আমাদের ছাদের একপাশে তিনটা ঘর আরেক পাশে খোলা ছাদ। দুটো ঘরের পরে সিঁড়ির ঘর। দিনের বেলায় ছাদে হলুদ মরিচ ধনে শুকানো হলেও বিকেলের দিকে সব তুলে ফেলা হয়। ছাদ থাকে ঝকঝকে, পরিষ্কার। এখন চৈত্র্য মাস আর প্রচন্ড গরম পড়েছে। আমাদের ছাদটা আমাদের খুবই পছন্দের জায়গা। এখানে আমরা বৃষ্টিতে ভিজি, ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে পাটি বিছিয়ে সবাই একসাথে বসি। চৈতালি জোছনা রাতগুলো এই ছাদে রহস্যময় পরিবেশ তৈরী করে। মাথার উপর থালার মতো বিশাল একটা চাঁদ। চাঁদের নরম আলো যেনো অদৃশ্য সিঁড়ি বেয়ে খুব আস্তে নেমে আসে। পাশের বাগানের গাছপালার উপর এসে চাঁদের আলো থেমে যায়। সেখানে জমাট বাঁধে অন্ধকার। ছাদের উপর নরম আলোয় আলোকিত হয়।
বায়োগ্রাফি : শানজানা আলম লেখালেখির অভ্যাসটা পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে। বাবা অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। শানজানার মা করেন শিক্ষকতা। শানজানা গল্প বলেন, নিজের চারপাশের কথাগুলোই লিখে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করে চলেন অবিরাম। তার লেখার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, গল্প বলার সহজ-সাবলীল নিজস্ব ভঙ্গি। তার প্রকাশিত গ্রন্থ ‘এলাচিফুল’, ‘কুহুকথন’, ‘শঙ্খচিল’ প্রভৃতি বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। তার এক্সক্লুসিভ ইবুক ‘ফুলবউ’ প্রকাশ করেছে বইঘর। এটিও হয়েছে বেশ সমাদৃত। শানজানা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। এখন তাঁর সময় কাটে লেখালেখি করে ও একমাত্র কন্যা আফশীনকে নিয়ে। (source- boighor.com)
শানজানা আলমকে প্রবল গালিগালাজ করে আমি প্রায়ই উল্টায় দিই মূলত তার বাল্য বিবাহ ইনকারেজমেন্ট এর জন্য। যাই হোক দেখলাম তার উন্নতি হয়েছে, নায়িকাদের বিয়ার বয়স ১৪ থেকে উত্তীর্ণ হয়ে অবশেষে ১৯ এ এসে ঠেকেছে। স্লো প্রগ্রেস বাট ওকে!
তবে এই বইটা আরাম আরাম একটা বই। এমন কোনো ডিপ বই না যা মনে অন্তর মস্তিষ্ক এক্কেবারে আউট হয়ে যাবে তা না। বইটা এলাচি নাম্নী এক বালিকার নিতান্তই ছেলেমানুষী ডায়েরী বলা চলে। গ্রামের এক অবস্থাসম্পন্ন কিশোরীর চোখে তার জীবন। বইটি পড়তে পড়তে চোখে ভাসে এক হিজলতলী গ্রাম, নাকে আসে খড়ের গন্ধ, এক গ্রামীন জীবনের নিত্য সাধারন পটভূমি।
বহুদিন পর হুমায়ুন আহমেদের বইয়ের একটা ফ্লেভার পেলাম, শীতকালে প্রিয় লেপ যেমন জড়িয়ে রেখে আরামদায়ক উষ্ণতা ও আলস্য যেই, এলাচিফুল বইটা তেমনই আরাম। হালকা রিডের জন্য চমৎকার! মজার বিষয় হলো, মনে হয়নি লেখিকা হুমায়ুন আহমেদকে ইমিটেট করেছেন। স্রেফ মনে যা এসেছে, লিখে গেছেন। এতেই বইটি চমৎকার হয়েছে। ❤️
আমার লাস্ট এমন অনুভূতি হয়েছিলো "এইসব দিনরাত্রি" পড়ার পরে। কিছু কিছু বই থাকেনা শেষ হওয়ার পর মনে হয় ইশশ্ যদি শেষ না হতো! এটা তেমন একটা বই...
গ্রামের সাধারণ এক মেয়ে সাবরিন জান্নাত। ডাকনাম এলাচি। ফেসবুক নাম এলাচি ফুল। নিজের পরিবারের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ঝগড়া-বিবাদ এসব নিয়ে এলাচির বয়ানে পুরো বই। পড়তে পড়তে নিজের কথাই মনে হচ্ছিলো। এই যে সময়কে আটকে রাখার এতো চেষ্টা, কত কসরত দিনশেষে লাভ কি? কোনকিছুকে কি কখনো আঁকড়ে ধরে থাকা যায়? পড়ার সময় বারবার মনে হবে কারো জন্য তো কিছু থেমে থাকেনি, থাকবেওনা। তবুও কেনো যে সেই কেউ একজন, কিছু একটার জন্যই আমাদের জন্মের অপেক্ষা। পড়তে পড়তে বুক ভার হবে, চোখে পানি জমবে। তারপরে দপ করে বই বন্ধ করে আবারো যান্ত্রিক জীবনে পুনঃপ্রবেশ...
জীবনে কোনদিন আমার গল্প লেখলেও শুরুটা এমনই হবে... এটা আমারই গল্প। আমরাই এটার কুশীলব। শুধু শেষটা গল্পের মতো হবেনা। রোবটিক নাগরিক জীবনের শেষটা কখনো গল্পের মতো হয়না।
বইকে কি কিউট বলা যায়? তার চেয়ে বরং "মিষ্টি" বলি। অনেক মায়াভরা, মন কেমন করা সব ঘটনা ঘটতে থাকে এলাচির পরিবারে। যৌথ পরিবারে অনেক কাজ, নানা রকম ঝুটঝামেলা। আবার সবার সাথে সবার আত্মার বন্ধন হৃদয়কে স্পর্শ করতে বাধ্য। এলাচির মায়ের চরিত্রটি খুব সুন্দর, একদম গ্রাম বাংলার আদর্শ মা যাকে বলে। আরো ভালো লাগবে এলাচির ছোট চাচিকে। সবশেষে এলাচির জন্য আফসোস হবে... আহারে!
এবারের বইমেলায় লেখিকার অটোগ্রাফ সহ কিনে আনা বই এটা। আমার বেশ লেগেছে। বাকিদেরকেও পড়তে সাজেশন দিবো।
ছোটচাচী ফুলটা ধরে বললেন" এই ফুলের নাম জানিস না এলাচি? এটা ভাঁটফুল, জীবনানন্দ এই ফুল ইন্দ্রসভায় নৃত্যরত বেহুলার পায়ে জড়িয়েছেন তার কল্পনায়, কি সুন্দর লিখেছেন, 'বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো কেঁদেছিল তার পায়ে" এই ফুলের আরেকটা নাম আছে জানিস, ঘন্টাকর্ণ। তুই চিনিসই না! জীবনের আনন্দ গুলো এই ভাঁটফুলের মতো, হাতের এতো কাছে, চোখের সামনে অথচ আমরা তাকে চিনিই না! "
এলাচিফুল বইটা মূলত এলাচির জীবনের গল্প। একটা সুন্দর সাজানো গোছানো জীবন, যে জীবনে ভালোবাসার কমতি নেই সেই জীবনের গল্প। কিন্তু জীবন সব সময় এক রকম চলে না হঠাৎ করে পাল্টে যায় সাজানো গোছানো সব কিছু, যেন মুহূর্তেই লন্ড ভন্ড হয়ে যায়। কোন এক কালবৈশাখী ঝড় এলোমেলো করে দেয় সব। এলাচির জীবনও তেমন সহজ শান্ত নদীর মতো বয়ে চলা জীবন যেন হঠাৎ করেই ঝড়ের কবলে পড়ে অশান্ত হয়ে গেল। সুখ দুঃখ নিয়েই মানুষের জীবন এলাচির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এলাচির জীবনে সব কিছু সুন্দর মতো চলছিলো। যৌথ পরিবারের সবাই মিলেমিশে বসবাস, সুখের কোন কমতি ছিল না । সবাই আনন্দ হইহই করে জীবনটা উপভোগ করছিল। লবঙ্গ, এলাচি, জাফরান তিনবোন তাদের পরিবারে আরও আছে ছোট চাচি,ছোটচাচা, এলাচির মা, বাবা, মনজু ভাই, বড় চাচা সবার জীবনের ভিন্ন ভিন্ন গল্প নিয়েই মূলত এলাচিফুল । এলাচি নবম শ্রেণিতে পড়ে তার রঙিন জীবনের শুরু সবে। এরই মধ্যে তার জীবনে নানা রকমের ঝামেলা শুরু হয়। অন্যদিকে এলাচি পলাশ ভাইকে পছন্দ করেও তা প্রকাশ করতে পারে না, পলাশ ভাই তাকে পছদের কথা বলার পরও সে পলাশ ভাইকে ফিরিয়ে দেয়। গড়ার আগেই ভেঙে যায় যেন এক ভালোবাসার গল্প। জীবনের অনেক রকম টানা পোড়ন নিয়েই "এলাচিফুল"।
লেখক শানজানা আলমের লেখা এর আগে কখনো পড়া হয়নি। " এলাচিফুল " দিয়ে লেখকের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। বইয়ের প্রথম দিকে গ্রামের সাধারণ একান্নবর্তী পরিবারের গল্প দিয়ে শুরু হলেও সামনে যত আগাচ্ছিল ততই চমৎকার লাগছিল পড়তে। একান্নবর্তী পরিবারের প্রতিটি মানুষের জীবনের সুখ দুঃখের গল্প, পাওয়া না পাওয়ার গল্প খুব সুন্দর ভাবে ফুরিয়ে তুলেছেন লেখক। আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে লেখকের প্রকৃতি বর্ণনা কি সুন্দর করে প্রকৃতির প্রতিটি জিনিসের সাথে পাঠকদের পরিচিয় করিয়ে দিচ্ছিল লেখক ।যেন চোখের সামনে আমি সব দেখতে পারছি। আমি যেন এলাচির জায়গায় নিজেকে কল্পনা করছিলাম। শেষের দিকটা মনের কোণে কেমন যেন একটা বিষাদময়তা নিয়ে শেষ করেছি। মনে হয়েছে এলাচির সাথে এমন না হলেও পারতো প্রথমের মতো সব যদি সুন্দর সাজানো - গোছানো থাকতো। সাধারণ গল্প অসাধারণতা দিয়ে শেষ হয়েছে। বেশ ভালো সময় কেটেছে "এলাচি ফুলের সাথে।