গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার শপথকে বুকে আঁকড়ে ধরে ১৯৭১ সালে অর্থনৈতিক শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করে চিরস্থায়ী মুক্তির আলোকযাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আজ ঠিক কোথায়? ৫০ বছরের অর্জন ও ব্যর্থতা, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ— সুনিপুণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে নতুন পথপরিক্রমার সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করাই সুবর্ণজয়ন্তীর প্রধানতম উপলব্ধি হওয়া চাই। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্নকে ধারণ করে বিগত এক দশক পথ চলেছে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে একটি মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে নিজেকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করার অঙ্গীকার করেছে। একসময়ে দরিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের এমন মর্যাদা নিশ্চয়ই একটা মহিমান্বিত বিষয়। সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির অতীত দর্শনের মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র-ভাবনার নতুন চিন্তার বিকাশ ও প্রকাশ ঘটে। উন্নয়ন দর্শনের সমালোচনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী সাম্যচিন্তা প্রবল হয়ে ওঠে। নতুন স্বপ্ন, লক্ষ্য ও অভীষ্ট নিয়েই উদ্যাপিত হয় এক-একটি জয়ন্তী উৎসব। ঠিক এমন একটি মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ‘বাংলাদেশ : অর্থনীতির ৫০ বছর’ পুস্তক প্রকাশের আয়োজন।
ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব অর্থনীতির জগতের কেউ নন। ভদ্রলোক পেশায় প্রকৌশলী। কিন্তু অর্থনীতির বিভিন্ন দিক নিয়েও লেখালিখি করেন। বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তিতে লেখক এদেশের অর্ধশত বছরের অর্থনীতির হালচাল বুঝতে চেষ্টা করেছেন ; খণ্ডন করেছেন প্রচলিত উন্নয়নের বয়ানকে।
রক্তস্নাত বাংলাদেশের জন্ম একটি অন্যরকম দশকে। সত্তরের দশকের প্রথমে তখনো আবেদন হারায়নি বামপন্থা ; সমাজতন্ত্র শোচনীয়ভাবে ধরাশায়ী হয়নি ধনতন্ত্রের কাছে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বছরেই পতন ঘটেছিল ব্রেটন উডস আর্থিক ব্যবস্থার। এতদিন মুদ্রামান বিবেচনায় স্বর্ণের কদর ছিল। কিন্তু একাত্তরে ব্রেটন উডসের পতনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে 'গোল্ডেন উইন্ডো' বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাতে ডলারের সাথে স্বর্ণমানের সম্পর্কটি চূড়ান্তভাবে ছিন্ন হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি নিক্সনের এই শক কাটতে না কাটতেই মধ্যপ্রাচ্যে সংকট ঘনীভূত হয়ে ওঠে। ফলাফল আরব দেশগুলোর তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরপরই বিশ্বঅর্থনীতিতে বড়ো বড়ো কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে ইউরোপের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি। যেখানে ১৯৬৫ সালে পশ্চিমা দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতির হার ৩ শতাংশ , ১৯৭৫ সালে সেই হার পৌঁছে যায় ১২ শতাংশে। এই মূল্যস্ফীতিসহ তেলঅস্ত্রের খেসারত সদ্যস্বাধীন দেশকেও দিতে হয়। কেননা তখন দেশের রিজার্ভ ফাঁকা।
বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক গৃহীত সমাজতন্ত্রমুখী অর্থনীতি কতটা বাস্তবসম্মত ছিল তা নিয়ে বিশদ একটি বিশ্লেষণ আশা করেছিলাম। কিন্তু লেখক সেদিকে এগোননি। অথচ বঙ্গবন্ধুর নেওয়া শিল্প জাতীয়করণ নীতির একটি গভীর প্রভাব এদেশের অর্থনৈতিক দর্শন আলোচনায় রয়েছে।
জিডিপিকে এদেশের উন্নয়ন দর্শনের সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার হিসেবে দেখানোর প্রয়াস নতুন নয়। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি ছিল। ৯.৫৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির এই রেকর্ড এখনো কোনো সরকার ভাঙতে পারেনি৷ ৯.৫৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিন্তু '৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে রুখতে পারেনি। তাহলে জিডিপি ঠিক কোন কাজে দেয় তা বুঝতে পারছি না। পাকিস্তানে আমাদের শোষণ করতে তা ধ্রুবসত্য। আইয়ুবের আমলকে 'উন্নয়নের দশক' হিসেবে পালন করা হয়েছিল। এই দাবির মধ্যে পরিসংখ্যানগত একটি বড়ো সত্য বিদ্যমান। '৬৩-৬৪ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০.৯৫ শতাংশ! অর্থাৎ হাতেকলমে প্রায় ১১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাংলার মানুষকে তুষ্ট করতে পারেনি। তাহলে গলদ কোথায়? জিডিপির সরকারি হিসেবে নাকি জনগণের মনে? সরকারি হিসেব নিয়ে প্রশ্ন কিংবা কৌতূহল উদ্রেক করে জিয়াউর রহমানের আমল। ১৯৭৭ সালে ২.৬৭ শতাংশ জিডিপি পরের বছর বেড়ে ৭.০৭ শতাংশে দাঁড়ায়। আবার সকল হিসেবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ১৯৮০ সালে ০.৮০ শতাংশ জিডিপি থেকে এক লাফে ৭.২৩ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। কোন জাদুবলে ০ থেকে ৭-এর অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হলো তা বুঝতে পারছি না। ইদানীং 'শত্রুরাষ্ট্র' পাকিস্তানকে সকল পরিসংখ্যানে পরাস্ত করার প্রচারণা গণমাধ্যমে দেখি। মজার ব্যাপার হলো পাকিস্তানের 'দোসর' বিএনপির আমলে ২০০৬ সালে প্রথম আমরা জিডিপিতে পাকিস্তানকে অতিক্রম করি এবং বর্তমান সরকার সেই ধারা অব্যাহত রাখছে। তাহলে জিডিপিতে পাকিস্তানকে কুপোরাত করার শিরোপা প্রথম পাচ্ছে... থাক নাম না বলি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির চাবিকাঠি মোটাদাগে দুইটি খাত যথা- তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্স। লেখক দাবি করেছেন এই দুটি খাতের সূচনা জিয়াউর রহমানের আমলে! অবশ্যি এদেশে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি সৃষ্টির জনকের উপাধিও পাবেন জিয়াউর রহমান। জিয়ার আমলের ভালো-মন্দ দু'দিক নিয়েই সংক্ষেপে আলোচনা পাবেন। তাতে শাসক জিয়াকে প্রাণভরে গালাগালি করার প্রবণতা খানিকটা হ্রাস পাওয়ার বিশ্রী সম্ভাবনা রয়েছে।
এরশাদের শাসনামলকে অনেকেই প্রভূত উন্নয়নের সময়কাল হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু লেখক একদম রাজি নন। উল্টো এদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে নিকৃষ্ট সময়কাল হিসেবে এরশাদের শাসনামলকে চিহ্নিত করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এই জেনারেলের নয় বছরে দেশের অর্থনীতি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। নয় বছরে জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৪০ শতাংশ! যা পাকিস্তানের 'দোসর' বিএনপি-জামাতের চাইতেও অনেক কম! পরিসংখ্যানে বিশ্বাসী হলে তো আসর দোসর কে তা নিয়ে প্রচলিত বয়ান পরিবর্তন করতে হয়।
এদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো প্রকল্প পদ্মা সেতু। ২০০১ আওয়ামী লীগের আমলে এই সেতুর প্রাক-ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় হলেও বিএনপির পুরে পাঁচ বছর কোনো কাজ হয়নি। সাধারণত এত বড়ো সেতু উন্নত বিশ্বে টানেল পদ্ধতিতে করা হয়। টানেল পদ্ধতিতে খরচ বেশি - এই যুক্তি দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার টানেল পদ্ধতির প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। প্রথাগত পদ্ধতিতে তখন নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিো দশ হাজার কোটি টাকা। আজ ২০২১ সালে এসে সেই ব্যয় ত্রিশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে রেল সেতু ছাড়াই! তাহলে সবচেয়ে উন্নত টানেল পদ্ধতি টাকার কারণে বাতিল করার যৌক্তিকতা রইল কোথায়?
পদ্মার মতো নদীর ভূমির গঠন স্থায়ী নয় বরং অনেকবেশি পরিবর্তনশীল। সেখানে মাত্র ১১টি পিলারের মাটি পরীক্ষা করেই বাকি ৩২টি পিলার বসানো হয়েছে পদ্মার মতো নদীতে।
' এত পয়হা কোথায় বাওয়া যে ডাবল লাইনের রেলপথ বসাবো' - অথচ ১০৫ বছর আগে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরা পদ্মা নদীর ওপর ডাবল লাইনের রেলপথ নির্মাণ করে দিয়েছিল। যমুনা সেতু থুক্কু বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুতে একমুখী রেলপথ নির্মাণ করাতে ইতোমধ্যে যথেষ্ট ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে আমাদের। তা-ও অতীত থেকে শিক্ষা নিইনি আমরা।
পদ্মা সেতুর মেয়াদকাল ১শ বছর৷ এই জনবহুল দেশে মাত্র চার লেনের সেতু কীভাবে একশ বছর সেবা দেবে তা নিশ্চিত নয়। এই সেতু আগামী ২০-২৫ বছর পরে যানজটের বড়ো উৎস হয়ে দাঁড়াবে না তা কে বলতে পারে? পদ্মা সেতুর প্রতিটি পিলার ও স্প্যান বসানোর পর আমাদের গণমাধ্যমে যে প্রচার-প্রচারণা দেখা গিয়েছে তা অভূতপূর্ব। যেন পদ্মার মতো নদীগুলোতে এমন সেতু পূর্বে কখনো হয়নি। অথচ ব্রিটিশরাই এই ধরনের কমপক্ষে দুইটি সেতু তৈরি করেছিল। তাই গণমাধ্যমের নির্লজ্জ প্রপাগাণ্ডা দলদাসের ন্যায় মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়। উপরন্তু, এই সেতু নিয়ে সকল মিথকে চ্যালেঞ্জ করেছেন ফয়েজ তৈয়্যেব।
বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনের রোল মডেল - এই প্রোপাগাণ্ডাকে সমূলে উৎপাটিত করেছেন লেখক। বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বরের তালিকা অনুযায়ী উচ্চহারের প্রবৃদ্ধিও সত্ত্বেও দারিদ্র্য হ্রাসের শীর্ষ ১৫টি দেশের কাতারে নেই 'উন্নয়নের রোড মডেল' বাংলাদেশ। আফ্রিকার অপরিচিত দেশ তানজানিয়ার দারিদ্র্য হ্রাসের হার সবচেয়ে বেশি, দেশটি ৩.২ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমিয়েছে। উন্নয়নের রোড মডেলের হার মাত্র ১.৪২ শতাংশ।
প্রোপাগাণ্ডায় উন্নয়নের রোল মডেল হলেও প্রতিনিয়ত এদেশের মানুষের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। ২০১০ সালে ২ হাজার ৩১৮ কিলোক্যালোরি পেতো, খানা-জরিপ অনুযায়ী ২০১৬ সালে পাচ্ছে ২ হাজার ২১০ কিলোক্যালোরি৷ অর্থাৎ যে দেশের মানুষ পুষ্টিকর খাবার খেতে পায় না তিনবেলা, তারাই আবার বিশ্ববাসীকে উন্নয়নের পথ দেখাবে। এ যেন অন্ধের কাছে রাস্তা জানতে চাওয়ার মতো প্রহসন৷ এই প্রহসনের সবচেয়ে নগ্নরূপটি রয়েছে কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরে। সরকারি হিসাবমতে কুড়িগ্রামে শতকরা ৭১ জন গরিব এবং দিনাজপুরে শতকরা ৬৪ জন গরিবের তালিকায়। রংপুর বিভাগের দারিদ্র্যহার হার ঢাকা ও সিলেটের তুলনায় তিন গুণ বেশি। উন্নয়নকে টেকসই করতে চাইলে ঢাকা আর সিলেটকে লক্ষ্য করে কার্যক্রম পরিচালনা করলে হবে না। বরং রংপুরে বিভাগের গরিব মানুষদের দারিদ্র্যতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে পারলেই প্রকৃত উন্নয়ন হবে।
পরিসংখ্যানের প্রোপাগাণ্ডাকে পরিসংখ্যান দিয়ে মোকাবিলা করেছেন ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব। একেবারে পয়েন্ট বাই পয়েন্ট প্রতিটি সেক্টরের সত্যিকার অবস্থা তুলে ধরেছেন। উন্নয়নপন্থিদের বকওয়াসকে ডাহা মিথ্যা কিংবা অর্ধসত্য প্রমাণ করেছেন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে। এককথায়, অসাধারণ কাজ।
বাংলায় অর্থনীতির নিয়ে লেখাজোখার গ্রান্ডমাস্টার হলেন আকবর আলি খান। অর্থনীতিবিষয়ক যে কোনো লেখা স্বদেশি ভাষায় পড়তে গেলে প্রথমেই স্মরণ হয় ড. খানের লেখনীর কথা। এখানেই পাঠক দুঃখিত হবেন। ফয়েজ তৈয়্যব আ্যকাডেমিশিয়ান নন। তার লেখার ধাঁচ শতভাগ তথ্য-উপাত্তভিত্তিক৷ বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টকে ভিত্তি করে তিনি বইটি লিখেছেন। অর্থনীতি নিয়ে লেখা বইকে বেশি গুরুত্ব লেখক দেননি। তাতে লেখা একটু বেশিই নিরামিষ হয়ে গেছে ; এমনকি 'তথ্যসূত্রগত' দিক দিয়ে খানিকটা কমজোরি হয়ে গেছে বললে অত্যুক্তি হবে না৷ আবার কিছু ক্ষেত্রে তিনি ঠিকঠাক তথ্যসূত্র উল্লেখ করেননি। যেমন: ব্যারিস্টার মওদুদ তার আত্মকথা 'চলমান ইতিহাস' বইতে জনসভা করে ঋণদান করার ঘটনা উল্লেখ করেছেন৷ একই ঘটনা ফয়েজ তৈয়্যবের বইতেও পাই। কিন্তু লেখক সুস্পষ্ট তথ্যসূত্র দেননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছুদিন আমরা ভারত থেকে টাকা ছাপিয়ে আনতাম৷ লেখক এবনে গোলাম সামাদের 'আমার স্বদেশ ভাবনা' বইকে তথ্যসূত্র ধরে দাবি করেছেন, ভারতের নাসিক টাকশালে তখন বাংলাদেশের টাকা দুই কপি করে ছাপানো হতে৷ এককপি বাংলাদেশকে তার চাহিদামতো দিতো। জাল কপি দিয়ে ভারত আমাদের থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আমাদের ফতুর করে দিতো৷ লেখক সম্ভবত এবনে গোলাম সামাদের বইটি মনোযোগ দিয়ে পড়েননি। নতুবা এমন ডাহা গুজবে কেন কান দেবেন? এবনে গোলাম সামাদ তার এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের কোনো উৎস উল্লেখ করেননি। এদেশে বিরোধিতা করলে অন্ধ বিরোধিতা করার বদভ্যাস দেখা যায়। ফয়েজ তৈয়ব্যের মতো তরুণতুর্কিও এই দোষমুক্ত নন।
এদেশের অর্থনীতি আগ্রহী পাঠকগণ বইটি পড়তে পারেন। তবে হ্যাঁ, অর্থনীতির টার্মিনোলজির ধাক্কা পোহাতে হবে সেই প্রস্তুত নিয়েই ধরুন 'বাংলাদেশ: অর্থনীতির ৫০বছর'।
I read this book for academic purposes, but the writer did his job so well. He explained everything in detail and helped me understand concepts and the second and documented background.
‘বাংলাদেশের অর্থনীতি বিষয়ক আলোচনায় ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এর বই নতুন মাত্রা যোগ করবে। অনুপুঙ্খ, তথ্য সমৃদ্ধ, বিশ্লেষনী এবং সহজবোধ্য এই বই পাঠকদের কেবল প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে চিন্তা করতেই সাহায্য করবে তা নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা তৈরিতে উৎসাহীদের জন্যেও সহায়ক হবে। ড. আলী রীয়াজ, ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, রাজনীতি ও সরকার বিভাগ, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র। ‘ ‘বাংলাদেশ, অর্থনীতির ৫০ বছর’ বইয়ে বহু তথ্য-উপাত্তের সমাহার সত্ত্বেও প্রতিটি অধ্যায়ের আলোচনা সাধারণ পাঠকের জন্য সহজবোধ্য ও সাবলীল হয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে অনেক কঠিন কাজ। বইটির শেষ অধ্যায়ে অর্থশাস্ত্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের আলোকে পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান বোঝার এবং সংক্ষেপে তত্ত্বগুলোর সীমাবদ্ধতা আলোচনার প্রয়াস লক্ষণীয়। অগণিত নিত্য-নতুন তত্ত্বের তুলনায় এ প্রয়াস সংক্ষিপ্ত ও স্বল্প হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যায় প্রাসঙ্গিক। এক্ষেত্রে লেখকের প্রয়াস প্রশংসনীয়। পুরো বইটির পরতে-পরতে লুকিয়ে আছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার ভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক নাগরিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা। লেখক অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের আলোকে পঞ্চাশ বছরের অর্থনীতিকে সাধারণের কাছে সুখপাঠ্য করে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থনীতিবিদ। অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘নিও-লিবারেলিজমের পক্ষ-বিপক্ষের গতানুগতি আলোচনার বাইরে এসে উন্নয়ন দর্শনের যে চমৎকার বয়ান উপস্থাপন করেছেন লেখক, তা পাঠক আবেদন তৈরি করবে। ড. মারুফ মল্লিক। গবেষক ও কলামিস্ট, সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
‘বিগত ৫০ বছরের অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের বস্তুনিষ্ঠ, সাহসী ও সময়পোযোগী বিবরণ। ড. গোলাম রব্বানী, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, দ্য হেগ ইউনিভার্সিটি অব এপ্লায়েড সায়েন্সেস নেদারল্যান্ডস।
‘স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র তুলে আনার এক অনন্য প্রয়াস “বাংলাদেশ অর্থনীতির ৫০ বছর’ গ্রন্থটি। একটি চমৎকার রেফারেন্স গ্রন্থ। সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া, দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। প্রাক্তন গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব অ্যামস্টারডম ও বস্টন ইউনিভার্সিটি।
এই বইটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ৫০ বছরের অর্থনৈতিক যাত্রার একটি তথ্যভিত্তিক ও সহজবোধ্য মূল্যায়ন। লেখক কৃষি-নির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও সেবা খাতে রূপান্তর, দারিদ্র্য হ্রাস, রেমিট্যান্স ও RMG খাতের ভূমিকা তুলে ধরেছেন এবং বাংলাদেশকে একটি সংকটজয়ী ও অগ্রসরমান অর্থনীতি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তবে বইটি মূলত উন্নয়নবাদী ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা। অর্জন ও অগ্রগতির বয়ান শক্তিশালী হলেও বৈষম্য, শ্রম অধিকার, শাসনগত দুর্বলতা ও উন্নয়নের সামাজিক খরচের সমালোচনা তুলনামূলকভাবে সীমিত। বিশ্লেষণের চেয়ে বর্ণনামূলক আলোচনা বেশি, ফলে গভীর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রশ্নগুলো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। সার্বিকভাবে, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স বই, যা পাঠককে অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে ধারণা দেয়, তবে ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণে আরও কঠোর সমালোচনার জায়গা রেখে যায়।