📚 বই নিয়ে আলোচনা
সৃজিত মুখার্জি-র নাম কী?
চাপটার ১।
বিদঘুটে একটি ঘর। তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মানুষের শরীরের বিভিন্ন কাটা অংশ। ভালো করে দেখলে মনে হয় ঘরটা কোনো কোরিয়ান মুভির সাইকোর ঘর। যেখানে খুনি তার শিকার নিয়ে গিয়ে ইচ্ছে মতো কাটাকুটি করতে পারে। তেমনই এক ঘরেই বেঁধে রাখা হয়েছে এক লোককে। এবং একটু পরেই নির্মম ভাবে খুন করা হয় তাকে।
এলাকায় মিসিং মেয়র শারাফ আহমেদ। সেই মেয়রের লাশ খুঁজে পান সেই এলাকার বাসিন্দা ‘সূর্যনীল ঘোষ’। পুলিশ আসে, আসে ডিটেক্টিভ সুকুমার। আর গল্পের প্রধান চরিত্রের ভুমিকায় থাকেন এই ডিটেক্টিভ। যেমন তার জঘন্য চালচলন তেমন তার কথা বলার ঢং।
তাকে কথায় কথায় ডিটেক্টিভ ডাকতে হবে। তিনি নাকি দেশ সেরা গোয়েন্দা। কিন্তু সারা গল্পে দেখিনি কোনো চমক। কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলেন, দুইদিনের মধ্যে খুনিকে নিয়ে আসবো। যাইহোক তার ব্যাপারে পরে বলবো।
মেয়র খুন হন বিভৎস ভাবে। এক হাত কাটা, মুখে অসংখ্য ব্লেড দিয়ে কাটার দাগ, এবং কপালে একটি পেরেক দিয়ে গাঁথা চিরকুট। তাতে লেখা ‘সৃজিত মুখার্জি’!
তো এই মেয়রের খুনি ধরতে ধরতে তিন মাস চলে যায়। বইয়ের চলে যায় ৭০ পেজ। আর এসময় খুন হন সূর্যনীল ঘোষের ছোট ভাই। এবং একই পদ্ধতিতে। পুরা প্রশাসন থাকে চাপে। আর এই খুন, আর খুনি নিয়ে চলতে থাকে রাজনৈতিক মহলে অনেক নোংরা খেলা। পক্ষ বিপক্ষকে করতে থাকে দোষারোপ। এলাকায় সৃস্টি হয় অশান্তির।
হঠাৎ একদিন গোয়েন্দা সুকুমারর খুনি নিয়ে এসে হাজির। খুনিও স্বীকার করে নেয় যে সে খুন করে। তবে তিনি শুধু একজনকেই খুন করে। দ্বিতীয় জনকে খুন করেন নাই। তাহলে খুনি কে? আর একই পদ্ধতি অবলম্বন করলো কী করে? কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা এই খুন গুলো কেনো করা হচ্ছে?
এখন আসি ঘটনার ঘনঘটায়,
সৃজিত মুখার্জির নাম কী? বইয়ের নাম করন দেখে বুঝলাম লেখক পশ্চিম পাড়ার বাংলা মুভি নির্মাতা সৃজিত মুখার্জির ভক্ত বা তাকে অনুসরণ করেন। ভালো কথা এটা, কিন্তু তিনি যে প্রধান চরিত্র ঠিক করলে তা রীতিমতো অখাদ্য। গোয়েন্দা সাহেব কথায় বউয়ের সাথে রঙ্গো করেন। বউয়ের সাথে ঝগড়া করার পরই তার মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়, এমন কি খুনি ধরার পরও তিনি বউয়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমান, এসব কী!
তিনি সারা বইতে এক কনস্টেবল নিখোঁজ হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। পরে বের করলেন কনস্টেবল ছিলেন শারীরিক ভাবে দূর্বল। এটা নিয়ে নতুন বউয়ের সাথে মনমালিন্য। সেজন্য গোপনে চিকিৎসা করাতে গেছেন। হাহ্ দেশ সেরা গোয়েন্দার কাজ।
লেখক বইতে অহেতুক কথা বলে বলে বইয়ের পেজ বাড়িয়েছে। যার কোনো দরকার ছিলো না।
আর সারা বইতেই বানান ভুলের খেলা চলেছে। কমবেশি। আছে নাম বিভ্রাট (একবার যাকে বলছে সোকন ঠাকুর, পরের বাক্যেই তাকে আবার ঠোকন ঠাকুর বলা হচ্ছে।)
সুকুমার বাবু দেশসেরা ডিটেকটিভ কথাটা অনেকবার বলা। কিন্তু তিনি কোনো কাজেরই না। তাহলে লেখক শুধু নিজেই তার ঢোল পিটিয়ে গেলেন কেনো?
লেখকের নিজের অহেতুক মতামত দিয়ে পেজ বাড়ানো। আগে বলেছি অহেতুক কথা, এখন বলছি মতামত বা নৈতিক কথা। যেমন প্রেম কী? পার্কে বসে দুই ছেলে মেয়ে তাদের প্রেমের অভিসারের ভবিষ্যতে নিয়ে কি বলছে সেটা নিয়ে তো বললই সাথে লেখকের ফ্রী নীতি কথা ছিলো। এরকম আরো আছে।
ডিটেকটিভের অহেতুক মিথ্যা বলা। আমি বুঝিনা, যে কেস সলভ করতে একজন গোয়েন্দার তিনমাস সময় চলে যাচ্ছে, একবিন্দুও অগ্রসর হতে পারলেন না, তারপরও তিনি অনবরত মিথ্যা বলেই যাচ্ছেন, তবুও তাকে প্রশাসন দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। কেন?
খুনির মোটিভ ছিলো একদম ফালতু(এটা এখনি বলা যাবে না কারন পরের পার্টে তার ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তবু লেখকের প্লট নির্বাচন পছন্দ হইনি)।
গোয়েন্দা প্রবর ফট করে খুনিকে ধরলেন, ধরে লকাপে ভরলেন, তারপর বউয়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন! এটা কিছু হইলো? খুনি কিভাবে খুন করলেন, খুনির খুন করার রুম নিয়ে কোনো আলোচনা নাই, খুনি কিভাবে শিকারীকে ট্রাপে ফেললেন তার কিছুই তিনি জিজ্ঞেস করলেন না। বাহ!
যার সাথে যা দরকার নাই তার সাথে তাই নিয়ে আলোচনা। যেমন দারোয়ানের সাথে থ্রিলার মুভি নিয়ে আলোচনা। আরে ভাই তিনি কিভাবে এই দাঁত ভাঙা আলোচনা করবেন?
গল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্র হলো একটি এ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার। তিনি একজন ফাঁসি দন্ডপ্রাপ্ত মৃত আসামিকে ট্রান্সফার করছেন। পথে তিনি গাড়ি থামিয়ে সিগারেট খান। তিনি আবার সেই গাড়ি জেল থেকে একা একাই নিয়ে যাচ্ছিলেন। এটা কোনো কথা? কোনো প্রকার সিকিউরিটি ছাড়া এভাবে কী সরকারি গাড়ি চলা ফেরা করা সম্ভব? আমিতো কখনো শুনি এমন।
এবার কিছু কথা বলি।
প্লটটা নিঃসন্দেহে অসাধারণ। তবে লেখকের অপুটতায় সম্পূর্ণ কাহিনি ফেঁসে গেছে। অনেক টুইস্ট আছে সারা গল্পে কিন্তু আমার মনে হয়েছে লেখক নিজেই সেই জালে জড়িয়ে গেছেন। আর বের হতে না পেরেই তড়িঘড়ি করে বলে দিলেন ‘চাপ্টার ২ লোডিং’।
এই প্লটটা নিয়ে লেখক অনেক অনেক কাজ করতে পারতেন। কাহিনি বিল্ডাপ, চরিত্র গঠন, ভাষা ব্যবহার, প্লট টুইস্ট সবকিছুই।
আমি পড়ছি সিরিয়াল কিলিং বিষয়ের গল্প, তার মধ্যে যদি প্রেম, পরকিয়া, রাজনীতি আসে তাহলে অবশ্যই সেগুলো যৌক্তিক ভাবে আসতে হবে। ইচ্ছে হলো আর নিয়ে আসলাম তাহলে আর সেই গল্প পড়ে আর মজা নাই।
আমি অনুরোধ করবো লেখককে তার এই বইটা নিয়েই কাজ করতে। কারন গল্পটি আমার পছন্দ হয়েছে। এটা একটা সেরা মার্ডার থ্রিলার বই হতে পারে।
আমি বারবার আফসোস করছি যে এমন একটা কাহিনি নিয়েও লেখক ‘আব্দুল্লাহ আল মামুন’ সাহেব কিছুই করতে পারলেন না।
বিঃদ্রঃ তিনি যদি এটার পরের সিকুয়েল বের করেনই তবে আবারো রকমারিকে অনুরোধ করবো যে বইটা যেনো আবারো আমাকে উপহার দেন।
ধন্যবাদ।
©️ মোঃ কামরুল হাসান
📚 বই হোক আপনার, আপনি বইয়ের 📚