উপন্যাসের মূল চরিত্র ক্লাস ওয়ানে পড়ে। আমি যখন স্যারের লেখায় বুঁদ হতে শিখছি সবে, তখন ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। স্যারের উপন্যাসের চরিত্ররা তখন সব হাইস্কুলের সায়েন্স প্রোজেক্টে ভেলকি দেখানো লোকজন। মনে আছে, খালি ভাবতাম, কবে ক্লাস সেভেনে উঠব! বড় হয়ে যাব এদের মতো! এখন, যেমন তাঁর নতুন বেশিরভাগ চরিত্রই ক্লাস ওয়ান বা বড়জোর ক্লাস ফোর ফাইভে পড়ে। এখন আবার পড়ে মনে হয়, ইশ, যদি আবার এদের সমান হয়ে যেতে পারতাম! জীবন কতো সহজ আর মজার হয়ে যেতো!
আমার মুজাইয়ের নতুন পাঠকদের খুব হিংসা হয়। কারন, স্যার যা বুঝলাম, হাই স্কুলের পাঠকদের জন্য অনেক লিখে এখন আরো কম বয়সেই যাতে কেউ পাঠক হয়ে যায়, সেদিকে মনোযোগ দিয়েছেন। আমার সময়ে এদের কথা ভেবে লিখতেন না বলেই, এই হিংসা! আগেও কোন এক রিভিউতেই লিখেছিলাম, যে না, যারা আমরা স্যারের বই পড়ে পাঠক হয়েছি, তাদের অভিযোগ নিয়ে তিনি ভাবিত হয়ে তাদেরকে, অর্থাৎ আমাদের কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে লিখছেন না। তিনি লিখেছেন, লিখেন এবং আমি জানি সবসময়ে নতুন নতুন পাঠক তৈরি করতেই লিখবেন। আর একারনেই, এরকম একটা অতুলনীয় উদ্দেশ্যের জন্যই তিনি বাংলাদেশের এই মুহুর্তে শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে জরুরী লেখক। যাঁর পান্ডিত্য নিয়ে জনমনে সন্দেহ নেই, তিনিই মনে হয় পারেন তা ফলাতে এতো অনিচ্ছুক হতে। আর আমার ধারণা, তাই তিনি ‘স্যার আগের মতো লিখেন না’ এরকম কথার বিপরীতে পুরোপুরি নির্বিকার।
‘বন বালিকা’ এ বালিকার নাম মিতুল। সে পশুপাখিদের কথা বোঝে আর তাদের সাথে সেও কথা বলে। সে আর তার মা থাকে সুন্দরবনের কাছেই এক গ্রামে। উপন্যাসে পশুপাখিদের ভাষার উপর যে খুব দখল, এমনটি স্যার দেখান নি। বরং, এখানে পশুপাখিরা অনেক সরল ও শিশুদের মতোই আধো আধো বুলিতে কথা বলে, এটাই আমরা দেখি। ওদিকে মিতুলের বাবা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জেল হাজত খাটছেন। এসব ঝামেলার মধ্যে অভাবের সংসারে মিতুলকে নিয়েও তার মায়ের অনেক ভয়। কারন, সে যে পশুপাখিদের সাথে কথা-টথা বলে, এ বিষয়টি ফাঁস হলে মেয়েটা যে বিপদে পড়বে। ঘটনাক্রমে, দুই ধরনের লোভী মানুষদের কাছে মিতুলের এই গুন প্রকাশ পেয়ে যায়। এরপর কি হয়, তা নিয়েই গল্পের বাকিটা এগোয়। গরুর লড়াইয়ের অংশটা পড়ে মজা পেয়েছি। এক বাঘের সাথে মিতুলের দোস্তির কারনে শেষটাও খুব সুন্দর মনে হয়েছে। সব মিলিয়ে ছোটদের জন্য তাদের ছোটবেলা স্মরনীয় করে রাখার মতো একটা বই পড়ে শেষ করেছি, মনে হল।
সাদা চামড়ার লোকেদের প্রতি আমাদের দরকারের চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা। সেটা যে নিজেদের নিয়ে হীনমন্যতা থেকেই আসে, সেই বিষয়টি ঘটনার ফাঁকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন এখানে আমার প্রিয় লেখক। আর ছোট একটা মানুষকে তিনি বড়দের লোভ লালসার মাঝে ছেড়ে দিয়ে এও দেখান যে আসলে, সহজ মনের ছোট মানুষগুলোর সাথে মেশার যোগ্যতা চারপেয়ে প্রানী আর পাখাওয়ালাদেরই বেশি! কারন, আমরা বড় হয়ে তো সহজ কিছুর প্রতি আর আকৃষ্ট হই না, আর আরো বড় হতে চেয়ে মিতুলদের সাথেও আর মিশতে পারি না। এদিকে অবলা প্রাণীরা শুধু যে এখানে মিতুলের বন্ধু হয় তা না, তার ত্রাতাও হয়।
এদিকে, দেখতে তো পাচ্ছি সবাই যে মানুষের প্রতি মানুষের দয়ামায়া যেমন কমছে, তেমনি কমছে পশুপাখির প্রতি। সেদিন এক কাছের মানুষ দুদিন গায়েব ছিল, ফোন ধরে না। পরে শুনলাম, রাস্তার যেই বিড়ালটাকে মাঝে মাঝে খেতে দিত, কে বা কারা তার পা গুলো কেটে দেওয়ায় সে দুই দি��� তাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল। শুনে মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দ্বিগুন হয়ে গিয়েছিল সেদিন। আবার এক বন্ধুর বাচ্চার বয়েস এখনো এক হয় নি, সে তার মাকে পাগল বানিয়ে দেয় বাসার সামনে আসা কুকুরকে একটু বিস্কুটা দেবার জন্য। বন্ধু সেটি করলেই বাচ্চা শান্ত হয়। এই যে ছোট মানুষটাকে পশুপাখির প্রতি ভালোবাসায় উৎসাহিত করা হচ্ছে, এতে আশা করা যায় যে কোনদিন সে অন্তত ‘বন বালিকা’ এর ভিলেনের মতো কাক মেরে বসবে না বা বাস্তবের অচেনা অসভ্য কোন লোকের মতো বিড়ালের পা কেটে বসবে না। আর সেই বোধ তৈরির দায়িত্ব থেকেই সুন্দর এই উপন্যাসটা লেখা। হ্যা, ছোট একটা মানুষ বইটি পড়লে তার মধ্যে পশুপাখির প্রতি মমত্ববোধ তৈরি হবে, আমাদের যেমন, ‘বকুলাপ্পু’ পড়ে হয়েছিল।
এই বই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়। যেমন, ‘প্রোজেক্ট আকাশলীন’ও ছিল না। কেন স্যারের বইগুলোর মলাটে বারবার এই কথা লিখছে ‘তাম্রলিপি’ আমি আসলে বুঝতে পারছি না। বই তো ওনার এমনিও বিক্রি হয়। এরকম সম্ভাব্য পাঠককে ভুল পথে নিয়ে কয়টা বই বেশি বিক্রি করার ইচ্ছা থেকে এই প্রকাশনী বের হয়ে আসলে তাদের লজ্জায় পড়তে হয় না। লেখক হিসেবে মুজাইকে আরেকটু সম্মান দেখাতে এদের এতো অনীহা কেন কে জানে।
আমি মনে প্রাণে চাই, স্যার এখন যেভাবে লিখছেন, সেভাবেই লিখতে থাকুক। আমাদের জন্য তো অনেক লিখেছেন। যাদের জন্য লেখার কেউ নাই, যাদের উপর আমরা সুযোগ পেলেই নানা কিছু চাপিয়ে দেই ও যাদেরকে মারধর করে ‘বাচ্চা শাসন করা’ দেখাই, তাদের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো লেখকদের একজন সমানে লিখে যাচ্ছেন, এটা ভাবলে পাঠক হিসেবে নিজেকে নিয়ে একটা তৃপ্তি আসে। আর আমি এই তৃপ্তি স্যারের আগামী সব বই পড়েও পেতে চাই। আমি চাই না স্যার ‘আগের মতো ভালো’ লিখুক।