পয়লা বৈশাখের সন্ধ্যেবেলায় সমস্ত নীরবতাকে এক ধাক্কায় ভেঙ্গেচুরে সুরেলা কণ্ঠের মোহিনী গেয়ে ওঠে, "নেশা লাগিল রে, বাঁকা দুই নয়নে নেশা লাগিল রে…"
মোহিনীর গান যেন প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে চেয়ারম্যানের ছেলে সৌরভের বুকেও….; একখণ্ড "বাংলাদেশ" নিয়ে লড়তে গিয়ে কবে, কখন স্বাধীনচেতা শবনম ভীরু দিগন্তের প্রেমে পড়ে যায়, সে জানে না; আবার অত্যন্ত সুপুরুষ শরিফের গলায় গলা মিলিয়ে হিম-রক্তের পরমেশ্বরীরা বলে ওঠে- 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!"
বাপ-বেটির আবেগের কথা বলে "বাবা" গল্পটি; জীবন রহস্য উদঘাটনে বেরিয়ে পড়েন জেকের সাহেব, সাইম-আশরাফরা; আবার, গানের ম্যামের হাত ধরে নতুন করে বাঁচতে শেখে-শানিন, লাবণী, মৌ; অন্ধকার জগতে ছুটে চলা আশিক জানে না, চাইলেও লাবণ্যদের হাত ধরে কেন আলোর পথে ফেরা যায় না; 'বোকার হদ্দ' সুবোধটাও কি জানত, বুড়ো বয়সে প্রেমে পড়ে বোধশক্তিই হারিয়ে বসবে ও…?
এমনই সব গল্পের ঝুলি উপুড় করে বইটি "টুপ" করে কখন আপনার পাশে বসে পড়বে, নিজেও টের পাবেন না…..!
"নেশা লাগিল রে" বইটা মূলত গল্প সংকলন। ছোট খাটো সুগভীর মোট ১১ টা গল্প নিয়ে বইটি। নবীন লেখিকা 'শান্তা নাজনীন' তার লিখনীর দক্ষতায় খুব সুনিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন গল্প গুলোর পটভূমি। প্রতিটি গল্পেই অতীতের ঘটনার সাথে রেশ মিলিয়ে বর্তমান তুলে আনা হয়েছে। যা গল্প পড়ার ক্ষেত্রে পাঠক কে অগ্রসর করে। আমার সর্বশেষ "বাবা" গল্পটা বেশ ভালো লেগেছে। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে বইয়ের উৎসর্গ অংশ টুকু।
ছোটগল্প লেখা খুব কঠিন একটা কাজ। অল্প পরিসরে চরিত্রের বুনন, গল্পের ডেভেলপমেন্ট এসব করাটা মোটেও সহজ কাজ নয়। কিন্তু নবীন এই লেখক তার প্রথম বইতেই বেশ দক্ষতার সাথে এসব করে দেখিয়েছে। লেখকের লেখার ধরণে হৃদয়ে গেথে যাওয়ার মতো। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ বা ভাষা আন্দোলনের প্লটে লেখা তার গল্পগুলো তো অসাধারণ। সব মিলিয়ে চমৎকার একটা বই।
আমার পছন্দের মানুষের বই বলেই অর্ডার করেছিলাম। তবে এযাবত কালে যতগুলো বই পড়েছি তার মধ্যে সেরা একটি বই। ভালোবাসার শান্তা আপু আপনার জন্য অনেক শুভকামনা রইল। ❤️❤️❤️
বিভিন্ন ঘরানার ছোট্ট কিন্তু সুগভীর জীবনবোধসম্পন্ন এগারোটি গল্পের ডালি সাজিয়ে নবীন লেখক শান্তা নাজনীন পাঠকদের তরে তাঁর প্রথম বই "নেশা লাগিল রে" নিবেদন করেছেন।
বইটির নামগল্প "নেশা লাগিল রে" গ্রামের চেয়ারম্যানের ছেলে সৌরভ এবং অভাবের সংসারে হাল ধরা মাহবুবা নামের এক কিন্নরীর সমাজের তথাকথিত নিয়মের বেড়াজাল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার গল্প, যেখানে শেষ পর্যন্ত মোহিনীর মোহময়ী কন্ঠের জয়গান ধ্বনিত হয় সমাজের সেই নীতিসর্বস্ব মানুষদেরই প্রাণে।
"আঁধারের ইতিকথা" গল্পটি শোনায় রক্তের সম্পর্ক ছাড়িয়ে আত্মিক সম্পর্কের দুই ভাইয়ের গল্প, যেখানে অতীতের সব কালিমা মুছে একসময়ের আঁধারে হারিয়ে যাওয়া দুটি প্রাণ আবার একত্র হয় নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে। বইয়ের তৃতীয় গল্প "গানের ওপারে" মূলত স্মৃতিকাতরতার আড়ালে একজন গানের শিক্ষিকা ও তার তিন শিক্ষার্থীর জীবনের গল্প দিয়ে সাজানো, যে গল্পে সংগ্রাম করে জীবনে জয়ী হওয়ার শিক্ষা যেমন আছে, তেমনই আছে সময়ের স্রোতে এককালের অতি যত্নে গড়ে তোলা সম্পর্কে চিড় ধরার আক্ষেপের কথা।
"যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং হৃদয়ং মম" নামটি পড়ে বেশ ভারিক্কি আমেজের গল্প বলে মনে হলেও গল্পটি মূলত বাকশক্তিবিহীন রূপবতী মধুমিতার জন্য চিরকুমার হয়ে থাকার পণ নেয়া সুবোধের বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলার মিষ্টিমধুর এক আখ্যান, যার হাস্যরসাত্মক সমাপ্তি এক নিমিষেই মন ভালো করে দেয়। "বুকের বা'পাশে" গল্পটির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় অন্ধকার জগত থেকে আলোর পথে ফিরতে না পারার নির্মম সত্য।
"বিজয়ের গান" গল্পটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে এক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মেয়ে শবনমের ভীরু, কাপুরুষ দিগন্তকে হারিয়ে ফেলার গল্প, যে গল্প জানান দেয় একমুহুর্তের অবহেলাই দুটো মানুষের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব সৃষ্টি করে দিতে পারে, যেখানে সত্যটা রয়ে যায় অধরা, উপেক্ষিত।
"নির্ভরতার হাত" গল্পটি শেষ বয়সে এসে দুটো মানুষের একে অপরের ভরসা হয়ে ওঠার গল্প, যেখানে সন্তানদের স্বার্থপরতার নিষ্ঠুর সম্পর্কের সমান্তরালে সন্তান না হয়েও অসামান্য মমতার গাঁথুনীর মধ্য দিয়ে সন্তানাধিক হয়ে ওঠার সম্পর্ক রচিত হয়েছে ।
"সম্পত্তি" গল্পটি সময়ের প্রতিশোধ নেবার গল্প, ইহজীবনেই পাপের শাস্তির দহনে ক্ষতবিক্ষত হওয়া এক নারীর করুণ পরিণতির গল্প। নির্ভীক দেশপ্রেমিক শরীফের একাগ্রতায় অনুপ্রাণিত হয়ে পারিবারিক সংকীর্ণতাকে ছাপিয়ে গিয়ে পরমেশ্বরীর দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে রচিত হয়েছে "ফাগুনের দিন" গল্পটি।
খানিকটা ভৌতিক রহস্যে আবৃত "জেকের সাহেব ও তার সঙ্গী" গল্পটি শেষ পর্যন্ত যেন গল্পের ছলে যান্ত্রিক জীবনে অবসরের গুরুত্বটাই বুঝিয়ে দেয়। সবশেষে "বাবা" গল্পটি শোনায় কন্যা হারানো এক বাবার পিতৃসুখ প্রাপ্তির এবং পিতৃপরিচয়বিহীন এক মেয়ের ‘বাবা’-র স্বপ্নপূরণের সৌভাগ্য অর্জনের গল্প। জীবনের নানা বাজে অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে 'পুঁটি' থেকে 'পূর্বাশা'-র লেখক হয়ে ওঠার সুন্দর সমাপ্তি নিয়ে গল্পটি এক অদ্ভুত তৃপ্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে, ইতি টেনেছে " নেশা লাগিল রে" বইটির।
✳️পাঠ প্রতিক্রিয়া:
"নেশা লাগিল রে" বইটির প্রতিটি গল্পের মধ্য দিয়ে আমাদের জীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। বইটির গল্পগুলোকে পটভূমির বিচারে খুব সাধারণ মনে হলেও এই সাধারণ ঘটনাগুলোকে লেখক তাঁর অসাধারণ লেখনশৈলীর মধ্য দিয়ে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। প্রতিটি গল্পের বর্ণনার ভঙ্গি ছিল অনন্য। বইটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল চরিত্রগুলোর পাবনার ভাষায় কথোপকথন। আঞ্চলিক ভাষার সাবলীল ব্যবহার গল্পগুলোতে অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। "গানের ওপারে " গল্পে শাহনেওয়াজ ম্যাম এবং লাবণী আফরোজ, "বিজয়ের গান" গল্পে শবনম, "নির্ভরতার হাত" গল্পে খোকা এবং তার খালু্জান, "ফাগুনের দিন" গল্পে পরমেশ্বরী এবং সবশেষে "বাবা" গল্পে পূর্বাশার চরিত্রায়ণে বেশ যত্নের ছাপ পাওয়া যায়। অন্যদিকে "আঁধারের ইতিকথা" গল্পে রুকু কিংবা "জেকের সাহেব ও তার সঙ্গী" গল্পে মোজাম্মেল আলীর চরিত্রায়ণ আরেকটু বিস্তৃত হলে ভালো হতো মনে হয়েছে।
বইয়ের প্রত্যেকটি গল্পে লেখক তাঁর অসামান্য দক্ষতায় অতীতের কাহিনীর সাথে বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছেন। এক্ষেত্রে মোহিনীর সাথে সৌরভের প্রথম দেখা হওয়া কিংবা শানিনের প্রথমবারের মতো শাহনেওয়াজ ম্যামের বাড়িতে যাওয়া, প্রতিটি ক্ষেত্রেই পূর্বের ঘটনার রেশ ধরে বর্তমানের সাথে যোগসূত্র স্থাপনের বর্ণনাভঙ্গি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সবগুলো গল্পের মধ্যে "গানের ওপারে," "বিজয়ের গান, " "ফাগুনের দিন" এবং "বাবা" এই চারটি গল্প আমার বেশি ভালো লেগেছে। আর সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে বইয়ের শুরুতে “উৎসর্গ” এবং “গল্পের পেছনের গল্প” - এই অংশ দুটো।