বালুমাটিতে কেউ হারাইলে পায়ের ছাপ দেইখা তার খোঁজ করা যায়। ছাপ সবসময় খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু কোনো এক ভাবে দেখা যায়। কিন্তু পানির মতি ভালো না, তার দিক বেগতিক। কই থেইকা কই নিয়া যাইবো, কেউ জানে না। ভাসাইলো না ডুবাইলো, আছড়াইলো না হেছড়াইলো, কেউ কইতে পারে না। কিন্তু পানিতে নিজ ইচ্ছায় মানুষের ক্ষতি করে না। তার কি বুদ্ধি আছে নাকি? একটা জিনিস আছে। কিন্তু... কিন্তু ঐটা তো কুসংস্কার, কিচ্ছাকাহিনী। প্রাচীন একটা বস্তু। আসলে কোনো বস্তু না। সেই ছোটবেলায় আব্বার কাছে কিচ্ছাকাহিনী শুনতাম। রাতের আন্ধারে বাতাসের সাথে গীত ভাইসা আসে। নদীতে থাকলে সে গীত শুনা যায়। কোনো রূপ নাই, দেহ নাই, ছায়া নাই। আছে শুধু সুর আর ঢেউ। এক ফোটা বাতাস থাকবো না কিন্তু বিশাল ভয়ংকর ঢেউ আইসা সব উথালপাতাল কইরা যাইব। পানিতে তাঁর কথা শুনে, তাঁর চাহিদাই সবচেয়ে বড়, তাঁর ইচ্ছাই শেষ ইচ্ছা। তাঁর কাছ থেইকা কি কেউ ফেরত আসে?
দক্ষিণাঞ্চলের নদী ঘেঁষা এক গ্রামে বইয়ের কাহিনীর সূত্রপাত। এক চাঁদনী রাতে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হয় এক ছেলে। যেন হাওয়াই মিলিয়ে গেছে। ছেলেটা নিজেকে আবিষ্কার করে উদ্ভট এক জায়গায়। যেখানে ভয়ানক সব ঘটনা ঘটে। অপরদিকে গ্রামবাসী উঠে পড়ে লাগে ছেলেটাকে খুঁজে বের করতে। ছেলেটা মিলিয়ে কোথায় গিয়ে পড়ল? কেন এসব উদ্ভট ঘটনা ঘটছে ঐ অজানা জায়গায়?
আপাত দৃষ্টিতে ট্র্যাডিশনাল হরর বলে মনে হলেও সেটা আদতে নয় জলজ বইটি। একই সাথে সার্ভাইবাল, সাসপেন্স, ভৌতিক, কিছুটা মিস্ট্রি ও জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া আছে। বইটার সবথেকে বড় প্লাস পয়েন্ট হল স্টোরিটেলিং। ভয়ানক দৃশ্য, গ্রামের হোটেল সব বর্ণনা-ই জীবন্ত লেগেছে। দ্রুততার সাথে গল্প এগিয়েছে। লেখক নিজস্ব মিথ তৈরি করে প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। অজানা স্থানের কিছু বর্ণনা গা শিউরে ওঠার মত। সার্ভাইবাল অংশে সামান্য দমবন্ধ অনুভূতি হয়। গ্রামের আধ্যাত্মিক হুজুরের একটা দৃশ্য সহ দুয়েক জায়গায় কিছুটা জাদুবাস্তবতা দেখা গেছে। এমনকি ছোট্ট পরিসরের কাহিনীতেও সাইকোপ্যাথ টাইপ ক্যারেক্টার সফলভাবে বানিয়েছেন লেখক। শেষে একটা টুইস্ট আছে। আর খুবই সূক্ষ্মভাবে ধাঁধার সমাধানও করা আছে শেষে। এতই সূক্ষ্ম যে চোখ এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা-ই বেশী।
যাইহোক, এক বসায় শেষ করার মত উপভোগ্য ও ইন্টারেস্টিং বই। দুর্দান্ত বর্ণনাভঙ্গির কারণে যেকোনো পাঠকের জন্যই রিকমেন্ডেড।
অনেকক্ষণ ভাবলাম যে 4 star দিবো নাকি 5 star. শেষ পর্যন্ত ভাবলাম হৃদয় বড় করে star দেই! গল্পের মাঝে কিছু printing mistake আছে সেটা অনেকেরই বিরক্ত লাগতে পারে, পরবর্তীতে সংশোধন করে নেয়া যায়। গল্পটা unique, লেখকের নিজস্বতা প্রকাশ পায়। লেখকের লেখনী অসাধারণ আগেই দেখেছি। গা ছমছমে রহস্যময়তা আছে, আসলে গা শিউরে ওঠে। আর গল্পের সমাপ্তিটা অসাধারণ লেগেছে আমার কাছে যেন এভাবেই শেষ হবে বলে আশা রেখেছিলাম।
"সেই ছোটবেলায় আব্বার কাছে কিচ্ছাকাহিনী শুনতাম। রাতের আন্ধারে বাতাসের সাথে গীত ভাইসা আসে। কোনো রূপ নাই, দেহ নাই, ছায়া নাই। আছে শুধু সুর আর ঢেউ" - জলজ সেই এক প্রকারের কিচ্ছাকাহিনী। ডরাইলে ডরাইতেও পারেন।
অতিপ্রাকৃত কোনো গল্পকে যদি তুলনা করা হয় সুস্বাদু কোনো রান্নার সঙ্গে তাহলে ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে সে রান্নায় পরিমাণমতো সব মশলার ব্যবহার! লেখক আবরার আবীর খুব ভালোভাবেই জানে কিভাবে সে মশলার ব্যবহার করতে হয়! গল্পের শুরু হয় ১২০০ খ্রিষ্টপূর্ব, ব্রোঞ্জ যুগের এক উত্তাল সমুদ্রের পরিনামের মধ্য দিয়ে। গল্প শেষটাও যেন একটা ভয়ঙ্কর পরিণাম! প্লট এদিক থেকে ইউনিক লেগেছে। এক্সিকিউশন আরো ভালোভাবে করা যেত! কিন্তু শেষটা যে ধরতে পারিনি সেটাই অবাক করার মত বিষয়। আবার গল্প শেষ হলেও অনেক উদ্দেশ্যের ইস্তফা দেওয়া হয়নি ঠিকঠাক। যেমন ধরেন আমি একটা আকাম করেই যাচ্ছি। কেন করি তার মোটিভ পরিষ্কার না।
আবার একটা জিনিস দেখবেন ভয় জিনিসটা এক একজনের কাছে এক এক রকম। কেউ ভয় পায় ভূতে, কেউ পায় মানুষে, কেউ ভয় পায় পরাধীনতায়, কেউ আবার নিসঃঙ্গতায়। এর ভেতরে সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হচ্ছে আক্ষেপে। যেমনঃ 'এমনটাতো হওয়ার কথা ছিলো না!'
লেখা সহজ। আরামসে পড়তে পারবেন তবে বৃষ্টি বাদলের রাতে পড়বেন। মজা পাবেন।
"...সেই ছোটবেলায় আব্বার কাছে কিচ্ছাকাহিনী শুনতাম। রাতের আন্ধারে বাতাসের সাথে গীত ভাইসা আসে। নদীতে থাকলে সে গীত শুনা যায়। কোনো রূপ নাই, দেহ নাই, ছায়া নাই। আছে শুধু সুর আর ঢেউ। এক ফোটা বাতাস থাকবো না কিন্তু বিশাল ভংকর ঢেউ আইসা সব উথালপাতাল কইরা যাইব। পানিতে তাঁর কথা শুনে, তাঁর চাহিদাই সবচেয়ে বড়, তাঁর ইচ্ছাই শেষ ইচ্ছা। তাঁর কাছ থেইকা কি কেউ ফেরত আসে?"
দারুণ লাগলো না লেখনি টা? ভৌতিক/হরর বই তেমন পড়িনা। বিষয়বস্তু বিচিত্র হলে আর কোথাও খুব ভালো কথা শুনলে পড়ি আগ্রহ নিয়ে। ২০২১ এর বইমেলার এই বইটা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছিলো এরকম গ্রাম্য ভাইবের একটা হরর পড়বার জন্য। ঘন্টা দুয়েক আগে শুরু করেছিলাম। শেষ করলাম এক বসায়। আমার কাছে শুরুর দিকে গ্রামের ভৌতিক কাহিনীর মতোই লাগছিলো। যদিও শুরুর পার্টটায় বুঝতে পারছিলাম সাধারণ ভুতের গল্প হবেনা। হয়ও নি। অতিপ্রাকৃত অনেক কিছুই যোগ করেছেন লেখক। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে লেখনি। একেকটা বর্ণনা অত্যন্ত দারুণ। বিশেষ করে অন্ধকার অংশটার বর্ণনা। গল্পের শেষটাও ভালোই। তবে ভয়ের ম্যাটারিয়েলের অভাব ছিলো, কাহিনীও আরেকটু স্ট্রং হতে পারতো। তবে এক বসায় পড়ার মতো বই। শেষটা সুন্দর একটা লাইন দিয়ে শেষ করছি, "মনের সবচেয়ে করুণ আকুতি হচ্ছে, 'এমনটা তো হবার কথা ছিলোনা'। সমগ্র প্রাণী জগত প্রত্যাখ্যান নামক অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত।"
ব্রোঞ্জ যুগ। অনেক বছর আগে বারোটি নৌবহর যুদ্ধ জয় করে দশ বছর পর সমুদ্র পথে বাড়ি ফিরার সময় মুখোমুখি হয় এক ঝড়ের, যে ঝড় অন্যান্য স্বাভাবিক সমুদ্রের ঝড়ের মতো নয়, কেমন যেন। এদিকে বর্তমান সময়ে এক রাতে মাছ ধরতে গিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যায় এক ছেলে। গ্রামবাসী তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকে চারপাশে।
এভাবেই গল্প এগোতে থাকে। প্রথমে মনে করেছিলাম গতানুগতিক হরর হবে, কিন্তু পরে দেখলাম তা আসলে নয়, অতিপ্রাকৃত ছাড়াও বইতে কিছুটা ফ্যান্টাসির প্রভাবও রয়েছে বলে মনে হয়েছে। শেষের দিকে হালকা সাইকোটাইপ ফিলও পেয়েছি। গল্প বর্ণনার ধরণটা একদম সাদামাটা আর শেষের দিকে এসে লেখক খুব সূক্ষ্ম ভাবেই ইতি টেনেছেন, অনেকের চোখ এড়িয়ে যেতেও পারে বিষয়টা।
'জলজ' ১২৫ পৃষ্টার বইটি কোনো রূপ চিন্তা না করেই নিয়েছিলাম। এই বইয়ের লেখক আর বই দুটোই আমার কাছে পরিচিত নয়, বইয়ের তেমন রিভিউও চোখে পড়ে নি। সেই হিসেবে বলতে গেলে বইটি মোটামুটি ভালো লেগেছে। লেখক মনে হয় বেশ খাদ্যরসিক, খাবার-দাবারের বর্ণনা গুলো ভালো লাগছে।
'জলজ' গল্পটি হাজার বছরের এক অভিশাপ আর তার ভেতরে একটি গ্রামের কিছু মানুষের জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে লেখা। বইটাতে বেশ কিছু রহস্য থাকলেও সেগুলোর সমাপ্তি খুব একটা গুছিয়ে করা হয়নি। গল্পের ভেতরে থাকা ভাতের হোটেলটির বর্ণনা এটির ভালো একটি দিক, সেটির খাবারের বর্ণনাগুলো বেশ মুখরোচকই বলা যায়। গল্পে আদিভৌতিক ব্যাপার কিছু থাকলেও খুব একটা ভয় পেলাম না। আর বইয়ের প্রোডাকশন আর প্রচ্ছদ মোটামুটি লেগেছে। সবমিলিয়ে পড়ার ইচ্ছে থাকলে একবার পড়ার মতোই গল্পটা, তবে এন্ডিং টা কারো কারো কাছে হতাশাজনক লাগতে পারে।
আজকালকার বেশিরভাগ হরর জনরার বইগুলোতে হয় মিথোলজি, নাহয় সায়েন্স ফিকশন কিংবা ওকাল্ট ফিকশনের সংমিশ্রন থাকেই। একেবারে পিউর হরর, যা আলাদা কোনো সাব জনরার সাথে মিশ্রিত না হয়ে একটি অতিপ্রাকৃত হররের স্বাদ দেয়, এমন গল্পের প্রতি আমার আগ্রহ বরাবরই বেশি। আর এমন গল্পগুলোই আবরার আবীর ভাইয়ের বইগুলোতে খুঁজে পাই। 'হুরপতঙ্গ' ও 'এখানে আশ্চর্য সব মানুষ রয়েছে' বইয়ের নিখাদ সুপারন্যাচারাল হরর গল্পগুলো পড়েই খুব আগ্রহী হয়ে উঠি উনার লেখা কোনো হরর উপন্যাস পড়ার জন্য। তখন হাতে আসে 'জলজ'।
আবরার আবীর ভাইয়ের গল্পগুলোতে যেমনটা দেখা যায়, একজন মুয়াজ্জিন/ইমাম থাকেন, কোনো চরিত্রের রান্নার একটা বিশেষ বর্ননা, গা ছমছমে একটা আবহ, সাধারন চরিত্রের মাঝে সৃষ্টি হওয়া রহস্য, আঞ্চলিক সংলাপ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো একটা নিখাদ হরর গল্পের স্বাদ দেয়। 'জলজ' বইটিতেও সেই সিগনেচার স্টাইলগুলো বিদ্যমান, তবে মোটেও গতানুগতিক নয়। স্টোরিটেলিং বরাবরের মতোই গ্রিপিং, অদ্ভুত সব গা ছমছমে স্থানের বর্ননা এত জীবন্ত যে পড়ার সময় সব ভেসে উঠছিলো চোখে।
হরর গল্পের সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো একটা ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যা পড়ার সময় গা ছমছমে একটা আবহ তৈরী হয়। সেদিক থেকে বললে এই বই সফল, অন্তত আমার জন্য। বইটি বেশ অনেকদিন আগেই পড়েছিলাম, তাই এখন লিখতে বসে প্লট নিয়ে বেশি কিছু বলতে পারছিনা। তবে আমি খুব উপভোগ করেছি। যারা হরর পছন্দ করে তাদের অবশ্যই ট্রাই করে দেখতে বলবো।