স্পেকুলেটিভ ফিকশন কখন সার্থক হয় বলুন তো?
যখন প্লট, লেখনী, আর পরিবেশনের ত্রিবেণী-সঙ্গম ঘটে গল্পটা তার সবটুকু অসম্ভাব্যতা বা চেনা আদল ছাপিয়ে পাঠককে পাতা ওল্টাতে বাধ্য করে।
যখন গল্প শেষ হওয়ার পরেও মনে তার রেশ থেকে যায়— তৃপ্তি, অস্বস্তি, উত্তেজনা, বা "যদি এমনটা আমার সঙ্গেও হয়...?" প্রশ্নের আকারে।
আলোচ্য সংকলনের সবক'টা গল্পে এই বৈশিষ্ট্য আছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং বিভিন্ন সংকলনে আমরা ঐষিক মজুমদারের লেখা পড়েছি। পালক পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম গল্প-সংকলনটি। তাতে যে-সব গল্প আছে তারা হল~
১. গাছ
২. মাকড়সা
৩. ভ্রম
৪. মন্দারপুরের মনুষ্যভুক মকর
৫. লাল ডাইনির উপাখ্যান
৬. অভিশাপ
৭. চশমা
৮. পৌষ-সংক্রান্তির মেলায়
৯. জ্যোৎস্নায়
এই গল্পগুলো তিনটি কারণে অলৌকিক বা অদ্ভুত রসের কাহিনির পাঠকদের কাছে অবশ্যপাঠ্য বলে আমার মনে হয়েছে।
প্রথমত, ঐষিকের গল্প বলার ধরনটি অত্যন্ত মনোগ্রাহী। তাতে কোনো অনাবশ্যক ভ্যাজর-ভ্যাজর নেই। বাচ্য গুলিয়ে ফেলা নেই। একগাদা 'ওনার/উনার'-জাতীয় ভুল নেই। সর্বোপরি ভয়ের গল্প লিখতে গিয়ে তিনি সমাজ-বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেননি। ফলে লেখাগুলো যতই চেনাজানা, এমনকি সাধারণ হোক না কেন, তাদের মধ্যে একটা অন্যরকম বাস্তবতা আছে। সেজন্যই এদের পড়তে ভারি ভালো লাগে।
দ্বিতীয়ত, এরা খাঁটি ভয়ের গল্প। তান্ত্রিক হররের নামে অপদেবী তথা পেত্নিদের ছাদে সোজা বা উল্টো হয়ে ঘোরাঘুরি, পিশাচের মুখে অন্যদের মুন্ডু চেবোনোর কড়মড়ানি— এ-সবে আমরা একেবারে নিমজ্জিত হয়ে আছি৷ সেই পরিবেশে এইরকম ন'টা ছিমছাম, অথচ মেরুদণ্ড দিয়ে কনকনে স্রোত নামিয়ে দেওয়া গল্প পড়তে কী ভালো যে লাগল, তা বলে বোঝাতে পারব না।
তৃতীয়ত, এর মধ্যে বেশ ক'টি গল্প ভয়ালরসের ক্লাসিক লেখাজোখার উদ্দেশে শ্রদ্ধার্ঘ্য। সেগুলোর মাঝপথে পৌঁছেই হয়তো আপনি পরিণতি বুঝে ফেলবেন। কিন্তু যেভাবে সেগুলো গুছিয়ে বলা হয়েছে, তার মধ্যেও আপনি অনেকখানি আনন্দ আর ভয় খুঁজে পাবেন।
এই বইয়ের সেরা গল্প "ভ্রম"। একটি লোকায়ত ভয়কে কীভাবে নাগরিক আবহে আত্তীকৃত করা যায়, তার অদ্বিতীয় নিদর্শন এই ছোট্ট লেখাটি। পাঠককে বলব, রাতে ঘুমোতে যাওয়ার ঠিক আগে এটা পড়তে। পড়ার পর আপনি টয়লেটে যাওয়ার জন্য উঠবেন। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে দেখবেন...
ভেবে দেখুন। এই বইটা কি আপনার জন্য? নামটা কিন্তু লেখক বেশ ভেবেচিন্তেই দিয়েছেন!
বইটির মুদ্রণ পরিচ্ছন্ন, লে-আউটও যথাযথ। প্রচ্ছদটা বিকট; পরবর্তী সংস্করণে ওটি বদলাতে অনুরোধ করব।
আমার তরফে ঐষিক মজুমদারের পরবর্তী বইয়ের জন্য এখন থেকেই প্রতীক্ষা শুরু হয়ে গেল।
আর আপনার?