সংবাদপত্রের ঘটনাবলি যখন একজন সংবেদনশীল লেখকের কলমে উঠে আসে, তখন সেটা আর শুধু সংবাদ থাকে না; হয়ে ওঠে মানবতার দলিল। সেই দলিল পাঠ করে শতবর্ষ পরে জানা যায় সেই সময়ে সেই রাষ্ট্রে কোন কোন মানুষের হাসি এবং কান্না বেহালার সুর হয়ে বাতাসে ভেসে বেড়াত।
বাংলাদেশ নামের বদ্বীপটা জন্মলগ্ন থেকেই নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে সময় পার করে আসছে। দেশের বুকে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে ক্ষত। এই অস্থিরতা থেমে গিয়ে একদিন স্থিরতা আসবে এই আশায় দিন যায় এই দেশের জনগোষ্ঠীর। কিন্তু একজন সংবেদনশীল লেখক শুধু আশাটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। তাঁকে সেই ক্ষতটি নেড়েচেড়ে দেখতে হয়। দেখাতে হয় কীভাবে জন্ম নিল এই ক্ষত আর এর চিকিৎসাই বা কী হতে পারে।
সেই ক্ষতেরই শিল্পীত রূপায়ন সাব্বির জাদিদের 'বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ'।
সাব্বির জাদিদ একজন গল্পকার। উনার গল্প লেখার ধরন এত্ত সুন্দর যা বলে বোঝানো দায়। তার লেখা ছোট গল্প গুলোতে বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেন।
২০১৫ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ সালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোট ১৪টি ছোটগল্প লেখা আছে "বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ" বইটিতে। বইয়ের প্রতিটি গল্পে পাবেন বিষাদের ছোঁয়া। বিষাদে মুড়িয়ে রেখেছেন প্রতিটি গল্প। প্রতিটি গল্পে বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন।
"বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ" বইটিতে প্রতিটি গল্প সুন্দর হয়েছে। কোন গল্প পড়তে গিয়ে বিরক্ত হই নি। কিছু গল্প ছিল সুন্দর, কিছু গল্প ছিল অসাধারণ।
♣️আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে!
২০১৮ সালের বাবা মেয়ের কথোপকথন মনে আছে আপনাদের? যা হৃদয়ে দাগ কে'টে ছিল অনেক মানুষের। যদিও আমি ভুলে গিয়ে ছিলাম সেই হৃদয়ে দাগ কা'টা কথোপকথন। তবে সাব্বির জাদিদ ভাইয়ার গল্প পড়ে আবার মনে পরে যায়। রূপক অর্থে কি সুন্দর ভাবেই না গল্পটি তুলে ধরেছেন।
♣️ কেউ কেউ ম'রে গিয়ে সংখ্যাও হয় না
যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করে বইটিতে সবচেয়ে বেশি কোন গল্প টি ভালো লেগেছে। আমি বলবো এই গল্পটি। গল্পটি পড়তে গিয়ে নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে গেল। একজন বৃদ্ধ লোক প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার জন্য বাসে উঠে। সেখানে অনেকেই জিজ্ঞাসা করে তাদের মধ্যে কেউ কি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করিয়ে দিতে পারবে! মানুষ প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে সাহায্য চাওয়ার জন্য, নয়তো ক্ষতিপূরণ চাওয়ার জন্য। কিন্তু বৃদ্ধ লোক দেখা করতে চান লা'শে'র সংখ্যা বাড়ানোর জন্য।
♣️ ভার অথবা নির্ভারের গল্প
বাংলাদেশে মেয়েরা কতটুকু নিরাপদ? প্রতিনিয়ত খবরের কাগজ, টেলিভিশন আর গণমাধ্যম গুলোতে অহরহ খু'ন, ধ'র্ষ'ণে'র সংবাদ প্রচার হচ্ছে। সেখানে একজন বাবা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকে নিজের মেয়েকে নিয়ে। বিষয়টি খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন।
♣️ স্বস্তিকর দুঃসংবাদ
এই দেশ কি বাচ্চার জন্য নিরাপদ! যেখানে স্কুলের পিকনিক বাস খাদে পড়ে নি'হ'ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, বাস দুর্ঘটনা, লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে মা'রা যাচ্ছে কতশত মানুষ, নারায়ণগঞ্জে খেলার মাঠে গভীর পাইপের ভিতরে পড়ে যাওয়া দেড় বছরের শিশুর ঘটনা। এত্ত এত্ত দুর্ঘটনা দেখার পর একজন মানুষ চায় না নিজের সন্তান দুনিয়ায় আসুক। যেখানে বাচ্চা নিরাপদ না সেখানে জন্ম দিতে নারাজ। লেখক সাহেব তার দক্ষ হাতে খুব সুন্দর ভাবে লিখেছেন গল্পটি।
♣️ অন্তর্বাস
একজন বাবার পেশা তার সন্তানের জন্য যেমন আশির্বাদ তেমনি হয়তো অভিশাপ ও। মাসুমার বাবার পেশার জন্য তাকে হীনমন্যতায় ভুগতে হয়েছে ছোটবেলা থেকে। যা তার পিছু ছাড়ে না। মাসুমা নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু করে। যে কারণে সবসময় হীনমন্যতায় ভুগতে হয়েছে তাকে সে কারণেই তার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল। এক রাতে হঠাৎ মাসুমা পরিবর্তন হয়.....
♣️ দ্বিতীয় মৃ'ত্যু'র আগে
আল্লাহ যাকে দেয় সবদিক দিয়ে দেয়। আর যাকে দেয় না, কোন দিক দিয়ে দেই না! এই গল্পটাও অনেকটা এরকম। বহর আলি আর শরীফুল হক প্রতিবেশী, একই বংশে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও দুজনের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। একজনের বিলাস বহুল বাড়ি অন্যজনের মাটির ঘর। এ নিয়ে বহর আলির আফসোসের শেষ নেই। কিন্তু বহর আলি দেখতে চেয়েছিলেন শরীফুল হক মৃ'ত্যু'। কেননা মৃ'ত্যু'র পর কিভাবে বিলাসবহুল ভাবে ক'ব'রে থাকবে! কেননা ক'ব'রে তো ধনী গরীবের ফারাক থাকে না। বহর আলির চাওয়া কি পূর্ণ হয়ে ছিল? নাকি মৃ'ত্যু'র পর দ্বিতীয় বার মৃ'ত্যু হয়েছে?
♣️ প্রতিদ্বন্দ্বী
একজন মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হয় অপর পাশের আরেকটি মানুষ। এইটা তো স্বাভাবিক তাই না! কিন্তু কায়েসের প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে একটি গরু। যার আগমনের ফলে কায়েস তার নিজের বাবা, মায়ের ভালোবাসা পায় না। তার দিকে খেয়াল না দিয়ে গরুর দিকে সবসময় খেয়াল রাখে। এরকম কতশত অভিযোগ জমা হয় কায়েসের মনে।
♣️ ফরিদ ডাক্তারের গল্পকার হয়ে ওঠার গল্প
সাহিত্যিক বই পড়া শুরু করার পর একটা মানুষকে যে কত রকমের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তা খুব ভালো করেই জানে বই পড়ুয়ারা। তেমনি হয়েছে ফরিদের ক্ষেত্রে। সে লেখালেখি শুরু করতে চান। কিন্তু নৌকা চালানোর আগে যেমন বৈঠা ধরা শিখতে হয় তেমনি লেখালেখি করার জন্য সাহিত্যিক সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। যার কারণে ফরিদ আগে সাহিত্যিক বই পড়া শুরু করে। আর তখনই শুরু হয় নানান রকমের প্রশ্ন! ফরিদ ডাক্তারের কি গল্পকার হয়ে ওঠা হয়ে ছিল??
♣️ হাঁটতে হাঁটতে ধর্ষিত হওয়া মেয়েটি
ধর্ষণকে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন গণধর্ষণ, বৈবাহিক ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, কারাগারে ধর্ষণ আর যু'দ্ধে ধর্ষণ। আরো হয়তো অনেক প্রকার থাকতে পারে। কিন্তু মেয়েটি হাঁটতে হাঁটতে কিভাবে ধর্ষিত হয়ে বইটি পড়ে জানতে পারবেন। লেখক অসাধারণ ভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
♣️ বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ
বাসে যাতায়াত করা মানুষ গুলো জানে বাস উঠলে কতটা ভোগান্তিতে পরতে হয়। তার মাঝে যদি ড্রাইভার হয় অদক্ষ তাহলে তো কথাই নেই। এক স্টোপের পরে আরেক স্টোপে বাসের ড্রাইভার পরিবর্তন হলেও ভোগান্তি কমে না একটুও। বাস যাত্রীরা মনে মনে ভাবে আগের ড্রাইভারই হয়তো ভালো ছিল।
♣️ স্যান্ডেল ও মুরগিছানা
বন্যার সময় সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্দশার কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু মানুষের মতো পশুপাখিদেরও যে একই রকম অবস্থা হয় তা কি আমরা উপলব্ধি করতে পারি। লেখক খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পটি।
বইয়ের আরো একটি দিক ভালো লেগেছে। অন্য সব বইতে আগে গল্পের নাম থাকে তারপর গল্প। লেখক সাহেব সেসব গতানুগতিক ধারার বাহিরে গিয়ে আগে গল্প তারপর গল্পের শেষে গল্পের নাম উল্লেখ করে দিয়েছেন।