিকা ডিরেক্ট পাছায়! (দুঃখিত, এই বইয়ের রিভিউ যদি আপনি শুদ্ধ সুন্দর ভাষায় দেখতে চান, সেটা আমার দ্বারা সম্ভব হচ্ছেনা!) বলেন, এরকম একটা বই আপনি পড়ে না হাসলে কেমনে?
মানে পুরা উদ্ভট, উড়াধুড়া, আজব, হযবরল, ভজগট একটা বই পড়লাম। এরকম বইতো আগে পড়িনি। পুরোটা সময় আমি খ্যাক খ্যাক করে দুলে দুলে, গড়াগড়ি দিয়ে হাসছিলাম নয়তো লাফ দিয়ে উঠে যাচ্ছিলাম হোহো করে হেসে। আমি সাধারণত বইতে মজার কোনো লাইন পেলে মার্ক করে রাখি, এই বইতে সেটা করতে গিয়ে বুঝলাম এত দাগাদাগি করলে বই আর পড়ার মতো থাকবেনা। বই শুরুর আগেই এক সতর্কতায় লেখক বলে দিয়েছেন এই বই সিরিয়াসলি অসামাজিক, প্রাপ্তবয়স্ক উপন্যাস। আমি এতটুকু শিওর এই বই লিখতে গিয়ে লেখক ওয়াসি আহমেদ রাফি ভাই নিজেই গা দুলিয়ে হাসতেসিলেন। যদি তা না হয়ে থাকে এই লোক থেকে সাবধান থাকবেন, বড় ডেঞ্জারাস লোক! :v
মূল চরিত্র হান্নান পাটোয়ারি পুরোপুরি গবেট কিসিমের প্রাণী (গবেষণায় প্রমাণিত) এবং এই কারণেই সে নায়ক। সে চারবার এইচএসসি ফেল ছাত্র, কিন্তু মামার দোয়ায় এক কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার হয়ে বসে আছে। গল্প শুরু হয় তার ফাতরা বন্ধু পঞ্চমের সাথে পিনিক (!) করতে যেয়ে। এরপর ঘটনাক্রমে পঞ্চমের মাথা কাটা পড়ে, আর সেই কাটা মাথা নিয়ে হান্নান বগুড়ার বাসে উঠে জতুনহাইম থেকে শুরু করে হেলহাইম হয়ে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভ্রমণে রওনা দেয়। সাথে থাকে সর্বপিতা শামীম উদিন (Odin!), লুঙ্গি মালকোচা মারা শাহ সিমেন্টের বস্তা হাতে আসা গোলাম থরোয়ার (Thor!) আরও গুপি-বাঘা থেকে শুরু করে সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী সানচেজ সাহেব! ;)
বইটার আসল মজা হলো এর প্রচুর রেফারেন্স আর ইস্টার এগ গুলো। প্রায় প্রতি লাইনেই কোনো না কোনো হিন্ট আছে। আপনি যদি পপ কালচার, বাংলা সিনেমা, সাহিত্য, মিথলজি, সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড ইত্যাদি ব্যাপারে চোখ-কান খোলা মানুষ হয়ে থাকেন, তাহলেই আপনি এই বইটার সম্পূর্ণ মজাটা পাবেন। আর এই বইতা মূলত নর্স মিথলজিকে কেন্দ্র করে। সেজন্য মিথলজি সম্পর্কে যদি আপনার ভালোলাগা থেকে থাকে তাহলে তো কথাই নেই। (তবে আমি এটাও নিশ্চিত এটার পর আপনি আর কোনদিন স্বাভাবিক ভাবে নর্স মিথলজি পরতে পারবেন না। :v) পুরো সব চরিত্রকে উনি বাংলাদেশী ছাঁচে ফেলে নিজের মতো বানিয়ে নিয়েছেন। এবং এইটাই ছিলো সবচেয়ে ডেঞ্জারাস ব্যাপার। আর মাঝখানে মাঝখানে এতো পরিচিত ক্যারেক্টারের ক্যামিও করেছেন, পড়তে কি যে মজা লাগছিলো। আমি তো জৌশিক কামান ভাইয়ের কাচ্চিদানোর কথা অনেকদিন মনে রাখবো। তমাদের কি উনি ভুলতে দিবেন?!
আর এইখানে তো ম্যাজিক রিয়েলিজম, মিথলজি, কোয়ান্টাম ফিজিক্স, শোডিঞ্জারের তত্ত্ব, মাল্টিপল টাইমলাইন, এন্টিমেটার, ব্ল্যাকহোল সব মিলে মিশে খিচুড়ি পাকিয়ে একটা সেই ভজগট অবস্থা। সব কিছু একসাথে মিশিয়ে আবার সুন্দরভাবে এক্সিকিউশন যেভাবে করলেন লেখক, হ্যাটস অফ! বই শেষে তিনি আবার আলাদা করে মিথলজির চরিত্র, ঘটনা টীকা আকারে ব্যক্ত করেছেন। ওহ আর বলতেই হয়, রেহনূমা প্রসূনের এই কালারফুল প্রচ্ছদটা বেস্ট!!
তবে একটু জানাশোনা না থাকলে আমার মনে হয় সবাই এঞ্জয় করলেও সব ইঙ্গিত ধরতে পারবে না। আর এত সুক্ষ সুক্ষ টিপ্পনি মেরেছেন লেখক, এগুলো ধরতে না পারলে মজা কোথায়? আমি মোটামুটি শিওর আমি সব ধরতে পেরেছি। এইজন্যই আরও বেশি ভালোলাগা কাজ করছে। এটা লেখক বলেছেন ট্রিলজি হবে। একটা বইয়ের নাম হবে সম্ভবতঃ 'চমৎকার ধরা যাক দু একটা ইঁদুর এবার' এবং পরের বইতে কাওরান বাজারের মাছ বিক্রেতা 'পোসাইডন'(!) যুক্ত থাকার সমূহ সম্ভাবনা আছে। এবং আমি তাই ধরেি নিচ্ছি এবার গ্রিক মিথলজি নিয়েও মাতামাতি হতে যাচ্ছে! বইটার জনরা কি আমার জানা নাই, লেখক বলেছেন এটাকে অসামাজিক, নেশাবাস্তব, কালচে রসাত্মক থ্রিলার উপন্যাস বলা যেতে পারে! একটূ কম দিতাম, তবে পুরো পাঁচতারাই দিচ্ছি কারণ এরকম বই একেবারেই বিরল প্লাস আমি এঞ্জয় করেছি।
আমি রেকোমেন্ড করবো বইটা, পড়েন। না পড়লে কেম্নে জানবেন হেল এর মা অ্যাংব্রোডা, হেল কে ছোটবেলায় ঘুম পাড়ানোর সময় শোনাতেন,
নতুন লেখকদের বই, বিশেষ করে সেটা যদি গুডরিডস বা সোশ্যাল মিডিয়াতে হাইপ তোলা বই হয়, সেটা শুরু করলেই এক ধরণের আতঙ্কে থাকি--এই বুঝি হিমালয়ের চূড়া থেকে সোজা গুলিস্তানের ফুটপাথে ধপাস করে পড়বো। ৯৫% ক্ষেত্রেই সেটা হয়েছে বলে আজকাল গায়ের সাথে ভার্চুয়াল কম্বল-গদিও বেঁধে নেই, পড়বো তো জানা কথাই, ব্যথা একটু কম লাগুক। পয়সা, সময়, আশা--সবকিছুই হারালে কারই বা গায়ে বিষ করবে না!
'হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে' সেটার ব্যতিক্রম, সেজন্য শুরুতেই লেখক ওয়াসি আহমেদকে অভিনন্দন জানাই। পয়সা দিয়ে বই কিনে পড়ে একবারও মনে হয়নি সময় বা টাকা নষ্ট হচ্ছে। কাহিনীতে, লেখক যেমনটা দাবী করেছেন, সেরকম ব্ল্যাক কমেডির ছড়াছড়ি, দারুণ গতি আছে, কখনোই পাঠক ঝিমাবেন না বা খেই হারাবেন না। অবশ্যই নর্স মিথলজি নিয়ে কম-বেশি জানা থাকলে বইয়ের কাহিনী আর কমেডি দু'টোই বুঝতে সুবিধা হবে, আর যদি জানা না থাকে তাহলে বইয়ের শেষে টীকার অংশটা পড়ে নিলেও হবে। হান্নানের চরিত্র ওয়েল ডেভেলপড, পঞ্চম আর শামীম উদিনেরটাও। যদিও একান্তই ব্যক্তিগত মত, নর্স মিথলজির সাথে হয়তো সাই-ফাই আনার চেষ্টা না করলেও হতো, কারণ এই ব্লেন্ডটা খুব একটা সুবিধার লাগেনি। তবে অনেকের কাছে সেটা একটা বাড়তি আকর্ষণও হতে পারে। একটা ব্যাপার ৯৫% কনফিডেন্স লেভেলে বলতে পারি--বাংলাদেশে এমন কিছু কখনো লেখা হয়নি, অন্তত আমার ক্ষুদ্র পাঠ অভিজ্ঞতায় যা বুঝি। পশ্চিমবাংলার ইদানিংকার লেখা সম্পর্কে খুব বেশি জানি না, তবে ওদের থ্রিলার-সাইফাই-হরর ইত্যাদি যা পড়ি, এমন কিছু চোখে পড়েনি। এমনিতেও আমার মনে হয়েছে যে, ফ্যান্টাসি বা আরবান ফ্যান্টাসি ধারায় বাংলাদেশের তরুণ লেখকরা ওদিকের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন, এই বইটা তার একটা উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
এরপরেও যে বইটাকে ৫ দিলাম না, সেটার জন্য লেখকের চেয়ে পাঠক হিসেবে আমার দোষই বেশি, অর্থাৎ খুঁতখুঁত করা, এবং অন্তত এই লেখক যদি দাবী করেন যে, এতই যদি বোঝেন তাহলে একটা লিখে দেখান এমন, তাহলে সবিনয়ে স্বীকার করতে হবে যে, এমন এলোপাতাড়ি জিনিস এত চমৎকারভাবে লেখা আমার দ্বারা কোনদিনই হবে না। বড় অভিযোগটা হলো, বইটার প্রথম ২ ভাগের সাথে পরের ১ ভাগের ঠিক যেন সামঞ্জস্য নেই। অনেকটা সিনেমার কন্টিনিউইটির মত। হয়তো দু'বছর আগে গ্রীষ্মকালে একটা অংশের শ্যুটিং করা হয়েছে, দু'বছর পরে শীতকালে যখন শ্যুটিং করা হলো, তখন পরিচালকের কাছে আগের অংশগুলোর কন্টিনিউইটির হিসেবটা ছিল না। ফলে মনে হয়েছে সম্রাট এবং রাঙাপরী আসার আগে লেখক এক ধরণের মুডে লিখেছেন, এরপর থেকে লিখেছেন আরেক ধরণের মুডে। একইভাবে, প্রথম ঐ দুই ভাগ অনেক বেশি জমজমাট, যাকে বলা যায় সলিড এবং প্রতিটা রসিকতা লাগসই; যেখানে পরের অংশটুকুর অনেক কিছুই মনে হয়েছে জোর করে আরোপিত। প্রথম দুই ভাগের রসিকতা মনে হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত, পরেরটায় মনে হয়েছে ফাতরামি। যদিও অন্যতম একটা চরিত্র পঞ্চম-এর বৈশিষ্ট্যই নাকি সে হলো ফাতরা, কিন্তু পাঠকের কাছে কোন রসিকতা কাতুকুতু মনে হলে সেটা ঠিক সুবিধার জিনিস না। একটু সময় নিয়ে লেখক নিজেই যদি এডিট করতেন, এবং শেষ ১০ পৃষ্ঠায় উসাইন বোল্টকে হার মানানোর জন্য আরো কিছু গোঁজামিল না দিতেন (যেমন, হেলের সাথে একজনের আত্মীয়তা, এবং অবশ্যই যে পরীকে নিয়ে এত কাহিনী তাকে আরেকটু ডেভেলপ না করেই কাহিনী শেষ করা), তাহলে এই ধারার লেখকদের জন্য একটা ম্যানুয়াল হতে পারতো বইটা। তারপরেও, যারা ভবিষ্যতে ফ্যান্টাসি লিখেন, তাদের একবার হলেও পড়ে দেখা উচিত।
পুনশ্চঃ লেখকের প্রটাগনিস্টরা সবাই এ যুগের, কাজেই তাদের মুখের বুলিটা আধুনিক হলেও, লেখকের নিজের লেখার ধরণে তিনি যে ফেসবুকীয় স্ট্যাটাসের স্টাইলটা পরিহার করেছেন, সেজন্য কৃতজ্ঞতা। তাঁর প্রজন্মের বেশিরভাগই এটা পারেন নি। আরেকটা ব্যাপার খুবই সামান্য, সম্ভবত ২ জায়গায় থরোয়ার এবং র্যাগনারক-এর কথা বলার আগেই হান্নানের মুখ দিয়ে নামগুলো বের হয়ে এসেছে, একটু মনোযোগ দিয়ে পরের এডিশনে ঠিক করে দেয়া দরকার। আর নর্স চরিত্র বা বস্তুগুলোর কিছু নামের উচ্চারণ মনে হয় একটু শুনে নিলে ভাল হয়। সবশেষে, লেখক এক জায়গায় উদিনের মুখ দিয়ে একটা ডায়ালগ দিয়েছেন--''এই শহরটা যে কুত্তারাই চালায় সেইটা আগে বুঝি নাই" বা এরকম কিছু, এই লাইনটার জন্য বাড়তি ১টা তারা।
খোদা!! 😂😂 এইটা কি ছিল! আমি মনে হয় জীবনেও আর নরমালভাবে নর্স মিথলজি পড়তে পারব না 😂😂
শুরুতে বইয়���র প্রথম দুই চ্যাপ্টার পড়ে মনে হচ্ছিল ধুর! পজেটিভ রিভিউ টিভিউ সব ভুয়া.. হাইপ আর অদ্ভুতুড়ে নামটাই আসল। খাইসি ধরা বইটা কিনে। কিন্তু তারপরেও কি মনে করে পড়া চালায় যাচ্ছিলাম.. কিন্তু কিন্তু কিন্তু.. পিকচার আভি বাকি হ্যায় ম্যারা দোস্ত! (বইয়ের প্রভাবে আমিও একটু প্রভাবিত হয়ে গেলাম আর কি) হাসতে হাসতে গড়াগড়ি। সাই-ফাই-মিথলজি-এডভেঞ্চার... মানে পুরাই ব্লেন্ডার। তবে, একটা জিনিস, বর্তমানের থ্রিলার পড়ুয়া পাঠকেরা (যারা লেখক সম্পর্কেও মোটামুটি জ্ঞান রাখেন), মিথলজি সম্পর্কে মোটামুটি জ্ঞান আছে বা ট্রেন্ডি ডায়লগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তারা একদম এক শ পার্সেন্ট এঞ্জয় করবে। লেখক সাহেবকে হ্যাটস অফ! দারুণ দুর্দান্তভাবে এলোমেলো আগলা পাগলা সবকিছুকে একটা সুতোয় গেঁথেছেন।
খুব খুব খুব এঞ্জয় করসি.. স্পেশালি জতুনহেইমে যাবার জন্য বগুড়ার বাসে উঠা, লুঙ্গি পড়া গোলাম থরোয়ার, জোব্বা পড়া শামীম উদিন (যাকে কি না উদ্দিন বললে ক্ষেপে যায়) আসলে স্পেসিফিক করে বলার কিছু নাই.. একটু পর পর উল্টাপুল্টা কাহিনি মনে হয়ে যায় আর দিন দুনিয়া ভুলে আমি একা একা ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে থাকি। হান্নানের উল্টাপুল্টা দুনিয়ায় সুস্বাগতম
বি.দ্র. এক তারা গুপী-বাঘা সংক্রান্ত ঝামেলার জন্য এক তারা কেটে রাখসিলাম, আবার কনফিউশন শেষ হয়ে যাওয়ায় পুরা ৫ তারাই দিসি। 😪
বইটা একটা Hot mess। আরও ঠিকভাবে বললে, বইটা একটা Proud Hot Mess। হান্নান হলো শ খানেক ইস্টার এগ আর রেফারেন্সে ঠাসা একটি নেশাবাস্তব জনরার বই। এর উত্তোরত্তর অ্যাবসার্ডিটির সাথে যোগ হয়েছে লেখকের কমপেলিং স্টোরিটেলিং এর ম্যাজিক, যে জন্য একটার পর একটা অদ্ভুত থেকে অদ্ভুততর ঘটনার ঠাসাঠাসি ঘনঘটায় বইটা এগিয়ে গেছে তড়তড়িয়ে। বইটার যেই প্রেমিজ, সেই প্রেমিজ বিচারের জন্য আলাদা কোনো এক্সপ্লেনেশন আশা করি নি, দরকারও মনে করিনি, মস্তিষ্ককে 'ইয়ে' করে দেয়া নেশাকেই সকল কাজের কাজী ধরে নিয়েই যাচ্ছেতাই অ্যাবসার্ড ঘটনা লেখার সার্টিফিকেট আগেই দিয়ে রেখেছিলাম বইটাকে। অবাক হলাম যখন দেখলাম লেখক সেটাকেও সাইফাই এর বরপুত্র প্যারালাল ওয়ার্ল্ড আর কোয়ান্টাম এন্টাঙ্গলমেন্ট দিয়ে মোটামুটি উপাদেয় একটা 'যৌক্তিক' এক্সপ্লেনেশনে বেঁধে দিয়েছেন।
এই বইটা ১০০% সেলফ অ্যাওয়ার অ্যাবাউট ইটসেলফ, তাই বইটা নিজেকেই নিজে ঠিক ততটুকুই সিরিয়াসলি নেয় যতটুকু নেওয়া উচিত। সেজন্য যা-তা রকমের একটার পর একটা মাইন্ডবগলিং ঘটনা যেমন উপভোগ করা যায়, আবার মিথিকাল হিস্টোরির কন্টিনিউটির সাথেও প্লটের যোগসাজশ আবার ঠিকমতো থাকে।
বইটা পড়তে গিয়ে মনেহয় সাড়ে তিনবার শব্দ করে হেসেছি, রুমের অন্যান্য ব্যক্তির ভ্রুকুটির শিকার হয়েছি। শব্দ করে হাসা ছাড়াও ফিক-খ্যাক ইত্যাদি বইজুড়েই ছিলো। আমার মতো গোমড়াথেরিয়াম যে যাবতীয় সকল সিটকম নির্বিকারভাবে গালে হাত দিয়ে দেখে, তার কাছে এটা অবশ্যই বড় ধরনের প্রশংসা।
মিথোলজির ব্লেন্ডিং এবং প্লটিং চমৎকার। নর্স মিথ নিয়ে জানাশোনা লোকেদের কাছে মিথোলজির প্লটিং ভালো না লেগে উপায় নাই। এই কাজটা করা হয়েছে বেশ যত্ন সহকারে, আর নর্স মিথের প্রতি বিশদ দরদ থাকায় মোটামুটি সব ঘটনাই মনে ছিলো, এই বইয়ে সেটার হান্নানের ভার্সনটা পাই টু পাই এনজয় করেছি। জতুনহেইমের ফ্রস্টজায়ান্ট জৌশিক কামানের জন্য ভালোবাসা।
বইটা বেশ থরোলি এনজয় করার কারণ, বইটার মোটামুটি সবরকম পপ কালচার রেফারেন্স আর অধিকাংশ ইনসাইড জোক আমি ধরতে পেরেছি, লেখক এবং তার কমিউনিটির সাথে মোটামুটি জানাশোনা থাকার কারণে। তার ওপর, নর্স মিথোলজি আমার মোটামুটি ভেজে খাওয়া। তাই সহজেই বলা যায় বইটার টার্গেট ডেমোগ্রাফিকের একজন নিঃসন্দেহে আমি। কিন্তু এই ডেমোগ্রাফিক সংখ্যায় কতোটা বড়, সেটা আমি ঠিক শিওর না। পপ কালচার রেফারেন্স এবং ইনসাইড জোক এবং নর্স মিথোলজির জ্ঞানবিহীন একজন পাঠকের কাছে বইটার এক্সপেরিয়েন্স বা এনজয়মেন্ট যে আমার মতোই দারুন হবে, সেটা জোর গলায় বলতে পারছি না। এইখানে লেখককে বাহবা দেওয়া যেতেই পারে, এতো এক্সপেরিমেন্টাল কাজের সাহস দেখানোর জন্য।
এবার হিউমার নিয়ে মাই টু সেন্টস। বইটার হিউমারের ৬০% থেকে ৬৫% হলো রেফারেন্স এবং ইস্টার এগ ভিত্তিক। সেটা গল্পের ভেতরের ইস্টার এগ বা লেখকের ন্যারেশনে অথবা চরিত্রের সংলাপে বারংবার পপ কালচারের, আনপপ(!) কালচার, মিম টেমপ্লেট ইত্যাদির রেফারেন্স পর্যন্ত বিস্তৃত। এবং সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উতড়ে গেছে ভালোভাবেই। তবে এই নেম ড্রপিং হিউমারের আধিক্যের কাছে কিছুটা ম্লান হয়েছে লেখকের দূর্দান্ত সিচুয়েশনাল কমেডির বা উইটি প্লটিংগুলো। পসেইডনের কাওরান বাজারে মাছ বেচা, বা মুখ খারাপ করা পঞ্চমের কাটা মাথার রাবীন্দ্রিক মুখের ভাষা, ওডিনের হল ভালহালা ঢাকায় এসে কমিউনিটি সেন্টারে বদলে যাওয়া, অথবা 'ব্যাথার দাগ না, ওটা ওর জন্মদাগ' টাইপ দুর্ধর্ষ হিউমারগুলো ভালোবেসেছি অনেক বেশি।
বইটা যত এগিয়েছে, রেফারেন্স, ক্রসওভার এবং কাহিনীর অ্যাবসার্ডিটি যা-তা থেকে যা-তা'তর হয়েছে, স্পেশালি ক্লাইম্যাক্সে এসে। একদম ডিসেন্ডিং ইনটু ম্যাডনেস। একের পর এক ক্যারেক্টার, এক্সপ্লেনেশন, সাইফাই কড়চা যোগ হয়েছে। শেষের দিকে মহাবিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীর এই লম্বা ক্যামিও এনজয় করেছি পুরোটা। নিটপিকিং করতে হলে, ওডিন এবং ওল্ড গডস দের রিভিলটা আরও জমাট হতে পারতো। হান্নান টাইপের গবেট প্রকৃতির ছেলের ছোটবেলা থেকে নর্স পুরাণ পড়ে তাদের চিনতে পারাটাও একটু আউট অব ক্যারেক্টার লেগেছে। আর একদম শেষে বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে এসে স্টেরেওটিপিকাল জিরো টু হিরো হওয়াটাতেও হয়তো লেখক একটু টুইস্ট করতে পারতেন।
বইটায় কোনো বানান ভুল নাই, কিছু ছোটখাট কন্টিনিউটি এরর আছে। প্রোডাকশন ভালো, আরাম করে বই খুলে পড়া যায়। প্রচ্ছদ ভালো, তবে এতো যা-তা একটা বইয়ের প্রচ্ছদ আরও 'উইটি' হতে পারতো।
সবমিলিয়ে হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে একটা থরোলি এনজয়েবল সেলফ অ্যাওয়ার প্রাউড হট মেস। পরের পর্বের জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষা করছি।
এইধরনের সুপার এক্সপেরিমেন্টাল বইয়ের রেটিং দেওয়া বেশ কঠিন। বেশ ভেবে বুঝলাম এটার প্রকৃত রেটিং ৩.৬৯ থেকে ৪.২০ এর মাঝেই।
( রিভিউতে ব্যবহৃত যা-তা, যাচ্ছেতাই, mess শব্দগুলো একদমই নেগেটিভভাবে ব্যবহৃত নয়।)
এই বইটা নিয়ে লেখা বিশাল গ্যাঞ্জামের কাজ। বইটার একদম ড্রাফট কপি থেকে শুরু করে ফাইনাল কপি পর্যন্ত সবগুলা ভার্সন কয়েকবার করে পড়া হয়েছে আমার। বইটার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কেবল গ্যাঞ্জাম আর গ্যাঞ্জাম। জনরা হিসেবে মিথলজিকাল ব্ল্যাক কমেডি সাই-ফাই ফ্যান্টাসি থ্রিলার বলা হলেও এই বইটা তার চেয়ে অনেক বেশী কিছু। প্রতিটা পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় এস্টার এগ আর সবগুলা, আই রিপিট সবগুলা চরিত্রকে আমি চিনি। এই চেনা চরিত্রগুলার মধ্যে যেমন মাথা কাটা পঞ্চম, দানব জৌশিক কামান আছে তেমনি উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরির গুপি গাইন বাঘা বাইন, নর্স মিথোলজির ওডিন, থর থেকে শুরু করে রিক এন্ড মর্টির রিক পর্যন্ত আছে। পড়তে পড়তে আমি বারবার হো হো করে হেসে উঠছিলাম আর ভাবছিলাম কী নাই এই বইয়ে! গল্পটার শুরু হয়েছিল নেশা করতে গাজীপুরের শালবন যাওয়া থেকে। তখন মনে মনে ভেবেছিলাম শেষে বোধহয় দেখা যাবে নেহাত একটা এলএসডি ট্রিপ নিয়ে লেখা গল্পটা। তেমনটা হলে বেশ কষ্ট পেতাম আমি। কিন্তু শেষটায় আমার সব আশঙ্কা একদম দূরে সরিয়ে দিয়ে খুবই স্যাটিসফাইং একটা এন্ডিং চলে এলো। আর সেই এন্ডিংটার জন্য ওয়াসি ভাই কী পরিমাণ খাটা খাটনির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে তার সামান্য ধারণা আছে আমার। ওয়াসি ভাই বইটা যখন বার তের হাজার ওয়ার্ড লিখেছেন তখন থেকে পান্ডুলিপি পড়ছি আমি। দু'জন একসাথে রাত জেগে লেখি আর প্লট নিয়ে কথাবার্তা বলি। মোটামুটি ত্রিশ হাজার শব্দের মধ্যে প্যাক করে ফেলতে চাওয়া এই বইটা ততোদিনে পঞ্চাশ হাজার ওয়ার্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে। টিপিকাল থ্রিলার, সাইফাই বা অন্য যে কোন জনরার সেই ধরা বাঁধা প্লটকে ওয়াসি ভাই রীতিমতো দুমড়ে মুচড়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটা জগত তৈরি করে ফেলেছেন এই বইটায়। এমন কাজ শুধু আপনার পক্ষেই করা সম্ভব রাফি ভাই। রাফি বানানে তাই ই-কার ব্যবহার করার মতো মহাপাপ করলেও এই বইটার জন্য হ্যাটস অফ বলতে বাধ্য হলাম। হ্যাটস অফ রাফি ভাই, হ্যাটস অফ। এই বইটা নিয়ে আমার অনেক আশা ছিল, সেই আশাগুলো খুব সুন্দরভাবে পূরণ করেছেন আপনি।
এইটা কি পড়লাম!!! কি নেই বইটাতে? ব্ল্যাক কমেডি, ডার্ক ফ্যান্টাসি, মিথলজি,সায়েন্স... আর কী বাদ পড়লো? যে এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছে খুব বেশি মাত্রায় চান্স ছিল বিষয়টা কেচে যাওয়ার। কিন্তু তেমন কিছু হয়নি বরং সবকিছু মিলে দারুণ একটা জার্নি ছিল। হ্যাটস অফ টু দ্য লেখক রাফি ভাই। 😝😝😝
প্রথমেই একটা কথা বলে নেই এটা একটা অ্যাডাল্ট বই, নাম দেখে ভাববেন না যে বাচ্চাদের জন্য লেখা!
হান্নান একটা 'গাছবলদ' ছেলে, চারবার এইচ এস সি ফেইল করেছে সে কিন্তু বর্তমানে একটা মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার যার কান্ট্রি হেড তার মামা। একটু বলদ কিসিমের হওয়ায় পঞ্চম ছাড়া ওর কোন বন্ধুবান্ধবও নেই। পাড়ার কিছু বখাটে ছেলেদের সাথেও ওর ওঠাবসা আছে কিন্তু ওরা শুধুই হান্নানের টাকা পয়সার লোভে হান্নানকে বন্ধুর মর্যাদা দিয়েছে। হান্নানের বাবা মা নেই, একমাত্র মামার কাছে মানুষ। মামাও জানেন হান্নান একটা বলদ তাই টাকা পয়সা কখনোই হান্নানের হাতে দেননা। তাতে হান্নানের কিছুই যায় আসে না! সময় নষ্ট করবেনা বলে হান্নান সবসময় গাড়িতে উঠেই ঘুম দেয়, তাই বাইরে সিগারেট খেতে একা বের হলেও সে নিজের ঘর চিনে ফিরতে পারে না। এইরকম একটা মানুষকে যখন পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সিলেক্ট করা হয় তখন সেই পৃথিবীর কি অবস্থা হবে একবার ভাবুন তো! বই এ ঠিক এই কাজটাই হান্নানকে করতে হয়েছে! ভাবছেন কিভাবে সম্ভব? আমিও ভাবছিলাম, বই পড়ার পর মনে হলো হান্নানের সাথে "হ্যাংওভার" মুভি সিরিজের অ্যালান এর বেশ মিল আছে! অ্যালান যেমন পুরোটা সময় জুড়ে বুঝতে পারেনা যে ওর চারপাশ দিয়ে কি ঘটে যাচ্ছে, হান্নানেরও তাই হয়েছে। সে ও পুরোটা সময় জুড়ে বুঝতে পারেনি যে কিভাবে সে পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে!
খুবই হাস্যরসাত্নক একটা বই। বই এর সংলাপ, চিন্তা ভাবনা এবং বর্ননাতে সারকাজমের ব্যাপারটা খুবই পছন্দ হয়েছে। মুরাদ টাকলার ভাষা, বাংলা সিনেমার সংলাপ, হাতি মার্কা ছাপ, কেপপ আরো কি কি যেনো এখন আর মনেও পড়ছে না! হান্নানের মতো বলদ একা তো আর পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেনা, তাই তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে গোপি-বাঘা, এসেছে নর্স মিথলজির দেবদেবীরা, এসেছে রিক এন্ড মর্টি টিভি সিরিজের রিক, পাওয়ার পাফ গার্লসের মোজো-জোজো! এদের মধ্যেই আছে গল্পের হিরো আর ভিলেন! তবে আমার মতো যারা নর্স মিথলজি পড়েননি তাদের একটু অসুবিধা হতে পারে বুঝতে, যদিও লেখক যথেষ্ঠ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন সবকিছুই এবং বই এর শেষেও রেফারেন্স আকারে না দিয়ে সুন্দর করে গল্পগুলো বলে দিয়েছেন!
মিথের ওপর ভর করে গল্পটা লেখা হলেও কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর ব্যাপার স্যাপার ও এর মধ্যে চলে এসেছে! সব মিলিয়ে একটা হযবরল অবস্থা থাকলেও গল্পটার শেষটা হয়েছে চমৎকারভাবে। ইদানীং নতুন লেখকদের বই পড়তে গেলে বেশিরভাগ সময়ই এন্ডিংটা পছন্দ হয়না, তাই ভালো রিভিউ না পেলে বইও কিনিনা। আসমার রিভিউ পড়ে এই বই এর প্রতি আগ্রহ জাগে কিন্তু কেনা তো সম্ভব না! শেষবার বাংলা বই কিনেছিলাম ২০১৯ সালে, তিনটা বই এর মধ্যে একটা ছিলো এই লেখকের বই। রকমারি থেকে বইগুলো যখন বাসায় গিয়ে পৌঁছালো তখন আমি বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে। বই গুলো পড়েই রইলো। আমার পড়া আর হলো না!
এই বইটা পড়তে সাহায্য করার জন্য আসমা এবং লেখক দুইজনকেই অসংখ্য ধন্যবাদ। ওয়াসি আহমেদ রাফির বই এর রিভিউ পড়েছি অনেক, তাই লেখা নিয়ে কোন সন্দেহ ছিলো না, এখন গল্প পড়ে বুঝলাম গল্পকার হিসেবেও উনি অনবদ্য!
এই বইটাকে একটা সহজ সরল জন্রাতে ফেলা কঠিন। লেখক নিজেও পারেননি। তবে গতানুগতিক ভাবধারার বাইরে কোন বই পড়তে চাইলে অবশ্যই বইটা পড়ার অনুরোধ রইলো। ভালো লাগবে গ্যারান্টি দিচ্ছি!
পুনশ্চ, সুন্দর করে একটা রিভিউ লেখার ইচ্ছা ছিলো কিন্তু এইটুকু লিখতে কন্যা ঠিক কতোবার ডিসট্রাক্ট করলো সে হিসাব রাখতে পারিনি বিধায় মাথার মধ্যে থাকা অর্ধেক কথাবার্তাই লিখতে পারিনি, ভুলে বসে আছি। ঠিক একই কারনে ভালো লাগলেও বইটা শেষ করতে প্রায় এক মাস লেগে গেলো!
এটা একটা আজগুবি বই, মারাত্মকভাবে গুছানো একটা আজগুবি বই। কাহিনীর মূল চরিত্র 'গাছবলদ' কিসিমের হান্নান পাটেয়ারী। চারবার এইচএসসি ফেল করেও আজ মামার কল্যানে বহুজাতিক কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হান্নান। সমাজের উঁচুশ্রেণীর কিছু ফাতরা ছেলেপেলের সাথে তার বন্ধুত্ব, তাদেরই একজনের নাম পঞ্চম। একদিন তুখোড় পিনিকের খোঁজে পঞ্চমের সাথে গাজীপুর শালবনে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে বন্ধুর কাটা মাথা নিয়ে ফেরত আসে হান্নান। এরপর নর্স মিথলজি, টাইম ট্রাভেল, প্যারালাল ইউনিভার্সের চক্করে পড়ে 'চোজেন ওয়ান' হিসাবে আসন্ন ধ্বংস থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার িয়েই এই বই।
ঈদের দিন জ্বর নিয়ে মন খারাপ করা একটা দিনে এই বই পড়তে পড়তে কখনো মুচকি হেসেছি, কখনো গড়াগড়ি দিয়ে। মিথলজি বরাবরই পছন্দের বিষয়। তার উপর যদি দেশী প্রেক্ষাপটে লেখা হয় তাহলে তো কথাই নেই। কবিগুরুর মতো দাড়িওয়ালা শামীম উদিন ওরফে Odin আর শাহ সিমেন্টের বস্তায় হাতুড়ি বহনকারী লুঙ্গি পরা গোলাম থরোয়ার ওরফে Thor এর দেখা পেয়ে কার হাসি আসবে না বলুন? সবথেকে মজার ব্যাপার হলো বইয়ের মাঝে তাবৎ দুনিয়ার সকল বিষয়ের রেফারেন্স আর ইস্টার এগ। গুপী গাইন-বাঘা-বাইন, রিক অ্যান্ড মর্টি সিরিজের বিজ্ঞানী রিক স্যানচেজ, পাওয়ারপাফ গার্লস কার্টুনের ভিলেন মোজোজোজো, বাংলা সিনেমার ডিপজলের গান "পুত কইরা দিবো", রাস্তার ধারে মলম বিক্রেতাদের মাইকিং, এতো এলিমেন্ট নিয়েও সবকিছু গিট্টু না পাকিয়ে বরং মূল স্টোরিলাইনে প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে এসেছে। এই রেফারেন্সগুলোর মাঝেই বইয়ের আসল মজা। তবে আপনি এসব ক্যারেক্টারের সাথে বা নর্স মিথলজির সাথে আগে থেকে পরিচিত না হলেও চিন্তার কারণ নেই, লেখক সে ব্যাবস���থাও করে রেখেছেন। বইয়ের শেষে সবার পরিচিতি দেওয়া আছে, চাইলে সেটুকু আগে পড়ে নিতে পারেন।
যদিও শুরুতেই বইটিকে আখ্যা দেওয়া আছে অসামাজিক, নেশাবাস্তব, কালচে রসাত্মক উপন্যাস হিসাবে, তবুও কিছুটা গালাগাল ছাড়া তেমন ট্রিগারিং কন্টেন্ট চোখে পড়েনি। তবুও হালকা ডার্ক কমেডিতে অস্বস্তি বোধ করলে বইটি না পড়ার অনুরোধ থাকলো৷ আর এসবে সমস্যা না থাকলে জলদি পড়ে ফেলুন। পরের খন্ডে কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা পসাইডনের সাথে হান্নানের অভিযান দেখার জন্য আমি তো মারাত্মক এক্সাইটেড!
কী নেই বইটায়? নর্স পুরাণের মহাশক্তিধর দেবতারা ঢাকার রাস্তায় কেলিয়ে বেড়াচ্ছে। আছে গুপি-বাঘা, মিম-ট্রল-ঢাকাইয়া সিনেমা-ফ্রেন্ডসে ব্যবহৃত ডায়লগ/গান, বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী রিক থেকে শুরু করে জনৈক কাচ্চি লাভার, এক বিশিষ্ট (!) লেখক যার বিয়ে করতে 'লইজ্জা' লাগে। এবং আছে পঞ্চমের কাটা মাথা।
'হান্নান' একটা জার্নি। একটা উন্মাদ, নেশা ধরানো, পরাবাস্তব জার্নি। লেখককে অভিবাদন। এরকম প্লটরুপী পাগলা ঘোড়াকে বশে আনার জন্য।
এক্কেবারে পথ হারায়ে মাঝ রাস্তায় ছেড়ে দিলো হান্নান পাটোয়ারী 🤦♂️🤦♂️। এমন অসামাজিক মরণমুখী কালচে রসাত্মমুলক বই ইহজগতে আমার পড়া হইছে কিনা জানা নাক🤦♂️ হান্নানের মত গাছবলদ হয়েও পরী আটকাইতে যাত্রা করছি দিন দুনিয়ার একমাথা থেকে আর��ক মাথায়।
হার্ডকভার বই। বেশ ভালো ছাপা। প্রথম থেকে শেষ অবধি লেখায় ঠাসা। শুরু করলে শেষ না করে থামা যায় না। এই অবধি লিখে তারপর ভাবতে বসেছি, বইটা নিয়ে কী, বা সঠিকভাবে বললে, কীভাবে লিখব। তার কারণ, বাংলায় এইরকম বই... নেই। এটি ফ্যান্টাসি, ডার্ক ফ্যান্টাসি, স্যাটায়ার, কল্পবিজ্ঞান, কঠোরভাবে প্রাপ্তমনস্ক উপন্যাস, সুকুমার রায়ের উদ্দেশে শ্রদ্ধার্ঘ্য, আর আরও অনেক কিছু। তবে এর সবচেয়ে বড়ো বিশেষত্ব হল 'মেটা'-ধর্মী প্রকৃতি— যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় চরিত্র সরাসরি পাঠকের সঙ্গে ভাব-বিনিময় করতে পারে। "ডেডপুল" সিরিজের অনুরাগীরা জানেন, ওই সিরিজের গ্রাফিক নভেল বা সিনেমায় ঠিক এই কারণেই পাঠক বা দর্শকও চরিত্র হয়ে ওঠেন। হান্নান পাটওয়ারী সরাসরি আমাদের সঙ্গে কথা না বললেও তার দিনযাপন, ভয়, লোভ, আশা, এমনকি ভালোবাসাও এতটাই আমাদের মতো যে মনে হয়, এ যেন আমাদেরই আখ্যান।
এই চমৎকার ডার্ক কমেডিটি শেষে এসে কেমন যেন পেঁচিয়ে গেছে। আসলে লেখক মনের রান্নাঘরে যত মশলাপাতি ছিল সব ঢেলে দিয়েছেন এক বিশাল কড়াইতে। ফলে ব্যাপারটা ঘেঁটে গেছে। তাছাড়া কমেডি উপন্যাসের শেষে নর্স মিথলজি নিয়ে সহায়িকা জুড়ে দেওয়াটা কেমন যেন লাগল। এই কারণে বইয়ের একটি তারা খসালাম।
তবে বিপদ হল অন্য জায়গায়। বেল্ট পরতে গেলেই এবার মনে হতে পারে, স্বয়ং ওডিন বলছেন, "যাদের রানের চিপায় ঘা, উলটাইয়া চুলকায়, পাল্টায়া চুলকায়। চুলকাইতে চুলকাইতে প্যান্টের সেলাই ছিঁড়ে ফ্যালে, চামড়া ফেটে রক্ত বের হয়, আর চুলকাতে চুলকাতে মনে হয় আহ কী শান্তি, তাদের জন্য, হ্যাঁ ভাই, তাদের জন্য..." বিপজ্জনক বই। ঝট করে পড়ে ফেলুন দেখি।
"হান্নানের কি কোনো কাজ নাই যে পরী আটকায় রাখবে?", বইয়ের নাম দেখেই আম্মুর এই মন্তব্য। আমারও বইয়ের নামটা দেখার পর মনে হয়েছিল, "হান্নান ক্যান পরী ধরবে? এটা কি বাচ্চাদের বই?" মলাট উল্টাতেই দেখি লেখক লিখে রেখেছেন যে এটা মোটেই বাচ্চাদের বই না!
বইটা পুরোটাই ভুজুংভাজুং জিনিস নিয়ে লেখা। মানে একদম ল্যাটকা খিচুড়ি যাকে বলে৷ কী নাই এইটার মধ্যে পপ কালচার রেফারেন্স, মিম রেফারেন্স, মিথলজি- সবই পাবেন। ওয়াসি ভাইয়া নিজেও এই বই নিয়ে কনফিউজড, সেই সাথে আমিও কনফিউজড। মুসা ভাইয়া, জোয়া আপু আর কিবোর রেকমেন্ডেশন লিস্ট দেখে বইটা কিনে ফেলেছিলাম। আশাহত হই নাই, তবে আহা-উহু করার মতন ভালোও লাগেনি। কারণটা বলছি। বইয়ের প্রথম অর্ধেক পড়তে মজাই লাগছিল। পঞ্চমের কথা, বাংলা সিনেমার ক্রিঞ্জ গান, ফানি ডায়ালগ, গুপি গাইন বাঘা বাইন, রিক, হ্যারি পটার, মোজো জোজোসহ অনেক পরিচিত রেফারেন্স ছিল। বিশেষ করে হান্নানের বন্ধু যখন "তোমার জন্য নীলচে তারার..." গেয়ে উঠে তখন খুব জোরে হেসে ফেলেছিলাম। ইয়ে, সিটিএসকে নিয়ে লিখে ওয়াসি ভাইয়া যে এখনো কারো তোপের মুখে পড়েন নাই, সেটা দেখে অবাক হলাম 😛
সমস্যা হলো শেষ অংশে৷ ওই সময় একসাথে অনেকগুলো বিষয় ঘটছিল, প্যারালাল ইউনিভার্স, টাইম ট্রাভেল, তার সাথে নর্স মিথোলজির সর্বপিতা ওডিন, বজ্রদেবতা থর, লোকির ব্যাপারও চলে আসে। তখন আর পড়তে ভালো লাগছিল না। মিথোলজি আমার ভালো লাগে না। জীবনে এ নিয়ে একটাই বই পড়েছিলাম, 'নর্স মিথলোজি'। পরে জানলাম এইটার লেখক ওয়াসি ভাইয়াই ছিলেন। যাই হোক, তো মিথলোজি ভালো লাগে না দেখে আমি শেষ অংশটা নিয়ে আমি একটু হতাশ। কারণ রেফারেন্সগুলো বুঝতে পারি নাই। যদিও ভাইয়া বইয়ের শেষে সব চরিত্রের ব্যাখা দিয়ে দিয়েছিলেন, এইটা ভালো হয়েছে। আগে জানলে শেষ থেকেই পড়া শুরু করতাম। মানে আমি মিথোলজি নিয়ে এতটাই অজ্ঞ যে থরোয়ারই হচ্ছে থর, এইটা বুঝতে বইয়ের শেষ পাতা পর্যন্ত যাওয়া লেগেছিল!
আপনি যদি পপ কালচার নিয়ে আপ-টু-ডেট থাকেন, ফেসবুকে মিম (meme) দেখা হয়, তাহলে বইটা পড়ে আপনি মজাই পাবেন।
নিখাদ বিনোদন। পড়ে অনেক মজা পেয়েছি। বইয়ের প্লট, কাহিনির বুনন আর ভাষা মাথা ঘুরিয়ে দেয়। বইয়ে নর্স মিথলজি, সায়েন্স ফিকশন আর ডার্ক হিউমারের মিশেল রীতিমতো দুর্দান্ত। চার চারবার এইচএসসি ফেল "গাছবলদ" হান্নান কোয়ান্টাম ফিজিক্সের গ্যাঞ্জামে সময় আর প্যারালাল ইউনিভার্সের চক্করে পরে যেভাবে নর্স মিথলজির "চোজেন ওয়ান" হয়ে উঠলো তার কোনো তুলনা হয় না। সেরা চরিত্র পঞ্চম।
The Norse myths are the myths of a chilly place, with long, long winter nights and endless summer days, myths of a people who did not entirely trust or even like their gods, although they respected and feared them. - Neil Gaiman, Norse Mythology - হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে - হান্নান পাটওয়ারী, চার বার এইচএসসি ফেইল করার পরেও তার মামার বদান্যতায় কোনেস্যোঁ ইন্টারন্যাশনাল এর এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার পদে অধিষ্ঠিত। হান্নানের অন্যতম কাছের এবং শৈশবের বন্ধু পঞ্চমের পরামর্শ অনুযায়ী তারা শালবনে যাওয়ার প্লান করে তুখোড় পিনিকের আশায়। কিন্তু সেই শালবনে ঢোকার পর থেকেই হান্নানের সাথে ঘটতে থাকে অবিশ্বাস্য সব ঘটনা।
অনেক ধরনের অবিশ্বাস্য ঘটনা দেখার পরে একসময় হান্নান সেই বন থেকে বের হতে পারলেও তার চেনা পৃথিবী আর আগের মতো চেনা থাকেনা। হান্নানের সাথে সাক্ষাৎ হতে থাকে অদ্ভুত সব মানুষজনের এবং সে জানতে পারে তার উপরে দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে দুনিয়া রক্ষা করার। এখন কেন তার উপরেই এই পৃথিবী রক্ষার দায়িত্ব পড়লো এবং কোন উপায়ে হান্নান এই পৃথিবী রক্ষার চেষ্টা করবে তা জানার জন্য পড়তে হবে লেখক ওয়াসি আহমেদ এর মিথোলজিক্যাল ব্ল্যাক কমেডি ঘরানার উপন্যাস "হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে"। - "হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে" মূলত একই সাথে মিথোলজিক্যাল এবং ব্ল্যাক কমেডি ঘরানার উপন্যাস। বইটি শুরু থেকেই বেশ ইন্টারেস্টিং এবং প্রতিটি অধ্যায়েই একটি উপদেশবাণী দিয়ে শুরু হয়েছে, যা ভালো লাগলো। কাহিনি যতই এগিয়েছে, ঘটনার ডালপালা ততই বাড়লেও লেখনশৈলীর কারণে কখনোই তা মূল প্লটের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি, যদিও গল্পের শেষভাগ বেশ তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে বলে মনে হলো। - আমার কাছে "হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে" বইয়ের সবচেয়ে দারুণ জায়গা লেগেছে এর ব্লাক কমেডি এবং প্রচুর দেশি-বিদেশি পপ কালচার তথা গান, কবিতা, সিনেমা, অ্যাড, জনপ্রিয় মিম- ইত্যাদির রেফারেন্স, যেগুলো পড়ার সময় মনে হয়েছে যেন আমার মতো পাঠকদের জন্যই বইটি লেখা। এর সাথে বইতে চরিত্র হিসেবে কখনো পাওয়া যাবে সত্যজিৎ রায়ের গুপি গাইন-বাঘা বাইন, কখনো রিক অ্যান্ড মর্টি এর রিক কে আবার কখনো পাওয়ার পাফ গার্লস এর মোজো জোজো কে। এর সাথে যোগ হয়েছে নর্স মিথোলজির ওডিন, থর, হেল, মিমির, বল্ডার সহ নানা চরিত্র। মাঝে মাঝে বাংলা স্পেকেউলিটিভ ফিকশনের কয়েকজন লেখক-অনুবাদক যেমন তানজীম রহমান, নসিব পঞ্চম জিহাদী, জাহিদ হোসেন, কৌশিক জামান , সালমান হক, লুৎফুল কায়সার এমনকি লেখক স্বয়ং গল্পে নানাভাবে এসেছেন চরিত্র হিসেবে। প্রথমদিকে এত এত রেফারেন্স এবং সার্কাস্টিক স্টোরিটেলিং খুবই ভালো লাগলেও শেষদিকে গল্পে সায়েন্স ফিকশন এর সাথে মিথলজির প্যাঁচ দেয়ার ব্যপারটা আরো ভালো ভাবে এক্সিকিউট করা যেতে পারতো। পার্সোনালি প্রায় সব বড় বড় রেফারেন্স ধরতে পারায় প্রায় প্রতি রেফারেন্সের পরে "হান্নানের এই কথাটি পরিচিত মনে হলো" - টাইপ বক্তব্য কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক করেছে, যে ধরনের পাঠকদের উদ্দেশ্যে বইটি লেখা তাদের এ সকল রেফারেন্স ইজিলি ধরতে পারার কথা। নর্স মিথোলজি, বর্তমান পপ কালচার এবং লেখক কমিনিউটির নানা ধরনের জোক না জানা পাঠকদের জন্য এ ধরনের লাইন অবশ্য প্রয়োজনীয় হতে পারে। - হান্নান পাটওয়ারী , এই বইয়ের স্ট্যান্ড আউট চরিত্র। বইয়ের বেশিরভাগ জায়গায় তার "গাছবলদ" টাইপ চরিত্রায়ণ ভালো লাগলেও এক জায়গায় রিক অ্যান্ড মর্টি দেখার কথাটা ঠিক তার চরিত্রের সাথে যায়নি বলে মনে হয়েছে। বইতে যেহেতু নানা কালচারের নানা চরিত্র নিয়ে ভর্তি, যারা মনে করেন এ সকল রেফারেন্স ধরতে কষ্ট হবে তারা বইয়ের শেষদিকের নির্ঘন্ট আগে পড়ে নিয়ে তারপরে বইটি শুরু করলে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন কিছু চরিত্র। এই ধরনের বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সার্কাস্টিক সংলাপ, এক্ষেত্রে বইটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উতরে গেলেও কিছু সংলাপ অবশ্য খুবই ক্রিঞ্জি মনে হলো। - প্রোডাকশন হিসেবে "হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে" বইয়ের কাগজ, প্রিন্ট ভালো আসলেও আমার বইতে বাঁধাই ভালো হয়নি, প্রায় প্রতি ফর্মা পড়ার পরেই অলমোস্ট খুলে যাচ্ছিলো। বইয়ের প্রুফরিডিং এবং সম্পাদনা মোটের উপর ভালো লাগলেও কয়েক জায়গায় হান্নান নানা ধরনের বিষয়ের রেফারেন্স দিচ্ছিলো যা সম্পর্কে সে পরবর্তীতে জানতে পারে। বইয়ের প্রচ্ছদ অবশ্য ভালোই লাগলো, কাহিনির সাথে মানানসই ই লেগেছে। - কয়েক বছর আগেই বাতিঘর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় লেখক জাহিদ হোসেনের "দুধ চা খেয়ে তোকে গুলি করে দেব"। ব্লাক কমেডি ধাঁচের এই বইটি প্রকাশের পর থেকেই বেশ মিক্সড রিএকশন পায়। আমার মনে হয় পড়ার "দুধ চা খেয়ে তোকে গুলি করে দেব" এর pre requisite হওয়া উচিত "হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে" বইটি। যাদের "দুধ চা খেয়ে তোকে গুলি করে দেব" বইটি ভালো লেগেছে এবং এ ধরনের আরো বই খুঁজছেন তারা "হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে" বইটি পড়ে দেখতে পারেন।
জ্ঞানী ব্যক্তিরা লেখার সময় কে কি ভাবলো, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে নিষেধ করে গিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এ আর এমন কি! তবে আমরা যারা গল্প উপন্যাস লিখি, তাদের জন্য এই মূল্যবান কথা মাথায় রেখে লেখালিখি করা প্রচন্ড কষ্টের। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি পাঠকের হৃদয় জয় করার উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা শুরু করলে হৃদয় উজাড় করে লেখা যায় না; যেটা ভালো লেখার পূর্বশর্ত। মানুষের ইচ্ছে ও রুচির কাছে নতজানু হওয়া মানে হাঁটা-চলার পথ সীমিত করে ফেলা। অথচ একজন লেখকের কাজ হচ্ছে পৃথিবীর তাবৎ অলি-গলিতে ঘোরা। সকল আনন্দ-অন্ধকার পত্যক্ষ করা। নতুন কিছু সৃষ্টি করা। সময় নিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে যথেষ্ট সাহসের প্রয়োজন। কারণ এতো পরিশ্রমের পর সেটা পাঠকের ভালো না লাগার অবকাশ থেকে যায়। এর চেয়ে পাঠকপ্রিয় পথে হাঁটা অনেক শান্তির। আমার দেখা খুব কম কিছু মানুষই এ অসীম সাহকিতার কাজটি করেন। তারা নিজেদের যা ভালো লাগে, তা-ই লেখেন। কার কি ভালো লাগলো বা না লাগলো, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। ওয়াসি আহমেদ এ দলের একজন অন্যতম সদস্য। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, লেখকের লেখার টোন, এবং ন্যারেটিভ স্টাইল মিলিয়ে যা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে কিছু লাইন পড়ামাত্র বলে দেয়া যায় এ লেখা আসলে কার। এ বয়সে এ ধরণের স্বকীয়তা সৃষ্টি এক কথায় অকল্পনীয়। নর্স মিথোলথি’র কিছু চরিত্র, প্রচন্ড ইন্টারেস্টিং কিছু ক্যারেকটার, হিউমার এবং একটা অভিনব থ্রিলিং প্লট – সব মিলিয়ে শুধু একটা কথাই বলবো – ‘ওস্তাদের মাইর শেষ রাতে।’
প্রথমেই বইটার নাম আর প্রচ্ছদ এত এত সুন্দর! তারপর উপর এত এত জনরার মিশ্রন দেখে সকল পাঠক ই পড়তে বাধ্য।
নামটা শুনলে প্রথমে মাথায় আসে হয়ত এটা ফ্যান্টাসি। কিন্তু বই শুরু করে দেখলাম কমেডি। এরপর ওডিন, লোর এসব পুরাণ চরিত্র, মিথলজি। বাব্বা এটা আসলেই কোন জনরার বই? মিথলজিকাল অল্টারনেট হিস্ট্রি ব্ল্যাক কমেডি সাইফাই ফ্যান্টাসি....... এবং থ্রিলার।
নর্স মিথলজির ক্যারেক্টার আর ওয়ার্ল্ড এর কথায় বেশি। যারা এই জনরা টা পছন্দ করে বা ওডিন, লোকি, বোল্ডার, থর এই ক্যারেক্টার সম্পর্কে অবগত তাদের বেশ পছন্দ হবে। কারণ গল্পের সাথে তাদেরকে একযোগ করে দিয়েছে। পাশাপাশি কিছু কার্টুন ক্যারেক্টার রিকমর্টি, জোজোমোজো আর গুপিবাঘাও আছে। ভাবা যায় সব যুগের এক একটা ক্যারেক্টারকে কীভাবে মিলে এই সময়ের একটা উপন্যাস লিখেছে! পাশাপাশি এখানে বিভিন্ন থ্রিলার লেখকদের নামে চরিত্রও আছে। বাংলা সিনেমার কিছু ক্রিঞ্জি গান আর ডায়লগ মেশায় কমেডিও এনেছে।
আর যেহেতু এখানে চরিত্র অনেক তাই অনেকসময় নাম ভুলেও যেতে পারেন তাই ক্যারেক্টারের দিকে খেয়াল রাখবেন। প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন নিয়ে বইটা দেখতে খুব সুন্দর এবং কোনো ভুল বানানও নজরে পড়েনি।
সবমিলিয়ে দারুন একখানা পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বইটা পড়ে এতবার হেসেছি আবার এমন ভিন্নধর্মী প্লটে আস্ত উপন্যাস লেখায় বাহবা দিতেও ভুলে যাইনি। পুরোটা বই উপভোগ করেছি একদম একবসাতেই ২৪৭ পেইজের একটা বই খতম।
একদিকে লেখক-সৃষ্ট চরিত্রদের মিলিয়ে নতুন করে মিথের ঘটনাগুলোকে সাজানো, অন্যদিকে পৌরাণিক এলিমেন্টগুলোকে বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা, তার ওপর খাঁটি বাঙাল মেজাজে গালাগাল আর বাংলা সিনেমার আদলে হাস্যকর সব ঘটনার মাঝ দিয়ে এগুতে গিয়ে সাম্প্রতিক অজস্র রেফারেন্স পড়তে পড়তে হেসে গড়াগড়ি খাবার অবস্থা হবে পাঠকের।
মিথ, সায়েন্স, ডার্ক কমেডি- এত সবের মাঝে দিয়ে এপিক ফ্যান্টাসির এক 'মহান যাত্রা'য় হান্নানের সাথে সামিল হবার আগে আরো বিস্তারিত শুনতে চাইছেন? দেখে আসতে পারেন আমার ভিডিও রিভিউ : https://youtu.be/qnuOCMpe-7o
শুরুর দিকটায় যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছি। লেখকের সেন্স অফ হিউমার দারুণ,তবুও জায়গায় বেজায়গায় হিউমারের ছড়াছড়ি ভালো লাগেনি। বইয়ের মাঝামাঝি অংশ থেকে শেষের অংশটা মোটামুটি ভালোই বলা যায়। বইটার সাইজ আরেকটু ছোট হলে,হিউমারের ম���ত্রাতিরিক্ত ব্যবহার না হলে এবং গল্পের গাঁথুনি আরেকটু ভালো হলে তিন তারকা দেওয়া যেতো।
আচ্ছা বলুন তো দেখি, এমন কোন চরিত্রের কথা প্রফেসিতে উল্লেখ আছে যে মহাপরাক্রমশালী সুপারভিলেনকে পরাজিত করে উদ্ধ্বার করবে বিশ্বব্রক্ষ্মাণ্ড? চারটা ক্লু দিচ্ছি- এক, চরিত্রটা ছেলে। দুই, শৈশবে বাবা-মা দু'জনকেই হারায় সে। তিন, ইংরেজি বানানে তার নামের আদ্যাক্ষর H এবং P. চার, এটা হুদাই দিছি। অপশন বাড়ানোর জন্য।
কী বললেন? হ্যারি পটার? ধুর মিয়া। হি ইজ দ্য অনলি ওয়ান, হান্নান পাটওয়ারি। তার নামের পাশে পরিচয়গুলোর কথা ধরতে গেলে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে 'গাছবলদ', 'কোনেস্যোঁ ইন্টারন্যাশনালের এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার', 'কান্ট্রি হেড রেজওয়ান পাটওয়ারীর একমাত্র ভাগ্নে', 'দুদুবার করে দুদুবার, মানে মোট চারবার এইচএসসি ফেল' 'হিউমেন রিসোর্স সেকশনের সাবিহার আশেকে দেওয়ানা' ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে হ্যাঁ, হ্যারি পটারের মতো তার গায়েও আছে আদি ও অকৃত্রিম এক দাগ। হ্যারিরটা কপালে হলেও হান্নানেরটা আছে, ইয়েহ মানে... পাছায়।
ফাও প্যাচালে বিভ্রান্ত হবেন না। লেখকের জবানিতেই এটা বাংলা সাহিত্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া নষ্ট একটি বই। নষ্ট বইয়ের রিভিউতে নষ্ট কথাই তো থাকবে, নাকি?
বইয়ের শুরু কিছু সতর্কতাবাণী দিয়ে। তবে একটা বিষয় লেখক এক্ষেত্রে উল্লেখ করেননি সেটা হলো- নর্স মিথলজি নিয়ে বিসিএস ক্যাডার লেভেল না হোক, অন্তত যদি প্রাথমিক জ্ঞান না থাকে, সেক্ষেত্রে এই বই হাতে না নেয়াই ভালো। দেখা গেল ক্যারেক্টারের খটমট নাম দেখেই ছুঁড়ে মেরে বউয়ের নাক ফাটিয়ে দিলেন (পয়েন্ট: অবসরের বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি মজবুত)। তারপর হামলা-মামলা খেলে লেখক-প্রকাশক দায়ী থাকবে না।
এরপর আসি অধ্যায়ের নাম নিয়ে। প্রতিটা অধ্যায়ের শিরোনাম হিসেবে লেখক জ্ঞানগর্ভ বাণী, উপদেশ, বিবেকের কাছে প্রশ্ন ইত্যাদি উল্লেখ করেছেন। ব্যাপারটা মজাদার।
কাহিনী সংক্ষেপ উল্লেখ করা জরুরী? করছি একটু। মামার জোরে চাকরি পাওয়া হান্নানকে ভাঙিয়ে খায় বাটপার বন্ধুরা। তবে আরেক বন্ধু পঞ্চম নেশাখোর হলেও এদিক থেকে ভালো। সদুপদেশ দিয়ে হান্নানকে বাঁচায় মাঝেমধ্যে। একদিন কড়া এক নেশার সন্ধান পেল পঞ্চম। 'ওয়াই' আনার জন্য হান্নানকে নিজের ভেসপায় নিয়ে রওনা দিল গাজীপুরের ঘন জঙ্গলে। কিন্তু সেখানে কী এমন হলো, যার ফলে পঞ্চমের কাটা তবে জীবিত মাথা নিয়ে ফিরে এল হান্নান? ড্রাগ ডিলার হেলাল আপা আসলে কে? এখন এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য কঠিন একটা কাজ করতে হবে বেচারাকে। বোতলে আটকাতে হবে একটা পরীকে। কিন্তু পরিচিত মহলে গাছবলদ হিসেবে পরিচিত হান্নান এই অসম্ভবকে সম্ভব করবে কীভাবে? সে তো আর জ্বলন্ত অলিল নয়। পথিমধ্যে পরিচয় হলো অন্য জগত থেকে আসা কিছু বন্ধুর সাথে। তাদের সাহায্যে হান্নান কি পারবে নিজে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পাশাপাশি প্রফেসি অনুযায়ী পুরো দুনিয়াকে র্যাগনোরকের হাত থেকে বাঁচাতে?
এবার একটু নিজস্ব বুলি কপচাই। বইটা পড়ার সময় বেশকিছু চরিত্রের দেখা পাবে পাঠক। নর্স মিথের ওডিন, বজ্রদেব থর, পাতালরাণী হেল ছাড়াও আছে অনেক দৈত্যদানো। আছে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সৃষ্ট দুই কালজয়ী চরিত্র গুপি গাইন-বাঘা গাইন। আছে ছোটবেলায় দেখা কার্টুন পাওয়ারপাফ গার্লসের সুপারভিলেন মোজো জোজো। আছে আমেরিকান সাই-ফাই সিরিজ রিক অ্যান্ড মর্টির পাগলা বিজ্ঞানী রিক। এসব চরিত্রের সাথে আগে থেকে পরিচয় থাকলে তো ভালো, না থাকলেও খুব একটা সমস্যা নেই। লেখার সাথে চরিত্রগুলোকে, বিশেষ করে নর্স মিথের কিছু গল্পকে লেখক এমনভাবে সিংক্রোনাইয করেছেন লেখক, তাকে বাহবা দিতে হবে। এছাড়া বইয়ের বেশকিছু চরিত্র বাস্তব থেকে নেয়া। তাদের চেনা থাকায় পড়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন ভিজুয়ালাইয করছি প্রতিটা কথা, প্রতিটা অঙ্গভঙ্গি। এক্ষেত্রেও লেখকের মুন্সিয়ানা লক্ষ্য করার মতো।
বইটা আমার হাতে আসে প্রকাশের আগে পাণ্ডুলিপি হিসেবে। ভেবেছিলাম বের হওয়ার আগেই পড়ে ফেলব। কিন্তু গল্পে মজে যাবার পর বুঝলাম, এই জিনিস পড়তে হবে আস্তে আস্তে-রসিয়ে রসিয়ে। জনরার ক্ষেত্রেও পড়ে গেছি কনফিউশনে। মিথলজিক্যাল, সাই-ফাই, ফ্যান্টাসি ইত্যাদি সাবজনরা ছাপিয়ে যে বিষয়টা বেশি নজর কাড়বে, তা হলো কমেডি। বর্তমান সময়ের প্রচলিত কিছু কৌতুক, ডায়লগ, ছড়া, গান ইত্যাদি খুব সুন্দরভাবে লেখক বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করেছেন। হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবার অবস্থা হচ্ছিল প্রায়ই। আপনারা পড়লে বুঝবেন। তবে হ্যাঁ, হিউমারসম্পন্ন লোক ছাড়া এসব ভালো লাগার কথা না।
ক্লাসিক সাহিত্য যাদের পছন্দ, সেসব সিরিয়াস পাঠকদের সাজেস্ট করব না আমি। তবে যারা লেখার মাঝে মজা খোঁজেন, তাদের জন্য সময় কাটানোর খুব ভালো একটা মাধ্যম হবে হান্নানের এই আখ্যান। পোস্ট অলরেডি খুব বড় হয়ে গেছে। আরেকটু সহ্য করেন ভাই।
রেহনুমা প্রসূনের আঁকা প্রচ্ছদটা চলনসই। তবে আরেকটু ভারী হতে পারত সম্ভবত। কালারটা প্রিন্টে দুর্দান্ত এসেছে। অবসরের প্রোডাকশন কোয়ালিটি জোশ। বই চাইলে ক্ষেপনাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
যাক গে, অনেক কথা বলে ফেললাম। রেটিং দেয়া জরুরী না। নষ্ট বইয়ের আবার রেটিং কীসের? এমনিতে দশে আট দিতাম। এ প্লাস। শুনেছি ট্রিলজি হবে। তবে তাই হোক।
এক নজরে, নষ্ট বইয়ের নষ্ট রিভিউ হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে লেখক- ওয়াসি আহমেদ অবসর প্রকাশনা সংস্থা পৃষ্ঠা- ২৪৮ দাম- ৩২৩ টাকা মাত্র(২৫% ছাড়ে)
এইটা কি ছিল!! পুরাই উরাধুরা আউলা বাউলা একটা বই। কখন যে কোথা থেকে কে পাঠকের সামনে ঝাপ দিয়ে পরবে কিচ্ছু বলা যায় না। কখনো বইয়ের ক্যারেক্টার, কখনো সিনেমার বা আবার কখনো কোন কার্টুন অথবা পুরাণের কোন দেব-দেবী আবার হয়তো বা রিয়েল লাইফের কেউ। উফফফ পুরাই লজিকহীন বিষয়-আশয়ের সমাগমে আনপ্রেডিক্টেবল একখানা বই। তবে কথা হচ্ছে পড়ে মজা পাইছি। (দাঁত কেলানো হাসির ইমো হবে)
প্রথমেই বলে রাখি, এই বইটা সম্বন্ধে সবার ধারণা এটা খুব ফিচলা ধর্মী একটি বই। ধারণাটা আংশিক সত্য। ফিচলামি এই বইয়ে আছে। আছে খুব উদ্ভট রকমের কিছু ক্রসওভার। প্রচ্ছদে বোতল ধরে থাকা লোকটার (ইনিই হান্নান, বইয়ের নামে দেখে বুঝে ফেলেছেন সবাই) পেছনে দেখা মেলে আরো চারটি চরিত্র। এরমধ্যে মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স অথবা তাদের কমিক্সের সাথে যারা পরিচিত তারা বজ্রদেবতা থরকে সহজেই চিনতে পেরেছেন। আরেকটু যারা খোঁজখবর রাখেন, তারা থরের বাবা ওডিনকেও চিনে ফেলেছেন। বাকি দুজনকেও চেনার কথা। একটা হিন্ট দেই: আমরা হলাম রাজার জামাই...জামাই! যাক, অনেক ফিচলামি হলো। এসব বলার কারণ হচ্ছে, এরা এই বইয়ের চরিত্র। এবং কেবল ছোটখাটো ক্যামিও দিয়ে দায়সারা চরিত্র নয়, রীতিমতো প্রয়োজনীয় চরিত্র। যারা লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে দুই এক পাতা পড়েছেন, তারা আন্দাজ করতে পারবেন না এদের অংশগ্রহণ। হাস্যরসের বাইরেও পুরাণের সাথে এই বইয়ের সংযোগটা হেলাফেলা করার মতো নয়। ব���টি আমার কেমন লেগেছে? ভালো লেগেছে৷ তবে অভূতপূর্ব কোনো কিছুর সাথে একটা ঝুঁকি রয়ে যায়। অনেকেই এই বইয়ের "কৃষ্ণরম্য" (বা ডার্ক কমেডি, লেখক ফিচলেমি করে "কালচে রসিকতা" বলে থাকে) হয়তো নিতে পারবেন না। স্কট পিলগ্রিম ভার্সেস দ্য ওয়ার্ল্ড (২০১০) বা টেনাশিয়াস ডি (২০০৬) ধরনের ছায়াছবি যারা উপভোগ করেছেন, তাদের কাছে দুর্দান্ত লাগবে। লেখকের গদ্য বলার জোরের সাথে তার গল্পগ্রন্থ "যে বাক্য অশ্রুত অন্ধকার"-এর মাধ্যমে পরিচিত ছিলাম, হান্নান বইটিতে এসে তার আরেকটা দিক আমার কাছে উন্মোচিত হলো। কাজটা লেখকের একধরনের গবেষণা ছিল। আমার কাছে গবেষণাটুকুকে সফলই মনে হয়েছে।
সাধারণ ঘটনাকেই মুখরোচক ভাবে তুলে আনতে পারলে লেখনীর গুণে সেটাই হয়ে ওঠে অসাধারণ। ঠিক এই কারণেই হয়তোবা হুমায়ূন আহমেদ এত জনপ্রিয়। আবার অদ্ভুতুড়ে-অবিশ্বাস্য ঘটনাকে রসালো ভঙ্গিমায় বর্ণনা করতে জানলে বইপড়ার অভিজ্ঞতাটা হয় মাখনের মধ্যে ধারালো ছুরি চালাবার মতো- মসৃণগতিতে পৃষ্ঠা উলটে যাওয়া যায়। যার প্রমাণ শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ। ওয়াসি আহমেদের হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে বইটি পড়বে দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে। মিথলজি-সায়েন্স ফিকশন-এডাল্ট কমেডি-ফ্যান্টাসি আর প্রচুর, প্রচুর ইস্টার এগের সমন্বয়ে লেখা খুবই উপভোগ্য বইটি।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ বইটা ১৮+ বলা যায়। আর ১৮+ মানেই অশালীন দৃশ্য সম্পন্ন, তা না। ভুল ভাববেন না।
আচ্ছা, কাহিনী নিয়ে কচকচ না করে কয়েকটা বিষয় নিয়ে কথা বলা যাক। প্রথমত, বাংলাদেশের থ্রিলার পাঠকগণ আরবান ফ্যান্টাসি, সাইফাই আর ক্রাইমভিত্তিক উপন্যাস পড়লেও ডার্ক কমেডি আর পশ্চিমা লেখকদের ভঙ্গিতে লিখিত পপ-কালচারাল রেফারেন্স সম্পন্ন বই পড়েছেন অল্প কয়েকটাই। যার মধ্যে বিভং, দুধ চা… এর নাম উল্লেখযোগ্য। এক্ষেত্রে হা বো প আ রা-কে বলা যায় এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ার্ক। কারণ এর মধ্যে লেখক যেমন ঢুকিয়েছেন ডার্ক কমেডি তেমনি বর্তমান সমাজে তরুণ সমাজে ব্যবহৃত কথা-বার্তা আর আচরণ, অসংখ্য ইস্টার এগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো বই জুড়েই; প্যারালাল ওয়ার্ল্ড ও কোয়ান্টাম মেকানিক্স থিওরি এবং অতি অবশ্যই- মিথলজি। কোন মিথলজিকে আশ্রয় করে লিখেছেন তা প্রচ্ছদ দেখলেই আন্দাজ করা যায়- এক চোখে পট্টি বাঁধা বৃদ্ধ, হাতুড়ি উদ্যত পালোয়ান…পরিচিত লাগছে না? আন্দাজ করুন। বইতে অনেক চরিত্রের দেখাই পাবেন যাদের দেখেছেন রূপালী পর্দায় কিংবা টিভিতে অথবা বইয়ের পাতায়। থ্রিলার পাঠকরা পরিচিত বেশ কিছু লেখক-অনুবাদকদের দেখা পাবেন। তাদের উপস্থিতি আর তাদের হাস্যকর কর্মকাণ্ড খিক খিক করে হাসতে বাধ্য করবেই। আর চোখ-কান খোলা থাকলে হো হো করেও হেসে উঠতে পারেন কিছু ক্ষেত্রে রেফারেন্স ধরতে পারলে। কারও কিংবা কোনোটারই নাম উল্লেখ করলাম না। স্পয়লার দিয়ে দিলে মজা নষ্ট। নিজেই খুঁজে নেবেন। দ্বিতীয়ত, যেকোনো এক্সপেরিমেন্টাল কাজেই ভয় থাকে নির্দিষ্ট কোনো একটা বিষয়কে ওভার ইউজড করার তথা ত্যানা পেঁচিয়ে ফেলবার। এক্ষেত্রে সেটা থেকে উৎরে গেছেন লেখক। কাহিনীর প্রয়োজনে পরিচিত-অপরিচিত একাধিক চরিত্রকে ভেঙে সাজিয়েছেন নিজের ইচ্ছানুযায়ী, তবে সেটা গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে রেখেই। অ্যাডাল্ট কমেডির নামে সারাক্ষণ ভাঁড়ামি চালাতে দেননি কাউকেই, লাগাম টেনে অবতীর্ণ করেছেন মিথলজিকাল লোর-এর কিংবা ঘুঁটনি নেড়ে সেখানে মিশিয়ে দিয়েছেন নিজের কল্পনাকে। বিজ্ঞানভিত্তিক অংশগুলোকেও মোটামুটি সহজবোধ্য ভাবে লিখেছেন যাতে সবাই বিষয়বস্তু ধরতে পারে। তৃতীয়ত, বইয়ের প্রচারণার সময়ই দেখেছি সাদামাটা ভাবে স্বীকার করতে যে এই বইয়ের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র বিনোদন দান করা। অন্তর্নিহিত কোনো সুগভীর উদ্দেশ্য আছে বা জীবন ঘনিষ্ঠ কিছু তত্ত্বকথা পাওয়া যাবে এই আশায় বই পড়তে হবে এরকম ভাবার কোনো কারণই নেই। পুরোটা সময় জুড়েই যা পাবেন তা হলো- নির্মল আনন্দ লাভ করা। ব্যস! আর একটা কথা, এই আনন্দ লাভ করতে গেলে একটা খটকা থেকে যেতে পারে সবার, এত ইস্টার এগ সম্পন্ন বই পড়তে হলে যে অনেক কিছু জেনে বসে থাকতে হবে! উঁহু! মিথলজিক্যাল ঘটনা ও চরিত্রসমূহদের সচিত্র পরিচিতি দেয়াই আছে বইয়ের শেষে বোনাস হিসেবে। এবার গৎবাঁধা কিছু কথা বলি, প্রোডাকশন কোয়ালিটির দিক দিয়ে বইটা মোটামুটি। বোর্ড, বাঁধাই আর জ্যাকেট খুব একটা ভাল লাগেনি। রেহনুমা প্রসূনের আঁকা চমৎকার প্রচ্ছদটি আরও ভাল কিছু ডিজার্ভ করে। বানান ভুল প্রায় নেই-ই। টাইপো আছে হাতেগোণা কয়েকটা। ওয়াসি আহমেদের লেখার ধরণ নিয়ে কিছু বলার দরকার দেখি না খুব একটা। বরাবরের মতো প্রাঞ্জল বর্ণনাভঙ্গিই আটকে রাখে পাঠককে বইতে।
খুঁত বের করার ইচ্ছা নিয়ে সাই-ফাই কিংবা ফ্যান্টাসি বই পড়তে বসলে পড়া এগোবার কথা না। সে সূত্র মেনেই হান্নানে খুব একটা দোষ-ত্রুটি পাইনি। তবে কিছু ঘটনা হান্নানের কাছে বর্ণনা করার সময় লম্বা মনোলগে পরিণত হয়েছে, সেটা একটু ভিন্ন ভাবে দেখাতে পারতেন লেখক। কারণ এই ব্যাপারটা কয়েকবার ঘটেছে। সেই সাথে পুরাণের কাহিনী গল্পে বর্ণনা করা সত্ত্বেও নির্ঘণ্ট অংশে আবার দেয়া হয়েছে, যেটার প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। এটা হান্নান ট্রিলজির প্রথম বই। ফেল্টু হান্নানের পাগলামিতে ভরা গল্প এখানেই শেষ না…
আর সবশেষে, একটা সদুপদেশ দিতে চাই- নেশা করবেন না। নেশা মস্তিষ্ককে ধ্বংস করে দেয়।
একই জগতে এতো এতো পরিচিত অপরিচিত চরিত্রের সংমিশ্রনে লিখা বই শেষ কবে পড়েছি খেয়াল নেই। চমৎকারভাবেই তউলে এনেছেন মজার সব চরিত্রকে। বন্দী করেছেন গল্পে। ভালো লেগেছে কিছু ডিপ মিনিং এর ইংগিত যা লুকিয়ে ছিলো কমেডির ফাঁকে ফাঁকে। ৯০ দশকের গান, কবিতা, বিজ্ঞাপনের রেফারেন্স ছিলো চমৎকার। উরাধুরা মজার লেখা পড়তে চাইলে এই বইটি পড়তে পারেন। বিস্তারিত জানতে এই ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন।
বইটি ১০০-১২০ পৃষ্ঠার মধ্যে রাখা হলে ভিন্ন ধাঁচের, ভিন্ন টেস্টের বই হিসেবে হয়তো ৪ তারকা দিয়ে দিতাম। কিন্তু এরকম স্টাইলের লেখা ২৪০ পেজ পর্যন্ত পড়ে যাওয়া - ইরিটেটিং! শুরুতে ভালোই লাগছিল, ১০০ পেজের পর থেকে বেশ ভালোরকম বিরক্তি চলে আসে। খুব কস্ট করে শেষ করতে হয়েছে।। যেকোনো বইকে ধরে অযথা টেনেটুনে বড় বানানোর বদঅভ্যাস থেকে আমরা কবে বের হয়ে আসব? :")
ডার্ক বা মানব প্রকৃতির অন্ধকার বিষয়/ ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। চাইলেই রহস্যঘেরা প্রচুর কাহিনী লেখা যায়। লেখা যায় রম্য- কিংবা এডভেঞ্চার কোন উপন্যাসও। 'হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে' ক্ষেত্র বিশেষে এই তিনটা জনরাকেই একইসাথে একটু একটু করে মিলিয়েছে। সাথে কিছু পপ রেফারেন্স এবং অতি আবশ্যক জাদু বাস্তবতাকেও মিলিয়েছে বেশ দক্ষতার সাথেই।
ওয়াসি আহমেদ এর লেখায় স্বভাব-সুলভ কিছু সাহিত্যনির্ভর ইনসাইড-জোক এবং রেফারেন্স বিদ্যমান। সেটা গল্পে বেশ বৈচিত্র্য এনেছে। পুরো লেখাটা বলতে গেলেই নিরীক্ষাধর্মী। কিছু ক্ষেত্রে এমন নিরীক্ষা অবশ্যই দরকার, কারণ এসবের মাধ্যমেই পাঠক নতুন কিছু খুঁজে পায়। সাসপেন্স রয়েছে, রয়েছে ব্যাঙ্গাত্মক সমাজের কিছু চিত্রায়ন (মামার জোরে চাকরি, পরী আটকে ধরার ভাষ্য, দুনিয়া ধ্বংসের মুখে [!] ইত্যাদি), রয়েছে উচ্ছন্নে যাওয়া তরুন সমাজের রূপক চিত্র আর সেই সাথে কিছু (অ) সামাজিক আলাপ। রয়েছে অদ্ভুতভাবে মেশানো নর্স মিথ-কিংবা আপাতদৃষ্টিতে গুপী-গাইন এর অভিযান! এসব নিয়েই মূল গল্প তবে চরিত্রায়ন এর চেয়ে এখানে লেখক উপস্থাপনা আর গল্পের বিভিন্ন এলিমেন্ট বা জনরার মিশ্রনের ব্যবহার করেই গল্প আগানোতে জোর দিয়েছেন। এটাও কিন্তু ফেলনা নয়। বরং উপভোগ্য লেগেছে। আগের বই এর চেয়ে বেশ পরিণত, বিশেষত গল্পের ড্রামাগুলোর চিত্রায়নে। তাই সব মিলিয়ে পাঠকদের জন্য ভিন্ন স্বাদের একটা উপভোগ্য বই হতে পারে হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে। লেখকের কাছে প্রশ্ন৷ এই একই ইউনিভার্স নিয়ে কি সিরিজ আগানো সম্ভব? কিছু ক্ষেত্রে কিন্তু সম্ভাবনা রয়েছে... নিরীক্ষাধর্মী বইয়ে রেটিং দেয়া শোভা পায় না। শুধু এটুকুই বকি, ভালো লেগেছে।
অবসর প্রকাশনার বই। যে কোন অনলাইন শপে খুঁজে পাবেন । দীর্ঘ লকডাউনের আগে সংগ্রহ করে রাখতে পারেন। সময়টা মন্দ কাটবে না আশা করি। মূদ্রিত মূল্য ৪৩০ টাকা।
বইটির প্রচ্ছদ থেকেঃ
চার-চারবার এইচএসসি পাশ করার ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে হাল ছেড়ে দিলো হান্নান। বর্তমানে সে একটি বহুজাতিক কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার, কারণ তার মামা সেই কোম্পানির কান্ট্রি হেড। অফিসের লোকজনের কাছে অবশ্য সে "মাস্টার্স ফ্রম ম্যানচেস্টার।"
হান্নানের ওঠাবসা সমাজের উঁচুশ্রেণীর ফাতরা ছেলেপিলের সাথে। সেই ফাতরা ছেলেপিলেদের একজনের নাম পঞ্চম।
পঞ্চম একদিন জানালো, গাজীপুর শালবন থেকে দুই কিলোমিটার দূরে একটা জায়গা আছে। সেখানে এমন এক বস্তু পাওয়া যায়, যা খেলে তুখোড় 'পিনিকের' সন্ধান মেলে। হান্নান দেরি না করে সেখানে চলে গেলো। তারপর ভীষণ ঝড়ের কবলে পড়ে ফিরে এলো পঞ্চমের লাশের কাটা মাথা সাথে নিয়ে।
ফেরার পর দেখা গেলো হান্নানের মামার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। হঠাৎ করেই বললেন, "তুই যদি কখনও বোতলে পরী আটকাতে পারিস, তবেই এই বিপদ থেকে মুক্তি পাবি। নাহলে সামনে ঘোর বিপদ।" এদিকে পঞ্চমের কাটা মাথা কথা বলতে শুরু করল। ভীষণ মেজাজ গরম ওর। তবে গালিগালাজ করেও সঠিক বুদ্ধি বাতলে দেয় বারবার।
নিরুপায় হান্নান উপায় খুঁজতে মাঝরাতে রাস্তায় নামল। সাথে পঞ্চমের কাটা মাথা, পেছনে পুলিশ এবং বারোটি হিংস্র কুকুর। শেষপর্যন্ত খোঁজ মিলল মগবাজারের এক সস্তা হোটেলের। সেখানে কবিগুরুর মতো চেহারার শামীম উদিন কাঁধে দুটো কাক নিয়ে ঘরে ঢুকে বললেন, "চমৎকার, ধরা যাক দু-একটা পরী এবার।"
পুরো পৃথিবী জুড়ে নেমে এসেছে চিরস্থায়ী সন্ধ্যা। পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে ভয়ঙ্কর এক শত্রু। হান্নান কি পারবে ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্রকে রুখে দিয়ে পৃথিবীকে রক্ষা করতে?
বইটি প্রচুর হাসিয়েছে পুরোটা সময়। অনেক কিছু পাবেন পুরো বইয়ে। নর্স মিথোলজি, ডার্ক কমেডি, ফ্যান্টাসি,ফিজিক্স, বাংলা সিনেমা, গান আরো বহু কিছু। কি নেই! প্লট টা বেশ ভাল। অনেক ডিটেইলড ও বলা চলে। লেখক বিভিন্ন চরিত্র কে এনেছেন এবং সেগুলোর ব্যখা শেষ অংশে পাওয়া যায়। এইকাজ টা বেশ ভাল হয়েছে। তবে বেশ কিছু জায়গা পড়ার সময় আমার খুব একটা ভাল লাগছিলো না। বিরক্তি ছিল। তাই রেটিং টা কমে গেলো আমার ক্ষেত্রে।