আলভী ভাইকে নিয়ে এটা আমার দ্বিতীয় লেখা । ইতিমধ্যেই হয়তো অনেকেই জানেন ( আবার বেশিরভাগই জানেন না) আলভী ভাই একজন তুখোড় ছোটোগল্প লেখক ও ‘মুরাকামি স্পেশালিস্ট’ অনুবাদক । তাঁর ছোটোগল্প নাকি অনুবাদ এই দুইটি থেকে একটি বেছে নিতে বলা হলে যারা দুটিই পড়েছেন তাদের নিঃসন্দেহে দুইদিন দ্বিধায় কাটবে । অবশেষে আমার মতো কিছু ক্ষুদ্র পাঠকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে লেখক নিয়ে এলেন নিজের প্রথম মৌলিক উপন্যাস ‘জীবন অপেরা’
• প্রকাশকঃ বাতিঘর
• মুদ্রিত মুল্যঃ ৩৬০
• পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৮৮
• প্রথম প্রকাশঃ মার্চ ,২০২১
কিছুক্ষন আগেই আমি বইটি পড়ে শেষ করলাম । বইটা কিছুটা অদ্ভুত । অবশ্য প্যারালাল ইয়্যুনিভার্স নিয়ে যে কোনো লেখা পরার সময়ই কমবেশি এই অদ্ভুত ফিলিংসটা আসে । প্রথম যে সমস্যায় আমি ভুগি সেটা হলো ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’। বইটা পড়ার সময় অনেকবার সম্মুখীন হয়েছি আমি কে , কোথায় আছিসহ আরও অসংখ্য প্রশ্নের।
প্লটঃ
‘জীবন অপেরা’ থেকে আমি এখন একজন রফিকের গল্প বলবো। যে এক ইয়্যুনিভার্সে একজন কবি । যে বুকের মধ্যে কষ্ট জমাতে জমাতে অসুখ বাধিয়ে ফেলে । যে ভাবে ,এ ধরণের দুঃখ মনে থাকলে মানুষ খুব ক্রিয়েটিভ কিছু একটা হয়ে ওঠে । পর্তুগীজ ভাষায় একে বলে ‘Saudade’ ( সওদাজ ,যার বাংলা করলে মোটামুটি অর্থ দাঁড়ায় –দুঃখবিলাস)
বলছিলাম রফিকের কথা । আধপোড়া এই কবির সমস্যা হচ্ছে সবকিছু স্বাভাবিকের চেয়ে একটু দেরিতে বুঝতে পারে । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অঘোষিত, অপ্রস্তাবিত কিন্তু আকাঙ্খিত তরুণী শারমিনকে যে সে ভালোবাসে ,সেটা বুঝতে তার সময় লেগেছে শারমিনের বিয়ে হয়ে যাওয়া পর্যন্ত । আমেরিকাপ্রবাসী স্বামীর সাথে বসবাসকারী শারমিনকে সে নিয়মিত মেইল করে । কোনো উত্তর আসে না , এমনকি আসবেনা – জানার পরও।
এই ইয়্যুনিভার্সে কিছু না পেলেও অন্তত দু’জন বন্ধু রফিক পেয়েছে । সুমন আর অঞ্জন । রফিককে দিয়ে একটা ওয়েব কন্টেন্টের স্ক্রিপ্ট লেখানোর জন্য প্রায়ই তাগাদা দেয় সুমন । অঞ্জন তার সাথে একই এপার্টমেন্টে থাকে যেখানে সে প্রায়ই মাস্টারবেট করে শারমিনের কথা ভেবে ।
কিন্তু হঠাৎ একদিন রফিক নিজেকে আবিষ্কার করে অন্য এক দুনিয়ায় । ঘরের টেবিল চেয়ার ছাড়া সবকিছু অচেনা লাগে রফিকের । সবকিছু কেমন যেনো বদলে গেছে । চমকে দিয়ে গোসল সেরে বের হয় শারমিন ,যে এই ইয়্যুনিভার্সে তার বিয়ে করা বউ । শুরু হয় রফিকের অদ্ভুত জীবন ,যে জীবন তার পরিচিত নয় ।
রফিক এখানে তার নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের গন্ডি বের হয়ে আসতে পেরেছে ,লেখালেখির ক্ষমতা হারিয়ে সে বেছে নিয়েছে নিয়োজিত হয় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষকতা ।
এই দুনিয়ায় সারা অ্যাপার্টমেন্ট জুড়ে শারমিনের গায়ের রসুনের গন্ধ । এখানে তার টাকা পয়সার কোনো অভাব নেই , অঞ্জন নামের কোনো রুমমেট নেই , সুমন আর নাটক সিনেমা বানায় না ।
মাত্র এক রাত । এক রাত পরই রফিক ফিরে যায় তার আবার আগের জীবনে , যেখানে সে ঢকঢক করে মদ গিলে সব কষ্ট ভুলে থাকে । শারমিনকে না পাওয়ায় তীব্র হতাশা তাকে দৌড়ে বেড়ায় এপাশ থেকে ওপাশ । সে ভালোবাসার চেষ্টা করে দীপা নামের একটি মেয়েকে । তবুও সে বারবার আটকা পরে শারমিনের কাছে । শারমিন সেখানে কেবলই একজন আমেরিকাপ্রবাসী স্বামীর স্ত্রী ।
“জীবন অপেরা” মূলত অসম্ভবের গল্প । কেউ চাইলে আজগুবি বলে উড়িয়ে দিতে পারে । আজগুবি এবং অসম্ভব । ‘জীবন অপেরা’ একজন শারমিন আর রফিকের গল্প । অসহায়ত্বের গল্প , বিজ্ঞানের গল্প । এর বেশি বলতে গেলে আমাকে পুরো ঘটনাটাই স্পয়লার দিয়ে দিতে হবে , তাই আর বিশদে গেলাম না।
আলোচনা-সমালোচনাঃ
আলভী ভাইয়ের স্টোরিটেলিং অসাধারণ । এ নিয়ে আগেও আমি লিখেছি । প্লটটি নিয়ে বলতে গেলে বলতে হবে প্লট সিলেকশন ইউনিক। কোয়ান্টাম ফিজিক্স , নিউ্মেরোলজি , ভবিষ্যৎবাণীর মতো জিনিসগুলোও এ বইয়ে এসেছে । প্রথম মৌলিক উপন্যাস হিসেবে জীবন অপেরা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য । আলভী আহমেদের লেখা আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে পড়ি । ভবিষ্যতেও আমি আগ্রহ নিয়ে বসে থাকবো নতুন বইয়ের জন্য ।
এইতো গেলো আলোচনা ।
বইয়ের ত্রুটি বলতে গেলে ,
লেখক কিছুকিছু জায়গায় ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন ,যেটা না করে বাংলা শব্দ ব্যবহার করলে আরও আকর্ষনীয় হতো আমার মতে । যেমন , প্রথম পৃষ্ঠায় লিখেছেন ,আমি তোমাকে ভালোবাসি । যাদের ভালোবাসি ,তাদের প্রচুর ‘পেইন’ দেই । এরকম আরও দুয়েকটা শব্দ চোখে লেগেছে । কিছু জায়গায় সর্বনামের ব্যবহার না করলে নাম ব্যবহার করলে গঠনগত দিক থেকে বাক্য আরও উন্নত ও মজবুত হতো । যেহেতু লেখকের প্রথম উপন্যাস এটা , এসব সামান্য ভুল ত্রুটি উপেক্ষা করাই যায় ।
এক জায়গায় খটকা লাগলেও লেখক নিজেই যেহেতু বলে দিয়েছেন অসম্ভবের গল্প এটা , সুতরাং পাঠক হিসেবে অতি কৌতূহল রাখলাম না ।
জীবন অপেরা পড়ে কিছু কিছু জায়গায় আপনারা নিজের সাথে মিল পাবেন , কিছু জায়গা পড়ে বুকটা শূন্যতায় খালি হয়ে যাবে , কিছু জায়গায় আধোমায়া টাইপ একটা ফিলিংস হবে । এই ফিলিং এর নাম আমি জানিনা । তাই বলতেও পারছি না । দুঃখিত।