"গল্পটা মোহাচ্ছন্ন এক আশ্চর্য মায়ানগরীর। যে নগরের বাসিন্দারা অযাচিতভাবেই জড়িয়ে আছে একে অন্যের জীবনের জটাজালে। রূপকথার এই গল্পটি নর-নারীর কিছু অনাহুত সম্পর্কের, ক্লেদাক্ত কলুষতার অথবা নিতান্তই মানবিকতার। আদি এবং অন্তে গল্পটি আদতে জাদুর এই শহরের।"
প্লট বা কাহিনীর আলোকপাত নেই, তাও আকর্ষক একটা ফ্ল্যাপ। একটা খুনের তদন্তে গল্পের শুরু, ইন্সপেক্টর হাফিজ ক্রাইম সিনে এসেছেন, একটা কাঠের মার্কেটের সামনে। কোন মায়ানগরী তার উল্লেখ না থাকলেও, পাঠকের মাথায় চট করে চলে আসবে জানাশোনা ঢাকা শহর, মার্কেটটা হয়তো বঙ্গবাজার।
মার্ডার মিস্ট্রি হিসেবে শুরু হওয়া গল্পটা এরপর লিটারেরি ফিকশনের রূপ নেয়, মানে ওই 'সামাজিক গল্প'। এই গল্পের দরকারি চরিত্ররা হয় নিম্নবিত্ত, অথবা অতি নিম্নবিত্ত। মধ্যবিত্ত আছেন হাফিজ একাই। একজন ভিক্ষুকের টিকে থাকা এবং উচ্চাশাও এই গল্পের অনুষঙ্গ , সিএনজি চালক হাশেমের পরিবারও নিজেদের গল্প বলতে এসে দাঁড়িয়েছে। গৎবাঁধা সামাজিক গল্প কিন্তু না সেটা মোটেই। আগাগোড়া এবার চলছে থ্রিলারের দৌড়। ভিক্ষুক, সিএনজিওয়ালা, পুলিশ, খুন এবং তদন্তকাজ, আর সবটুকুর মোটিভ নাকি লুকিয়ে আছে তাদের প্রতিদিনকার জীবনযাপনের মাঝেই, অবাক করে না ব্যাপারটা?
"পিপীলিকার ডানা" মানুষের প্রত্যাশার গল্প। পিঁপড়ের যেমন ওড়ার কথা নয় তবু মরার আগে উড়তে চায়, তেমন সাধারণ জীবনমানের চেয়ে একটু বেশি চেয়ে বসার গল্প, এই উপন্যাস। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ জীবনের অনুপ্রেরণা আছে, হাফিজের স্ত্রী, হাশেমের অসুস্থ সন্তান, কালামের গোপন প্রেমিকা — এই যে ছন্দের বাইরে সামর্থ্যের বাইরে উড়তে চাওয়ার বেপরোয়া চিন্তা, এর পেছনে যার যার অনুপ্রেরণা আছে আপন আপন জীবনে। এর সাথে খুন কিভাবে জড়িত? আর কার সাথে সবচে বেশি জড়িত? রহস্যের সমাধান আছে তার মাঝেই।
উপন্যাসটার চমৎকার একটা দিক হলো, শেষদিকে কয়েক জায়গায় 'কালশী', 'মিরপুর' উল্লেখ করা ছাড়া কোথাও ঢাকার কথা না বলা হলেও যেমন মনে হবে, যে, প্রতিটা রাস্তা আপনার চেনা, তেমনই ঘটনাপ্রবাহের আদ্যোপান্ত আপনাকে ভাবাবে, 'এসব তো প্রতিদিনকার ঘটনা। এরকমটাই তো ঘটে।' ঠিক যেভাবে গন্তব্যে যেতে রাজি না হলে সিএনজিওয়ালা 'নবাবের বাচ্চা' গালি শোনে। সংলাপ নির্মাণে লেখক নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন এত সঠিকভাবে তুলে এনেছেন তা পড়ে অবাক লাগে, "হ, ঢাকা শহরে তো খালি আপনেরাই নবাব, আর আমরা খালি চাকর-বাকর।"
হাশেমের মুখে যখন পড়ছিলাম "গরীব মানুষ যহন বিপদে পড়ে, তহন তার হুশ থাকে না। আমারও এহন নাই, স্যার। আমারও এহন মাতা-মুতার ঠিক নেই। তাই স্যার আপনারে আপন ভাইবে বলতিছি, কোনো রিস্ক নিয়েন না।" তখন সত্যি মনে হচ্ছিল চঞ্চল চৌধুরী সংলাপ বলছেন। ওয়েব সিরিজের সুদিনে 'পিপীলিকার ডানা' দারুণ একটা স্ক্রিনপ্লে হতে পারে, সে প্রসঙ্গে যাবার আগে চরিত্র নির্মাণে আরেক পাক ফেরত যাই।
'পিপীলিকার ডানা' কোনো সব-পেয়েছির-দেশের কাহিনী না, আমাদের সমাজের মতোই সেখানে উচ্চাশার সুযোগ খুব অল্প লোকের আছে, সাধারণ মানুষ ওসব মাথায় আনে না। তবু গঁতের বাইরে উড়তে চাওয়ার প্রবণতা কার কেন হলো, সেখানটা লেখক এঁকেছেন দারুণ যত্নের সাথে। কালামের সাথে 'দুনিয়াটা মুতে ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছা করে' কখনো পাঠকের, হাশেমের মতো টের পায় 'আফিয়াকে সে ভালবাসে কি না জানে না। তবে আফিয়াকে ছাড়া যে সে থাকতে পারে না, এটা সে বহু আগেই বুঝে গেছে'। চাকরির রুটিনে ক্লান্ত জীবনের ছায়া থেকে ঘর-কে আড়াল করার প্রচেষ্টা হাফিজের মতো করে পাঠক খুব অনুভব করতে পারবেন। আর এর মাঝেই যখন এমন কোনো প্রয়োজন এসে দাঁড়ায় যা পূরণ করার সাধ্য জীবন দিলেও হয়ে যাবে না, তখনই মানুষের দরকার হয় পিঁপড়ের মতো ওড়ার। সমাজে কেউ ওড়ে, বেশিরভাগ না।
কাহিনীর অভিনব গতি আপনাকে শেষ কয়েক পাতায় এনে দুর্দান্ত পরিবর্তনের মুখোমুখি করবে। এবং খুবই অবাক হয়ে খেয়াল করবেন, একাধিক রহস্য উন্মোচনের সূত্র লেখক মাঝে মাঝে আপনাকে দিয়ে এসেছেন, এমন চমৎকার ফোরশ্যাডো হয়তো আপনি সামাজিক গল্পের মেজাজের মাঝে আশাও করেননি। কোনো ছেঁড়া সুতো নেই পুরো বইয়ে, স্বগত চিন্তা থেকে রাস্তার ভিখারী, কোনো উপাদানকে পাঠক অপ্রয়োজনে আনেননি। শেষটুকু একদম কল্পনারও অতীত। আর প্রতিটা চরিত্রের স্বরূপ আরো অদ্ভুতভাবে লক্ষ্য করবেন, যদি শেষ করে আবার আগাগোড়া পড়তে যান বইটা। রীতিমতো, সবটা আমার চোখের সামনেই ছিল, লক্ষ্য করতে হবে বলেই মনে হয়নি আমার!
লেখক ওয়েব সিরিজের জন্য চিত্রনাট্য লিখেছেনও, বায়োস্কোপের 'সুন্দরী'। এর আগেও প্রকাশিত 'ধনুর্ধর' উপন্যাসটা লিখেছিলেন মূলত সিনেমার চিত্রনাট্য হিসেবেই। 'পিপিলীকার ডানা' একটা দুর্দান্ত ওয়েব সিরিজ হতে পারে। না হলেও, চিত্রায়ণ এত চমৎকার যে পড়তে গেলে চোখে ভাসবে।
বাঁধাইয়ের মান বাতিঘরের মতোই, তবে যে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা করে দিয়েছে এই বইটিকে, সেটা হলো প্রচ্ছদ। মাহাতাব রশীদ এবং আয়ান এই প্রচ্ছদটা করেছেন, লেটারিং সহ। বইয়ের সাইডে একই লেটারিং ব্যবহৃত হলে দেখতে ভালো লাগতো। এই কাজটার জন্য বইটাকে আরো আউট-অব-দ্য-বক্স মনে হয়েছে, ভেতরে আদতে তা-ই।
পিপীলিকার ডানা
লেখক : সিদ্দীক আহমেদ
জনরা : কন্টেম্পরারি/সামাজিক উপন্যাস, মার্ডার মিস্ট্রি, থ্রিলার
প্রকাশক : বাতিঘর
প্রকাশকাল : জুন ২০২১
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ১৯২
মূল্য : ২২০ টাকা