ইউরোপ যখন কাপড় পরতে শিখেছে এই বাংলার জনপদ তখন মসলিন রপ্তানিতে জগতবিখ্যাত। বাংলার অলিতে গলিতে গড়ে উঠা অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল তখন ইউরোপীয় রেনেসাঁসের, রয়েল সোসাইটির কোন অস্তিত্বই ছিল না। যখন বাংলার অর্থায়নে সুদূর মক্কা শরীফে নির্মিত হয়েছিল ‘বাব-ই উম্মে-হানি’ নামক মাদরাসা, হাজীদের পানির কষ্ট দূর করতে খনন করা হয়েছিল সুবিশাল খাল তখন এই বাংলার মানুষের উদারতায় পৃথিবীর আকাশ বাতাস ছিল মুখরিত। যখন এই বাংলায় ১ টাকায় ৮ মণ চাল, ২ টাকায় ১৫ গজ সুতি কাপড়, ৩ টাকায় একটি গাভী কিনতে পাওয়া যেত; তখন এই বাংলার মানুষের আধ্যাত্মিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা মুহাম্মদ আল মাসুমুদি, ইবনে বতুতাদের মতো বিশ্ববিখ্যাত পর্যটকদের মুখে মুখে শোনা যেত। ৬১০ সালের ২১ শে রমাদান মক্কার হেরা গুহা থেকে নবুওয়তের সেই শাশ্বত বাণী কিভাবে এই বাংলার সহজ সরল জনপদের মানুষ গুলোকে বদলে দিল? কে বা কারা ঐক্যবদ্ধ করলো এই ছোট ছোট জনপদ গুলোকে? কিভাবে এই বাংলা, বাঙালির হয়ে উঠলো? সাম্প্রদায়িকতার কালো থাবা থেকে কে বা কাদের হাজারো ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হলো আজকের এই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ? পনেরো শতকে লেখা একটি চিঠি কিভাবে এই বাংলার মুসলিম জাতিসত্তাকে খাঁদের কিনারা থেকে অতল গহব্বরে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করলো? এ সব কিছু নিয়ে মুসা আল হাফিজের লেখা ফোয়ারা প্রকাশনীর অনবদ্য একটি বই ‘শতাব্দীর চিঠি’।
বইটি মহান নুর কুতুবুল আলমকে ঘিরে রচনা করা। তার সাথে গণেশের এর দ্বন্দ্ব। নুর কুতুবুল আলম আর গণেশকে কেন্দ্র করে একেকটা চরিত্র ফুটে উঠে।
এই বাংলায় মুসলিম আগমণ আর সে সাথে অসাম্প্রদায়িক বাংলার প্রতিষ্ঠা, পুরো বাংলাকে একত্র করা, দীর্ঘ সময়ের শোষণ থেকে রক্ষা পাওয়া সাধারণ মানুষের আনন্দ।
গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের ন্যায়-নীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটা আদর্শ। উনার উপদেষ্টাই ছিলেন গণেশ। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ অসাম্প্রদায়িক বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর, কিন্তু বুঝতেই পারেন নি গণেশ তার সাথে এমন আচরণ করবে, সাম্প্রদায়িকতার পতাকা তুলে নির্বিচারে অত্যাচার করবে বাঙালির।
পুরো বইটি জুড়েই এই বাংলাই, ইসলাম ধর্মের মানুষের মন জয় করার এক দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে। পীর, ফকিররা; যাদের কাছে সকল ক্ষমতা এসে লুটে পড়ত, উনারা সেখানে সাধারণের সেবাই ছিলেন একাগ্র। তাদের কৌশলে ছিল কীভাবে বাংলার মানুষদের কল্যাণ হয়। তাই উনারা সাবধানে পথ চলেন কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যেন না হয়, যেখানে জানতেন শত্রু প্রকাশ্য।