অজ পাড়া গায়ের এক ইমাম সাহেব বিপদে পড়েছেন। বিপদ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে। দ্বিতীয় স্ত্রীর পর পর চার বার পুত্র সন্তান হয়েছে। জন্মের পরই তারা মারা গিয়েছে। এবার তিনি পঞ্চম বারের মতো গর্ভবতী হয়েছেন। এবারের সন্তান কি বাঁচবে? সন্তান যাতে বাঁচে এজন্য ইমাম সাহেব তার সদ্যোজাত পুত্রের নাম দিলেন তারাক্ষ্যাপা। সন্তানের নাম উদ্ভট কিছু রাখলে, সেই সন্তান নাকি অনেকদিন বাঁচে। তারাখ্যাপা কীভাবে কালক্রমে কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে উঠলেন, আমারে দেব না ভুলিতে হচ্ছে সেই অপরূপ, অবিশ্বাস্য, রুদ্ধশ্বাস আখ্যান।
বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের জীবনী আপাতদৃষ্টিতে বেশ গ্ল্যামারাস বলে মনে হয়। বিখ্যাত মানেই অপরিচিত, আলোকিত জগতের- এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের জন্ম কোত্থেকে, সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মণীষীরা কেন সমাজের আর দশটা মানুষের থেকে আলাদা, মনোটনি থেকে মুক্ত, রোমান্টিসিজমে পরিপূর্ণ স্বাধীনচেতা প্রাণ? কেনই বা তাঁদের পরিচিতির পর্ব এলে শুধু প্রাপ্তি আর আড়ম্বরের কথা তুলে ধরা হয়; আড়াল ঢাকা পড়ে যায় রক্ত-মাংসের নির্ভেজাল মানবসত্তার পরিচয়? প্রায় সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার 'আমারে দেব না ভুলিতে' উপন্যাসে কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের খুঁটিনাটি কথা যেভাবে উঠে এসেছে, তাতে প্রাপ্তি আর আভিজাত্যের চিরাচরিত চর্বিত-চর্বণ অনুপস্থিত। তারাক্ষ্যাপা, দুখু মিয়া, নুরু মিয়া অথবা নজরুল- যে নামেই ডাকা হোক, রক্ত মাংসের মানুষ হিসেবেই তিনি উপস্থিত এই বইয়ের পাতায়।
কবির জীবনের কথা তুলতে গেলে ঘুরেফিরে অল্প কিছু কথাই আসে: বাংলাদেশের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি, ইসলামী গান এবং কবিতার রচয়িতা, দীর্ঘসময় বাকশক্তি হারিয়ে অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত। কিন্তু এসবের বাইরে কাজী নজরুল ইসলাম যে আক্ষরিক অর্থেই মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত হয়ে পৃথিবীতে টিকে ছিলেন, এবং সেই জীবনযাত্রা যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রোমাঞ্চকর সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়; তা আসলে নজরুলের জীবনী না পড়লে বোঝা সম্ভব না।
জন্ম থেকেই নজরুল ছিলেন সংগ্রামী। দিনে মক্তবের ছাত্র হয়ে আজান দেয়া, রাতে যাত্রাপালা কিংবা লেটো দলে নাচগান; সেখান থেকে আসানসোলের রুটির দোকানের কর্মচারী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেনাবাহিনীতে যোগদান- কৈশোরে উপণীত হবার প্রারম্ভে জীবনের প্রথম ভাগে এত বিচিত্র অভিজ্ঞতা কজনেরই বা হয়? বালক বয়সে বিত্তবান দম্পতির বাড়িতে আশ্রয় মেলার পর হয়তো তার জীবনটা ছকবাঁধা নিয়মে কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু পরাধীনতার শৃঙখলে দুখু মিয়া নিজেকে জড়াতে চাননি কোনদিন। শৈশবে পিতৃহীন হবার পর যখন তার মা দ্বিতীয়বার বিয়ে করে, সেই অভিমানে ঘর পালানো কাজী নজরুল আর কোনদিন নিজের মা'র দিকে ফিরেও তাকাননি।
খামখেয়ালিপনা আর উদাসীনতায় ভরা কাজী নজরুলের গোটা জীবন। নিজের ইচ্ছেমতো পত্রিকায় লিখেছেন, গান গেয়েছেন, চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন বিভিন্ন সংস্থার সাথে। আবার হুট করেই সব ছেড়ে উধাও হয়ে গিয়েছেন দীর্ঘসময়ের জন্য। প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে বন্দী হয়েছেন কারাগারে। অনশনে মরতে বসেও তার জিদ থামানো যায়নি। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আড্ডায় মশগুল থেকে কখনো বা বিস্মৃত হয়েছেন, ঘরের ভেতর অনাহারে কাতরাচ্ছে স্ত্রী-শাশুড়ি।
প্রথম প্রেমিকা নার্গিস (নজরুলের নিজের দেয়া নাম) ফেলে নিজের বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যাওয়া, রক্ষণশীল সমাজের ধার না ধেরে সনাতন ধর্মের আরেক কিশোরীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, পরবর্তী জীবনে আরেক বিদূষী নারীর প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ব্যর্থমনোরথে হাল ছেড়ে দেয়া- নজরুলের জীবনে নারীদের ভূমিকা অপরিসীম, নানাভাবে যা ছাপ ফেলেছে বিভিন্ন কবিতায়।
নজরুল একদিকে যেমন সর্বোচ্চ সাফল্য দেখেছেন, নামীদামী পত্রিকার হাজার হাজার সংস্করণ নি:শেষিত হয়েছে শুধুমাত্র নজরুলের লেখা কবিতার কারণে; ঠিক তেমনিভাবে অসামাজিকতা বা বেখেয়ালী কর্মকাণ্ডের দায়ে হয়েছেন সমালোচিত, বর্জিত। কখনও ফুটো পয়সার অভাবে দিনের পর দিন না খেয়ে কাটিয়েছেন, আবার কখনও রেকর্ড কোম্পানির টাকায় কিনেছেন বিলাসবহুল ক্রাইসলার গাড়ি। জাঁকজমকপূর্ণভাবে সন্তানের আকিকা আর অন্নপ্রাশনের আয়োজন করে পোলাও মাংস খাইয়েছেন অসংখ্য বন্ধুকে, আবার তার দুদিন পরেই পরিবারের জন্য সামান্য ভাত জোটাতে পারেননি। পেশাদারিত্বের কাছে নিজেকে না বিকিয়ে, সাফল্যের তোয়াক্কা না করে নজরুল পালিয়ে বেড়িয়েছেন। কখনও বন্ধু-শুভাকাঙখীদের কাছ থেকে, আবার কখনও নিজের কাছ থেকেই।
প্রচলিত প্রথা আর সমাজের রীতিনিতির কাছ থেকেও পালিয়ে থাকতে চেয়েছেন নজরুল। প্রথম ছেলের নাম রেখেছেন কাজী কৃষ্ণ মোহাম্মদ। একদিকে জায়নামাজে বসে নামাজ পড়েছেন, আবার কখনও সেই জায়নামাজ পেতেই পুজো করেছেন দেবী দুর্গার। কখনো শ্রদ্ধাভরে কালীমূর্তিকে আশ্রয় দিয়েছেন নিজের বাড়িতে, মগ্ন হয়েছেন উপাসনায়। তৎকালীন সমাজ তাকে কাফের বলে ছুড়ে ফেলতে চেয়েছে; মুখে মুখে ইসলামের গৌরবান্বিত ইতিহাস কেন্দ্র করে কাব্য রচনা করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন ধর্ম সম্পর্কে তার সম্যক জ্ঞান। রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ অথবা নাতে রাসুল 'ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ' এর মতো গানগুলো এখনো মানুষের মুখে মুখে।
একাধারে বহুমুখী রচনায় হাত দিয়েছেন কাজী নজরুল। বিদ্রোহী কবিতা থেকে শুরু করে ইসলামি গজল, শ্যামাসঙ্গীত, উপন্যাস, গল্প, নাটিকা। নিজে গান লিখেছেন, কম্পোজার হিসেবে যোগ দিয়েছেন নামী রেকর্ড কোম্পানিতে। বহু নামকরা পত্রিকায় লিখেছেন সদম্ভে, আবার কখনও নিজ উদ্যোগেই প্রকাশিত করেছেন নিজের পত্রিকা। সমসাময়িক অনেকের মতো তিনি ইংরেজ সরকার কিংবা আমলাদের সুনজরে থেকে সাফল্যের পথ ধরতে চাননি, বরং স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন প্রতিবাদের কথা।
ছোটবেলায় লোকমুখে অর্জিত 'দুখু মিয়া' নামটি সত্যিকার অর্থেই নজরুলের সাথে জুড়ে গিয়েছিল আজীবন। প্রিয় সন্তান বুলবুলের শিয়রের কাছে বসে অর্থের জন্য কবি অনুবাদ করেছেন পারস্যের কবি হাফিজের রুবাইয়াৎ। সেই সন্তানের মৃত্যুর পর কবরের জমি কেনার টাকা যোগাতেও তাঁকে কলম তুলে নিতে হয়েছে। অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রকাশকের শর্ত অনুযায়ী লিখতে হয়েছে হাসির কবিতা। এই ঘটনার মতো করেই কাজী নজরুল ইসলামের অনেক বিখ্যাত কবিতা, গান বা চিঠির পেছনের গল্পগুলো জীবন্ত হয়ে উঠে এসেছে এই উপন্যাসের পাতায়।
নজরুলের জীবনী হিসেবে এই বইকে কোন নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বেধে রাখা হয়নি। প্রয়োজনে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনেও (তাতে কাহিনীতে ছেদ পড়েনি) আগমন ঘটেছে অসংখ্য ঐতিহাসিক চরিত্রের। তাদের কেউ হয়তো সরাসরি কবির সাথে সম্পর্কিত, আবার কেউ কেউ এসেছেন কালের সাক্ষী হিসেবে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পল্লীকবি জসীম উদদীন, কাজী মোতাহার হোসেন, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো রথী-মহারথীদের সরব উপস্থিতি তো আছেই। তার পাশাপাশি দেখা মিলেছে জীবনানন্দ দাশ, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাদুকর পিসি সরকার, কাননবালা দেবী এমনকি হিটলারেরও। সবাই যে সরাসরি নজরুলের সাথে সম্পর্কিত তা নয়, সাবপ্লট হিসেবেও আগমন ঘটেছে অনেকের।
"আমারে দেব না ভুলিতে" সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লেখা একটি ফিকশনাল বায়োগ্রাফি। অর্থাৎ বাস্তব ইতিহাসের সাথে লেখক মিশ্রণ ঘটিয়েছেন নিজের কল্পনার। তবে ব্যক্তিগত মতামত, বর্ণণার সাথে মিলিয়ে নজরুলের বয়সের কল্পনা করাটা অনেকাংশেই কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। কিছু জায়গায় সাল/সময়ের উল্লেখ অথবা নিদেনপক্ষে বইয়ের শেষে দুই পৃষ্ঠায় কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের বিশেষ বিশেষ ঘটনার কাল নির্দেশিকা দিয়ে দিলে সুবিধা হতো।
ইতিহাস আর রেফারেন্স ঘেটে প্রচুর পড়াশনা করে বই লিখতে গিয়ে প্রধান যে সমস্যাটা হয় তা হলো,ভারী ভারী তথ্যের ভারে ফিকশন তার স্বভাবসুলভ প্রাণোচ্ছল ভাব হারায়। অথচ এই বইটা পড়তে গিয়ে কোথাও হোচট খেতে হয় না, ইতিহাসের তথ্যগুলো আপনা-আপনি মাথার ভেতর স্থান দখল করে নেয়। হাহাকার জাগিয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে। বিশাল কলেবরের একটা জীবনীভিত্তিক উপন্যাস যখন রহস্য-রোমাঞ্চ গল্লের মতো একটানে পড়তে ইচ্ছে করে, সেটার কৃতিত্ব নিশ্চয় লেখকের ভাষা আর বর্ণণাগুণের।
লেখক আশীফ এন্তাজ রবির বেশ কিছু বই এর আগে আমার পড়া হয়েছে। খারাপ লাগেনি, আবার মনে দাগ কেটে যাবার মতো কিছু ছিল বলেও মনে হয়নি। তবে ২০২০ এর বইমেলায় প্রকাশিত পূর্বপুরুষ এবং বিশেষ করে ২০২১ এর মেলার 'আমারে দেব না ভুলিতে' এর মাধ্যমে তিনি নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। বইয়ের নামের সাথে মিলিয়ে লেখকের এই কাজটিও অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।
নজরুল প্রীতি কবে থেকে শুরু সেইটা মনে নাই। ২০১২ সালে ঢাকায় সেটেল করার পর বাংলা একাডেমির নজরুল রচনাবলী দিয়ে নজরুল প্রেম শুরু। কাজীদার জীবনী নিয়ে কিছুটা জানা ছিল। সেইসূত্র ধরেই একবন্ধুকে বলেছিলাম ভাগ্যিস কাজীদার সময়ে জন্মাইনি। নাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেত। উনার প্রেমে হাবুডুবু খেতাম আর তিনি হ্যা বা না কিছুই বলতেন না। মাঝখান থেকে আমি বেচারা ঝুলে যেতাম। 😁
আমারে দেব না ভুলিতে (নামটা খুবই পছন্দ হয়েছে) বইয়ের শুরুটা বেস চমৎকার ভাবেই হয়েছে। এরপর সার্কাসপার্টি নিয়ে লম্বা লেখাটায় মনে হলো কাজীদার জীবনীতে এরা কি করছে! কাজীদার জীবনের নানান পরতের একটা ধারনা পাওয়া যায় বইতে। ঈশ্বর এই মানুষটার মধ্যে খামখেয়ালীপনা আর কবিত্ব যেন নিক্তি দিয়ে মেপে সমান ভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন। শুধু যদি গাইড করার মতন কেউ থাকতো যদি খামখেয়ালীপনায় কেউ লাগাম পরাতে পারতো, একটু যদি মাথার ওপর ছায়া হয়ে কেউ থাকতো....কি না হতে পারতো তাঁর কলমে!
নিজে একজন মেয়ে বলেই হয়তো প্রমীলা দেবীর জন্য কষ্টটা একটু বেশিই লাগল। ঘরে চাল নেই, টাকা নেই। কাজীদা বন্ধুর আড্ডায় পরে দিনের পর দিন ঘরবাড়ি ছেড়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছেন। এদের চলে কি করে একবার মাথায়ও আসে না! অথচ বাড়িরকর্তা তিনিই।
বইটার একটা মজার দিক হচ্ছে সম-সাময়িক অন্যান্য বিখ্যাতজনকেও ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। বইতে উঠে এসেছেন শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দিন, কাজী মোতাহার হোসেন, এ কে ফজলুল হক, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, পি সি সরকার, গায়িকা ইন্দুবালা, কাননবালা, ফিরোজা বেগম আরো অনেকে। তবে সত্যি বলতে কি পড়ুয়াদের কাছে বইটা বেস ভালোই লাগবে কিন্তু বিদ্যজনের জন্য সমালোচনার সুযোগ রয়েছে প্রচুর। বইটির ভাষা নিয়ে প্রচুর কাজ করা যেত। বিরজাসুন্দরী দেবী যখন কাজীদাকে বলেন 'অনেক দূর জার্নি করে এসেছ।' এটা শুনে অতি সাধারন পাঠক হয়েও আতকে উঠেছি।
বইটির পেছনে লেখক আশীফ এন্তাজ রবি প্রচুর সময় দিয়েছেন সেটা বুঝা যায়। নয়তো এত বিষয়, এত তথ্য নিয়ে আসা যেত না বইতে। আমি বরাবরই লেখকের লেখার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। তাও মনে হয়েছে বইটি বোধহয় আরো একটু সময় চাইছিলো। যাহোক লেখকের জন্য শুভ কামনা রইলো।
পাঠ্যানুভূতি: নজরুল আমার প্রিয় কবি। তাঁর কবিতায় মুগ্ধ আমি। সবসময়ই। তাঁর জীবনের কথা তো টুকটাক সবাই জানিই। আশীফ এন্তাজ রবির লেখা জীবনীভিত্তিক উপন্যাসটা কবির পুরো জীবন ফুঁটিয়ে তুলেছে। লেখার ধাঁচ ছিল সহজ-সরল। তবে প্রচুর অপ্রাসঙ্গিক ‘বকরবকর’ ছিল। সাধারণ একজন পাঠক হিসেবে এটা বিরক্তিকর। শেষের দিকে একলাইনের ছোট্ট যোগসূত্র টানতে উপন্যাসের শুরু থেকে একটা চরিত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ অদরকারি/ অতিরিক্ত বর্ণনা, মৃত্যুর পরও জোর করে সেই চরিত্র-সম্পর্কিত ঘটনার অবতারণাও ছিল। জীবনীনির্ভর উপন্যাসে লেখকের কল্পনা থাকবেই। সেটা মেনেই পড়তে হয়। সে দিক দিয়ে লেখক সাহেব বাংলা সাহিত্যের বেশ কয়েকজন জাঁদরেল সাহিত্যিকের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক, আড্ডা, ভাব বিনিময়— এ সমস্ত দেখিয়েছেন। কিছু বর্ণনার অতিবর্ণন ছাড়া উপন্যাসটা আমার মন কেড়েছে। সেজন্য পাঁচ তারকা দেওয়া গেল না। চারেই নিজেকে সন্তুষ্ট রাখছি।
এক গভীর রাতে বাড়ি ফিরতে গিয়ে তিনি কুকুরের তাড়া খেয়েছিলেন। জান বাঁচাতে ডান বাম ভুলে ভো দৌঁড়ে পৌঁছুলেন মেসে। শ্বাস যায় যায় হাল। কিন্তু আশ্চর্য কান্ড! হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে তিনি বললেন তাড়াতাড়ি দোয়াত আর কলম দিতে। না হয় ছন্দ পালিয়ে যাবে। আর হ্যাঁ! বললেন পারিশ্রমিক বাবদ ১০ টাকা ছাড়তে। এরপর গরগর করে লিখে গেলেন অদ্ভুত সুন্দর এক কবিতা। যা বছর, যুগ পেরিয়ে কিংবদন্তি হয়ে গেছে। ছেলেপুলেদের ইশকুলের পড়ার বইতে ঠাঁই পেয়েছে। ঠাঁই পেয়েছে এমন আরও অনেক কবিতা।
❛বাবুদের তাল-পুকুরে হাবুদের ডাল-কুকুরে সে কি বাস্ করলে তাড়া, বলি থাম্ একটু দাঁড়া !❜
সময়ের চাকাকে একটু পিছে ঘুরিয়ে নিই বরং! আচ্ছা?
ফকির আহমদের অনেক চিন্তা। বউটা পোয়াতি। বাচ্চা হবে শীঘ্র। কিন্তু আগের চারটা ছেলেও জন্ম হয়ে টিকলো না, পরপারে আশ্রয় নিলো। এইবারের ছেলেটা যেন বাঁচে আল্লাহর কাছে সেই দোয়া করে। মসজিদের ইমাম সে। আয় রোজগার বেশি নেই তার। ভেবেছে এইবার সন্তান হলে সে উল্টাপাল্টা নাম রাখবে।
ছেলে হলো। ফকির তার নাম রাখলেন তারাক্ষ্যাপা। কিন্তু মায়ের এই নাম অপছন্দ। তবুও স্বামীর কথায় এই নামেই ডাকেন তিনি। মনে মনে তার নাম সে রেখেছে নজর আলী। লোকে তাকে আবার নুরুও ডাকে। নুরুর চেহারা সুরত মাশাআল্লাহ। মেধা ভালো। সে দিনের বেলা মসজিদে আজান দেয়। রাতের বেলা যাত্রাপালায় কাজ করে। লেটো গানের দলে। নিজে গান বানাতেও পারে। নুরুকে আবার লোকে দুখু মিয়া বলেও ডাকে।
এক সময় নুরুর পিতা দেহ রাখেন। মা বিয়ে করে নুরুর চাচাকে। দুঃখে ঘর ছাড়ে সে। চুরুলিয়ার গাঁয়ে জন্ম নেয়া ছেলেটা সেই যে ঘর ছাড়লো আর ফিরে না। পাড়ি জমায় কলকাতায়। সেখানে কোনোরকমে চলতে চলতে পেয়ে যায় ঘোষ পরিবারের ছায়া।
কিন্তু থিতু হওয়া তার স্বভাবে নেই। আসানসোলে সে রুটির দোকানে কাজ জুগিয়ে নেয়। সেই ভোরে উঠে একগাদা আটা, পানি গুলে রুটি তৈরি। অমানসিক পরিশ্রম। এরপর বড় এক বিল্ডিংয়ের নিচে রাত কাটানো।
এখানেই তাকে খুঁজে পায় এক পুলিশ কর্মকর্তা। সুন্দর এই বালককে সে পুত্রের স্থান দেয়। লেখাপড়ার বিনিময়ে তাকে মাসিক বেতন দেয়ার কথা বলে। লেখাপড়া করতে করতে আবার কী মতি ভেগে গেল। সময় হয় মাধ্যমিক পরীক্ষার। সবাই জানে নুরু এবার একটা তেলেসমাতি করবে পরীক্ষায়। কিন্তু সে তেলেসমাতি না করে যোগ দিয়ে দিলো সৈনিক দলে। তখন বিশ্বে চলে প্রথম বিশ্বযু দ্ধের দামামা। হাবিলদার হয়েও সে কবিতা লিখে। সেগুলো আবার নাকি পত্রিকাতেও ছাপা হয়। সেখানে তার নাম ছাপা হয় ❛কাজী নজরুল ইসলাম❜ নামে। এভাবেই তারাক্ষ্যাপা থেকে নজর আলী, নজর আলী থেকে দুখু মিয়া কিংবা নুরু থেকে তিনি হয়ে ওঠেন কাজী নজরুল ইসলাম।
একসময় সৈনিকের জীবন শেষ হয় করাচির। এরপর তিনি এলেন কলকাতা। এখানে বন্ধু জুটিয়ে ফেলেন বেশ। পত্রিকায় লেখা, আড্ডাবাজি এসব করে বেশ যায় দিন। নজরুল চায়ের ভক্ত। দিনে ক'কাপ চা যে তিনি খান হিসেব নেই। সাথে পান। গান, সুর, কবিতা, চা আর পানে আড্ডাবাজি চলে। সেই আড্ডার মধ্যমণি তিনি। এত আড্ডার মাঝে থাকলেও নজরুলের জীবনে অভাবের অন্ত নেই। কখনো পকেট ফাঁকা। ধার করে চলতে হয়। আছে মুজফফরের মতো বন্ধু। তিনি নজরুলের সকল দুঃখে ছায়ার মতো থাকেন।
কলকাতার সেই সময়ে সাহিত্যে আলো ছড়াচ্ছেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ। রবির কবিতা, গান আর উপন্যাসে সাহিত্যাঙ্গন মেতে আছে। মেতে আছে শরৎচন্দ্রের লেখায়। তিনি আছেন আরেক জ্বালায়। বাজারে একই নামের আরেক লেখক এসেছে। বইয়ে বইয়ে গুলিয়ে যাচ্ছে। লোকে ভাবে ❛আহা! শরতের লেখার ধার বুঝি গেল❜। এই দুঃখে প্রকাশকের কথায় তিনি সাধের দাড়ি কামিয়েছেন। বইতে ছবি ছাপা হবে। লোকে বই কেনার আগে যেন দেখে নেয় আসল শরৎ নাকি!
নজরুলকে সবাই লুফে নিতে চায়। লেখার কাটতি আছে। সেই আশাতেই আকবর তাকে কুমিল্লায় যাওয়ার এক প্রস্তাব দিলো। হাওয়া বদল। অন্য বন্ধুদের নিষেধ সত্ত্বেও নজরুল কুমিল্লার ট্রেনে চেপে বসলেন। সেখানে আরেক কান্ড বাঁধলেন। তার জীবনে এলো প্রেম।
নার্গিস-ই (সৈয়দা খাতুন) তার প্রেম। তার সাথে হবে বিয়ে। কিন্তু সেখানে কী হলো নজরুল বিয়ের আসর ছেড়ে পালালেন। কুমিল্লায় তিনি বিরজাসুন্দরীকে নিজের মা বানিয়ে ফেললেন। সেখানেও রেখে এলেন এক পিছুটান!
নজরুলের কবিখ্যাতি বাড়ছে। নজরুল লিখছে আর লেখায় মুগ্ধ হচ্ছে সবাই। নজরুল ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়িতে রাত জেগে লিখে ফেললেন এক কবিতা। যা পুরো ভারতবর্ষে তোলপাড় তুলে ফেললো। হ্যাঁ সেই বিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতা -
এই কবিতা কত কাহিনি করে বিজলী পত্রিকায় ছাপা হলো, এরপর হাজার হাজার বিক্রি সে ইতিহাস অবাক করে। টনক নড়ল ইংরেজ বাহিনীর। পত্রিকা বন্ধ করে নজরুলকে পুড়ে দিলো গারদে! নজরুল জেদী। তিনি অনশন করলেন। কিছুতেই তাকে টলানো যায় না। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাকে উৎসর্গ করে বই লিখলেন, ইংরেজদের চিঠি দিলেন। অবশেষে বেশ সময় বাদে তিনি ছাড়া পেলেন।
কিন্তু তিনি তো নজরুল। ছাড়া পেয়ে এক ছুটে কুমিল্লা। বাঁধালেন আরেক অনর্থ। যে সময় হিন্দু-মুসলিমে বিভেদ। সে সময় জাত ধর্ম ভুলে তিনি মাতলেন এক হিন্দু নারীতে। নাম তার আশালতা। আশার মা সহ তিনি চলে এলেন কলকাতা।
মহা মুশকিল! যার নিজের থাকার ছাদ নেই সে এসেছে হবু বউ-শাশুড়ি নিয়ে। আক্কেল বুঝি আর হলো না। নজরুলের এই বিয়ের কারণে হিন্দু-মুসলিম একত্র হয়ে তার দুর্নাম করলো। কিন্তু বিয়ে হলো ঠিকই। আশালতা হলেন প্রমীলা দেবী। গিরিবালা, প্রমীলা আর নজরুলের সুন্দর সংসার।
কিন্তু কবির ভাগ্য সবসময়ই তাকে খেলিয়েছে। এই সুখ, এই দুঃখ আবার অনিষ্টের মধ্যেই কেটেছে। বিয়ে করেও তার গতি ফেরেনি। উড়নচণ্ডী আর আড্ডাবাজি কমেনি। পরিবর্তন হয়নি আর্থিক অবস্থারও। আধপেটা খেয়ে তিনি তিনজনের সংসার নিয়ে থাকেন। তাতেও প্রাণশক্তি তার অপার।
নজরুলের সাথে সখ্যতা আছে শরৎচন্দ্রের। তারা একত্রে ঘুরে, মজলিশে যায়, গান শুনে। বিপদে তিনিও নজরুলকে সাহায্য করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন।
নজরুল সমানে লিখে যাচ্ছেন। সেই সাথে পত্রিকায় লিখছেন। কষা কষা খবর চমকপ্রদ হচ্ছে তার দেয়া ছন্দমাখা শিরোনামে।
প্রমীলা জন্ম দিয়েছে প্রথম সন্তানের। সাহসী নজরুল হিন্দু-মুসলিমের এই বিরোধের কালে পুত্রের নাম রাখলেন কাজী কৃষ্ণ মুহাম্মদ। পুত্র নিয়ে সুখের দিন নজরুলের কপালে বেশিদিন জুটলো না।
কলকাতার রাস্তায় একলোক প্রায়ই উদাস হাঁটেন। কতবার ট্রামের তলে পড়তেও নিয়েছিলেন। কেন এত উদাস তিনি? তার কবিখ্যাতি হচ্ছে। তবুও সমালোচনার ঝড়। সেই সমালোচনাতে আছেন কবিগুরুও।
নজরুলের সাথে দেখা করতে এসেছে ফরিদপুরের এক ছেলে। নজরুলকে আবেদন জানাবে তার লেখা কবিতাখানি যেন ছাপা হয়। কেউ তার কবিতা পছন্দ করছে না। কী সমস্যা এই লাইনগুলোতে?
❛এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।❜
নজরুল পড়লেন। জসীমকে তিনি ডাকেন শিশুকবি বলে। ছেলের লেখার হাত আছে। কবির সাথে তার সম্পর্ক নানা ঘটনায় বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল। জীবনের সামনের দিনগুলোতে এই শিশুকবি নজরুলের অনেক উপকারে আসবে।
নজরুলের ঘরে এসেছে দ্বিতীয় সন্তান। তার নাম বুলবুল। কিন্তু পুত্রটির জন্মের সময় তিনি ছিলেন না। ঘুরে বেড়িয়েছেন। এদিকে শাশুড়ি আর বউ কীভাবে না খেয়ে থেকেছে খোঁজ নেননি তিনি। মেতেছিলেন চা, আড্ডা আর গানে।
তবে এবার তাকে হাল ধরতে হবে। অভাব অনটন নিত্য সঙ্গী। তবুও তিনি উদ্যমে চলছেন।
বন্ধু মোতাহারের কাছে তিনি গেলেন ঢাকা। কবি তো কবি। তিনি সকলের। তার মনে প্রেম অসামান্য। ঢাকায় তিনি প্রেমে পড়লেন। আচ্ছা কান্ড ঘটালেন। দুঃখী মনে প্রেয়সীর থেকে অপমান হয়ে ফিরে গেলেন নিজ ঘরে। এই সময়টায় তিনি ভুলেই গেছিলেন তারও স্ত্রী-সন্তান আছে।
পুত্রের আকীকা আর অন্নপ্রাশন করেছিলেন একত্রে। বিশাল আয়োজন। কে বলবে এই আয়োজনের পরে তার ঘরে ফুটেনোর মতো একটু চাল ছিল না! লোকে অবাক। এই দুর্দিনেও বন্ধুরা তাকে নানা জায়গা থেকে ধার কর্য করে চালালো।
লোকে তাকে কা ফের বলে। তিনি তাদের মুখে তালা দিয়ে এমন গান রচনা করলেন যা প্রজন্ম ধরে সকলের মুখে। তিনি লিখলেন,
❛ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।❜
এতেই থামলেন? লিখেন - তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে....
নজরুলের জীবনে ঝড় আর দুঃখ সমানতালে থাকে। তাইতো এক কঠিন রোগ হলো তার প্রিয় পুত্রের। ডাক্তার বদ্যি কবরেজ করেও কিছু হলো না। নজরুল ভেঙে পড়লেন।
এখন তার দিন ফিরেছে। ভালো চাকরি পেয়েছেন। গানের রেকর্ড করছেন, সুর তুলছেন। সব মিলে ধু ন্ধুমার অবস্থা। ভালো বাড়ি আছে। শখ করে কিস্তিতে কিনেছেন ঢাকনাখোলা গাড়ি। আরো দুই পুত্র হয়েছে। কিন্তু এত হাসি, আনন্দ, গানের মাঝেও নজরুলের অন্তর পোড়ে। আহারে বুলবুল!
❛শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয় ফিরে আয়।❜
এই দুঃখের রেশ না কাটতেই প্রমীলা দেবী অসুস্থ হলেন। দেহের নিচের অংশ অবশ হলো। নজরুল মুষড়ে পড়লেন। জীবন তাকে নানাভাবে পরীক্ষা নিয়েছে। স্ত্রীর অসুস্থতায় তিনি অনেক খরচ করলেন। নিঃস্ব হলেন আবার। প্রকাশকরা গুটিয়ে গেল, পাওনা দিলো না। শখের গাড়ি হাতছাড়া হলো।
সময় অনেক পেরিয়ে গেছে। এরমধ্যেই গত হয়েছেন সাহিত্যের অনেক মহারথী। এদের দুঃখে নজরুল সিক্ত হলেন। একদিন রেডিওতে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে তার কথা জড়িয়ে এলো। ধীরে ধীরে কথা বন্ধ হয়ে গেল। জানা গেল অসুখের কথা। কথা জড়িয়ে আসে। কী বলে বোঝা যায় না। কিন্তু সুচিকিৎসা পাবে কেমনে? একটা কড়ি নেই তার। অসুস্থ স্ত্রী, আর বৃদ্ধা শাশুড়ি। অসুস্থ তিনি নিজেও। শাশুড়ি তাকে নিজ পুত্রের মতো আগলে রাখেন। কিন্তু অর্থ?
অনেক কষ্ট করে চিকিৎসার অর্থ জোগাড় হলেও নজরুল সুস্থ হলেন না। সময় অনেক এগিয়ে গেল। তিনি ভারসাম্য হারালেন। একসময় হারিয়ে গেলেন গিরিবালা। অন্য ভুবনে পথ ধরলেন স্বামীকে আজীবন আগলে রাখা প্রমীলা। দেশ ভাগ হলো। কিন্তু কেউ জানতে পারলো না দেশ ভাগ নিয়ে নজরুলের ভাষ্য। কারণ তিনি নির্বাক।
পাকিস্তান তখন নিজেদের জন্য লড়ছে। বাংলাদেশ নামে নতুন দেশ হবে। নজরুলের লেখা গান তাদের শক্তি জোগাচ্ছে।
❛কারার ঐ লৌহ কপাট!❜
নতুন দেশে নজরুলকে আনা হলো। বিশাল আয়োজন। কিন্তু নজরুল এর কিছুই বুঝলেন না। সে দেশের নাগরিকত্ব দেয়া হলো। দেয়া হলো জাতীয় কবির মর্যাদা। তার লেখা সঙ্গীত হলো রণসঙ্গীত। পেলেন উপাধি।
জীবনের শেষ দিকে এসে যেটুক সুখ পেয়েছিলেন সেটা দেখার মতো তার আপন দুই মানুষ রইলো না। একসময় এলো ��৯৭৬ সালের ২৯শে আগষ্ট। বিদ্রোহী কবি পাড়ি জমালেন অনন্ত মহাযাত্রায়।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
বইটা পড়া শেষ করে কিছুক্ষণ নিথর বসেছিলাম। কী লিখবো? কীভাবে শুরু করব?
বলছিলাম আশীফ এন্তাজ রবির লেখা উপন্যাস ❝আমারে দেব না ভুলিতে❞ - এর কথা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনীভিত্তিক উপন্যাস এটি।
লেখকের লেখা আগে পড়িনি। এটাই প্রথম। আমার মনে হয় লেখকদের জীবনে এমন কিছু কর্ম থাকে যাকে তারা নিজেরা আর কখনো ছাড়িয়ে যেতে পারেন না। এই বইটা তেমনই।
কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা চিনি তার কবিতায়, রণসঙ্গীতে, ইসলামী গজলে। প্রতি বছর রোজার ঈদে বাজা ওই গান কেউ কোনোদিন ভুলতে পারবে না। তেমনি ওই সুন্দর সুন্দর কবিতায় আমরা তাকে চিনি।
স্কুলে পড়ার সময় কবিতার সাথে কবি পরিচিতি থেকে পরিচয়। আমি মুখস্ত করতে পারতাম বেশ। কবি পরিচিতির একটা প্যারা মনে হয় আজও মুখস্ত আছে। একবার দেখলে অনর্গল বলতে পারবো। জন্ম, প্রয়াণ সাল, তারিখ ঠোটোস্ত করে ফেলেছিলাম।
জানতাম তার নাম দুখু মিয়া। অনেক দুঃখী ছিলেন। এরপর বড়ো হতে হতে নানাভাবে তার সম্পর্কে জেনেছি। কিন্তু এমন আবেগ, আদরমাখা সাহিত্যের ভাষায় জানাটা নতুন। লেখক সত্য আর কল্পনার মিশ্রণে পুরো উপন্যাসে এমন আবহ তৈরি করেছেন যে প্রতিটা পাতা মুগ্ধ করেছে।
সে এমন এক সময়ের কথা যখন ভারতবর্ষে সাহিত্যের আলোড়ন হচ্ছে। বাঘা বাঘা সাহিত্যিক তাদের লেখার ফুলঝুড়ি করছেন। হচ্ছে সাহিত্যের আসর, আড্ডা। এর ওকে একটু সমালোচনা করাও বাদ যাচ্ছে না। কলকাতার রাস্তায় হাঁটছে শরৎ, রবিঠাকুর সহ বিজ্ঞ ব্যক্তিরা। তখনই আবির্ভাব নজরুলের। ধারালো লেখায় মানুষের অন্তরে কাঁপন ধরিয়ে দেন তিনি। একসময় এই রোল উঠে রবির চেয়েও তার বইয়ের কাটতি বেশি।
উপন্যাসে নজরুলের একদম ছেলেবেলা থেকে ঘটনা এসেছে। এসেছে তার জন্মের ইতিহাস। কীভাবে চুরুলিয়ার তারাক্ষ্যাপা হয়ে উঠলো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই ইতিহাস লেখক নানা পরতে, মাধুর্যে এনেছেন।
নজরুলের জীবনে দুঃখ ছিল নিত্যসঙ্গী। পেয়েছিলেন অসাধারণ কিছু বন্ধু। আর তিনি ছিলেন নজরুল। মানে নজরুলই। কিংবদন্তির মাঝেও তিনি ছিলেন মানুষ। লেখক নজরুলকে এখানে এক তরফা নায়ক বনতে দেননি। তিনিও দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। অস্থির স্বভাব, আমুদেপনা সব কিছু ছিল তার।
লেখক যেন একটা সোনালী সময়ের আখ্যান রচনা করেছেন এখানে। ঘটনা শুধু নজরুলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমসাময়িক সাহিত্যিকদের দর্শন করিয়েছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ দাশ, দিলীপ কুমার দাস, শহীদুল্লাহ্ সহ বাংলার বিখ্যাত লোকের পদচারণা ছিল উপন্যাস জুড়ে। এসেছে সত্যেন্দ্রনাথ বসের কথা।
বাদ যায়নি পল্লীকবিও। তার সাথে নজরুলের সখ্যতা, তার কবিতার কথা এসেছে। এসেছে বিভূতিভূষণের কথাও। সত্যজিৎ রায়ের কথাই ধরি। উপস্থিতি ছিল তারও। এই ঘটনাগুলো পড়তে গিয়ে অবাক হচ্ছিলাম। ব্রিটিশ শাসনে থাকা সেই সময়ে বাংলায় কত রথী ছিলেন, তাদের পদচারণায় এই মৃত্তিকা যেন ধন্য হয়েছে তখন।
নজরুল অভাব দেখেছেন, না খেয়ে থেকেছেন। অভুক্ত রেখেছিলেন পরিবারকেও। নিজের জীবনের গরল পান করেও তিনি রচনা করেছিলেন অভাবনীয় সব গান। যে গান রানু সোম, ইন্দুবালা সহ অনেকের কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে।
নজরুলের জন্য যেমন কষ্ট লেগেছে, তেমনি লেগেছে প্রমীলা দেবীর জন্যেও। জাত-ধর্ম বিসর্জন দেয়া এই নারী জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন। কিন্তু কখনো নজরুলকে ছেড়ে যাননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন পাশে।
ছোটোকালে টেলিভিশনে একটা দৃশ্য দেখেতো নজরুলের জন্ম কিংবা প্রয়াণ বার্ষিকীতে। এই দৃশ্যটা আমার মনে গেঁথে আছে। বৃদ্ধ অসুস্থ নজরুল বসে আছেন। পাশে খাট কিংবা চকিতে পড়ে থাকা অবশ প্রমীলা তাকে মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দিচ্ছেন।
ভাবতেই কেমন লাগে যার কলমে বিদ্রোহী রচনা তিনি শেষকালে নির্বাক ছিলেন। জীবন নিষ্ঠুর। এই নিষ্ঠুরতার মাঝেও তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন কালজয়ী সব সাহিত্য। তালতলা লেনের যে বাড়িতে কবি রাত জেগে লিখেছিলেন বিদ্রোহী কবিতা আজ সে বাড়ি নেই। কালের চাকা পিষে শেষ করেছে সেই ঠিকানা।
৩৩৪ পৃষ্ঠার উপন্যাস শুধু নজরুল নয়, সে সময়ের সাহিত্যের জয়গান গেয়েছে। একেকজনের উপস্থিতি যেন নতুন করে এক ভালো লাগা তৈরি করেছে। নজরুলের আড্ডায় যেন নিজেও চায়ের পেয়ালা হাতে বসে গেছিলাম।
উপন্যাসের কল্পনা আর সত্যির মিশেলে আপনি হারিয়ে যাবেন। তখন বাস্তব আর কল্পনার ফারাক থেকে যা এগোচ্ছে বরং তাই উপভোগ করবেন।
উপন্যাসে হরিদাস পাল, পুঁটিরানী, ভিক্টোরিয়া এদের বেশ লেগেছে। দা ঙ্গার ঘটনা, এর বলি আর হরির জন্য দুঃখ হয়েছে। চুনীলালকেও মন্দ লাগেনি।
উপন্যাসের ভালো লাগার মাঝেও কিছু চোখে লাগার বিষয় ছিল।
* লেখার মাঝে সে সময়ের টোন অনেক জায়গায় ছিল না। ভাষার প্রয়োগে কিছু সমস্যা ছিল। * নজরুলের জীবনে বন্ধু মুজফফরের উপস্থিতি উপন্যাসে যেন হুট করেও মিলিয়ে গেল। * নজরুলকে যখন জেলে দেয়া হলো সে ঘটনা কিছুটা আনা যেত। স্বয়ং আফজাল উল হক যে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছিলেন ব্যাপারটা থাকলে মন্দ হতো না। * ফজিলাতুন্নেসার বিষয়টা আলগা রয়ে গেছিল। এ নিয়ে জলঘোলা হয়েছিল ভালোই। * নার্গিসের সাথে বিয়ের আসরের পরবর্তী কোনো ঘটনা আসেনি। আগ্রহ ছিল।
তবে এই সীমাবদ্ধতা উপন্যাসের সৌর্ন্দয্য ম্লান করেনি। পুরো উপন্যাসেই এত দারুণ আবহ ছিল যে পড়তে পড়তে যেন ইতিহাসের অলিগলিতে ঘুরেছি। শেষটা অসাধারণ ছিল। নজরুলের দুঃখ, দুর্দশা আর শেষকালের সকল অর্জন যেন কেমন আবছা লাগছিল।
লেখক বেশ গবেষণা করে লিখেছেন। উপন্যাসের আকারে রূপ দিতে তার লেখার সুকৌশলী ধরন, গল্প বলার ক্ষমতা আর বাক্যের মাধুর্যতা অবদান রেখেছে। পড়ার অভিজ্ঞতাকে করেছে দারুণ।
নজরুল কিংবদন্তি। তারা অনন্ত নক্ষত্র বীথি হয়েও মানুষের মনে আজীবনের স্থান নেন। তারে ভুলা যায় না। কারণ তিনি, তার কর্ম তারে দেয়না ভুলিতে।
স্কুল-কলেজ বয়সে রেডিও রাত জেগে আশীফ এন্তাজ রবির শো শুনতাম। ভাল লাগতো তার গুছিয়ে কথা বলা। ফিকশোনাল বায়োগ্রাফি হলেও মনে হচ্ছিলো চোখ বুজলেই দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে সব কিছু।
ঠিক লেখক হয়ে উঠতে পারিনি এখনো, রিভিউ লেখা তো 'দিল্লি দূর অস্তই'। কোনো লেখার আলোচনা-সমালোচনা করবার জন্যে যে ন্যূনতম জ্ঞানটুকু প্রয়োজন, তার কানাকড়িও নেই বলে সে চেষ্টাও করে দেখিনি কখনো। কিন্তু 'আমারে দেব না ভুলিতে' উপন্যাসটি পড়া শেষ করলাম সদ্যই, সাড়ে তিনশ পেইজের উপন্যাসটি শেষ করে মনে হচ্ছে, বইটি নিয়ে না দুয়েক কথা না বললে ভেতরের খচখচানিটা থেকেই যাবে। একটা গল্প বলা হয়েছে সেখানে। তাতে কাজী নজরুল ইসলাম এসেছেন, তার হাত ধরে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জসীমউদ্দিন। আরও এসেছেন জাদুকর পিসি সরকার, কাননবালা থেকে শুরু করে এক প্রজন্মের সমস্ত রথী-মহারথী। এমন একটি বই নিয়ে কোনোমতে চুপ থাকা যায়?
নিচে যা লেখা হচ্ছে, তা রিভিউ না বলে পাঠ প্রতিক্রিয়া বললেই বোধ করি শোভন হবে। আর পাঠ প্রতিক্রিয়াও যদি না হয়, তবে আপনাদের ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি তো আছেই।
****
উপন্যাসের গল্পটা শুরু হচ্ছে এক পুকুরপাড় থেকে। পুকুরের ধারে বসে আছেন ফকির আহমেদ। ফকির আহমেদ আবার স্থানীয় মসজিদের ইমাম। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা বলে আয়-উপার্জন তেমন নেই। দুই স্ত্রী আর এক পুত্র নিয়ে সংসারটা তার টানাপোড়েনেই চলে।
এরই মধ্যে দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে আসে সন্তান। এর আগেও চারবার সন্তান জন্ম দিয়েছেন তিনি, কিন্তু তাদের কাউকেই পৃথিবীতে ধরে রাখা যায়নি খুব বেশিদিন। তাই পঞ্চমবার স্ত্রীর গর্ভে সন্তান এলে ফকির আহমেদ পরামর্শ হাতড়ে বেড়ান এখানে-সেখানে। কেউ বলেন, শ্রুতিমধুর নাম শুনলে আজরাইলের দৃষ্টি সহজে আকৃষ্ট হয়। এ জন্য সন্তানদের নাম রাখতে হয় উল্টাপাল্টা। পাশের শহরের এক সন্ন্যাসী তাকে জানান, এইবারও ছেলে হবে। এই ছেলে বাঁচবে। সন্ন্যাসীর কথায় ভরসা পেয়ে ফকির আহমেদ সিদ্ধান্ত নেন, ছেলে হলে বামাক্ষ্যাপা সন্ন্যাসীর সঙ্গে মিলিয়েই রাখা হবে ছেলের নাম, তারাক্ষ্যাপা।
উপ���্যাস আবর্তিত হচ্ছে এই তারাক্ষ্যাপাকে ঘিরেই। এই তারাক্ষ্যাপাই আবার কিছুকাল পরে হয়ে যাবেন দুখু মিয়া, বড় ভাই সাহেবজানের কল্যাণে। ততদিনে বাস্তবতার পাঠ অনেকটাই জেনে গিয়েছে সে। মক্তবে পড়ার বয়সে আজান দিয়েছে মসজিদে, রাতে চাচার সঙ্গে লেটোর দলে গান গেয়েছে। বয়স নয় না পেরোতেই হারিয়েছে বাবাকে, মা ফের বিয়ে করেছেন চাচাকে। লেখক তাই দুখু মিয়া নামকরণের সার্থকতা খুঁজে পাচ্ছেন এখানে। বলছেন, 'যে ছেলে মাত্র নয় বছর বয়সে পিতৃহারা হয়, দুখু নামটি তার জন্য উপযুক্ত বটে।'
এই দুখু মিয়াই পরবর্তীতে পরিচিতি পায় কাজী নজরুল ইসলাম নামে, যে নামবদলের কাজটি করেছে সে নিজেই। এই নামবদলটা যেন তার স্বাধীনচেতা মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। লেখক যেমন বলছেন, ' জীবনটা তো তার, নামও তার রাখা উচিৎ। অন্যের দেয়া নাম সারা জীবন বহন করার কোনো মানে আছে?' খুব সম্ভবত, দুঃখ-দুর্দশায় বেড়ে ওঠা একাকিত্বে ভরা নজরুলের শৈশবটাও ফুটে ওঠে এখান্ব।
দুখু মিয়া কিংবা নজরুল চরিত্রটি লেখক তৈরি করেছেন বিশেষ যত্ন নিয়ে। শিশু নজরুলের ফর্সা গাল কিংবা সিঁড়ি ভেঙে বাসায় উঠবার পথে কিশোর নজরুলকে দেখে কাজী রফিকউল্লাহর থমকে যাওয়া, এসব ঘটনা নজরুলের রূপ-লাবণ্যেরই দিকে ইঙ্গিত করে। আবার ডালকুত্তার তাড়া খেয়ে মেসে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে নজরুলকে দিয়ে 'বাবুদের তাল-পুকুরে, হাবুদের ডাল-কুকুরে' কবিতা লিখিয়ে লেখক বোঝাতে চান, স্রষ্টা তাকে রূপের সঙ্গে গুণও দিয়েছেন যথার্থ। প্রতিভার গুণে মানুষের নজরে চলে আসাটা ঢের সহজ তার জন্য। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের ৩২ নম্বর বাড়িতে তার আগমনে ঘুঘু বিদায় হয়ে যায়, এমন ঘটনার উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, দুখু মিয়ার চরিত্রের 'আড্ডাবাজ' বৈশিষ্ট্যকে লেখক গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন বাড়তি করে।
তাই বলে নজরুলের রিপুগুলো উল্লেখ করতেও ভোলেননি লেখক। বিয়ের আসর ছেড়ে অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবেই নজরুলের পালিয়ে যাওয়া, তার স্বার্থপরতারই প্রমাণ দেয় যেন। কিংবা পরবর্তী জীবনে স্ত্রী-শাশুড়িকে অর্ধাহার-অনাহারে রেখে নজরুলের আমোদ-প্রমোদ করে বেড়ানো, তার উদাসীনতারই প্রমাণ। আবার, নজরুলের বেহিসেবী চরিত্র, সরলমনা প্রকৃতি তাকে অভাব-দারিদ্যের মধ্যে রেখেছিল হরদমই। আর সবখানেই তার উড়ুক্কু মনের একটা ছাপ পাই আমরা। অণ্ডাল জংশন, আসানসোল, কিংবা ময়মনসিংহ; দুখু মিয়াকে এক জায়গায় স্থির হয়ে জমে থাকতে দেখা যায়নি কখনোই। এই অস্থিরতার প্রমাণ সে রেখেছিল পরবর্তী জীবনেও। পত্রিকায় লেখালেখি করে করে জীবনটা একঘেয়ে হয়ে গেছে? আগু-পিছু না ভেবে সঙ্গে সঙ্গে বিদায় বলে দিয়েছে সে কাজকে। দুখু মিয়ার এই অস্থিরমতি স্বভাবটিও লেখক আশীফ এন্তাজ রবি তার লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন যথেষ্ট সার্থকতার সঙ্গে।
চাঞ্চল্যে ভরা ছিল দুখু মিয়ার প্রেমজীবনেও। কখনো সৈয়দা খানম ওরফে নার্গিস, কখনো আশালতা সেন ওরফে প্রমীলা, কখনো ফজিলাতুন্নেসা, কখনো ইন্দুবালা, কখনোবা কাননবালা; নজরুলের জীবনে নারীর আগমন ঘটেছে প্রচুর। প্রত্যেককেই যতক্ষণ সে ভালোবেসেছে, উজাড় করেই বেসেছে। কিন্তু আচমকাই থমকে গিয়েছে ভালোবাসা। হয়তোবা শৈশবে পাওয়া অনাদর আর অবহেলায় প্রকৃত ভালোবাসাটা তার বোধগম্যই হয়ে ওঠেনি কখনো, ছুটে ফিরেছে এ দুয়ার থেকে সে দুয়ারে। বন্ধু মোতাহার হোসেনের সঙ্গে নজরুলের এক রাত্রীকালীন আলাপে লেখক সে করুণকাহিনী বলিয়েছেন নজরুলের মুখেই।
তৎকালীন সমাজবাস্তবতাও ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। নজরুল বিয়ে করতে চেয়েছেন এক হিন্দু রমণীকে, আর তার জন্যে দু'ভাগ হয়ে গিয়েছে গোটা অঞ্চল, এমনকি কিছুটা উত্তম-মধ্যমও হজম করতে হয়েছে নজরুলকে, এসব ঘটনার উল্লেখ করে লেখক এ অঞ্চলের মানুষদের ধর্মীয় উগ্রতার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। নারীদের দিয়ে থিয়েটার নামিয়ে, কিংবা পুঁটিরানীর শূন্য থেকে শেখরে ওঠার গল্প শুনিয়ে, নারীদের অগ্রযাত্রার জয়গানও যেন শোনানো হয়েছে উপন্যাসে।
নজরুলের সূত্রেই উপন্যাসের নানা ধাপে আগমন ঘটেছে নানা চরিত্রের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কখনো পাওয়া যাচ্ছে আর্জেন্টিনায়, যেখানে মিলছে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে তার সখ্যতার বিবরণ। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজেই হয়ে গেছেন তার সৃষ্ট চরিত্র 'দেবদাস', লেখকের যথার্থ ভাষাপ্রয়োগে যা আরোপিত মনে হয়নি একটুও। জীবনানন্দ দাশ ট্রামের তলায় চাপা পড়ার আগে চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছেন অনেকবার, যেন মৃত্যুর জন্যেই অপেক্ষা ছিল তার।
এর বাইরে জসীমউদ্দিন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্তিত্বও পাওয়া গিয়েছে উপন্যাসে। এত বেশিসংখ্যক চরিত্রের উপস্থিতি ঘটলে একটি আশঙ্কা থাকেই, অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হয়ে যায়নি তো? কিন্তু লেখক তার ভাষার যথাযথ ব্যবহার এবং সাবলীল বর্ণনাভঙ্গিতে সংশয় প্রকাশের জায়গা রাখেননি একদমই।
সব মিলিয়ে তাই আশীফ এন্তাজ রবির লেখা 'আমারে দেব না ভুলিতে' উপন্যাসটি পড়তে উপভোগ্যই মনে হয়েছে আমার কাছে। আমার ভাবনা সঠিক কী ভুল, তা যাচাই করবার দায়িত্ব ন্যস্ত করে যাচ্ছি আপনাদের ওপরই।
কাজী নজরুল ইসলামকে ঠিক কতটুকু চিনি আমি? এই উত্তর আমার কাছে জানা নেই আমার মনে হয় এই মহান মানুষটাকে নিয়ে আমার জানার সীমানা ভীষণ সীমিত! এর কারণ কী! আমি শুধু জেনেছি স্কুলের গন্ডিতে যখন কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা মুখস্থ করা কিংবা সার সংক্ষেপে গিয়ে স্যারের ভয়ে তা মুখস্থ করা আর ইশকুলের পরীক্ষায় নাম্বার পাবার আশায় লেখক পরিচিতি পড়ে নেওয়া যদি কোনো প্রশ্ন কমন পড়ে এই আশায়। অথচ এই মানুষটার এতো চমৎকার একটা জীবনের এক সিকিভাগ না জানায় নিজেকেই নিজে দুখী বলতে ইচ্ছে করে৷
কত অজানারে:
আসিফ এন্তাজ রবি'র লেখা এই বায়োফিকশন পড়ার আগ অব্দিও আমি নজরুলকে বিশেষ ভাবে আবিষ্কার করতে পারিনি। এটা আমারই ব্যর্থতা। তো বলা যায় এই বই পড়ে যে আমি সব কিছু জেনে বসে আছি তাও মূর্খতাই বলবো নিজেকে। কিঞ্চিৎ জেনেই এই মহান মানুষটার জীবনের এক অদ্ভুত মায়া মায়া এসে ভর করেছে আমার মানসপটে। এই এক বিদ্রোহী কবি যে শব্দের কারুকার্যে ভেঙ্গে দিয়েছে কত রাজপথ কতশত হার না মানা অদম্য গল্প।
বই প্রসঙ্গে:
'আমারে দেবো না ভুলিতে' পড়ার শুরু থেকে আমার মন খুব উতলা হয়ে উঠেছিল যখন টের পেলাম নজরুলের জন্মকাল থেকেই গল্প বলা শুরু হয়েছিল। পরতে পরতে তা শৈশব, কৈশর, যৌবনেরও ঊর্ধ্বে গিয়ে যখন ঠেকেছে তখন মনের অজান্তে কখনো হেসেছি, কখনোবা দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে এসেছে হৃদয়। কত সংগ্রাম, কত ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন এই মানুষটা। ভাবতেই মনে এক দীর্ঘশ্বাসের জন্ম নেয়। ওই সময়কার সময়গুলো ছিলো সব গুনী মানুষদের আনাগোনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, জসীমউদ্দিন, জীবনানন্দ দাশ সহ আরো অনেক অনেক গুনীজন। প্রত্যেকের জীবনের টুকরো টুকরো স্মৃতি জাতীয় কবির জীবনে সঞ্চারিত হয়েছে। তাদের সান্নিধ্য কিংবা তারা নজরুলের সান্নিধ্য পেয়ে পরিবেশ হয়ে ওঠেছিল কাব্যিক ময় সুরেলা গানের আসর কিংবা কবিতার ছন্দে ছন্দিত রূপকথা গল্পের কারুকার্য। নজরুল তার জীবনে সেরা সেরা মানুষদের দেখা পেয়েছিলেন। যাঁরা তার বিপদে আপদে সবসময় এগিয়ে এসেছিলেন নির্দ্বিধায়। কখনো অর্থ সংকটে পড়লে সবার আগে তাঁরাই এই মানুষটাকে সাহায্য করতেন। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে অনেকটাই ছন্দপতনের মতো ছিলো। তিনি কখনো পরিপূর্ণ সুখের দেখা পাননি৷ প্রিয় পুত্র হারানোর শোকের মাতমে শেষবেলায় ছেলের চিকিৎসার জন্য কবিতা ছাড়া অবশিষ্ট কোন অর্থ ছিলো না তার কাছে। আহা! কত সংগ্রাম মানুষটার! দুখু মিয়ার জীবনের শেষটাও কেমন যেন আকুলতার মতো। জ্বলন্ত প্রদ���প যেন হুট করেই নিভে গেলো এক আকস্মিক ঝড়ে! নজরুলের জীবনী আরো আরো জানার তৃষ্ণায় আমার প্রাণ আইঢাই করছে আমি টের পাচ্ছি।
গল্পকার নিয়ে কিছু কথা:
আসিফ এন্তাজ রবির অনবদ্য সৃষ্টির প্রয়াস এই গ্রন্থ। লেখনী দিয়েই পাঠকের মনের অবস্থা তিনি বেশ ভালোমতোই চাপ ফেলতে পেরেছেন বলে মনে হলো৷ মনে হচ্ছিলো জাতীয় কবির শুরু থেকে শেষ আমার সামনে তরতরিয়ে কেটে যাচ্ছে ছন্দময় হয়ে। লেখনী নিয়ে কোন অভিযোগ অনুযোগ আনার প্রশ্ন আসাটা বাতুলতা। পাশাপাশি চরিত্রদের আত্মকাহিনী তিনি বেশ ভালো মতো ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। যা সত্যিই অনবদ্য লেগেছে। লেখকের আরো বই পড়ার ইচ্ছে আছে সামনে।
সবশেষে:
এটা কোন রিভিউ না। কি লিখছি নিজেও জানি না। বইটা শেষ করার পর ঘোর নিয়ে লেখা এসব কথাগুলো। আমি শুধু একটা কথাই বলতে পারি আমার কাছে সত্যিই, সত্যিই ভালো লেগেছে বইটা। সংগ্রহে রাখার মতোন অবশ্যই। কাজী নজরুল ইসলামকে জানার ইচ্ছে আরো হাজারগুন বেড়ে গেলো সবশেষে।
কবি নজরুলের জীবনভিত্তিক উপন্যাস হলেও এতে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, জসীম উদদীন, শরৎচন্দ্র। পূর্বে গোলাম মুরশীদের "বিদ্রোহী রণক্লান্ত " পড়ার কারনে এটার মাঝে তেমন নতুনত্ব পাইনি। লেখক শেষদিকে কিছুটা তাড়াহুড়ো করেছেন বলে মনে হলো।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মারা যান মাত্র ৪৮ বছর বয়সে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা জীবনানন্দ দাশও অনেক কম বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। এ দেশের বুক থেকে, শহীদুল্লাহ কায়সার ও জহির রায়হান হারিয়ে গেছেন খুবই অল্প বয়সে। এ নামগুলো বাংলা সাহিত্যের জন্য আক্ষেপের। এমন নাম আরও অনেক আছে। কিন্তু সে তালিকায় কেউ কখনও কাজী নজরুল ইসলামের নাম যোগ করবে না।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি বেঁচে ছিলেন ৭৭ বছর। বেঁচে থেকে একজন মানুষের জীবনের কাজগুলো গুটিয়ে আনার জন্য ৭৭ বছর বেশ বড় একটি সময়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন মারা যান,তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি তার জীবনকে একদম পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করে গেছেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি তার মস্তিষ্ক ব্যবহার করে রচনা করেছেন কাব্য। কলম হয়ত ধরতে পারেননি। তবে লাইনগুলো মুখে বলেছেন তা অন্য কেউ তুলে নিয়েছে। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম যে তার জীবনের শেষ ৩৪ বছর সাহিত্যকর্মই করেননি। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর তাকে দেশে এনে সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়, কবি তার কিছুই বোঝেননি। কারণ তার বোঝার শক্তি তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন এ দেশের বুকে পা দেবার অনেক অনেক আগে।
আমাদের জাতীয় কবি হওয়া স্বত্তেও নজরুল সংক্ষেপিত ও উপেক্ষিত। নজরুল যে আসলে আমাদের এক আফসোসের নাম, সেটা যেমন আমরা ধরতে পারিনি, তেমনই তার রোমাঞ্চকর জীবনের গল্পও আমাদের অজানা।
"আমারে দেব না ভুলিতে" বইটি না পড়লে হয়ত নজরুল সম্পর্কে এতসব তথ্যও জানা হতো না। তবে এই বইটি ঠিক নজরুলনামা নয়। লেখক নিজেই বলেছেন, এই বইটি পুরোপুরি নজরুলের জীবনী না। এর সাথে আছে ফিকশন। তবে বইটি নজরুলকে আরও ভালোভাবে জানার আগ্রহ তৈরি করবে। লেখক এদিকে শতভাগ সফল। জানি না বইটি কতটা সাড়া ফেলবে বা কতজন পাঠকের কাছে পৌঁছাবে! তবে আমি নিশ্চিত এই বইটি শেষ করার পর পাঠক অবশ্যই নজরুল নিয়ে আরও ঘাঁটাঘাঁটি করবেন। হয়ত নজরুলের কবিতাও নতুন করে পাঠ করতে বসে যাবেন। আর একটিমাত্র কথাই তার মাথায় ঘুরতে থাকবে! "আফসোস", "আফসোস"।
আপনার বই পড়ে বার দু'য়েক কেঁদেছি। বইয়ের সংলাপ, প্রেক্ষাপট কীংবা "ঐতিহাসিক ঘটনা" নিয়ে এত চিন্তা করিনি কারণ ইতিহাস শেখার জন্য নয় বইটি, বরং মনে হয়েছে ইতিহাসকে উপজীব্য করে দু'ফোঁটা গ্লানি বের করে দেয়ার উদ্দেশ্যই লেখা হয়েছে এটি৷ পুটিঁরাণীও তো একই উপায়ে বুক হালকা করে থাকেন? লেখনী সহজবোধ্য, কথাসাহিত্যের চল হুমায়ুনের সাথে মিলে যায়। জোছনা ও জননীর গল্পের কথা মনে পড়ছিল বারে বারে। তবে আপনার শব্দচয়ন কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলাদা। পড়তে একঘেয়েমি লাগেনি, খানিক পরপর কবিতার ব্যবহার ভালো লেগেছে অনেক। সত্যি বলতে, ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লেখা আর ইতিহাস এক নয়। অনেকেই এই বিষয়টা ধরতে পারেন না। তবুও, বইয়ের প্রতিটি লাইন যদি সত্য ধরে নিই, তবে নজরুলকে তার সাহিত্যশক্তি ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে পছন্দ করার মত গুণ পেলাম না। শুভকামনা।
আমার পড়া লেখকের প্রথম বই ' কাগজের নৌকা '। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকে পড়েছিলাম। চমৎকার ঝরঝরে লেখা, মজা করে পড়া যায়। ' সাহিত্যমর্যাদা ' জাতীয় বিষয়ের বালাই নেই, ইংরেজিতে যাকে বলে ' Page Turner '- তেমন ধরণের বই। চপল বইটা আমি কয়েকবার পড়েছি তার হালকা মেজাজের জন্যে এবং বইয়ের মূল চরিত্রের নানা বিবাহিত হিমুসুলভ কাজ-কারবার, চটুল বার্তায় হাসতে।
এরপরে কিনেছিলাম লেখকের ' গল্পতুচ্ছ '। অখাদ্য বই। এ বইয়ের কাগজ দিয়ে মুড়ির ঠোঙ্গা বানালে মুড়ির সম্মানহানি ঘটবে।
' আমারে দেব না ভুলিতে ' পড়ে আমার কাছে ঐ দুটো বইয়ের মাঝামাঝি লেগেছে ( পাল্লা কাগজের নৌকা-র মনোভাবের দিকে বেশি ভারী)... তবে এই ভালো লাগার পেছনের অন্যতম প্রধাণ প্রভাবক হলো আমার ব্যক্তিগতভাবে নজরুলকে ঘিরে আগ্রহ। নজরুলের সুখপাঠ্য জীবনীর খোঁজ আমি পাই নি, যা পেয়েছি তা মূলত গবেষনাগ্রন্থ বা প্রবন্ধের মেজাজে লেখা নন-ফিকশন। ' ক্রাচের কর্নেল ' যিনি লিখেছেন, শাহাদুজ্জামান, তিনি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখার পর আমার মনে ক্ষীণ একটা আশা ছিলো এবং এখনও আছে যে তিনি নজরুলকে নিয়েও লিখবেন। আশীফ এন্তাজ রবি ক্রাচের কর্নেলের মতো কিছু লেখেন নি, লিখতে চান-ও নি। তিনি লিখেছেন তার নিজের লেখার মেজাজে। হালকা চালে, গল্প-করার ভঙ্গিতে, কিছুটা অসংলগ্নভাবে। লেখক নিজের লেখা ধাঁচের প্রতি সৎ থাকবেন, এটা কাঙ্খিতও।
কিন্তু সমস্যা হলো পাঠক হিসেবে আমার নজরুলের মতো ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এতো লঘু মেজাজের বই পড়ে যেন মন ভরলো না, খানিকটা রাগও হলো। তবে বইটা পড়ে আমি আনন্দ পেয়েছি। বিরক্তও হয়েছি। নজরুলের উপর। নজরুল যে এতো অসম্ভব রকমের বিরক্তিকর, বোধশক্তি বিবর্জিত এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন চরিত্র ছিলেন জানতাম না। বিখ্যাত কবি বলে মানুষ হয়তো খেয়ালি, অস্থির, ছন্নছাড়া এসব শব্দ ব্যবহার করে তার বিবমিষা জাগার মতো ক্রমাগত আচরণের দায়কে হালকা করতে চাইবেন। তাতে মত পাল্টানো ঠিক হবে না। অন্যায় অন্যায়-ই। ব্যক্তিভেদে অন্যায়ের সংজ্ঞা বদলায় না। অবশ্য বইয়ের উল্লেখিত ঘটনা কতখানি সত্য আর কতখানি কল্পনা সেটা নিয়েও ধোঁয়াশা আছে।
বইটাতে আমার কিছু অসঙ্গতি আছে বলে মতামত থাকলো। বিশেষত স্থান, কাল পাত্র বিবেচনায় চরিত্রদের সংলাপে। একশ বছর আগে নজরুলের মুখে ' খ্যাতির খ্যাতা পুড়ি " জাতীয় ��থা বের হচ্ছে এটা একটু কষ্টকল্পনা। যাক, লেখকের স্বাধীনতা বলেও একটা কথা আছে। আর লেখক তার সেই স্বাধীনতার চর্চা করে ধান ভানতে গিয়ে অসংখ্য শীবের গীত শুনিয়েছেন পুরো বই জুড়ে (এমন কী বইয়ের ফ্ল্যাপেও)। পরম্পরাহীন ভাবে নজরুলের জীবন আশ্রিত উপন্যাসে গুরুত্ব দিয়ে চিত্রিত চরিত্র তাই হরিদাস পাল, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, বেঙ্গল সার্কাসের দুই মালিক, পুঁটিরানী, চুনীলালসহ নানা চরিত্রেরা। হিরন্ময়ী দেবী কি আসলেই শরৎচন্দ্রের স্ত্রী ছিলেন? দ্বিমত আছে বলে পড়েছি।
অপ্রাসঙ্গিকতায় বইয়ের অনেকখানি অংশ পূর্ণ করে লেখক বইয়ের সমাপ্তি এবং নজরুলের অসুস্থ জীবনের অংশ চিত্রিত করলেন ফর্মার হিসেব করার তড়িঘড়িতে।
" নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো " থিওরিতে পড়তে পারেন বইটা। কিছুটা প্রগলভ মেজাজের এ বইতে যদিও নজরুলের প্রতি সুবিচার করা হয়েছে বলা যাচ্ছে না কোনভাবেই, পাঠক হিসেবে আপনার সময় বেশ ভালোই যাবে।
২/বইটাতে একটা বিষয় বেশি হাইলাইট করা- নজরুল প্রচুর ফুর্তিবাজ, তাঁর দুঃখ ঢেকে রাখে, টাকা পয়সা উড়িয়ে ফেলে, 'সহজ সরল'।
৩/তখনকার সময়ের জনপ্রিয় সব লেখক, কথা সাহিত্যিকদের কথাও উঠে এসেছে, পড়তে গিয়ে অনেক ভালো লাগে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জসীমউদ্দিন, জীবনানন্দ দাশ, কাজী মোতাহার হোসেন,ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, এ.কে. ফজলুল হক এদের সবাইকে এক মলাটে পেলাম। এখানে একটা বাটারফ্লাই ইফেক্ট দেখলাম, পুঁটিরানী, চুনিলাল, ইন্দুবালা এরা যে কিভাবে একে অপরের সাথে কানেক্টেড তা খেয়াল করলে মজাই লাগে।
৪/সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হয় যখন বুলবুলের মৃত্যুতে কবিকে আবার প্রকাশকের ধার পরিশোধের জন্য লিখতে বসা লাগে, তাও আবার হাসির ছড়া, লেখক লিখেছিলেন "কাঁদতে কাঁদতে হাসির ছড়া লিখতে লাগলেন।" লেখকও এই পার্টে নজরুলের দুঃখটাকে সবচেয়ে ফুলেফেঁপে দেখিয়েছেন। নজরুলের ভবিষ্যতেও এর প্রভাব দেখা যায়। বুলবুলের প্রতি আমারও এখন মায়া কাজ করা শুরু করেছে।
৫/ ঐতিহাসিক চরিত্রের উপন্যাস হওয়ায় গল্পে অনেক টাইমল্যাপ্স ছিলো। তবে উপন্যাসের জন্য যদি নজরুলের ইমোশনগুলোকে আরো বেশি প্রাধান্য দেওয়া হতো তাহলে হয়তো আরো ভালো হতো। এমনিতেই যথেষ্ট প্রাঞ্জল। তবে ইতিহাস জানতে গেলেই বইটা বোধহয় সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হবে।
অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল নজরুলের জীবন নিয়ে বিস্তারিত জানব। আমার আর আলাদা ভাবে খোঁজাখুঁজির প্রয়োজন হয়নি। এই বই-এ একদম সবকিছুই গোছানো রয়েছে। সেই সময়ে চলাকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহ বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকদের জীবন যেভাবে বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে সত্যিই সুন্দর। বইটি পড়ার সময় নতুন করে নজরুল সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা জন্মালো।
এখন পর্যন্ত কাজী নজরুল ইসলাম এর জীবনের উপর লেখা সব থেকে ভালো বই। খুব সুন্দর আর সাবলীল ভাষায় এখানে জাতীয় কবির জীবনের চড়াই উতরাই গুলি বলা হয়েছে। একটুও বোরিং পার্ট নাই। আশিফ এন্তাজ রবির লেখা ছোট বেলা থেকে পড়তাম। সহজ ভাবে লেখেন। বইটাতেও একই লিখনশৈলী। সুন্দর। পড়ুন জলদি। অনেক কিছু জানবেন।
সময়টা প্রায় ১০০ বা তার অধিক বছর আগের কথা। চুরুলিয়ার একটি গ্রামে একজন ইমাম বসবাস করতেন। একজন সন্তানের আশায় যার মনের অস্থিরতা চাপা থেকে না। কিন্তু তার স্ত্রীর গর্ভে সন্তান তো আসে, কিন্তু পৃথিবীর এই জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে পারে না। স্ত্রী আবারও গর্ভবতী। এবার কি এই লড়াই টিকে থাকার জন্য কেউ আসবে? হয়তো তখনই নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল। কাজী ফকির আহমেদের ঘর আলো করে সেদিন যেই পুত্র সন্তান ক্রন্দনরত— কে জানত, তার রক্তে মিশে থাকা বিদ্রোহ একদিন টগবগিয়ে ফুটবে। এই বাংলার বুকে যার জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁবে। দুখু মিয়া থেকে কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে ওঠার এই যাত্রা কখনোই সুখকর ছিল না। জীবনের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পদে পদে সংগ্রাম করে একজন কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে ওঠে! চলুন, এই যাত্রায় আজ আমরাও শামিল হই।
একজন কবি আসলে কেমন ধারার মানুষ হয়? কেউ হয় উদাসীন। জীবন সম্পর্কে যার ধারণা নিতান্তই সামান্য। একটু চঞ্চলতা তাকে ঘিরে ধরে। জগৎ সংসার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলে। কতটুকু পারা যায়? কাজী নজরুল ইসলাম এমন একজন মানুষ ছিলেন, তার জীবন জুড়ে চঞ্চলতা ছিল প্রাধান্য বিষয়। আড্ডাবাজি, গানে আসর মাতিয়ে রাখা, আসরের মধ্যমণি হয়ে সবার মনোযোগ কেড়ে নেওয়া ছিল কাজী নজরুল ইসলামের স্বভাবগত আচরণ। ছোটবেলা থেকে তার চঞ্চলতার কারণে চুরুলিয়া সেই গ্রাম থেকে কলকাতার রাস্তায় তাকে নিয়ে আসে। সেখান থেকে ঢাকা। ছোট্ট এক মানুষ থেকে মস্ত বড় কবি! যদিও নজরুল ইসলাম কি সবকিছুই পেয়েছেন, জীবনে যা চেয়েছেন? সব থাকার পরও কী তার অপূর্ণতা ঘিরে ধরেনি? মানুষ সবসময় সবকিছু পায় না। জীবনে সুখের আড়ালে দুঃখ-কষ্টগুলো সেভাবে হয়তো প্রকাশ্যে আসে না, সময় অসময়ে ঠিকই যন্ত্রণা দিয়ে যায়।
সেই ছোট্টবেলায় একজন ইমামের পরিবারে বেড়ে ওঠা। ধর্ম, মাদ্রাসার পাশাপাশি হুট করে যাত্রাপালায় ঝোঁক। নিজের গায়কীতে মজলিস মাতিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সেখান থেকেই। আগেই বলেছি, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন চঞ্চল প্রকৃতির। তাই কখনোই এক স্থানে থিতু হতে পারেননি। ছোটবেলা থেকেই যেন ছুটে চলেছেন। কারো ফুট ফরমাস খেটেছেন, হোটেলে কাজ করেছেন, যুদ্ধ করতে যোগ দিয়েছেন সেনাবাহিনীতে। সেখানেই চালিয়ে গিয়েছেন কবিতার চর্চা। একজন হাবিলদারের কবিতা কোনো এক পত্রিকায় ছাপা হয়, শুরু হয় নজরুল বন্দনা। দুখু মিয়া হয়ে ওঠেন সবার প্রিয় কাজী নজরুল ইসলাম।
“আমারে দেব না ভুলিতে” কেবল কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে রচিত উপন্যাস, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। এই বইটির মাধ্যমে উঠে এসেছে একে একে বাংলা সাহিত্যের রথী মহারথীরা। এসেছেন রবীন্দ্রনাথের জীবনের গল্প। শুরু থেকে নজরুল যাকে ভক্তি করে এসেছেন। চেয়েছিলেন এমন এক মহাকবির মতো জনপ্রিয় হতে। পেরেছিলেন হয়তো তার চেয়েও বহুগুণ। ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন কোনো সাহিত্যে। রবীন্দ্রনাথের এক বিশাল গল্পের রেশ এখানে উপস্থিত। উঠে এসেছে বিশ্বভারতীর কথা। বিশ্বভারতীকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁর পরিশ্রমের কথা!
শুধু কী তা-ই? কেবল রবীন্দ্রনাথ-ই যে বাংলা সাহিত্যকে একা টেনে নেননি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ভুলে গেলে চলবে? নজরুল ইসলামকে বিশেষ স্নেহের চোখে দেখতেন শরৎচন্দ্র। তাকে নিয়ে ঘুরতেন। গানের আসর কিংবা যাত্রাপা���ায় একসাথে হাজির হতেন। তখনও নজরুল ইসলাম আজকের কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে ওঠেননি। নজরুলের মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন হয়েছিল। নজরুল হয়েছেন অমর। সৃষ্টি করেছেন একের পর এক অমর কবিতা।
বইটিতে আছেন জসীমউদ্দীনও। যাকে শিশু কবি বলে নজরুল সম্বোধন করতেন। একে একে যখন কোথায় নিজের কবিতার মর্যাদা না পেয়ে স্মরণাপন্ন হোন কবি নজরুলের। সেখান থেকে দুইজনের যে সখ্যতা গড়ে ওঠে, তা অতুলনীয়। আরো আছেন জীবনানন্দ দাশ। একজন মুখচোরা কবি। উদাস হয়ে যিনি অবলোকন করতেন পরিবেশ, প্রকৃতি। আর তাতেই উঠে আসত এক একটি দারুন কবিতা। যদিও সেসময় জীবনানন্দ দাশের কবিতা খুব যে মর্যাদা পেয়েছিল এমন না, অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছিল।
এছাড়া দিলীপ কুমারের গল্প, বিভূতিভূষণ, সত্যেন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়রাও জায়গা পেয়েছে বইটিতে। বেশ কিছু আবেগের সাথে পরিচয় হওয়া গিয়েছে। পুরনো গল্প নতুন করে জন্য গিয়েছে। সাহিত্যের এত গুনিব্যক্তিকে একসাথে নিয়ে আসা মুখের কথা নয়। যে চেষ্টা লেখক করেছেন, সাধুবাদ দিতেই হয়। লেখকের পরিশ্রম এখানে সার্থক। প্রতিটি বর্ণনা, এর সাথে সংযোগ স্থাপন করে পাঠকদের আবেগে ভাসিয়ে দেওয়া খুব একটা সহজ নয়। লেখক খুবই দক্ষতার সাথে সে কাজটি করেছেন।
সবকিছু ছাপিয়ে “আমারে দেব না ভুলিতে” একজন কাজী নজরুল ইসলামকে বর্ণনা করে। তার উচ্ছল একজন যুবা পুরুষ। যে এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না। অস্থির চিত্তের এই মানুষটি হুট করেই হারিয়ে যেত। কাউকে কিছু না বলে কোথাও চলে যেত। যেখানে গিয়ে জীবনকে অন্যরকমভাবে চিনত। কখনো বিপদগ্রস্ত হয়ে হাত পাততে হতো বন্ধুদের কাছে। কাব্য রচনা করতে গিয়ে প্রচুর অর্থকষ্টে পড়তে হয়েছে কাজী নজরুল ইসলামকে। নজরুলের বন্ধু ভাগ্য খুব ভালো। মোজাফফর হোসেনের মতো একজনকে পেয়েছিলেন। কতবড় বিপদে পড়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম, ততবারই তিনি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সাহায্য করেছেন। উদ্ধার করেছেন বিপদ থেকে। তবুও নজরুল সেই মর্যাদা দিতে পেরেছে। হয়তো পেরেছে। কিন্তু অস্থির মন নিয়ে নজরুল তা-ই করত, যা তার করতে ইচ্ছে হতো। কোনো কিছুর পরোয়া করত না। নিজের মনের কথা শুনতে গিয়ে কম বিপদেও পড়েনি।
যেমন বলা যায় বিদ্রোহী কবিতার কথা। বাংলা কাব্য ইতিহাসে এক অমর সৃষ্টি এই বিদ্রোহী। যার প্রতিটি চরণে কাঁপুনি ধরেছিল ইংরেজদের বুকে। কেঁপে উঠেছিল অজানা আশঙ্কায়। এর ফলও ভালো ছিল না। দেশদ্রোহীতার রূপ দিয়ে কাজী নজরুল ইসলামকে জেলখানায় বন্দী করা হয়। সেখানেও বিদ্রোহ তার রক্তে মিশে থাকে। অনশন, অন্যায়ের সাথে আপোষহীন এক কবি নিজের শক্তিবলে অবশেষে মুক্ত হন। শ্বাস নেন খোলা বাতাসে।
এমন এক বিপদ হয়তো সামনে চলে এসেছে। একজন কবি মানুষ প্রেমে পড়তেই পারে। যিনি কবিতা লিখেন, কাব্য দিয়ে প্রেমকে জয় করতে পারেন। সেখানে ভালোবাসা আছে কি না, সেটা একটা প্রশ্ন থেকে যায়। কুমিল্লায় তেমনই এক নারীর প্রেমে মত্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন বিয়ের। কিন্তু ঘোর কাটতে বেশি সময় লাগে না। নজরুল স্বাধীনচেতা মানুষ। কারো প্রভাবে সে বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না। সে কারণেই বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে বেড়ায়। নিজস্বতা যেখানে নেই, সেখানে নিজেকে সঁপে দেওয়া অনর্থক। তাই বলে কি নজরুল বিয়ে করেননি? সেখানেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন বিদ্রোহী কবি। জাত ভুলে ভিন্ন ধর্মের একজনকে বিয়ে করেছেন। কবি মানুষের কাছে জাত তুচ্ছ। মানুষই আসল। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। সেকারণেই ধর্ম, জাত আমলে না নিয়ে এক হিন্দু নারীকে বিয়ে করেছিলেন। যে নিজের আত্মীয়স্বজন, পরিবার ভুলে কেবল তার মাকে নিয়ে নজরুলের সাথে পথে নামে।
নজরুলের নিজের কোনো থাকার জায়গা নেই, তাও সে বিয়ে করে এক বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। কিছু কবিতা লিখলে আয় রোজগার হয় ঠিকই, কিন্তু বেহিসাবি নজরুলের কাছে অর্থের মুল্য থাকে না। প্রমীলা দেবী বলেই হয়তো নজরুলের সাথে সংসার করতে পেরেছেন। ঘরে চাল নেই, হাতে টাকা নেই। অথচ নজরুল পরিবার ভুলে দিব্যি নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন সময় অসময়ে। সন্তান জন্মের পরও সেই চঞ্চলতার শেষ হয়নি। যদিও বুলবুলকে নিয়ে জীবনের একাংশ কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু…. সব ইচ্ছে তো চাইলেই পূরণ করা যায় না।
অর্থকষ্টে থাকা, হুট করে গল্প, কবিতা, গান লিখে আয় রোজগার করা। আবার বেহিসাবি খরচে সব উড়িয়ে দেওয়া নজরুলের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় ছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও নজরুল কি ভালো ছিলেন? শেষবেলায় এসে জীবনের এক অনুরূপ দেখেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যে সময় তার বাড়ি, গাড়ি, টাকার দরকার ছিল পাননি। যখন পেয়েছেন, তখন উপভোগ করার উপায় ছিল না। কারণ এক কঠিন ব্যাধিতে নজরুল তখন জর্জরিত। এই বেঁচে আছেন, এই তো অনেক!
নজরুলের জীবন খরস্রোতা নদীর মত, একুল ওকুল দুই কুলেই ভেসে যায়। সেই ভেসে যাওয়ার গল্পই লিপিবদ্ধ করেছেন লেখক। এমন এক মানুষকে এভাবে তুলে ধরা খুব যে সহজ এমন নয়। তারপরও তার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। যা হৃদয়কে আন্দোলিত করে, নতুন করে চেনায় অদ্ভুত চিত্তের একজন কবিকে। যাকে কোনো বন্ধনে বেঁধে রাখা যায়নি। সে ছুটেছে, নতুনত্বের পথে। নজরুলের আশেপাশে থাকা জ্ঞানীগুণী মানুষদের যেভাবে লেখক তুলে এনেছেন, প্রশংসা করার মতো। সাহিত্যের অমর স্রষ্টাদের এক মলাটে পড়তেও বেশ লাগে। একই সাথে কাজী মোতাহার হোসেন, ফজিলাতুন্নেসা কিংবা বিভিন্ন পত্রিকার প্রকাশকদের তুলে এনেছেন, যারা একসময় জীবন্ত ছিল। হয়তো সেসময় কিংবদন্তিও ছিল।
কবিতার ছন্দে দারুণ কিছু প্রিয় কবিতা লেখক তুলে ধরেছেন। খুবই হৃদয়স্পর্শী বর্ণনায় মুগ্ধতা ছড়িয়ে যায়। লেখকের লেখনশৈলীতে হুমায়ূন আহমেদের কিছুটা ছাপ লক্ষ্য করেছি। শব্দচয়ন, বর্ণনাশৈলী কিছু জায়গায় হুবহু মিলে যায়। আমি জানি না, লেখকের সহজাত লেখনী এমন কি না! হয়তো এমন লেখনী তার মধ্যে বিরাজমান। এতে অবশ্য দোষের কিছু না। পড়তে আরাম লাগে। লেখকের সাবলীল লেখনীর স্রোতে বরাবর ছুটে গিয়েছিলাম। আর সেই স্রোতেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে এক ঝড়ঝঞ্ঝা, বিক্ষুব্ধ এক কবি।
গল্পের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র ছিল পুটিরানি, হরি দাস পাল আর তাদের সন্তান ভিক্টোরিয়া। হরি দাস পালের পরিণতি মানতে বেশ কষ্ট হয়। তখন ব্রিটিশ শাসন চলমান। মুসলিম আর হিন্দুদের বিরোধের রেশে কত প্রাণ যে এভাবে ঝরে গিয়েছে। ধর্মীয় দাঙ্গা কেড়ে নিয়েছে কত নিরীহ মানুষের প্রাণ! ধর্ম প্রতিনিয়ত শান্তির বাণী ছড়ায়, অথচ ধর্মকে ধারণ করা মানুষেরা শান্তির ধারক হতে পারে না। কী অদ্ভুত! তবে পুটিরানির জীবনের গতিপথের পরিবর্তন এক অন্য জীবনের ইঙ্গিত করে। জীবনে সাফল্য কীভাবে ধরা দিবে কেউ জানে না। কেবল ধৈর্য ধরতে হয়। তাহলেই হয়তো ভাগ্যের চাকা একসময় না একসময় ঠিকই বদল হয়।
লেখকের গল্প বলার ধরন বেশ। তবে কিছুক্ষেত্রে অনেক প্রশ্ন আছে। যেমন, লেখক যে সময়কে তুলে ধরেছেন, সেই সময়ের সংলাপের সাথে লেখকের রচিত সংলাপ সামঞ্জস্য কি না। অবশ্য পড়তে খারাপ লাগেনি। কিছুক্ষেত্রে একটি ঘটনা থেকে আরেকটি ঘটনায় হুট করে চলে যাওয়া বেশ বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে। কিছু অংশ ধরতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। টুকটাক এ জাতীয় সমস্যা থাকলেও বেশ উপভোগ্য একটি বই। শেষটা খুব বেশি দারুণ। এমন সমাপ্তির পর আর বেশি কিছু বলার থাকে না। এক ধরনের তৃপ্তি আর মুগ্ধতা নিয়ে থাকতে হয়। জীবনীভিত্তিক উপন্যাসে সবকিছু যে সত্য বা বাস্তব, এমন মেনে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। লেখকের এটুকু স্বাধীনতা থাকে, নিজের মতো করে গল্প সাজানোর। তাই বইটির কোনটা সত্য, আর কোনটা কাল্পনিক, সে খুঁজে বের করার দায় পাঠকের। অবশ্য খুঁজে ���া পেলেও চলবে। এমন একখান বই অনুভব করতে হয়, উপভোগ করতে হয়!
পরিশেষে, এই পৃথিবীকে আলোকিত কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্র আসে। তাদের ঔজ্বল্যে উদ্ভাসিত হয় প্রকৃতি। নিজেদের দক্ষতার সাক্ষী রেখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে যায়। আলোর পড়ে অন্ধকার আসে। সেই নক্ষত্রের একদিন পতন হয়। সাহিত্য হোক কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে তারা নিজেদের ঔজ্বল্য বিলিয়ে বিলীন হয়ে যায়। রেখে যায় নিজেদের সৃষ্টিকর্ম। যে সৃষ্টিকর্ম বারবার তাদের কণ্ঠে সমস্বরে বলে ওঠে — আমারে দেব না ভুলিতে।
▪️বই : আমারে দেব না ভুলিতে ▪️লেখক : আশিফ এন্তাজ রবি ▪️প্রকাশনী : আদর্শ প্রকাশ ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৫/৫
আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, এই করোনাকালীন সময়ে যতো বই পড়েছেন, সবচেয়ে প্রিয় কোনটা? আমি চোখ বন্ধ করে বলবো একজন কমলালেবু। শাহাদুজ্জামানের লিখা সেই বইটা। এরপর কাছাকাছি পর্যায়ে আরো যে কয়টা বই প্রিয় তালিকায় যুক্ত হয়েছে বা হলো, তার ভেতরে এই বইটা একটা।
বই এর নাম: আমারে দেব না ভুলিতে লেখক: Ashif Entaz Rabi । আশীফ এন্তাজ রবি
মূলত বইটা লিখা হয়েছে কবি নজরুল কে নিয়ে। নজরুল এর জন্ম থেকে মৃত্যু, গোটা জীবন। যা আবার জীবনী নয়। লেখক নিজেই বলেছেন কোনটা ইতিহাস আর কোনটা কল্পনা তা ঠিক করার দ্বায়িত্ব পাঠকের।
বই এ অবধারিতভাবেই উঠে এসেছে নজরুল সমন্ধীয় সবাই, সবকিছু অথবা সব না হলেও অনেকেই বা অনেক কিছুই। তবে নজরুল ই শুধু নয়, বই এর বেশ বড় অংশ জুড়েই আছেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, জসীমউদ্দিন, জীবনানন্দ দাশ, প্রমূখ তবে আলাদাভাবে নন, নজরুল এর সঙ্গে কেমন করে জড়ানো - সেভাবেই হয়েছে বর্ননা।
আপনি জানেন? কাজী নজরুল ইসলাম নামটি কার দেয়া? কিভাবে তারাক্ষ্যাপা হলো দুখু মিয়া, আর দুখু মিয়া নজরুল ইসলাম? এই ঘটনাবলী এবং নজরুলের শিশু কিশোর জীবন দিয়েই শুরু হয়েছে বইটি।
আছে বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠে এসে পালানো থেকে শুরু করে, কবির জেল জীবন, বিরজাসুন্দরীর সঙ্গে মা- ছেলে সম্পর্ক, আশালতা কে বিয়ে করে প্রমীলা দেবী বানানো, গিরিবালা দেবীর ত্যাগ, বিয়ের পরের প্রেম, নজরুলের টাকার অভাব কিংবা গ্রামোফোন রেকর্ড এর টাকা পেয়ে গাড়ি কেনা, অথবা কবির পাগলামি, অসুস্থতা, বাংলাদেশে আসা- এমন অসংখ্য ঘটনা, রটনার সম্মেলন এই বইয়ে।
এছাড়াও বই এ আছেন নজরুল এর অসংখ্য বন্ধু যেমন মুজাফফর আহমেদ, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, কাজী মোতাহার হোসেন। এছাড়াও বিভিন্ন বর্ননায় সত্যেন বোস, যাদুকর পিসি সরকার, বিভূতি-ভূষণ বন্দোপাধ্যায়, সত্যজিত রায়, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, অবন ঠাকুর সহ আরো নামীদামী ব্যক্তিদের খুঁজে পেয়েছি।
[বই পড়া শেষ করে লিখছি তাই হয়তো অনেক নাম বাদ পরতে পারে, সেজন্য দুঃখিত]
বইটিতে নেগেটিভ লেগেছে একটিই যায়গা, হ্যারি- পুঁটিরানী রসায়ন টা আমার কাছে ভালো লাগে নি। মনে হয়েছে অতো গুরুত্বপূর্ণ নয় হয়তো। এমন ও হতে পারে, আমি এদের সঙ্গে নজরুল কিংবা এই বই এর সম্পর্ক খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছি।
তবে যাই হোক, বইটিতে ইতিহাস আর কল্পনা মিশে ভালোই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে; লেখক যেমনটি চেয়েছেন। তবে আফসোস হয় নি, পড়তে গিয়ে হৃদয় ছুঁয়েছে, ভালো লেগেছে, আকর্ষণ করেছে। কবি নজরুল এর জীবন আর লেখকের কল্পনা এই দুই এ মিলে এক অসাধারণ উপন্যাস 'আমারে দেব না ভুলিতে'। আর প্রতি পাতায় বুঁদ হয়ে থাকা উপন্যাসে,সত্য মিথ্যার ফাঁরাক খোঁজার সময় কই?
আমি এখন আপনাদের যে গল্পটার খবর জানাতে যাচ্ছি সেই খবরটার সূচনা যেদিন হয়, সেদিন ছিল জ্যৈষ্ঠ মাসের ১১ (হিসাবে ১২ তারিখ হয়) তারিখ, ১৩০৬। ইংরেজি সাল হচ্ছে, ২৫ মে, ১৮৯৯। আর মাত্র কয়েক দিন পর শুরু হবে ১৯০০ সাল। এ সময়টা বড় বিচিত্র। এই সময়েই আমেরিকায় একটা মেশিন খুব জনপ্রিয় হচ্ছে। এই বিস্ময়কর মেশিনটির নাম- ইলেকট্রিক টাইপরাইটার।
ওই দিকে দুই ভাই আরেক কান্ড করেছে। এরাও আমেরিকান। বড় ভাইয়ের নাম অরভিল রাইট, ছোটজন উইলবার রাইট। তারা একটা বিশাল পাখাওয়ালা যন্ত্র বানিয়েছে। যেটা দিয়ে মানুষ পাখির মতো উড়তে পারবে। এত কিছু সত্ত্বেও পৃথিবীর অবস্থা ভালো নয়। যেকোনো সময় যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। পুরো দুনিয়া দুই ভাগ হয়ে যুদ্ধ করবে। এ ধরনের লড়াই এটাই প্রথম। এর নাম হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।
ঠিক সেইদিনই পৃথিবীর আরেক প্রান্তের এক গ্রামে তীব্র এক ঝড়ের তান্ডবে যখন চারপাশ কেয়ামতের দারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে মনে হচ্ছে, সেই সময়েই এলাকার হুজুর ফকির আহমেদের ছাদ উড়ে যাওয়া ঘরে জন্ম নিলো এক বলবান সুন্দর শিশু, যাকে বাবা ডাকতো তারাক্ষ্যাপা নামে, কিন্তু মায়ে আদর করে ডাকত নজর আলী নামে। অবশ্য এই দুই নামের পুরোটাই তার পরবর্তী জীবনে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো । বরং কিছুদিন পরেই সেই নামটা বলদে হয়ে গেলো দুখু মিয়া।
দুখু মিয়া খুবই প্রতীভাবান একজন ছেলে ছিলো, তার গানে মুগ্ধ হয়েই অন্ডাল এলাকার ঘোষ মশাই তাকে নিজের ঘরেই রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু দুখু মিয়া বড়োই অস্তির সে এক জায়গায় থাকার মানুষ না। একদিন সেখান থেকে পালিয়ে চাকরি নিলো রুটির দোকানে, সেখান থেকে তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে কাজী দারোগা ধরে নিয়ে গিয়ে ময়মনসিংহ এক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলো। অবশ্য সেখানেও দুখু মিয়া বেশিদিন স্থায়ী হলো না। একদিন নিজের নাম বলদে যোগ দিলো সেনাবাহিনীতে, এবার নাম রাখলো কাজী নজরুল ইসলাম।
হ্যাঁ, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথাই বলছি। বাংলা সাহিত্যের আকাশে এমন কিছু নাম আছে, যাদের দিকে তাকালে মনে হয় তারা শুধু লেখক নন, তারা ছিলেন এক যুগের আত্মা। কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই এক নাম। তিনি ছিলেন কবি, সৈনিক, সংগীতজ্ঞ, নাট্যকার, সম্পাদক, প্রেমিক, বিদ্রোহী সব মিলিয়ে এক জীবন্ত অগ্নিশিখা।
সেই অগ্নিশিখাটি যখন রণাঙ্গন থেকে ফিরে কলম হাতে তুলে নিলেন তখন তার কলম থেকে টাইটানিয়াম ভেদ করে ফেলার মতো শব্দবোমা যেমন বের হচ্ছিলো, ঠিক তেমনই বের হয়েছে হৃদয় জুড়ানো কবিতা, বেদানার গল্প, ছোটদের হৃদয় জুড়ানো ছড়া। কখনো কুকুরের তাড়া খেয়ে লিখেছেন,
বাবুদের তাল-পুকরে, হাবুদের ডাল-কুকুরে
কিংবা বাচ্চা মেয়ে পেয়ারা হাতে কাঠবিড়ালিকে ডাকতে দেখে কাঠবিড়ালি কবিতাই লিখে ফেলেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বড়োই অস্তির, উড়নচণ্ডী আর আড্ডাবাজ মানুষ। যিনি কলকাতায় পা রাখতেই মাতিয়ে ফেলেছিলেন সাহিত্যপাড়া। একদিকে একেরপর এক চমৎকার লেখা যেমন বের হচ্ছিলো ঠিক তেমনি চড়ুই পাখির মতো এখান থেকে সেখানে উড়ে বেড়াচ্ছিলো শহরের এ প্রান্তে থেকে ওপ্রান্তে। কখনো কখনো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে থিয়েটার দেখতে রাজুবালার কাছে যাওয়া হতো যেখানে রাজুবালার কন্যা ইন্দুবালার কন্ঠে গান পাখির কিচিরমিচির মতো মধুর হয়ে ধরা দিতো কানে। নজরুলের এমন উড়নচণ্ডী স্বভাবের জন্যই সে খুব কম সময়েই নুরু পাগলা নামে বেশ আলোচনায় উঠে গিয়েছিলো সাহিত্য পাড়ার সবার কাছে।
এই রাজুবালার সাথে ���ড়িয়ে আছে এক সার্কাস দলের গল্প, আছে হরিদাশ নামে এক ছোগড়ার কাহিনি যে ছেলেটা নাম বদলে ইংরেজ হতে চেয়েছিলো। চরম ভক্ত ছিলো মহারাণী ভিক্টোরিয়ার, যার মায়ের গল্পটাও পাঠককে মুগ্ধ করবে। সেই পুঁটিরাণীর সাথে কাজী নজরুল ইসলামের হয়তো সম্পর্ক নেই কিন্তু জীবন এমন এক গল্প যে গল্পের কোনো না কোনো পর্যায়ে না চেনা অনেক মানুষের সাথেই আমাদের গল্প পাশাপাশি অনেকদূর এগিয়ে চলে।
কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের সাথেও এমন অসংখ্য চরিত্রের গল্প জড়িয়ে গিয়েছিলো। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দিন এসব চরিত্রের সাথে কবির খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। এবং কী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কাজী নজরুল ইসলাম সেই সময়ে বেশ শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। কাজী নজরুল মোতাহার হোসেনকেও নিজের বন্ধুরূপেই গ্রহণ করেছিলেন।
কবি সাহিত্যকদের জীবনেও মাঝে মাঝে প্রেম আসে, কখনো আশীর্বাদ হয়ে, কখনো বা অভিশাপ হয়ে। নজরুলের জীবনেও প্রেম এসেছিলো, যতবার এসেছে ততবারই তার জীবনকে উলটপালট করে দিয়েছি। প্রথমবার সে প্রেমে পড়েছিলো কুমিল্লার নার্গিসের, যে প্রেম শিকল পরার গান হয়ে দংশন করেছিলো বলে পালাতে হয়েছিলো কবিকে। দ্বিতীয় বার অবশ্য প্রমীলা দেবিকে নিজের করে নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তৃতীয় বারের প্রেম কাঁটার মতো বিদ্ধ করে গেছে বাকি জীবন।
কাজী নজরুল ইসলামের জীবন বড়োই বিচিত্রময় ছিলো, উড়নচণ্ডী আর অস্তির এই মানুষটির কোনো কোনো কর্ম সম্পর্কে জেনে আনন্দিত হবেন তো কোনোটার জন্য পাঠকের হৃদয়ে জমবে মেঘ। এই যেমন কবিপুত্র বুলবুলকে হারিয়ে কবির মনের হাহাকার ছোঁয়ে যাবে পাঠককে। আবার কোনো কোনো ঘটনার, কথার কিংবা কাজের জন্য বড়োই অবাক হতে হবে। এ কি ইচ্ছাকৃত নাকি পাগল মনের অজান্তেই করা কোনো কর্ম বলে ভ্রম হবে।
দোষ গুনেই মানুষ, নজরুলও ঠিক তেমনই। তবুও লেখক আশীফ এন্তাজ রবি-র কলমে নজরুলকে আপনি আবিষ্কার করবেন নতুন ভাবে, ভিন্ন রুপে। যে নজরুল কখনো যাত্রাপালের সদস্য, কখনো সৈনিক, কখনো গায়ক, কখনো পিতা, কখনো স্বাধীনতার জন্য কারাগারে বন্দি রূপে। কিংবা কখনো কখনো আবিষ্কার করবেন সুরকার, গান রচয়িতা, আড্ডাবাজ কিংবা প্রেমিক রুপে।
আশীফ এন্তাজ রবি-র এ গল্প শুধু নজরুলের নয়, হয়তো সেখানে নজরুল খুব বিশাল পাতা জুড়ে দখল করে আছে। তবুও এ গল্প শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দিন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অসংখ্য বিখ্যাত মানুষের জীবনের মাঝ দিয়ে কিংবা পাশ দিয়ে চলা এক নদীর মতোই বয়ে গেছে। সেই নদীর কোনো কোনো প্রান্তে রাজুবালা, ইন্দুবালা, হরি দাশ, পুঁটিরানীরাও আছে, আছে এক কোণে পানের দোকানদার চুনিলালও। হয়তো অথটা প্রাসঙ্গিক নয় তবুও এদের জীবনও পাঠকের মনে দাগ কেটে রবে।
আমাদের কবি জীবনের বিশাল অংশই কেটেছে বড়োই কষ্টে, সেই ভালোবাসা আর ক্ষুধার কষ্টের কথা কবি একদিন ঢাকার রাতের অন্ধকারে কাজী মোতাহার হোসেন এর বাড়িতে মধ্য রাতে তাকে শোনাতে শোনাতে কেঁদে উঠেছিলেন। জীবনের এক বিশাল এই সংগ্রামী জীবনে কবির পাশে ছিলেন স্ত্রী প্রমীলা দেবি, শাশুড়ী গিরিবালা। কবির বন্ধুরাও নানান সময়ে এগিয়ে এসেছেন। তবুও শেষ জীবনে তার কথা বলতে না পারা, স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলার মুহূর্তগুলো লেখকের কলমে পড়ে মনটা বিষন্ন হয়ে উঠে। বুক ছিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। আহ! কবি বলে আফসোসে মনটা ভরে উঠে। বড়োই দুর্ভাগা কবি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
লেখক আশীফ এন্তাজ রবি-কে আমি ঠিক ভাবে চিনি না, তার লেখার সাথে পরিচয়ও হয়নি আমার। তবুও যে আবেগ দিয়ে লেখক উপন্যাসটা লিখেছেন, কালো অক্ষরে কবিকে 'আমারে দেব না ভুলিতে' বইয়ে ধারণ করেছেন তা পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এই বই হয়তো আমি আবার পড়বো, আরো বহুবার পড়বো। আমাদের নুরু পাগলার জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে বইটিতে উপভোগ করতে গিয়ে তৃষ্ণা মেটার চেয়ে বরং আরো বেড়ে গেছে। এ তৃষ্ণা একবার পড়ে মেটার নয়।
এই গল্প নজরুল হয়তো বিশাল অংশ জুড়ে আছে, তবুও লেখক সেই অংশের ফাঁকে ফাঁকে আরো যে বিখ্যাতদের ঠাঁই দিয়েছেন তা আমাকে বড়োই আনন্দিত করেছে। শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ আর রবিঠাকুরের শেষ মুহূর্তকেও লেখক এই গল্পে ঠাঁই দিয়েছেন তাদের সেই জীবনের এক ঝলক লেখক বইটিতে তুলে দিয়েছেন। সেই সব গল্প পড়েও মুগ্ধ হয়েছি। কখনো কখনো হয়তো রাজুবালার থিয়েটারের গল্প বিরক্ত করেছে তবুও শেষে এসে এক বিষাদগ্রস্ত মন নিয়ে বলতে হয় অনেকদিন পর হৃদয়ে দাগ কেটে যাওয়া একটা বই শেষ করলুম।
বইটি পড়লেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগবে এসব কাহিনি কী আধো সত্যি নাকি কল্পনা, লেখক অবশ্য বলে দিয়েছেন সত্য আর কল্পনা এখানে মিশেছে। তার সেই সত্য মিথ্যার প্রমাণ তিনি শেষে নানান রেফারেন্সের তালিকায় খুঁজে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমার মনে অবশ্য সত্য মিথ্যাকে ছাড়িয়ে এই উপন্যাস জুড়ে বিচরণ করা নজরুলের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই দাগ কেটে গেছে। একটা বিষন্ন হৃদয়ে বইটি শেষ করে বলতে হয় এই বই আসলেই চমৎকার। যারা ভালো বই খুঁজেন তাদের জন্য এই বই একটা রত্ন হয়ে ধরা দিবে। যে রত্নের মাঝখানে আসন পেতে আছে আমাদেরই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
বইটি নিয়ে এতো কথা লেখার পরও আমার মনে হচ্ছে খুব কমই প্রশংসা করা হয়েছে। এমন চমৎকার বইয়ের জন্য লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ।
নজরুল সর্ম্পকে লিখা অনেক বড় সাহসিকতার পরিচয়। আর সেটা করে দেখিয়েছেন লেখক। নজরুল যেমন প্রকৃতির লোক ছিলেন তাতে উনাকে নিয়ে কিছু লেখা বেশ কষ্টসাধ্য, এবং রীতিমত দুরহ ব্যাপার ছিল।
"আমারে দিব না ভুলিতে" মূলত আত্নজীবনী ভিত্তিক উপন্যাস। যেখানে নজরুলের জন্ম থেকে শুরু করে , তার বেড়ে উঠা, নিজেই নিজের নাম পরিবর্তন করা, তারাক্ষ্যাপা থেকে দুখু মিয়াঁ, হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম থেকে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হয়ে উঠা, বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে আসা,পরবর্তীতে অন্য ধর্মের মেয়েকে বিয়ে করা করা নিয়ে বিভিন্ন মহল হতে তিরস্কার, মুসলিম সমাজ "কাফের" নামে সম্মোধন করা। কর্ম জীবন, বে-হিসাবি জীবনযাপন, দেবদাসের স্রষ্টা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জসীম উদ্দীনের সাথে সখ্যতা। প্রিয় পূত্র বুলবুলের মৃত্যু, এবং শেষে অর্থ কষ্টে নিজের এবং প্রমীলার চিকিৎসা করাতে না পারা। আমাদের জাতীয় কবি হয়ে উঠা, গৃহহীন নজরুলকে সরকার থেকে আবাস্থল উপহার দেওয়া,এবং মৃত্যু অবধি বিভিন্ন বিষয় তুলেধরা হয়েছে।
নজরুল সম্পর্কে জানতে হলে অবশ্যই বইটি পড়তে হবে। লেখকের লেখনশৈলি আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কে নিয়ে এত বিষদ ভাবে কোন উপন্যাস লেখা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।কিছু কিছু জেনেছি উনাকে নিয়ে বুদ্ধদেব বসু বা প্রতিভা বসুর বই থেকে যা আসলে কবির জীবন কে পুরোপুরি তুলে ধরেনা,নিতান্তই টুকরো ছবি পাওয়া যায় মাত্র।"আমারে দেব না ভুলিতে'- লেখক আশীফ এন্তাজ রবি।এই বইটি আমার সব অপূর্ণতা পূরন করেছে বলা যায়। বইটি একটানা পড়ে মনে হলো চোখের সামনেই কবির জীবন চলছে,বোধ হয় সব দেখতে পাচ্ছি-এত টাই জীবন্ত এই উপন্যাস টি। অনেক ধন্যবাদ রবি ভাইয়াকে,কখন ই উনি নিরাশ করেন না পাঠক কে,এবারো করেন নি।একটি অবশ্য পাঠ্য উপন্যাস য��র সাথে কল্পনার কিছু মিশেল আছে আর আমার কাছে এই জন্য বইটি আরো বেশি উপভোগ্য হয়েছে। " আমারে দেব না ভুলিতে" - ভোলা যায়না আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কে,ভোলা যাবেনা এই উপন্যাস টি ও।
জন্মের পর পিতা নাম দিলেন তারাক্ষ্যাপা,মা ডাকতেন নজর আলী বলে,ভাইয়ের দেয়া নাম দুখু মিয়া।তবে আমরা তাকে চিনি তার নিজের দেয়া নাম 'নজরুল' বলে।নামের মতই নজরুলের জীবনে নারীসঙ্গের কখনো অভাব হয়নি।স্বেচ্ছাচারীতা আর একগুয়েমিতার দিক দিয়ে হয়তো অন্য যেকোনো বাঙালী সাহিত্যিককে তিনি ছাড়িয়ে গিয়েছেন। পাগলামি,প্রেম,প্রণয়, বিদ্রোহ আর জীবন সংগ্রাম নিয়ে প্রায় সাড়ে তিনশ পৃষ্টার এত সুন্দর একটা উপন্যাস নজরুলকে নিয়ে আগে সম্ভবত লেখা হয়নি। নজরুল উপন্যাসটির মূল চরিত্র হলেও জসীম উদদীন,শরৎচন্দ্র,রবীন্দ্রনাথ,জীবনানন্দ,বিভূতিভূষণ সহ আরো সমসাময়িক সাহিত্যিক,রাজনীতিকরাও কাহিনীর ধারাবাহিকতায় উঠে এসেছেন।নজরুলকে নিয়ে কল্পনা আর বাস্তবতার মিশেল দিয়ে লেখা উপন্যাসটি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ে ফেলার মতনই।
আমার মতে বই খুবই কম পড়ি। আমার বই পড়ার একটা ধরণ হচ্ছে কোন বই প্রথম ১০ পৃষ্ঠা পড়ে যদি আমার কোন আগ্রহ না তৈরী হয় আর বাকিটা পড়ার তাহলে সেই বই আমি আর কখনোই পড়িনা, আর ভালো লাগলে যতো সময় ই লাগুক সেই বই আমি এক বসাতেই শেষ করি। এই অভ্যাস টা ভালো নাকি খারাপ তা আমি জানিনা। আশীফ এন্তাজ রবি এমনই একজন লেখক যার লেখা, গল্প বলা আমি অনেক ভালোবাসি! তার লেখায় আমার বই পড়ার এই চাহিদা পূরণ হয়। এর আগে তার লেখা পূর্বপুরুষ বইটি ছিল এক কথায় অসাধারণ! সেটি আমি পুরো এক রাত না ঘুমিয়ে টানা পড়ে শেষ করেছিলাম। এবছর ও যখনই নতুন বই ' আমারে দেব না ভুলিতে' প্রকাশের ঘোষণা আসে খুবই Excited ছিলাম। রকমারি থেকে প্রথমেই প্রী- অর্ডার করে ফেলি ( আমার একটি সৌজন্য কপি পাওয়ার কথা ছিল এতোটাই Exited ছিলাম তার অপেক্ষা করতে পারিনি)। বই এর সাথে ছিল দুটি অমূল্য জিনিস! ১ টি নজরুল টুপি! ২য় টি কবি নজরুল এর কিছু দুষ্প্রাপ্য ছবি! পাঠক আকৃষ্ট করার জন্যেই হোক কিংবা লেখকের অন্য কোন উদ্দেশ্য উপহার গুলো দারুন ছিল । 'আমারে দেব না ভুলিতে' উপন্যাসটি পড়া শেষ করেছিলাম অনেক আগেই কিন্তু ব্যস্ততার জন্য কিছু লেখার সময় হচ্ছিলো না, সাড়ে তিনশ পেইজের উপন্যাসটি শেষ করে মনে হচ্ছে, বইটি নিয়ে না দুয়েক কথা না বললে ভেতরের খচখচানিটা থেকেই যাবে। বইটি কবি নজরুল ইসলামের কাল্পনিক জীবনী। এটিকে আসলে জীবনিও বলা যায় কল্পনা ও বলা যায় কল্পনা ও বাস্তবতার যে সংমিশ্রণ লেখক তার লেখায় ঘটিয়ে থাকেন, মনে সবকিছুই সত্য এবং যেন সব কিছু আমার সামনেই হচ্ছে। লেখক এই কাজটি অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে করতে পারেন যা তিনি এর আগেও তার পূর্বপুরুষ উপন্যাসে করেছেন। এখানে গল্পের নায়ক বা জাকে নিয়ে লেখা তিনি আমাদের প্রিয় কবি নজরুল কিন্তু এখানে একটা গল্প বলা হয়েছে । তাতে কাজী নজরুল ইসলাম এসেছেন, তার হাত ধরে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জসীমউদ্দিন। আরও এসেছেন জাদুকর পিসি সরকার, কাননবালা থেকে শুরু করে এক প্রজন্মের সমস্ত রথী-মহারথী। পুরো বইটি অ-অনুমেয়। কখন যে কি হবে কে আসবে তা একেবারেই অনুমান করা যায় না। নজরুল এর জীবন একেবারেই আনপ্রেডিক্টেবল!
উপন্যাসের গল্পটা শুরু হচ্ছে এক পুকুরপাড় থেকে। পুকুরের ধারে বসে আছেন ফকির আহমেদ। ফকির আহমেদ আবার স্থানীয় মসজিদের ইমাম। সংসারটা তার টানাপোড়েনেই চলে।
এরই মধ্যে দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে আসে সন্তান। এর আগেও চারবার সন্তান জন্ম দিয়েছেন তিনি, কিন্তু তাদের কাউকেই পৃথিবীতে ধরে রাখা যায়নি খুব বেশিদিন। তাই পঞ্চমবার স্ত্রীর গর্ভে সন্তান এলে ফকির আহমেদ পরামর্শ হাতড়ে বেড়ান এখানে-সেখানে। কেউ বলেন, শ্রুতিমধুর নাম শুনলে আজরাইলের দৃষ্টি সহজে আকৃষ্ট হয়। এ জন্য সন্তানদের নাম রাখতে হয় উল্টাপাল্টা। পাশের শহরের এক সন্ন্যাসী তাকে জানান, এইবারও ছেলে হবে। এই ছেলে বাঁচবে। সন্ন্যাসীর কথায় ভরসা পেয়ে ফকির আহমেদ সিদ্ধান্ত নেন, ছেলে হলে বামাক্ষ্যাপা সন্ন্যাসীর সঙ্গে মিলিয়েই রাখা হবে ছেলের নাম, তারাক্ষ্যাপা।
উপন্যাস আবর্তিত হচ্ছে এই তারাক্ষ্যাপাকে ঘিরেই। এই তারাক্ষ্যাপাই আবার কিছুকাল পরে যান দুখু মিয়া, ততদিনে বাস্তবতার পাঠ অনেকটাই জেনে গিয়েছে সে। মক্তবে পড়ার বয়সে আজান দিয়েছে মসজিদে, রাতে চাচার সঙ্গে লেটোর দলে গান গেয়েছে। বয়স নয় না পেরোতেই হারিয়েছে বাবাকে, মা ফের বিয়ে করেছেন চাচাকে। তিনি আসলেই দুঃখী বটে।
এই দুখু মিয়াই পরবর্তীতে পরিচিতি পায় কাজী নজরুল ইসলাম নামে যে নামখানা তিনি নিজেই নিজেকে দিয়েছেন কেননা তিনি মনে করেছেন আরেকজন এর দেওয়া নাম সারাজীবন বয়ে চলার কোন মানে হয় না!
নজরুল এর জীবন ছিল বেদনাবিধূর! ৯ বছর বয়েসে সে তার বাবাকে হারিয়েছে, মা তার আপন চাচার সাথে বিয়ে করায় তিনি অভিমানে সেখান থেকে চলে আর সেথায় যাননি। এরপর স্টেশনে এক ধনী মাতাল এর সাথে পরিচয় হয় তার কোন এক বিশেষ কারণে মাতালরা হয়তো মায়াময় হয়। তার সাথে তিনি নজরুলকে তার বাড়িতে নিয়ে যান সেখান নজরুল চাকরি পায় বাড়ীর এক প্রকার কেয়ারটেকার হিসেবে দিনে বাড়ির গিন্নীর কাজে সাহায্য আর রাত্রিবেলা মাতালটাকে স্টেশন থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ী নিয়ে আসা এবং গান শোনানো। এরপর নজরুল সেখান থেকে চাকরি ছেড়ে কাজ নেন একটি হোটেলে রুটি বানানোর। নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তিনি একটাসময় অনেক ভালো ছাত্র হাওয়া সত্যেও হঠাৎ করে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে অংশ নেবার জন্য তিনি সিপাহী হিসেবে যোগদান করে চলে যান করাচিতে। করাচিতে থেকেই তিনি তৎকালীন সময়ে কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা পাঠাতেন এবং তা ছাপাও হতো। নজরুল এর জীবন একেবারেই আনপ্রেডিক্টেবল! একবার তিনি কুমিল্লায় বিয়ের আসর ছেড়ে অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবেই পালিয়ে যায়, এখানে তার স্বার্থপরতারই প্রমাণ দিয়ে যেন।
নজরুল একটি বেহিসেবী চরিত্র, সরলমনা প্রকৃতি তাকে অভাব-দারিদ্যের মধ্যে রেখেছিল হরদমই। আর সবখানেই তার উড়ুক্কু মনের একটা ছাপ পাওয়া যায়, দুখু মিয়াকে এক জায়গায় স্থির হয়ে জমে থাকতে দেখা যায়নি কখনোই। পত্রিকায় লেখালেখি করে করে জীবনটা একঘেয়ে হয়ে গেছে? আগু-পিছু না ভেবে সঙ্গে সঙ্গে বিদায় বলে দিয়েছে সে কাজকে। দুখু মিয়ার এই অস্থিরমতি স্বভাবটিও লেখক আশীফ এন্তাজ রবি তার লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন যথেষ্ট সার্থকতার সঙ্গে।
নজরুল এর জীবনে প্রেম এসেছে বহুবার! কখনো সৈয়দা খানম ওরফে নার্গিস, কখনো আশালতা সেন ওরফে প্রমীলা, কখনো ফজিলাতুন্নেসা, কখনো ইন্দুবালা, কখনোবা কাননবালা; নজরুলের জীবনে নারীর আগমন ঘটেছে প্রচুর। প্রত্যেককেই যতক্ষণ সে ভালোবেসেছে, উজাড় করেই বেসেছে। লেখক মোতাহের হোসেন কে ফজিলাতন্নেসা র জন্য লেখা একটি চিঠি পাওয়া যায় যেখানে নজরুল লিখেছিলেন তার অনেক কষ্টের অনুভূতি!
নজরুল বিয়ে করেছেন এক হিন্দু রমণীকে, আর তার জন্যে দু'ভাগ হয়ে গিয়েছে তৎকালীন হিন্দু-মুলমানেরগোটা অঞ্চল, এমনকি কিছুটা উত্তম-মধ্যমও হজম করতে হয়েছে নজরুলকে, এসব ঘটনার উল্লেখ করে লেখক এ অঞ্চলের মানুষদের ধর্মীয় উগ্রতার দিকেই ইঙ্গিত কর���ছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পাওয়া গিয়েছে ব্যাপকভাবে। তিনি কখনো যাচ্ছে আর্জেন্টিনায়, যেখানে মিলছে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে তার সখ্যতার বিবরণ। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজেই হয়ে গিয়েছিলেন দেবদাস নজরুল এর জীবনে তারও ছিল ভূমিকা। জীবনানন্দ দাশ ট্রামের তলায় চাপা পড়ার আগে চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছেন অনেকবার, যেন মৃত্যুর জন্যেই অপেক্ষা ছিল তার।
এর বাইরে জসীমউদ্দিন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্তিত্বও পাওয়া গিয়েছে উপন্যাসে। এত এত চরিত্র নিয়ে লেখা সত্যেও কোথাও লেখকের কোন দুর্বলতার ছাপ পড়েনি চোখে।
আশীফ এন্তাজ রবি'র আমারে দেব না ভুলিতে বাংলা ভাষায় একটি অসাধারণ সৃষ্টি!
নজরুল ইসলামকে কেন্দ্রকরে লেখা উপন্যাসে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছাড়াও জড়িয়ে আছে তৎকালীন সময়ের নানা ঘটনা। ফুটে উঠেছে তখনকার আরও কয়েকজন খ্যাতিমান লেখকের জীবন, নজরুলের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতা। ঐতিহাসিক পটভূমি যাদের পছন্দের বিষয় তাদের জন্য এই বই বোধকরি অবশ্যপাঠ্য৷
"আমার ব্যাথার রক্তকে রঙিন খেলা বলে উপহাস যিনি করেন, তিনি হয়তো দেবতা-আমাদের ব্যাথার অশ্রুর বহু উর্ধ্বে। কিন্তু আমি 'মাটির নজরুল' হলেও সে দেবতার কাছে অশ্রুর অঞ্জলি আর নিয়ে যাবো না।" মোতাহের হোসেনকে লেখা কাজী নজরুল ইসলামের চিঠির একাংশ।
ছোটবেলায় আমার একটা কবিতার বই ছিলো। সে বইটি থেকে আমি বিভিন্ন কবিতা পড়তাম। পড়তে পড়তে আবৃত্তি করে করে মুখস্ত করে ফেলতাম। সেখানকার লিচু-চোর আর কাঠবেড়ালি কবিতা দুটো আমার সবথেকে পছন্দ ছিলো। বাবার কন্ঠ ধরে ধরে সে কবিতাগুলো আবৃত্তি করা শেখা। আর সেখান থেকেই আমি চিনেছি কাজী নজরুল ইসলাম কে। "বল বীর, বল উন্নত মম শীর" কবিতার ঝংকার আমার হৃদয় কে নেড়ে বিখন্ড করে ফেলেছিলো। কবিতার তেজ আমায় স্পর্শ করতো। ছোটবেলায় কবিতা প্রীতির পাশাপাশি সংগীত আমায় ছুয়ে যেতো। আমার বাবার কন্ঠে নজরুল গীতি শুনে বড় হয়েছি। সে গানের কথাগুলো বরাবর ই আমায় ছুয়ে যেতো। আমি নজরুল কে কল্পনা করেছি আমার মনের মত করে তার লেখা দিয়ে। তার বিদ্রোহ, রোমান্টিজম, শিশুতোষ স্নেহময় মানুষ হিসেবে নজরুলকে পেয়েছি। আজ, যখন আমার হাতে আশীফ এন্তাজ রবির লেখা "আমারে দেবো না ভুলিতে" এবং আমি যখন বইটির শেষ পাতা উলটে বইটি বন্ধ করলাম, মনে হলো আমার শৈশব পূর্নতা পেলো। তবে আমার হৃদয় ভরে গেলো জীবনের ইতির ক্রুঢ়তায়, যার কাছে সবাই, এমনকি কাজী নজরুল ইসলাম ও হার মেনেছিলেন।
বিদ্রোহী বজ্রকন্ঠধারী নজরুলের শৈশব কৈশোর যতটা বৈচিত্র্যময়, তার যৌবন ততটাই অস্থিরতাময় আর বার্ধক্য ততটাই ক্রূঢ়তাময়। প্রতিটি লেখকের জীবনের বৈচিত্রতা তার লেখনিকে দৃঢ় করে, দান করে এক অসম মাত্রা। নজরুলের জীবন সেক্ষেত্রে ছিলো উপযুক্ত। জ্ঞানের ক্ষুরধার আর সৃজনশীলতার মাত্রা, সবটার পরিমান তার মাঝে ছিলো একদম সঠিক রূপে। তবে প্রতিটি প্রতিভার মাঝেও নজরুলে সদাহাস্যজ্বল আর মিশুক স্বভাব তাকে মানুষ হিসেবে অনন্য করে তুলেছিলো। তার এই ব্যাক্তিত্বের কারনেই তিনি যেনো আরো অনেকাংশে নজরুল হয়ে উঠেন।
বাবা যদিও নাম রাখেন তারাখ্যাপা, তবে নিজেই নিজের নাম দিয়ে সে নাম ইতিহাসের পাতায় লিখে রেখে যান। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই নজরুলের লেখায় দেখেছিলেন ভবিষ্যতের কোনো উজ্জ্বল নিদর্শন। ছটফটে প্রজাতির এই মানুষটি যেমন ছিলেন লেখায় সেরা, তেমনি গানের কন্ঠেও ছিলেন অনন্য। তার গান লেখার, সুর করার ও গাওয়ার দক্ষতায় স্বয়ং দিলীপ কুমার ও নস্যি ছিলেন। নজরুলের কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত মানাতো ও বেশ, রবীন্দ্রনাথের ও বেশ পছন্দসই ছিলো সেটা। তবে তার ভুলোমনের দরুন অনেক মানুষের বিরাগের কারন ও ছিলেন তিনি। সংসারের বিমুখতার কারনে তার আশেপাশের মানুষ বরাবরই ভোগান্তির কারন হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে তাহার সহধর্মিণী প্রমীলার যন্ত্রনা ও ক্লেষ অবর্ননীয়। জীবনে সুখ দেখতে পাননি তেমন, তবে তিনি স্ত্রী হবার প্রতিটি দায়িত্ব শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত চালিয়ে গেছেন। সংসার কে চালিয়ে গিয়েছেন সবটা দিয়ে। তার বন্ধুবান্ধবেরাও সবসময় তাকে চেষ্টা করেছেন জীবনে ভালোভাবে যেনো চলতে পারুক সে।
তবে নজরুলের বাকরুদ্ধতা, অর্থাৎ তার অসুস্থতায় প্রমানিত হয় মানু্ষ কতটা একা। সবথেকে প্রয়োজনের সময় ভক্তকূলের কাছ থেকে নিরবতা বৈ কিছুই পাননি তিনি। তার অসুস্থতায় তিনি হয়ত অভিযোগ করেছেন সেই সকল মানুষের প্রতি, যা আমাদের অজানা। তিনি নিজের মানসিক ভারসাম্য হারান এবং ধীরে ধীরে হারিয়ে যান নক্ষত্রের ভীড়ে। একজন নজরুল হয়ে জ্বলে রবেন তারার ভীড়ে সর্বদাই।
আমারে দেবো না ভুলিতে বইটির আলোচোনায় যেতে গেলে প্রথমেই আমাদের বলতে হবে কবি নজরুলের কথা। বইটির মূল কথা একজনের জীবনের গল্প। তার জীবনের গল্পের পাশাপাশি আরো অনেক মানুষের গল্পই এখানে বলা হয়েছে স্বল্পভাবে যারা নজরুলের জীবনে অল্প হলেও জড়িত ছিলেন। তাদের জীবন ভিম্ন খাতে প্রবাহিত হলেও তাদের প্রভাব ও নজরুলের জীবনে তাদের উপস্থিতি বেশ সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। লেখকের সামঞ্জস্যতা এবং ভাবগাম্ভীর্যতা বেশ চমৎকার ছিলো। এছাড়া গল্পে লেখকের কাল্পনিক মিশ্রন বেশ সুন্দর গোছানো ছিলো। ভুল ত্রুটি থাকলেও আমার স্বল্পজ্ঞানে সেটি ধরা পরেনি। আমার জন্য এটি নজরুলের জীবন নিয়ে লেখা একটি অন্যতম বই।
বিশেষ ভাবে বলতে চাই লেখকের লেখনি নিয়ে। একটি গল্প বলা, গল্পকে শেষ পাতা পর্যন্ত পাঠককে বলে যাওয়া এবং তাকে আকর্ষণ দিয়ে ধরে রাখাটা কষ্টসাধ্য কাজ যা তিনি বেশ সাবলীল ভাবে সম্পন্ন করেছেন। আশীফ এন্তাজ রবি সাহেব এর প্রতি আমার সম্মান রইলো, যিনি এমন কষ্টসাধ্য একটি কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। প্রতিটি মানুষের এই বইটি পড়া উচিত। নজরুল আমাদের জাতীয় কবি, অন্তত সে দোহাই দিয়ে হলেও নজরুল কে জানা উচিত সবার। লেখকটি সময়ের স্রোতে যে গুরুত্বের যোগ্য ছিলেন সেটি যেনো কখনোই তার জুটে নি। তবে নজরুলেরা একবারই জন্মগ্রহন করে।
বইয়ের ছবিগুলো নজরুলের সমাধিস্থলে তোলা। আমার ইচ্ছে হলো নজরুলকে নিয়ে লেখা বই খানা তার প্রাঙ্গনে স্থান পাক।
লাইনগুলো পড়ার পর যে কারো গায়ে শিহরণ জাগিয়ে দেয়ার কথা! এ লাইনগুলো তো বিদ্রোহী কবির মগজ থেকে নিঃসৃত অগ্নি ঝরা পঙ্গক্তির একাংশ। তিনি আমাদের ছোট্ট স্বাধীন ভূখন্ড বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ছোটবেলা থেকে অল্পবিস্তর আমরা শুধু তার সাহিত্য খ্যাতি ও অর্জনের সাথেই পরিচিত হয়েছি। এই পরিসীমার বাহিরে ব্যক্তি নজরুল পর্দার আড়ালেই রয়ে গেছে। নজরুলের সাহিত্য খ্যাতি আর অর্জনের গন্ডি পেরিয়ে ব্যক্তি নজরুলের উপর ফোকাস দিয়ে এই পর্দা উন্মোচন করেছেন লেখক আশীফ এন্তাজ রবি তার লিখিত ‘আমারে দেব না ভুলিতে’ বইটিতে।
জন্মের পর বাবা নাম ��েখেছিলেন তার��ক্ষ্যাপা। মা সম্বোধন করতেন নজর আলী বলে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা আবার বিয়ে করলে অভিমানে সব ছেড়ে ছুড়ে বেরিয়ে পরেছিলেন নজরুল। এভাবে প্রায় সময়ই নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে পড়তেন তিনি। এসময় তার নাম হয়ে যায় দুখু মিয়া। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক হিসেবে হাবিলদার পদে যোগদান করেন। হাবিলদার থেকে ‘বিদ্রোহী' কবিতা লিখে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন অবিভক্ত ভারতের বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। এরপর অনেক চরাই উতরাই পেরিয়ে সদ্য স্বাধীন ভূখন্ডের জাতীয় কবির মর্যাদা লাভ করেন। ডক্টর অফ লেটার্স (ডি. লিট) উপাধিতেও ভূষিত হন তিনি। ছোট্ট তারাক্ষ্যাপা থেকে বিদ্রোহী কবি এরপর একটি দেশের জাতীয় কবি হয়ে উঠার জার্নিটা খুবই সহজ স্বাভাবিক লেখায় বর্ণনা করা হয়েছে এ বইয়ের প্রতিটি পাতায় পাতায়।
নজরুল শুধুমাত্র একজন সাহিত্যিক ছিলেন না। তিনি একজন গীতিকার হিসেবেও সমাদৃত ছিলেন। ছোটবেলায় নজরুল দিনের বেলায় মসজিদে আজান দিয়েছেন আর রাতে চাচার সাথে লেটোর দলে পালাগান করে বেড়িয়েছেন। তার লেখা গানে মুদ্রার এপিঠে বিদ্রোহী সত্তার প্রতিফলন দেখতে পাই আমরা। মুদ্রার উল্টোপিঠে আবার শব্দের কোমলতা আর বিরহের পরশে মন জুড়িয়ে দেয় আমাদের।
বরেণ্য অনেক ঐতিহাসিক চরিত্রের আগমন হয়েছে কবি নজরুলের ফিকশনাল বায়োগ্রাফিতে। এদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যক্ষ ভাবে নজরুলের লাইফস্টাইলের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। কেউ কেউ এসেছেন কালের সাক্ষী হয়ে। কাহিনী বর্ণানায় অপ্রয়োজনীয় হলেও কোথাও ছেদ পড়েনি ঐতিহাসিক এ চরিত্রগুলোর আগমনে। বরং উপন্যাসের আবহকে আরো জমজমাট করেছেন এই রথী-মহারথীগণ।
বিংশ শতাব্দীর বাঙালির মননে কাজী নজরুল ইসলাম ব্যাপক গুরুত্ব এবং প্রভাব বিস্তার করেছেন। তার মানবিকতা, ঔপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধতা বোধ এবং নারী-পুরুষের সমতার বন্দনা গত প্রায় একশত বছর যাবৎ বাঙালির মানস পীঠ গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে।
অস্থিরতা ও বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন মানুষ সম্পর্কে গল্পের আদলে প্রায় সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার বইটা পড়ে বিন্দু পরিমাণ বিরক্ত লাগেনি আমার কাছে। বইটা লিখতে লেখকের প্রচুর রেফারেন্স ঘাঁটাঘাঁটি করার ব্যাপারটা অস্বীকার করার উপায় নেই। পড়লেই এ ব্যাপারে অবগত হওয়া যাবে। ইতিহাস ঘেঁটে ছড়ানো ছিটানো তথ্য উপাত্ত থেকে গুছিয়ে ফিকশন লেখাটা টাফ। এই দুর্বোধ্য বিষয়টাকে সহজ করে চিত্রিত করা হয়েছে এই বইয়ে। এতে করে খুব সহজেই ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো মথায় গেঁথে যায় অনায়াসেই। লেখকের বর্ণনা কৌশল ও উপস্থাপনা এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তবে প্রতিটা ঘটনার বর্ণনার সাথে পৃষ্ঠার নিচের দিকে রেফারেন্স হিসেবে টীকা দিয়ে দিলে একেবারে পারফেক্ট হতো আমার মতে। লেখকের এই কাজটি পরিশেষে বাংলা সাহিত্যের একটি অবিস্মরণীয় কাজ হিসেবে আখ্যায়িত হবে বলে আমি মনে করি।
আশীফ এন্তাজ রবি সমসাময়িক সময়ে আমার সবচাইতে প্রিয় লেখকদের একজন। তার লেখা উপন্যাস "পূর্বপুরুষ" ইদানীংকালে পড়া আমার প্রিয় ফিকশন বইগুলোর একটি । তবুও কেন যেন আমারে দেব না ভুলিতে পড়ে তেমন যুত করে উঠতে পারিনি। গুডরিডসে এই বইয়ের যে চমৎকার রেটিং তা দেখে দ্বিধায় পড়ে গেলাম, ঠিক কেন এমনটা হল? এক হতে পারে যেহেতু ব্যক্তিগত জীবনে উত্থানপতনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি সেজন্য ঠিক কানেক্ট করে উঠতে পারিনি (ব্যাপারটা অসম্ভব নয়, ১২ই আগস্ট থেকে ২৩শে ডিসেম্বর, চারমাসের বেশি লাগিয়ে এই বই শেষ করার কথা না)। তবে আমার কাছে লেগেছে সমগ্র বইটাই যেন এই দোষে দুষ্ট, কেন যেন ঠিক সেই "কানেকশনটা" অনুপস্থিত। এক চ্যাপ্টার থেকে আরেক চ্যাপ্টারে, এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে, এক চরিত্র থেকে আরেক চরিত্রে। কেন যেন মনে হয়েছে খুব তারাহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে এই বইয়ের কাজ। শুনেছি নজরুল ইসলামের জীবনটাও নাকি এমনই ছিল, অস্থির, অগোছালো, অচিন্তনীয়। তবে আমি তো নজরুলের জীবনী পড়ব বলে এই বই হাতে নেই নি। পূর্বপুরুষ বইয়ের লেখক নজরুল ইসলামের জীবনের কাহিনীকে সঙ্গী করে উপন্যাস লিখছেন, সেজন্য বসেছি! আমার মতে কাজী নজরুলকে এই বইয়ে মোটামুটি সুপারহিরো হিসেবে দেখানো হয়েছে। সমস্যা হল আমি তো ব্যাটম্যান, সুপারম্যান না, আমারে দেব না ভুলিতে পড়তে নিয়েছি! আর ঠিক সেখানেই আমি কিছুটা হতাশ।
এটুকু সরিয়ে রাখতে পারলে বইটা যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং, কাজী নজরুল ইসলামের জীবনটাই তো এক অদ্ভুত চিত্রনাট্য! তার জন্ম থেকে শুরু করে পিতাকে হারানো, তার মা থেকেও না থাকার মত করে বড় হয়ে উঠা, গ্রাম থেকে শহরে আসা, জীবনযুদ্ধ সবই আছে এই প্রায় সাড়ে ছিনশ পৃষ্ঠা ছুঁইছুঁই বইয়ে। আছে তুখোড় প্রতিভাধর মানুষগুলো কীভাবে ভাতের কষ্টে জীবন কাটায় সে গল্প। অবধারিতভাবেই আছে তার কুমিল্লায় কাটানো সময়গুলো, আছে নার্গিসের কথা, প্রমীলার কথা, গিরিবালা দেবীর কথা। যেখানে আজকেও কেউ এমনটা করতে ভয় পাবে সেখানে আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগেও সেই গোঁড়া সমাজে কীভাবে কবি জাত ধর্মের উর্ধ্বে উঠে হিন্দু-মুসলিম বিয়েকে সম্ভব করেছিলেন, আপন করে নিয়েছিলেন মনের মানুষকে, আছে সেই গল্পও। কবি কাজী নজরুল ইসলাম যে সময়ে এই ভূখণ্ডে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, একই সময়ে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ, জসীমউদ্দীনের মত নক্ষত্ররাও বাংলার মাটিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, করছেন লেখালিখি। সময়টা আসলে কেমন ছিল? তার কিয়দাংশও তুলে আনা হয়েছে এই উপন্যাসে।
আশীফ এন্তাজ রবির লেখার বিশাল ফ্যান আমি সে তো আগেই বলেছি। প্রচন্ড খেটেখুটে লেখা এই বইয়ে আশ্চর্যজনকভাবে উনি সবচাইতে ভালো লিখেছেন শেষ সময়গুলো, মৃত্যদৃশ্যগুলো, অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়েছে! হোক তা শরৎচন্দ্রের, রবীন্দ্রনাথের কিংবা নজরুলের, সবগুলো শেষ দৃশ্যই হৃদয়কে আর্দ্র করার ক্ষমতা রাখে। আর তাই বইয়ের বাকি অংশ যেমনই লাগুক, শেষদিকে এসে তা মনে দাগ কেটে যায়। শেষ দিকে এসেই মনে হয় নাহ, এই তো আশীফ এন্তাজের লেখা পড়ছি!
"আমারে দেব না ভুলিতে" প্রেক্ষা by রাফসান কাদেরী ------------------------------------ *শুধু সমালোচনা যারা পড়তে চান, একেবারে নিচে চলে যান, প্রথমটুকু না পড়লেও চলবে*
বইটি হাতে পাওয়ার সাথে সাথে তোখড় একটা ছবি তুলে দুঃখী সমাবেশ গ্রুপে পোস্ট দিয়ে দিলাম। ছবিটি হঠাৎ দেখলাম লেখক আশীফ এন্তাজ রবি'র পেজে স্পনসরড হয়েছে, ব্যাপারখানা উল্লেখযোগ্য। আপনারা কার রিভিউ পড়ছেন তা জানা উচিৎ। এবার আসল যায়গায় ঢুকি। ততক্ষণে আমি উপন্যাসটির অর্ধেক পড়েছি মাত্র। ফলে যেটা হয়েছে আমার মধ্যে অর্ধ নজরুলের ছাপ পড়ে যায়। আমি তার মত ভাবতে থাকি, ইমোশনাল হতে থাকি। এই ঘটনার পর একটি বিপত্তি ঘটে। ব্যাপারখানা শেয়ার না করলেই নয়। লেখক সাহেবের কোন এক পোস্টে ডাক্তার সমাজ এবং আমসমাজের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা চলতে থাকে। আম সমাজের পক্ষে আমি একাই দাঁড়িয়ে। এমন সময় এক নারী আমাকে লক্ষ্য করে অতি নিষ্ঠুর ভাবে কঠিন কঠিন বাক্য লিখতে থাকে । আমার মনে হলো, এর একটি বিহিত করা দরকার। চট করে আমি মেয়���টিকে বললাম, ইউ আর সো কিউট। মেয়েরা মূলত প্রশংসায় গলে যায়। কিন্তু এই নারীর ক্ষেত্রে তা ঘটলো না। সে আমাকে আরও প্রখর হৃদয় বিধ্বংসী কথা শোনাতে লাগলো। আমি তখন কেবল ফজিলাতুন্নেসা নজরুলকে কীভাবে জব্দ করেছে সেইটুকু পড়ে উঠেছি। যেহেতু আমি তখন অর্ধ নজরুল, কাজেই আমি নজরুলের মত এক বুক ভরা বিরহ নিয়ে মেয়েটির সাথে যথাসম্ভব খাতির জমাতে লাগলাম। ফলাফল যেটা দাড়ালো, আরেকটি নারী- যে আমার পূর্ব পরিচিত- সে কমেন্টগুলো দেখে ফেললো। আমাকে যা-তা বলে তুলোধূনা করে ছাড়লো। পুরো দোষটা যেয়ে পড়লো লেখক সাহেব এবং নজরুলের উপর। আমি কষ্টে বিরহে কমেন্ট করা বাদ দিয়ে দিলাম। তারপর আবার পড়া শুরু করলাম। উপন্যাসের শেষের দিকে এসে পরিস্থিতি অন্যরকম হয়ে গেল। নজরুল শব্দটা শোনামাত্রই আমার বুক জ্বলতে লাগলো, আমার চোখ আপনাআপনি ভিজে যায়। কোন এক বুনো মায়ায় বুকটা হু হু করে ওঠে। যাকগে ওসব কথা। গতকাল লেখক হিমালয় সাহেবের বক্তব্যে খেয়াল হলো, প্রশংসা সবাই করছে, কিছু সমালোচনাও করা উচিৎ। সব ভাল বললেও আবার লেখকদের অপমান হয়। কয়েকটি কটূক্তি নিম্নে অবতীর্ণ হচ্ছেঃ
১। হ্যারিদাস পাল, তার স্ত্রী-সন্তান এবং চুনিলালের চরিত্রের আধিক্যতা আমার নজরে লেগেছে। যদিও ইহা নিছক উপন্যাস কাজেই সয়ে নেওয়া যায়।
২। নজরুলকে ঢাকায় আনার পর হেডমাস্টারের ঘটনাটি কলেবর বৃদ্ধিজনিত চরিত্র মনে হয়েছে। যদিও সেইসময়কার মানুষ কেমন করে নজরুলকে স্বাগত জানিয়েছিলো সেসবের বিবরণ হেতুও এই চরিত্র আসতে পারে। তবে নুতন করে আরেকটি চরিত্র আনা এক্সট্রা মনে হয়েছে।
৩। বইয়ের প্রচ্ছদ প্রথম থেকেই তেমন পছন্দ হয়নি। এর চেয়ে ভাল কেমন প্রচ্ছদ হয় তাও জানিনে।
একজন সু-সমালোচক বন্ধুই বটে। এমন একটা বই যেটা যে কেও পড়লে আনন্দ, মুগ্ধ হবে। ফাইব স্টার ছাড়া কম দিলে অন্যায় হবে।
আমাদের একজন নজরুল ছিল। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। তার জীবনকে নিয়ে এই বইটি। তার জীবন ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর। সেই রোমাঞ্চ গুলি লেখক এত সুন্দর করে তুলে ধরেছেন মাঝে মাঝে মনে হতো আমি লেখকের লিখায় নজরুলের প্রত্যেকটা ঘটে যাওয়া ঘটনা তার খুব কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছি। লেখকের একটা ভাল গুন তিনি গল্পে কিছু চরিত্র বানান সেগুলি পড়ে মনেই হবে না ঐগুলা কাল্পনিক মনে হবে বাস্তব(কিন্তু আমি জানি না এই চরিত্র গুলো সত্যি ছিল কিনা। ) আমার সব চাইতে ভাল লেগেছে সেই সময়ের বাংলা সাহিত্যের যে সোনালী মুখগুলো ছিল রবীন্দ্রনাথ ,শরৎ, জীবন, জসিম, মোতাহের সবার গল্পগুলো তিনি তুলে ধরেছেন। এবং তুলে ধরেছেন নজরুলের সাথে তাদের পরিচয়, মেশা, গল্প আড্ডা । একেক কবি লেখকের গল্পে ঢুকা বর্তমান সময়ে বহু কাস্ট অভিনীত সিনেমায় অভিনেতাদের প্রবেশের অনুভূতি দিবে আপনাকে। গল্পে কখন নজরুলের ওপর প্রচন্ড রাগ উঠবে, কখনো তার প্রতি মায়া লাগবে, আবার কখনো তার আনন্দে আন্দনও লাগবে। গল্পে তৎকালীন সময়ের অনেক ঘটে যাওয়া ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে যেমন মুসলিম হিন্দু দাঙ্গা, বিশ্ব যুদ্ধ আরো অনেককিছু। আপনি যদি জীবনী পড়তে ভালোবাসেন তাহলে নজরুলের রোমাঞ্চকর জীবন একটা যাত্রা শুরু করতে পারেন বইটির মাধ্যমে আশা করি আপনিও রোমাঞ্চিত হবেন।
We had one Nazrul. He is our national poet. This book is about his life. His life was full of adventure. The author has portrayed those thrills so beautifully, sometimes I felt like I could see each and every incident of Nazrul very closely in the author's writing. One of the good qualities of the author is that he creates some characters in the story, reading them you will not think that they are fictional, they will seem real (but I don't know if these characters were real.) I like the golden faces of Bengali literature of that time like Rabindranath, Sarat, Jiban, Jasim, Motah all the stories he highlighted. And highlighted their acquaintance with Nazrul, Mesha, story chat. Entering the story of each poet writer will give you the feeling of entering the actors in today's multi-cast movies. In the story, sometimes you will feel anger towards Nazrul, sometimes you will feel affection for him, and sometimes you will also feel joy in his happiness. The story also depicts many events of that time like Muslim Hindu riots, world wars and many more. If you love to read biographies then you can embark on a journey through Nazrul's thrilling life, I hope you will be thrilled too.
বর্তমানে যারা লেখালেখি করেন তাদের অধিকাংশের লেখাতেই হুমায়ূন আহমেদের প্রভাব বেশ ভালো ভাবেই দেখা যায়। বর্তমানের জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের একটি বই ই আমার পড়া হয়েছে- আরশিনগর। সেখানেও প্রবলভাবে হুমায়ূন উপস্থিত ছিলেন। প্রভাব থাকাটাকে আমি দোষণীয় কিছু মনে করি না। রবীন্দ্র প্রভাব থেকেও বের হয়ে আসতে বহু সময় লেগেছে। কিন্তু বর্তমানের অধিকাংশ লেখক যেভাবে হুমায়ূনকে কপি করে লেখার চেষ্টা করেন তা অত্যন্ত বিরক্তিকর, এতে লেখা তার স্বাভাবিকতা হারায়। রবির লেখাতেও হুমায়ূন এর প্রভাব রয়েছে তবে হুমায়ূনকে কপি করে লেখার প্রবণতা রবির লেখায় নেই। রবি লিখেন চমৎকার। ঝরঝরে লেখা, একটানেই পড়ে ফেলা যায়। প্রায় সাড়ে ৩০০ পৃষ্ঠার এই বইটিও একদিনেই পড়ে শেষ করেছি। এটা আমার পড়া আশীফ এন্তাজ রবির দ্বিতীয় বই। এর আগে গত ঈদের ছুটিতে লেখকের পূর্বপুরুষ বইটা পড়া হয়েছিলো। ভালোই লেগেছিলো। এবারের ঈদে তাই পড়া হলো আমারে দেব না ভুলিতে। বইটা মূলত আমাদের তারাক্ষ্যাপা, দুখু মিয়া, নুরু মিয়া অথবা কাজী নজরুল ইসলামের ফিকশনাল বায়োগ্রাফি! ইতিহাসের সাথে লেখক মিশ্রণ ঘটিয়েছেন নিজের কল্পনার। এই জনরার বইয়ের সমস্যা হলো মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই কল্পনা ও ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। বিশেষ করে যদি সে ইতিহাস সম্পর্কে পূর্ব কোন আইডিয়া না থাকে। লেখকের কল্পনাকে সত্য ইতিহাস বলে ধরে নেয়। আপনি যদি সুনীলের প্রথম আলো পড়ে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জেনে ফেলেছেন বলে মনে করে থাকেন তাহলে যে ভুল করবেন, এই বইয়ের ক্ষেত্রেও নজরুল সম্পর্কে জেনে ফেলেছেন মনে করলে একি ভুল করবেন। নজরুলের মতো আজব চরিত্র বাংলা সাহিত্যে আর একজন আছে কিনা আমি জানি না। নজরুলকে বিভিন্ন দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। নির্মোহভাবে নজরুলকে ব্যাখ্যা করেছেন এমন লেখা আমি খুব কমই পেয়েছি। নজরুলকে ব্যাখ্যা করতে যেয়ে লেখকের নিজ আদর্শ বিশ্বাসের একটা প্রভাব লেখার মধ্যে এসেই যায়। ফলে একই ঘটনায় একজন যখন নজরুলের প্রশংসা করেন, অপরজন করেন নিন্দা। গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাকে এড়িয়ে আপাত গুরুত্বহীন ঘটনাও গুরুত্বের সাথে হাইলাইট করা হয়। সুনীলের প্রথম আলোর ক্ষেত্রে কথাগুলো যেমন সত্য, এই বইয়ের ক্ষেত্রেও তাই। মূল কথা হচ্ছে, ফিকশনকে ফিকশন হিসেবেই পড়া উচিত, ইতিহাস হিসেবে নয়। আপনি যদি এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে পারেন তাহলে বইটা পড়ে আরাম পাবেন। মোটাদাগে বইটা আমার কাছে ভালোই লেগেছে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখার আগে ছোট্ট একটা ঘটনা বলে নিতে চাই। "রবি" ভাইয়ের আরও অনেক ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষীদের মত আমিও জানতাম এবার তিনি "নজরুল" শরাব পান করেছেন। তারই ফলসূতিতে আমরা পেতে যাচ্ছি "আমারে দেব না ভুলিতে" শিরনামে নজরুলের ইতিকথা। লেখকের "পূর্বপুরুষ" পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি- তার লেখা পড়তে শুরু করলে থেমে যেতে ইচ্ছে করবে না। তাই রকমারিতে প্রি-অর্ডার করে বইটি হাতে পেয়েও ছুটির দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে সেই দিন এল। চাকুরিজীবীদের চাঁদ রাত তুল্য সেই বৃহস্পতিবার। কিছুক্ষণ আগেই বইটি পড়া শেষ হল।
পড়তে শুরু করার পর থেকে আমার ছোটাছুটি শুরু হয়েছে। রবি ভাই রীতিমতো আমাক�� বাধ্য করেছেন দুখু মিয়ার সাথে চুরুলিয়া থেকে অন্ডাল জংশন, সেখান থেকে আসানসোল, ময়মনসিংহ, কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুড়ে বেড়াতে। তার সীমাহীন জীবন সংগ্রামে যে ক'টি মানুষ জড়িয়ে ছিল তাদের খুঁজে পেতে লেখকের কি পরিমাণ অধ্যবসায় আর শ্রম লেগেছে তার কতকটা উপলব্ধি করেছি। সেই সাথে উপলব্ধি করেছি অর্থের প্রয়োজনীয়তা। অর্থ হয়ত সমস্ত সুখের কারণ হয় না, তবে কিছু কিছু দুঃখ ঢেকে রাখতে অর্থের জুড়ি নেই। আধপেটা খেয়ে নজরুল সেই সংগ্রামে মেতেছিলেন আরও দুটি ছায়া "প্রমীলা দেবী(আশালতা সেন) আর গিরিবালা"। প্রাণপ্রিয় পুত্র বুলবুল বিয়োগের শোক কবির মত আমাকেও গ্রাস করেছিল।
এক-আধটু উদাসীন না হলে কবি হওয়া যায় না বোধহয়। আর আমাদের কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ভালবাসার ফেরিওয়ালা। তার সম্মোহনী জাদুতে মেতেছিল পুরো ভারতবর্ষ। কখনও তিরস্কার আবার কখনও জয়গানে তার জীবনটা একই সাথে হয়ে উঠেছিল রোমাঞ্চকর এবং দুর্বিষহ।
"ফজি তোমায় বোঝে নি কো হায়- দেয় নি তারার ফুল, কেঁদো না কেঁদো না কবি- ওহে, নজরুল"।
নজরুল ইতিহাসের সাথে চলতে চলতে যখন দেখলাম পথের হয়েছে শেষ। তখন রবি ভাইয়ের সাথে একমত হয়েছি। উনাকে লিখে শেষ করা যাবে না। শেষ পাতায় এসে রীতিমতো ধাক্কা খেয়েছি একটা।
[বই পড়লেও পাঠের প্রতিক্রিয়া সাধারণত লিখা হয় না। আমার এই প্রতিক্রিয়া যদি লেখকের চোখে পড়ে তিনি এই লিখার ভুল-ক্রুটি মার্জনা করবেন।]