বাংলায় ইসলাম প্রচার ও মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। কারো মতে, তলোয়ারের জোরে বা মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। যুক্তি ও তথ্য যার যথার্থতা প্রমাণ করে না। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বহিরাগত সুফি-দরবেশরাই এ দেশে ইসলাম ধর্মের প্রসারে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। এই ধারণাটিও কি শতভাগ সঠিক? কারো কারো মতে, এ দেশের মুসলমানদের বড় অংশটাই নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্য থেকে ধর্মান্তর প্রক্রিয়ায় মুসলমান হয়েছে। এই ধারণার পক্ষে যেমন তেমনি বিপক্ষেও কিছু যুক্তি ও তথ্য রয়েছে। প্রচলিত এসব ধারণা এবং এ সম্পর্কে দেশি-বিদেশি পণ্ডিত ও গবেষকদের নানা মতামত বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি এসব ধারণা ও মতকে যুক্তি ও তথ্যের আলোকে যাচাই করতে চেয়েছেন আকবর আলি খান। তাঁর অন্য সব রচনার মতো এ বইটিতেও লেখকের তীব্র অনুসন্ধিৎসা এবং পরিশ্রমী ও নিরাসক্ত গবেষণা-প্রবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায়। বইটি কেবল আগ্রহী পাঠকের কৌতূহলই মেটাবে না, আলোচ্য বিষয়ে অনেক সংশয় ও বিভ্রান্তি নিরসনেও সহায়ক হবে।
Akbar Ali Khan (Bengali: আকবর আলি খান) was a Bangladeshi economist and educationist who served as a bureaucrat until 2001. He was the SDO of Habiganj during the Bangladesh Liberation War, when he decided to join the war. Later he served as an official of the Mujibnagar Government. After the independence he joined back the civil serviceand reached to the highest post of Cabinet Secretary and also worked as a university teacher. His book Porarthoporotar Orthoniti (Economics of Other-minding) has been a popular book on economics à la Galbraith.
১. বিশ্ব মানচিত্র খুলে বসলে দেখবেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর অনন্য বৈশিষ্ট্যর মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র ,যার চতুর্সীমানায় অন্য প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্র নেই। সম্ভবত জনসংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। ১৮৭২ এর আদমশুমারীর আগে কেউ ধারণাই করেনি যে এই ভূখণ্ডে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন সামনে চলে আসে যে, তিনপাশে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আর একপাশে বঙ্গোপসাগরে ঘেরা এত ছোট্ট একটা ভূখন্ডে এত মুসলমান কবে কিভাবে আসলো? এর উত্তর আমাদের হাইস্কুলের সামাজিক বিজ্ঞান বইগুলোতে যেভাবে দেওয়া আছে- উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে এবং আরব-পারস্য থেকে আগত পীর-সুফী-দরবেশ-বণিকদের প্রভাবে বাংলার মানুষ দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু উত্তরটা আসলে এতটা সহজ না।
২. যদি ধরে নেই, ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে আর আরব-পারস্য থেকে আগত পীর-সুফী-দরবেশ প্রভাবে বাংলায় গণধর্মান্তর ঘটে,তবে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে কেন এমনটা ঘটেনি?তাহলে কি মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই উপমহাদেশে ইসলাম প্রাধান্য বিস্তার করে?? এর এক কথায় জবাব হচ্ছে, বাংলার চাইতে ভারতের অন্যান্য অংশে কুলীন ব্রাহ্মণদের নিপীড়ন-বর্ণাশ্রমের খড়গ অনেক বেশী মাত্রায় ছিল এবং কেন্দ্রের নিকটস্থ হওয়ায় সেসব জায়গাতে মুসলিম ধর্মপ্রচারক আনাগোনাও বেশী ছিল।তারপরও দিল্লী-আগ্রার মত রাজধানীতেও মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। এই বাংলার স্থানীয় ব্রাহ্মণরা নিজেরাই যেখানে নানা ক্যাটাগরিতে বিভাজিত ছিলেন এবং সেন বংশের রাজারা উত্তর ভারত থেকে কুলীন ব্রাহ্মণ নিয়ে এসেছিলেন, সেখানে স্থানীয় ব্রাহ্মণরা চরম নিপীড়ন করার মত কতটা সক্ষম ছিলেন বা বর্ণাশ্রমকে ধর্ম ও নিয়তির অংশ মনে করা শূদ্ররা সেটাকে 'নিপীড়ন' ভাবতেন, সেই প্রশ্ন রয়েই যায়।
৩. তবে কি ফেসবুকে হালে যে মতটা খুব প্রচার করা হয় যে,এই উপমহাদেশে আরব বণিকরা ইসলাম ছড়িয়ে দিয়েছেন-সেটা সত্য?? আরব বণিকরা বাংলার যেসব এলাকা দিয়ে প্রবেশ করেছেন,সেই চট্টগ্রাম -নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় আরব শব্দের ব্যবহার এই তত্ত্বের হালে পানি যোগায়।তবে এমন তত্ত্বও জোর দাবী দিয়ে বলা মুশকিল। কারণ, আরব বণিকরা যেখানে ইসলাম নিয়ে গেছেন, সেখানে শাফেয়ী মাযহাবের প্রচলন বেশী। অথচ এই উপমহাদেশের প্রায় সব মুসলিম হানাফি মযহাবের। বণিকদের মাধ্যমে এই উপমহাদেশের অন্য যে জায়গায় ইসলামের প্রচার-প্রসার হয়েছে, সেটা আমার অতি আগ্রহের জায়গা কেরালা। সেখানে মুসলিম বণিকরা স্থানীয়দের বিয়ে করে আলাদা বসতি স্থাপন করেন। এরকম নজির এই অঞ্চলের ইতিহাসে পাওয়া যায় না।তাছাড়া চট্টগ্রাম -নোয়াখালী অঞ্চলের আরবদুষ্ট আঞ্চলিক ভাষা কেবল মুসলিম নয়,হিন্দু সহ অন্য ধর্মাবলম্বীরাও ব্যবহার করেন।
৪. গণধর্মান্তর করণ সহ এই বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য নিয়ে যতগুলো ঐতিহাসিক মতামত প্রচলিত আছে,তার সবগুলোই ডঃ আকবর আলী খান উনার " বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে ঐতিহাসিক সাফল্য " বইয়ে তথ্য - তাত্ত্বিক কাঠামো -সারণী দিয়ে যাচাই করতে চেয়েছেন। সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ রেখেছেন, প্রফেসর ইটনের বিখ্যাত ' The Rise of Islam & The Bengal Frontier ' বইয়ে উল্লেখিত 'উদ্যোক্তা পীর' তত্ত্বর খন্ডনে। ডঃ খান মনে করেন, এই বাংলায় ইসলামের বিস্তার লাভের গুরুত্বপূর্ণ কারণ,এখানকার গ্রামের সাংগঠনিক কাঠামো এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যর প্রাবল্য। একই ঘটনা ঘটেছে কেরালাতেও। যদিও উনি নিজের মতকে চূড়ান্ত মত দাবী করেন না এবং দ্রুত আরো গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন, আমার মনে হয়েছে বাংলায় ইসলামের বিস্তার নিয়ে এই বই বেশ আগ্রহ জাগানিয়া। বইটি সাকুল্যে ১১৩ পৃষ্ঠার হলেও এই বই নিয়ে কয়েকশো শব্দের আলোচনা লেখা খুব সহজেই সম্ভব। সময়ের অভাবে লেখা হলো না।
৫. বহুদিন যাবত আমার কৌতূহলের জায়গা ছিল যে, 'সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান' বলে বহুল প্রচারিত টার্মের অর্থ বা তাৎপর্যটা কি?? এই বই পড়ার পরে আমার মনে হয়েছে,যেহেতু এই বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমই আসলে নিম্নবর্গের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত মুসলিম,তাই তাদের থেকে নিজেদেরকে 'আশরাফ 'শ্রেণীর দাবী করার জন্য আরব-পারস্য থেকে অভিবাসনসূত্রে আসা মুসলিমদের বংশধররা নিজেদেরকে ' সম্ভ্রান্ত ' বলে দাবি করেন। যদিও আরব থেকে আসা মুসলিমরা কোন গুণে নিম্ন বর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত মুসলিমদের থেকে উন্নত -আমার ছোট মাথায় ধরে না।
৬. গত দশ বছর যাবত ডঃ খান শারীরিকভাবে অসুস্থ ও অসমর্থ। তার উপরে তাঁর একমাত্র মেয়ে ও স্ত্রীকে হারানোর বেদনা। এতসবের মধ্যেও তিনি প্রচুর খাটনাখাটনি করে যেসব বই লিখেন, তাতে করে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা চলে আসে।
রেজা আসলানের ‘নো গড বাট গড’ পড়তে পড়তেই মনে হয়েছিল, বাংলায় ইসলামের আগমন নিয়েও একটা বই পড়ার সুযোগ পেলে ভালো হতো এবং সে সূত্রেই আকবর আলি খানের বইটা তুলে নিয়েছিলাম। আকবর আলি খানের নানা বইয়ের রিভিউ পড়লেও এর আগে তাঁর কোন বই পড়া হয় নি। খুব ইচ্ছা আছে কোন এক সময়ে ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ পড়ার। দেখা যাক, কখনো পড়া হয় কিনা।
বইটি পড়ে সারাজীবন শুনে আসা অনেক মৌখিক ইতিহাসপ্রসূত ভুল ধারনা কিছুটা হলেও দূর হয়। যেমন, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা দলে দলে মুসলমান হয়ে যাবার যেই গল্প প্রচলিত, তার বিপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে লেখক এখানে বলেন যে উচ্চবর্নের হিন্দু উপমহাদেশের অন্যত্রও একই কাজ করেছে, কিন্তু, বাংলা বাদে অন্যখানে ইসলামের প্রসার তাতে ঘটে নি। পীর-আউলিয়াদের প্রচারক হিসেবে যে একচেটিয়া স্থান দেয়া হয়েছে, তা নিয়ে ইটন সাহেবের যুক্তির সাথেও পুরোপুরি একমত হন নি লেখক। এমনকি ইতিহাসে গণধর্মান্তরকরনেরও কোন ঘটনা পাওয়া যায় না, যা ঘটলে রাজার সভাসদ কর্তৃক রচিত ইতিহাসে স্থান পেতোই বলে লেখক মনে করেন। তিনি উপসংহার টেনেছেন কিছুটা এভাবেই যে নিশ্চিত কারন কি ছিল এই এলাকায় মুসলমানের সংখ্যাধিক্যের তা জানা না গেলেও ইসলামের প্রতি অনুরাগবশতই সম্ভবত এতো মানুষ ধর্মান্তরিত হয়েছিল।
বইটিতে যেই বিষয়টা মনে হয়েছে থাকলে ভালো হতো সেটা হল স্থান ভিত্তিক আরো তথ্যের উপস্থিতি। কারন, এলাকা ভেদেও নানা মিথ আছে। সেগুলো সম্পর্কে পাঠককে জানাতে পারলে বইটা আরো নির্ভরযোগ্য হতো। অবশ্য, এই বইয়ের কলেবর তা কতোটুকু অনুমোদন করতো জানি না। সারনীগুলো সারনী আকারে না দিয়ে সহজে বর্ণনায় এসব তথ্য আসলে গবেষনাপত্রের যেই ভাবগাম্ভীর্য, তা থেকে বইটা বেরিয়ে এসে পাঠককে আরো সংযুক্ত করতে পারতো।
সাধারনত, বইয়ের মলাট বা বাঁধাই নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু থাকে না। এ বইয়ের ক্ষেত্রে বলতে হচ্ছে। ‘প্রথমা’ প্রকাশনীর আটোসাঁটো বাঁধাই বইটিকে মেলে ধরে পড়ার বেলায় বেশ অসুবিধার সৃষ্টি করে। সহজে সমাধানযোগ্য এই সমস্যা আশা করছি পরবর্তী সংস্করণে দূর হয়ে যাবে।
১৮৭২ সালের আগে কেউ ধারণাই করতে পারেনি বৃহৎবঙ্গে বাঙালি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ। ১৮৭২ সালে বেভারলি সাহেবের তত্ত্বাবধানে প্রথম আদমশুমারি হয়। তখনই আবিষ্কৃত হয় বঙ্গে মোট জনসংখ্যার প্রায় আধেক অংশ মুসলমান। কিন্তু কেন? এই কেন'র উত্তর খোঁজার প্রয়াস আকবর আলি খানের 'বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য' শীর্ষক গবেষণাধর্মী গ্রন্থটি।
মুসলিম শাসকদের প্রভাব, উচ্চবর্গের হিন্দুদের নির্যাতন, বৌদ্ধদের দলে দলে ইসলাম গ্রহণ কিংবা পীরদের মাহাত্ম্য - বাংলায় ইসলামের বিকাশের পেছনে মোটাদাগে এইসব কারণগুলো উল্লেখ করা হয়। আমেরিকার ইটন সাহেবও এই নিয়ে মোক্ষম এক পুস্তক রচনা করেছেন। অসীম রায়, মোহর আলি, ফজলে রাব্বীদের মতামত গ্রহণ কিংবা বর্জন দুইই অত্যন্ত যৌক্তিকতার সাথে করেছেন আকবর আলি খান। মিথ নয়, বাস্তবতার নিরিখে বুঝতে চেয়েছেন বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্যের শিকড়।
বাংলাদেশে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান, সেটা ১৮৭২ সালের আগে কেউ জানতো না। ১৮৭২ সালে ব্রিটিশরা সর্বপ্রথম এদেশে আদমশুমারি করে। তখন দেখা গেল বাংলায় প্রায় ৪৮% মানুষ মুসলমান। এই সংখ্যা বাড়ার কারণ কি?
কারণ হিসেবে অনেকে অনেক কথা বলেন। কেউ বলেন বাংলায় ইসলাম প্রচার হয়েছে শাসকদের তরবারির জোরে। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় বাংলার মুসলিম শাসকদের ইসলাম প্রচারে তেমন বেশি আগ্রহ ছিল না। তারা মূলত বাংলার সম্পদের কথা শুনেই বাংলা শাসন করতে আসেন, আর এটাই করেন। এমনকি তাদের উচ্চপদ গুলোতেও মুসলিম আধিক্য ছিলো না। আবার কেউ বলেন বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য এনেছেন সুফি ও পীররা। এটা সকল ইতিহাসবিদরা গ্রহন করেছেন। কিন্তু বাংলায় সুফিদের এত সফলতার কারণ কি? সুফিরা তো ভারতের অন্য সকল প্রদেশেও গিয়েছিলেন, কিন্তু সেসব জায়গায় তাঁরা খুব বেশি সফলতা আনতে পারেনি। তবে বাংলায় এমন উল্লেখযোগ্য সফলতার কারণ কি? বাংলায় মূলত কারা মুসলমান হয়েছে? এরা কি নিম্ন বর্ণের হিন্দু নাকি এরা আরব দেশ থেকে আগত মুসলিম?
এই সকল প্রশ্নের গবেষণা ভিত্তিক নিরপেক্ষ উত্তর খুঁজতে হলে আপনাকে এই বইটি পড়তে হবে। আমি এতটা নিরপেক্ষ লেখা এর আগে পড়িনি। মাস্ট রিড বলবো।।
আকবর আলী খানের অন্যতম একটি ভালো কাজ এই বইটি।শুধুমাত্র ইতিহাসের নিরেট তথ্য আর বয়ানের আলোকেই বইটি সাজানো হয়নি।বরং রীতিমতো গবেষণা করে সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি আর ভুগোলের মত বিভিন্ন বিষয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্যের কারণগুলো।বইটাকে শুধুমাত্র এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভালো বললে বোধহয় অবিচার হয়ে যাবে। লেখক গবেষণা আর পরিশ্রম করে গ্রন্থ রচনা করার পাশাপাশি পাঠককে ইতিহাস সচেতন হওয়ার প্রতিও উৎসাহ দিয়েছেন বলে আমার জোর বিশ্বাস।কেননা, লেখকের লেখায় বারবার উঠে এসেছে ইতিহাস সংরক্ষণ না করার সুপ্ত হাহাকার।ইতিহাস সংরক্ষণ না হলে পরবর্তীতে তা অনেক কিংবদন্তীর জন্ম দেয়, ফলে ইতিহাস গবেষণা হয়ে দাঁড়ায় সমুদ্র সেচা কিংবা খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতন। হ্যাপি রিডিং🖤💙
বইটির মূল বক্তব্য বা হাইপোথিসিস একটি বড়সড় প্রবন্ধেই তুলে ধরা যেত, ওইটুকুর জন্য ১২০ পৃষ্ঠার বই লিখতে হয় না। বিভিন্ন অধ্যায়ে তথ্য ও ব্যাখ্যার পুনরাবৃত্তি বিরক্তি জাগিয়েছে। তবে বেশ কিছু অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা জানা গেছে। ওটার জন্যই তিন তারা।
ঝরঝরে বই। নন-ফিকশন বই আস্তে ধীরে পড়া লাগে সাধারণত। তবুও বেশ দ্রুত পড়ে ফেলতে পেরেছি। আকবর আলি খানের গবেষণা মূলত অর্থনীতি নিয়ে। তবে ভদ্রলোক বেশ সাহিত্য অনুরাগী সেটা বোঝা যায়। সাহিত্যকেও তিনি দেখেছেন ইতিহাস হিসেবে- এদিকটা বেশ সুন্দর। তথ্য উপাত্ত দিতে কার্পন্য করেননি বিন্দুমাত্র, যেখানে পাননি সেখানেও দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করে গেছেন সে কথা। ছোট্ট এই বইটিতেও এগারটি অধ্যায় জুড়ে বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার পেছনে একাধিক কারণ বের করে আনা হয়েছে। তার পক্ষে এবং বিপক্ষে তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ, গবেষক প্রমুখের মতামত এবং যুক্তি। সব মিলে বেশ উপভোগ্য।
বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য নিয়ে তথ্যভিত্তিক, নির্মোহ অ্যাকাডেমিক আলোচনা করেছেন জনপ্রিয় অর্থনীতিবিদ এবং প্রাক্তন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান। ওনার লেখার হাত বরাবরই খুব ঝরঝরে, একাডেমিক হওয়া সত্ত্বেও, প্রচুর তথ্যসূত্র এবং ঐতিহাসিক উপাদান থাকা সত্ত্বেও কখনোই পাঠকের বোরিং লাগবে না। আজব এবং জবর আজব অর্থনীতির পরে ওনার দ্বিতীয় বই পড়া আমার।
বাংলায় ইসলাম প্রসারের বিভিন্ন তাত্ত্বিক আলোচনা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়শই কমেন্টবক্সে ঝড় তোলে। সেক্যুলার দের মতে মুসলিম শাসকদের তরোবারির জোরে বাধ্য হয়ে ইসলাম কে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সাধারণ মানুষের উপরে, অন্যদিকে ইসলামিক চিন্তাধারার দাবি ধর্মের উদারতা এবং নিরাপত্তার তাগিদে পালে পালে মানুষ পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছে৷ ইতিহাসের এইরূপ সরলীকরণ দেশীয় ডিস্কোর্সের কমন থিম, এবং অহেতুকী অকার্যকর সিদ্ধান্তের জন্ম দেয়। লেখক সময় নিয়ে একাধিক হাইপোথিসিস তুলে ধরেছেন বাংলায় ইসলামের সাফল্যের, প্রতিটার পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, এবং শেষে অনুসিদ্ধান্ত উপস্থাপন করে নতুন রিসার্চের তাগিদ দিয়েছেন৷
আকবর আলি খান ইকোনোমিকস এর মানুষ, কিন্তু তার লেখায় সব সময়ই থাকে ইতিহাসের মাল্টিভ্যারিয়েট এনালাইসিস। লেখক সাহিত্যের অনুরাগী, সাহিত্যকে ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্ত হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন। ভৌগোলিক পরিমণ্ডলের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলেন, নৃতাত্বিক আলোচনা করেন, যেখানে তথ্যের অভাব সেই জানানটুকুও দেন। বাংলার সামাজিক জীবন, বাংগালির মানস নিয়ে লেখকের কিছু থিসিস আছে, যেটা অন্য বইতেও ব্যাক্ত করেছেন। বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক মতাদর্শ বুঝতে হলে ওনার অন্যান্য বইয়ের সাথে এই বইটাও পড়তে হবে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য এবং মুসলিম সংখ্যাধিক্যের কারণ নিয়ে নানান শ্রুতি প্রচলিত আছে যার বেশিরভাগই ঐতিহাসিক দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত নয়। জীবনের কোন এক পর্যায়ে ব্যক্তিজীবনে এগুলো নিয়ে আলোচনায় সামিল আমরা কখনো না কখনো হয়েছিই। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অত্যাচারের কারণে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধদের ইসলাম গ্রহণ এবং তলোয়ারের জোরে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা দুটি প্রধান ভ্রান্ত ধারনা। লেখক এরকম ধারনা সহ বিভিন্ন সময়ের গবেষক এবং ঐতিহাসিকেরা বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্যের যেসব কারণ তুলে ধরেছেন লেখক সেগুলোর যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করেছেন। লেখকের অন্যান্য লেখার মতই এই বইটিতেও ছিল তথ্য ও যুক্তির সাবলীল উপস্থাপন।
"প্রদোষে প্রাকৃতজন" পড়বার পরে, বাংলায় ইসলামধর্মের প্রসার নিয়ে আমি আগ্রহী হই, সেই সূত্র ধরে আমার প্রিয় লেখক প্রয়াত আকবর আলী খানের বইটি পড়া।
স্যারের ভাষায়, এই গ্রন্থের লক্ষ্য হলো বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য সম্পর্কে চলমান বিতর্কের মূল প্রশ্নগুলো আলোচনা করা। বইটি এগারোটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়ে বইটির প্রস্তাবনা ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং বইটির রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাংলাদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণ কারা-স্থানীয় হিন্দুরা না পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত মুসলিম অভিবাসীরা-এ সম্পর্কে বিতর্ক পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়ে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে মুসলমান শাসকদের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়ে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ওপর ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচার বাংলায় ধর্মান্তরকরণে কী ভূমিকা রেখেছে, সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
পঞ্চম অধ্যায়ে বাংলায় বৌদ্ধদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ফলে মুসলমানরা সংখ্যাধিক্য অর্জন করেছে, এই অনুমানটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে বাংলাদেশে সুফি, দরবেশ ও পীরদের ইসলাম প্রচারে ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সপ্তম অধ্যায়ে বাংলাদেশে কখন ইসলাম প্রচার শুরু হয় এবং কখন ইসলাম সাফল্য অর্জন করে সে সম্পর্কে প্রচলিত তত্ত্বসমূহ পর্যালোচনা করা হয়েছে।
অষ্টম অধ্যায়ে পীরেরা বাংলার সমাজে বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে সমর্থ হন কিন্তু ভারতের অন্যত্র তাঁদের এ ধরনের ভূমিকা ছিল না-অসীম রায়ের এ তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এর দুর্বলতাসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে।
নবম অধ্যায়ে রিচার্ড এম ইটনের উদ্যোক্তা-পীরদের তত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে এবং এর দুর্বলতাসমূহ তুলে ধরা হয়েছে।
দশম অধ্যায়ে বাংলাদেশে ইসলামের সাফল্যের ক্ষেত্রে গ্রামীণ সমাজের গড়নের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
একাদশ অধ্যায়ে বাংলায় ইসলাম প্রচার ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের ইসলাম প্রচারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এবং বাংলার ক্ষেত্রে আলোচিত তত্ত্বসমূহ অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সবশেষে এ সম্পর্কে ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে।
🔴 পাঠবিশ্লেষণ: বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রসারণ নিয়ে বেশ কিছু প্রচলিত ফ্যাক্টর রয়েছে। এই ফ্যাক্টরগুলো হলো -
১. অন্য অঞ্চল থেকে আশরাফীদের মাইগ্রেশন ২. হিন্দুদের স্বগোত্রীয় শ্রেণিবৈষম্য ৩. বাংলায় হিন্দু ও বৌদ্ধদের মধ্যেকার দ্বন্ধ ৪. ইসলামী সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা ৫. ইসলামী সুফী দরবেশ ও পীরদের পৃষ্ঠপোষকতা ও মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তৈরী
এক্ষেত্রে একটা বিষয় সবার মাথায় রাখতে হবে যে, উপরোক্ত ফ্যাক্টরগুলো ভারতেও সব প্রদেশে চলমান ছিল : কিন্ত বাংলায় ইসলাম প্রচারে যে সাফল্য পাওয়া গেছে, তা ভারতে হয়নি।আকবর আলী খান এই বইয়ে যথাযথ তথ্যের আলোকে এই সকল ফ্যাক্টরগুলো বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে এই সিন্ধান্তে পৌছান যে -
১. বাংলার মানুষ নিম্নবর্গের হিন্দু বৌদ্ধদের বংশধর, ইসলামী মাইগ্রেটেড আশরাফীরা কখনোই ১৬% এর বেশি নাহ।
২. বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্যের সবথেকে বড় কারণ বাংলার উন্মুক্ত গ্রামব্যবস্থা - যেখানে মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ছিল, ভারতীয় হিন্দু সমাজের গ্রামগুলোর মতন কট্টর বিধিনিষেধ ছিল নাহ, এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি দূরে দূরে অবস্থান করতো - যা সে সকয়ে ধর্মান্তরের অনুকূল পরিবেশ।এই উন্মুক্ত গ্রামব্যবস্থা ধর্মান্তরের সবথেকে বড় কারণ হিসেবে লেখক তার গবেষণায় বলেছেন।
গবেষণাধর্মী এই বইটি সহজবোধ্য ভাষায় লেখা, বাংলার ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী যে কারো জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য।
বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ- আকবর আলি খান
বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্যঃ একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ আকবর আলি খানের একটি অন্যতম গবেষণামূলক ইতিহাস গ্রন্থ। ব্যাপক পড়াশোনার পর তিনি এই বইটি লিখেছেন এটা বইটির শেষে যুক্ত থাকা তথ্যসূত্রের ভাণ্ডার দেখেই বোঝা যায়।
মূলত ব্রিটিশ আমল থেকেই বাংলায় ইসলাম প্রচার ও প্রসারের সাফল্য নিয়ে ইংরেজরা চিন্তা শুরু করেছিল কারণ সেসময় খ্রিষ্টান মিশনারিরা খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তাতে তারা সন্তুষ্টজনক সাফল্য লাভ করতে পারেনি। অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মনে করতেন, “ইংরেজ ঐতিহাসিকরা বাঙালি হিন্দুদের গৌরবোজ্জ্বল কীর্তিসমূহ লুকিয়ে রেখেছেন এবং এমন ধারণার সৃষ্টি করেছেন যে হিন্দুদের পূর্বপুরুষদের কোনো গৌরব ছিল না এবং তাদের পক্ষে বর্তমানেও কোনো গৌরব অর্জন করা সম্ভব নয়”। এরপর তিনি হিন্দুদের প্রচলিত ভাবমূর্তি ভেঙ্গে ফেলে নতুন ইতিহাস তৈরির লক্ষ্যে তার উপন্যাসে হিন্দু নায়ক ও নায়িকাদের বীর ও সম্ভ্রান্ত এবং মুসলমানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এরূপ দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন।
এরকম বহু অনুষঙ্গ লেখককে অনুপ্রাণিত করে বাংলার ইসলামের অগ্রগতির ব্যাপারে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্র তৈরি করতে। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন গবেষক, চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক ও ঐতিহাসিকদের বই, গবেষণা পত্র, নিবন্ধ ও উক্তি ব্যবহার করে যেভাবে বইয়ের আলোচনাকে এগিয়ে নিয়েছেন তা বাংলায় মুসলমান সমাজের প্রসারের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরতে সহায়ক হয়েছে এটা স্বীকার করতেই হবে।
আলোচনার সুবিধার্থে বিতর্কমূলক বক্তব্যগুলোকে লেখক দুটি ভাগে বিভক্ত করে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। প্রথম ভাগে রেখেছেন প্রথম প্রজন্মের ঐতিহাসিকদের। প্রথম প্রজন্মের ঐতিহাসিকদের মধ্য থেকে মোট পাঁচটি তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছেঃ
এক. পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত আশরাফ মুসলমানরা বসতি স্থাপন করেছিল বলে। দুই. মুসলমান শাসকরা স্থানীয় হিন্দুদের জোর করে এবং বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছে। তিন. বাংলায় উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের শোষণ করেছে। ইসলাম বর্ণবাদে বিশ্বাস করে না এবং সকল মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের উদ্যোগ নিয়েছে; ইসলামের এই সাম্যবাণী অনেক হিন্দুকে অনুপ্রাণিত করেছে। চার. হিন্দুরা বৌদ্ধদের অত্যাচার করত। হিন্দুদের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পূর্ব বাংলার বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করেছে। পাঁচ. বাংলাদেশে মুসলমান সুফি, দরবেশ ও পীরগণ ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। তাদের আধ্ম্যাতিক শক্তিতে অনুপ্রাণিত হয়ে দলে দলে লোক ইসলাম গ্রহণ করে।
উপরে উল্লেখিত প্রত্যেকটি তত্ত্বের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। এর মধ্যে বেশিরভাগ পয়েন্টের মধ্যেই শক্তিশালী তেমন মোটিভ খুঁজে পাননি। অধ্যায় জুড়ে নিজেই তিনি উল্লেখিত তত্ত্বের বিশদ আলোচনা সমালোচনা করে তত্ত্বটির গ্রহণযোগ্যতা পাবার চেষ্টা করেছেন। নিজেই প্রশ্ন করেছেন নিজেই উত্তর খুঁজে তার স্বপক্ষে বয়ান দিয়েছেন।
জনাব আকবর বাংলায় ইসলাম প্রসারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতীয় অঞ্চলের বাহু ঘেঁষে অবস্থানরত অন্যান্য মুসলমান প্রধান দেশগুলোর সম্পর্কেও সামগ্রিক যুক্তি খুঁড়েছেন। পৃথিবীর আনাচে কানাচে আষ্টে-পিষ্টে থাকা গবেষকদের উক্তি ও গবেষণাপত্রের উপর ভিত্তি করে গ্রন্থটির সামগ্রিকতা উপস্থাপন করা হয়েছে। ৩২৫ টাকা প্রচ্ছদ মূল্যে বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ পেয়েছে প্রথমা প্রকাশনী থেকে। প্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন মাসুক হেলাল। ১২৪ পৃষ্ঠার এই ���ইটি আকারে ভীষণ ছোট্ট কিন্তু এর ভার অনেক। খুবই সাবলীল ভঙ্গিমায় লেখা। লেখনশৈলীতে কোনো জটিলতা কিংবা গুরুগাম্ভীর্যতা নেই।
এই বই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে টেনেছে। মোহর আলী নামের একজন ইতিহাস বিশেষজ্ঞের কথা বারবার বলেছেন আকবর আলি খান। মোহর আলী মধ্যযুগের বাংলাদেশের ইতিহাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। আমার বাবা মোহর আলীর একজন প্রিয় ছাত্র ছিলেন। বলা যায় বাবার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন মোহর আলী। মোহর আলীর গল্প শুনে আমি বড় হয়েছি। বাসায় মোহর আলীর বই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। সেই বই থেকে আকবর আলি খান সুত্র খুঁজেছেন। হাইপোথিসিস দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন।
এই বই নতুন করে গোছানো হয়েছে। আগে বের হওয়া এই লেখকের ডিসকাভারি অব বাংলাদেশ বই, এবং জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাকে দেওয়া লেকচার ও অন্যান্য লেখা থেকে সম্পাদনা করে বইটি লেখা হয়েছে। ভূমিকায় তিনি এগুলো বলেছেন। জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক বক্তৃতায় আকবর আলি খানের পর্বে আমি উপস্থিত ছিলাম। এতে বইটাকে রিলেট করতে আমার সুবিধা হয়েছে।
বইটা ছোট। নতুন সিদ্ধান্ত এখানে কম। তবে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা এলাকার অনেক বিষয়ে কিছু তথ্য আকবর আলি এনেছেন। যেগুলো পুরো সময়কে বুঝতে বা একরকম ধারণা পেতে সাহায্য করে। বইটা শেষ করে চট করে বলে দেওয়া যাবে না বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য কেমন করে এল। কারণ বইটাতে গবেষক ও প্রচলিত ধারণার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মতগুলোকে বিভিন্ন দিক থেকে যাচাই করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আকবর আলির ২০১১-২০২০ এ প্রকাশিত বইয়ে যেমন দেখা যায়, তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণের সঙ্গে নিজে একরকম সিদ্ধান্ত বের করেছেন, এই বইয়ে সেটা নেই। এখানে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তিনি আগের মতগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। সমালোচনা করেছেন। নতুন চিন্তা যেন পাঠকের মধ্যে আসে, চেষ্টা করেছেন।
বাঙালি মুসলমানদের বুঝতে হলে এই বইয়ের সুত্রগুলো নাড়াচাড়া করতে হবে। মানে বইটা পড়তে হবে। বাংলাদেশের গ্রাম কাঠামো, আর্থিক অবস্থা, ধর্ম মানার প্রবণতা, হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, এসব বিষয়ে আমার জানাশোনা কম। এই বই জানাশোনা বাড়ানোর জন্য একটা সুত্র হিসেবে কাজ করেছে আমার ক্ষেত্রে।
বাংলায় বিশেষ করে পূর্ব বাংলায় মুসলমান সংখ্যার আধিক্য নিয়ে প্রচলিত সকল বিশ্লেষণ এর সমাহার নিয়ে রচিত হয়েছে এই বইটি। আকবর আলি খানের লেখা সবসময়ই সুখপাঠ্য, এই বইটিও ব্যতিক্রম নয়। সহজ সরল ভাষায় তত্ত্বে সাথে তথ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রচলিত সব হাইপোথিসিস এর শক্তি আর দুর্বলতা উপস্থাপনের পাশাপাশি নিজের অভিমত প্রকাশ পেয়েছে। বাংলায় ইসলামের প্রসারের পেছনের কাহিনি জানার ক্ষেত্রে বইটি অবশ্য পাঠ্য হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
বইটা ভালো লাগছে। চারপাশে হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বত্তেও বাংলায় কিভাবে ইসলাম মেজরিটি হল তার কারণ খুঁজার চেষ্টা করা হইছে। বইয়ের লাস্ট এ উনি কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছাইছেন।
কয়েকটা প্রশ্ন দিয়ে পুরো বইটা বুঝার চেষ্টা করা যায়। কারা মুসলমান হইছিল? পশ্চিম থেকে সরাসরি অভিবাসন এর চেয়ে মেজরিটি মানুষ মুসলমান হইছে নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা মুসলমান হবার কারণে। কাদের দ্বারা হইছিল? মোঘল সুলতান দের দ্বারা না, পীরদের দ্বারাই বাংলার গ্রামগুলোতে গণ-ধর্মান্তর না হয়ে ধীরে ধীরে ধর্মান্তর হইছে। পীরদের আগমন তো উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও হইছে, তাহলে ওখানে হিন্দু মেজরিটি কেন? ওই জায়গাগুলোতে ছিল কেন্দ্রমুখী গ্রাম, একটা বড় হর্তাকর্তা বা উচ্চ বর্ণের হিন্দুরাই গ্রামের প্রধান হইতো, একঘরে হলে গ্রামের কোথাও স্থান হতনা। আর বাংলার বেশিরভাগ গ্রাম ছিল সরলরৈখিক মানে ঘরগুলো ছড়ানো-ছিটানো, একটু বেশি স্বাধীন। একঘরে করে দিলেও তারা গ্রামের বাহিরে গিয়ে নিজেরাই আবার ঘর তৈরি করতো। এছাড়াও বাংলার সংস্কৃতি, বন-জঙ্গল কম বেশি হওয়া এরকম আরো কিছু আলাপ আছে।
লেখক সাজেস্ট করছেন এ বিষয়ে একটা ফিক্সড উপসংহার এ পৌঁছাতে আরো ঐতিহাসিক, নৃতাত্তিক, সামাজিক তত্ত্ব ও তথ্য দরকার। আমার মনে হল, দুই দিকের গ্রাম এর গঠন আলাদা হল কেন এটাও জানা দরকার, পরবর্তীতে এ নিয়ে কিছু পড়া লাগবে।
যেটা ভালো লাগছে বই এর ভাষা। আমরা যারা এইসব ডিসিপ্লিন এর না, আগ্রহ থেকে কিছু পড়তে আসলে প্রথমেই একটা ঢাক্কা খাই ভাষা আর শুধু সংখ্যা দেখে। এ বইটায় সব ডাটা সুন্দর করে প্রেজেন্ট করছে প্লাস প্রতি অধ্যায় এর শেষে দুই এক লাইন এ আবার রিকেপ করছে মেসেজগুলো। আগ্রহ থাকলে পড়ে দেখা যায়!
ভারতবর্ষে পাকিস্তান ব্যতীত বাকি সব অঞ্চলেই হিন্দুধর্মানুসারী বেশী বলেই ধারণা ছিলো তখনকার গবেষকদের। কিন্তু এই চিন্তায় বড়সড় এক ফোড়ন কাটলো ১৮৭২ সালের ইংরেজদের করা প্রথম আদমশুমারী। দেখা গেলো, বাংলায় মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
তো, কোথা থেকে আসলো এতো মুসলিম। ইসলাম ধর্ম কীভাবে বাংলায় এতো শক্তিশালী হয়ে উঠলো, এই নিয়ে চিন্তা করা শুরু হলো। বিভিন্ন গবেষণা আর গবেষকদের নানা মতের পরেও যেন দোদুল্যমান আসল সত্য বা আসল রহস্য।
আরবদের ব্যবসা করতে এসে ধর্মান্তরিত করার কথা অথবা নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদেরকে অর্থলোভ দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করার কথা যেমন এসেছে; আবার ঠিক বিপরীতে, ধর্মান্তরিদের মধ্যে নিচুবর্ণের হিন্দু খুজে পাওয়া দুরুহ বলেও প্রকাশ পায় গবেষণাপত্র।
সবচাইতে যৌক্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য যে সমাধানে আসা যায়, তা হলে পীরদের দেশে পীরদের প্রভাব। বড় বড় পীরদের ধর্মপ্রচার এবং তাদের পরবর্তী মাজার কেন্দ্রিক ধর্মপ্রচারে এই দেশে মুসলিমদের আধিক্যতার সহায়।
তবুও ই কি এই শেষ কথা? না, বিষয়টা এখনো ঘোলাটে আকবর আলি খানের মতে। সময়ের সাথে আরো গবেষণার তাগিদ রাখে এই বিষয়। সেই গবেষণা হোক, সমাধান হোক রহস্যের।
নিঃসন্দেহে বেশ ভালো একটি বই। অনেক তথ্য, মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক মিথিস্ক্রিয়া নিয়ে উপভোগ্য একটা বই।
তবে বইটার একটা ঘাটতি আমি বলবো লেখক বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্যের পেছনে নিজে যে হাইপোথিসিস দাড় করিয়েছেন, সেটার পেছনে উনি নিজে যথেষ্ট পরিমাণ গবেষণা করেন নি বা করলেও যথাযথ তথ্য - প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে পারেন নি ( অন্য ঐত��হাসিকদের কিছু কোটেশন ছাড়া)। বইয়ের সমাপ্তি টেনেছেন হাইপোথিসিস প্রমাণের দায়িত্ব অন্যদের উপর ছেড়ে দিয়ে।
তারপরও এই বিষয়বস্তু সম্বন্ধে যাদের আগ্রহ আছে তাদের জন্যে বইটি অবশ্যপাঠ্য।
This entire review has been hidden because of spoilers.
খুবই সুন্দর। এ বিষয়ে বিদ্যমান সব মতামত / অভিমত বিশ্লেষণ করে নিজের একটা বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে যা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে। তবে শেষের দুই অধ্যায়ে ইংরেজিতে লম্বা উদ্ধৃতি লেখাকে পরীক্ষার খাতায় অধিক নাম্বার পাওয়ার জন্য চেষ্টার মত মনে হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে লেখক অধিকতর সময় ব্যয় করার পরিবর্তে উদ্ধৃতি দিয়েই দায় সারতে চেষ্টা করেছেন।
বাংলায় ইসলাম প্রচার কীভাবে সাফল্য পেয়েছিল সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন তত্ত্ব ও উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই সাথে বাংলা ও উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার ও গ্রহণ সম্পর্কিত কিছু প্রচলিত মিথকে ভাঙা হয়েছে। সবমিলিয়ে ভালো বই৷