ব্যাক্তিগত ভাবে বাংলাদেশী পাঠক হিসেবে আমার একটা আফসোস শুরু থেকেই। কিছু ব্যতিক্রম বাদে আমাদের দেশের বইগুলোর কভার ও বাইন্ডিং কলকাতার বইয়ের চেয়ে অনেক অনেক পিছিয়ে। কিন্তু এই বইটা হাতে নিয়ে আমার সেই দুঃখ নিমেশেই উধাও হয়ে গেছে। প্রিমিয়াম ফিল দেয়া দারুণ একটা কভার এবং ভালো মানের একটা বাইন্ডিং মন শুরুতেই ভালো করে দিতে বাধ্য।
বেদনার নীলে ছাওয়া সম্পূর্ণ প্রচ্ছদে পত্রহীন এক বৃক্ষের সামনে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা এক অবয়ব নিজ নিজ শূন্যতায় যেন বলে যাচ্ছিল এই পরম্পরার গল্প।
শান বাধানো পুকুর ঘাটে বসে নয়ন আর রূপা। দুজনের হাতে ফুল আকাঁনো সাদা চায়ের কাপে দু কাপ চা। নীল শাড়ি পরা রূপার হাতে সাদা কাপ দেখে নয়নের মনে হলো, তার পাশে একখন্ড আকাশ বসে আছে।
রূপা যে কথা বলতে এসেছিলো তা আর বলা হলো না। কী আগ্রহ নিয়ে বৃষ্টি দেখছে ছেলেটা। কেমন মায়া মায়া লাগছে। বাইরে থেকে সামান্য আলো আসছে, সেই আলোয় নয়নের চোখ দেখে মনে হলো, সে চোখ দুটো আদ্র।
রাতে খাবারের পর রূপা দুই কাপ চা নিয়ে এলো। নয়নের সাথে বসে চা খাবে৷ উঠানের এক পাশে ডালিম গাছের নিচে বসলো ওরা। পাশ থেকে আসা হাস্নাহেনা ফুলের তীব্র গন্ধে চায়ের গন্ধটা হারিয়ে যাচ্ছে। আকাশের চাঁদটা যেনো নিচে নেমে এসেছে, জোছনায় ভেসে যাচ্ছে উঠোনটা! রূপা সেদিকে তাকিয়ে বললো, ' চাঁদের বুড়ির গল্পটা জানো নাকি?’
একটু আগেভাগেই শিমুল গাছটাতে ফুল ফুটেছে এবার। লাল লাল ফুলসমেত গাছটার প্রতিবিম্ব ভেসে আছে ঠিক নিচেই পুকুরের স্থির জলে। সেই পুকুরের পাড়ে বসে প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ফাইজার মনে হলো, জীবনটা এতো সুন্দর কেনো! আগে কখনো এমন মনে হয়নি ওর! এটাই কী তবে প্রেম!
আনোয়ার খান হা করে শ্বাস নিয়ে স্মৃতির পাতাটা বন্ধ করে দিলেন। এই পাতাটা তিনি পড়তে চান না। অথচ স্মৃতির ধূলিভরা ধূসর পাতার মধ্যে এই পাতাটা রেডিয়ামের মতো জ্বলজ্বল করে! যদি এই পাতাটা তিনি ছিঁড়ে ফেলতে পারতেন!
না, এটা নয়ন, রূপা, ফাইজা কিংবা আনোয়ার খান কারো একার গল্প নয়। নয় শুধু প্রেম, মুগ্ধতা, সৌন্দর্য কিংবা বিভা ও বিভ্রমের গল্প।
তাই আমি এই বইয়ের কাহিনী সংক্ষেপ সচেতন ভাবেই এড়িয়ে গেলাম। এড়িয়ে গেলাম সবুর, গনু, বাসমতিদের মতো প্রধান চরিত্রদের। যাদের নিয়ে বয়ে গেছে ঘৃণা, অপেক্ষা আর অভিশাপের পরম্পরার গল্প।
তিনটি দেশ ও দুই মহাদেশ বিস্তৃত চরিত্র ও প্লট ছিলো সুচারুভাবে একে অন্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সময়, স্থান ও কাহিনীর প্লট পরিবর্তনে লেখকের মুন্সিয়ানা ছিলো চোখে পড়ার মতো। স্থান ও সময় পরিভ্রমনের ভেলায় গল্পের চরিত্ররা আমাকে নিয়ে গিয়েছে একাত্তর থেকে পচানব্বইয়ে, বাংলাদেশ হতে পাকিস্থানে।
এখানে প্রেমের অনুভূতিগুলো ছিলো যেমন গাঢ় তেমনি ঘৃণা ছিলো তীব্র আর অভিশাপ ছিলো ভয়ংকর।
বইয়ের কাহিনী অর্ধেকের পর থেকে যথেষ্ট গতিশীল ছিলো। বইয়ের চরিত্রগুলো বিশেষ করে নারী চরিত্রগুলো ছিলো নিজেদের জায়গায় সুবিস্তৃত।
কাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধের যে অবতারনা হয়েছে তা যথেষ্ট সংগতিপূর্ণ ছিলো, ছিলো হৃদয় স্পর্শী এবং ঘটনার বর্ণনা ও শব্দচয়ন ছিলো দারুণ। আমাদের বীরাঙ্গনাদের অসামান্য ত্যাগের চিত্র কলমে তুলে ধরায় লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
👎 এই বইকে যদি আমি জনরায় ফেলতে যাই তবে তা কেনো যেনো ফ্যান্টাসি জনরার দিকেই চলে যাচ্ছিল। একটা মুক্তিযুদ্ধ আশ্রিত রচনায় এতোটা ফ্যান্টাসি আমার ব্যাক্তিগতভাবে ভালো লাগেনা।
👎প্রথম দিকে গল্প ছিলো খুবই স্লো এবং শেষে যেনো খুবই তাড়াহুড়ো করা হয়েছে।
তবে কাহিনী এবং আউটলুক সব মিলিয়ে এমন দারুণ একটি বই আমাদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ।