অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক হাতিয়ার হলো বাজেট। ড. আকবর আলি খান সচিব হিসেবে নয়টি বাজেট তৈরি করেছেন। কর্মজীবনে প্রায় ১৬ বছর বাজেট কার্যক্রমের সাথে জড়িত ছিলেন। তাই যে কোনো মানুষের চাইতে বাজেট নিয়ে কৌতূহল, আগ্রহ তার বেশি। সেই কৌতূহল ও আগ্রহের বশবর্তী হয়ে এবার বাংলাদেশের বাজেটব্যবস্থার ভেতরকার অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে লিখেছেন আকবর আলি খান।
বাংলায় রবিবাবু প্রথম 'বাজেট' শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এদিকে মূল ফরাসি 'বুজেট'-এর নিকটতম শব্দ মানিব্যাগ। বিলাতের প্রধানমন্ত্রী ওয়ালপুল বছরজুড়েই করসংক্রান্ত নানা দাবি ও প্রস্তাব শুনতে পেতেন৷ সরকারি-বেসরকারি দু'তরফ থেকেই সুপারিশ আসতো। প্রাথমিকভাবে ওয়ালপুল সাহেব সেগুলো লিখে মানিব্যাগ তথা ফরাসি বুজেটে রাখতেন। ধীরে ধীরে দাবিদাওয়ার ফিরিস্তি বড়ো হতে থাকে এবং গোপনীয়তার রক্ষার খাতিরে আর মানিব্যাগে দাবিদাওয়া ও আয়-ব্যয়ের তালিকা মানিব্যাগে রাখা সম্ভব হলো না। তখনই বাজেট ঘোষণার দলিলপত্র রক্ষণের জন্য আবির্ভাব আজকের ব্রিফকেসের।
বাজেট ঘোষণার দিনে অর্থমন্ত্রীকে ব্রিফকেস হাতে সংসদে প্রবেশ করতে দেখা যায়। মূলত, বাজেট ঘোষণার প্রভাব পণ্যদ্রব্যের দামে পড়ে। দাম হ্রাস-বৃদ্ধির খবর আগেই যাতে ফাঁস না হয়ে যায়, সেজন্য একসময় ব্রিফকেস ব্যবহার শুরু করেন অর্থমন্ত্রিরা। বাজের প্রস্তুতের সাথে জড়িত কর্মচারীদের বাজেট ঘোষণার আগপর্যন্ত একপ্রকার বন্দী রাখার অদ্ভুত প্রথাও পৃথিবীতে ছিল। আজকাল বাজেটের আগেই কোনটির দাম কমবে-বাড়বে তা গণমাধ্যমের কল্যাণে লোকে জেনে যায়। কিন্তু একসময় বাজেটের গোপনীয়তা রক্ষা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে বিলেতের অর্থমন্ত্রী ছিলেন হিউ ডালটন। তিনি বাজেট ঘোষণার আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে পদত্যাগ করেন অধ্যাপক ডালটন!
ব্রিটেনের এককালের উপনিবেশ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার পটভূমিতে ছিল বাজেট। 'No Taxation without representation' অর্থাৎ গণপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ব্যতীত কোনো ধরনের কর ধার্য করা যাবে না - এই ছিল ইউএসের দাবি। সেই দাবিকে ব্রিটেন তোয়াক্কা না করেই ১৭৭৩ সালে বাড়তি করের বোঝা চাপিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। এতে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
আবার গণপ্রতিনিধিত্ব থাকলেই জনগণের ওপর নাহক কর ধার্য করা হবে না এমন বিশ্বাস আজকের দিনে অনেকটাই অকার্যকর। যেমন- এদেশে সংসদে বাজেট উত্থাপিত হলে কোনো বিশদ আলোচনা ছাড়াই তা পাশ হয়ে যায়। পাশের দেশ ভারতে বাজেট নিয়ে কমপক্ষে মাসখানেক আলোচনা হয়, সেখানে বাংলাদেশে গড় আলোচনা চলে মাত্র ১৬ দিন। উপরন্তু, ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সরকারি দলের কোনো সদস্য বিবেকের তাড়না বোধ করলেও প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারেন না। ব্রুট মেজোরিটি তথা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বলীয়ান সরকারি দলের বাজেট প্রস্তাবের বিপক্ষে ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়েও জোর গলায় কথা বলার শক্তি বিরোধীদলগুলোর অবশিষ্ট নেই।
প্রতিবছর লাখ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার পর গণমাধ্যমে তা নিয়ে প্রোপাগাণ্ডা চালানোর বিশ্রী ধরনের উৎসব শুরু হয়৷ বাজেটের টাকার অঙ্ককে এমন তরিকায় উপস্থাপন করা হয় যেন এক বাজেটেই দেশের সকল মুসকিল আসান হয়ে যাবে। ২০২১-২০২১ সালে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘোষণা করা হয়। টাকার হিসেবে এই অঙ্ক নিঃসন্দেহে বড়ো। প্রথম বাজেটের বাজারমূল্যের তুলনায় এই বছরের বাজেট ৭২২ গুণ বেশি। কিন্তু এখানেই ফাঁকি লুকিয়ে আছে৷ বাজারমূল্যে হিসাব করলে চলবে না। বাজেট কত বড়ো তা বিবেচনা করতে হবে স্থিরকৃত মূল্যে। ড. খান লিখেছেন,
' বাজারমূল্যে ২০২০-২১ সালের বাজেট ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটের চেয়ে ৭২২.৬ গুণ বেশি। কিন্তু স্থিরকৃত মূল্যে ২০২০-২১ সালের বাজেট ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটের প্রায় ১০ গুণ বেশি, ৭২২.৬ গুণ নয়। '
অর্থাৎ গত ৫০ বছরে বাজেট মূলত বেড়েছে মাত্র ১০ গুণ! যা প্রোপাগাণ্ডার মাধ্যমে বিরাট বড়ো কৃতিত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই প্রোপাগাণ্ডা বছরের পর বছর ধরে বেড়েই চলছে।
দেশে এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। তাজউদ্দীন আহমদ ঘোষিত ১৯৭২-৭৩ সালের স্থূল জাতীয় উৎপাদের পরিমাণ ছিল মোট বাজেটের ১৭.৪ শতাংশ। ২০২০-২১ সালে সেই পরিমাণ ১৭.৯ শতাংশ! মানে গণমাধ্যম ও দলীয় প্রচারণায় দেশের উন্নয়নের জোয়ার বইলেও গত ৪৯ বছরে স্থূল জাতীয় উৎপাদের হিস্যা বেড়েছে মাত্র ৪ শতাংশ। তাহলে উন্নয়নের গল্পের সাথে অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত একেবারে মিলছে না।
উন্নয়নগাঁথার সাথে বাস্তবতার ফারাক আরও লক্ষণীয়। প্রথম বাজেটে জিএনপির প্রায় ৭ শতাংশ বরাদ্দ ছিল উন্নয়নের জন্য। ২০২১ সালের বাজেট উন্নয়নের হিস্যা ৬.৮ শতাংশ। মানে এত বছর পরে উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির বদলে কমে গেছে। অথচ বয়ান শুনি এর ঠিক বিপরীত
'বই কেনা' প্রবন্ধে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন, বইয়ের দাম বেশি তাই লোকে বই কেনে না ; আবার মানুষ বই কেনে না বলেই প্রকাশক বইয়ের দাম কমাতে পারেন না। এদেশে করারোপের ক্ষেত্রেও একই দ্বান্দ্বিকতা বিদ্যমান। বাংলাদেশে বাজেটের মাত্র ৩০ ভাগ আয় আসে প্রত্যক্ষ থেকে। এদিকে উন্নতবিশ্বে বাজেটের সিংহভাগ অর্থের উৎস আয়কর। এমনকি ভারতে শতকরা ৪৬.৬ ভাগ আয় আসে আয়কর থেকে। আমরা ঠিকমতো কর দিই না। তাই রাষ্ট্রকে বাধ্য হয়ে বিভিন্নভাবে আমাদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দিতে হয়। আয়করের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্নার্জিত থেকে যায়। উন্নত দেশে বাজেটের ঘাটতি পূরণে সর্বোচ্চ কত টাকা সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সংগ্রহ করতে পারবে তা আইন দ্বারা নির্ধারিত। আমাদের দেশে এমন কোনো কানুন নেই। তাই সরকার বেশি বেশি সুদের বিনিময়ে ঋণ সংগ্রহ করে। তাতে জনগণের একটি অংশ লাভবান হলেও বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহ কমে যায়। ফলে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গতি ব্যহত হয়।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে ঘাটতি বাজেট ভালো কিনা, কত শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি গ্রহণীয় ইত্যাদি। এসবের উত্তর নিজস্ব ভঙিমায় দিয়েছেন ড. খান। পড়তে পড়তে যথাযথ উত্তর পেয়ে যাবেন
ড. আকবর আলি খানের ম্যাগনাম ওপাস 'পরার্থপরতার অর্থনীতি'। তাই তাঁর যে কোনো লেখার প্রতিতুলনা করতে চাইলে আমি সেই বইটির কথা ভাবি। বাজেট নিয়ে বাংলায় এরচাইতে তথ্যপূর্ণ ও সহজবোধ্য বই হয়তো থাকতে পারে। কিন্তু আমি পড়িনি৷ তবে ইদানীং আকবর আলি খানের স্বভাবসুলভ লেখনশৈলীর কিছুটা অভাববোধ করছি। বাজেট নিয়ে লেখা বইটিতে অনেকবেশি তথ্য-উপাত্ত সন্নিবেশ সাধারণ পাঠককে বিপর্যস্ত করতে পারে। পড়তে গিয়ে মনে হয়েছি বইটি আ্যকাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা এবং টার্গেটকৃত পাঠকরাও সাদাসিধা না হয়ে আ্যকাডেমিশিয়ান হবে এমন ভাবনা থেকে লেখা। আমি অ-অর্থনীতির মানুষ। তাই পড়তে গিয়ে খানিকটা বেগ পেতে হয়েছে। তবে হ্যাঁ, বাজেট নিয়ে সত্যিকারের আগ্রহ থাকলে বইটি অবশ্যই আপনার জন্য লেখা। একবসায় পড়তে পারবেন না, রয়ে-সহে পড়বেন এমন প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করুন 'বাংলাদেশের বাজেট'।