সব মানুষের একটামাত্র জীবন। রফিকের জীবন দুটো। এক জীবন থেকে সে আর এক জীবনে ঢুকে পড়েছে। ব্যাপারটা ঘটে গেছে অবলীলায়। যেন ঢাকা থেকে বাসে চেপে ফরিদপুর চলে গেল। নতুন জীবনে তার জন্য শারমিন আছে। শারমিনের লোভ দেখিয়ে একটা ফাঁদ পাতা হয়েছে। ফাঁদ হলো এমন একটা জিনিস যেখানে টোপ ফেলে শিকারকে ভেতরে টেনে আনা হয়, পেছনে বের হবার দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। তিল তিল করে পচে মরতে হয়। রফিক বোকার মতো এস ফাঁদে ধরা দিয়েছে।কিন্তু সে কি নিজেই ফাঁদে পড়তে চায়নি? তাহলে বের হওয়ার প্রশ্ন কোথা থেকে আসে? জীবন অপেরায় সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে। কোয়ান্টাম ফিজিকসে বিজ্ঞানীরা বলেন, n সংখ্যক জগৎ থাকতে পারে যেখানে n একটা অসীম সংখ্যা। এ ব্যাপারে তাঁরা ওয়েভ ফাংশন বের করেছেন, সেই ফাংশনের ল্যাব সিমুলেশন করেছেন। সিমুলেশনের রেজাল্ট প্রমাণ করে এ রকম অসংখ্য আলাদা জগৎ থাকতে পারে। হয়তো এ জগতে আমি ঢাকায় থাকি, অন্য জগতে আমেরিকায়। আরেক জগতে উগান্ডায়। আলাদা আলাদা জীবন। কেউ চাইলে আজগুবি বলে উড়িয়ে দিতে পারে। আজগুবি এবং অপ্রয়োজনীয়। এর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। থাকবে কীভাবে? যদি ব্যাখ্যা থাকত, পৃথিবীর সব লোক বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন জীবনের মধ্য দিয়ে নেচে-গেয়ে বেড়াত। পয়সাওয়ালা মানুষ যেমন বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ায় তারপর শেষ বয়সে এসে একটা দেশে গিয়ে থিতু হয়, তেমনি আমরা বিভিন্ন জীবনের মধ্যে ঘুরে বেড়াতাম। সবচেয়ে নিখুঁত জীবনটাতে গিয়ে থামতাম। সেই পৃথিবীর মানুষ হতো তার স্বপ্নের সমান বড়।
জীবন অপেরা সেই অসম্ভব জীবনের গল্প। মিষ্টি প্রেমের গল্প।
সায়েন্স ফিকশন নয় এটি। বিজ্ঞানের উড়োজাহাজে আপনি চাপবেন। কিন্তু ঘুরে বেড়াবেন পৃথিবীর প্রাচীনতম অনুভূতির রাজ্যে। প্রেম এসে হানা দেবে। রফিক ও শারনিনের জীবন অপেরায় আপনাকে স্বাগত।
আলভী আহমেদের প্রথম মৌলিক উপন্যাস। বেশ ভালো লেগেছে। অবশ্য তার লেখা খারাপ লাগবে না এটা এর আগে কয়েকটা ছোটগল্প পড়েই আন্দাজ করেছিলাম। প্রাঞ্জল ভাষা ও সুন্দর বাক্য গঠনের জন্য উপভোগ্য হয়ে ওঠে তার লেখা। উপন্যাস সম্পর্কে বলতে গেলে একটা কথাই বলতে হয়, প্রথাগত সায়েন্স ফিকশন নয়; কোয়ান্টাম ফিজিকস, প্যারালাল ইউনিভার্স, নিউমেরোলজি এসবকে ছাপিয়ে মূলত এটি একটি ভালোবাসার গল্পই হয়ে উঠেছে, যা মন ছুঁয়ে যায়।
ক) নিতান্ত সাধারণ কোনো মানুষের প্রকৃতির খেয়ালে ভিন্ন মাত্রার আরেক জগতে পরিভ্রমণ, যেখানে সে নিজেই যাপন করছে অন্যরকম জীবন। খ) শ্রোডিঞ্জারের বিড়াল আর কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা নিয়ে অল্প আলাপ। গ) ইএসপি বা দেজাভ্যু জাতীয় শব্দের আরোপিত প্রয়োগ।
ভিনদেশি সাহিত্যে যাবার প্রয়োজন নেই, বাংলাদেশের সাহিত্যেই হুমায়ূন আহমেদ তার একাধিক লেখায় এসব নিয়ে এসেছেন।
পড়ুয়া লেখক নিজের প্রথম উপন্যাসে উচ্চাভিলাষী না হলে পাঠক আশাহত বোধ করে।
কিছু চেয়ে না পাওয়ার হাহাকার প্রথম কলিজা দিয়ে অনুভব করেছিলাম সুনীলের সেই সময় বইটা পড়ে। মেয়েটি মরে যাওয়ার আগে একবাক্যে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিল ’পরের জন্মে যেন তোকে পাই’। আহা! বড্ড মায়া লেগেছিল তার জন্য ।
আলভী আহমেদের এই বইটিও আমার কাছে হাহাকারের গল্প মনে হয়েছে। এই জন্মে চাইলাম কিন্তু পেলাম না। চাওয়ার তিব্রতা এতটাই যে প্রকৃতি সেখানে হস্তক্ষেপ করে বসলো। অন্য জন্ম নয় অন্য দুনিয়া মানে প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে নিয়ে গিয়ে ছেলেটাকে বানিয়ে দিলো ঐ মেয়েটির বর। কিন্তু সেখানেও ভ্যাজাল লেগে যায়। তাকে ফিরে আসতে হয় আগের দুনিয়াতে….
এই দুনিয়ায় রফিক জানে কি ঘটেছে আর ঐ দুনিয়ায় শারমিনও জেনে যায় কি ঘটেছে। কিন্তু সমাধান কোথায়? বাকি জীবন কি রফিক শারমিনের কাছে যাওয়ার এই তীব্র ইচ্ছা নিয়ে কাটাবে? শারমিন কি অপেক্ষা করবে নাকি অন্য কারো বাড়িয়ে রাখা হাতে হাত রাখবে? জানা যাবে কীভাবে ঘটে এই প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে যাওয়া-আসা? কোন এক দুনিয়ায় কি দীপার হাত ধরবে রফিক? না কি সেও বাকি জীবন কাটাবে তীব্র অপেক্ষা নিয়ে?
বই শেষ করে এক রকমের শূন্য অনুভূতি নিয়ে বসে ছিলাম রফিকের পাশে। বইয়ের এতটা পথ তার সাথে হাঁটতে হাঁটতে তার অনুভূতিগুলো যেন আমিও অনুভব করতে পারছিলাম। এই কৃতিত্ব পুরোটাই লেখকের। তিনি বইয়ের চরিত্রগুলোকে পাঠকের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসতে পেরেছেন। আলভী আহমেদের বাক্য গঠন, শব্দের ব্যবহার বরাবরই সুন্দর। এই বইতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
বইতে বিজ্ঞান নিয়ে বেস কথাবার্তা আছে। সেটুকু সহজ করেই লিখেছেন পাঠক বুঝলে ভালো না বুঝলেও সমস্যা নাই বলেই মনে হলো। নিউমারোলজি নিয়ে অংশটা পড়ে মজা পেয়েছি। আমি নিজেও একসময় নিউমারোলজি, হস্তরেখা, তিলবিচার, আইচিং হেনতেন নিয়ে পড়েছিলাম। নস্টালজিক হয়ে গেছিলাম। :)
৩.৫/৫ "এতোটুকু প্রশ্রয় দিয়ো আমায় আমি তোমায় দেবো,সারাটা জীবন।"
জীবন অপেরা সমান্তরাল বিশ্বের ফাঁদে আটকে পড়া রফিক ও শারমিনের গল্প।গল্পের প্লট আহামরি নতুন নয়, তবু লেখক যে গভীর মমতা দিয়ে চরিত্রগুলো নির্মাণ করেছেন তাদের বেদনা আমাদের স্পর্শ করে।জীবন অপেরা সবকিছু ছাপিয়ে ভালোবাসার গল্প আর এ গল্পগুলো বেঁচে থাকুক চিরকাল।
আমি কখনও দেশীয় সাই-ফাই রোমান্টিক উপন্যাস পড়বো ভাবিনাই। যদিও লেখক এটাকে সাই-ফাই বলতে নারাজ, তার মতে এটা বিজ্ঞানের আশ্রয় নেয়া প্রেমের উপন্যাস। তো এর আগে আরেকটা দেশী ডিস্টোপিয়ান পড়েছিলাম। মশিউল আলমের 'প্রিসিলা'। সেটা ঠিক রোমান্টিক ছিলো কিনা মনে নাই। তো গল্পটা হলো প্যারালাল ওয়ার্ল্ড নিয়ে। আমাদের জগতেই সমান্তরালে একই সময়ে বয়ে চলেছে আরেক জীবন ধারা। বিজ্ঞানীদের মতে n সংখ্যক প্যারালাল ইউনিভার্স থাকতে পারে (প্রচ্ছদে একটা বিশাল n আছে। ছবি তুলতে যাবার আগে সেটা চোখেই পড়েনাই!😅)। তো ফিজিক্সের ছাত্র, রফিক নামের এক লেখক কোনো একভাবে ভিন্ন জগতে প্রবেশ করে আবিষ্কার করে সেখানে সবকিছু অন্যরকম। তার না পাওয়া ভালোবাসা শারমিন সেখানে তার স্ত্রী। সেখানে সে কোনো ভবঘুরে ব্যাচেলর নয়, রীতিমতো একজন ইউনিভার্সিটির লেকচারার। রফিক সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, আবার চায়না! এই দন্দ্ব আর টানপোড়নের মাঝেই এগিয়ে চলে গল্প। রফিকের গল্পটা গ্রিক ট্র্যাজেডিগুলোর মতো। যতই পালাতে চাও, পারবেনা। ইউরিপিদিস যেমন বলেছিলেন 'Moral fate is hard. You'd best get used to it'।
পুরো ঘটনাটাই সহজ স্বাভাবিক ভাবে এগিয়েছে। মাঝে এসেছে প্যারালাল তত্ব, শ্রোডিঞ্জারের তত্ব থেকে শুরু করে কনশাস মাইন্ড, সাবকনশাস মাইন্ড, কালেক্টিভ মাইন্ড, কসমিক কানেকশন মাইন্ড, দেজাভ্যূ ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক ব্যাপারস্যাপার এর ব্যাখ্যা (!)। লেখক আলভী আহমেদ বেশ যে জানাশোনা মানুষ, লেখা থেকে বোঝা যায়। লেখার ধরণও খুব সুন্দর। আমি বইটা কিনেছিলাম ফ্ল্যাপের অংশটুকু পড়ে। বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছিলো শুরুর অংশটুকু। পড়তে মজাও লাগছিলো হিউমার গুলোর জন্য। এক টানা পড়ে উঠেছি। তবে আমি আসলে কাহিনীর ডেপথ পাইনি। এতো সুন্দর প্লট, কিন্তু সেরকম কোনো উপসংহার নেই, ইঞ্জিনছাড়া নৌকা সাগরে ফেলে দেবার মতো। বেশিরভাগ বইগুলোর মতো খেই হারানো গল্প। দীপা ক্যারেক্টারটাকে লাগছিলো পুরোপুরি হুমায়ুন আহমেদ এর বইয়ের কোনো নায়িকা যেনো। ওনার লেখার ছায়া আরও ছিলো শেষ দিকে। আরেকটু ভালো আশা করছিলাম আসলে। সামনে হয়তো বেটার পাবো।
বইটা 'রফিক' নামের একজনের দুটো জীবন লিড করার গল্প। একজীবনে সে তার বন্ধু শারমিনকে বিয়ে করে, আরেক জীবনে ভালোবাসলেও বলতে পারার ক্ষমতা থাকেনা, তাই শারমিনের বিয়ে হয়ে যায় অন্য জায়গায়।
প্যারালাল ইউনিভার্স, নিউমোরলজির কপচানি থাকলেও এখানে এসবের ব্যবহারটা ভালো করে ক্লিয়ার করেনি লেখক।
লেখককে বইয়ের শুরুতে মুরাকামি ইনফ্লুয়েন্সার মনে হয়েছিল, কিন্তু শেষে গিয়ে দেখলাম হুমায়ুন আহমেদের লেখার ধরণটাও চলে এসেছিল লেখায়।
আমার অনেক একঘেয়ে লেগেছে, এক্সপেকটেশন লেভেল অনেক হাই ছিল, তাই হতাশ হতে হলো।
ফ্ল্যাপের লেখা পড়ে ভেবেছিলাম 'মিডনাইট লাইব্রেরি' টাইপের কিছু হবে, কিন্তু ওইটার ধারে কাছেও যায়নি।
আলভী ভাইকে নিয়ে এটা আমার দ্বিতীয় লেখা । ইতিমধ্যেই হয়তো অনেকেই জানেন ( আবার বেশিরভাগই জানেন না) আলভী ভাই একজন তুখোড় ছোটোগল্প লেখক ও ‘মুরাকামি স্পেশালিস্ট’ অনুবাদক । তাঁর ছোটোগল্প নাকি অনুবাদ এই দুইটি থেকে একটি বেছে নিতে বলা হলে যারা দুটিই পড়েছেন তাদের নিঃসন্দেহে দুইদিন দ্বিধায় কাটবে । অবশেষে আমার মতো কিছু ক্ষুদ্র পাঠকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে লেখক নিয়ে এলেন নিজের প্রথম মৌলিক উপন্যাস ‘জীবন অপেরা’
• প্রকাশকঃ বাতিঘর • মুদ্রিত মুল্যঃ ৩৬০ • পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৮৮ • প্রথম প্রকাশঃ মার্চ ,২০২১
কিছুক্ষন আগেই আমি বইটি পড়ে শেষ করলাম । বইটা কিছুটা অদ্ভুত । অবশ্য প্যারালাল ইয়্যুনিভার্স নিয়ে যে কোনো লেখা পরার সময়ই কমবেশি এই অদ্ভুত ফিলিংসটা আসে । প্রথম যে সমস্যায় আমি ভুগি সেটা হলো ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’। বইটা পড়ার সময় অনেকবার সম্মুখীন হয়েছি আমি কে , কোথায় আছিসহ আরও অসংখ্য প্রশ্নের।
প্লটঃ
‘জীবন অপেরা’ থেকে আমি এখন একজন রফিকের গল্প বলবো। যে এক ইয়্যুনিভার্সে একজন কবি । যে বুকের মধ্যে কষ্ট জমাতে জমাতে অসুখ বাধিয়ে ফেলে । যে ভাবে ,এ ধরণের দুঃখ মনে থাকলে মানুষ খুব ক্রিয়েটিভ কিছু একটা হয়ে ওঠে । পর্তুগীজ ভাষায় একে বলে ‘Saudade’ ( সওদাজ ,যার বাংলা করলে মোটামুটি অর্থ দাঁড়ায় –দুঃখবিলাস)
বলছিলাম রফিকের কথা । আধপোড়া এই কবির সমস্যা হচ্ছে সবকিছু স্বাভাবিকের চেয়ে একটু দেরিতে বুঝতে পারে । বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অঘোষিত, অপ্রস্তাবিত কিন্তু আকাঙ্খিত তরুণী শারমিনকে যে সে ভালোবাসে ,সেটা বুঝতে তার সময় লেগেছে শারমিনের বিয়ে হয়ে যাওয়া পর্যন্ত । আমেরিকাপ্রবাসী স্বামীর সাথে বসবাসকারী শারমিনকে সে নিয়মিত মেইল করে । কোনো উত্তর আসে না , এমনকি আসবেনা – জানার পরও।
এই ইয়্যুনিভার্সে কিছু না পেলেও অন্তত দু’জন বন্ধু রফিক পেয়েছে । সুমন আর অঞ্জন । রফিককে দিয়ে একটা ওয়েব কন্টেন্টের স্ক্রিপ্ট লেখানোর জন্য প্রায়ই তাগাদা দেয় সুমন । অঞ্জন তার সাথে একই এপার্টমেন্টে থাকে যেখানে সে প্রায়ই মাস্টারবেট করে শারমিনের কথা ভেবে ।
কিন্তু হঠাৎ একদিন রফিক নিজেকে আবিষ্কার করে অন্য এক দুনিয়ায় । ঘরের টেবিল চেয়ার ছাড়া সবকিছু অচেনা লাগে রফিকের । সবকিছু কেমন যেনো বদলে গেছে । চমকে দিয়ে গোসল সেরে বের হয় শারমিন ,যে এই ইয়্যুনিভার্সে তার বিয়ে করা বউ । শুরু হয় রফিকের অদ্ভুত জীবন ,যে জীবন তার পরিচিত নয় । রফিক এখানে তার নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের গন্ডি বের হয়ে আসতে পেরেছে ,লেখালেখির ক্ষমতা হারিয়ে সে বেছে নিয়েছে নিয়োজিত হয় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষকতা ।
এই দুনিয়ায় সারা অ্যাপার্টমেন্ট জুড়ে শারমিনের গায়ের রসুনের গন্ধ । এখানে তার টাকা পয়সার কোনো অভাব নেই , অঞ্জন নামের কোনো রুমমেট নেই , সুমন আর নাটক সিনেমা বানায় না ।
মাত্র এক রাত । এক রাত পরই রফিক ফিরে যায় তার আবার আগের জীবনে , যেখানে সে ঢকঢক করে মদ গিলে সব কষ্ট ভুলে থাকে । শারমিনকে না পাওয়ায় তীব্র হতাশা তাকে দৌড়ে বেড়ায় এপাশ থেকে ওপাশ । সে ভালোবাসার চেষ্টা করে দীপা নামের একটি মেয়েকে । তবুও সে বারবার আটকা পরে শারমিনের কাছে । শারমিন সেখানে কেবলই একজন আমেরিকাপ্রবাসী স্বামীর স্ত্রী ।
“জীবন অপেরা” মূলত অসম্ভবের গল্প । কেউ চাইলে আজগুবি বলে উড়িয়ে দিতে পারে । আজগুবি এবং অসম্ভব । ‘জীবন অপেরা’ একজন শারমিন আর রফিকের গল্প । অসহায়ত্বের গল্প , বিজ্ঞানের গল্প । এর বেশি বলতে গেলে আমাকে পুরো ঘটনাটাই স্পয়লার দিয়ে দিতে হবে , তাই আর বিশদে গেলাম না।
আলোচনা-সমালোচনাঃ
আলভী ভাইয়ের স্টোরিটেলিং অসাধারণ । এ নিয়ে আগেও আমি লিখেছি । প্লটটি নিয়ে বলতে গেলে বলতে হবে প্লট সিলেকশন ইউনিক। কোয়ান্টাম ফিজিক্স , নিউ্মেরোলজি , ভবিষ্যৎবাণীর মতো জিনিসগুলোও এ বইয়ে এসেছে । প্রথম মৌলিক উপন্যাস হিসেবে জীবন অপেরা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য । আলভী আহমেদের লেখা আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে পড়ি । ভবিষ্যতেও আমি আগ্রহ নিয়ে বসে থাকবো নতুন বইয়ের জন্য । এইতো গেলো আলোচনা ।
বইয়ের ত্রুটি বলতে গেলে , লেখক কিছুকিছু জায়গায় ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন ,যেটা না করে বাংলা শব্দ ব্যবহার করলে আরও আকর্ষনীয় হতো আমার মতে । যেমন , প্রথম পৃষ্ঠায় লিখেছেন ,আমি তোমাকে ভালোবাসি । যাদের ভালোবাসি ,তাদের প্রচুর ‘পেইন’ দেই । এরকম আরও দুয়েকটা শব্দ চোখে লেগেছে । কিছু জায়গায় সর্বনামের ব্যবহার না করলে নাম ব্যবহার করলে গঠনগত দিক থেকে বাক্য আরও উন্নত ও মজবুত হতো । যেহেতু লেখকের প্রথম উপন্যাস এটা , এসব সামান্য ভুল ত্রুটি উপেক্ষা করাই যায় । এক জায়গায় খটকা লাগলেও লেখক নিজেই যেহেতু বলে দিয়েছেন অসম্ভবের গল্প এটা , সুতরাং পাঠক হিসেবে অতি কৌতূহল রাখলাম না ।
জীবন অপেরা পড়ে কিছু কিছু জায়গায় আপনারা নিজের সাথে মিল পাবেন , কিছু জায়গা পড়ে বুকটা শূন্যতায় খালি হয়ে যাবে , কিছু জায়গায় আধোমায়া টাইপ একটা ফিলিংস হবে । এই ফিলিং এর নাম আমি জানিনা । তাই বলতেও পারছি না । দুঃখিত।
বইঃ জীবন অপেরা লেখকঃ আলভী আহমেদ প্রকাশনা সংস্থাঃ বাতিঘর প্রথম প্রকাশ ২০২১ মুদ্রিত মূল্যঃ ৩০০ টাকা
মিথ্যে বলব না, বুকশপে স্ট্যান্ড এর উপর স্তুপিকৃত বইয়ের উপরে থাকা সুন্দর কুসুম হলুদ রঙের প্রচ্ছদটাই আমার চোখ আকর্ষণ করেছিল সবার আগে। প্রচ্ছদের টানে বইটা হাতে নিতেই ফেঁসে গেলাম। আলভী আহমেদের নামটা চেনা ছিল কারন হারুকি মুরাকামির অনেকগুলো বইয়ে অনুবাদক হিসেবে তার নাম দেখেছিলাম। হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখি এটি মৌলিক উপন্যাস। ভূমিকা পড়ে বুঝলাম সাই ফাই ঘরানার গল্প। ব্যক্তিগতভাবে আমি সাইফাই জনরার তেমন ভক্ত নই। সেকারণে এ বিষয়ে পড়াও হয়েছে কম। ইতস্তত করতে করতে নিজেকে বুঝ দিলাম ফ্ল্যাপে লেখা শেষ প্যারাটুকু পড়ে – “সায়েন্স ফিকশন নয় এটি। বিজ্ঞানের উড়োজাহাজে আপনি চাপবেন। কিন্তু ঘুরে বেড়াবেন পৃথিবীর প্রাচীনতম অনুভূতির রাজ্যে। প্রেম এসে হানা দেবে। রফিক ও শারমিনের জীবন অপেরায় আপনাকে স্বাগত।"
হুমায়ুন আহমেদ সায়েন্স ফিকশনের সাথে মায়া প্রেম মিলিয়ে যে খিচুড়িটি তৈরী করতেন, আমি তার ফ্যান ছিলাম না কখনোই। সেজন্য আলভী আহমেদ এ বইয়ে কি বানিয়েছেন তা নিয়ে এক ধরনের কৌতুহলও কাজ করছিলো। অতএব বই বগলদাবা করে রওনা হলাম।
এবার বইয়ের কথায় আসি- বইয়ের নায়কের নাম রফিক। সে জীবনে একটি প্রেম করেছিল। এই মহাবিশ্বে তার জন্য ২ টি জীবন তৈরী হয়েছে এবং সে প্রকৃতির কোন এক খেয়ালে এক জীবন থেকে অন্য জীবনে আসা যাওয়া করে তবে সে যখন যে জীবনে থাকে সে জীবনটাই তার কাছে বাস্তব। দু’টি জীবনেই তার কিছু অপ্রাপ্তি আছে, আছে কিছু প্রাপ্তি। এক জীবনে প্রেমের উপস্থিতি আছে আর অন্য জীবনে সেই প্রেম কেবল অতীত। এই জগতে আসা যাওয়ার রহস্য এবং তার পরিনতি নিয়ে বইটা লেখা। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখক অলৌকিক বা অতিলোউকিক কিছু বিষয়, অপ্রমাণিত কিছু বিষয়ের সাহায্য নিয়েছেন এবং আমার মতে সেটি বরং গল্পের প্লটকে দুর্বল করে দিয়েছে। পুরোপুরি সাইফাই হলে ব্যাখ্যার সাহায্যে নিউমারোলজিকে কাজে লাগানোর ব্যাপারটা কিছুটা জাস্টিফাই করা যেতো। নিউমারোলজির এই দুর্বল (এক চরিত্রের ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা, পালিয়ে যাওয়া, রহস্যময় ভাবে গায়েব থেকে ফিরে আসা) দিক এবং ক্ষেত্র বিশেষে ব্যাখ্যাতিত বিষয় দিয়ে গিট্টু না লাগালে বইটা আমি হয়তো আরো উপভোগ করতাম। বইটার একটা ভাল দিক হল গল্পটা পড়ে যাওয়া যায়, একটু বোধহয় ইমোশনালিও কানেক্টেড হওয়া যায়।
বইটাকে পড়ার জন্য একটা চান্স অবশ্যই দেয়া যেতে পারে কারণ লেখা বেশ তরতরিয়ে পড়ে ফেলা যায়। তাই পড়ার জন্য রেকমেন্ডেড কিন্তু বেশি আশা রাখা যাবে না! আশা না রাখলে বইয়ের প্লট যেমন করে লেখক উপস্থাপন করেছেন তাতে ভাল লাগার চান্স আছে।
স্টোরিলাইনটা সেরকম ইউনিক না, বিশেষ করে আপনি যদি জাপানিজ ফিকশনগুলো পড়ে থাকেন। তবে আলভী আহমেদ সাজিয়েছেন একরকম ভালোই; জটিল করে ফেলেন নাই কাহিনী। আরেকটা ব্যাপার হলো, আলভী আহমেদের তরল গদ্য, একনাগাড়ে পড়ে যাওয়া যায় অনেক দূর। সমস্যাটা মনে হয়েছে যখন কনভার্সেশনগুলো আসে। এরকম নাটুকে ধরণের কথাবার্তা রিলেটেবল না। এই বিষয়টায় তিনি যদি কনসার্ন থাকতেন, মোর ইন রিয়্যাল লাইফ ফোকাস করতেন, তা হলে ফাইভ স্টার দিয়ে দিতাম হয়ত কে জানে।
শেষটা ভালো, শেষটা অবশ্যই ভালো। প্রেডিক্টেবল, কিন্তু বোরিং না, লাগামছাড়াও না। যদিওবা গ্রেট এক্সপেকটেশনস নিয়ে বইটা পড়তে শুরু করলেও তার ৪০-৫০% পূরণ হয়েছে শুধু।
সমকালীন প্রমিজিং লেখকদের উপর ভরসা আছে। আলভী আহমেদের আরও কয়েকটা বই আছে সংগ্রহে, পড়ে দেখব।
প্যারালাল ওয়ার্ল্ড, টাইম ট্রাভেল - ভাবনাটা ভাল কিন্তু এই উপন্যাসের প্লটটা বড় গল্পের জন্য মানানসই, একটা আস্ত উপন্যাস নয়।
লেখকের ছোট গল্পগুলো ভাল লেগেছিল সেজন্যই উপন্যাস নিয়ে আশা বেশি ছিল আর বিষয়বস্তুও আগ্রহ উদ্দীপক কিন্তু আশাহত হয়েছি। কথা সাহিত্য আর বিজ্ঞান- কল্প বিজ্ঞানের মেলবন্ধন জমেনি। অনেক জায়গাতেই মনে হয়েছে অপ্রয়োজনীয় তথ্য আর ব্যাখ্যা কাহিনীর গতিকে ধীর করে দিচ্ছে। হয়ত অনেকের এই ধারাটাই ভাল লাগবে, তবে আমি উপভোগ করিনি।
❝I ʅσʋҽ ყσυ ιɳ ҽʋҽɾყ υɳιʋҽɾʂҽ.❞ --𝙳𝚛. 𝚂𝚝𝚛𝚊𝚗𝚐𝚎 𝚒𝚗 𝚝𝚑𝚎 𝙼𝚞𝚕𝚝𝚒𝚟𝚎𝚛𝚜𝚎 𝚘𝚏 𝙼𝚊𝚍𝚗𝚎𝚜𝚜 একজনকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসলে তাকে আমরা আজীবন চাই। চাওয়া পূরণ না হলে মনের ভেতর এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। আর সেই ক্ষত বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয় আজীবন। রফিক ভালোবাসে শারমিনকে। কিন্তু কোনোদিনই সে কথা মুখ ফুটে বলা হয়নি। শারমিন বিয়ে করে স্বামীর সাথে চলে যায় আমেরিকা। রফিক বইতে থাকে তার নিত্য জীবন। যে জীবনে সে একজন লেখক। কয়েকটা কবিতার বই বের হয়েছে, কিছু নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখেছে আর মামুলি কিছু অনুবাদ করে দিনাতিপাত করে যাচ্ছে। দীপা নামের এক মেয়ের সাথে টুকিটাকি কথা হয়। তাকে ঠিক ভালোবাসে না রফিক। রফিকের মন জুড়ে যে শারমিনের দখল। দীপা তাকে বোদলেয়ারের কবিতা লেখা একটা ডায়েরী উপহার দিয়েছিল। সেখানে রফিক তার নিত্য জীবনের কিছু ঘটনা লিখে রাখে। ডায়েরীর নাম দিয়েছে ❝জীবন অপেরা❞। এক সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনি যদি দেখেন আপনার জীবন বদলে গেছে, যাপিত জীবনের না পাওয়া গুলো পেয়ে গেছেন। কিন্তু বুঝতে পারছেন না হচ্ছেটা কী! না পাওয়া কিংবা আরাধ্য জিনিসটা পেয়ে গেলেন কেমন লাগবে? আশেপাশের পরিচিত মানুষগুলো আছে ঠিকই, কিন্তু বদলে গেছে তাদের বৈশিষ্ট্য। কেমন লাগবে তখন? যাপিত জীবনে ফিরে যেতে চাইবেন নাকি নতুন জীবনে আটকে থাকতে চাইবেন? এমনটাই ঘটেছিল রফিকের জীবনে। ঘুম থেকে উঠে সে চলে যায় ভিন্ন এক জগতে। যেখানে শারমিন তার জীবনসঙ্গিনী। হ্যাঁ, রফিকের যাপিত জীবনের না পাওয়া ভালোবাসাই নতুন ঢুকে পড়া জীবনে তার বউ। এটাকে রফিক কী হিসেবে নিবে? এই আরাধ্য জীবন কি কোনো ফাঁদ? আর সে ফাঁদেই কি পা দিলো রফিক? রফিক বুঝতে পারেনা এই জগতে সে কীভাবে এসে পড়ল। নতুন জগতে রফিক একজন শিক্ষক, শারমিন চাকরি করে। এখনো সে বুঝতে পারছে না এটা কি স্বপ্ন না বাস্তব। কোথায় এসে গেলো সে! তার বন্ধু সুমন যে কি না কথার তুবড়ি তোলে, নাটক-ফাটক বানায় আর রফিককে ফোন দিয়ে বকবক করে, সে কি না এই জগতে রাজউকে দৌড়ায়! লেখালেখি করা রফিক না-কি এই জগতে গত চার বছরে কিছুই লিখতে পারেনি। ভাবা যায়! রফিকের হয়তো এমনটা মনে হতেই পারে, ❝কে আমি? কোত্থেকে এলাম আমি?!❞ কেনই বা তারা দুইজন প্রতি মাসে একবার শারমিনের মামা নওশাদের কাছে একবার সিটিং দেয়? নতুন জগতে শারমিনের এক বন্ধু ইশতিয়াক। কাজের খাতিরে পরিচয়। কিন্তু পরিচয়টা এখন আর কাজের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। দুইজন ভিন্ন বয়সের মানব মানবী হয়ে উঠেছে বন্ধু কিন্তু আবার তেমন ঘনিষ্ঠ ও নয়। তবুও শারমিন এক ধরনের টান অনুভব করে ইশতিয়াকের জন্যে। কেন? যেনো এক অদৃশ্য সুতায় তারা বাঁধা। রফিক বুঝতে পারে সে একটা প্যারালাল ইউনিভার্সে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু কীভাবে জানা নেই। এর থেকে বেরোনোর পথও জানা নেই। সে কি বের হতে চায় আদৌ? এ জগতে যে শারমিন আছে তার আপনজন হয়ে। রফিক-শারমিনের ভালোবাসা, ইশতিয়াকের সাথে এক অজানা সম্পর্ক, দীপার ভালোবাসা আর এক জগৎ থেকে আরেক জগতে প্রবেশ সব মিলে এক অবাস্তব বা বাস্তব এক পরিস্থিতি। যার কূল কিনার নেই। রফিক কি ফিরে যাবে আগের জীবনে? শারমিন কী বুঝতে পারবে তার সাথে গত দুইদিন থাকা মানুষটা আসলে এই জগতের রফিক না? পাঠ প্রতিক্রিয়া: লেখকের প্রথম মৌলিক বই ❝জীবন অপেরা❞। উনার দুটো অনুবাদ সংগ্রহে থাকলেও ❝জীবন অপেরা❞ দিয়েই লেখকের লেখার সাথে পরিচয় হলো। ❝জীবন অপেরা❞ কে নিখাদ প্রেমের গল্প বলা যায়, সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের থিওরি। কোয়ান্টাম ফিজিকসে n সংখ্যক জগৎ থাকতে পারে। যেখানে n অসীম সংখ্যা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রেম শারমিনকে না পাওয়ার এক দুঃখবোধ নিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছিল জীবন। মাঝেই এক অজানা কারণে প্যারালাল ইউনিভার্সে ঢুকে যায় সে। একটা জীবন থেকে জীবন হয়ে যায় দুটো। প্রেমের মাঝে বিজ্ঞানের আনাগোনা চলতে থাকে। সাধারণত প্রেমের গল্পে যে ধরনের আবেগ থাকে, রোমান্টিক ডায়লগ থাকে "জীবন অপেরা" সেক্ষেত্রে একেবারে ভিন্ন। প্রেমের উক্তি থেকে এখানে বিজ্ঞানের বর্ণনা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। গল্পের প্রতিটি চরিত্রই বুদ্ধিমান, স্বীয় ক্ষেত্রে সফল। বইটা আমি কিনেছিলাম মূলত ❛সাই-ফাই❜ ভেবেই। তবে একদম সলিড সাই-ফাই বলা যায় না একে। সমকালীন প্রেমের মাঝে প্যারালাল ইউনিভার্সের তত্ত্ব জুড়ে দিয়েছেন লেখক। তবে প্যারালাল ইউনিভার্সের কঠিন কঠিন যুক্তি, তত্ত্ব লেখক বেশ সাবলীল ভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন। বই শুরু করতেই ঘটনা প্রবাহে মিশে গেছিলাম। শেষ না করে উঠা সম্ভব হয়নি। কোয়ান্টাম ফিজিকসের সাথে প্রেমের গল্প ভালোই লেগেছে। ❝দেজা ভ্যু❞-র বিশ্লেষণটা ভালো লেগেছে। আমারও মাঝে মাঝে এমনটাই মনে হয়। তবে সব ভালো তো ভালো না। ভালোর খারাপ দিকও আছে। এই বইতেও তেমন ভালো না লাগার ব্যাপারও ছিল। বইটা পুরোদস্তর এগিয়েছে রফিককে ঘিরে। চারদিকে শুধু রফিক আর রফিক। রফিকের প্রেম, এই জগতে রফিকের একাকীত্ব, অর্থের সংকট, ছন্নছাড়া রফিক সবই খালি রফিক। এমনকি রফিকের সুইট হার্ট শারমিনের কোনো পদচারণাই ছিল না এই জগতের ঘটনায়। যা একটু নাম এসেছে তা সেই রফিকের মুখে কিংবা লেখায়। প্যারালাল ইউনিভার্সে শারমিন সম্পর্কে যা একটু জানা যায় তা-ই। বইয়ের শেষেও সেই রফিক। ঐ জগতে শারমিনের বা ইশতিয়াকের কী হলো সেটার কিছু বর্ণনা থাকলে ভালো হতো। এই জগতে শারমিনকে একটু ফোকাস করলে আমার মনে হয় আরেকটু ভালো হতো। রফিক, শারমিন, দীপা, ইশতিয়াকের ভালোবাসা খালি দুঃখই দিয়েছে। মনে হচ্ছিল এতো দুঃখ কোথায় রাখবে এরা! পরের জন্মে এরা কে কাকে পাবে? রফিকের মন জুড়ে শারমিন আবার শারমিনের সমস্যা যা পাইয়াছি তা আর মজা না কিন্তু সেটাকে ছাড়াও যাবে না, আবার ইশতিয়াকও ছুটছে শারমিনের পেছনে কোনো এক অজানা কারণে। মাঝে দিয়ে এক কোণায় লেগে আছে দীপা। না রফিক নতুন করে দীপার প্রেমে পড়তে পারছে না পারছে শারমিনকে ভুলতে। সব মিলে অন্য ধাচের এক বই ❝জীবন অপেরা❞। খারাপ দিকগুলো একপাশে রেখে পড়েই নেয়া যায় বইটি। শেষকথা, কোনো দুনিয়াতেই শান্তি নেই আসলে। আসলে আমরা ভাবি জীবনটা এমন না হয়ে অমন হলে বোধয় সুন্দর হতো। একে পেলে হয়তো সুখী হতাম। কিন্তু আদতে কি একেবারে সুখী হওয়া যায়? এইজন্যেই গ্রিক ট্র্যাজেডিগুলো বলে, ❝ℳℴ𝓇𝓉𝒶𝓁 𝒻𝒶𝓉ℯ 𝒾𝓈 𝒽𝒶𝓇𝒹. 𝒴ℴ𝓊'𝒹 𝒷ℯ𝓈𝓉 ℊℯ𝓉 𝓊𝓈ℯ𝒹 𝓉ℴ 𝒾𝓉.❞ প্রচ্ছদ: ছিমছাম প্রচ্ছদ। ভালো লেগেছে। বাতিঘর ঢাকার প্রোডাকশন নিয়ে কিছু বলার নেই। এরা সবসময় দারুণ।
' এতটুকু প্রশ্রয় দিয়ো আমায়, আমি তোমায় দেব,সারাটা জীবন।'
বাংলাদেশী পরিচালক, লেখক এবং অনুবাদক আলভী আহমেদের প্রথম মৌলিক উপন্যাস ' জীবন অপেরা '। কাহিনীর সূচনা হয় মূলত প্রধান চরিত্র রফিক যখন নিজেকে ভিন্ন এক জগতে আবিষ্কার করে যেখানে সে তার পরিচিত জীবনের থেকে বেশ আলাদা জীবনে নিজেকে দেখতে পায়। লেখক তার উপন্যাসে প্যারালাল ইউনিভার্স , শ্রোডিঙারের বিড়াল,কোয়ান্টাম ফিজিক্স ইত্যাদি বিষয়ক আলোচনা তুলে ধরেন।তাছাড়াও ই এসপি ও দেজাভ্যু এর হালকা উল্লেখ ও রয়েছে।
তবে বৈজ্ঞানিক যুক্তিধারার বাইরে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে রফিকের দুইটি ভিন্ন জীবন ও সেই জীবনের পাওয়া না পাওয়ার হিসেব। এই বইটার থেকে নতুন একটি শব্দের সাথে পরিচিত হই ," সাওদাজ"
{Brazilian Portuguese word " Saudade" is an emotional state of melancholic or profoundly nostalgic longing for a beloved yet absent something or someone. It derives from the Latin word for solitude.}
বইতে দীপা বলেছিল ' দুঃখবিলাস '। কথাটির সাথে রফিকের ভীষণ রকম মিল পাওয়া যায়। আমরা মানুষেরা শূন্যতা কে ভীষণভাবে ভয় পাই যার ফলে শূন্যতা এড়াতে আমরা দুঃখ কে প্রশ্রয় দিয়ে বসি।তখন হয়ে যায় আমাদের নিজেদের দুঃখ বিলাস। রফিকের জীবনেও তাই ই ঘটে।দুই ভুবনে দুইটি ভিন্ন জীবনেও রফিকের দুঃখবিলাসের কোনো গতি হয় না। প্যারালাল ইউনিভার্স এ ভ্রমণের জন্য ইশতিয়াক আহমেদকে যদিও নির্দিষ্ট একটি পন্থা অবলম্বন করতে হয় তবে রফিকের ক্ষেত্রে কোনো ধরাবাধা নিয়ম লেখক দেননি।অন্নভুবনের বিবাহিত রফিকের কোনো উল্লেখ ও তিনি করেননি।
আলভী আহমেদের "ফোর ইসটু ওয়ান' পড়ে আমার ইচ্ছে হয়েছিল তার মৌলিক বই পড়বার। পড়ার আগে একটু হীনম্মন্যতাও কাজ করছিল কেননা ছোটগল্প দারুণভাবে পাঠক হৃদয় আকর্ষিত করতে পারলেও উপন্যাস পারবে কী পারবে না তা নিয়ে। তবে আলভী আহমেদ অনেকটা মনে হচ্ছে পেরেছেন।
প্যারালাল ইউনিভার্সে নিয়ে আমি এর আগেও তরুণ লেখকদের কয়েকটা উপন্যাস পড়েছি। তবে তারা যা পারেন নি তাদের লেখায়, তা হলো প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে যারা বিজ্ঞান বোঝে না তার কাছে ব্যাপারটা ক্লিয়ার না করা। কিন্তু আলভী আহমেদের এখানেও বেশ প্রফেসরদের মতন দারুণ করে বলেছেন। বলেও থামেন নি বুঝিয়েও ছেড়েছেন। সেক্ষেত্রে প্যারালাল ইউনিভার্সে নিয়ে যারা উপন্যাস পড়তে আগ্রহী তাদের এই বইটি পড়তে বলব সর্বপ্রথম।
গল্পটিতে শুধু পদার্থবিজ্ঞানই না, পালমোলজি, সাইকোলজির দারুণ দারুণ সব লোভনীয় টার্ম, থিওরি পাঠক হৃদয়কে চমৎকৃত করতে বাধ্য করবে৷ পদার্থের বেশ কিছু থিওরিকে আলভী আহমেদ এত সহজ করে উপস্থাপন করেছেন যে আমি এত সহজ করে কাউকে বলতে শুনি নি।
গল্প পড়তে গিয়ে কিছু মাঝে মাঝে বেশ বিরক্ত লেগেছে। কেননা কিছু কিছু জায়গায় পুতুপুতু টাইপের প্রেমালাপ যা গল্পের দুর্বল পয়েন্ট।যদিও ইহা একটি আদ্যোপান্ত প্রেমের উপন্যাস। এটি রফিকের গল্প।মানুষের একটা জীবন থাকে কিন্তু রফিকের দুটো জীবন। এক জীবনে ব্যর্থ প্রেমিক আর এক জীবনে সফল প্রেমিক।
বইটির প্রচ্ছদটাও নজরকাড়া। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। এটিই মনে হয় আমার সংগ্রহে থাকা হলুদ রঙের প্রচ্ছদের বই।হিহিহি!
রফিক আর শারমিনের গল্প। রফিকের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শারমিনকে প্রচন্ড ভালোবাসতো ও কিন্তু কখনও বলা হয়নি সে কথা। তাইতো একসময় বিয়ে করে আমেরিকা চলে যায় শারমিন। কিন্তু রফিক তো তাকে ভুলতে পারেনি। তাই রফিকের এই অপ্রাপ্তিকে পূর্ণ করতে প্রকৃতি নিজেই হাত বাড়িয়ে দেয়। প্যারালাল ইউনিভার্সে শারমিনকে কাছে পায় রফিক। তারপর?
লেখক যেমনটা বলেছেন সাই-ফাই এর আড়ালে বইটা আসলে ভালোবাসার গল্প। গল্পটা খুবই মন কেমন করা ধরণের। পুরো সময়টা রফিককে আমি খুব ফিল করেছি। ওর আকাঙ্ক্ষা, হাহাকার, দুশ্চিন্তাকে খুব চেনা মনে হয়েছে। কোন মুভিতে যেন একটা ডায়লগ ছিল অনেকটা এরকম ; যখন তুমি কোনোকিছু খুব গভীরভাবে চাও তখন প্রকৃতিও তোমাকে সাহায্য করে। এই বইটা অনেকটা সেই থিমেরই প্রকাশ। কিন্তু এটা ছাড়িয়ে বইটা আরেকটু এগিয়েছে কেননা রফিক দুই জীবনের দোলাচালে পড়ে আটঁকে গেছে।
ভালো লেগেছে বইটা। রফিক আর শারমিন ছাড়াও ইশতিয়াক আর দীপা চরিত্র ইন্টারেস্টিং ছিল। নওশাদ মামাও ভালো ছিল। লেখনী বেশ সহজ, দ্রুতই পড়ে ফেলেছি বইটা। দেজা ভ্যু, ইএসপি, নিউমারোলজি এসব একটু খটমটে মনে হয়েছে ; আরেকটু সহজ করা যেত বা এত বিস্তারিত বর্ণনা না করলেও চলতো।
"এতটুকু প্রশ্রয় দিও আমায়, আমি তোমায় দিবো, সারাটা জীবন!"
জীবন অপেরার শেষ লাইনটা!
এই প্রথম কোনো উঠতি বাঙালি লেখকের বই পড়লাম। উঠতি লেখকদের নিয়ে একটা বাজে ইম্প্রেশন থাকলেও সেটি কেটে গেছে এই বই দিয়ে। আলভী মাহমুদের লেখায় মুরাকামি-হুমায়ুন উভয়ের ইনফ্লুয়েন্স আছে (উনি বেশ কয়েকটা মুরাকামি বাংলায় ট্রান্সলেটও করেছে) এবং আমিও বিরাট বড় মুরাকামি-হুমায়ুন ফ্যান হওয়ায় উনার লেখা উপভোগ করেছি। সাইন্স ফিক্শন এবং রোমান্সের কম্বিনেশনটাও ভালো ছিল। বইটা পড়ে একটু হিংসাও হচ্ছে, আমিও যদি রফিকের মতো আমার "what if" সিনারিওগুলো স্বচক্ষে দেখতে পারতাম!
4/5, রেকমেন্ডেড, কিন্তু অনেক বেশি এক্সপেকটেশন না রাখাই ভালো।
আলভী আহমেদ এর বই এই সবে শুরু করলাম আর অবস্থা এমন হয়েছে,একটা বই শেষ করার পরেই লেখক কেমন লেখে তা জানার আগ্রহে আর বই পড়া। আলভী আহমেদ আমাদের বর্তমান জীবনটাই যেনো তুলে ধরছে। আমি প্রতি চরিত্রে নিজেকে না হয় আমার চেনা কাউকে খুজে পাই!
"জীবন অপেরা" বইটা হুটহাট একটা আক্ষেপ তৈরী করে বসে। লেখা বেশ সহজ, সাবলীল।
বাংলায় একটা কথা আছে, বিরাট পর্বতের মূষিক প্রসব। সোজা বাংলায় যেটাকে বলা যায়, বিরাট সম্ভাবনার মৃত্যু অর সামথিং। আক্ষরিক অর্থেই লেখক নিজ হাতে সম্ভাবনাময় একটা কাহিনির মৃত্যু ঘটালেন। সবশেষে প্রতিক্রিয়া হিসেবে ছোট্টো ‘ধুর’ শব্দটাই বরাদ্দ রইলো।