বাংলার ভূমিব্যবস্থাকেন্দ্রিক শাসনকাঠামোতে প্রজা তথা জনসাধারণের হিস্যা থাকত। মোগল আমল পর্যন্ত জমির মালিক ছিল সরকার তথা সম্রাট স্বয়ং। ফারসি 'জমিদার' শব্দটির মানে আর যা-ই বোঝাক কোনোভাবেই জমির মালিক বোঝাতো না। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে বাংলার দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকাঠামো অদল-বদল হয়ে গেল। ব্রিটিশরা নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করতে জমিদারশ্রেণি নামে একটি জালিম ও আয়েশিশ্রেণির সৃষ্টি করল। ফলাফল ইতিহাসের আমূল পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন নিয়ে লিখেছেন ড. সিরাজুল ইসলাম।
একবসায় পড়ার মতো না। ভীষণ তথ্যবহুল। বানান বিভ্রাট এবং একই বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি বিরক্তিকর।
তকদিরে লেখা না থাকলে আর একটা ভালো প্ল্যান ঠিকমত বাস্তবায়ন করতে না পারলে নবাব শামসদ্দৌলাহর মত প্রতিভাবান মানুষও বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। তিনি ছিলেন বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত। সমকালীন ইউরোপীয় রাজনীতি ও ইতিহাস সম্পর্কে তিনি ছিলেন অবগত। প্রফেসর সিরাজুল ইসলামের তাঁর ' বাংলার ইতিহাস ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো ' বইতে লিখছেন, ঢাকার নবাব জং এর এই ভাই নিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থেকে উপলব্ধি করেন যে, এখানে ওখানে খণ্ড খণ্ড বিদ্রোহ করে কোম্পানি সরকার উৎখাত করা সম্ভব নয়। এরকম এক সামরিক ও অর্থনৈতিক মহাশক্তির পতন ঘটাতে হলে দেশব্যাপী এক বিপ্লবের প্রয়োজন যেখানে থাকবে সারা দেশজুড়ে অভ্যুত্থান আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।সেজন্য তিনি উপমহাদেশের সব আঞ্চলিক স্বাধীনতাকামী শক্তিকে একটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বাধীন শক্তির অধীনে সংগঠিত করার কথা ভাবেন এবং সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করে সুবিধামতো এক সময়ে স্বাধীনতার যুদ্ধ ঘোষণা করার। বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশরা যেন সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে না পারে সেজন্য আফগানিস্তানের আমীর জামান শাহকে রাজি করান পশ্চিম দিক থেকে কোম্পানির রাজ্য আক্রমণ করার। একই সাথে ওমান ,হায়দারাবাদের মুসলিম বাদশাহদের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন। তাঁর বিদ্রোহের নীলনকশা প্রণয়নে সবচাইতে বড় অবদান রাখেন অযোধ্যার নির্বাসিত নবাব ওয়াজির আলী এবং মুর্শিদাবাদের নবাব।
কিন্তু কপালের কি লিখন! ১৭৯৯ সালে নবাব ওয়াজির আলী তাঁর নির্বাসনস্থল বেনারসে এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বহু ইউরোপীয়কে হত্যা করে জঙ্গলে পলায়ন করেন। পলায়নের পর তাঁর ব্যক্তিগত কাগজপত্রের মধ্যে এই মহাবিদ্রোহের নীলনকশা খুঁজে পায়। দলিল পাওয়া মাত্রই শামসদ্দৌলাহ বন্দী হন। তিনি তখন অপেক্ষা করছিলেন আমীর জামান শাহের আক্রমণের। এদিকে আমীর জামান শাহও তাঁর কথা রাখতে পারেননি কারণ তখন তাঁর নিজ দেশেই এক রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। জামান শাহ আক্রমণ করতে পারলে আর বিদ্রোহের গোপনীয়তা ফাঁস না হলে উপমহাদেশের ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লিখিত হতো।
প্রফেসর সিরাজুল ইসলামের তাঁর ' বাংলার ইতিহাস ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো ' বইয়ের শুরুতে বিশ্লেষণ করছেন পলাশীর যুদ্ধে কেন কিভাবে এমন বিপর্যয় ঘটলো, এরপর কিভাবে ব্রিটিশরা বাংলায় তাদের আধিপত্য স্থাপিত করলো, শাসন- বিচার-প্রশাসন-পুলিশ কাঠামো তৈরি করলো আর এর ফলাফল বাংলার মানুষ ভোগ করলো।
আসলে একটা বিদেশী বণিক গোষ্ঠী যে একটা উপমহাদেশ কব্জা করে ফেলতে পারে ,সেটা মুঘল সম্রাট বা বাংলার নবাবরা বুঝতে পারেননি। ইতিহাস হয়তো এভাবেই সৃষ্টি হয়। নয়তো যে ইংরেজরা ব্যবসা করতে এসে মুঘলদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো,তাদের সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য মুঘলরা একটা শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তুলেনি। অথচ মুঘলদের আর্থিক ক্ষমতা ছিল, দেশে জাহাজ নির্মাণের সামগ্রী ছিল,জনসম্পদ ছিল এমনকি ইউরোপীয় জাহাজ নির্মাণ কারিগর- প্রকৌশলী নিয়োগ করা যেত। এখানেই শেষ না। সম্রাট আওরঙ্গজেবের ইন্তেকালের পরে সম্রাট ফররুখশিয়র সামান্য অর্থের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়া এক ফরমান জারি করেন।
শুরুর দিকে কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশদের শাসন ক্ষমতায় সরাসরি যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা ছিল না। বরং এখান থেকে অর্থ পাচার আর লুট করাই মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু লুট করতে গিয়ে একের পর এক পরিস্থিতি এমনভাবে উদ্ভূত হয় যে তারা ট্রায়াল এন্ড এররের মধ্য দিয়ে প্রশাসনের কাঠামোও তৈরি করতে থাকে।
এই ট্রায়াল এন্ড এররের মূল্য চুকাতে হয় বাংলার মানুষকে দুর্ভিক্ষে প্রাণ দিয়ে, জমিদারের খাজনা থেকে বাঁচতে ভূমি থেকে পালিয়ে আর জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম দেখাচ্ছেন কিভাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত – সূর্যাস্ত আইন সহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিভিন্ন শোষণনীতি এখানকার রায়ত-জমিদার, বিচারক- বিচারপ্রার্থী সবাইকে দুর্নীতিতে অভ্যস্ত করছে। কর্নওয়ালিস কোড নামের এক জবরদস্তিমূলক আইন বিধি বিচারের নামে অবিচারের জন্ম দিচ্ছে। মামলা-মোকাদ্দমা আর উকিল-মোক্তার-টাউট-মামলাবাজদের দৌরাত্ম্য বাড়াচ্ছে। পুরাতন অভিজাত জমিদার পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে আর নতুন জমিদারশ্রেণীর সৃষ্টি হচ্ছে যারা আসলে কোম্পানির বানিয়া, মুৎসুদ্দি , কোর্ট কাছারির কর্মচারী আর জমিদারী আমলা ও ফড়িয়া ব্যবসায়ী। এবং এই সবকিছু কিভাবে এক দীর্ঘ রেশ তৈরি করে যা আমরা এখনো বয়ে চলেছি।
প্রফেসর সিরাজুল ইসলামের এই বই হয়তো শশী থারুরের Inglorious Empire এর মত গোটা দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের ব্রিটিশ শোষণকে তুলে ধরেনি।কিন্তু বাংলায় কোম্পানির শোষণনীতি ও ব্রিটিশ রাজ ও মুঘল-নবাবদের শাসন সঙ্ক্রান্ত দর্শনের যে তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছেন,তা আমার বেশ চমৎকার লেগেছে। বইয়ে থাকা কিছু বিস্তারিত তথ্যের ভার পাঠের গতিকে শ্লথ করে ফেলতে পারে। সেগুলো কিছু কমিয়ে এবং অনেকগুলো পুনরাবৃত্তি বাদ দিয়ে বইটিকে সাধারণ পাঠকের জন্য প্রায় অর্ধেক সাইজে নিয়ে আসা সম্ভব যাতে করে পাঠক বুঝতে পারে কি ঘটেছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের সাথে এবং আমরা কিভাবে এখনো আসলে ‘ বৃটিশ উপনিবেশ’ এই বাস করি!
Intriguing! Fascinating! Mindblowing! Professor Sirajiul Islam provides a very analytical and critically-lensed historical account of the British rule in Bengal and India. He has tried to cover the subject matter of this book from different points of view, which makes it more interesting. Also, his style of writing was fluent, so it was very easy to read. Overall, it was an excellent book!