গদ্যলেখক হিসেবে ইমতিয়ার শামীমের শক্তিশালী কলমের ক্ষমতা সম্পর্কে এ দেশের পাঠক ওয়াকিবহাল তিন দশকেরও বেশি৷ তাঁর কথাসাহিত্যিক কৃতী সম্পর্কে নতুন করে বলার নেই। জনজীবনের ভাঙন ও যূথবদ্ধতা, রাষ্ট্রযন্ত্রের পেষণে নির্যাতিত মানুষ, অন্ধকারে হানা দেওয়া গোপন ও প্রকাশ্য সন্ত্রাস আর ব্যক্তিজীবনের হাহাকারের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা ভালোবাসার পাতলা পরত উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। এর বাইরেও এমন সব বিষয়কে লেখার উপাদান করেছেন তিনি, যা আমাদের চোখে প্রায়শ যেন ধরাই পড়ে না। কোমল কঠোর কলমে সেখানে তাঁর অনায়াস যাত্রা।
এই বইয়ের দীর্ঘ ও ছোটো গল্পগুলোয় গদ্যদিগন্তের নতুন সীমানা ছুঁয়েছেন লেখক। কাহিনিকথন ও বিষয়বৈচিত্রে অভিনব এই গল্পগ্রন্থতে আমরা পাই নতুন এক ইমতিয়ার শামীমকে।
ইমতিয়ার শামীমের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আজকের কাগজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু নব্বই দশকের গোড়াতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ (১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ‘একদম আলাদা, নতুন। আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’
ইমতিয়ার শামীম ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গল্পগ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার (২০১৪), সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সকল প্রধান সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
প্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীমের গদ্যভাষা বরাবরই পদ্যগন্ধী। তার গল্প ও উপন্যাসের গুরুগম্ভীর বিষয়বস্তুর সাথে এমন ভাষা মাঝে মাঝে আরোপিত মনে হয়। কিন্তু এই গল্পগ্রন্থের বিষয় প্রেম ও নস্টালজিয়া হওয়ায় তার গীতিময় গদ্য তীব্র ভালোলাগার জন্ম দেয়। বিষয়,ভাব ও ভাষার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে। বিশেষ করে প্রথম গল্প "প্রেমের জন্মমৃত্যু রহস্য" পুরোটাই দীর্ঘকবিতার মতো। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভাষার আশ্চর্য কারুকাজে মোহাবিষ্ট হয়ে ছিলাম। পুরো বইতেই মনে রাখার মতো অজস্র লাইন আছে। যেমন- "আমি তো জানতামই না,অপচয়ের শিল্প দিয়ে মানুষ নিজের অশ্রুবিন্দুকে কত দুর্লভ করে তোলে।" "শোন, সবকিছু পালটে যায়,কেবল একাকিত্ব ছাড়া,কেবল অন্ধকার ছাড়া।" জীবনানন্দের কাব্যসমগ্র উপহার পাওয়ার পর নায়কের প্রতি লেখকের উক্তি-"একটি মেয়ে তোমার হাতে সারাজীবনের জন্যে বিষণ্ণতা তুলে দিলো।" গল্পগুলোয় কাহিনি,চরিত্রায়ন ও পরিণতির দিক দিয়ে খুঁত থাকলেও লেখকের অপূর্ব লিখনশৈলী এগুলোর অভাব অনেকটাই পূরণ করেছে। প্রতিবাদী, রাজনীতি সচেতন লেখক এ বইতে ধরা দেন অন্যরূপে। তার লেখকসত্তার অন্য দিক জানার জন্য হলেও বইটা সবার পড়া উচিত। (২১ জুন,২০২১)
ইমতিয়ার শামীমের এই বইয়ের গদ্য এক ঘোরলাগা সৃষ্টি করে। পড়তে পড়তে কেবলই বিমূঢ় হতে হয়। আমরা প্রেমের জন্ম-মৃত্যুর রহস্য জানতে হারিয়ে যাই এক দীর্ঘ-কবিতায়। বিস্মরণের আগে জেনে নিই চাঁদের আলোয় মৃত চুম্বনভ্রুণের খবর কিংবা আফসোস করি হারিয়ে যাওয়া চুম্বন-অমরতা'র জন্য। কয়েকটি সূর্যমুখী ও রজনিগন্ধার ঘ্রান এড়িয়ে আমরা 'লাল লিটমাস নীল লিটমাস' নিয়ে পড়ে থাকি। আমরা বুঝি - মানুষের চূড়ান্ত অন্বেষা এইটুকু - একাকিত্বকে উপলব্ধি করা, প্রতিনিয়ত সেটাকে হত্যা করা।
অতঃপর বৃষ্টিহীন একজোড়া চোখ আমাদের গেয়ে শুনায় -
' If I must die I will counter darkness as a bride And hug it in mine arms.. '